
বেবী সাউ-এর দীর্ঘ কবিতা ‘কবি, কবিতা এবং প্রতিহিংসা’
কবি, কবিতা এবং প্রতিহিংসা
আমাকে হত্যার আগে তুমিও, সময়,
শিখে নিতে পারতে কীভাবে
খুলে নিতে হয় ডানার পালক!
যখন মহান সেই কবিতাটি লেখার উদ্দেশ্যে
আমি পরিচয় ভুলে
প্রতিহিংসা ভুলে
একটা উইয়ের ঢিবির মধ্যে
নিরন্তর এক সাধনার মধ্য দিয়ে
নিজেকে দেখতে এবং দেখাতে চেয়েছিলাম
শরীরে স্বেদবিন্দুর মতো
জমে থাকা সামাজিক পাপ
হত্যা এবং…
আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল ওরা
ওরা চেয়েছিল অসফল হয়ে যেন
ধ্বংস হয় যাবতীয় সাধনা
অপরাধ এই, শুধু একটি ধ্বনির কাছে
বশ্যতা স্বীকার করেছিলাম আমি
শুধু একটি শব্দের কাছে বিকিয়ে দিয়েছিলাম
আমার নিজস্ব সত্ত্বা
শরীরে ভেতর ঢুকে পড়া অসন্তোষের পর্যায়ে
চিল্কীগড়ের রাজবাড়ির মাথায়
চাঁদের মতো নেচে বেড়াচ্ছিল কাল কুহকিনী
তাঁর সাদা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছিল
মুদ্রা এবং কৌশল
তাঁর চোখের ভেতর শতাব্দীর জমে থাকা
আনন্দলহর
নিজেকে প্রকাশের এবং ছোঁয়ার…
আর তখনই সারা শহর বুভুক্ষু পর্যটকের মতো
ছড়িয়ে দিচ্ছিল শব্দের মাধুরী
আর
আমার জরাভারানত শরীর
আমার বুড়িয়ে যাওয়া মন
কষ্ট বেচতে বসেছিল প্রকাশ্য দিবালোকে
তখনই আমার ইচ্ছে হয়েছিল কিছু লিখে ফেলার
হাতে ছিল রাজার দাস্তান
যদিও ইস্তেহারের মতো পাঠ করছিল সে
যদিও কর্মব্যস্ত সাধারণ নাগরিক কিছুটা সময়
আহারের সংস্থান ভুলে
ঘোলাটে দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছিল
সেই রাজনাগরিকের দিকে
ছুঁড়ে দিয়েছিল প্রশ্ন এবং থুতু
বিষণ্ণ জীবন ও তার গল্প লেখার জন্য
যখন তুলে নিলাম
শব্দ, ধ্বনি, কিছু মায়াবী অক্ষর
নীতি নির্ধারিত হল তখন
রাষ্ট্র দেখাল পূর্বপুরুষের দস্তখৎ
বুঝিয়ে দেওয়া হল: লিখছ লেখো
কিন্তু স্তবগানে তুলে আনো রাষ্ট্র এবং শাসক
আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম!
আমি শুধু লিখতে চেয়েছিলাম নিজের কথা কিছু
আমার উপেক্ষা, অপেক্ষার অপরাধ
আমার মেয়েজন্ম, কান্না, চিৎকার, দ্রোহ…
এবং আমাকে দেখানো হল
এক ক্যালাইডোস্কোপ —
হত্যা করা হয়েছিল
প্রপিতামহীর প্রবঞ্চনা
ছিন্ন শির, ব্যবচ্ছিন্ন দেহ যেখানে
তাদের হত্যার রঙে
তাদের রক্তের রঙে
তাদের উল্লাসের ধ্বনিতে
পৃথিবী উর্বর হবে বলে
যারা দেখেছিল দিবাস্বপ্ন
যারা লিখেছিল পবিত্র মন্ত্র এবং আয়াতের কিয়দংশ
এবং প্রেমের কথা
এবং প্রেমের শব্দ
এবং প্রেমের ধ্বনি
এবং প্রেমের প্রেমকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করে
ছিনিয়ে নিয়েছিল নারীত্বের অধিকার
অক্ষরের অক্ষম আড়ালে
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে
লুকায়িত ইতিহাস
তুলে এনে ধরতে চাইছিল
আত্মা এবং আত্মহত্যাকে
আর অতি সুনিপুণ ভাবে
বাস্তবের এক উর্বর ভূমিতে কালি ও কলম
দিয়ে রচনা করেছিল
আনন্দ, দুঃখ, বিরহ…
বিচ্ছেদের পাহাড়ের ওপর
ফুটিয়ে তোলা কয়েক’শো
শিলালিপি রেখে
ভবিষ্যতের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল
আশার স্বরলিপি
তারা আজ আর কেউ জীবিত নেই
তারা আজও কেউ হতে পারেননি
প্রকৃত লেখক
আমি সেই উপেক্ষার কথা লিখতে চেয়েছিলাম
অপেক্ষারত একেকটি শব্দ
শুধু প্রকাশের জন্য
উদোম কেঁদেছে দিনরাত
কিন্তু তারা প্রকৃতির কাছে সমর্পণ করতে শেখে নি
বরং ভালোবেসেছিল
তারা অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে নি
বরং বুঝিয়ে ছিল মাথা নত না করার উদ্ধত
তারা মানুষের জন্য মানুষ গড়তে চেয়েছিল
তারা পৃথিবীকে ভয়ে নয়
ভালোবাসায় ভরাতে চেয়েছিল
দুখী মানুষের হৃদয়ে এঁকে দিয়েছিল কবিতা, কাব্য এবং চিত্র…
তবে কি সেই সব অক্ষর আর শব্দ সফল হয়েছিল?
তারা কি প্রপিতামহদের প্রবঞ্চনা মুছে দিয়ে
গড়ে দিতে পেরেছিল কাব্যের অঙ্গন?
আর সাফল্য ঘরের দোরগোড়ায় ভেবে
উলুধ্বনি দিয়ে ওঠা গম্ভীর সময়
উপেক্ষার বন্ধনসমূহ ছেড়ে
বেরিয়ে এসেছিল রাজপথে
সেই সাজ, মুক্তি
পাখির ডানার মতো
ছুঁয়ে যাচ্ছে মহাকাশ
পালকে পালকে লিখছে গভীর নীল
শূন্যতার পরতেও ফুটে উঠছে
অক্ষর শিকারী…
আর ধুলোয় লুটোচ্ছে
রাজ উদ্ধত…
তাদের একেকটি আশা এবং ভরসার স্বপ্ন
বিক্রি হচ্ছে ফুটপাতে
তাদের কান্নার সুরে জেগে
উঠছে দেশের শিল্প, ভূমি আর ক্ষত বিক্ষত প্রকৃতি
সেইসব মহান অক্ষর দিয়ে
রাতের ভেতর বেজে উঠছে মাদলের ডাক
আর যারা শুধু শব্দের জন্য
অক্ষরের জন্য
অক্ষম আক্রোশে ভরা ভাবনা চিন্তার জন্য
কাঙাল হয়ে অলংকৃত করছেন
রাষ্ট্রের নিয়ম
তাঁরা শাসকের স্তবগান লিখতে লিখতে
কালের বালিশে
মাথা রেখে
নাক ডেকে
কবেই ঘুমিয়ে পড়েছেন
এক করুণ বাতাস নিরুৎসাহিত হয়ে
একা একা মুখস্থ করছে হাহাকার
মেনে নিতে হয় বলে
মেনে নেওয়া
মানিয়ে নেওয়া
এই দেশ, রাষ্ট্র এবং সমাজ
আসন পিঁড়ি পেতে ছুটির সকালবেলা
শ্যাম্পুগন্ধে
লাল চুলের মেয়ের গল্প বলছে
মৌজ করছে আনন্দে
সমস্ত গুপ্ত হত্যা ফাঁস করে উঠে আসছে
ইদের চাঁদ
গণ্ডুষ ভর্তি নাটকের স্বরলিপি
অদৃশ্য গোলকে ঘুরপাক খেতে খেতে
হারিয়ে ফেলছে প্রক্সি বালকের ঠিকানা!
আর তখনই আমাদের জঙ্গলমহল ভেদ করে
সুবর্ণরেখা ছাপিয়ে
বৃদ্ধ বটগাছের নীচে অপেক্ষারত
গভীর শামুক
একে একে কেটে ফেলছে পেঁপেপাতার বিষ
লিখছে আর লিখেছে এবং লিখছে
মহাকালের সত্য ইতিহাস
পিঁপড়ের লাশ নিয়ে ছুটে চলা
অজস্র ফাটল
বন বন করে ঘুরছে
মহাপ্লাবনের আগে আমাদের এই ঝুমচাষ
আর তার পার্বত্য কাহিনি
তার খানা খন্দে ভরা ভয়াল বিষাক্ত
খরিশের বিষ
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা
মৃত্যুর ভেতর বসে
ঝর্ণা-তীরে বাঁশি বাজাচ্ছে
দিস্তার পর দিস্তা ভরে উঠছে অত্যাচারী স্বৈরশাসকের সংলাপ
কালের কন্ঠ এসে থুতু ছেটাচ্ছে
আর হো হো করে হাসছে উলঙ্গিনী সৃষ্টি
তুমি কি তাকে প্রলয়ের পাগল বলবে, সময়?
তুমি তার দিকে ছুঁড়ে দেবে উপেক্ষার হুল?
জানি,
শূলে দেবে, মারবে
জেলের কুঠরী থেকে একটু একটু করে
ছিঁড়ে নেবে জীবনী শক্তি
কিন্তু তাও
হলুদ প্রজাপতি আলোর বলয় হয়ে ঘুরবে চারপাশে
সামনে কুলু কুল শব্দে বয়ে চলা
তীক্ষ্ণ, তীব্র আদিম জীবন
অভিমুখে লিখে ফেলবে বিরাট এক মহাকাব্য
বুকের ভেতর ঢুকে সাঁতার কাটবে
পুঁটি, কোরান, মৌরালা
কবি বুঝে যাবে
এই মায়া, এই ছায়া
আসলেই মৃত্যুর জিঘাংসা
কেউ কোথাও নেই
কেউ কোথাও ছিল না কোনদিন
তাও ক্ষতের গায়ে ক্ষমতার প্রলেপ
বুলিয়ে
মেটে সাপ গা শুকোচ্ছে আলপথে
আর আলতা পা হেঁটে যাচ্ছে সৌন্দর্য সৌকর্যে
মুক্তির আনন্দে মুক্তি লিখছে
কবি জেগে উঠেছেন ভেবে
কবি ও কবিতা মুক্ত হয়েছে ভেবে
অতি সাধারণ পোশাকে
মানুষের মানুষ হয়ে
কবিতা পাঠের আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে মহাকাল
একলা উঠোনে বসে থাকা তিনজন নাবিক
তাদের অভুক্ত নৌকা
জলের জন্য হাপিত্যেশ করতে করতে
চুপচাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাসে ভাসছে
ভাত ডালের দুপুর ঝিমোচ্ছে
সমানে
নিরুত্তর কবি দেখছে,
কবি মরে গেলে কবিতার দাম বাড়ে
শিল্পী মরে গেলে শিল্পের যেমন
বুভুক্ষু কবিতা লজ্জায় জুবুথুবু হয়ে
অসহায় মন নিয়ে তাও
লিখে রাখছে লেখার নকশা
এবং প্রতিহিংসা এই
মেলে ধরছে ব্যাপারস্যাপার
গোপন ষড়যন্ত্র
আর আগে পিছে ছেড়ে যাওয়া দলিল এবং দস্তাবেজ
আর শিখে নিচ্ছে
পুরস্কৃত মঞ্চের আগে কীভাবে জখম
করতে হয় হৃদয়ের ক্ষতগুলি
লকলকে করছে ফণা
বিষের তীক্ষ্ণতায় জমে উঠছে বৃদ্ধ ঋষির কলম
হাওয়ার ভাসছে রচিত স্তোত্র
পবিত্র হচ্ছে ইতিহাস
ভূমি এবং জল…
উদীয়মান আলোয় ফুটে উঠেছেন সৃষ্টি
যার শুরু আছে
শেষ নেই…
তুমি কাকে কাকে হত্যা করবে সময়?

