রসা হায়নঅসি-র দিনলিপি থেকে <br /> অনুবাদ ও ভূমিকা- গৌতম বসু

রসা হায়নঅসি-র দিনলিপি থেকে
অনুবাদ ও ভূমিকা- গৌতম বসু

[ ইসলামীয় শাস্ত্রের বিশিষ্ট পন্ডিত ডঃ জিউলা জারমরনঅস্ (Gyula Germanus ১৮৮৪ - ১৯৭৯) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অনুরোধে সুদূর হাঙ্গেরী থেকে তিন বছরের অধ্যাপনার কর্মসূচী (১৯২৯ - ১৯৩১) নিয়ে শান্তিনিকেতন-এ এসেছিলেন। বিশ্বভারতী-র আরবী ফারসী ও ইসলামীয় শাস্ত্রচর্চার বিভাগের পত্তন তাঁর অন্যতম প্রধান সুকৃতি। তিনি ও তাঁর স্ত্রী, রসা হায়নঅসি ( Rozsa Hajnoczy ১৮৯২ - ১৯৪২) শান্তিনিকেতন-এর স্বর্ণযুগের দুই প্রত্যক্ষদর্শী। শান্তিনিকেতন-এ বসবাসের সময়ে অধ্যাপক জারমরনঅস্ ভারতের নানা শহর পরিভ্রমণ করেন; ভারত থেকে বিদায় নেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থান ঘুরে তাঁরা যখন স্বদেশে ফেরেন তখন য়ুরোপ ফ্যাশিজমের নাগপাশে আবব্ধ। রসা একজন নিঃসন্তান গৃহিণী, তাঁর স্বামী এক উদারপন্থী ইহুদী, ভিতরে-ভিতরে মুসলমান হয়ে-যাওয়া এক প্রাজ্ঞজন - বিপদ যে এঁদের ঘরে কড়া নাড়বে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। গেস্টাপো বাহিনীর সদস্যরা যে-কোনও সময়ে তাঁদের ধরপাকড়, বন্দী ও হত্যা করতে পারে, এই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে, রসা, ১৯৪২ ও ১৯৪৪-র মধ্যে কোনও এক সময়ে আত্মঘাতী হন। কিন্তু, দশ বছরের পুরানো দিনলিপিটি তাঁর, অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়। মাতৃভাষায় রচিত তাঁর 'Bengali Tuz' ( 'Fire of Bengal' / 'বেঙ্গালী টিউজ' ) প্রকাশিত হয় নাৎসি অধিগ্রহণ চলাকালীন, ১৯৪৪- এ, এবং স্বল্পকালের জন্য বিপুল মরণোত্তর সমাদর লাভ করে। এভা ভিমর ( Eva Wimmer ১৯৩৯-১৯৮৫) নামের একবর্ণ ইংরেজি না-জানা এক কিশোরী ১৯৫৬-তেই সোভিয়েত রাশিয়া কর্তৃক অধিকৃত হাঙ্গেরী থেকে পালিয়ে, উদ্বাস্তু হয়ে ইংল্যান্ডে প্রবেশ করেন। ন্যাতা-বালতি সহযোগে মেঝে পরিষ্কার করা থেকে শুরু করলেও, এভা দ্রুত ইংরেজি ভাষা শিখে নেন, আরও ভাল ক'রে শেখেন সেলাইয়ের কাজ, কয়েক বছরের মধ্যে ছোট্ট একটা দর্জির দোকান খোলেন, এবং ডেভিড গ্রান্ট নামের এক ইংরেজকে বিয়েও করেন। ওদিকে, ততদিনে হাঙ্গেরী-র রাজনৈতিক প্রতিবেশ আবার অনুকূল হয়ে এসেছে, অধ্যাপক জারমরনঅস্ বৃদ্ধ হলেও তখনও জীবিত, ১৯৭২-এ, তাঁর একটি ভূমিকাসহ 'বেঙ্গালী টিউজ'-র আরও একটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়, এবং, সৌভাগ্যের কথা, ততদিনে হাঙ্গেরী-তে এভা-র পারিবারিক যোগসূত্রগুলি আবার স্থাপিত হতে পেরেছে। ১৯৭২- সংস্করণের এক কপি ইংল্যান্ড-এ এভা-দের বাড়িতে ডাকযোগে কেন এসে পৌঁছল, তাঁর কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা মেলা ভার, কারণ এভা এর আগে রসা হায়নঅসি-র নামও শোনেন নি। প্রায় আটশো পাতা দীর্ঘ বইটি এভা-র গার্হস্থ জীবন তোলপাড় ক'রে দেয়। ঘরে শিশুসন্তান, স্বামী সাময়িকভাবে উপার্জনে অক্ষম, আর্থিক সম্বল বলতে কেবল ওই দর্জির দোকান, তবু হার মানেন না তিনি, পুরো আটশো পাতাই মুখে-মুখে অনুবাদ ক'রে তাঁর স্বামীকে শোনান। বইটির একটি ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করার সঙ্কল্প গ্রহণ করেন দু'জনে, কিন্তু বাধার পাহাড় লঙ্ঘন ক'রে প্রথম খসড়া তৈরি হতে-হতে কেটে যায় আরও পাঁচ বছর। ততদিনে এভা-র স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে, এবং, তাঁদের যৌথ পরিশ্রমের ফল দেখে যাবার আগেই, ১৯৮৫-তে, মাত্র ছেচল্লিশ বছর বয়সে, তাঁর মৃত্যু হয়। বেঁচে থাকেন কেবল কবি-স্কুলশিক্ষক ডেভিড গ্রান্ট, এবং বেঁচে থাকে 'Fire of Bengal'-এর পান্ডুলিপি। অবশেষে ডেভিড গ্রান্ট-এর, ও তাঁর অল্পসংখ্যক শুভানুধ্যায়ীর প্রচেষ্টায়, উইলিয়ম রাদিচে-র সম্পাদনায়, ১৯৯৩ সালে ঢাকা থেকে 'Fire of Bengal' প্রকাশিত হয়। খুব সংক্ষেপে, এই হল দুই দম্পতি ও একটি বইয়ের বৃত্তান্ত। আত্মশক্তি কার, মানুষের, না 'নিষ্প্রাণ' গ্রন্থের - এ-প্রশ্নের মীমাংসা কখনও-কখনও, ঝাপসা হয়ে আসে । ] অনুবাদ ও ভূমিকা- গৌতম বসু

শান্তিনিকেতন, এপ্রিল ১৯২৯-র শেষের দিকে

আরও একটা নিদ্রাহীন রাত কাটাবার পর, দুপুর ৩-এ, আমরা ট্রেনে শান্তিনিকেতন রওনা হলাম। মহলানবিশ বললেন, যেতে সময় নেবে চার ঘন্টা। তার মানে, বুদাপেশৎ-এর ব্যারোনেস ই‍ .ডব্লু. ভুল বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ঘন্টা দেড়েক লাগবে।
#
সন্ধে সাতটায় আমরা শান্তিনিকেতন-এর রেল স্টেশন, বোলপুর পৌঁছলাম। দেখলাম দুধ-সাদা ধুতি প’রে দু’জন হিন্দু [য] আমাদের জন্য প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছেন। প্রথমজনের চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু সুপুরুষ, একটু টেনে-টেনে কথা বলেন, ইনি হলেন ট্যাগর-এর পুত্র, রথীন্দ্রনাথ ট্যাগর। অন্যজন, গোলগাল ভদ্রলোকটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। আমরা সকলে একটা গাড়িতে উঠলাম, গাড়িটা একটা ঘিঞ্জি বাজারের ভেতর দিয়ে দ্রুত চলতে লাগল। লক্ষ ক’রে ভাল লাগল যে, বাজারের দিক থেকে ঘিয়ের গন্ধ ভেসে আসছে না, তার পরিবর্তে এক মিষ্টি, মশলাদার, ঝিমুনি-ধরানো বাতাস টের পাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর শান্তিনিকেতন-এ এসে পৌঁছলাম। গাড়ি এসে থামল জানলায় আলো-জ্বলা এক বাড়ির সামনে, দরজার গোড়ায় দু’হাত একসাথে জড়ো ক’রে আমাদের স্বাগত জানালেন এক ব্যক্তি, তাঁর এক গাল কাঁচা-পাকা দাড়ি, পরনে সোনার বোতাম লাগানো সাদা পোশাক। ইনিই এখানকার ওয়ার্ডেন। আমাদের নিয়ে যাওয়া হল সুন্দর আসবাবে সুসজ্জিত বাড়ির ভিতর ; পাঁচটি কামরা, তাদের মধ্যে একটি বাদে, সব ক’টিই বেশ ছোট, আলো বাতাসও কম। আগামী তিন বছরের জন্য এই আমাদের গৃহ।

*

#

( পরের দিন ) লাঞ্চ সারা হয়ে যাবার পর, কবির পুত্র, রথীন্দ্রনাথ ট্যাগর-এর পক্ষ থেকে চায়ের আসরে যোগদানের নিমন্ত্রণ এল। ইংরেজিতে হাতে লেখা আমন্ত্রণপত্র প’ড়ে বোঝা গেল যে, আমার স্বামীর সম্মানার্থে এ-আয়োজন এবং সেখানেই তাঁকে তাঁর নতুন সহকর্মীদের সঙ্গে পরিচয় ক’রে দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানের উপযুক্ত পোশাক প’রে, ওই গরমে যতদূর পেরে ওঠা গেল, আমরা উপস্থিত হলাম ঠিক ছটায়। শ্যামলা গায়ের রঙের বহু ভারতীয়র মাঝে পঁচজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ আর মাত্র একজন শ্বেতাঙ্গ নারী! কনিষ্ঠ ট্যাগর, যিনি রথীবাবু নামেই পরিচিত, শিক্ষকদের সঙ্গে সাড়ম্বরে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন।

#

‘মসিয়ে বেনোয়া, ফরাসী ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক’, প্রথমেই ঘোষণা করলেন তিনি, এবং এক লম্বা সুপুরুষ ব্যক্তির সামনে এসে থামলেন, তাঁর পরনে হিন্দু পোশাক [য], খালি পা। আমি করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করলেন না। তার পরিবর্তে, হিন্দুদের মতো দু’হাত জড়ো ক’রে আমায় অভ্যর্থনা জানিয়েই তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে গিয়ে অন্যদের মধ্যে মিশে গেলেন। আমি খুবই অবাক হলাম। রথীবাবু নম্র হেসে আমায় বোঝালেন, ‘মসিয়ে বেনোয়া দেহে এবং অন্তরাত্মায় হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেছেন, য়ুরোপীয়নদের সঙ্গ উনি এড়িয়ে চলেন।’
#

এর সম্পূর্ণ বিপরীত অভিজ্ঞতা হল ফারসী ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপকের ক্ষেত্রে; রোগাটে, অবিরাম ধূমপানরত রুশ ভদ্রলোকটি হই হই করতে-করতে কার্যত জড়িয়ে ধরলেন আমাদের। তাঁর চশমা-পরা, সাদামাটা-দেখতে স্ত্রীকে আমাদের দিকে ঠেলে দিয়ে, উচ্চস্বরে ব’লে উঠলেন, ‘আপনাদের দু’জনের ঘন-ঘন দেখা হওয়া দরকার !’
#

এগিয়ে-আসা তৃতীয় ব্যক্তি, তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক ডঃ কলিন্স, একজন ইংলিশম্যান; বিড়-বিড় ক’রে সৌজন্য প্রকাশ করলেন। তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে এক ছোটখাট্ট, চটপটে মানুষ, পিয়েট্রো গুয়াদ্গনি, ইতালিয়ান ভাষার অধ্যাপক, ইতালিয়ান টানে অনর্গল নিখুঁত ইংরেজি ব’লে যেতে পারেন, যদিও তাঁর সব ক’টা ‘এইচ’ প’ড়ে যায়। ইনি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন।
#

পঞ্চম শ্বেতাঙ্গ পুরুষটি, ঠিক শিক্ষক সম্প্রদায়ভুক্ত নন, ছাত্র। রোগা, লম্বা, খরগোশের মতো সামনের দাঁত ক’টা বের-করা, চালচলন কেমন কাঠ-কাঠ, বয়স ২১ বছর, আদ্যন্ত জর্মন : ভ্যালেনটিন্ ট্র্যাপ।
#

সুন্দর ‘টোগা’ পরিহিত [য] হিন্দু অধ্যাপকরা [য] এগিয়ে এবার, মাথা হেঁট ক’রে, প্রফুল্ল চিত্তে আমাদের স্বাগত জানালেন। ‘নমস্কার, নমস্কার!’ সমস্বরে ব’লে উঠলেন তাঁরা, তাঁদের শ্যামলা গায়ের রঙের মাঝে তাঁদের সাদা দাঁতের সারি ঝলমল ক’রে উঠল। এঁদের সকলের মধ্যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন, বিধুশেখরবাবুকে আমার সবচেয়ে মনে ধরল। উনি সংস্কৃত ভাষার এক মহাজ্ঞানী পন্ডিত, তাঁর সহকর্মীরা শাস্ত্রী মহাশয় নামে তাঁকে ডাকেন, যার মানে ‘মহৎ আশ্রয়স্থল’। সংস্কৃত ভাষার কোনও বাক্যের মানে বুঝতে না পারলে, এঁর কাছেই আসতে হবে। ইনি গোঁড়া ব্রাহ্মণ, নিজের জাতের প্রত্যেকটি নিয়ম পুঙ্খানুপুঙ্খ মেনে চলেন।
#

তাঁর শরীরের ঊর্ধ্বাঙ্গে জামা নেই, পায়ে কাঠের চপ্পল। কাঁধের এপাশ থেকে ওপাশে সাদা পশমের সুতো প’রে থাকেন, এটি তাঁর দু’বার জন্মগ্রহণ করবার চিহ্ন, বোঝা যায় যে, তিনি একজন ব্রাহ্মণ। চেহারায় তাঁকে সর্বত্যাগী মনে হলেও – দেখতেও তিনি প্রেতের মতো শীর্ণ – স্বভাবটি বেশ হাসিখুসি, প্রত্যেকটি বাক্য শেষ হওয়ার পর, কোনও তাৎপর্য থাক আর না-ই থাক, গলা ফাটিয়ে তিনি হেসে উঠবেনই। সব অধ্যাপকরা কিন্তু মোটেও প্রেতের মত শীর্ণকায় নন, কেউ-কেউ পেটমোটা, স্থূলকায়, থপথপে, মোটা শরীর নিয়ে হাঁসফাঁস করছেন। তাঁদের দেখে আমার কলকাতার বাজারগুলোর নাদুসনুদুস দোকানদারদের কথা মনে প’ড়ে গেল।
#

আমার স্বামী সহজেই তাঁর নতুন সঙ্গীদের মধ্যে মিশে গেলেন, আলাপ-আলোচনায় ম’জে- থাকা তাঁর স্বভাব ; আমার তো মনে হল এরই মধ্যে উনি ভাষণ দিতে শুরু করেছেন। আমি, মিসেস বগদানফ্ -এর সঙ্গে এক নির্জন কোণে গুছিয়ে বসলাম। তাঁকে জানালাম, শান্তিনিকেতন-এরই এক অধ্যাপকের সুন্দরী শ্বেতাঙ্গিনী স্ত্রী, মিসেস রায়-এর সঙ্গে আমরা সমুদ্রপথে ভারতবর্ষে এসেছি । …


****
#
(আমাদের স্টাফ কোয়ার্টারে) ফিরে এলাম। ঘরে ঝাঁকে-ঝাঁকে মশা আর ডাঁশ, মশারির ভিতর অসহ্য গরম। এই জেলখানায় তিন বছর কাটাতে হবে! এ যে যাবজ্জীবন সাজা! অন্ধকারেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম, নাঃ, এখানে থাকা যাবে না। বাঁচব না এখানে। বাড়ি ফিরতেই হবে।
#

এক মিনিট পর জিউলা ব’লে উঠল, ‘ঠিক বলেছো। চলো বাড়ি ফিরে যাই!’
#

‘থার্ড ক্লাসে চড়ব, ডেক-এ শুয়ে থাকব – তবু বাড়ি, বাড়ি আমরা ফিরবই !’, আর্তনাদ ক’রে উঠলাম আমি। তারপর শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
#

রাত্রি যত গড়াচ্ছে পোকামাকড় থিতিয়ে আসছে। ভোর হল। আলোর প্রথম রশ্মি ঘরে এসে পড়েছে; জানলা দিয়ে, খোলা দরজা দিয়ে, শীতল বাতাস বয়ে আসছে। হামাগুড়ি দিয়ে মশারির বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাথরুমে গিয়ে মাথায় জল ঢাললাম, ঢেলেই চললাম। সকালের এই চান আমার কাছে ছিল এক বিলাসিতা।
#

বেশ কিছুক্ষণ আগেই ঠাকুরচাকরদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছিল। রাঁধুনি আর তার দুই সহকারী এই গ্রামেই, ভুবনডাঙায়, থাকে। বাথরুমের দায়িত্বে আছে রসিক, সে আসে অন্য এক গ্রাম থেকে। এই গ্রামগুলি শান্তিনিকেতন থেকে আধঘন্টার হাঁটা পথ। এরা সকলে ধীরে-সুস্থে হেঁটেই আসে, খুব সকালে হাজির না-হওয়ার ব্যাপারে এরা যথেষ্ট সচেতন। সুদীন, আমাদের রাঁধুনি, এর আগেও য়ুরোপীয়ন অধ্যাপকদের বাড়িতে রান্নার কাজ করেছে, বেশ কয়েকটি বিলিতি পদ রান্নার প্রণালী তার জানা আছে। তার জামাইটি, গণপতি, স্বভাবিক নিয়মেই একই জাতের সদস্য, অতিআনাড়ি এক তরুণ। তার শ্বশুর তাকে সদাসর্বদা চোখে-চোখে রাখে। ভিস্তি এবং মালী, অমূল্য-র আকৃতি বন্য, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, তার সঙ্গে অন্যদের চেহারার কোনও মিলই নেই। সে আসে অন্য এক গ্রাম থেকে, এবং আমার মনে হয়, সে ভিন্ন প্রজাতিরও। গায়ের রঙ তার ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, কিন্তু কোমর ছিপছিপে, পা সরু; শরীরের সমানুপাতিক গঠন বহু য়ুরোপীয়নকে ঈর্ষাণ্বিত করতে পারে।
#

প্রাতরাশের পর আমরা হাঁটতে বেরলাম। সূর্য অনেকটা ওপরে উঠে গেলেও, ঘড়িতে মাত্র ৫ টা এবং বাতাস এখনও শীতল। এই সময়ে হাঁটতে বেরনো খুবই মনোরম অভিজ্ঞতা।
#

এতদিনে ( এই প্রথম ) নিজেরাই নিজের মতো ক’রে শান্তিনিকেতন ঘুরে দেখার সুযোগ পেলাম। আমাদের কোয়ার্টারের পেছনে ঘন ঝোপঝাড় থাকায় উত্তর দিকটা দেখা যায় না। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে, ঝোপঝাড় ভেদ ক’রে আমরা একটা সরু পায়ে-চলা পথ ধরলাম, সেখান থেকে উঠে এলাম বড় রাস্তায়, এটাই আবার চ’লে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড়-বড় বাড়িগুলোর দিকে। মাত্র কয়েক মিনিট হাঁটতেই একটা ফাঁকা চৌহদ্দিতে এক অট্টালিকার সামনে আমরা এসে পড়লাম, দরদালান, লম্বা-লম্বা থামের সারিসহ বাড়িটা বেশ কয়েক তলা উঁচু, দুর্গের প্রাকারের মতো বারান্দায় ঘেরা; চ্যাপ্টা ছাদ, প্রবেশ করার জন্য কয়েক ধাপ নিচু সিঁড়ি পেরোলেই একটি চাতালে উঠে আসা যায়। বাড়িটার সামনে এবং পিছনে বিরাট-বিরাট শালগাছ, ভোরের আলোয় ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছের নিচে মাটিতে ব’সে ভারতীয় ছাত্ররা লেখাপড়া করছে। আমাদের দেখেই তারা সকলে লাফিয়ে উঠে আমাদের অভিবাদন জানাল। দরদালানের দিকে এগোতে আমরা টের পেলাম তাদের কৌতূহলী দৃষ্টি আমাদের অনুসরণ করছে। আমাদের দেশে একজন নিগ্রো যেমন, ঠিক তেমনই, ভারতবর্ষে একজন শ্বেতাঙ্গ সকলের নজর কেড়ে নেয়। একটা সাঁওতাল গ্রাম দেখতে যাওয়ার সময়, এটা আমরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছি। গ্রামে আমাদের প্রবেশ করতে দেখেই কুকুরের ডাক আর বাচ্চাদের কান্না শুরু হয়ে গেল। একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষকে ভারতবর্ষে খুব খাতির করা হয়, কারণ সে শক্তিমান এবং হয়তো উন্নততর স্তরেরও। এই সম্মানপ্রদর্শন, যা প্রতি পদক্ষেপেই আমরা অনুভব করি, আমাদের মধ্যে ঔদ্ধত্য ও দম্ভ জাগিয়ে তুলতে পারে, মনে হতে পারে, হয়তো আমরা সত্যিই অন্যরকম। বাড়ির দেউড়ি ধ’রে হাঁটতেই আমরা এখানকার গ্রন্থাগারে এসে পড়লাম, ঘরটি গোলাকার, দেয়ালে বইয়ের তাক পর-পর সাজানো রয়েছে। এক হিন্দু ভদ্রলোক বিশালাকার একটা টেবিলে ব’সে রয়েছেন, তাঁকে কেমন চেনা-চেনা লাগল। স্বাগত জানিয়ে তিনি আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
#

‘এত সকাল-সকাল উঠে পড়েন যে!’ বিস্ময় প্রকাশ করলেন ভদ্রলোক।
#

‘একই প্রশ্ন তো আমি আপনাকেও করতে পারি’, প্রত্যুত্তরে বললেন আমার স্বামী। প্রশংসা সূচক বাক্যটি নম্রতার সঙ্গে এড়িয়ে গেলেন হিন্দু ভদ্রলোক। ‘আমরা হিন্দুরা চটপট শুতে যাই, ভোর-ভোর উঠি। ভোরবেলার ওই কয়েক ঘন্টা সময় পড়াশোনার পক্ষে খুবই উপযোগী। দুপুরবেলাটা আমরা ঘুমিয়ে কাটাই, কারণ সূর্যের তাপ আমাদের রক্ত সঞ্চালনও তপ্ত ক’রে তোলে, শিথিল করে আমাদের মস্তিষ্কের ক্রিয়া। ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য ঘুম এর একমাত্র প্রতিকার’, মুচকি হেসে তিনি জানালেন।
#

হাসির সময়ে তাঁর বত্রিশটি নিঁখুত আকারের দাঁতের সারি দু’টি ঝলমল ক’রে উঠল, ঠিক দাঁতের মাজনের সাজানো বিজ্ঞাপনের মতো। এইরকম স্বাস্থ্যকর, সুগঠিত, মুক্তোর মতো দাঁতের পাটি য়ুরোপীয়নদের মধ্যে বিরল। সব দিক থেকেই এই মানুষটি অসামান্য রূপবান। তাঁর গায়ের রঙ চাপা, অনেকটা ঈষৎ কৃষ্ণবর্ণ ক্রীয়োলদের মতো, মাথার ঢেউ খেলানো চুল দেখলে ছোটবেলায় পড়া ভূগোলের বইতে দেখা ককেশিয়ান প্রজাতির মুখাবয়বের দৃষ্টান্তের কথা মনে পড়ে যায়। এখানকার গ্রন্থাগারিক, এই বিশিষ্ট মানুষটির নাম মুখার্জি, কিন্তু সকলেই এঁকে প্রভাতবাবু নামে এক ডাকে চেনে। রথীবাবু ( আমার স্বামীর সম্মানার্থে ) যে অভ্যর্থনা-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, সেইখানে তাঁর সঙ্গে আমাদের আগেই পরিচয় হয়েছিল। এখন, নিজের এলাকায় তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন, তিনিই কর্তা। বাড়ির বাইরের সিঁড়ি বেয়ে প্রথমেই তিনি আমাদের ছাদে নিয়ে এলেন। গ্রন্থাগার ঘিরে রয়েছে কয়েকটি উঁচু তালগাছ, তারা উঠে গেছে আকাশ পানে, তাদের বিরাট পাতাদের ছায়া আমাদের ওপরে খেলে বেড়াচ্ছে। এখান থেকে পুরো ক্যাম্পাসের গঠন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে – গাছগাছালি, ঝোপঝাড়ে ঘেরা বিভিন্ন আকারের প্রায় একশো খানা বাড়ি।
#

‘চূড়াসহ ওই যে গম্বুজাকৃতি বাড়িটা দেখছেন’, মুখার্জি আমাদের চেনালেন, ‘ওটা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস। প্রায় ১৫০ জন ছাত্র থাকে ওখানে, প্রত্যেক ডর্মিটরিতে ( শয়নাগার ) ৮ থেকে ১০ জন ক’রে। বেশির ভাগ ছাত্রই খাটবিছানায় শোয়, তবু অনেকেই আছে যারা ছোটবেলা থেকে কেবল মাথার বালিশ পেতে মাটিতে শুতে অভ্যস্ত। মৃত্তিকা, মাতৃভূমি ভারত, তিনিই তো কোমলতম কোল; যেহেতু মাটি থেকে আমরা পুষ্টি গ্রহণ করি, আমাদের আত্মাও যেন মাটি ছুঁয়ে থাকে। তারার মতো দেখতে ওই যে বাড়িটা দেখছেন, ওটা সঙ্গীতভবন। লক্ষ করুন, ওর চারপাশে কোনও গাছ নেই। এর কারণ, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবির এক ভাগ্নে, যিনি সঙ্গীতভবনের অধ্যক্ষ, গভীর ভাবে বিশ্বাস করেন যে, মানুষের অন্তর থেকে উদ্গত ধ্বনি, কোনও রকম বাধা বিপত্তি ছাড়াই, সোজা আকাশে উঠে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ মুক্ত অবস্থায় থাকা উচিত।’
#

এবার তিনি আমাদের ছাদের পুবদিকে নিয়ে এলেন। ‘ ওদিকটায় কয়েক ঘর অধ্যাপক থাকেন, সংলগ্ন বাগানও আছে, যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় আনাজের চাষ হয়, আরও একটু এগোলেই ( ছোটদের ) স্কুল। ওই বড় বাড়িটা ( স্কুলের ) ছাত্রাবাস। গাঙ্গুলি, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, ওখানেই থাকেন। বিয়ে-থা করেন নি, তাই তাঁর বাগানেরও কোনও প্রয়োজন নেই। ছাত্রদের মাঝেই থাকতে তিনি পছন্দ করেন। জাগতিক সুযোগসুবিধের দিকে তাঁর কোনও খেয়ালই নেই। এক কালে ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু ইংল্যান্ডে বসবাসের সময়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ওইজন্য আমরা তাঁকে হাইস্কুলের দায়িত্বভার দিয়েছি।’

#

আমার স্বামী আর আমি পরস্পরের দিকে সবিস্ময়ে তাকালাম। ওঁর যুক্তি আমাদের কাছে মোটেই স্পষ্ট হল না; এই ভারতবর্ষে, যেখানে এত জাতপাতে ও ধর্মবিশ্বাসে দেশের জনসংখ্যা বিভক্ত, যেখানে হিন্দু ও মুসলিম পরস্পরকে পথেঘাটে আক্রমণ করে, এবং যেখানে, এই শান্তিনিকেতন-এ, দেশের বর্ণভেদ প্রথা ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে ব্রাহ্মসমাজ সংগ্রামরত, সেইখানে তাঁরাই তাঁদের আগামী প্রজন্মের প্রশিক্ষণ ব্রাহ্মণ্যধর্ম থেকে খ্রিস্টধর্মে রূপান্তরিত এক ব্যক্তির হাতে তুলে দিয়েছে।
#

আমাদের বিস্মিত দৃষ্টি থেকে আমাদের প্রশ্নও পাঠ ক’রে নিলেন তিনি, ব’লে চললেন ‘ গাঙ্গুলি নিজের মধ্যে হিন্দুধর্ম ও খ্রিস্টধর্মের উন্নত আদর্শের একটা সমণ্বয় গ’ড়ে তুলেছেন। তাঁর ছাত্ররা, যারা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবলম্বী পরিবার থেকে আসছে, য়ুরোপের মহৎ খ্রিস্টধর্ম বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ পাবে। তিনি কোনও মামুলি ধর্মতত্ত্ববিদ নন, তিনি এক ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান। আমাদের ছাত্রদের সঠিক ধর্মশিক্ষার জন্য তাঁর চেয়েও যোগ্য ব্যক্তি আমরা খুঁজে পেতাম না।’
#

কে কোথায় থাকেন, কোন বিভাগের কী লক্ষ্য, প্রভাতবাবু আমাদের সমস্তই ধৈর্য সহকারে বুঝিয়ে চললেন। বিরাট ক্যাম্পাসের পুরোটা আমরা স্মৃতিতে ধ’রে রাখতে পারলাম না, অনেক শিক্ষকের নামও বিস্মৃত হলাম। তাঁদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্ম, জৈন ও খ্রিস্টান, সব সম্প্রদায়ের মানুষই আছেন; কেউ নিজের ধর্মসম্প্রদায়ের বিধান কঠোরভাবে পালন ক’রে থাকেন, কেউ আবার মুক্ত আদর্শবাদে আস্থাবান, কিন্তু, তাঁরা প্রত্যেকেই একে অপরকে বোঝার ও সহায়তা করার প্রেমবন্ধনে সংযুক্ত। ছাদের সামনে বিরাট তালগাছগুলো যেন ফিস ফিস ক’রে বলছে, ‘শুষ্ক, দয়াহীন মাতা মৃত্তিকা, যার কাছে আমাদের শিকড় আশ্রয় চায়, হিংস্র সূর্য, যে আমাদের দেহ ঝলসায়, ( জেনো ), আমরা তবু আকাশের দিকে ঊর্ধ্বগামী, নিবেদন করি ফলের সম্ভার…’
#

প্রভাতবাবু এবার আমাদের গবেষণাকেন্দ্রের দিকে নিয়ে চললেন। পন্ডিতরা এখানে যে-যার নিজের কাজে মগ্ন, গ্রন্থাগারের আকর থেকে নিজের প্রয়োজনীয় সারবস্তু আহরণ ক’রে নিচ্ছেন। সরু গলিপথের দু’ধারে বইয়ের অন্তহীন সারি। হাজার হাজার বই, যেখানে ভারতবর্ষের অপার্থিব রত্নভান্ডার গচ্ছিত রয়েছে। আমি লক্ষ করছিলাম বইগুলো তাক থেকে তুলে নিয়ে আঁকড়ে ধরবার জন্য, তাদের পাতায় ডুবে যাবার জন্য, আমার স্বামী ছটফট করছেন। ওঁর কাছে এ যে মর্তলোকে স্বর্গসুখ লাভের সমান। কি বাঙ্ময় এই নীরবতা! অতীত নিদ্রোত্থিত, ভবিষ্যৎ প্রস্ফুটিত। বড় হলঘরে দেখলাম, ছোট-ছোট খুপরির মধ্যে ব’সে, পন্ডিতেরা ঘাড় গুঁজে লেখাপড়া ক’রে চলেছেন। লম্বা বিনুনি-বাঁধা এক চীনা পন্ডিত ফিনফিনে তালপাতার একটা পুঁথি পরীক্ষা করছেন। আরেক খুপরির মধ্যে ব’সে আছেন এক তিব্বতী, তিনি পাঠ করছেন সংস্কৃত ভাষায় রচিত একটি গ্রন্থ। আরও একটু দূরে, একটা নিচু পাটাতনের ওপর, একদিকে অজস্র পান্ডুলিপির স্তূপ, আর অন্য দিকে বইয়ের পাহাড়, তারই মধ্যে শাস্ত্রী মহাশয়কে আমরা আবিষ্কার করলাম। রঙ শ্যামলা, তাঁর গায়ে কোনও জামা নেই, রোগা শরীরটা বেঁকে, নিজের কাজের ওপর এমনভাবে ঝুঁকে রয়েছে যে তাঁর পাঁজরার প্রতিটি হাড় গোনা যাচ্ছে। আমাদের আওয়াজ পেয়ে তিনি লাফিয়ে উঠলেন, সারা মুখে ভালবাসার উদ্ভাস, আমাদের দেখে তিনি যে কতটা উৎফুল্ল তা প্রকাশ করবার জন্য দু’হাত জড়ো ক’রে নমস্কার জানালেন এবং, তাঁর স্বভাবমত উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। পাশে বসিয়ে কত সান্ত্বনা তিনি দিতে থাকলেন আমায়, এই নিদারুণ গ্রীষ্মকালের জন্য, মশার উপদ্রবের জন্য, প্রতিবেশের এই নিরাভরণতার জন্য।
#

‘দুশ্চিন্তা ক’রো না, মেমসাহেব’, কোমলস্বরে তিনি বললেন, ‘দেখো, ভারতকে তুমি ভালবাসতে পারবে। বাইরের অমসৃণ আবরণটা অবজ্ঞা ক’রে, আমাদের অন্তরের সূক্ষ্মতা তোমায় খুঁজে নিতে হবে। যাও, পাহাড় দেখে এসো – হিমালয়। অধ্যাপক মশাইয়ের আপাতত এখানে কোনও কাজ নেই। পড়ানোর কাজ এখনই শুরু হচ্ছে না। হাতে এখন প্রচুর সময়। তিন বছর প্রচুর সময়। জোর জবরদস্তি ক’রো না মোটে। সহজ হও। তোমার জীবনটি আমাদের মধ্যে স্বচ্ছন্দে গুছিয়ে নাও।’
#

সত্যি, তিন বছর দীর্ঘ সময়ই বটে, আমি ভাবলাম। আমরা কি পারব? এই তো গত রাত্রেই আমার স্বামী আর আমি বাড়ি ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম, বললাম, বাড়ি ফিরব, তা সে যে ভাবেই হোক।
#

এতক্ষণ, আমার স্বামী তাকগুলোর সামনে একটা টুলে ব’সে অধৈর্যসহকারে বই খোঁজাখুঁজি করছিলেন। বই পড়াই তাঁর নেশা, বই তাঁকে চুম্বকের মতো টানে। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, বাড়ি ফেরা আমাদের আয হবে না। অভয় ও সহায়তার সন্ধানে আমি শাস্ত্রীর শান্ত, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দু’টির পানে তাকিয়ে রইলাম। তাঁর চোখ দু’টি চেয়ে রয়েছে ভিতরের পানে, তাঁর আত্মা যেখানে প্রতিবিম্বিত। এই শুষ্কতা, এই অনুর্বর প্রান্তর, গোচরে আসে না, মশারা মার্জনা লাভ করে, এই ভয়ানক দাবদাহ, এই একাকিত্ব তাদের স্পর্শ করতে পারে না। সময়জ্ঞান নেই এই দুই চোখের, কারণ তারা এক কালাতীত, চিরায়ত, মহৎ আত্মার প্রেক্ষিত থেকে বাস্তব জগতকে পরিমাপ ক’রে চলেছে।
****
#

এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার জেরে জীবনের শান্ত গতি হঠাৎ অবিন্যস্ত হয়ে গেল। কবি রবীন্দ্রনাথ ট্যাগর সংক্রান্ত এক অপ্রীতিকর সংবাদ আমাদের এখানে পৌঁছল। ক্যানাডা থেকে ইউ.এস.এ প্রবেশ করার সময়ে, দুই দেশের সীমান্তে আমেরিকার সরকারী কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত অশালীন আচরণ করেছেন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে রাখার পর, সাধারণ অশ্বেতাঙ্গ প্রবেশকারীদের যেভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাঁকেও ওইভাবে উত্যক্ত হতে হয়েছে। অভিবাসন (immigration) দপ্তরের একজন আধিকারিক তাঁর হাতে প্রশ্নাবলীর এক ফর্ম তুলে দেন, যা একজন নোবেলসম্মানজয়ী লেখকের পক্ষে, যিনি বিভিন্ন মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ভাষণ দিতে আসছেন, খুবই অসম্মানজনক। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, ‘আপনি কি লিখতে পড়তে পারেন?’ আত্মসম্মানবোধের ওপর এই আঘাত ট্যাগর সহ্য করেন নি, সমস্ত অনুষ্ঠানসূচী বাতিল ক’রেছেন, সে-দেশে প্রবেশই করেন নি।
#

শাস্ত্রী মহাশয়ের কাঠের চপ্পলের খটাখট ধ্বনি দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল। তাড়াহুড়োর মধ্যে তাঁর চপ্পলটাই যাতে খুলে না যায়, সেইজন্য চপ্পলের মাঝের খুঁটিখানা পায়ের (দুই) আঙুল দিয়ে শক্ত ক’রে চেপে ধ’রে, তিনি দ্রুত এদিকে আসছিলেন।
#

‘বিরাট মিটিং হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে!’, উত্তেজিত কন্ঠে তিনি আমাদের জানালেন, ‘যাতে কবিকে এইভাবে আঘাত করার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ ধ্বনাত হয়। আপনারাও আসুন দু’জনে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের, জাতির ও ধর্মের মানুষ, শান্তির এই নিকেতনে কতদূর সুসংবদ্ধ, তা বিশ্ববাসীকে জানানো দরকার এবং এইজন্যই প্রতিটি শ্বেতাঙ্গ শিক্ষকের সেখানে উপস্থিত থাকা আবশ্যক। আমাদের একতা দিয়ে মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি আমরা সকলের সামনে তুলে ধরব।’
#

মিটিং অনুষ্ঠিত হল পাঠাগারের ছাদে। হিন্দু ছাত্ররা নিঃশব্দে এসে সারিবদ্ধ হয়ে মাথা নত ক’রে মাটিতে বসল, তারপর মেয়েরা, তারা আরও বিষণ্ণ। য়ুরোপীয়ন অধ্যাপকরা ঘটনাটির নিন্দা করতে -করতে অধীর হয়ে পায়চারি করতে লাগলেন। তাঁদের মেজাজ বেশ আক্রমণাত্মক। বোতাম প্রস্তুতকারক আর হ্যাটবিক্রেতারা যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা ক’রে থাকেন, সংস্কৃতি যেখানে অবদমিত, সেই অসভ্য ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’-এর বিরুদ্ধে, গুয়াদ্গনি, তাঁর ইতালীয় আবেগের দ্বারা তাড়িত হয়ে, যুদ্ধ ঘোষণার প্রস্তাব রাখলেন। এই জঙ্গী মনোভাব হিন্দু অধ্যাপকদের মধ্যেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। ইতিহাসের অধ্যাপক নেপাল বাবুর কন্ঠস্বর উত্তেজনায় কাঁপছিল, তিনি মার্কিন ইতিহাস থেকে আতঙ্কজনক সব ঘটনার বিবরণ দিতে লাগলেন, আফ্রিকানদের কিভাবে চুরি ক’রে আনা হত, ক্ষেতমালিকরা কিভাবে নিগ্রো মেয়েদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করত, এবং সন্তান এসে গেলে কিভাবে পাশের ক্ষেতমালিকের বাচ্চার সঙ্গে বদলে নিত, যাতে পেটাতে-পেটাতে বাচ্চা মেরে ফেললে অন্তত নিজের হাতে নিজের বাচ্চাকে হত্যা করার পাপ স্পর্শ না করে। ভারতের ভূগোলের অধ্যাপক ঘোষ অ্যামেরিকানদের বস্তুবাদী, ধনতন্ত্রপন্থী প্রভৃতি নানা নিন্দাসূচক মন্তব্য করলেন, বললেন তারা চেহারা দেখে মানুষ বিচার করে, গায়ের রঙ দিয়ে মানুষ শ্রেণী-বিভাজিত করে, অথচ মানুষের মধ্যে যা-কিছু চিরায়ত তা তার অন্তরাত্মা দিয়েই বিচার্য, বাইরেয আকার -আকৃতি- বর্ণ দিয়ে নয়। গুয়াদ্গনি এবং আমার স্বামী উচ্চস্বরে তাঁকে সমর্থন করলেন। এই দু’জনেই ছিলেন সবচেয়ে সরব এবং এঁরাই বাকি য়ুরোপীয়নদের সম্মতি আদায় ক’রে নিলেন। এমন কি বৃদ্ধ কলিনস্-ও করতালি দিতে দিতে মাথা নাড়িয়ে তাঁর সমর্থন জানাচ্ছিলেন।
#

ক্ষিতিমোহন সেন একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন : ‘ নৈতিকতা ও ধৈর্যরক্ষা হল নিপীড়িত মানুষের একমাত্র অস্ত্র। আমাদের আত্মত্যাগ সারা জগতের যাতনাভোগ প্রশমিত করার শক্তি ধরে। কষ্ট স্বীকারের সময়ে আমাদের, হিন্দুদের, কেবল মনোবলের পরিচয় দিয়েই ক্ষান্ত থাকলে চলবে না, তাতে বিশ্বাস রাখতে হবে। মানবজাতির ত্রাণ যেমন যীশু খ্রিস্ট-এর কষ্টস্বীকারের লক্ষ, ঠিক তেমন মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন আমাদের (জাতির) মুক্তিলাভের পথ।’
#

গান্ধীর নাম উচ্চারিত হওয়া মাত্র ছেলেরা মাথা নিচু ক’রে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করল, মেয়েদের প্রতিক্রিয়া আরও নম্র। লক্ষে উপনীত হওয়ার জন্য, নিজেদের জাতির স্বীকৃতিলাভের জন্য, তারা আত্মাহুতির জন্যও প্রস্তুত। এরপর, কয়েক মুহূর্তের শ্রদ্ধামগ্ন নীরবতা। সেটি ভাঙল একজনের কন্ঠস্বর; তাঁরা সমবেত কন্ঠে ‘বন্দেমাতরম’ গাইতে লাগলেন। শান্তভাবে, এক সুসম মধুরতায় জেগে উঠল সে-মন্ত্রধ্বনি, গানের চেয়েও অনেক বেশি কান্নার সুরে। সমস্ত যন্ত্রণা সঙ্গে নিয়েই, কিন্তু দৃপ্ত ভঙ্গিমায়, গৌরববোধের সঙ্গে, কোনও ভূগর্ভ থেকে যেন, সে-সুর উঠে আসছে। এই গানের মাঝে আমি ভারতবর্ষের প্রকৃত মহত্ত্ব অনুভব করলাম।
****

জুলাই (১৯২৯)-এর মাঝামাঝি
#

তুমুল ব্যস্ততাসহ ট্যাগর-এর আগমনের প্রতীক্ষা করছিল শান্তিনিকেতন। ছাত্ররা অট্টালিকাটি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করছিল, শিক্ষক ও ছাত্রদের আরও একটি দল ছোট-ছোট জাতীয় পতাকা নাড়তে-নাড়তে মিছিল ক’রে স্টেশনের দিকে রওনা হয়ে গেল। ভারতের নতুন জাতীয় পতাকার রঙ অবিকল আমাদের মতো – সাদা, সবুজ আর লাল [ য]। কেন্দ্র একটি চরকা শোভা পাচ্ছে, ভারতের স্বাধীনতা কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে একদিন অর্জিত হবে, এটা তারই প্রতীক। স্টেশনের পথে ছাত্ররা সমবেত কন্ঠে একটি গান ধরল, সুরটি কেমন যেন বিষণ্ণ। গানটি ট্যাগর-এরই রচনা : শান্তিনিকেতন-এর আশ্রম সঙ্গীত। কথাগুলো আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না; সুরটি, মন একেবারে কেড়ে নিল, গানের ধুয়োটি, বিশেষ ক’রে, খুবই মধুর। একটা দীর্ঘ সুরক্ষেপণ দিয়ে সেটি শেষ হচ্ছিল – শা-ন্তি-নি-কে-ত-ন।
#

য়ুরোপীয়ন শিক্ষকদের প্রতিনিধি হিসেবে কলিন্স ওদের সঙ্গে গেলেন। অট্টালিকার চাতালে দাঁড়িয়ে আমরা কবির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। মাথার ওপর ঘন, কালো, বিশাল মেঘ জমছে, ঝড়বৃষ্টি হবে। সবেগে হাওয়া বইতে লাগল, গাছের মাথাগুলো উন্মত্তের মতো দুলতে লাগল; ঠিক তখনই, যখন দূরে কবির গাড়ি আমরা দেখতে পেলাম, প্রচন্ড শব্দে, মাটি কাঁপিয়ে বাজ পড়ল। এমনই ছিল কবি রবীন্দ্রনাথ ট্যাগর-এর স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন।
#

গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন এক অনিন্দ্যসুন্দর পুরুষ, এক মাথা পাকা চুল, এক মুখ দাড়ি। তাঁর লম্বা, সামনে ঈষৎ ঝুঁকে-পড়ে শরীর আলখাল্লায় আবৃত, পাকাচুলের সুদীর্ঘ ঢলের ওপর গাড় লাল রঙের ( crimson) টুপি। আমরা দু’হাত সামনে জড়ো ক’রে নমস্কার জানালাম, কারণ আমাদের সম্মুখে প্রাচ্যের এক মহাজ্ঞানী, এক পয়গম্বর দন্ডায়মান। ভৃত্যেরা এগিয়ে গেল প্রথমে, প্রভুকে যেভাবে সম্মান জানায়, সেইভাবে মাটিতে ঝুঁকে পড়ল। সুমিষ্ট হাসি হাসতে-হাসতে তিনি আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন, দু’চোখে স্নেহশীল দৃষ্টি। আমরা আমাদের পরিচয় দিলাম। সরু, প্রায় মেয়েলী কন্ঠে, কয়েকটি সৌজন্যমূলক বাক্যে তিনি আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানালেন।
#

‘আমার অনুপস্থিতিতে, মেমসাহেব, আশা করি আপনাদের কোনও অসুবিধা হয় নি। যতদিন আপনারা ভারতে বসবাস করবেন ততদিন আমার গৃহে আপনারা অতিথিরূপে স্বাগত। হাঙ্গেরি-কে আমি আমার প্রীতি ও কৃতজ্ঞতা জানাই – ( স্মরণ করি) অপূর্ব সুন্দর বালাতোন হ্রদ যেখানে ঈশ্বর আমায় সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আপনাদের দেশবাসীদের আমার শুভাশীর্বাদ (জানাই)।’
#

শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পদক্ষেপে তিনি অন্যদের সঙ্গে অট্টালিকার দিকে এগিয়ে গেলেন, কিন্তু তাঁর চেহারায়, চলাফেরায়, মুখাবয়বের রূপে এমন কিছু ছিল, যা অন্য সকলকে ছাড়িয়ে যায়। এক বালিকা এগিয়ে গিয়ে তাঁকে মালা পরিয়ে দিল।
#

সুদীর্ঘ যাত্রার শেষেও কবির কোনও ক্লান্তি ছিল না। পাঁচটি মহাদেশ থেকে তাঁর প্রতিভার ওপর যে নানাবিধ সম্মান বর্ষিত হয়েছিল, তা তাঁকে আরও উজ্জীবিত ক’রে তুলেছিল। মাত্র কয়েক ঘন্টা বিশ্রামের পর, তিনি তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে মিলিত হতে প্রস্তুত, ওইদিনই আমরা নৈশাহারের নিমন্ত্রণ পেলাম। অট্টালিকার ডাইনিং হলে য়ুরোপীয় রীতি অনুসারে লম্বা টেবিল পাতা হল। সব প্লেট, গ্লাস, কাঁটাচামচ আর ন্যাপকিন সঠিক জায়গা মতো না-রাখা পর্যন্ত প্রধান খানসামা কতবার যে তাঁর সহকারীদের বকাবকি করলেন তার হিসেব কল্পনা ক’রে নিতে হয়।
#

নৈশাহার-পর্ব শুরু হওয়ার আগে, কবি, হলঘরে আমন্ত্রিতদের স্বাগত জানালেন, তাঁর পরনে অন্য একটি আলখাল্লা, মাথায় ভেলভেটের উঁচু টুপি। খালি পা, একটি নিচু বেঞ্চিতে তিনি উপবিষ্ট। হিন্দু শিক্ষকরা [ য ] একে-একে এগিয়ে এসে পা ছুঁয়ে তাঁকে প্রণাম করলেন ( রজা হাইনঅসি-র ভাষ্যে প্রণাম করার বিবরণটিতে খ্রিস্টীয় অনুসঙ্গ লুকিয়ে রয়েছে কি না তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও, তা প্রথমে কৌতুকেরই উদ্রেক করে; পরে মনে হয়, এ-আচার তাঁর অভ্যাসের অন্তগর্ত ছিল না ব’লেই তিনি ধরতে পেরেছিলেন যে গুরুজনের পদস্পর্শ করার মধ্যে পদসেবার, পা মুছিয়ে দেবার সঙ্কেতও যেন কোথাও রয়ে গেছে; তাঁর বিবরণের ইংরেজি অনুবাদ এইরকম : ‘each of them dusted the Poet’s feet and touched their foreheads in respect’) । আমাকেও তাঁদের অনুসরণ করতে হবে কি না, বুঝতে না পেরে, উদ্বিগ্ন হয়ে ফিসফিস ক’রে শাস্ত্রী মহাশয়কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। দার্জিলিং থেকে বেড়িয়ে আসার পর তাঁর এই বদভ্যাসের কথা ভুলেই গেছিলাম। হাসি শুনে ট্যাগর এক নিমেষের জন্য আমাদের দিকে তাকালেন, এবং আমায় দেখতে পেয়ে বেঞ্চি থেকে উঠে পড়লেন, দু’হাত জড়ো ক’রে আমায় নমস্কার জানালেন, আমিও বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেয়ে গেলাম। তাঁর অট্টহাস্যের জন্য শাস্ত্রী-কে আমার অনুচ্চারিত কৃতজ্ঞতা জানালাম। ‘মহৎ আশ্রয়স্থল’ আমায় গোলযোগের হাত থেকে নিস্তার পাইয়ে দিয়েছেন, এটা তার একমাত্র দৃষ্টান্ত নয়।
#

‘মেমসাহেব আমার মা’, বলে চললেন তিনি, ‘হ্যাঁ, এতটাই আপন, আমার মা।’

হিন্দু মাত্রই তাঁর মা’কে অগাধ শ্রদ্ধা ক’রে থাকে, হিন্দুদের মধ্যে কোনও নারীকে ‘মা’ ব’লে সম্বোধন করার অর্থ তাকে সর্বোচ্চ সম্মানজ্ঞাপন করা। য়ুরোপ-এ, পঞ্চাশ বছর বয়স্ক কোনও ব্যক্তির মায়ের পরিচয় বইতে হলে, কি রাগই না হত আমার!
#

‘গুরুদেবও ক্রমে আমার মা’কে ভীষণ ভালবাসতে পারবেন’, হাস্য সহকারে তিনি ব’লে চললেন।
#

গুরুদেব – ‘দিব্য প্রভু’ – কবির অন্তরঙ্গ মানুষেরা, তাঁর সহকর্মীরা এবং ছাত্ররা, সকলে এই নামেই কবিকে সম্বোধন করেন, আমিও তাঁদের অনুসরণ করলাম। রথীবাবু চেয়ার আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, আবিষ্কার করলাম আমি গুরুদেবের ঠিক পাশে ব’সে আছি। ওইদিকে ব’সে আছেন তাঁর কন্যা মীরা এবং পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী। বেশ সম্মানিত বোধ করছিলাম।
#

প্রত্যেকের জন্য পৃথক-পৃথক সুমিষ্ট বাক্য ছিল কবির কাছে, প্রত্যেকের আগ্রহের বিষয় তাঁর জানা ছিল। জিউলা-র সঙ্গে তিনি কোরান সম্পর্কে দু-চার কথা আলোচনা করলেন এবং এখন থেকে যে ইসলামীয় বিদ্যার বিভাগ শুরু হবে এ-নিয়ে হর্ষ প্রকাশ করলেন। কিসুনি-র ( মিসেস বগদানফ-এর পোষা বিড়াল) বিষয়ে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করতে মিসেস বগদানফ একেবারে অভিভূত। ট্র্যাপ-এর সঙ্গে সংস্কৃত ভাষায় তাঁর দু-চার বাক্য বিনিময় হল।
#

এর পর অধ্যাপকরা এগিয়ে এলেন একে-একে : গ্রন্থাগারিক প্রভাত মুখার্জি, নেপালবাবু, ক্ষিতিমোহন সেন, পদার্থবিদ্যার শিক্ষক চৌধুরী এবং স্কুলের প্রধানশিক্ষক গাঙ্গুলি; একেবারে শেষে হিমঝুরি-র সঙ্গে অতনু রায় ও গেটহুড হুডিগর ( Gertrude Rudiger) । কবির মুখাবয়ব আমি লক্ষ করছিলাম। স্বর্ণাভ কেশবতী দুই সুন্দরী এগিয়ে আসা মাত্র কবির মুখ ঝলমল ক’রে উঠল। হিমঝুরি নিজেকে মাটির এত কাছে নামিয়ে আনল যে আমার মনে হতে লাগল ও বুঝি এবার কবির পদচুম্বন করবে। রবীন্দ্রনাথ ট্যাগর তাকে আশীর্বাদ করলেন। দৃশ্যটি অনেকটা রেনেসাঁস যুগের চিত্রকলার মতো। সন্ধ্যাবেলার আনুষ্ঠানিক পোশাক প’রে গেটহুড আড়ষ্ট ভঙ্গিতে পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, ভাবছে তার সৌজন্যবিনিময় কেমন ভাবে উৎরবে।
#

‘স্বাগত, মাদাম’, কবি তাকে অভিবাদন জানালেন। ‘আমাদের অতিসাধারণ গৃহকোণে আপনি তুষারের দেশের তাজা বাতাস এবং আপনার দুঃসাহসী কীর্তি বয়ে নিয়ে এসেছেন, এইজন্য আমি খুশী। জাপানে থাকার সময়ে আপনার অভিযানের বার্তা আমি পেয়েছি। আপনাদের অভিযান, বিশেষ ক’রে তাতে আপনার ভূমিকা সম্পর্কে জাপানি সংবাদ মাধ্যম উচ্ছ্বসিত। আমাদের দেশের মেয়েরা এত সঙ্কোচ বয়ে বেড়ায় তাদের সংসারে, আপনি তাদের প্রেরণাদাত্রী। সিদ্ধান্তগ্রহণে আপনার বলিষ্ঠতা থেকে কিছুটা দিয়ে দিন তাঁদের, যাতে তারা জীবনের কঠোরতার সম্মুখীন হতে পারে।’
#

অল্প মাথা নাড়াল গেটহুড, ট্যাগর-এর দিকে তার হাতটা এগিয়ে ধরল। কবি উষ্ণতার সঙ্গে তা গ্রহণ করলেন, এবং মেয়েটির কোমল কিন্তু বলিষ্ঠ ধবধবে ফর্সা হাতটি কিছুক্ষণের জন্য ধ’রে রইলেন। কবি কারুর সঙ্গে করমর্দন করছেন, এই দৃশ্য, এর আগে শান্তিনিকেতন-এ কেউ কোনওদিন দ্যাখে নি। একে অপরের চোখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাঁরা তাকিয়ে রইলেন – ট্যাগর-এর চোখ দু’টি তামাটে বর্ণের, বিষণ্ণ ও চিন্তামগ্ন, মনোযোগী, গভীর; জার্মান মেয়েটির চোখ দু’টি হিমশীতল, ইস্পাত-নীল। নীল চোখ দু’টি উদ্ধত, তারা যেন কোনও নির্দেশ পাঠাচ্ছে; তামাটে চোখ দু’টি ভাবনায় নিমজ্জিত, সবকিছু গ্রহণ ক’রে নিতে চাইছে যেন। পূর্ব পশ্চিমের মুখোমুখি; যেন দুই নেকড়ে বাঘ পরস্পরকে পরিমাপ করছে।
#

জাপান থেকে ট্যাগর এবার দু’জন অতিথি নিয়ে এসেছেন, প্রথমজন জুজুৎসু গুরু ও প্রশিক্ষক, দ্বিতীয়জন, শান্তিনিকেতন-এ পড়তে- আসা একটি জাপানী মেয়ে। জুজুৎসু গুরু, তোয়ামা, বেঁটেখাটো, ঘাড়ে-গর্দানে, গাঁট্টাগোট্টা একজন মানুষ, তাঁর স্ত্রীও তেমনই, কেবল মুখখানি তাঁর ভারি মিষ্টি, আপেলের মতো টুসটুসে লাল। তাঁরা দু’জনেই কেবল জাপানী ভাষাই জানেন ফলে সমস্ত চিন্তা ও অনুভব মুখের হাসি দিয়েই ব্যক্ত করতে হয়। এইদিকে তাঁরা শাস্ত্রী মহাশয়ের দোসর – তাঁর হাসি সরব, তাঁদেরটি নীরব, কিন্তু কেউই মন থেকে হাসছেন না। হাসিটা একটা আড়াল, বহু কিছু ঢেকে রাখছে।
#

জাপানী ছাত্রীটি আমার মন কেড়ে নিল। তার নাম মিনুচি হারুকো। জাপানী ভাষায় ‘হারুকো’ মানে বসন্তকাল, মেয়েটি সত্যিই যেন বসন্তকাল। তার সিল্কের জামাটি পিঠে এক বিরাট ‘বো’ দিয়ে বাঁধা, এবং জাপানী রীতি অনুসারে সে যখন দু’হাত নামিয়ে সামনে ঝুঁকে প’ড়ে সৌজন্য প্রকাশ করে, তখন তাকে অবিকল বসন্তকালের ঝলমলে এক প্রজাপতির মতো দেখায় ( অনুমান করা যায় রসা হায়নঅসি এখানে ‘কিমোনো’ দেখে অভিভূত)। মুখখানি তার চাঁদের মতো গোলাকার, ফ্যাকাসে; চোখ দু’টি কালো, শিশুর সরলতা নিয়ে জগতের পানে চেয়ে থাকে। মিনুচি অনাথ, তার হাসিতে বিষাদের ছায়া। তার বাবা-মা’র স্মৃতিচারণের সময়ে, ঠোঁট দু’টি আরও গুটিয়ে নিয়ে কথা বলে সে, হয়তো-বা শ্রোতার সমব্যথা লাঘব করবার জন্য। তার হাসি, আসলে, বিষণ্ণতা লুকিয়ে রাখবার এক আড়াল হলেও, তা যেন রামধনুর সাত রঙে বোনা। মেয়েটি কবির পায়ের কাছে গুছিয়ে ব’সে তাকিয়ে রইল ওপরে, ঠিক যেমন এক বালিকা তার সমস্ত বিশ্বাস আর আস্থা নিয়ে তার বাবার দিকে চেয়ে থাকে।
#

কবি ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করলেন; তাঁর মনের ভিতরে ভাবনার ভান্ডার আরও একবার পরিদর্শন করবার জন্যই যেন, মাঝে মাঝে চোখ বুজেই কথা বলছিলেন। গলার স্বর সরু, উঁচু পর্দায় বাঁধা, মাঝে মাঝে মনে হতে পারে, প্রাপ্তবয়স্ক কোনও পুরুষের স্বর নয়, আমরা শিশুকন্ঠ অথবা নারীকন্ঠ শুনছি। অভ্যাগতরা গভীর আগ্রহ সহকারে তাঁর অ্যামেরিকা ও জাপান পরিভ্রমণের বিবরণ শুনতে লাগলেন।
#

‘রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে, দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠা আমার অণ্বিষ্ট। মানুষে-মানুষে পারস্পারিক সহনশীলতার মধ্য দিয়েই তা স্থাপিত হতে পারে। জীবনীশক্তির মধ্যে অমঙ্গলকে পরিহার করে শুভকে আমাদের আলিঙ্গন করতে হবে। প্রত্যেকটি রাষ্ট্র কোনও-না-কোনও অসামান্য গুণের অধিকারী। প্রথমত, সাহসিকতা ও সংগ্রামী চেতনা; দ্বিতীয়ত, দার্শনিকতা; তৃতীয়ত, শিল্পবোধ; এবং চতুর্থত, শরীরের ঘাম দিয়ে মাটি ভিজিয়ে দেবার ক্ষমতা ধরে, এমন কর্মোদ্যোগ। আলাদা ক’রে বিবেচনা করলে এই চার শক্তি একপেশে। এক যোগে কাজ করলে এরা অসাধ্য সাধন করতে পারে। আবার, অসূয়ার শিকার হয়ে এরা যদি একে অপরের বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করে, তা হলে সকলের পরাজয় অনিবার্য। শান্তিনিকেতন-এ আমি ভিন্ন-ভিন্ন দেশের জন্য একটিই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার চেষ্টা করেছি। শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার দ্বারা, সমগ্র সভ্য মানবজাতির জন্য সৃষ্ট এই নতুন সংশ্লেষ সার্থকতায় পৌঁছে দেওয়া, এবার, আপনাদের উপর নির্ভর করছে। শিল্পকলা ব্যতীত বিজ্ঞানের অস্তিত্ব অসম্ভব। ঠিক যেমন জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে দেখি, শিল্পকলাও মানুষের অন্তর থেকে ফেটে বেরিয়ে আসে। এবং একজন প্রকৃত বিজ্ঞানী একজন শিল্পীই, কারণ সত্যে তিনি সুন্দরের সন্ধান পান। একজন প্রকৃত শিল্পী-বৈজ্ঞানিক গৌরবময় মঙ্গলসাধনের অন্বেষণ ক’রে থাকেন, সেই কারণে তিনি এক ঋত্বিক। এই আশ্রম সত্য, মঙ্গল ও সুন্দরের দেবালয়। আমাদের উপলব্ধি হোক, আমাদের আচরণ সঠিক হোক, আসুন, এই জগতে আমরা আনন্দের সন্ধান করি।’
#

তাঁর কন্ঠস্বর অবসন্ন, ভাঙা-ভাঙা; চোখ বুজে, খুব শান্ত ভঙ্গিতে তিনি আবার ব’লে চললেন, ‘যদিও বহু কাজ এখনও বাকি, আমি বেশ বুঝতে পারছি আমার দিন ফুরিয়ে আসছে। জীবিতকালে আমি যা সম্পূর্ণ করতে পারলাম না, তা আমার স্মৃতিতে পূর্ণ হবার অপেক্ষায় প’ড়ে রইল। সেই স্মৃতি ধ’রে রাখবেন আপনারা, জানবেন, যেদিন আমার এই দেহ ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে, সেদিনও আমি আপনাদের সঙ্গেই রয়েছি।’
#

তিনি মাথা নত করলেন। ঘর-জোড়া গোরস্থানের নীরবতা, কেবল মশাদের ভনভন আর পাইপ টানার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কবিকে এক নিঃশেষিত মোমবাতির মতো মনে হচ্ছিল আমাদের। আসন্ন মৃত্যুর চিন্তায় তিনি মগ্ন, মনে হচ্ছিল তিনি যেন কিসের পূর্বাভাস পেয়ে গেছেন। এই আশ্রম অনাথ হয়ে যাবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়, এই সৌধ, তাঁর এই মহৎ সৃষ্টি, ধুলোয় মিশে যাবে। যে মশাল তিনি জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন, তা প্রজ্বলিত রাখার জন্য, অগ্নিশিখায় নিরন্তর বাতাস যোগাতে হবে অধ্যাপকদের। ওই বিষণ্ণ পরিবেশে আমরা সকলে নিথর হয়ে ব’সে রইলাম, ভাবতে লাগলাম স্রষ্টার অবর্তমানে তাঁর সৃষ্টি কীভাবে বেঁচে থাকবে।
#

কবি উঠে পড়লেন, ঝুঁকে প’ড়ে, রথীবাবুর কাঁধে ভর রেখে, ধীরে-ধীরে এগিয়ে চললেন ডাইনিং হলের উদ্দেশে, সঙ্গে মীরা দেবী ও প্রতিমার উদ্বিগ্ন চাহনি। সেই সময়ে তাঁকে অতিশয় বৃদ্ধ এক ব্যক্তি ব’লে মনে হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল হোঁচট খেতে-খেতে তিনি মৃত্যুর দুয়ারের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।


~~~~

ঋণস্বীকার: Fire of Bengal
মূল বইয়ের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ:
অনুবাদ: Eva Wimmer ও David Grant সম্পাদনা: William Radice
প্রথম প্রকাশক: The University Press Limited স্থান ও কাল : ঢাকা, বাংলাদেশ, ১৯৯৩

মূল গ্রন্থ : ‘Bengali Tuz’ রচনা: Roza Hajnoczy
প্রথম (মরণোত্তর) সংস্করণের প্রকাশক : Singer & Wolfner
স্থান ও কাল : বুদাপেশৎ, হাঙ্গেরী, ১৯৪৪ মূল ভাষায় দ্বিতীয় সংস্করণ :১৯৭২

চিতৃঋণ- গুগল

‘ Fire of Bengal’ বইটি পড়তে ক্লিক করুন — https://www.goodreads.com/book/show/5461605-fire-of-bengal

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর সম্পাদনায় ‘শান্তিনিকেতনের সেকাল’ গ্রন্থে। গ্রন্থটির
প্রকাশক– কিশলয় প্রকাশন। প্রকাশকাল – জানুয়ারি, ২০১৯

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)