যে দরজার কোন দেওয়াল নেই <br /> শমীক ঘোষ

যে দরজার কোন দেওয়াল নেই
শমীক ঘোষ

স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার … অ্যান্ড স্প্রিং (২০০৩)
১০৩ মিন
নির্দেশক: কিম কি দুক

“আমি এই সিনেমাটা শুরু করেছিলাম একটা প্রশ্ন থেকে ‘জীবনের মানে কি?’ প্রতিটা মানুষের নিজস্ব একটা সুযোগ দরকার যখন তাঁরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারবেন তাঁদের কাছে জীবনের অর্থ কী, বিশেষ করে যখন একজন মানুষ একটা যন্ত্রণাদায়ক সময়ের মধ্যে দিয়ে যান।”
কিম কি দুক

চলচ্চিত্রের সমালোচনা করার সময় বেশীর ভাগ সমালোচক সেই চলচ্চিত্রের আখ্যানের আলোচনা করেন। কিন্তু সিনেমা শুধু আখ্যান নয়। সিনেমা মানুষের আবিষ্কার করা শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে সব থেকে আধুনিক। আমাদের ভাষায় সেভেন্থ আর্ট। ফলে সিনেমার বয়ানে আখ্যান ছাড়াও লুকিয়ে থাকে আরো অনেক বয়ান। আর তার মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য তার ভিস্যুয়াল বা তার দৃশ্য। অতএব চলচ্চিত্র সমালোচকের দায় থেকে যায় সিনেমার দৃশ্যের আলোচনার। কিন্তু দৃশ্য চাক্ষিক মাত্র, শাব্দিক নয়। যদি শব্দ বা ভাষায় দৃশ্যের সমস্ত গুনাগুন প্রকাশ করে দেওয়া যেত, তাহলে আলাদা করে দৃশ্যের প্রয়োজন হত না।
সাউথ কোরিয়ার অন্যতম সেরা পরিচালক কিম কি দুকের স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার … অ্যান্ড স্প্রিং দেখতে দেখতে বার বার এই কথাগুলো মনে পড়ে। কিম কি দুক সিনেমার বিশ্বে অন্যতম পরিচিত এক নির্দেশক। তথাকথিত আর্ট হাউজ পরিচালকের মতই তাঁর ছবি সাউথ কোরিয়ায় তেমন চলে না। অথচ দৃশ্যের বুননে এবং বয়ানে তিনি অবিস্মরণীয়।
কিম কি দুকের এই ছবিটায় গল্পের প্রয়োজনীয়তা কম। বরং তার থেকে বেশী প্রয়োজনীয় বোধ। এবং আরো প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিকতা। এই আধ্যাত্মিকতা বৌদ্ধধর্মের। আর আধুনিক, উত্তর আধুনিক মন্তব্যে এই আধ্যাত্মিকতাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার সুযোগ কম। কারণ এই আধ্যাত্মিকতা প্রতীচ্যের নন্দনতত্ত্বের আঁচড়ে আঁচড়ে লেখা আছে। এই ফিল্মের কম্পোজিশন, দৃশ্যের বুনোট, এমনকি বিষয়ও অসম্ভব প্রতীচ্যের।

স্প্রিং – বসন্ত

রাইস পেপারের উপর কোরিয়ান ক্যালিগ্রাফিতে লেখা ছবির টাইটেল। তারপর টাইটেল কার্ডে লেখা থাকে প্রথম পর্বের নাম। স্প্রিং। বসন্ত।
একটা বন্ধ দরজার শরীরে আঁকা দু’জন মানুষের ছবি। ছবির ধরণ ফার ইস্টের চিত্রকলার / পেইন্টিঙের নিয়ম মেনে। আমরা ভারতীয়রা এমন ছবি দেখতে অভ্যস্ত বুদ্ধিস্ট মনাস্ট্রির দেওয়ালে। ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে ধীরে ধীরে খুলে যায় দরজা। পিছনে জল। একটা ছবির মত সুন্দর জলাভূমি। তার উপর ভাসছে একটা প্যাগোডা আকৃতির বাড়ি। তার পিছনে পাহাড়। জলের মধ্যে অর্ধেক ডুবে থাকা কিছু গাছ। গাছের কালো ছায়া জলের গায়ে দুলছে। ক্যামেরা টিল্ট আপ করতে থাকে আমরা আবার দেখতে পাই জলের মধ্যে প্যাগোডা আকৃতির সেই ভাসমান বাড়িটি। দুটো গাছের ডালের ভিতরে বাড়িটা ধরে স্থির হয় ক্যামেরা। যেন পরম যত্নে গাছ দুটো ধরে রেখেছে বাড়িটাকে। দৃশ্যের বুনোটে একটা হারমনির আভাস। যেন প্রকৃতি আর প্যাগোডাটা ভীষণ সাবলীল এক সাদৃশ্যে ভেসে আছে। পরের দৃশ্যেই আবার সেই দরজা, প্যাগোডাকে পিছনে রেখে। আমরা দেখতে পাই দরজার কোন দেওয়াল নেই। দরজাটা আসলে আপাত ভাবে নিষ্প্রয়োজন। আমরা বুঝতে পারিনা কেন এই দরজাটা।
জল বা অপ ধাতু আসলে আপেক্ষিকতার ইঙ্গিত। দেওয়ালহীন এই দরজা আসলে অন্য ইঙ্গিত দেয় যেন। আসলে এর সবটাই যেন রূপক – মায়া। মৈত্রেয় যেন তাঁর স্বপ্নের মধ্যে নির্মাণ করছেন মায়ার বাস্তব।
বুদ্ধের পায়ের কাছে জল। সেই জলে সাঁতার কাটছে লাল মাছ। এই জীবনের সবটুকুই যেন বুদ্ধের পায়ের কাছে। জলের মতই আপেক্ষিক। বুদ্ধমূর্তির পয়েন্ট অফ ভিউতে আমরা দেখতে পাই উপাসনারত গুরুকে। সবটুকুই যেন মৈত্রেয়র স্বপ্নে। মায়ায়। তথাগতের চোখ দিয়ে দেখা। এর পরেই আমরা দেখতে পাই বৌদ্ধ শ্রমণের মত মুন্ডিত মস্তক শিশু ভিক্ষুকে। ঘুমন্ত অবস্থায়। তার শরীরের পাশ দিয়ে আবার একটা দরজা। দেওয়ালহীন এই দরজাটাও। এই দরজাটা ঠেলে খুলে গুরু তাঁর শিষ্য শিশু ভিক্ষুক বলেন জেগে উঠতে। অথচ দরজার বাইরে থেকেও বলা যেত। কারণ কোন দেওয়াল নেই। কিন্তু গুরু সেটা না করে যেন অদৃশ্য দেওয়ালের উপস্থিতি মেনে নিলেন। শিশু শিষ্যও ঘুম থেকে উঠে আবার সেই দরজার ভিতর দিয়েই বেরিয়ে এল। হাত জোড় করে উপাসনায় বসল বুদ্ধমূর্তির সামনে। সেই বুদ্ধমূর্তি জলের পাত্রের মধ্যে রাখা। সেই জলের মধ্যে লাল মাছ ঘোরাফেরা করে। বাইরে দেখা যায় বৃদ্ধ গুরুকে। জলে ভাসমান প্যাগোডা সদৃশ মঠের পাশের জলে তিনি ঘোরা ফেরা করতে দেখেন লাল মাছ। লং টপ শটে এর পরই প্রায় পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা প্রায় গোলাকার সেই জলাভূমির মাঝে ভাসমান একটা মঠ। এই ক্রসরেফারেন্সটা চমৎকার। জল আর পাহাড়ের ছোট্ট গোলাকার ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু যেন ওই মঠ যেন প্রকৃত পক্ষে বুদ্ধেরই ইঙ্গিত। পরিচালক শুধু দৃশ্যের ভাষায় আসলে ইঙ্গিত দিয়ে দেন ছবি প্রতিপাদ্য বিষয়ের, কাহিনীর আখ্যানে যার কথা আসবে অনেক পরে- ওই বৃদ্ধ যেন আসলে বোধিসত্ত্বই। এই কয়েকটা শট দেখার পর মনে প্রশ্ন জাগে এটা আইজেনস্টাইনের টোনাল মন্তাজ হল কিনা। বিখ্যাত রাশিয়ান নির্দেশক এবং ফিল্ম তাত্ত্বিক আইজেনস্টাইনের মতে টোনাল মন্তাজ হল কয়েকটা আপাত উদ্দেশ্যহীন শটের সমাহার যার টোন বা মূল সুর এক।
লং শটে এরপর দেখা যায় জলের মাঝে ভাসমান মঠ। তার ছায়া পড়েছে জলে। অদ্ভুত সিমেট্রি কম্পোজিসনে। আবার সেই হারমনির ইঙ্গিত। বৃদ্ধ গুরু ঝাঁট দিচ্ছেন। আর শিষ্য শিশুটি একটা ছোট্ট কুকুর নিয়ে বসে আছে। এরপরেই গুরু নৌকায় উঠে বসেন। আর ছবির তৃতীয় দরজা, মঠের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে শিষ্য। এই দরজাটাই একমাত্র প্রকৃত দেওয়াল সর্বস্ব দরজা। বৃদ্ধের নৌকায় উঠে বসে শিশুটি। সে ওষুধের গাছ খুঁজতে যাবে। পিছন দিকে নৌকা বাইতে থাকেন গুরু। ঈষৎ হাস্যময় তাঁর ভঙ্গিমা। আর রিভার্স অ্যাঙ্গেলে শিশু শিষ্যের হাস্যময় মুখ। পিছনে জলের স্রোত। অসামান্য সিনট্যাক্স। শিশুটির পবিত্রতার ইঙ্গিত করে। আবার একই সাথে বলে দেয় এইটাও আপেক্ষিক, একটা পর্যায় মাত্র। দেখা যায় নৌকার গায়ে মহাযান বৌদ্ধধর্মের দেবী গুয়ানইন-এর ছবি আঁকা। এই গুয়ানইন হলেন ভারতের অবলোকিতেশ্বর। ক্ষমার প্রতিমূর্তি। নৌকার গায়ে আঁকা গুয়ানইনের হাতে পদ্ম, তার মধ্যে বসে আছেন শিশু বোধিসত্ত্ব। এবার সিম্বল (প্রতীক)। নৌকা বাওয়া গুরু যেন শিশু বোধিসত্ত্বকে বয়ে নিয়ে যাওয়া অবলোকিতেশ্বরের প্রতীক।
শিশুটি ভেষজ উদ্ভিদ তুলতে তুলতে তুলতে দেখতে পায় বিষধর সাপ। সাপটাকে হাত দিয়ে তুলে দূরে ছুঁড়ে দেয় সে। বৌদ্ধধর্মের মতে যে অপাপবিদ্ধ, তার ক্ষতি কেউ করতে পারেনা।
শিশুটি পাহাড়ে মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে উঠে দাঁড়ায় এক চোখ মুদ্রিত বুদ্ধমূর্তির পিঠে। দূরে তাকিয়ে দেখতে পায় জলের মধ্যে ভাসমান তাদের মঠ। যেন বুদ্ধের মতই সমাধিস্থ। শিশুটিও যেন অপাপবিদ্ধ মুদ্রিত বুদ্ধ মূর্তির মতই।
শিষ্যের ভেষজের মধ্যে গুরু খুঁজে পান বিষাক্ত উদ্ভিদ। শিষ্যকে তিনি চেনাতে থাকের ভেষজ ঔষধি গুন সম্পন্ন উদ্ভিদ আর বিষাক্ত উদ্ভিদের তফাৎ। আসলে যেন বুঝিয়ে দেন ভালো ও খারাপের ভেদাভেদ, দয়া ও হিংসার ভেদাভেদ।
এর কিছু পরেই শিশুটিকে দেখা যায় ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠতে। একবার দেখা যায় গুলতি ছুঁড়তে, পাথর ছুঁড়তে জলের দিকে। তারপর দেখা যায় একা নৌকা বেয়ে পারের দিকে যেতে। শিশুটি প্রথমে একটা মাছ ধরে তার গায়ে একটা পাথর বেঁধে সেটাকে জলে ছেড়ে দেয়। একই কাজ সে করে একটা ব্যাঙ এবং একটা সাপ ধরেও। আর শিশুটির এই নির্দয় আচরণ আড়াল থেকে প্রত্যক্ষ করেন গুরু। এইখানে দর্শকের মনে একটা প্রশ্ন জেগে ওঠে। গুরু কি করে এই পারে এলেন। কারণ এতক্ষণ অবধি গোটা ছবিতে একটি মাত্র নৌকাই দেখা গিয়েছে। এর উত্তর আরো পরে দেবেন পরিচালক।
এই অপকর্মটি করে মঠে ফিরে আসে শিশুটি। ঘুমিয়ে পড়ে। গুরুকে দেখা যায় একটা ভারী পাথর নিয়ে আসতে। পাথরটা তিনি বেঁধে দেন শিষ্যের পিঠে। সকাল হলে শিশুটি কাঁদতে থাকে, ভারী পাথরটা খুলে দিতে বলে গুরুকে। গুরু বলেন ঠিক একই কাজ সে করেছে মাছ, ব্যাঙ আর সাপের সাথে। তাই যতক্ষণ না সে তাদের পাথর খুলে দিচ্ছে, ততক্ষণ তিনিও খুলবেন না তার পাথরটা। কিন্তু যদি তাদের মধ্যে কেউ এই অত্যাচারে মরে গিয়ে থাকে তাহলে এই পাথর সে বয়ে নিয়ে যাবে সারা জীবন ধরে, তার মনের ভিতর।
শিশুটি খুঁজে পায় মাছটাকে। মাছটা মরে গিয়েছে। ব্যাঙটা জীবিত। আর সাপটাও মরে গিয়েছে। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কিন্তু আর অপাপবিদ্ধ নয় সে। সে পাপ করে ফেলেছে। ফলে পতন ঘটেছে তার। বাইরের পৃথিবীর মানুষের মতই সে এখন সাধারণ। খুব জোরে বয়ে যাওয়া ঝরণার জল, এতক্ষণের স্থির জলের পাশাপাশি যেন তার এই পতনেরই ইঙ্গিত করে। এইখানেই শেষ হয় স্প্রিং। বসন্ত, যখন অঙ্কুরের উদ্গম হয়।

সব্‌বে তসন্তি দন্ডস্‌স সব্বে ভায়ন্তি মচ্চুনো।
অত্তানং উপমং কত্বা ন হনেয্য ন ঘাতয়ে।।

সবাই দণ্ড থেকে ভয় পায়, সবারই মৃত্যুভয় হয়। সবাইকে নিজের মত ভাবো, কাউকে মেরো না আর মারতে দিয়ো না। (ধম্মপদ)

সামার – গ্রীষ্ম

গ্রীষ্মে শিষ্য ভিক্ষু যুবা হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মের কারণেই ছবিতে আলো অনেক বেশী তেজী। ভিস্যুয়ালে প্রকৃতির রূপ বদল হয়। এই পর্যায়ের শুরুতে দেখা যায় যুবা শিষ্য নৌকা বেয়ে মঠের থেকে ক্রমশ দূরে সরে আসছে। এটাও যেন এই পর্যায়ের আখ্যানের চলনের ইঙ্গিত করে। দরজার বাইরে বেরিয়ে সে দেখতে পায় মৈথুনরত দুটি সাপকে। তার মুখের অভিব্যক্তি বুঝিয়ে দেয় যে প্রকৃতির রহস্য সে জেনে ফেলেছে। যুবা শিষ্য পাহাড়ের মাথায় বুদ্ধ মূর্তির পিছনে তাকিয়ে দেখে দূরে। এইবার তার দৃষ্টি অন্যদিক, মঠের থেকে দূরে। এক্সট্রিম লং শটে দেখা যায় পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে আসছেন দুই নারী। এক কিশোরী ও তার মা। মেয়েটি অসুস্থ। তারা মঠে এসেছে মেয়েটির সুস্থতার জন্য। এই পর্যায়ে যুবা শিষ্যটির পোষ্য একটি মোরগ। এই মোরগটা ছেলেটির পুরুষত্ব বা ভিরিলিটির ঈঙ্গিত। সে এই মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট হয়। মঠে প্রার্থনারত এই মেয়েটির দিকে সে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে চতুর্থ একটা দরজা খুলে। এই দরজাটা মূল দরজা নয়, বরং এক পাশ থেকে। পরিচালক যেন ঈঙ্গিত করেন এই তাকানো আসলে বয়ঃসন্ধি-উত্তর পাপবোধের পরিচয়। এর কিছু পরের দৃশ্যে মঠটাকে আবার দেখা যায় দরজার পাশ থেকে। স্প্রিং পর্যায়ে যে দুটি গাছের ডালের মাঝখান নিয়ে পরম মমতায় মঠটিকে ধরা হয়েছিল, এইবার দেখা যায় মঠটা সামান্য পাশে। অর্থাৎ সিমেট্রি ভেঙে গিয়েছে। যে নিখুঁত হারমনি স্প্রিং-এ ধরা পড়েছিল সেই নিখুঁত হারমনি এইবার আর নেই। মেয়েটির মা মেয়েটির সুস্থতার জন্য তাকে মঠে রেখে যায়।
যুবা শিষ্য মেয়েটিকে পোষাক পরিবর্তন করার সময় দেখে ফেলে। কাম ক্রমশ দানা বাঁধে দুজনের সম্পর্কে। এরপর মেয়েটিকে দেখা যায় সাদা পোষাক পরা অবস্থায়। সাদা অর্থাৎ পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা। বোধহয় এই সাদা পোষাক মেয়েটির কৌমার্যের প্রতীক। কাম তাকে স্পর্শ করেনি, অর্থাৎ সে বিশুদ্ধ। ছেলেটি মেয়েটিকে মঠের বাইরে রাখা মূর্তির উপর বসতে নিষেধ করে। ছেলেটি পরম মমতায় মূর্তিটার উপরের ধুলো ঝাড়ে। মূর্তিটাকে ঘুরিয়ে ঠিক করে রাখে। মেয়েটি উঠে গিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে মঠের ভিতর। ছেলেটা একটা কম্বল চাপা দেয় মেয়েটার গায়ে। তারপর হঠাৎ যেন নিজের কামবোধ চাপতে না পেরে হাত দেয় মেয়েটির স্তনে। মেয়েটি উঠে পড়ে, চড় মারে ছেলেটিকে। ছেলেটি ভয় পায়। প্রার্থনা করতে থাকে বুদ্ধ মূর্তির উদ্দেশ্যে। মেয়েটি ছেলেটির দিকে ফিরে তাকায়, হাত রাখে ছেলেটির কাঁধে। এমন সময় গুরু এসে যান। ছেলেটা আরো জোরে প্রার্থনা করতে থাকে। গুরু তাকে জিজ্ঞাসা করেন সে কেন অসময়ে প্রার্থনা করছে। ছেলেটা উত্তর না দিয়ে খুব জোরে প্রার্থনা করতে থাকে। এই সিকোয়েন্সটা খানিকটা কমিক। কিন্তু ছেলেটার বুদ্ধের প্রতি সমর্পণ যেন আর সত্যি নয়। এই পর্যায়ে প্রত্যেকেরই প্রার্থনা আসলে জাগতিক স্বার্থে। ছেলেটার প্রার্থনার শব্দে কন্টিনিউড শটে দেখা যায় মোরগটা খাবার খুঁটে খাচ্ছে। আবার সেই ভিরিলিটির ইঙ্গিত। একই সঙ্গে ইঙ্গিত জাগতিক বাসনা মেটানোর।
ছেলেটি মেয়েটিকে নিয়ে নৌকায় করে নিয়ে আসে পারে। এক্সট্রিম লং শটে মঠের ব্যাকগ্রাউণ্ডে তাদের দুজনকে নৌকায় উঠতে দেখা যায়। দেখা যায় আবার সেই গাছের ডাল দুটিকে। এইবারও মঠটা গাছের ডাল দুটির মধ্যে ধরা নেই। বরং তাদের একটু নিচে। পরিচালক এক একটা শটে মেটিকুলাসলি তাঁর সিনগুলো অ্যারেঞ্জ করেছেন। এই সিনেমার মিসো সিন (Mise en scene- সিনে কি কি আছে) বার বার দেখার মত। যত বার বার দেখা হয় তত যেন দৃশ্যের নিজস্ব বয়ান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জলের মধ্যে মেয়েটির কাছে ছেলেটা একটা পাথর বেয়ে নিচে নেমে আসে। আবার যেন অ্যাধাত্মিক জগৎ থেকে মায়ার দুনিয়ায় নেমে আসার ইঙ্গিত।
ভেষজ পিষে ওষুধ তৈরী করতে থাকে ছেলেটি। গুরু বলে ওঠেন এটা হৃদয় দিয়ে করার বিষয়। এইবার সংলাপের মাধ্যমে সোজাসুজি বলে দেওয়া।
একা বসে থাকা মেয়েটির সামনে ছেলেটা নৌকা বাইতে বাইতে হঠাৎ চক্রাকারে ঘোরাতে থাকে নৌকাটা। এই চক্র হল বুদ্ধধর্মের একটা খুব পরিচিত প্রতীক। বৌদ্ধধর্মে চক্র হল আধ্যাত্মিক সচেতনতার ইঙ্গিত। এইখানে এই ইঙ্গিত ব্যবহার হয় যেন যৌনবোধের জাগুরুক হয়ে ওঠার প্রতীক হিসাবে। এই সময় দেখা যায় মেয়েটির পিছনে একটা নৌকা আঁকা দেখা যায়। বৌদ্ধধর্মে নৌকা হল আধ্যাত্মিক সচেতনতা পাওয়ার একটা পদ্ধতি মাত্র। এই নৌকা আসলে প্রতীক একজন নারী ও পুরুষের পূর্ণমাত্রার নারী এবং পুরুষ হয়ে ওঠার পদ্ধতির। একটা ট্র্যাঞ্জিশনের প্রতীক।
এরপরেই দুজনে অন্য পারে গিয়ে ওঠে। দুটি হাঁসকে দেখা যায় জলে। তারপরেই এই দুজনকে দেখা যায় মৈথুনরত অবস্থায়। ছেলেটা মেয়েটিকে পিঠে করে নিয়ে আসতে থাকে। আবার ক্রশ রেফারেন্সে স্প্রিং-এর সেই পিঠে পাথর বাঁধাকে মনে করিয়ে দেওয়া। এইখানে একটা কন্টিনিউটির সমস্যা চোখে পড়ে। নৌকায় ওঠার সময় মেয়েটা ছিল খালি পায়ে। এখন দেখা যায় তার পায়ে জুতো। এটা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত বোঝা যায়না। তবে জুতো আসলে ফেমিনিটির প্রতীক। ফলে একটা অন্য আভাস থাকতে পারে। দুজনে ফিরে আসে এইপারে। গুরুকে দেখা যায় একটা কাঠের উপর জল দিয়ে মন্ত্র লিখতে। লেখা শেষ হওয়ার আগেই উবে যাচ্ছে জলের দাগ। যেন আসলে নারী ও পুরুষের এই মিলন সাময়িক। খুব সামান্য, জলের উবে যাওয়ার মতই এর রেশ থাকবে না। গুরুকে দেখে ছেলেটি খানিকটা কুন্ঠিত। গুরু তাকে বলেন যে নৌকাটা সে বাঁধেনি, নৌকাটা ভেসে যাচ্ছে। আসলে যে নৌকা তার ব্যবহার করা উচিত ছিল জ্ঞানের আলোয় পৌঁছানোর জন্য, সেই নৌকা সে ব্যবহার করেছে যৌনতার জন্য, জাগতিক কাজে।
রাত্রে ছেলেটি মেয়েটির সাথে মিলিত হতে আসে। সে প্রথমে মঠের ভিতরের দরজা খুলতে যায়। কিন্তু গুরুর শরীরে আটকে গিয়েছে দরজাটা। ছেলেটা তাই দরজা দিয়ে না বার হয়ে, অদৃশ্য দেওয়াল উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসে। যেন সে আসলে অলঙ্ঘ্য সব নিয়ম ভেঙে ফেলছে। মঠের ভিতরেই মিলিত হয় দুইজন।
এর পর দেখা যায় বৃষ্টিমুখর এক দিনে ছেলেটা মেয়েটিকে আদর করে বসায় মঠের বাইরে রাখা মূর্তির উপর। যে মূর্তির উপর আগে সে মেয়েটিকে বসতে নিষেধ করেছিল।
পরের সকালে দুজনে খেলতে থাকে মঠের বাইরে। গুরু দেখেন তাদের খুনসুটি। মোরগটা খুঁটে খুঁটে খেতে থাকে মেঝে থেকে। রাত্রে মেয়েটি নিজেই দরজা খুলে চলে যায় ছেলেটির কাছে। দুজনে বেরিয়ে পড়ে। মিলিত হয় নৌকার মধ্যে। সকালে গুরু উঠে দেখেন দুজনকে এক সাথে ঘুমিয়ে থাকতে। মোরগটার পায়ে দড়ি বেঁধে তিনি ছুঁড়ে দেন নৌকার মধ্যে। তারপর দড়ি ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসেন মঠের কাছে। যেন ভিরিলিটি জীবনের এই পর্যায় জ্ঞানের মাধ্যম নৌকাটিকে চালনা করছে। গুরু নিজেই নিয়ন্ত্রণ করছেন। তবু ভিরিলিটি জরুরি। গুরু খুলে দেন নৌকার মধ্যে রাখা প্লাগ। নৌকাটি ডুবতে থাকে। ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে জেগে ওঠে দুজন।
দুজনে কুন্ঠিত ভাবে এসে দাঁড়ায় গুরুর পিছনে। মুরগিটি মাটি থেকে খুঁটে খেতে থাকে। গুরু বলেন এটা শুধু প্রকৃতির কাজ। গুরু বলেন কাম আসলে ভোগের লালসা সৃষ্টি করে, আর এই ভোগদখলের মানসিকতা শেষ পর্যন্ত খুনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মেয়েটিকে চলে যেতে বলেন তিনি। মেয়েটির চলে যাওয়া মেনে নিতে পারে না ছেলেটি। সে এখন প্রেমে পাগল। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে বুদ্ধমূর্তিটাকে ঝোলায় বেঁধে ফেলে সে এবং পিঠে নেয়। বুদ্ধ এখন তার কাছে ভারী পাথর মাত্র। মোরগটাকেও সাথে নেয় সে। গুরু চোখ খোলেন। তিনি টের পেয়েছেন শিষ্যের চলে যাওয়া। কিন্তু তিনি তাকে বাধা দেবেন না। তিনি উপাসনা করতে বসেন। তাঁর সামনে বুদ্ধমূর্তি নেই। বরং ঝাপসা, রঙ ওঠা দেওয়ালে আঁকা অন্য এক বুদ্ধের সামনে তিনি উপাসনারত। সেই বুদ্ধের মুখ দেখা যায় না। মোরগটাকে দেখা যায় জঙ্গলের পথে একা হাঁটতে। এইখানেই শেষ হয় সামার। অঙ্কুর এখন চারা গাছ। কিন্তু পথভ্রষ্ট।

পমাদমনুযুঞ্জন্তি বালা দুম্মোধিনো জনা।
অপ্পমাদঞ্চ মেধাবী ধনং সেট্‌ঠং’ব রক্‌খতি।।

মূর্খ (দুর্বুদ্ধি) ব্যক্তিগণ প্রমাদে যুক্ত থাকে। জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ ধনের মতো অপ্রমাদকে রক্ষা করেন। (ধম্মপদ)।

ফল – হেমন্ত

হেমন্ত হল পাতা ঝরার সময়। এইসময় সবুজ পাতারা রঙিন হয়ে ওঠে। আমরা দেখতে পাই গুরু বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছেন। একা তিনি নৌকা বেয়ে ফিরে যাচ্ছেন মঠের দিকে। তাঁর পিঠে ঝোলার মধ্যে বাঁধা একটা বিড়াল। বিড়াল হল কনশাসনেস বা চেতনার প্রতীক। বিড়ালটাকে ঝোলা থেকে বার করে তিনি বলেন “খুব ক্লান্তিকর ছিল।” এই কথাটা যেন তাঁর নিজেকেই বলা।
ঝোলা থেকে বিড়ালের সাথেই বার হয় আরো অনেক কিছু। তার মধ্যে থাকে খবরের কাগজে মোড়া জমাট ভাত। আর খেতে খেতেই পুরোনো খবরের কাগজের মোড়কে তিনি পান তাঁর শিষ্যের খবর। এখন তাঁর তিরিশ বছর বয়স। স্ত্রীকে খুন করে সে ফেরার হয়েছে। সিদ্ধার্থ উনত্রিশ বছর বয়েসে গৃহত্যাগ করেছিলেন। শিষ্যের বয়স এখন প্রায় তারই মত।
বৃদ্ধকে দেখা যায় তাঁর ছেড়া চীবর সেলাই করতে। যেন পরিনির্বাণের আগেও কিছু কাজ এখনও বাকি আছে তাঁর। বিড়ালটাকে দেখা যায় বুদ্ধমূর্তির শূন্য পাত্রের ধারে ঘুরে বেড়াতে। যেন বুদ্ধকেই খুঁজছে সে।
শিষ্য ফিরে আসে। ফিরে আসার শটটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জলের মধ্যে প্রথমে তার ছায়া দেখা যায়। তারপর টিল্ট আপ করে ক্যামেরা ধরে তার শরীর। জল এইখানে কামনা বাসনার প্রতীক। জলে শিষ্যের ছায়া সেইটাকেই প্রতিভাত করে।
এই শিষ্য প্রচন্ড অস্থির। গুরু সাথে কথোপকথনে সে জানায় যে মেয়েটাকে সে ভালোবেসেছিল, সে অন্য পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। আর সেইটা সে মেনে নিতে পারেনি। গুরু তাঁকে বলেন তুমি কি জানতে না মানুষের (কামনা বাসনার) জগত কেমন? এইখানে যেন মনে করিয়ে দেওয়া হয় আগের পর্বে তার সাবধানবাণী। কাম আসলে ভোগের লালসা সৃষ্টি করে, আর এই ভোগদখলের মানসিকতা শেষ পর্যন্ত খুনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শিষ্য তার ব্যাগ খুলে বার করে বুদ্ধমূর্তি। আবার স্থাপিত হন তিনি তাঁর পুরোনো আসনে। এই পর্যায়ের পুরোটাই আসলে যেন বুদ্ধের তথা ধর্মের ফিরে আসার ইঙ্গিত। বুদ্ধমূর্তির সাথেই তার ব্যাগ থেকে বার হয় খুনের রক্ত মাখা ছুরি। ছুরিটা সে বারবার ঠুকতে থাকে কাঠের মেঝেতে।
জীবনের এই পর্যায় হল যখন আত্মা তার জৈবিক কামনার বস্তুটিকে পাওয়ার অসীম বাসনায় তাকে খুন করেছে। কিন্তু তার ভিতরের বুদ্ধ তাকে অনুশোচনায় বাধ্য করছে। নিজের সাথে এই যুদ্ধে সে আসলে মায়ায় আবৃত জীবনের প্রতি লোভের দরজাগুলো বন্ধ করছে। কিন্তু সে নিজে বুঝছে না যে সে আসলে দেওয়ালহীন দরজার অন্যপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
শিষ্য তাই ভোরবেলা মঠের বাইরে বেরিয়ে মঠের দরজা বন্ধ করে দেয়। নৌকা বেয়ে সে চলে যায় অন্যপ্রান্তে। আক্রোশে পাথর ছুঁড়তে থাকে জলে। সেই জায়গায় যেখানে সে মাছের, ব্যাঙের শরীরে পাথর বেঁধেছিল। এই কামনা বাসনার পাথর এখনও তার মনের গভীরে। তার মনের গভীরে পাপের ভার। জলের মধ্যে কাঁদতে কাঁদতে তাই সে চিৎকার করে ওঠে গুরুর উদ্দেশ্যে।
মঠে ফিরে আসে সে। আত্মহত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু শরীরের প্রতি জীবনের প্রতি তার মায়া অবিচ্ছিন্ন। মরতে সে পারে না। গুরু লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করতে থাকেন।ঝুলিয়ে দেন মঠের ভিতর। পাপের দণ্ড স্বরূপ।
আর তারপর পোষা বিড়ালটিকে ধরে তার লেজ কালিতে চুবিয়ে মঠের সামনের কাঠের দেওয়ালে লিখতে থাকেন প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র। তারপর শিষ্যকে বলেন ছুরি দিয়ে সেই কালিতে লেখা সূত্র খুদে খুদে প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রটা ফুটিয়ে তুলতে মেঝেতে।
প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র মহাযান বৌদ্ধধর্মের অন্যতম প্রধান সূত্র। এই সূত্র বলে যে প্রজ্ঞাপারমিতার সাথে মিলিত হতে হতে বুদ্ধ বুঝেছিলেন জীবনের অসারতার কথা আর তারপর তিনি প্রকৃত বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। এইখানেও কামতাড়িত হয়ে খুন করা শিষ্য প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র খোদাই করতে থাকে কাঠের মেঝেয়। যেন এর মধ্যে দিয়েই প্রকৃত বুদ্ধ হয়ে উঠবে সে।
খুনিকে খুঁজতে হাজির হয় দুজন পুলিশ। শিষ্য ভয় পায় তাদের দেখে। একবার ছুরি তুলে নেয় আত্মরক্ষার্থে। তার হাত কেটে তখন রক্ত পড়ছে। গুরু তাকে লিখে যেতে বলেন। সে আবার লিখতে থাকে। যেন সে ধর্মের কাছে ধীরে ধীরে নিজেকে সমর্পণ করছে। পুলিশ দুজন খেলার ছলে গুলি ছোঁড়ে জলে ভাসা ক্যানে। শিষ্য আবার ভয় পায় গুলির শব্দে। কিন্তু সে খোদাই করতেই থাকে। ক্রমশ রাত নেমে আসে। ঘুমিয়ে পড়ে পুলিশেরা। কিন্তু শিষ্য পালায় না। সে তার কাজ করে যেতে থাকে। যেন তার সমর্পণ সম্পন্ন হচ্ছে। সেও যেন ক্রমশ কামনা বাসনা ভয় সব ভুলে বুদ্ধ হয়ে উঠছে। সকাল হলে গুরুর আদেশে খোদাই করা প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের উপর রঙ বোলায় দু’জন পুলিশ ও গুরু। যেন সবাই নিজেদের সমর্পণ করে বুদ্ধের কাছে, প্রকৃত জ্ঞানের কাছে। শাস্তিদাতা ও শাস্তিপ্রাপ্ত এক হয়ে যায় কোথাও।
শিষ্যকে দেখা যায় রঙিন প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকতে। সে যেন সমাহিত। শান্ত। ভয়, অনুশোচনা, কামনা বাসনা মুক্ত। এরপরেই নির্দেশক একটা অসামান্য চিত্রকল্প ব্যবহার করেন। দেখা যায় শিষ্য একা বসে মঠের সামনে। মঠটা জলের মধ্যে পাক খাচ্ছে চক্রাকারে। আর শিষ্যের পিছনে রাখা ক্যামেরায় ধরা পড়ছে পাড়ের দৃশ্য। শিষ্যই যেন বুদ্ধ হয়ে উঠছে ক্রমে ক্রমে। সেই যেন ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। সে যেন বুঝতে পারছে দরজাহীন দরজার অস্তিত্ব।
শিষ্যকে নিয়ে নৌকায় করে চলে যাওয়ার সময়, কয়েক মুহূর্তের জন্য নৌকা থামিয়ে দেন গুরু মঠের সামনে থেকে। পুলিশ দাঁড় বাইলেও নৌকা এগোয় না এক চুলও। বোঝা যায় গুরু অলৌকিক শক্তির অধিকারী। শিষ্য আর পুলিশের সাথে নৌকায় সওয়ার সচেতনতার ইঙ্গিতবাহী বিড়ালটা। ওপারে পৌঁছানোর পর তারা চলে গেলে, মঠের সামনে দাঁড়ানো গুরু অলৌকিক দক্ষতায় নৌকাটি ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। বোঝা যায় যে তিনিই ধর্মের ও মায়ার প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি খোদ বোধিসত্ত্ব। শিষ্যকে তিনি সাধারণ জগতে ফেরত পাঠালেন তার পাপের শাস্তি পেতে। লৌকিক জীবনে তার বোধের পরীক্ষা নিতে। জঙ্গলের মধ্যে গাছের ডাল বেয়ে ওঠা বিড়ালটা যেন তারই ইঙ্গিত করে।
এরপর বোধিসত্ত্বের মতই গুরু আয়োজন করেন তাঁর নিজের পরিনির্বাণের। তাঁর কাজ শেষ হয়েছে। নৌকার উপর কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে, তিনি নিজে যেন যজ্ঞের আগুনে শেষ হয়ে যান। তাঁর চেতনার ইঙ্গিতবাহী একটা সাপ আগুনের মধ্যে থেকে জলের মধ্যে দিয়ে সাঁতার কেটে ভেসে আসে। সাপটাকে দেখা যায় প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের মধ্যে দিয়ে চলে আসতে।
কুয়াশা ঢাকা লেকের মধ্যে দিয়ে শেষ হয় ফল বা হেমন্তের পর্যায়। গাছ এখন পাতা ঝরিয়ে ফেলেছে। নতুন জীবন আসবে আবার শীতের পরে।

বহুং বে সরণং যন্তি পব্‌বতানি বনানি চ।
আরামরুক্‌খচেত্যানি মনুস্‌সা ভয়তজ্জিতা।।
নেতং খো সরণং খেমং নেতং সরণমুত্তমং।
নেতং সরণমাগম সব্‌বদুক্‌খা পমুচ্চতি।।
যো চ বুদ্ধঞ্চ ধম্মঞ্চ সঙ্ঘঞ্চ সরণং গতো।
চত্তারি অরিয়সচ্চানি সম্মপ্পঞ্‌ঞায় পস্‌সতি।।
দুক্‌খং দুক্‌খসমুপ্পাদং দুক্‌খস্‌স চ অতিক্কমং।
অরিয়ঞ্চহট্‌ঠঙ্গিকং মগ্‌গং দুক্‌খুপসমগামিনং।।
এতং খো সরণং খেমং এতং সরণমুত্তমং।
এতং সরণমাগম্ম সব্‌বদুক্‌খা পমুচ্চতি।।

মানুষ ভয় পেয়ে পর্বত, বন, উদ্যান, বৃক্ষ, চৈত্য ইত্যাদির স্মরণ নেয়। কিন্তু এই স্মরণ মঙ্গলদায়ক স্মরণ নয়। এ উত্তম আশ্রয় নয় কেননা মানুষ এই শরণে গেলেও সব দুঃখ থেকে আশ্রয় পাবে না। যিনি বুদ্ধ, ধর্ম এবং সঙ্ঘের শরণগ্রহণ করেন, তিনি চার আর্যসত্যকে (১) দুঃখ, (২) দুঃখের কারণ, (৩) দুঃখের বিনাশ, (৪) দুঃখের উপশমকারী আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ সম্যক জ্ঞান দ্বারা দেখে ফেলেছেন, তাঁর এটাই কল্যাণদায়ক শরণ, উত্তম শরণ, এই শরণ নিলে তিনি সব দুঃখ থেকে মুক্ত হয়ে যান। (ধম্মপদ)

ন ক্ষালন্তি মুনরো জলেন পাপং
নৈবাপকর্ষন্তি করেন জগহু খম্‌।
নৈব চ সংক্রমতে…

জল দিয়ে যেমন ময়লা ধোয়া হয় তেমন ভাবে বুদ্ধ লোকেদের পাপ ধুয়ে দেন না। শরীরে কাঁটা ঢুকলে যেমন হাত দিয়ে টেনে বার করতে হয়, তিনি তেমনভাবে জগতের দুঃখও বার করে নিয়ে আসেন না। তিনি নিজে জ্ঞান অন্যলোকের মধ্যে সঞ্চারিত করেন না। বরং যাকে উদ্ধার করতে চান তাকে বস্তুর যথার্থতার উপদেশ দেন।

উইন্টার – শীত

শীতের শুরুতে ফিরে আসে মধ্যবয়স্ক শিষ্য। এই শিষ্যের ভূমিকায় নির্দেশক নিজে। বোধহয় এই ফিল্মে তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ ফুটে উঠেছে বলেই। দেখা যায় হ্রদটা জমে বরফ হয়ে গিয়েছে। যেন মোহ এবং মায়া সব প্রলোভন, ইহলৌকিক চাওয়া পাওয়ার সব কিছুই শিষ্যের জীবনে এখন জমাট বাঁধা বরফের মত। বরফে জমাট মঠের ভিতর ঢোকেন তিনি। দেখা যায় গুরুর চীবর এবং জুতোর মধ্যে শুয়ে রয়েছে সাপটা। এই সাপটা এই শীতেও নিদ্রামগ্ন নয়। এই সাপটাকেই আমরা আগে দেখেছি গুরুর মৃত্যুর পর জলের মধ্যে দিয়ে ভেসে আসতে। এই সাপ অলৌকিক। গুরুর চেতনা।
বরফে জমাট বাঁধা নৌকাটা খুঁড়ে বার করেন তিনি গুরুর চিতাভস্ম। জমে বরফ হয়ে যাওয়া ঝরণা খুদে তৈরী করেন বরফের বুদ্ধমূর্তি। গুরুর চিতাভস্ম লাল কাপড়ে মুড়ে তিনি লাগিয়ে দেন সেই চিতাভস্মের ত্রিনয়নের জায়গায়। বরফের ঝরণার সামনে এই বরফের বুদ্ধমূর্তিকে দেখা যায়। বরফ ফাটিয়ে তখন পিছনে বইছে জলের ধারা। এও অলৌকিক। যেন জগতের বাইরের কোন কিছু্‌ এই বুদ্ধমূর্তি।
শিষ্যকে দেখা যায় একটা প্রাচীন পুঁথি খুঁজে বার করতে। যে দেরাজ খুলে তিনি সেটা পান, তার উপরেই আমরা দেখেছি সেই সাপটাকে। এও যেন গুরু তথা বোধিসত্ত্বের নির্দেশিত। শিষ্যকে এরপর দেখা যায় সেই পুঁথিতে আঁকা মার্শাল আর্টস অনুশীলন করতে। মার্শাল আর্টসের নানান মুদ্রায় বার বার ফ্রিজ হয়ে যায় ফ্রেম। এইখানে মার্শাল আর্টস যেন আবার হারমনির ঈঙ্গিত করে। মার্শাল আর্টস অনুশীলনতরত শিষ্যের সাথে সাথে আমরা দেখতে পাই বরফ ফাটিয়ে বয়ে চলা ঝরণা। কখনো পার্স্পেকটিভে, কখনও বা ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজে। আমরা বুঝতে পারি জমাট হয়ে যাওয়া অনুভূতির ভিতর থেকে জন্ম নিচ্ছে ফল্গু ধারার মত বোধ। শিষ্যও বোধিস্বত্ত্ব। সেও এইবার বুদ্ধ হয়ে উঠছে।
মঠে আগমন ঘটে এক মহিলার। কোলে শিশু। তাঁর মুখ ঢাকা নীল কাপড়ে। রাত্রে বুদ্ধমূর্তির সামনে উপাসনারত অবস্থায় তার চোখ দিয়ে জল পড়ে। অথচ তাঁর মুখ ঢাকা নীল কাপড়ে। অদ্ভূত সুররিয়াল। চোখের জল যেন তাঁর জীবনের পাপের অনুশোচনার প্রতীক। শিষ্য এই নারীকে দেখেন মঠের ভিতরে রাখা দরজার ভিতর দিয়ে। এইবার কিন্তু তাঁর দেখা সামারের মত দরজার বাইরে দিয়ে নয়। আমরা বুঝতে পারি তিনি এখন বুদ্ধধর্মের অনুশাসনের ভিতরে। দরজাহীন দরজার প্রকৃত অর্থ বুঝতে পেরেছেন তিনি। দরজাটা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দেন তিনি। তিনি এখন কামনা বাসনা রহিত। আরো রাত হলে মহিলা ঘুমিয়ে পড়েন। দরজার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে শিষ্য তার মুখের কাপড় খুলতে চান। মহিলার হাত স্পর্শ করে তাঁর পা। তিনি কাপড় খোলেন না আর। তিনি যেন বুদ্ধের মতই ক্ষমাশীল। আরো রাত হলে মহিলাটি শিশুটিকে ফেলে একা পালাতে চান মঠ থেকে। বরফে মোড়া হ্রদের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি পড়ে যান জলের জন্য শিষ্যের খুঁড়ে রাখা গর্তে।
সকাল হয়। শিশুটি মঠের ভিতর থেকে বেরিয়ে পড়ে হামাগুড়ি দিয়ে। বরফের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে এগিয়ে যায় সেই গর্তের দিকে। শিষ্য তার কান্না শুনতে পেয়ে ছুটে আসেন। বাচ্চাটিকে তুলে নেন। দেখা যায় বরফের বুদ্ধমূর্তি ঝরণার জলের ভিতর গলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। বুদ্ধ যেন লীন হচ্ছেন প্রকৃতিতে। কিংবা হয়ত গুরুর ত্রিনয়নের আর প্রয়োজন নেই শিষ্যের। সেই বোধিস্বত্ত্ব থেকে ক্রমে বুদ্ধ হয়ে ওঠার পথে।
জমাট বাঁধা হ্রদের নিচে ভাসমান মায়ের দেহ। শিষ্য তাকে তুলে আনেন। বরফের উপর। মুখ খোলেন তার। ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজে আবার দেখা যায় মায়ের সেই নীল মুখ ঢাকার কাপড়ের উপর একটা বুদ্ধমূর্তি রাখা। যেন সবই মায়া। সবই বুদ্ধ। কিংবা পাপীর মধ্যেও বুদ্ধ আছেন। এই নারীও যেন অবলোকিতেশ্বর। যিনি শিশু মৈত্রেয়কে পৌঁছে দিয়ে গেলেন।
শিষ্য বার করে আনেন যিনি ভবিষ্যত বুদ্ধ সেই মৈত্রেয়র মূর্তি। এইখানে পরিচালক একটা অসামান্য চিত্রকল্প ব্যবহার করেন। মঠের ভিতর যে তাক খুলে তিনি মৈত্রেয়র মূর্তি বার করে আনেন, তার দরজায় বোধিপ্রাপ্ত বুদ্ধের ছবি। যেন বুদ্ধের মধ্যে মৈত্রেয়র উপস্থিতি।
প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্রের উপর বসে, শিষ্য কোমরে বেঁধে নেন ভাবচক্র। ভাবচক্র হল বৌদ্ধধর্মের সমস্ত নির্যাস সম্পন্ন এক চক্র। এই ভাবচক্রকে বলা হয় জীবনের চক্র, বা জীবনের সব কিছুই যে আসলে চক্রাকারে ঘটে সেইটা বোঝানোর জন্যই এই চক্র।
কোমরে বাঁধা এই চক্র নিয়ে, খুব কষ্ট করে শিষ্য উঠতে থাকেন পাহাড়ের চূড়ায়। বারবার পড়ে যান তিনি। তার এই ওঠার মাঝে ইন্টেলেকচুয়াল মন্তাজে ব্যবহার হয়ে স্প্রিং-এর সেই পাথর বাঁধা মাছ, ব্যাঙ আর সাপের দৃশ্য। আমরা বুঝতে পারি জীবনের চক্রাকার পুনরাবৃত্তি। আর এই বোধের মধ্যে দিয়েই যেন বোধিস্বত্ত্ব থেকে থেকে বুদ্ধ হয়ে ওঠেন শিষ্য। পাহাড় চুড়ায় তিনি বসিয়ে দেন মৈত্রেয়র মূর্তি। আর পাহাড়ের উপর থেকে তিনি দেখতে পান অনেক দূরে অনেক পাহাড়ের ঠিক মধ্যিখানে চক্রবত একটু হ্রদ আর তার মাঝে মঠটা। কোরিয়ান ট্র্যাডিশনাল গান Jeongseon Arirang-এর ব্যবহার এই উপরে ওঠার সিকোয়েন্সটার অনন্যতাকে যেন আরো বেশী করে ডাইমেনশন দেয়।
এইখানেই শেষ হয় শীত। জীবনের পর্যায় শেষ হয় যেন। জীবন থেকে পুনরজীবন। বোধিস্বত্ত্বের বার বার জন্ম নেওয়া এবং অন্য সমস্ত প্রাণীর সাথে সাথেই নির্বাণ প্রাপ্ত হয়ে বুদ্ধ হয়ে ওঠার পর্যায়।

পুব্বেনিবাসং যো বেদী সগ্‌গাপায়ঞ্চ পস্‌সতি।
অথো জাতিক্‌খয়ং পত্তো অভিঞ্‌ঞাবোসিতো মুনি।
সব্‌ববোসিতবোসানং তমহং ব্রূমি ব্রাহ্মণং।।

যিনি পূর্বজন্মকে জানেন, স্বর্গ ও নরককে জানেন, যাঁর পূর্বজন্ম ক্ষীণ হয়ে গেছে, যার অভিজ্ঞা পূর্ণ হয়ে গেছে, যিনি নিজের সব কাজ সমাপ্ত করেছেন, তাঁকে আমি ব্রাহ্মণ বলি (ধম্মপদ)।

অ্যান্ড স্প্রিং – এবং বসন্ত

আবার বসন্ত ফিরে আসে। শিষ্য এখন গুরু। আর বাচ্চাটি এখন তার নতুন শিষ্য। এই নতুন শিষ্যের ভূমিকায় আমরা দেখি স্প্রিং-এর শিষ্যের ভূমিকার সেই একই অভিনেতা ঝং হো কিমকেই। এই শিশুটি প্রথমে অত্যাচার করে একটি কচ্ছপকে। কচ্ছপ আসলে পুনরাবৃত্তির প্রতীক। এই শিশুটিকেও আমরা দেখতে পাই তার গুরুর মতই একটা মাছ, ব্যাঙ আর সাপের উপর অত্যাচার করতে। শুধু বাঁধার বদলে সে এদের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয় পাথরগুলো। আর অনেক উপর থেকে যেন সেইটাই দেখে যান মৈত্রেয়। তিনি পরবর্তী বুদ্ধ। তিনি আসবেন একদিন এই হিংসা দ্বেষ ভরা পৃথিবী থেকে মানুষকে মুক্ত করতে। ততক্ষণ ধরে আবর্তিত হবে এই চক্র।

অত্তা হ অত্তনো নাথো কো হি নাথো পরো সিয়া।
অত্তনাব সুদন্তেন নাথং লভতি দুল্লভং।।

মানুষ নিজেই নিজের প্রভু, অন্য কে তার প্রভু হতে পারে? নিজেকে দমনকারী সেই দুর্লভ প্রভূত্বরূপী নির্বাণকে লাভ করে।

কিম কি দুকের সাক্ষ্যাৎকার – লিন্ডা লিন, TheMovieInsider.com
ধম্মপদ, ওয়াংচুক দোরজি নেগি, রামকৃষ্ণ দাস, পরশপাথর প্রকাশনী

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (3)
  • comment-avatar
    Debalina Chakravarty 9 months

    চলচ্চিত্রটি দেখার পর এমন পর্যালোচনা মুগ্ধ করলো

  • comment-avatar
    saswati basu 3 months

    রিভিউটি পড়ার পর চলচ্চিত্রটি দেখলাম। অসাধারণ লাগলো এই রিভিউটি। প্রতিটি দৃশ্যের এরকম ব্যাখ্যা আমি খুব কম রিভিউতে পেয়েছি। সমৃদ্ধ হলাম।

  • comment-avatar
    কৌস্তভ রায় 2 months

    সিনেমা নিয়ে কিছু লিখতে গেলে শমীক ঘোষের এই লেখাটা পড়ি। সিনেমা দেখা, পড়া, লেখা – শেখার চেষ্টা করি। সিনেমাটা ক্লাসিক। কেন, সেটা বুঝিয়ে দেয় এই লেখাটা। ক্লাসিক সিনেমা নিয়ে এইরকম লেখা আরো প্রকাশিত হলে সিনেমা দেখার চোখ খুলবে আমাদের।