
শতাব্দী চক্রবর্তীর কবিতা
১. ত্রাহি মাম
আকাশ ছোঁয়া যায় কিনা ভেবেছি বহু রাতেই
আলোকসন্ধানী মন জ্যোৎস্নার দুধটুকু শুষে
জমা রাখে চির চঞ্চল গর্ভে আমার
অর্বাচীন আমি চমকের ভিড়ে সরিয়ে রাখি
আমার না-দেখা গতজন্মকে।
শুশ্রূষার লিপি জড়ানো বিরহ পথের সঙ্গী করতে
বেহায়া মুখে ছায়া ফেলে অপার দ্রাঘিমাংশ।
আমার চির বিদ্রোহী আত্মা
আগুনে শুদ্ধি করে হ্রদের লবণ
আর খুঁজে পাই কীভাবে বাল্মীকি হৃদয়
অজান্তেই ফের রত্নাকর হয়ে ওঠে!
যে নিতান্তই গুপ্ত মন্ত্রে বলে যায়,
ছুঁয়ে দেখো, দেখো না ছুঁয়েই জন্ম রহস্য।
আমি এসব মন্ত্রে ভয় পাই আজকাল
চোখ পেতে সহ্য হয় না যে
প্রতিবাদহীন দৃশ্যে বেবাক দর্শকের সম্মুখে
মেয়েদের জামার ভেতর বলিষ্ঠ হাত ঢুকিয়ে
দুধ খুবলে আনা দেশে আমি আর
মেয়ে জন্মের রহস্য জানতে চাই না!
রক্ষা করো রঘুবীর!
এদেশ তোমার না হালুমের!
২. হ্লাদিনী
ধুম্রজালে আটকে থাকে সুর
কে যেন বলে ছিল কথাটা আজ আর মনে নেই।
অ, আ, ক, খ শেষে ভোরের দোয়েল দেখিনি কখনো
ওসব ছল। দোয়েল দেখিয়ে ওপারে রাখা আছে
ধোঁয়া ওঠা আঁচ, রক্তাল্পতার মাস, মাছ তরকারির গুদাম।
সেই সব ছেলেভোলানো শৈশবের খেলনাবাটির
কি আর গতি হবে দু-চারটা পাস দিয়েই!
যেখানে ভাসায় দেবতার মাথায় ঠেকিয়ে সর্বস্ব
শুদ্ধ হয় সংসার, ঘরে শান্তি আসে, লক্ষ্মীমন্ত বউ
পুকুর পচে যায় জবা ফুল, বেলপাতা, রক্তের কাপড়ে।
বেগুন কাটতে কাটতে নাভি থেকে উঠে আসে ওম
বন্ধ কপাটিকা খুলে যায় প্লুতস্বরে।
ভৈরবী খঞ্জনি গেয়ে যায় আনন্দগীত, মাধব নাম
শরীরের জখমগুলো সেরে যায় দুধ ফোটানো গন্ধে। আমাদের আয়েস বেড়ে যায় দীর্ঘ
জ্বরের মাথায় জলপটি পাবার লোভে
না সামলাতে পারি খিদে না পাই মরণের দশা।
পাশে বসে থাকবে মায়ের মতো কল্যাণরূপ
ছটফটানি হাত দুটো আর সারা গায়ে
বুলিয়ে যাবে ঘুমপাড়ানি গান।
এই তো লালা ঝরে পড়ে কেমন
বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে মন।
এখন ঘর হয়েছি, দোতলা তিনতলা আকাশ ছোঁয়া
সংসারের সুরগুলো গুঞ্জন উড়িয়ে উঠে যায়
ঐ এক্কে এক্কে এক, এক দুইয়ে দুইয়ের পাতায়।
আমার হ্লাদিনী শরীর জলভাগ করে দিই সুবিধামতো
পলিগুলি নিজের সঞ্চয় পেটে জমা হয়
সাঁতার পড়ে থাকে আলোর, কালোর, মন্দ কাজের,
কোনো বিদূর একমুঠো খুদ দেবে ঠিক এই পরিক্রমায়
ভেবে ভেবে জন্মের চুল নিয়ে গন্ধে বিভোর পদ্মাবতীর
পঞ্চমকারে তন্ত্র সাজিয়ে সাধনায় মগ্ন হয় শরীর
অপেক্ষা গাছ হয়ে বসে থাকে দরজা কিংবা শ্মশানে।

