অলোকরঞ্জন : একটা অসমাপ্ত খেলা
: দীপক রায়

আজ থেকে দু’বছর আগে ২৪ডিসেম্বর ২০১৮ কলকাতায় যাদবপুরের বাড়িতে শেষ বার গিয়েছিলাম অলোকদার বাড়ি। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। শরীর তখনই তাঁর খুব ভালো ছিল না।
আমার সম্পাদক বন্ধু নিত্যরঞ্জন দেবনাথের কাগজে অলোকদা জার্মানি থেকে লেখা পাঠাতেন আর সংগতকারনেই পর পর কয়েকটি সংখ্যায় কবিতার পাতায় প্রথমেই সেই লেখা ছাপা হয়েছে। নিত্যরঞ্জনের সঙ্গে চাক্ষুস দেখা বা আলাপ ছিল না অলোকদার।
একথা সবাই জানেন অলোকরঞ্জন শীতের শুরুতে কলকাতায় আসেন তিনমাসের জন্য আর শীত ফুরোলেই পরিযায়ী পাখির মতো উড়ে যান তাঁর জার্মানির হির্শবার্গের বাড়িতে। ২০১৮-য় অলোক রঞ্জনের কলকাতায় আসার খবর পেয়ে আমার বন্ধু নিত্যরঞ্জন উদগ্রীব হয়ে উঠলেন কবে তার সঙ্গে একেবারে একান্তে দেখা করা যায়।
কলকাতা এলেই ফোন করে বুঝতে পারি তাঁর সীমাহীন ব্যস্ততার কথা। সকলেই তাঁর সঙ্গে বাড়িতে গিয়ে কথা বলতে চান কিংবা তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতে চান। এবং সেটা চলতে থাকে তাঁর আশি বছর বয়সের পরও। কারণ অলোকরঞ্জনের বয়স শুধু বাড়ে। তিনি বুড়ো হন না কখনও। ক্রমাগত দূরভাষে আলাপ করে নিত্যরঞ্জন একটা মহার্ঘ অপরাহ্ন পেলেন – ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮, যেদিন আমরা শুধু দুজনে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারব।
শীতের বিকেল খুঁজে পাওয়া যায় না। হাওড়া স্টেশনে ৮বি বাসে জানলার ধারে দু’জনে বসে যখন যাদবপুরে তাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে যাচ্ছি তখন মনে হচ্ছে আমাদের চেয়ে সুখী মানুষ আর কেউ নেই যারা একঘণ্টার মধ্যে এমন এক একজন আন্তর্জাতিক মানুষের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে, যেখানে আর কেউ থাকবেন না। পান্ডিত্য প্রদর্শনের জন্য আমাদের একান্ত আলাপচারিতার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বে না কেউ।
বাসে যেতে যেতে ভাবছিলাম গতবছর আমাদের বেশিরভাগ কথা হয়েছিল কবিতার অনুবাদ নিয়ে। কারণ সেই বছরেই প্রকাশিত হয়েছে আমার আর দীপকরঞ্জনের সম্পাদনায় ‘দেশ বিদেশের ছোটো কবিতা’-র সংকলন। আর তাতে একমাত্র অলোকরঞ্জনই সবচেয়ে বেশি দেশের কবিতার অনুবাদ করেছেন। কথায় কথায় সেকথা তুলতে বালকের মতো তিনি বললেন – তাই !
ওঁর সামান্য কৌতূহলের উত্তরে আমিই জানিয়েছিলাম ইংরেজি আর জার্মান কবিতা ছাড়াও আছে স্পেন ইতালি আমেরিকা এবং মেক্সিকোর কবিতা। আমি সেদিন তাঁকে বলেছিলাম তাঁর একটি হল্যান্ডের অনুবাদ কবিতাও পড়েছি আমি। সেদিন আমাদের সঙ্গে ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক শুভেন্দুবিকাশ অধিকারী। কিন্তু আজ আমার সঙ্গে যিনি যাচ্ছেন তিনি গল্প লেখক এবং একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক। অলোকরঞ্জনের বহুমুখী প্রতিভায় যিনি মুগ্ধ !
তাঁর যাদবপুরের বাড়িতে আমরা যখন ঢুকলাম তখন অপরাহ্নের কোলাহল শেষ হয়ে সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর ছোটো বসার ঘরে আমরা দু’জন। অপেক্ষা করছি তাঁর জন্য। জানি আজ শুধু আমাদের জন্যই খোলা আছে দ্বার। তবু আশঙ্কা যদি তাঁর কাছে না জানিয়েই এসে পড়ে কেউ ? তাঁর কোনো আপনজন? কোনো ভিআইপি ?
না, কেউ আসেন নি। খুব সুস্থ ছিলেন না তিনি।তিনি এলেন একা ভেতরের ঘর থেকে কয়েক মিনিট পর। ছড়িয়ে পড়ল আলো ঘরের চারদিকে।
প্রণাম করে তাঁর হাতে আমাদের সামান্য উপহার দিতেই বলে উঠলেন – কী, কী এনেছ আজ? আজ তো ‘ক্রিসমাস ইভ’। ২৪ডিসেম্বরের সন্ধ্যাকে যে আদর করে ‘ক্রিসমাস ইভ’ বলে ডাকা যাবে এই মহার্ঘ উচ্চারণ তো অলোকরঞ্জনের নিজস্ব। বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবার আর সকলের কুশল জিজ্ঞাসা ও চা-পানের পর,আমার বন্ধুর সঙ্গে তাঁর কর্মজীবন আর পত্রিকা নিয়ে নানা কথা বলার পর অলোকদা হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন – কী বলবে আজ তুমি এই পুণ্য দিনে?
কী বলি আজ অলোকদার কথার উত্তরে?
কী যে দুর্মতি হল আমার কে জানে , হঠাৎ বলে বসলাম , কেউ যদি আপনাকে খেলার ছলে জিজ্ঞাসা করে রবীন্দ্রপরবর্তী পাঁচজন কবির নাম বলুন। কী বলবেন আপনি? খেলার ছলে এই প্রশ্নের উত্তর কি দেওয়া যায়? আর আমার এই প্রশ্ন করাও কি ঠিক হল? এই বয়সের আর কোনো কবিকে আমি কি এমন প্রশ্ন করতে পারতাম? বলতে দ্বিধা নেই, পারতাম না। অলোকদা বলেই পারলাম। আর জানি ,উড়িয়ে দেবার বা হার মানবার মানুষ নন তিনি। ভেতরে ভেতরে খুব কৌতূহল হচ্ছে আমার।
এক নম্বরে জীবনানন্দ আসবেন এতো সকলেই জানে, কিন্তু তারপর? পিন পড়ার শব্দ নেই ঘরে।ভাবছি বলবেন কি ওই সময়ের অমিয় চক্রবর্তীর নাম?কিংবা বিষ্ণু দে কিংবা অরুণ মিত্রের নাম? নাকি চলে যাবেন পরের দশকে। বলবেন, সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা রমেন্দ্রকুমারের নাম। বলবেন কি মনীন্দ্র গুপ্তর নাম? নাকি চলে যাবেন নিজের সময় পাঁচের দশকে? ইতিমধ্যে উনি খুব সতর্ক হয়েও বলে ফেলেছেন পাঁচের বেশি নাম। বাদ দেবার পর্ব শুরু হবার আগেই চলে এল নিজের দশক। কার নাম করবেন তিনি? সবাই তো তার বন্ধু। একজন তো নয় অন্তত তিনজনের নাম উঠে আসছে আমার মনে। কাকে বাদ দেবেন? কোন বন্ধুকে? মজার খেলাটা আর মজা মনে হচ্ছে না আমার নিজের কাছেও। উনি বলছেন কারো কারো নাম। বাদ দিতে পারছেন না।
এরপর ছয়ের দশক। অন্তত দু’জন, দু’জনের নাম করতেই হবে। এরপর সাতের দশক। কী বলবেন এবার তিনি?
একশো বছরে দু’জন তিনজন মহাকবির জন্ম হয়। কারা তাঁরা? আমি তো রবীন্দ্রনাথের পর পাঁচজনের নাম চাইছিলাম। না, খেলাটা শেষ করা দরকার। কীভাবে শেষ হবে? কাল! মহাকাল!!
খেলা শেষ হচ্ছে না। উনিই বললেন – এভাবে হবে না দীপক। এখন সমবায়ের যুগ। এখন আর কারো একক সাম্রাজ্য নয়। অনেক ভেবেচিন্তেও অনেক সতর্ক হয়েও সংখ্যা দশ পেরিয়ে গেছে।
আমাদের অসমাপ্ত খেলা শেষ করতে হবে। রাত বাড়ছে বলে নয়। এ খেলা শেষ হবার নয় বলে।
একটা ঘোরের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছি আমরা দু’জন। ওপরে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন অলোকদা। — — বলছেন, আজকের খেলা, মজার খেলা। নামগুলো বোলো না কাউকে। নিচের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অলোকদাকে বলেছিলাম , জীবনানন্দ দাশ ছাড়া বলা যাবে না কারো নাম।
এরপর জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারততত্ত্ব পড়াতে চলে গিয়েছিলেন তিনি কদিন পরে। আর ফিরতে পারলেন না । ১৮ডিসেম্বর ২০২০ জার্মানির হির্শবার্গেই প্রয়াত হলেন তিনি। বাংলার মাটিতে ফেরা হল না তাঁর।
অসমাপ্ত খেলা শেষ হবার নয়!

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)