মহাশ্বেতা দেবী ও তাঁর আখ্যান <br />  রাহুল দাশগুপ্ত

মহাশ্বেতা দেবী ও তাঁর আখ্যান
রাহুল দাশগুপ্ত

"রবীন্দ্রনাথের পর ভারতীয়দের মধ্যে শ্রীঅরবিন্দ এবং মহাশ্বেতা দেবীই নোবেল পুরস্কারের সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিলেন। সবচেয়ে বেশিবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু দুজনের কেউ-ই শেষপর্যন্ত জয়ী হননি। শ্রীঅরবিন্দ এক সময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, হিংসার রাজনীতি করেছেন, তাই ‘সাবিত্রী'র মতো বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য লিখেও তিনি নোবেল পাননি। মহাশ্বেতা হাতে বোমাবন্দুক নেননি ঠিকই, কিন্তু চারণকবির মতো ঘুরে ঘুরে সারা জীবন ধরে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যারা বোমা-বন্দুক হাতে নিয়েছে, তাদের জয়গাথা গেয়েছেন, সেকথা স্বীকার না করে উপায় নেই। সেই অর্থে শ্রীঅরবিন্দের মতোই তিনি আজন্ম বিপ্লবী, আদর্শবাদী ও প্রতিবাদী। মুশকিল হলো, তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ের লেখক, ভারতীয় রাজনীতি যখন ঔপনিবেশিকতার প্রত্যক্ষ অবসানের পর গোটা বিশ্বে, বিশেষ করে পশ্চিমী দুনিয়ার কাছে, প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। তাছাড়া তিনি লিখেছেন ভারতীয় আদিবাসীদের নিয়ে, তাদের শোষণ ও বঞ্চনা নিয়ে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে। এ সেই ক্ষমতা, পশ্চিমী দুনিয়া যাদের পৃষ্ঠপোষক। এই আদিবাসীরা তাদের অস্তিত্ব ও লড়াই নিয়ে, পশ্চিমী দুনিয়ার চোখে, তাদের রাজনৈতিক লেনদেনের মানচিত্রে, শুধু প্রান্তিক, অপাংক্তেয় বা অপ্রাসঙ্গিকই নয়, সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীনও বটে। মহাশ্বেতার রচনার তাই মানবিকতার ইতিহাসে যে মূল্যই ধার্য হয়ে থাক, সংস্কৃতিকে রাজনীতির দাবাখেলায় ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে, তিনি পশ্চিমী দুনিয়ার হিসাবের বাইরেই থেকে যান। টনি মরিসন হিসাবে আসেন, কারণ কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও তিনি আমেরিকার মানুষ এবং বর্ণবৈষম্য ও নারী স্বাধীনতাকে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমী দুনিয়ায় যে দুটি বহু আলোচিত বিষয়।"

নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কিছু শর্ত আছে। সেইসব লেখককেই এই পুরস্কার দেওয়া হয় যাদের লেখা বইপত্রে এমন কিছু ইস্যু আছে, যাদের আন্তর্জান্তিক স্তরে গুরুত্ব আছে। অন্তত পশ্চিমী জগৎ যে সব ইস্যুকে সাম্প্রতিককালে তাদের নিজেদের অস্তিত্বের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লেখালেখি। তা হলোকস্টের স্বৈরাচার হতে পারে, আবার কমিউনিস্ট স্বৈরাচারও হতে পারে। প্রথমটি নিয়ে লিখে নোবেল পেয়েছেন ইমরে কারতেজ বা প্যাট্রিক মোদিয়ানোর মতো লেখক, দ্বিতীয়টি প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, হের্টা মুলার বা শ্বেতলানা আলেক্সিয়েভিচের নাম। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লেখালেখি আরেকটি উদাহরণ। তবে এ সব ক্ষেত্রে নোবেল কমিটি শ্বেতাঙ্গ লেখকদেরই বেশি পছন্দ করেন। যেমন, ডরিস লেসিং বা জে এম কোয়েৎজি। অনেক বেশি শক্তিশালী লেখক হয়েও উপেক্ষিত থাকেন এনগুগি ওয়া থিয়োংগোর মতো মহৎ লেখক। একমাত্র ব্যতিক্রম বোধহয়, টনি মরিসন। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ। তবু তিনি পেলেন কেন? আমেরিকা বলেই হয়তো। আফ্রিকা হলে হতো না। আমেরিকার একটা মানবিক মুখের দরকার। গোটা পশ্চিমী দুনিয়ার একটা মানবিক মুখের দরকার। যাতে গোটা বিশ্বে তারা যে অন্যায় করে চলেছে, তাদের আড়াল করা যায়। তাই এই ইস্যুভিত্তিক পুরস্কারের ব্যবস্থা। এই কারণেই বব ডিলান সাহিত্যে নোবেল পান।

এ প্রসঙ্গে আরো কিছু উদাহরণ দেওয়া যায়। টমাস বার্নহার্ডকে টপকে পুরস্কার পান এলফ্রেড জেলিনেক। তিনি যৌনতা ও শ্রমের ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীনতার কথা বলেন। এটা এখন পশ্চিমী দুনিয়ার একটা প্রিয় বিষয়। কিন্তু জেলিনেক যে পুরস্কার পান, সিমোন দ্য বোভয়া সেই একই বিষয় নিয়ে বিশ্বমানের কৃতিত্ব দেখিয়েও বঞ্চিত থাকেন কেন? তিনি সাম্যবাদের সমর্থক এবং পশ্চিমী অবিচারের কড়া সমালোচক বলে? কেনজাবুরো ওয়ে, মো ইয়ান বা মারিও ভার্গাস লোসা এই পুরস্কার পান কেন? লোসা পুঁজিবাদ ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের সমর্থক। ওয়ে আর মো, জাপান ও চিনের লেখক, যে দু’টি দেশ পশ্চিমী দুনিয়ার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, এশিয়ার সেই দুটি দেশ, যাদের পশ্চিমী দুনিয়া সমীহ করে এবং স্বীকৃতি দিতে চায়। অর্থাৎ নোবেল পুরস্কারের পিছনে সবসময়ই একটা রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করে। আর এই সমীকরণটি থেকে বাদ পড়ে যান বলেই, মহাশ্বেতা দেবীর ভাগ্যেও নোবেল পুরস্কার জোটে না। না হলে গত কয়েক দশকে গোটা বিশ্বে নারী আখ্যানকারদের মধ্যে টনি মরিসন বা নাদিনে গার্ডিমারের মতো লেখক ছাড়া আর কেউই তাঁর সঙ্গে তুলনায় আসেন না। তিনি ডরিস লেসিং, এডফ্রেড জেলিনেক বা হের্টা মুলারের চেয়ে তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী লেখক। তাঁর কাজের ব্যাপ্তিও এদের চেয়ে অনেক বেশি। তবু কেন?

রবীন্দ্রনাথের পর ভারতীয়দের মধ্যে শ্রীঅরবিন্দ এবং মহাশ্বেতা দেবীই নোবেল পুরস্কারের সবচেয়ে কাছাকাছি এসেছিলেন। সবচেয়ে বেশিবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু দুজনের কেউ-ই শেষপর্যন্ত জয়ী হননি। শ্রীঅরবিন্দ এক সময় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন, হিংসার রাজনীতি করেছেন, তাই ‘সাবিত্রী’র মতো বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য লিখেও তিনি নোবেল পাননি। মহাশ্বেতা হাতে বোমাবন্দুক নেননি ঠিকই, কিন্তু চারণকবির মতো ঘুরে ঘুরে সারা জীবন ধরে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যারা বোমা-বন্দুক হাতে নিয়েছে, তাদের জয়গাথা গেয়েছেন, সেকথা স্বীকার না করে উপায় নেই। সেই অর্থে শ্রীঅরবিন্দের মতোই তিনি আজন্ম বিপ্লবী, আদর্শবাদী ও প্রতিবাদী। মুশকিল হলো, তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ের লেখক, ভারতীয় রাজনীতি যখন ঔপনিবেশিকতার প্রত্যক্ষ অবসানের পর গোটা বিশ্বে, বিশেষ করে পশ্চিমী দুনিয়ার কাছে, প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। তাছাড়া তিনি লিখেছেন ভারতীয় আদিবাসীদের নিয়ে, তাদের শোষণ ও বঞ্চনা নিয়ে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে। এ সেই ক্ষমতা, পশ্চিমী দুনিয়া যাদের পৃষ্ঠপোষক। এই আদিবাসীরা তাদের অস্তিত্ব ও লড়াই নিয়ে, পশ্চিমী দুনিয়ার চোখে, তাদের রাজনৈতিক লেনদেনের মানচিত্রে, শুধু প্রান্তিক, অপাংক্তেয় বা অপ্রাসঙ্গিকই নয়, সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীনও বটে। মহাশ্বেতার রচনার তাই মানবিকতার ইতিহাসে যে মূল্যই ধার্য হয়ে থাক, সংস্কৃতিকে রাজনীতির দাবাখেলায় ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে, তিনি পশ্চিমী দুনিয়ার হিসাবের বাইরেই থেকে যান। টনি মরিসন হিসাবে আসেন, কারণ কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও তিনি আমেরিকার মানুষ এবং বর্ণবৈষম্য ও নারী স্বাধীনতাকে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন, পশ্চিমী দুনিয়ায় যে দুটি বহু আলোচিত বিষয়।

একটা নোবেল প্রাইজ মানে বিপুল অর্থের বিনিয়োগ। পশ্চিমী দুনিয়া এমনি এমনি এই বিনিয়োগ করে না। শুধু শুধু একজন লেখককে এই দুনিয়াব্যাপী বিপুল প্রচার ও প্রতিষ্ঠা দেয় না। বিনিময়ে এইসব লেখায় সে পায় নিজের পক্ষে অনুকূল ভাবাদর্শের বিপুল সমর্থন। ফলে যে অর্থ বিনিয়োগ করা হয় তা বহুগুণ হয়ে ফিরে আসে পশ্চিমী দুনিয়ায়। এই কারণে যে লেখকের তেমন জনপ্রিয়তা নেই, তাকে সেভাবে গ্রাহ্য করা হয় না। জনপ্রিয়তা অর্থাৎ পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও এই পুরস্কারের একটা অন্যতম শর্ত। রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে, সেই সময় পশ্চিমের হিংসার বাজারে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার বিপুল চাহিদা ছিল। রবীন্দ্রনাথকে একজন অতীন্দ্রিয় কবি হিসাবেই গ্রহণ করা হয়েছিল এবং সেই অতীন্দ্রিয়তাকে মনে করা হয়েছিল পশ্চিমী হিংসার সময়োচিত প্রতিষেধক। শ্রীঅরবিন্দের ‘সাবিত্রী’ যখন রচিত হয়, তখন সেই বাজার আর ছিল না। পশ্চিমের সংস্কৃতির বাজারে তখন রাজত্ব করছে জ্যঁ পল সার্তের অস্তিত্ববাদ। তাছাড়া শ্রীঅরবিন্দ মোটেই রাজনীতি বা সাহিত্যের বাজারে সেইসময় জনপ্রিয় ছিলেন না। উইনস্টন চার্চিল সাহিত্যে নোবেল পান যুগপৎ এই দুটি কারণেই। তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে ঘোর সাম্রাজ্যবাদী এবং সেই কারণেই পশ্চিমী দুনিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন মানুষ। আবার নোবেল কমিটির বিবেচনায় মুসলিম লেখকেরা সেভাবে আসেন না, কারণ মুসলিম দুনিয়ার সঙ্গে পশ্চিমের শ্বেতাঙ্গ দুনিয়ার প্রতিযোগিতার সম্পর্ক।

মহাশ্বেতা দেবী নোবেল পাননি, তিনি লেখক হিসাবে খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না অর্থাৎ ভারতীয় পাঠকের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা সেভাবে ছিল না। তিনি সারাজীবন ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজের পরিকাঠামোয় ক্ষমতা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। শোষিত মানুষের ন্যায্য অধিকার ও তাদের প্রতি সমস্ত অবিচারের প্রতিকারের দাবি জানিয়েছেন। বিখ্যাত চিন্তাবিদ গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক মনে করেছিলেন, মহাশ্বেতার অবশ্যই নোবেল পাওয়া উচিত। তিনি জ্যাক দেরিদার রচনা এবং মহাশ্বেতা দেবীর রচনা নিয়ে সমান আগ্রহ দেখিয়েছেন, সমান গুরুত্ব দিয়েছেন, সমান মনোযোগ দিয়েছেন। দেরিদা এ যুগের ‘আরিস্ততল’, পশ্চিমী দুনিয়ার সর্বজনমান্য চিন্তাবিদ। গোটা বিশ্বের নিরিখে মহাশ্বেতারও আখ্যানকার হিসাবে বিপুল গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। তিনি বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় লেখক। গোটা বিশ্বে বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মহিলাদের মধ্যে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় লেখক কমই জন্মেছেন। তিনি ভার্জিনিয়া উলফ নন, বরং সিমোন দ্য বোভয়া বা আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকার কোনও কোনও মহিলা লেখকের সঙ্গে তাঁর তুলনা হতে পারে। যেমন, নাদিনে গার্ডিমার বা ক্লারিস লিসপেক্টর, বুচি এমেচেটা বা আসিয়া জেবর। কিন্তু মহাশ্বেতার কাজ এদের চেয়ে আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত। তিনি অনেক বেশি লিখেছেন, তাঁর ভালো লেখার সংখ্যাও প্রচুর, জ্যঁ পল সার্তের মতোই তিনি আপোশহীন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভে এবং সুবিচারের দাবি-দাওয়ায় অক্লান্ত, একজন পুরোদস্তুর রাজনৈতিক লেখক।

প্রশ্ন হলো, তিনি কাদের পক্ষে এবং কাদের বিপক্ষে বলেছেন? তিনটি উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করা যাক। মহাশ্বেতা এই তিনটিকেই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ বলেছেন। এই তিনটি উপন্যাস হলো, ‘কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’, ‘চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তির’ এবং ‘টেরোড্যাকটিল, পূরণ সহায় ও পিরথা’। ‘কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু’ শুরু হয় এক মহাদুর্যোগের রাতে। এই উপন্যাসের সূচনা আমাদের আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’ সিনেমাটির কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। কবি বন্দ্যঘাটীর জীবনের মূল ট্র্যাজেডি কী? তিনি ছিলেন একজন আদিবাসী মানুষ, অরণ্যের মানুষ, চুয়াড় যুবক। কিন্তু নিজের এই আত্মপরিচয়কে তিনি ঘৃণা করতেন। চুয়াড়দের জীবনযাপন, তাদের গাত্রবর্ণ, তাদের খাদ্য, তাদের কৃষ্টি, তাদের কিংবদন্তি, তাদের দেবতা, সবকিছুই তাঁর কাছে নিকৃষ্ট বলে মনে হতো। চুয়াড় রমণীর প্রেম, চুয়াড়দের স্নেহ-ভালোবাসা এবং অরণ্য-জীবনকে পরিত্যাগ করে তিনি চলে এসেছিলেন প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতির আশায়, ভীমাদল নগরে। উচ্চবর্ণের খাদ্য, কৃষ্টি, দেবতা ও যাপনকে তিনি সাগ্রহে আত্মস্থ করেছিলেন। নিজের আত্মপরিচয় বর্জন করে এভাবেই এক নতুন আত্মপরিচয়কে তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। পেয়েছিলেন নতুন প্রেম। অর্জন করেছিলেন প্রতিষ্ঠা, খ্যাতি ও আস্থা। নিজেকে তিনি সন্দেহাতীত করে তুলেছিলেন। মানুষকে ও জীবনকে ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন। প্রেম ও যশ তাঁকে বিভ্রান্ত করেছিল। জনতার চরিত্র, মানুষের প্রকৃতিকে তিনি বুঝতে পারেননি। কিন্তু ধবংস ও মৃত্যু তার জন্য যেন ওঁত পেতে ছিল। নিজের প্রকৃত শেকড়কে ত্যাগ করে নতুন শেকড়ের সঙ্গে নিজেকে তিনি জুড়তে চেয়েছিলেন। লিখেছিলেন, ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্য। তাতে ছিল নগরের রাজার প্রশস্তি।
কিন্তু পুরানো পরিচয় এসে একেবারে মোক্ষম মুহূর্তে নিজের অধিকার দাবি করল। চুয়াররা দাবি করল, কবি আসলে চুয়ার। কবি সেই অধিকারকে অস্বীকার করতে পারলেন না। ফলে নতুন পরিচয় নিজের দাবি ফিরিয়ে নিল। কবি শুধু প্রত্যাখ্যাতই হলেন না, তাঁর জন্য নির্দিষ্ট হলো মৃত্যু, অর্থাৎ চূড়ান্ত বহিষ্কার। তাকে মুছে দিতে প্রস্তুত হলো ক্ষমতা-ব্যবস্থা। নগরের চোখে তিনি হয়ে গেলেন বহিরাগত। প্রতারক ও মিথ্যেবাদী। নিজের প্রকৃত পরিচয়কে আড়াল করে এবং মিথ্যে পরিচয়কে বহন করে সমাজের শ্রেণীসজ্জায় যে নিজের উত্তরণ চেয়েছিল। নগর এই স্পর্ধাকে প্রত্যাখ্যান করল। অরণ্যকে তিনি নিজেই প্রত্যাখ্যান করে এসেছিলেন। অরণ্যের কাছে তিনি আগেই হয়ে গেছিলেন বহিরাগত। নিজের পরিচয়ের প্রতি এই অকৃতজ্ঞতা দেখে চুয়াড়রাও তাকে প্রত্যাখ্যান করল। কবি কারও কাছেই আপন হতে পারলেন না। উভয়পক্ষেই তিনি নিজের প্রাসঙ্গিকতা হারালেন এবং নিশ্চিহ্ন হওয়া ছাড়া অন্য কোনও পরিণাম আর রইল না। উচ্চবর্ণ দেখল শুধু স্পর্ধা, আর নিম্নবর্ণ দেখল শুধু অবজ্ঞা। কবি কারও সমান হতে পারলেন না। কারও কাছের হতে পারলেন না। তাঁর প্রতিভার কথা কেউ ভাবল না। সর্বস্তরে শুধু জুটতে লাগল প্রত্যাখ্যান। মানুষের নির্বুদ্ধিতা দেখে কবি হতবাক হয়ে গেলেন। এদের ভালোবেসেছিলেন বলে তাঁর অনুশোচনা হল।

তিনি পালাতে শুরু করলেন। এই উপন্যাসের শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠায় রয়েছে সেই মৃত্যুযন্ত্রণার বর্ণনা। কবি মৃত্যুভয়ে পালাচ্ছেন। মৃত্যু নানা ছলনায় তাঁর সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে। চূয়াড় জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা মিথ তাঁর চোখে বিভ্রমের সৃষ্টি করছে। কবি পালকাপ্য মুনিকে দেখতে পেলেন। চুয়াড়দের আদিপুরুষ, হাতিদের রক্ষাকর্তা। এই মুনিও তো আসলে মৃত্যুর ইশারা, অরণ্য ত্যাগ করে আসে যে চুয়াড়, তার মৃত্যু হয় হাতির হাতে। মুনি তো সেই হাতিদেরই রক্ষাকর্তা! কবি তো কাব্য লেখার সময় পালকাপ্য মুনির কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছিলেন। এই বিস্মৃতিই কী আসলে মৃত্যু? যেদিন তিনি নিজের আত্মপরিচয় ত্যাগ করে এসেছিলেন, সেদিন থেকেই আসলে তিনি নিজের ভেতরে মৃত্যুর বীজ বহন করছিলেন। কবি অরণ্যকে ছেড়ে এসেছিলেন, নগরকেও ছেড়ে এসেছেন, কিন্তু মৃত্যুকে তিনি এড়াবেন কী করে? গোড়া থেকেই তিনি যেন মৃত্যুর জন্য নির্বাচিত হয়ে আছেন। মৃত্যুর হাত থেকে তার কোনও রেহাই নেই। অরণ্যকে তিনি ত্যাগ করে এসেছিলেন। নগরের আরাম-আয়েসে তিনি অভ্যস্থ হয়ে উঠেছেন। অরণ্যও তাই তাঁকে ত্যাগ করেছে। অরণ্য তাঁর চোখে অচেনা হয়ে উঠেছে। এটাও কী মৃত্যুর ইশারা নয়? কবির এই মৃত্যু আমাদের গার্সিয়া মার্কেজের ‘ক্রনিকল অফ আ ডেথ ফোরটোল্ড’ উপন্যাসটির কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। এই উপন্যাসেও সান্তিয়াগো নাসার গোড়া থেকেই জানতেন মৃত্যু তাঁর জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে। দুটি উপন্যাসেই মৃত্যু যেন পূর্বনির্ধারিত। মৃত্যুই নিয়তি, মৃত্যু-তাড়িত কবির তাই কোনও পরিত্রাণ নেই।

প্রকৃত অর্থে কবির এই মৃত্যু কিন্তু যুগপৎ সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। রামায়ণে শঙ্কুকের কেন মৃত্যু হয়েছিল ? মহাভারতে একলব্যকে কেন নিজের বুড়ো আঙুল বিসর্জন দিতে হয়েছিল? স্তঁধলের বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘দি রেড অ্যাণ্ড দি ব্ল্যাক’য়ে কেন জুলিয়ঁ সোরেলকে অভিজাতদের ষড়যন্ত্রে নিহত হতে হয়? কারণ, এরা সকলেই স্পর্ধা ও উচ্চাকাঙ্খা দেখিয়েছিল। নিজেদের অস্পৃশ্যতায় এরা কেউ সুখী ছিল না। এদের ভেতরেই ছিল বড়ো হওয়ার প্রেরণা। কবি সেই প্রেরণায় নগরে এসেছিলেন, শিক্ষিত হতে চেয়েছিলেন, পুঁথিপাঠ করতে চেয়েছিলেন, মুকুন্দরাম বা কৃষ্ণদাস কবিরাজের মতো অমর কাব্য সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। তিনি কারও ক্ষতি করেননি, শুধু নিজের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে চেয়েছিলেন। নিজের জীবন দিয়ে এই বড়ো হতে চাওয়ার খেসারত দিতে হয়েছিল তাঁকে। শম্বুক, একলব্য বা জুলিয়ঁর মতোই। একজন প্রান্তিক মানুষের উপরে উঠতে চাওয়ার, সমান হতে হাওয়ার উচ্চাকাঙ্খাকে ক্ষমতা কখনই মেনে নেয় না। প্রান্তিককে প্রান্তে রেখেই সে নিজের স্থিতাবস্থাকে বজায় রাখে। কিন্তু কবিও কী অপরাধ করেননি? নিজের স্বজাতির প্রতি, নিজের ঐতিহ্যের প্রতি, শেকড়ের প্রতি তিনি কী সুবিচার করেছেন? তিনি যাকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন, ছায়ার মতো সে তাকে অনুসরণ করে গেছে এবং শেষপর্যন্ত তাঁর প্রকৃত ঘাতক হয়ে উঠেছে। এই ঘাতকটি হলো কবির আত্মপরিচয়। এই আত্মপরিচয়ের কাছেই কবি শেষপর্যন্ত পরিত্রাণের জন্য ছুটে গেছেন, কিন্তু পরিত্রাণের বদলে প্রত্যাখ্যানই পেয়েছেন, যে প্রত্যাখ্যানের সূচনা করেছিলেন তিনি নিজেই। উত্তর-ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় মানুষের আত্ম-পরিচয় বিপন্ন। কিন্তু এই আত্মপরিচয়কে হারালে মানুষের আত্মিক মৃত্যু নিশ্চিত, কারণ তখন সে তার নিজের সবচেয়ে বড়ো অবলম্বনটিকেই হারায় এবং যশ-খ্যাতির আড়ালে ক্রমে আসলে নিঃস্ব ও নিরাশ্রিত হতে থাকে।

‘চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর’ মহাশ্বেতার সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস। সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের চিরশ্রেষ্ঠ দশটি উপন্যাসের একটি এই বইটি। গায়ত্রী স্পিভাক এই উপন্যাসটিরই অতি যত্নে ইংরাজি অনুবাদ করেছেন ও দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন। ঠিক যে যত্ন নিয়ে তিনি জ্যাক দেরিদার ‘অফ গ্রামাটোলজি’র মতো যুগান্তকারী বইটির ভাষান্তর করেছেন ও দীর্ঘ ভূমিকা লিখেছেন! বিশ শতকের আদিবাসী জীবনের দীর্ঘ সত্তর বছরের ইতিহাস ধরা রয়েছে এই মহাকাব্যে। স্বাধীনতার আগের চল্লিশ বছর এবং স্বাধীনতার পরের ত্রিশ বছর। এই কাহিনির কেন্দ্রে আছেন, চোট্টি মুণ্ডা। চোট্টি কোনও মানুষ নন। তিনি কোনও ব্যক্তি নন। তিনি একটি মিথ। তিনি একটি কিংবদন্তী। তিনি একটা স্বপ্ন। আদিবাসীরা যে মুক্তির স্বপ্ন দেখে, তিনি সেই স্বপ্নের রক্তমাংসের বিগ্রহ। তাই চোট্টি মুণ্ডার জীবনে সবই গল্পকথায় পরিণত হয়। চোট্টি কিন্তু কোনও বিপ্লব বা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেননি, সিধু-কানু বা বীরসা মুণ্ডার মতো। কিন্তু মুণ্ডাদের জীবনে এই চরিত্রটির ভূমিকা তাঁদের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। এই চরিত্রটি শান্ত হলেও চতুর, সহিষ্ণু হলেও সুকৌশলী, বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। তিনি যেন আদিবাসীদের আত্মমর্যাদাবোধের প্রতীক।

এটাকেই গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা। ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো আদিবাসীদের মনুষ্যেতর জীব হিসাবে দেখতে চেয়েছে। কিন্তু চোট্টি বারবার তাদের ভুল প্রমাণ করেছেন। নিজের জীবন দিয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, আদিবাসীদের আত্মমর্যাদাবোধ কারও চেয়ে কম নয়। তাদের মধ্যেও মহৎ মানুষের জন্ম হয়। গুণময় মান্না ‘লখিন্দর দিগার’ বলে একটি অতি উচ্চমানের উপন্যাসে একজন নিম্নবর্গীয়, সহিষ্ণু কৃষকের ছবি এঁকেছেন। এই কৃষকের ত্যাগ, সহিষ্ণুতা ও আত্মমর্যাদাবোধ অতুলনীয়। তদুপরি তার রয়েছে একটি মহৎ হৃদয়, যেন সে এক খ্রিষ্ট চরিত্র। বাংলা তথা ভারতীয় আখ্যানে চোট্টি যেন এই লখিন্দরেরই পরিণত রূপ। যদিও পরিত্রাতা হিসাবে খ্রিষ্টের চেয়ে কৃষ্ণের সঙ্গেই তাঁর মিল হয়তো বেশি।

চোট্টি মুণ্ডার সঙ্গে যে মিথটি অবিচ্ছিন্ন হয়ে আছে, সেটি হলো তাঁর তীর কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। এই ব্যাপারটা প্রতীকী। আদিবাসী জীবনে নানা স্তরে, নানা কৌশলে শোষণ চলতে থাকে। কেউ তাদের মানুষ বলে মনে করে না। সবাই চায় তাদের জীবনে দারিদ্র্য, বঞ্চনা, অনাহার ও অবিচার অব্যাহত থাকুক। ঔপনিবেশিক আমলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগী দেশের সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী শক্তি আদিবাসীদের শোষণ করেছে। স্বাধীনতার পর উত্তর-ঔপনিবেশিক জমানায় শোষণ ও অত্যাচারের কৌশল বদলে গেছে। নতুন শাসকেরা স্বদেশী হলেও শ্রেণীবৈষম্য, জাতবৈষম্য এবং অস্পৃশ্যতা জিইয়ে রাখার ক্ষেত্রে একই নীতির পক্ষপাতী। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ক্ষমতা-ব্যবস্থার কাছ থেকে আদিবাসীরা কোনও সমর্থন পায় না, তাই দেশের ভেতরে থেকেও তারা সম্পূর্ণ অরক্ষিত।
তাই তাদের নিজেদের ভেতর থেকেই একটা প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এই ব্যবস্থা আসলে একটি মিথ। চোট্টি মুণ্ডার মিথ। চোট্টি হিংসা চান না। তিনি আগ্রাসন চান না। কিন্তু আগ্রাসন হলে তিনি পরিত্রাতা হয়ে ওঠেন। কখনও বুদ্ধি দিয়ে, কখনও চাতুর্য দিয়ে, কখনও বিচক্ষণতা দিয়ে, কখনও দূরদর্শীতা দিয়ে তিনি আদিবাসীদের রক্ষা করেন। কখনও তাঁকে কিছুই করতে হয় না। শুধু তাঁর নামেই কাজ চলে যায়। স্বাধীনতার পর স্বাধীন দেশে মাস্তানরাজ ও পেশীশক্তি প্রবল হয়ে ওঠে। আদিবাসীদের স্বার্থের কথা কেউ ভাবে না। সবাই শুধু নিজেদের লাভ, স্বার্থ ও মুনাফা দেখে। কিন্তু মুণ্ডাদের রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন চোট্টি। নিজের জীবন দিয়ে, ত্যাগ দিয়ে তিনি শেষবারের মতো বাঁচিয়ে যান মুণ্ডা সমাজকে। তাঁর মৃত্যু হয় না, মিথের সঙ্গে মিথ জুড়ে শুধু এক অনিঃশেষ গল্পকথা রচিত হয়ে চলে…

বিশ শতকে কোনও দেশের কোনও ভাষায় কোনও মহিলা ঔপন্যাসিক এরকম অগ্নিবর্ষী ভাষায় শোষিত ও প্রান্তিক মানুষের স্বপক্ষে কলম ধরেছেন কী না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়। এরকম তীব্র ঝাঁঝের রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন কী না, সেটাও প্রশ্ন। এই উপন্যাসে সময়ের একের পর এক পর্যায়ে, নানা কৌশলে, কীভাবে ক্ষমতা-ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তর আদিবাসীদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালায়, তার বর্ণনা দিয়েছেন মহাশ্বেতা। সেই কবে আমেরিকায় কালো মানুষদের দুঃখের কাহিনি লিখেছিলেন একজন মহিলা আখ্যানকার, হ্যারিয়েট বিচার স্টো, ‘আঙ্কল টমস কেবিন’ উপন্যাসে। গোটা দুনিয়া সেই ভয়াবহ কাহিনি পাঠ করে কেঁপে উঠেছিল। চোট্টি মুণ্ডা যেন সেই আঙ্কল টমেরই উত্তরপুরুষ। এবং হাওয়ার্ড ফাস্টের ‘স্পার্টাকাস’ উপন্যাসের সমসাময়িক। যদিও মহাশ্বেতার কাহিনি তুলনায় অনেক বেশি জটিল এবং উৎকৃষ্ট। এটি কোনও সরলরৈখিক কাহিনি নয়। প্রচণ্ড রাগে তিনি ফেটে পড়তে চেয়েছেন কখনও, কখনও নিজেকে সংযত করেছেন, রাশ টেনে ধরেছেন নিজের আগুনে ভাষার ও বর্ণনার, কিন্তু মোটের ওপর তিনি সভ্য সমাজ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের মুখোশ খুলে দিতে চেয়েছেন, তাদের আসল ও প্রতারক মুখটিকে দেখিয়ে চমকে দিতে চেয়েছেন পাঠক-সমাজকে। আমেরিকার কৃষাঙ্গ মানুষদের মতোই অথবা লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার আদিবাসীদের মতোই ভারতের আদিবাসী সমাজ কীভাবে সভ্যতার নামে প্রতিনিয়ত ক্ষমতার হাতে ধর্ষিত হয়ে চলেছে, সে ব্যাপারে গোটা দুনিয়ার কাছে মানবিক আবেদন রাখতে চেয়েছেন তিনি।

কখনও এই আপোশহীন মনোভাবের জন্য মহাশ্বেতাকে এমিল জোলার সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছা করে। জোলার মতোই তিনি একজন তীব্র সমাজ ও রাজনীতি সচেতন লেখক। গভীরভাবে নিজের বাস্তবতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু মহাশ্বেতা জোলার মতো বাস্তববাদী লেখক নন। বরং ফ্রানৎস কাফকার মতোই তিনি যেন প্যারাবল ও অ্যালিগরিকে মিশিয়ে দেন। তাই বন্দ্যঘাটী গাঞীর জন্য মৃত্যু নির্ধারিত হয়ে থাকে, চোট্টি মুণ্ডা যা করেন তাই গল্পকথা হয়ে যায় এবং তাঁর তীর হয়ে ওঠে মন্ত্রপূত, বসাই টুডু বারবার মৃত্যুর পরও পুনর্জন্ম লাভ করে, আর ‘টেরোড্যাকটিল, পুরাণ সহায় ও পিরথা’ উপন্যাসে আদিবাসীদের পূর্বপুরুষদের আত্মা টেরোড্যাকটিল হয়ে ফিরে আসে। না, মহাশ্বেতা মোটেই বাস্তববাদী লেখক নন, যদিও বাস্তবতা ছাড়া তাঁর আখ্যানগুলিকে ভাবাই যায় না। জোসেফ কের কেন বিচার হয়? কেন কে দুর্গে পৌঁছতে পারে না? তীব্র সমাজ ও রাজনীতি সচেতন কাফকা যেন পুঁজিবাদী, বুর্জোয়া জীবনের প্রহেলিকাকেই বারবার তুলে ধরেন। এই কুহক মহাশ্বেতার লেখাতেও আছে। বাস্তবতাকে তিনি অনেক সময়ই পরাবাস্তবতার সীমানায় নিয়ে যান। অনায়াসে মিথ ও প্রতীককে ব্যবহার করেন। তিনি একজন উত্তর-ঔপনিবেশিক কথাকার। তাই ইতিহাসের চেয়েও তিনি অতীতকে বেশি খুঁজে ফেরেন লোক-উপাদানে। এ ব্যাপারে এনগুগি ওয়া থিয়োংগো বা চিনুয়া আচেবের কথা মনে পড়তে পারে। যদিও এনগুগি ও আচেবে জিনিয়াস হলেও, মহাশ্বেতার মতো ধাঁধা সৃষ্টি করেন না। বরং নিজেদের ইতিহাসকে একজন সমাজবিজ্ঞানীর মতো স্তরে স্তরে উন্মোচিত করেন।

‘টেরোড্যাকটিল, পুরাণ সহায় ও পিরথা’ উপন্যাসে পূরণ সহায় আদিবাসী সমাজের বাইরের মানুষ। সেই বাইরের মানুষের চোখ দিয়ে মহাশ্বেতা আদিবাসীদের বাস্তবতাকে দেখেছেন। কালী সাঁতরার মতোই। কবি বন্দ্যঘাটী প্রান্তিক সমাজের ভেতরের মানুষ হয়েও সেই সমাজকে প্রত্যাখ্যান করে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। চোট্টি মুণ্ডা এবং বসাই টুডু আদিবাসী সমাজের ভেতরের মানুষ, কিন্তু তাদের মধ্যে তফাৎ আছে। বসাই যেখানে সক্রিয় হিংসায় বিশ্বাসী, চোট্টি সেখানে বাইরে নির্বিবাদী হলেও ভেতরে ভেতরে আদিবাসী সমাজের বিবেক, চিন্তাশীল ও বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। দু’জনে আদিবাসী সমাজের দুভাবে পরিত্রাতা হয়ে উঠেছেন, একজন আত্মরক্ষার কৌশল শিখিয়েছেন, অপরজন প্রতি-আক্রমণের।
পূরণ সহায় কিন্তু বাইরের মানুষ। পুরোপুরি। আদিবাসী সমাজ তাঁর কাছে টেরোড্যাকটিলের মতোই দূরবর্তী। আলাদা এক মহাদেশ। তার নিজের সভ্য মহাদেশের সঙ্গে আদিবাসীদের প্রাগৈতিহাসিক মহাদেশের সেতুবন্ধন ঘটাতে চায় সে। কিন্তু সে কাজ করতে গিয়েই সে বুঝতে পারে, এটা কতটা অসম্ভব। আদিবাসীদের প্রতি তার মতো মানুষ সহানুভূতি বোধ করতে পারে ঠিকই, কিন্তু কোনওদিনই সে তাদের ভেতরের লোক হয়ে উঠতে পারবে না, তাদের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারবে না, যদিও তারা উভয়ে একই রাষ্ট্রব্যবস্থার অংশ। যুগ যুগ ধরে আদিবাসী সমাজের অবচেতনে শোষণ, বঞ্চনা, দারিদ্র্য ও অনাহারের যে অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়ে আছে, সে কখনই তার অংশীদার হয়ে উঠতে পারবে না। এই উপন্যাসে কবি বন্দ্যঘাটীর যেন বিপরীত ভাষ্য লিখতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা। তাঁর ‘ডিসকোর্স’–এর পরিপূরক অংশটি রচনা করতে চেয়েছেন। বন্দ্যঘাটী প্রান্তিক জীবন ছেড়ে কেন্দ্রে আসতে গিয়ে দেখেছিল, সেটা অসম্ভব। পূরণ সহায় কেন্দ্রকে ত্যাগ করে প্রান্তে আসতে গিয়ে দেখল, সেটাও অসম্ভব। কেন্দ্র ও প্রান্তের ইতিহাস আলাদা, অতীত আলাদা, অভিজ্ঞতা আলাদা। পূরণ সহায় তাই বন্দ্যঘাটীর মতোই প্রত্যাখ্যাত হয় এবং আবার নিজের ঘাঁটিতে অর্থাৎ মূল স্রোতে ফিরে আসে। যদিও যে অভিজ্ঞতা সে অর্জন করে, তার মধ্য দিয়ে আবারও সভ্য সমাজের সমস্ত ভণ্ডামি ও প্রতারণাকে উলঙ্গ করে ছাড়েন মহাশ্বেতা। রাষ্ট্র বলতে যা বোঝায় তা যে কতটা গোঁজামিল আর জোড়াতালি দিয়ে তৈরি এক অন্তঃসারশূন্য ব্যবস্থা, তা আমরা টের পাই।

পূরণ সহায় বুঝতে পারে, সভ্য সমাজ ক্রমে কোন বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে আদিবাসী সমাজকে। তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছে, আপোশ ছাড়া গতি নেই, মিশে যেতে হবে মূল স্রোতে, যেখানে তাদের সামাজিক অবস্থান হবে যথারীতি প্রান্তে, নীচের তলায়, এবং তাদের জাতিসত্তার কোনও স্বাতন্ত্র্য থাকবে না। কবি বন্দ্যঘাটী যে অভিশাপের সূচনা করেছিলেন, তারই ফলশ্রুতি যেন দেখতে পায় পূরণ সহায়। তফাত হল, বন্দ্যঘাটী স্বেচ্ছায় নিজের আত্মপরিচয় ছেড়ে এসেছিলেন, আর এখানে আদিবাসী সমাজকে নিজের আত্মপরিচয় ত্যাগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে, যে আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাবোধকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বীরের মতো লড়াই করে গেছেন বীরসা মুণ্ডা, চোট্টি মুণ্ডা বা বসাই টুডু, মহাশ্বেতার উপন্যাসের বিভিন্ন বাস্তব ও কাল্পনিক চরিত্র। কিন্তু এই লড়াই, টিকে থাকার ও মুছে যাওয়ার ইতিহাস কতটা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোটা বিশ্বের নিরিখে, বিশেষ করে পশ্চিমী দুনিয়ার কাছে? হলোকস্ট, বর্ণবৈষম্য বা কমিউনিজমের পতনের মতো তা কোনও আন্তর্জাতিক বিষয় নয়। মহাশ্বেতা তাই হিসাবের বাইরেই থেকে যান। তুলনায় আসতে পারে, লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের প্রসঙ্গ। পেরুর দুই মহান লেখক, সিরো অ্যালেগ্রিয়া এবং হোসে মারিয়া আরগেদাস, ভারতীয় আদিবাসীদের শেকড়চ্যুতির কাহিনি গভীর দরদে লিখে গেছেন। কিন্তু নোবেল পেয়েছেন মারিও ভার্গাস লোসা। তিনি নিজে শ্বেতাঙ্গ এবং তাঁর দেখার চোখও আন্তর্জাতিক, ঠিক যেভাবে ভি এস নইপল বা সলমল রুশদি ভারতের দিকে তাকান এবং ভারতের কথা লেখেন!

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (2)
  • comment-avatar
    Chinmoy Guha 1 week

    অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখককে ধন্যবাদ জানাই।

  • comment-avatar
    Krishnopriyo Bhattacharya 1 week

    মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস নিয়ে খুব ভালো আলোচনা করলেন রাহুল দাশগুপ্ত। লেখাটার প্রতি নতজানু হয়ে রইলাম।