জাঁ পল সার্ত্রে ও কার্ল মার্কস — তুলনামূলক ভাবনায়  <br />   প্রীতম সেনগুপ্ত

জাঁ পল সার্ত্রে ও কার্ল মার্কস — তুলনামূলক ভাবনায়
প্রীতম সেনগুপ্ত

 

জাঁ পল সার্ত্রে  এক মহৎ মানুষ ছিলেন, সেই নিয়ে কোনও সংশয় নেই। সমগ্রজীবন শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের উত্তরণের কথা ভেবেছেন, নানাভাবে চেষ্টা করেছেন তাদের সংগ্রামের অংশীদার হতে। ধনী শ্রেণির প্রতি অপরিসীম ঘৃণা পোষণ করে এসেছেন, অবিশ্বাস দেখিয়েছেন। অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের উন্নয়নের বিষয়ে ছিলেন প্রবল আশাবাদী। সাম্যবাদ, সমাজতান্ত্রিক ভাবনার প্রতি তাঁর একটা সমর্থন ও সহানুভূতি লক্ষ্য করা যায়। আর এই জায়গা থেকেই ক্রমশ মার্কসবাদ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। মার্কসবাদ বিষয়ে অতি উচ্চ ধারণা পোষণ করেছেন, বলেছেন মার্কসবাদ এমন একটি দর্শন যার বাইরে আমরা যেতে পারি না। কিন্তু এটাও ঠিক সার্ত্রের অস্তিবাদী দর্শন মার্কসবাদের  মূল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে স্তব্ধ, প্রাণশক্তিহীন করে তোলার কাজে প্রয়াসী হয়েছে। মার্কসবাদের  মৌল গতিশীলতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। সার্ত্রে ইতিহাসের জায়গা থেকে দ্বন্দ্ববাদকে মেনে নিয়েছেন কিন্তু বিশ্বপ্রকৃতির দ্বন্দ্বকে স্বীকার করেননি।

অস্তিবাদী ধ্যানধারণা বিষয়ে যদি আমরা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখতে পাব এর মূলে রয়েছে বুদ্ধি ও জ্ঞানের  সঙ্গে আবেগ ও অনুভূতির সংঘাত। অস্তিবাদীরা ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্নেই সরব থাকেন, সমাজ পরিবর্তন সেক্ষেত্রে গৌণ। প্রাচীন গ্রিসের সিনিক ও সাইরেনাইক দার্শনিকেরা এই জাতীয় ভাবনা থেকেই গড়ে তুলেছিলেন সংশয় ও নিঃসঙ্গতার জীবন দর্শন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মার্কস এবং এঙ্গেলস যখন প্রকৃতিবাদ ( Naturalism )  ও হেগেলীয় ভাববাদ থেকে শ্রেষ্ঠ ভাবনাগুলি আহরণ করে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের ভিত্তি নির্মাণ করছেন, দুনিয়াকে বদলে দেওয়ার সঠিক পথ অন্বেষণ করছেন, ঠিক সেইসময় ডেনিস ধর্মীয় দার্শনিক কীকেগার্ড হেগেলের পরমব্রহ্মবাদের ‘বন্ধন’ ছিন্ন করে ব্যক্তির নিরঙ্কুষ স্বাধীনতা ও অনন্য নির্বাচন ( unique choice ) ক্ষমতার দাবি তুলে ব্যক্তিগত ধর্মীয় আবেগ এবং উপলব্ধির জগতে আশ্রয় নিয়েছেন। অস্তিবাদের ইনি এক মুখ্য কারিগর।

জাঁ পল সার্ত্রের  অস্তিবাদী ভাবনার ক্ষেত্রে এই কীকেগার্ড, সঙ্গে হাইডেগারের প্রভাবই অধিক পরিমাণে দেখা যায়। হেগেলীয় প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়। মার্কসবাদের সঙ্গে সার্ত্রের অস্তিবাদের নানা পার্থক্য সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। সার্ত্রে তাঁর অস্তিবাদকে মানবতাবাদ ( humanism ) বলে দাবি করেছেন। কারণ তাঁর মতে, মানুষই সমস্ত মূল্যের স্রষ্টা, সেহেতু তাঁর মতবাদ মানবতাবাদ। অন্যদিকে মার্কসীয় মানবতাবোধের মূল লক্ষ্য হল মানুষের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ ও অগ্রগতি।  মার্কস ও এঙ্গেলস বারংবার একথা জোরের সঙ্গে বলেছেন যে, কমিউনিজমের ধারণা ধণী ও সর্বহারা শ্রেণির বিভেদের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। যেহেতু সাম্যবাদী সমাজ শ্রেণিহীন সমাজ হবে, সেক্ষেত্রে মানবতা হবে সর্বজনীন।

মার্কসীয় দর্শনে চেতনার অস্তিবাদী সংকটের কোনও স্থান নেই। কারণ বস্তুজগৎ ও  চেতনার মধ্যে এখানে কোনও যান্ত্রিক ব্যবধানের অস্তিত্ব নেই। এখানে স্পষ্টতই বলা হয়েছে — অজৈব জড়বস্তু পরমাণুসমূহের বিশেষ বিশেষ রকমের সংগঠনের মাধ্যমেই উৎপন্ন হয় জৈববস্তুর বিভিন্ন প্রকার অণু। আর এই সমস্ত জৈব অণুর সংগঠন থেকে সৃষ্টি হয় প্রাণ। প্রাণ কোনও অতীন্দ্রিয় অতিপ্রাকৃত শক্তির অভিব্যক্তি নয়, প্রাণিজগতের ক্রমবিকাশও নয়। সার্ত্রের দর্শনে চেতনা হল একটি মৌলিক ( Original ) অনাবশ্যিক ( Contingent ) ঘটনা। এই চেতনা কিন্তু বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদী দর্শনের চেতনা নয়।  সার্ত্রের মতে,  চেতনার অধিকার বজায় রাখতে ‘নেতি’র হাত থেকে নিস্তার পেতে আমরা চেষ্টা করি, ‘ স্ব- মধ্যস্থ স্ব-জন্য সত্তা’ ( being in and for itself) হয়ে ওঠার। বস্তুতপক্ষে এই সমগ্র বিষয়টিই স্ববিরোধী। মার্কসবাদ ও সার্ত্রের অস্তিবাদের একমাত্র সাদৃশ্য হল, উভয় ভাবনাই নিরীশ্বরবাদকে স্বীকৃতি দিয়েছে।  কিন্তু নিরীশ্বরবাদ থেকে সার্ত্রে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা পুরোপুরি অস্তিবাদী ও মার্কসবাদবিরোধী।

মার্কসবাদী জ্ঞানতত্ত্বের উপর সার্ত্রের খুব একটা আস্থা না থাকলেও সেই জ্ঞানতত্ত্ব যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত ও গতিশীল বলে মনে করা হয়। মার্কসবাদ অনুসারে, মানবিক জ্ঞান বাস্তব সত্তারই প্রতিফলন। কিন্তু এই ‘প্রতিফলন’ কথাটির সঠিক অর্থ সার্ত্রে বুঝে উঠতে পারেননি। সুতরাং এইসব আলোচনা থেকে এটা উঠে আসে সার্ত্রের অস্তিবাদ কোনওভাবেই মার্কসবাদের অধীনস্থ একটি মতাদর্শ নয়। যেটা সার্ত্রে দাবি করেছিলেন। নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার মধ্যে দিয়ে মার্কসবাদের  ক্রম অগ্রগতি । এটি কোনও নিশ্চল ( Static ) সত্য নয়, কিন্তু অবশ্যই মৌলিক।

মার্কসবাদ এর মূল সুর যে  দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ ( dialectical materialism )সেই বিষয়ে সার্ত্রে মোদ্দা কথায় যেটা বলতে চেয়েছেন, ইতিহাস ও মানবিক জ্ঞানের বিশ্লেষণে দ্বন্দ্ববাদ প্রযুক্ত হতে পারে। সেই হিসেবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদ গ্রহণযোগ্য হলেও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কোনওভাবেই নয়। আবার প্রকৃতির মধ্যে যেহেতু কোনও ঐক্য নেই, বুদ্ধিগ্রাহ্য দ্বন্দ্ব নেই এবং এটি নিতান্তই বহির্সত্তা, তাই এটি নিশ্চিতভাবে অদ্বান্দ্বিক। এক্ষেত্রে মনে হয় সার্ত্রে অনেকটাই প্রত্যক্ষবাদ ( Positivism ) দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্ব প্রকৃতি একটি সামগ্রিক সত্তা এবং সামগ্রিক সত্তা হয়েও এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য বিভাগ। স্বরূপতঃ বিশ্ব প্রকৃতি অনন্ত, যেটি ক্রমাগত নতুন নতুন অস্তিত্বের পরিসর,  নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য এবং নিত্য নতুন প্রকার ( modes ) প্রকাশ করে চলেছে।

এইভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি, সার্ত্রের অস্তিবাদ ও মার্কসবাদের মধ্যে রয়েছে নানা ব্যবধান। সবচেয়ে বড় কথা হল সার্ত্রে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে সরাসরি বর্জন করেছেন অধিবিদ্যা ( metaphysics) তকমা এঁটে। অথচ দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ হল মার্কসবাদের প্রাণভোমরা, জিয়নকাঠি।

 

তথ্যসূত্রঃ প্রসঙ্গ জাঁ পোল সার্ত্র, সম্পাদনা: তন্ময় দত্ত

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes