
দুই বোন সুদীপ বসু
হ্যাঁ–দিদিমনি ফুল একবারে সহ্য করতে পারত না। না–দিদিমনির প্রাণ ছিল গাছ–ফুল–লতাপাতা । নিজের হাতে বাগানটাকে সাজিয়েছিল।রূপযামনির ডালে খয়েরমাথা সুইচোরু বা ভাতশালিক এসে বসত যখন, না–দিদিমনি গুনগুন করে গেয়ে উঠত ‘আহা এ কোন অচিন অতিথি …… ‘। হ্যাঁ–দিদিমনির চোখেমুখে চাপা বিরক্তি আর রাগ ছড়িয়ে যেত। কিন্তু লোকে যখন জিজ্ঞেস করত’ বাগানটা কিন্তু ভারি সুন্দর। তোমার নিজের হাতে করা বুঝি?’ হ্যাঁ দিদিমনি লাজুক মুখ নিচু করে জবাব দিত ‘ ওই আরকি….. মানে একটু আধটু …… মানে সারাজীবনের শখ কিনা!’ না–দিদিমনি একই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কঠিন গলায় বলত’ না না ছিঃ। ওসবে আমার কোনো রুচিই নেই।’
একটা কুকুর ছিল ও বাড়িতে। ড্র্যাকুলা। শুয়ে থাকত সারাদিন শুয়েই থাকত। হ্যাঁ–দিদিমনি আদর করে ওর সারাগায়ের রোম আঁচড়ে দিত। ভারি ন্যাওটা ছিল হ্যাঁ–দিদিমনির। আমি যেদিন চলে যাবো আমার সঙ্গে তুই–ও চলে যাবি, কেমন? কথা দে’– হ্যাঁ–দিদিমনি বলত। রাতে ড্র্যাকুলাকে নিজের বিছানায় কোলের কাছে নিয়ে শুত।
না–দিদিমনি ড্র্যাকুলার ছায়া এড়িয়ে চলত। সহ্যই করতে পারত না। কিন্তু হ্যাঁ–দিদিমনি লোকসমক্ষে বলত লাগে না আবার ঘেন্না লাগে না; জন্তু–মানুষ সব একাকার হয়ে গেল। এমনই বাড়ি। না–দিদিমনি বলত না না ঘেন্না কীসের ? আহা একটা প্রাণী তো! ‘
বাড়িতে একটা ল্যান্ডফোন ছিল। মাঝে মাঝে বেজে উঠত। হ্যাঁ–দিদিমনি ফোন তুলেই হাসিতে গড়িয়ে পড়ত। আরে বলো বলো …. বাব্বা কতদিন পর….. মনে পড়ল তাহলে….. আমি ? তা আছি একরকম …… মাঝখানে কী একটা যেন হলো…… কী হলো…… দাঁড়াও একসেকেন্ড হোল্ড করো।’ কোনোদিনই কোনো ফোন না–দিদিমনির জন্য বেজে উঠত না। না–দিদিমনি নিজে থেকে কাউকে ফোন করলে কখনোই পেত না। শুধু ফোনের তার বেয়ে অনেক অচেনা লোকের কথাবার্তা ভেসে আসত, যেন হারিয়ে যাওয়া একটা সময় – কেউ হাসছে, কেউ কাউকে চিৎকার করে ডাকল এ কেউ রাগ দেখাচ্ছে…….
মাসে অন্তত দুবার হ্যাঁ–দিদিমনি শাটারখোলা বন্ধ পোস্টাফিসে যেত। পুরনো জীব, মাকড়সার জং আর বাতিল অন্ধকার পেরিয়ে শূন্য কাউন্টারের সামনে অদৃশ্য লাইনে দাঁড়াত। কাউন্টারের মুখে পৌঁছে জিজ্ঞেস করত ‘ প্রতাপের কোনো চিঠি এসেছে ? একটু খুঁজেখেঁজে দ্যাখো না গো লক্ষ্মীটি। বোঝোই তো সব।’ পোষ্টাফিসের ফাঁকা কাউন্টার হা হা করে উঠত। মাঝে মাঝে চড়া মেকআপে রাস্তায় বেরোতো। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলত ‘ ওই যাকে বলে একটু মার্কেটিংয়ে। ‘ লজ্জার মাথা খেয়ে বলত ও এসেছে তো। আর্মির কর্নেল। ওরা ছাড়তেই চায় না। [একটু থেমে] এলেই আমার ওপর যত জুলুম। এটা এনে দাও সেটা এনে দাও এটা রান্না করো সেটা রান্না করো……. যাই ভাই, একটু তাড়ায় আছি।’
শোনা যায় অনেক বছর আগে কোনো এক অজানা কারণে না–দিদিমনি বরকে ছেড়ে চলে এসেছিল। প্রতাপ মাঝেমধ্যে আসত। অনেকদিন পর পর। কয়েকদিন ও বাড়িতে থেকে যেত। ইনিয়ে বিনিয়ে বলত ‘ রূপু ফিরে চলো……. জলে ছায়া পড়ে এল, বাড়ি চলো। না–দিদিমনি ঝাঁঝিয়ে উঠত । ‘ কচু যাবো। কচু।’ এ কদিন হ্যাঁ দিদিমনি না–দিদিমনির বরকে আগলে আগলে রাখত। সন্ধেবেলা ভাঙা গলায় ‘ একা মোর গানের তরী………..’ – এর অন্তরোটুকু এবং চার মিনিটের মাথায় ‘ কেন মোর গানের ভেলায় এলে না প্রভাত বেলায় ‘ এবং ক্রমান্বয়ে আইলা শীত ঋতু হেমন্তেরই পর ‘ এবং কে আবার বাজায় বাঁশি এ ভাঙা কুঞ্জবনে’ শোনাত। পাওয়া তাকি দারকি করত। যাবার দিন ঘনিয়ে এলে মুখের কাছাকাছি মুখ তুলে এনে বলত ভুলে যাবে ? ভুলবে না তো ? ভুলবে ?
না–দিদিমনিকে পাড়ার কেউ এব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে অবাক হয়ে বলত – কে এসেছিল ? ওই দূর সম্পর্কের রিলেটিভ আরকি। মানে যাকে বলে লতায়পাতায় ।
সেবার হাড়–কাঁপানো হিম পড়েছিল শহরে। জানুয়ারির শেষ। একদিন গভীর রাতে দুটো সন্ডামার্কা লোক বাড়ির বন্ধ সদর দরজা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। একটা হালকা নীল রাতবাতি জ্বলছিল। যে হ্যাঁ–দিদিমিনিকে নিতে এসেছিল সে না–দিদিমনিকে নিয়ে গেল। যে না–দিদিমনিকে নিতে এসেছিল সে হ্যাঁ দিদিমনিকে নিয়ে চলে গেল।
পরদিন অনেক বেলায় পাড়ার লোক নিঃশব্দ লাল বাড়ির সদর দরজা ভেঙে দেখল না–দিদিমনির বিছানায় হ্যাঁ–দিদিমনি আর হ্যাঁ–দিদিমনির বিছানায় না–দিদিমনি শুয়ে আছে – দুজনের কোলের কাছে দুজন ড্র্যাকুলা।

