চিন্তার চিহ্নমালা <br /> পর্ব-১৩ <br /> সন্মাত্রানন্দ

চিন্তার চিহ্নমালা
পর্ব-১৩
সন্মাত্রানন্দ

" লেখার শেষ গতি ম্যাক্সিম-এ পরিণত হওয়া। একটা বিশাল প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী যেমন মরে গিয়ে মাটি চাপা পড়ে যুগের পর যুগ ধরে বিশ্লেষিত হতে হতে শেষে ফসিল হয়ে যায়, একটি মহাকায় অমিতসম্ভবা রচনাও হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের স্থূল হস্তের অবলেপে ক্ষয় পেতে পেতে ম্যাক্সিম বা প্রাজ্ঞবচন হয়ে দাঁড়ায়। ‘মহাজনো যেন গত সঃ পন্থা’, ‘জননান্তর সৌহৃদানি’, ‘জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই’, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে’, ‘দ্যাট হুইচ উই কল আ রোজ বাই এনি আদার নেম উড স্মেল অ্যাজ সুইট’, ‘সমাজ সংসার মিছে সব; মিছে এ জীবনের কলরব’—এসব ওই ম্যাক্সিমের উদাহরণ। এত কল্পনা, এত প্রতিভা, এত গভীর অনুভব সব শেষে ছিন্নশাখ ন্যূব্জ বৃক্ষের মতো ক’টা ন্যাড়ামুণ্ডি ম্যাক্সিম! " চিন্তার চিহ্নমালা। ত্রয়োদশ পর্ব। সন্মাত্রানন্দ।

লেখালেখি

দুয়েকটি বাক্য হয়তো থাকে। অথবা দুয়েকটি শব্দ। একজন লেখকের। এমনভাবে থাকে যে, তখন আর কোনো একজন লেখকের লেখা বলে তাদের আলাদা করে চেনা যায় না। লেখকের চিহ্ন মুছে যায়। লিখিত হওয়ার পর থেকে লেখা তার নিজের অভিযাত্রা শুরু করে। লেখকও বসে থাকেন না। তিনিও পালটে যান। ততদিনে অন্য কোনো লেখা এসেছে তাঁর কাছে। আবার জমে উঠেছে অক্ষরের হাট। মাথার উপর ভাবনার বুড়ো বট ডালপালা মেলেছে, শিকড় নামাচ্ছে মেরুদণ্ডের ভিতর দিয়ে মূলাধার পদ্ম ছুঁতে চেয়ে। বাইরের প্রত্যক্ষ দৃশ্য-শব্দ-ঘ্রাণের দরজায় কুলুপ দেওয়া হয়েছে। পানপাত্রে সুরাশীর্ষে স্মৃতির বুদ্‌বুদ বুড়বুড়ি কাটছে। পেলিকানের বুক থেকে রক্ত টেনে নিয়ে হলুদ হয়ে আসা বটপাতা কুড়িয়ে তার গায়ে লেখা হচ্ছে আনকোরা নতুন কোনো আখ্যান। যতক্ষণ না শেষ হয় লেখা, ততক্ষণই আনন্দ। শেষ হয়ে গেলে সে-লেখাকে ছুটি দিতে হবে। লেখা তখন বেরিয়ে পড়বে পক্ষীরাজে চেপে সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে দিগন্ত ধরতে।

শেষ অবধি সে-লেখাও থাকবে না। কোনো নদীর ধারে ঘাসবনে রোদে-জলে-কাদায় তার বুকের ক’খানা হাড় শুকিয়ে পড়ে থাকবে। তারপর সময়ের স্রোত এসে সেই কয়খানা হাড়কেও হয়তো নিয়ে যাবে মহাকালের সমুদ্রসঙ্গমে।

সেগুলো হয়তো কয়েকটি স্মৃতিধার্য শব্দ বা বাক্যবৈদূর্যমণি। আর কিছু নয়।

একথা শুধু এলেবেলে লেখক বা কবিদের জন্যেই সত্য, মহাজন রচয়িতাদের জন্য সত্যি নয়—এমন ভাবা ভুল। ব্যাস কিংবা বাল্মীকি, হোমার অথবা ভারজিল, কালিদাস বা শেক্সপীয়র, রবীন্দ্র বা কোনো শ্রীবিখ্যাতেন্দ্রর রচনা তো টিকে আছে, অন্তত তামাদি হয়ে যায়নি তাঁদের রচনা—এমনটা আমরা অনেক সময়েই ভাবি। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ওই নামগুলি যত প্রখ্যাত, তাঁদের রচনার সবগুলি তেমন নয়। হ্যাঁ, তাঁদের কোনো কোনো লেখা পঠিত, আলোচিত, চর্চিত, ব্যবহৃত, ব্যবহৃত, ব্যবহৃত হয়ে শান-বাঁধানো হয়ে গেছে আমাদের মনে। কিন্তু দেখা যাবে, এমন অনেক লেখা তাঁদের আছে, যারা এই বহুবন্দিত লেখাদের ভিড়ে মুখ লুকিয়ে থাকে। এবং মুখ-লুকিয়ে-থাকা লেখাগুলোই হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, প্রচারের আলোয় মুখপোড়া লেখাগুলোর অধিকাংশই হয়তো তুলনামূলকভাবে অগভীর। এমনকি বিখ্যাত রচনাগুলোর মধ্যেও দুটো-একটা অনুচ্ছেদ হয়তো কম্বুকণ্ঠে জলদ্‌গম্ভীর স্বরে মানুষ আবৃত্তি করে চলেছে। অথচ উচ্চারণের স্বনন-আনুকূল্য যে অনুচ্ছেদগুলো পেলো না, সেগুলোর মধ্যেই হয়তো রয়ে গেল কবি বা লেখকদের নিভৃত দীর্ঘশ্বাস, সকরুণ বিলাপ এবং তাঁদের অসচেতন বা সচেতন অনুনয়। অর্থাৎ, সত্যিকারের ব্যাস বা রবীন্দ্রও চাপা পড়ে হারিয়েই যান, যা পড়ে থাকে তা তাঁদের আইকন বা এফিজি। আইকন হয়ে গিয়ে পুজো পান, এফিজি হয়ে গেলে হোলিকা-উৎসবের দিন নদীতীরে দাহ করা হয়।

লেখার শেষ গতি ম্যাক্সিম-এ পরিণত হওয়া। একটা বিশাল প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী যেমন মরে গিয়ে মাটি চাপা পড়ে যুগের পর যুগ ধরে বিশ্লেষিত হতে হতে শেষে ফসিল হয়ে যায়, একটি মহাকায় অমিতসম্ভবা রচনাও হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের স্থূল হস্তের অবলেপে ক্ষয় পেতে পেতে ম্যাক্সিম বা প্রাজ্ঞবচন হয়ে দাঁড়ায়। ‘মহাজনো যেন গত সঃ পন্থা’, ‘জননান্তর সৌহৃদানি’, ‘জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই’, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে’, ‘দ্যাট হুইচ উই কল আ রোজ বাই এনি আদার নেম উড স্মেল অ্যাজ সুইট’, ‘সমাজ সংসার মিছে সব; মিছে এ জীবনের কলরব’—এসব ওই ম্যাক্সিমের উদাহরণ। এত কল্পনা, এত প্রতিভা, এত গভীর অনুভব সব শেষে ছিন্নশাখ ন্যূব্জ বৃক্ষের মতো ক’টা ন্যাড়ামুণ্ডি ম্যাক্সিম!

কান্না পেলেও করার কিছু নেই।

কিন্তু কান্না পাওয়ারও কিছু নেই। দুনিয়ায় এমন কী আছে, যা থাকবে? কে থাকতে এসেছে? কার পায়ে পাখা বাঁধা নেই? সমস্তই ভঙ্গুর, অনিত্য। কথাটা কেবল ধর্মভাবুকদের বাণী বলে উপেক্ষা করলে হবে? এ পৃথিবীর, এ সৃষ্টির কোনোকিছুরই চিরত্ব আপনি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন না। আর যুক্তির দরকারটাই বা কী? এ তো প্রত্যক্ষ বাস্তব। আয়ু প্রতিদিন ক্ষয় হয়, রূপযৌবন ধুয়ে যায়, যে দিন যায় সে দিন ফেরে না, টাকা-পয়সা-ক্ষমতার গরম ঠান্ডা মেরে আসে, পরিচিত প্রিয় মানুষেরা চোখের সামনে পট্‌ পট্‌ করে মরে যায়— বলি, থাকছেটা কী? তো, কিছুই যখন থাকল না, তখন আপনার লেখাটি থেকে যাবে অবিকৃতরূপে—তা কি হয়? হয় না। লেখা যা করার, তা করেছে। প্রথমে সে রচিত হয়ে লেখককে আনন্দ দিয়েছে, মুক্তি দিয়েছে। তারপর লেখকের হাত ফস্কে পাঠকদের হাতে গিয়ে পড়ে ধীরে ধীরে সমষ্টি অচেতনে ঢুকে গেছে। পাঠক আবার রয়ে-বসে আপন-মনে সেই লেখার পুনর্নির্মাণ করেছেন নবকলেবরে। অর্থাৎ লেখার মৃত্যু হয়েছে, অবশেষে পুনর্জন্ম হয়েছে। এখন সে-লেখা লেখককে চেনে না। ‘তখন তোমারে নাই মনে!’

আচ্ছা, লেখাদের মধ্যে কি পরস্পর ভালোবাসাবাসি হয়? পত্রিকার পূজাবার্ষিকী, উৎসব-সংখ্যা কিংবা অন্য কোনো ধরনের সংকলন, যেখানে অনেকের লেখা একসঙ্গে ছাপা হয়, সেখানে লেখাতে লেখাতে এমন ভাবসাব হওয়া সম্ভব নাকি? আমি বলছি না, ওসব সংকলনে প্রকাশিত লেখাগুলোর সবগুলোই তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম। আমি বলছি, ওই পরিসরে লেখায় লেখায় ভাবভালোবাসা না হওয়ারই সম্ভাবনা। একগাদা লোক গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে বাসে যাচ্ছে মানে কি তারা একে অপরের পরিচিত? মোটেই না। সেখানে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না, যে যার বাসস্টপ এসে গেলে টুপ টুপ নেমে যায়। সেরকমই একই সংকলনে মুদ্রিত লেখাদের চরিত্রসাম্য প্রায় নেই বললেই চলে। তাহলে এ লেখা ও লেখার সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করে কোথায়? কোথায় সেই গাছগাছালিতে ভরা পার্ক, যেখানে একজন লেখকের লেখা অন্য আরেক লেখার কাঁধে মাথা রেখে খানিক বসে থাকবে?

রসজ্ঞ পাঠকের মনই হচ্ছে সেই পার্ক, যেখানে হয়তো সম্পূর্ণ অপরিচিত দুই লেখকের লেখাদের মধ্যে ভালোবাসা হয়। পৃথিবীর যাবতীয় ভালোবাসার রহস্যের মতই সেও প্রায় দৈবী ঘটনা। একজন পাঠক হিসেবে আমি হয়তো লুতফর রহমানের লেখা পড়েছি। সেই লেখা নিয়ে ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল জগন্নাথদেব মণ্ডলের কোনো কবিতার কথা। এখন এই দুই লেখকের দুটি লেখা আমার মনের মধ্যে জড়িয়েমড়িয়ে একাকার হয়ে গেল। এমনই ব্যাপার হল যে, আমি আর আলাদা করতে পারছি না, কোনটা লুতফর, আর কোনটা জগন্নাথ। ফলত, আমার মনে যে পদার্থটি আবির্ভূত হল, তা আর কোনো লেখকচিহ্নিত নয়। সে একটা স্বতন্ত্র ভালোবাসার বস্তু, লেখার সঙ্গে লেখার সোহাগ-আশনাইয়ের ফলে তার জন্ম হয়েছে।

এই সম্পূর্ণ নতুন বস্তুটি হতেই পারে তৃতীয় আরেকটি লেখার প্রেরণা। তাতে অবশ্য থাকবেই আমার নিজস্বতা। কেননা, পঠিত দুটি লেখার মধ্যে ঘটকালি করেছে তো আমারই মন। কিন্তু কোন মন? কোন মুহূর্তের মন? যে-মুহূর্তে লেখাটি আমি লিখতে শুরু করেছি, সেই মুহূর্তের মন। এবার লিখতে লিখতে আমি বদলে যাচ্ছি, কেননা লেখাটি আমাকে বদলে দিচ্ছে প্রতি পলে পলে। একখানা তিনশো পাতার উপন্যাস লিখব, আর উপন্যাসের শুরুতে যে আমি, শেষেও সেই আমি একেবারে কাঠ-বঙ্কিম হয়ে বসে থাকব, এ একেবারে অবাস্তব কথা। লেখার প্রতিটি শব্দ লিখিত হওয়া মাত্রই আমার উপর ক্রিয়া করতে শুরু করে, আমাকে পালটে দিতে থাকে। প্রথম শব্দটি যিনি লিখেছেন, দ্বিতীয় শব্দটি লেখার সময় তিনি একটু পালটে গেছেন। লিখিত শব্দটিই তাঁকে পালটে দিয়েছে। এইভাবে শব্দের পর শব্দ, বাক্যের পর বাক্য, অনুচ্ছেদের পর অনুচ্ছেদ, অধ্যায়ের পর অধ্যায়। উপন্যাস শেষ হচ্ছে, লেখক জাঁক করে বলতে পারেন, আমি উপন্যাসের জন্ম দিলাম। কিন্তু লেখকের সেই জাঁক ফাঁকা ঢাকের বোল, অসার আটম্বরী মাত্র, কেননা লেখাটি জন্ম নিয়ে লেখককে নবজন্ম দিয়ে গেছে। শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এক অর্থে যেমন শিশুটির মায়েরও জন্ম হয়, শিশুজন্মের আগে তিনি কেবলই নারী, মা হননি তখনও; অনেকটা সেইরকম ব্যাপার।

সেই অর্থে লেখক লিখতে বসলে, লেখাই আসলে লেখককে লিখে থাকে।

(ক্রমশ)

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)