অরূপের আলো-অন্ধকার : কবিতা, দেশকাল ও ভাঙা মানবসম্ভার  মহিউদ্দিন সাইফ

অরূপের আলো-অন্ধকার : কবিতা, দেশকাল ও ভাঙা মানবসম্ভার মহিউদ্দিন সাইফ

 

বাংলা কবিতা সম্পর্কে আমরা যদি সামগ্রিকভাবে ভাবি, তবে দেখা যায় যে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে কবিতার ভাষা, ভাবনা ও প্রকাশভঙ্গি ক্রমাগত বদলে গেছে। এই পরিবর্তন এসেছে ইতিহাসের ধাক্কা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, উদ্বাস্তু সংকট, নতুন প্রযুক্তি, বিশ্বায়ন, এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাবের কারণে। কবিতার ভিতর শুধু নান্দনিকতা নয়, এসেছে ভাঙন, বিদ্বেষ, ভয়, আঘাত এবং মর্মান্তিক স্মৃতির অনুরণন। এই পরিবর্তনের ধারায় অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা একটি বিশেষ, স্বতন্ত্র ও গভীর কণ্ঠস্বর। আমার এই কথাগুলির সমর্থন করবে ‘রাবণ’ থেকে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ ‘আমার কোনো জন্মদিন নেই’ বইটি।

অরূপ গঙ্গোপাধ্যায় মূলধারার রাজনৈতিক বক্তৃতা বা স্লোগাননির্ভর কবি নন। তিনি যেসব বিপর্যয়ের কথা বলেন, তা সরাসরি ঘোষিত নয়, বরং তাঁর কবিতার অন্তর্গত নীরবতা, চিহ্ন, প্রতীক, সবই ছিন্ন দেহাবশেষ, বিপর্যয়-পরবর্তী শূন্যতা ও অন্ধকার থেকেই উঠে আসে। তাঁর কবিতা ইতিহাসকে পুনর্লিখন করে, কিন্তু সেই ইতিহাস সরকারি নথির নয়, বরং মানুষের ক্ষত, শরীর, মৃত্যু, অপেক্ষা, অনুপস্থিতি, উদ্বাস্তু জীবন ও সভ্যতার পচনের ইতিহাস।

 

আধুনিক জগতে কবির ভূমিকা কী? কাকে কেন্দ্র করে কবিতা রচিত হয়— মানুষকে, ইতিহাসকে, নাকি ভাষাকে? এই প্রশ্নগুলি গত পঞ্চাশ বছরের সাহিত্যচর্চায় বিশেষভাবে আলোচিত। দেরিদা, ব্লাঁশো, বেঞ্জামিন, আগামবেন, লিওতার্দ, লেভিনাস, এই সকল ইউরোপীয় দার্শনিকদের ভাবনা আজ প্রায় সব আধুনিক কবিতার পাঠে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার ব্যাখ্যাও আমরা তাদের আলোকে আরও গভীরভাবে বুঝতে পারি।

এই প্রবন্ধে আমরা অরূপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কবিতা ও তাদের বিষয়বস্তু, যেমন, ইতিহাস, উদ্বাস্তু অভিজ্ঞতা, যুদ্ধের ট্র্যাজেডি, ভাষার সীমা, প্রেমের অনুপস্থিতি, প্রকৃতির চক্র ও সভ্যতার পচন, ধাপে ধাপে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব। একইসঙ্গে দেখব কিভাবে তাঁর কবিতা বাংলা কবিতাকে নতুন এক রাজনৈতিক-অস্তিত্বগত উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

 

বাংলা কবিতার এই নতুন আধুনিকতা মূলত চারটি প্রধান ধাক্কায় গড়ে উঠেছে— ১. দেশভাগের ট্র্যাজেডি ও উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা। ২. ১৯৭০-এর দশকের রাজনৈতিক সহিংসতা এবং নকশাল আন্দোলনের ব্যর্থতা। ৩. নব্বইয়ের দশকের অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বিশ্বায়ন। ৪. সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ এবং আন্তঃদেশীয় উদ্বাস্তু পরিস্থিতি। এই চারটি স্তম্ভ একসঙ্গে মিলিত হয়ে বাংলা কবিতার ভিতর নতুন এক নন্দনচেতনা গড়ে তোলে। কবিতায় আসে ভাঙন, অনিশ্চয়তা, মৃত্যু, ভয়, অনুপস্থিতি ও অস্থির ইতিহাসের মতো বিষয়। অরূপ গঙ্গোপাধ্যায় এই ধারার মধ্যে দাঁড়িয়ে নতুন এক ভাষা নির্মাণ করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর শব্দচয়ন, প্রতীক, চিত্রকল্প এবং স্বর, সবকিছুই আসলে বিপর্যয়ের ভাষা। ব্লাঁশো যাকে বলেছেন “writing of the disaster”, অরূপের কবিতা যেন তারই বাংলা প্রতিচ্ছবি।

 

 

যে সময়ে কবিতা দাঁড়িয়ে থাকে:

কোনো ইতিহাসই নিছক সময়ের টুকে রাখা নথি নয়। প্রতিটি ইতিহাসই মূলত মানুষের পরিবর্তনের ইতিহাস। সেই পরিবর্তন মনের, ভাষার, বোধের ও আত্মচেতনারও। বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা কবিতা ঠিক এই দ্বন্দ্বময় মানব-ইতিহাসের মধ্যবিন্দুতে এসে দাঁড়ায়। একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রের নির্মম বাস্তবতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দাঙ্গা-হাতাহাতির কালো ছায়া, অন্যদিকে ভাষার ভেতরের রসায়ন, যেখানে শব্দেরা চেষ্টা করছে নিজেদের সীমা ভেঙে বেরোতে। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কবিরা বারবার নিজেকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেছেন: আমি কে?, আমার অস্তিত্ব ও ভাষা কোথায় ভেঙে যাচ্ছে?, আমার ভূমিটি কোন দিকে এগোচ্ছে? ঠিক এই প্রশ্নগুলোর ভেতরেই গড়ে উঠেছে অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা-জগত। তাঁর কবিতা যেন এক অদ্ভুত প্রান্তিক চৌহদ্দি, যেখানে ইতিহাসের চিতা ক্রমাগত জ্বলছে, অথচ সেই উত্তাপকে শব্দের মধ্যে ধরে রাখতে গিয়ে কবি আবারও নীরবতার দিকে ফিরে যাচ্ছেন। তাঁর কবিতায় আছে বাস্তবতার খসখসে দাগ, আবার আছে স্মৃতির আলো-ছায়া, যে আলো কখনো সম্পূর্ণ আলোকিত করে না, যে ছায়াও পুরোটা ঢেকে রাখে না। এই আলো-অন্ধকারের মধ্যেই অরূপের কবিতা একধরনের মানবসম্ভারের তালিকা তৈরি করে। এই তালিকায় আছে বেঁচে যাওয়া মানুষ, পতিত মানুষ, দেশান্তরী মানুষ, শোকাকুল মানুষ, আর আছে এক অদ্ভুত উদাসীন মানুষের দল, যারা ইতিহাসের মাঝপথে এসে উদ্ভ্রান্ত দাঁড়িয়ে থাকে। যেন কিছুই করতে পারে না, শুধু চেয়ে থাকে।

 

 

ইতিহাসের মুখোমুখি কবি:

ইতিহাসের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হল, সে কখনো নিছক বাহ্যিক ঘটনা নয়। ইতিহাসের প্রকৃত অভিঘাত ঘটে মানুষের অন্তর্জগতে। বাংলায় স্বাধীনতার পর যে-ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, ধর্নায়-ঘেরা প্রতিবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা চলছিল, তা কবিদের মনের ওপর এমনভাবে আঘাত হেনেছিল যে, কবিতা আর কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা আনন্দের ভাষা রইল না। কবিতা তখন থেকে হয়ে উঠল এক সাক্ষীর ভাষা। তখন তো তা-ই হয়ে ওঠার কথা। এইভাবেই ইতিহাসের দুর্যোগ যখন আমাদের ভিতরে জমে ওঠে, সেই জমাট ব্যথাই তখন শব্দ চায়। সে সেই ব্যথাকে প্রকাশ করতে চায়। অরূপের কবিতা হল সেই ব্যথারই সন্তান।

 

আগেই বলেছি, তাঁর কবিতার ইতিহাস কোনো রাজনীতি-বর্ণনার ইতিহাস নয়। এ ইতিহাস নিশ্বাসের, চলার পথে হঠাৎ দেখতে পাওয়া লুটোনো মৃতদেহের, বৈশ্বিক মানুষের অস্থিরতা ও অস্তিত্ব সংকটের, এ ইতিহাস নিদ্রাহীনতা ও তার কারণসমূহের। অরূপের কবিতায় ইতিহাস আসে এমনভাবে, যেন প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে কবির নিজের জীবনরেখা সরাসরি জড়িয়ে আছে। ইতিহাস আর কবির ব্যক্তিসত্তা তখন আলাদা থাকে না। একই আলো-অন্ধকার তাদের ঢেকে রাখে। এই সূত্রে মনে পড়ে যাচ্ছে তাঁর ‘একটি রাত্রির প্রস্তাবনা’ কবিতাটির কথা।

কোনো কবির ভাষা কেমন হবে, এ সিদ্ধান্ত অনেক সময় তাঁর পৃথিবী দেখার পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। অরূপের কবিতায় যে অন্ধকার, সেটি শুধু রাতের নয়, এটি মানুষের মধ্যেকার লুকোনো, রাষ্ট্রের ভেতরে গোপন এবং আমাদের সমাজের বিস্মৃত এক গভীরতার অন্ধকার। অন্ধকার রাত যে-ধরনের অভ্যন্তরীণ বিষণ্ণতার টান বহন করে, অরূপের অন্ধকার তাকে আরও রাজনৈতিক, আরও বহুমাত্রিক করে তোলে। এই একই কবিতায় আসে এক দলিতা নারীর প্রসঙ্গ। সে শুধু সমাজ বা রাষ্ট্রের অন্যায় বা অবদমনের প্রতীকই নয়, সে ইতিহাসেরও অবশিষ্ট। মানুষের মানবতা যেখানে ভেঙে পড়ে, যেখানে সমাজ নিজের নিষ্ঠুরতা লুকিয়ে রাখতে চায়, সেখানেই তার দেহ দাঁড়িয়ে থাকে। এই নারী রাষ্ট্রের শোষণের সাক্ষী, ধর্ম আর জাতির নিস্তব্ধ ছুরির সামনে ধারালো নীরবতার মতো মূর্তিমান। তার উপস্থিতি যেন অব্যক্ত ইতিহাস, অপেক্ষমাণ মানবিকতা এবং শ্রেণি-জাত-লিঙ্গ রাজনীতির বহুমাত্রিক বাস্তবতার প্রতিভূ হয়ে ওঠে। আর এই নীল খামের কামরাটিকে আমার মনে হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতীক। এটি আদতে একটুও স্থির নয়। একে যেমন একদিকে আশ্রয় বলে মনে হয়, অন্যদিকে আবার হুমকিও লাগে। নীল রঙ যেমন চিঠির সম্ভাবনাকে নির্দেশ করে, হয়ত শুভেচ্ছার, হয়ত বা আলোকের, আবার ওই একই নীল খামের ভেতরে আছে অনিশ্চয়তা, এই বোধও জাগে। কবি শুনতে পান ‘রুদ্ধ কলসির পিপাসানাদ’, তিনি থাকতে পারেন না ওই কামরায়। তাঁর যেন কেমন গা ছমছম করে।

তবে এই কবিতাটির অন্যতম একটি বিন্দু বর্তমান জীবনের অসহনীয় নিঃসঙ্গতা। চাল ডাল তেল তিষি আফিং এমনকি ফরাসি মদের বোতল, ভোগবাদের সমস্ত আয়োজন বোঝাই করা সেই গোছানো কামরাতে তিনি বলে ওঠেন— “আমি একা মানুষ।” সবকিছু পেয়েও মানুষের এই একাকিত্ব আর যায় না। এই একাকিত্ব অন্যের অনুপস্থিতির নয়, বরং অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের অসম্ভবতাকে ফাস করে ফেলে। আজকের পুঁজিবাদী সংস্কৃতি আমাদের বারবার বোঝায়— “তোমার একাকিত্ব বাজার থেকেই সমাধান হবে, যদি তুমি আরো কেনো, আরো সংযুক্ত হও, আরো ভোগ করো।” কিন্তু আমরা জানি যে এই একাকিত্ব আসলে ‘subjectivity’-র মৌলিক সত্য। একে বাজার দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। ফলে কবি জানেন যে, কবিতার শেষে তাঁর যে প্রত্যাশা তা পূরণ হবে না। কিছুতেই হবে না।

 

 

অরূপের কাক:

তাঁর ‘ঝড়ের স্কোয়াড’ কবিতায় দেখি যুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবীর ব্যর্থতা। সেখানে কাকেদের কথা পাই। কাক একটি দৃশ্যমান প্রাণী, কিন্তু আসলে সে দৃশ্যের পেছনের বাস্তব দেখানোর উপায়। ওয়াল্টার বেঞ্জামিন ইতিহাসকে ধ্বংসস্তূপ রূপে দেখেছিলেন, অরূপ সেই স্তূপে কাক বসান, যাতে দৃশ্যের সামনে আমাদের চোখের অক্ষমতা প্রকাশ পায়। অরূপের কাকেরা সেই ধ্বংসস্তূপের পরবর্তী কণ্ঠ। তারা মৃতদেহের ওপর নেমে আসে, এটি যুদ্ধোত্তর বর্বরতার চূড়ান্ত উপলব্ধি। গাজার শিশুর উল্লেখ কবিতাকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় যুক্ত করে। এটি বাংলা কবিতাকে বিশ্ব-মানচিত্রে দাঁড় করায়, যেখানে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা সকল মানবিক সীমানা অতিক্রম করে। তিনি দেখান গাজার শিশুটির অপুষ্ট শিরদাঁড়া ওই কাক ছিঁড়ে খায়। এবং সবচেয়ে শ্লেষাত্বক ব্যাপার হল, “দু’জনেরই কোনও মাতৃভূমি নেই।” কবিতাটির শেষ পংক্তিতে কবি এই অমানবিক ধ্বংসযজ্ঞেরই একজন হিসেবে স্বীকার করেন— “সেনার পোশাকের ভেতরে আমার শীত করে।” লেভিনাসের নীতিশাস্ত্রের আলোকে দেখলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যের মুখই আমাদের নৈতিকতা শেখায়। যুদ্ধ সেই মুখকে লুকিয়ে ফেলে। যুদ্ধ মানুষকে মুখহীন করে দেয়। কিন্তু কবির ভিতরে শীত জাগে। ‘শীত’ অনুভব মানেই নৈতিকতার পুনরাবিষ্কার। মনে পড়ে যায় ইসরায়েলী হত্যাকারীদের কারো কারো স্বীকারোক্তির কথা।

 

 

বিভাজনের রাজনীতি:

এরপর পাই ‘হাওয়ার রাত’ কবিতাটি। এই কবিতাটি মূলত অপহৃত উপস্থিতি, বেঁচে থাকার দৈনন্দিন ভয়, সীমান্ত-রাজনীতি, উদ্বাস্তু সত্তার গভীর ট্রমা, এবং অন্তঃসলিলা অশুভতার পুনরাগমনের শঙ্কা, এই মোটিফগুলো নিয়ে গঠিত। প্রথম লাইনেই “ঘাসের জঙ্গলে পড়ে আছে চটি”, এই চিত্রকল্পটি একটি অলঙ্ঘ্য অনুপস্থিতি তৈরি করে। এটি শুধু একটি হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মারক নয়। এই চটিটি সীমান্তে হারিয়ে যাওয়া দেহের ছায়া। চটি আছে, মানুষটি নেই— এই দ্বৈততা অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের সীমারেখা তৈরি করে। চটি হয়ে যায় সীমান্তের মৌন দলিল। কবি দেখেন “অন্ধকার থেকে আরও দূরতর অন্ধকার”। এই অন্ধকার ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ইতিহাসের পুঞ্জীভূত অমানিশা। এই অন্ধকার নির্দেশ করে রাজনৈতিক দমন, অজানা হিংসা, ‘নেই’-এর পুনরাবৃত্তিকে। “ধর্মকে বারবার ছিঁড়েছে খুঁড়েছে বিধর্ম”, এই অংশটি কবিতাটিকে সম্পূর্ণভাবে সমসাময়িক ভারত ও উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় স্থাপন করে। ধর্মের বিনাশ এখানে পরিচয়ের ধ্বংস, অস্তিত্বের ছিন্নতাও। আমরা জানি ট্রমা সেইখানে জন্মায় যেখানে মানুষের যন্ত্রণা আর ভাষা খুঁজে পায় না, পরিচয়ের সীমানা অনির্দেশ্য হয়, ভয়ের ‘নৈঃশব্দ্য’ ব্যক্তি-সত্তাকে আক্রমণ করে। আর তার সঙ্গে ‘ঢের বিভাজন’, এই শব্দটি অসংখ্য অদৃশ্য ক্ষতের ছবি হয়ে ওঠে। এই কবিতাতেই পাই “আমরা এসেছিলাম, আমরা আবার আসব” এই পংক্তি। এই পংক্তিটি কবিতাটিকে রাজনীতির কেন্দ্র থেকে তুলে এনে মিথিক হিংসার চক্রে ফেলে দেয়। আমরা জানি যে, হিংসা কোনোদিন শেষ হয় না। একটি সহিংসতা আরও একটি সহিংসতাকে আহ্বান করে, ইতিহাস পুনরাবৃত্তিময়। আর হিংসার এই রাজনীতিতে বিপর্যয় সাধারণ গৃহস্থালি জিনিসের মধ্যে সবচেয়ে কঠোরভাবে ধরা পড়ে। তখন আর কারও ঘর থাকে না। কোনো পোড়ো বাড়ির সিঁড়ির চাতালে তোলা মুড়ির টিন হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার ক্ষুদ্রতম কৌশল। উদ্বাস্তু মানুষ ‘মুড়ির টিন আর ধর্মগ্রন্থ নিয়ে বেঁচে থাকে’, এবং এই ঘৃণ্য রাজনীতির চক্রে অধিকারহীনভাবে বেঁচে থাকার ভার বহন করার জন্য ও ব্যবহৃত হওয়ার জন্য বেঁচে থাকে। কবিতার শেষ অংশটি পুরো কবিতাটিকে রাজনৈতিক থেকে ব্যক্তিগত সন্ত্রাসে ফিরিয়ে আনে। যাকে কবি ধরে নিয়েছেন যে, আর ফিরবে না, সেই অনুপস্থিত ব্যক্তিটি হতে পারে পিতা, ভাই, স্বামী, অথবা সীমান্তের যে-কোনো গুম হওয়া মানুষ। তার কথা মনে করে উপস্থিত মানুষগুলোর দুর্দশাকে আরও ব্যঞ্জনাময় করে তুলেছেন তিনি। এই শেষ অংশটি ব্যক্তিগত ইতিহাসের এমন নারকীয়তা তৈরি করেছে, যা রাষ্ট্রীয় হিংসার লেলিহান শিখাটিকে আরও স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর করে তুলেছে।

 

 

অন্ধকারের মুখোমুখি:

আরেকটি কবিতা রয়েছে ‘আঁধার মাণিক’। এই কবিতা ‘হাওয়ার রাত’-এর মতো বহির্জগতের নয়, বরং এটি অন্তর্জগতের অন্ধকার, স্মৃতি, ভয়, ও অন্তর্নিহিত ছায়ার অনুসন্ধান নিয়ে গঠিত। এই লেখা শুরু হয়েছে “একটি তালা কবে থেকে লটকে আছে দরজায়” এই পংক্তি দিয়ে। এই দরজা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ, দুইভাবেই অন্ধকারের দিকে যায়। বাইরের আঁধারে সমাজ, নিরাপত্তার প্রহেলিকা, নিয়ম। ভিতরের দিকে স্মৃতি, ভয় ও অতীত। তালাটি স্থির, কিন্তু কবি ভিতরের দরজা খুলতে চাইছেন। এই আকাঙ্ক্ষা হল নিজের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সংকট। কিন্তু কবি দেখেন বাইরের অন্ধকার ও ভিতরের অন্ধকার একাকার হয়ে যায়। সীমা ভেঙে যায়, ব্যক্তি নিজের গভীরতম ভয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। এই একাকার অন্ধকার হয়ে ওঠে ট্রমার মূল বৈশিষ্ট্য। কবি নিজের মানবিক ভূমিকা— শ্রোতা, সমব্যথী, সমাজ-দ্রষ্টা, এসব পরিচয়ের মধ্যেও একাকিত্ব অনুভব করেন। আর দরজার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা ভয় লুকানো পশুর মতো আচরণ করে। এটি আসলে অবদমিত অনুভূতিরই প্রত্যাবর্তন। ভয়ও তো একধরনের সত্যই। নিজের অন্ধকারের দিকে তাকানো মানে তো নিজের প্রকৃত সত্তাকেই দেখার চেষ্টা। সেই বিপর্যস্ত আঁধারেরই মাঝে তিনি খুঁজতে থাকেন নিজের অস্তিত্বের একান্ত আলোটিকে।

 

 

কোনো জন্মদিন নেই, ব্যক্তিসত্তার অবলুপ্তি:

এই বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা হল এর নামকবিতা’টি। এই কবিতার মূল সুর হলো অবিরাম চলমানতা, যা প্রকৃতি, সময়, ধ্বংস, পুনর্জন্ম এবং বিপর্যয়ের চক্রকে একইসঙ্গে ধারণ করে। কবি যে ‘চোরা ঝর্ণা’র কথা বলেছেন, সেটি কেবল একটি প্রাকৃতিক জলস্রোত নয়, এটি সময়ের অনিবার্যতা ও অন্তঃস্রোতের বিপর্যয়ধ্বনি। চোরা ঝর্ণা সেই ‘ruinous flow’, যা কিছুতেই থামে না, বরং প্রতিটি মুহূর্তে নতুন ক্ষয় সৃষ্টি করে। এখানে ‘ফুটে যাওয়া ফুল’, ‘ক্ষণজন্মা প্রজাপতির অহংকার’ সবই অস্থায়িত্বের চিহ্ন। প্রজাপতির অহংকার ব্যঙ্গাত্মক বলে মনে হয়েছে। তার কারণ প্রকৃতির দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের কাছে ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য কোনো গুরুত্বই পায় না। জোনাকি তার আলো ফেলে, কিন্তু সেটি প্রতিরোধের ক্ষুদ্র আলো মাত্র, “The smallest lights of hope in the ruins of history”. “কোনও পর্বতশ্রেণি কিংবা রেবতী নক্ষত্র”, এমনকি কোনো বৃহৎ আখ্যান, পৌরাণিকতা, দেবতা, কোনোকিছুই বিপর্যয়ের অবিরত স্রোতকে আটকাতে পারে না। কিন্তু তবু কাঠুরে দলের শব্দ শুনে, তাদের ক্ষমতা দেখে জেগে ওঠে অবিশ্রান্ত তৃণদল। টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম অস্তিত্বও প্রতিরোধ করে ওঠে। যদিও জানে অনর্থের কোনো নির্দিষ্ট স্থান নেই, এর উপস্থিতি সর্বব্যাপী। সেই বিপর্যয়ের ব্যাপকতা দেখি এই লেখারই পরবর্তী অংশে। সেখানে UFO, von Däniken, Avi Loeb, সবই এমন এক মহাজাগতিক অনুসন্ধানের প্রতীক, যার কোনো যৌক্তিকত প্রমাণ নেই। কিন্তু কবি দেখছেন একেবারে উল্টো দৃশ্য— সত্যিকারের ‘অলৌকিক আগমন’ হচ্ছে হাসপাতালে বোমায় ক্ষতবিক্ষত শিশুদের তুলে নেওয়া মহাবলীর মধ্যে। সেই শিশুদের, “ধরিত্রী যাদের আর কোনওদিন মাটি দিতে পারবে না”। এ কি শুধুই মৃত্যুর বর্ণনা, নাকি গৃহহীনতার পরম অবস্থা! মনে পড়ে যাচ্ছে আগামবেনের ‘We Refugees’ প্রবন্ধটির কথা, এবং আমার নিজের মতো করে বলতে ইচ্ছে করছে “the ultimate refugee is one who even the earth cannot claim.” আর রাষ্ট্রসংঘের সভা, বিশ্বশান্তির মুখোশ, সব বসে আছে শান্তির টেবিলের মহাভোজে। আমিষাশীদের জন্য সেদ্ধ হচ্ছে মাংস। জ্যান্ত, অর্ধমৃত ও মৃত শিশুর মাংস। আর রাস্তায় জাতির পতাকা নাড়তে নাড়তে নেমে পড়েছে এমন সব অমানুষেরা, যারা হিংসাকে, যুদ্ধকে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সমর্থন করে।

ফুটে ওঠে সভ্যতার নরকদৃশ্য। স্তূপীকৃত এত লাশ যে আর শনাক্ত করাই যাচ্ছে না। এই সীমান্তে কবির কল্পনাও ‘নিথর’ হয়ে যায় অর্থাৎ ভাষা কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কবিতা তখন অন্তহীন বিপর্যয়ের ভাষাহীনতার দলিল হয়ে ওঠে। আসে গান্ধারীর প্রসঙ্গ, সেই পৌরাণিক অন্ধত্বের পুনরাবৃত্তি। তখন গান্ধারীর চোখ বাঁধা ছিল আত্মত্যাগের জন্য। কিন্তু আধুনিক গান্ধারীরা চোখ বাঁধেন ভয়ের কারণে। তাঁরা চোখ বাঁধেন সন্তানের লাশ দেখতে চান না বলে। মঘা নক্ষত্রের কাছে তাঁরা আর্তি জানান। এই নক্ষত্রই যেন মানবসভ্যতার শেষ দেবী, তারই কাছে আর্তি। কিন্তু সেই নক্ষত্র পাল্টা প্রশ্ন করে— “সমস্ত লাশের দায় কোথায় রাখা আছে?” আর কবি, আলজাজিরা চ্যানেলে দেখছেন বীভৎস নৃশংসতার দৃশ্যগুলো। দেখছেন রক্তে ভেজা লাশ, রণরক্তে মাখামাখি ধুলো কাদা। আবার তারই পাশে দেখতে পান পুনর্জীবন, বিদ্যুৎ-প্রবাহিত জলের পানা ফুল। এই চিত্র ভয়াবহভাবে দ্ব্যর্থপূর্ণ। বিপর্যয়ের ভেতরেও জীবন উঠে আসে। কিন্তু দেখা যায় সেটি ‘জারজ’ অর্থাৎ শুদ্ধ নয়, নিরাপদ নয়, নৈতিক নয়। তিনি বড়ো অসহায়ভাবে বুঝতে পারেন, যে সভ্যতাকে নিয়ে মানুষের এত বড়াই, নিদারুণভাবে পচন ধরে গেছে সেই সভ্যতায়।

আমরা দেখতে পাই মানুষের ওপর ছায়ার মতো ঝুলতে থাকে মৃত্যু, এবং যে মৃত্যুতে প্রকৃতির কোনো হাত নেই, বরং বলা যায় power suspended overhead. কবি তাদেরই একজন হয়ে বলছেন, “তবু আমরা সেলফি নিচ্ছি।” জীবনকে উপভোগ করার তীব্রতা যেন আরও বেড়ে যাচ্ছে। মানুষ মৃত্যুর সন্নিকটে থেকেও নান্দনিকতা খোঁজে, We aestheticize our own end. উদ্বাস্তু হওয়ার আগে তারা শেষ নৈশাহার সেরে নিচ্ছেন। বোঝা যায়, মৃত্যুর আগেও মানুষেরা সাধারণ, ক্ষুদ্র সুখ রক্ষা করে। খুব ঘনিষ্ট জন জানায় জন্মদিনের শুভেচ্ছা। কিন্তু কবি তীব্রভাবে বুঝতে পারেন যে, তাঁর কোনও জন্মদিন নেই। একজন মানুষ এই অবস্থায় এসে যার পরিচয়, ব্যক্তিত্ব সবই মুছে যায়। সীমান্তে যাওয়ার আগের অবস্থায় ব্যক্তি আর ব্যক্তি নয়, তার ব্যক্তিসত্তার বিলোপ ঘটে। কারণ, জাতি-রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষকে ‘জাতীয় নাগরিক’ হিসেবে কল্পনা করে। ফলে যে মুহূর্তে কেউ উদ্বাস্তু হয়, সে রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষা হারিয়ে ‘bare life’-এ নেমে আসে, যেখানে সে কেবল বেঁচে থাকা এক শরীরমাত্র, ব্যক্তি বলে তার আর কোনো রাজনৈতিক স্বীকৃতি থাকে না। এই সূত্রে বলাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, এই উদ্বাস্তুর অভিজ্ঞতা আসলে সমকালীন সব মানুষেরই অভিজ্ঞতা। আধুনিকতা আমাদের সবাইকে একধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও নির্বাসনে ঠেলে দিয়েছে।

 

 

ক্ষয়িষ্ণু স্বপ্নের গান:

এরপর ‘পাথরের স্তব’ নামে একটি লেখা পাই। আগের কবিতায় যেখানে রাজনীতি ছিল উন্মুক্ত। বর্ডার, উদ্বাস্তু, শহীদ, লাশ ইত্যাদির বাস্তবতা ছিল দৃশ্যমান। অন্ধকারের রাক্ষুসে শক্তি ছিল স্পষ্ট। এই কবিতায় তা অন্তরীণ অন্ধকারে ফিরে আসে। এটি যেন রাজনৈতিক-সামাজিক দুঃস্বপ্নের পর ব্যক্তি মানুষটির নিজস্ব ভাঙা সত্তার গান। এখানে আলো-অন্ধকারের পারস্পরিক নির্ভরতা থেকেই অস্তিত্বের অনির্ণেয়তা তৈরি হয়। কবি একজন লোককে বাঁধ থেকে নেমে আসতে দেখেন সেই অস্পষ্ট রাতে। এই অস্পষ্ট দৃশ্য স্মৃতির ভিতর জমে থাকা ‘অবিনাশ’-এর স্মরণ জাগায়। এই ‘অবিনাশ’ কেবল ব্যক্তি নয়, এ অস্তিত্বের সেই পুরোনো অংশ যার সঙ্গে কবির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আরও subjectively বলতে গেলে বলা যায়, আমাদের প্রত্যেকের অস্তিত্বের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে এক গতিশীল শূন্যতার জন্ম হয়েছে। এই শূন্যতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়সে পরিণত হয়, অর্থাৎ অভিজ্ঞতার ক্ষয়, স্মৃতির পতন, তারপর বৃদ্ধ, ক্লান্ত, বেদনাভারাক্রান্ত নিঃসঙ্গতা। জীবন যেন হয়ে পড়ে জলের ওপর ভাসতে থাকা মৃত পাতা— নিরানন্দ, স্থবির, বিচ্ছিন্ন। ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত জীবন নিজেই বিচ্ছিন্নতার কারাগার হয়ে ওঠে। এখানে তখন অস্তিত্ববাদী এক প্রশ্ন জাগে— “আমার বিচ্ছিন্ন দিনগুলো আসলে কাকে, কোন সত্যকে সংযুক্ত করতে চায়?” উত্তর নেই। এখানে স্বপ্নের ক্ষয় অমোচনীয় নিঃসঙ্গতার মধ্যে সময়ের ক্ষয়ের সঙ্গে মিশে যায়, যা ধীরে ধীরে অস্তিত্বের বিচূর্ণতা তৈরি করে। তখন “ঘন চিবুকের থেকে উঠে আসা বিষাদের সেই হাসি দেখে প্রকৃত হাসির কথা ভুলে যেতে হয়।”

 

 

প্রেমের অনুপস্থিতি:

আরেকটি লেখা আছে ‘মরিয়ম’ বলে। ‘মরিয়ম’ প্রেমের অনুপস্থিতি বা বলা যায় প্রত্যাবর্তনহীন প্রেম ও যুদ্ধজর্জর মানবসত্তার কবিতা। ‘মরিয়ম’ নামের মধ্যেই রয়েছে ধর্মীয় স্মৃতি, মিথিক প্রতীক, নারীত্বের কোমলতা এবং একই সঙ্গে গভীর অনুপস্থিতির আঘাতও। আগের কবিতাগুলোতে যুদ্ধ ছিল দৃশ্যমান, লাশ ছিল শনাক্তহীন, ক্ষয় ও ভঙ্গুরতা ছিল স্পষ্ট এবং অন্ধকার ছিল বাইরে-ভিতরে একাকার। এই কবিতায়, সেই একই পৃথিবীতে ব্যক্তিগত প্রেম, অপেক্ষা ও পৌরাণিক নারীনাম ‘মরিয়ম’ প্রবেশ করে। যার ফলে কবিতা ব্যক্তিগত প্রেম, রাজনৈতিক হাহাকার এবং সেই প্রেমের অনুপস্থিতি, সব একসঙ্গে মিলিয়ে নতুন মাত্রা পায়। প্রথম পংক্তিতেই দেখা যাচ্ছে, যে গোলাপ প্রেমের সার্বজনীন প্রতীক, তা বিপুল আশায় কিনে নিচ্ছে কেউ। আর ঠিক তখনই শোনা যাচ্ছে “সমস্ত চার্চের ঘণ্টা পর পর মন্তাজ হয়ে বেজে চলেছে।” চার্চের ঘণ্টা সাধারণত উৎসব, প্রার্থনা, আনন্দের আহ্বান কিংবা মৃত্যু বা শোক ঘোষণা করে। এখানে ঘণ্টা হয়ে উঠেছে মন্তাজ অর্থাৎ স্মৃতি-ধর্ম-প্রেম-মৃত্যু ও নির্জনতার ভাঙা-জোড়া চিত্র। এই মিশ্র শব্দতরঙ্গ বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে যে, প্রেমকে আর নিছক ব্যক্তিগত প্রেম হিসেবে পাওয়া যাবে না। তার ওপর নেমে এসেছে এক বৃহত্তর ধর্ম-সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতা আর তা হয়ে উঠেছে এক মিশ্র অনুভূতি। সময়ের নৈরাজ্যে যখন ‘অখিল’ মানব নিজের পরিচয় বদলে নিতে বাধ্য হচ্ছে, তখন কবি বুঝে ফেলছেন যে, এই ভ্যালেন্টাইনে মরিয়ম আর কিছুতেই আসছে না। মরিয়মের এই না-আসাই হয়ে উঠছে প্রেমের শূন্যতা ও মানুষের ভেতরে ঘনিয়ে ওঠা অস্তিত্বের শীতলতা। আবার, মরিয়ম যখন ভবিষ্যতে আসবে তখন “পাখিরা থাকবে না।” সেই ভবিষ্যৎ আশার নয়, ভয়ের, যেখানে “এক খুনে নিদ্রাহীনতা সাইরেন হয়ে ছড়িয়ে পড়বে।” সেই ক্লান্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অথবা ভয়-কষ্ট ও প্রেমহীন জীবনধারণের তীব্র চাপ ভোলার জন্য শ্রমিকেরা ঘরে ফিরবে আশ্চর্য পানীয় নিয়ে। এইভাবে কবিতার শেষে এসে পাই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিন্দু। সেগুলি হল ১. শীতলতা যা অস্তিত্বের ঠাণ্ডা বা অনুভূতিহীন অন্ধকারকে নির্দেশ করে, ২. কুয়োতলার দড়ি যা গভীরতার সাক্ষী আর ৩. মরিয়মের স্নান যা শুদ্ধি, পুনর্জন্ম ও প্রেমকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু বক্তা জিজ্ঞেস করেন নি। তিনি জানতেও চান না যে মরিয়ম কার সঙ্গে স্নানে যাবে। কারণ, মানুষের জগতের বাইরে চলে যাওয়া কাউকেই প্রশ্ন করা বৃথা। এইভাবে ‘মরিয়ম’ হয়ে উঠেছে সামগ্রিক নৈরাজ্যের মাঝে মানুষের সবচেয়ে শান্ত কিন্তু গভীরতম ক্ষতের প্রতীক।

 

 

আলোঅন্ধকারের মাঝেও যে অসম্পূর্ণতার রেখা থাকে:

কবি যতই সময়কে প্রত্যক্ষ করার ক্ষমতা রাখুন, যেকোনো শক্তিশালী কবিতারও কিছু অনিবার্য সীমা থাকে। সেরকমই অরূপ গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা, যেখানে নীরবতা, বিপর্যয়, স্মৃতি ও ভাষার ভাঙন এত প্রভাবশালী, তারও নিজস্ব কিছু পারস্পরিক টানাপোড়েন ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অরূপ কিছু কিছু সময় এতটাই ইঙ্গিতনির্ভর হয়ে ওঠেন যে, কখনো কখনো পাঠক কবিতার মূল অর্থরেখা ধরতে গিয়ে অসুবিধায় পড়েন। অরূপ যেসব বিপর্যয়ের কথা বলেন, যেমন দাঙ্গা, রাষ্ট্রীয় হিংসা, অবদমিত মানুষের যন্ত্রণা, সেগুলো গভীর হলেও তিনি প্রায়ই বিশেষ ঘটনাকে নাম দিয়ে স্পষ্ট করে চিহ্নিত করেন না। আবার কখনো কখনো ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে নিছক ব্যক্তি ‘অনুভূতি’। কখনো আবার তা অতিরিক্ত প্রতীকী হয়ে ওঠে এবং ভাব ও ভাষার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে, অর্থাৎ, ভাঙনে যে দৃশ্যপট তৈরি হওয়ার কথা, তা সবসময় তৈরি হয় না। তাঁর অনেক কবিতায় অন্ধকার, মৃত্যু, ক্ষত, ভাঙা মানুষ ও তার বিষণ্ণতা পুনরাবৃত্তির মতো ফিরে আসে। হতে পারে এই পুনরাবৃত্তি কখনো ইচ্ছাকৃত কৌশল, কিন্তু একই সঙ্গে তা বিষয়ের সীমাবদ্ধতাও। ফলে কবিতায় থিমেটিক বৈচিত্র্য কমে যায়, একটি নির্দিষ্ট বেদনার পরিসর বারবার ঘুরে ফিরে আসে, বিস্ময়ের জায়গা যায় কমে, যেখানে প্রসঙ্গ, অনুষঙ্গ, সময়-বৈচিত্র্য বাড়লে কবিতার তীব্রতা আরো বিস্তৃত হতে পারত। অরূপের কবিতায় ‘মানুষ’ প্রায়ই মানুষ হিসেবে নয়, একটি প্রতীক হিসেবে উপস্থিত হয়। তা কখনো মুখহীন জনতা, অচেনা পথিক, মৃতদেহ, রক্তমাখা হাত, কখনো বা শূন্যচোখ শিশুর মুখ রূপে ফুটে ওঠে। এই প্রতীকগুলো শক্তিশালী, কিন্তু ব্যক্তিগত চরিত্রের ভেতরের মনস্তত্ত্ব অনেকসময় অনুপস্থিত বলে মনে হয়। মানুষ কম্পোজিশনের অংশ হয়ে যায়, ব্যক্তি নয়। গোষ্ঠীর বেদনা তো থাকে, তবে ব্যক্তির কণ্ঠস্বর কমে যায়। তাঁর কবিতার আরও একটি ব্যাপার হল প্রতিটি কবিতায় যেন আলো-অন্ধকারের মেটাফিজিক্স রয়েছে। এটি তাঁর এই বইয়ের প্রধান কাব্যভাষাও। তবে কখনো কখনো এটি অনিবার্য বলে মনে হয় না, বরং ‘ফর্মূলা’ হয়ে দাঁড়ায়। ছবির গভীরতা থাকে, কিন্তু শৈল্পিক পুনরাবৃত্তির কারণে নতুনত্ব কমে। অন্ধকার এত ঘন হয়ে ওঠে যে আলো ক্ষীণ হয়ে যায়, ভারসাম্য হারায়। এক অর্থে বলা যায় যেখানে তাঁর কবিতার আলো জন্মায়, ঠিক সেই একই জায়গা থেকে তাঁর অন্ধকারও তৈরি হয়। তবে সবমিলিয়ে অরূপ আমাদেরকে কবিতায় বর্তমানকে ধরার ও ফুটিয়ে তোলার একটি অত্যন্ত শৈল্পিক ও বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে অনেকটা অভিনব মার্গের সন্ধান দেন। তাঁর পরবর্তী বইয়ের দিকে আমার আগ্রহ চির-সজাগ হয়ে থাকবে।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes