অনুবাদ সাহিত্য কি এক ত্রুটিপূর্ণ পৃথক সাহিত্যধারা নাকি মূল রচনার প্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা নব্যপ্রাণ <br />সোমা দত্ত

অনুবাদ সাহিত্য কি এক ত্রুটিপূর্ণ পৃথক সাহিত্যধারা নাকি মূল রচনার প্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা নব্যপ্রাণ
সোমা দত্ত

 

ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, রবিনহুড, টারজন থেকে শুরু করে শেক্সপিয়র পর্যন্ত বাঙালি পাঠক বারো থেকে পনেরো বছরের মধ্যে পড়ে ফেলত, সত্তরের দশকে। বাংলা মিডিয়ামের জয় জয়কার ছিল তখন। অনুবাদ সাহিত্য বাঙালিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে। রাশিয়ান প্রচুর বই ঘিরে রেখেছে বাঙালির ছেলেবেলা। কাশতানকা, চলো সোভিয়েত দেশ ঘুরে আসি ইত্যাদি সব ঝকঝকে ছবিতে মোড়া গ্লসি কাগজ শৈশবকে চকমকি র্যাপ কাগজে মুড়ে ফেলছে। রোমিও জুলিয়েট, হ্যামলেট, জুলিয়াস সিজার পর্যন্ত ওই বয়সেই আয়ত্ত হয়ে গেছে। বিশ্বসাহিত্যকে এইভাবে আমাদের দরজায় এনে দেওয়ার নেপথ্যে বাঙালি অনুবাদকদের ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু এই অধ্যয়ন বা পাঠ খুব স্পষ্টভাবে মূল সাহিত্যটির থেকে আলাদা হয়েই বেঁচে থাকে। বিষয় ত্রুটির নয়। অসাধারণ কাজ হয়ে চলেছে অনুবাদের। কিন্তু সেটি একটি পৃথক সাহিত্যধারা তৈরি করেছে যা মূল রচনার ভার এবং ভাব দুটি থেকে যথেষ্ট আলাদা। ভাষার যথাযথ অনুভব কখনোই সম্ভব নয়। প্রতিটি ভাষায় শব্দের ব্যবহার অনুযায়ী কিছু ভাবপ্রকাশ অন্য ভাষায় সম্ভব নয়। কয়েকটি শব্দের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি ভীষণ স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যেমন ‘serendipity’। এই শব্দের যথাযথ বাংলা অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব। ভাবটুকু প্রকাশ করা যেতে পারে মাত্র। এরকম বহু শব্দ আছে। যেমন awkward শব্দটি। এরও সেই অর্থে যথাযথ কোনো অনুবাদ সম্ভব নয়। এছাড়াও ব্যাকরণগত গঠন এবং বাক্যবিন্যাসের ব্যাপক পার্থক্য অনেকসময় একটি বর্ণনার খোলনলচে বদলে দেয়। সেক্ষেত্রে মূল শব্দকে অক্ষুণ্ণ রেখে লেখা যায় ঠিকই কিন্তু সেই অন্তর্ভুক্তি শুধুমাত্র ইংরেজি বাংলা হিন্দির ক্ষেত্রেই সম্ভব। রুশ, জার্মান, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ বা অন্যান্য ভাষার ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। এক ভাষার শব্দের অন্য ভাষায় অন্তর্ভুক্তির বহু উদাহরণ থাকলেও সেটি অঞ্চলভিত্তিক। ইওরোপের দেশগুলিতে যে মিশ্র ভাষার ব্যবহার হতে পারে এশীয় দেশগুলিতে সেই একই ধরনের ব্যবহার চালু থাকে না। যেমন আমাদের রোজকার জীবনে বহু ফারসি শব্দের ব্যবহার আমরা করে থাকি। বহু ইংরেজি শব্দের ব্যবহারও করে থাকি আমরা। এমনকি সাম্প্রতিক বাঙালি জীবনে হিন্দি শব্দের ব্যবহারও বহুলাংশে মিশে যাচ্ছে। কথ্য ভাষা এবং সাহিত্যের ভাষার ব্যবহার আলাদা হলেও কথ্য ভাষার প্রভাব সাহিত্যে খুব ধীরে হলেও পড়ে। কিন্তু এই মিশ্র ভাষার সাহিত্যের যখন অন্য দেশের ভাষায় অনুবাদ হয় তখন তার যথাযথ মাত্রার পরিবর্তন হবেই। এই পরিবর্তনের কিছু নেতিবাচক ইশারা থাকে কিনা বলতে না পারলেও এই পরিবর্তন একটি পৃথক সাহিত্যরীতির জন্ম দেয় সেকথা বলা যেতেই পারে।
যেমন আমরা যখন দস্তয়ভস্কি বাংলায় পড়ি তখন তার লেখার যে মর্মবোধ আমাদের কাছে এসে পৌঁছয়, তা ইংরেজিতে পড়া উপন্যাস বা গল্পের থেকে অনেকখানি আলাদা। স্বাভাবিকভাবেই যখন কেউ রাশিয়ান ভাষা জেনে দস্তয়ভস্কির মূল রচনা পড়ছেন সেটি ইংরেজিতে লেখা অনুবাদের থেকেও অনেকখানি আলাদা হবে। রাশিয়ান থেকে ইংরেজি এবং ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ যথেষ্ট নয় কি একটি সাহিত্যের মধ্যে থাকা দৃষ্টিভঙ্গিমা বদলের জন্য? “Call me Ishmael” হারম্যান মেলভিলের বিখ্যাত উপন্যাসের প্রথম লাইন। এর অনুবাদ যেভাবেই করা হোক না কেন সেই অনুদিত বাক্য কি call me Ishmael এর ভাব ধরতে সক্ষম হবে? হোমারের বর্ণনার ‘wine-dark sea’ অনুবাদ কীভাবে হবে? শেক্সপিয়ারের সেই বিখ্যাত লাইন “to be or not to be” এর অনুবাদ সম্ভব? আক্ষরিক অনুবাদ এই সব চিরকালীন বাক্যের সমার্থক হতে পারবে না কোনোদিনই। আলবেয়ার কামুর “stranger” উপন্যাসের প্রথম লাইন নিয়েও এই অনুবাদের অস্বস্তি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন “Aujourd’hui, maman est morte” লাইনটির কোনো যথার্থ অনুবাদ করা সম্ভব নয়। এই বাক্যবন্ধের যে ইংরেজি করা হয়েছিল সেটি হলো “Mother died today.” প্রায় সকলেই একমত এই ভাবনায় এই ইংরেজি অনুবাদ কোনোভাবেই ওই লাইনের ফ্রেঞ্চ অনুভবকে স্পর্শ করতে পারে না। বাংলা সাহিত্যেও ঢের এরকম বাক্য এবং শব্দ আছে। মণীদ্র গুপ্তের “অক্ষয় মালবেরি” উপন্যাসের সেই প্রথম লাইন শত “শরদ মানুষের আয়ু” অন্য কোন ভাষায় নিজেকে ঠিক একইভাবে পরিস্ফুট করতে পারে? অনুবাদ করা সবথেকে বেশি চ্যালেঞ্জিং বোধহয় সুকুমার রায়ের লেখার ক্ষেত্রে। “আবোল তাবোল”- কে অনুবাদ করে একই অনুভূতি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। “আবোল তাবোল” এর কবিতাগুলোকে অনুবাদ করা মারাত্মক কঠিন। এ প্রসঙ্গে একটা কথা খুবই উল্লেখযোগ্য। অনুভবকে ব্যক্ত করে ভাষা। আর অনুভব তৈরি হয় পরিবেশ, পরিজন, সামাজিক অবস্থান, ভৌগোলিক অবস্থান ইত্যাদির ভিত্তিতে। সুতরাং যখন একটি ভাষার নির্দিষ্ট একটি কোনো শব্দ বা বাক্যের আক্ষরিক অন্য ভাষায় পাওয়া যায় না তখন ধরে নিতে হবে ওই ভাষাভাষীর মানুষের কাছে ওই নির্দিষ্ট অনুভবটিও অনুপস্থিত হতেই পারে। যেমন আমরা বাংলায় বলি আমি/ তুমি/ সে ইত্যাদি পুরুষের ব্যবহারের মধ্যে দ্বিতীয় পুরুষ হিসেবে ‘তুই’ শব্দের ব্যবহার করি। ইংরেজি ভাষায় ‘তুই’ শব্দের কোনো অনুবাদ হবে না। এবং ‘তুই’ সম্বোধন করে সম্পর্কের যে অবস্থানকে ব্যক্ত করা হয় তাকে অন্য কোনোভাবে প্রকাশও করা যাবে না কারণ ইংরেজি ‘তুই’ এর সমমাত্রিক কোনো সম্পর্কের অস্তিত্বই নেই। সুতরাং এই যে অননুদিত শব্দটিকে সঠিকভাবে ইংরেজিভাষায় ব্যক্ত করা গেল না সে ব্যর্থতা অনুবাদের নয়। এমনকি আবেগও দেশ কাল আবহাওয়া নির্বিশেষে এক নয়। নির্দিষ্ট কিছু ভাষার আবেগের উচ্চারণ হয়তো অন্য একটি ভাষার আবেগে অস্তিত্বহীন।
আসলে সাহিত্যে নিছক একটি গল্প বা বিষয় তো নয়, তার সঙ্গে যে ভাষায় সেই সাহিত্যটি রচনা করা হছে সেই ভাষার মানুষদের জীবননির্বাহ প্রক্রিয়া, তাদের অঞ্চলভিত্তিক আবহাওয়া ঋতুপর্ব, পরিবেশ, চেহারা সবকিছু মিশে থাকে। এই সব মিলেই একটি সাহিত্যপাঠ সম্পূর্ণ হয়। আমি যখন গ্যাব্রিয়েল নামের এক মেষপালকের সঙ্গে এলিনা নামের কোনো নারীচরিত্রের কথোপকথন বাংলা অনুবাদে পড়ব তখনই আমার কল্পনায় নন্দিনীর অনুসৃত বাক্যবন্ধের সঙ্গে ড্রেসিংগাউন পরিহিত সোনালী চুলের কন্যার তুষারপাতের সন্ধ্যা মিশে যেতে চাইবে। কারণ কথোপকথনের প্রত্যক্ষ প্রভাব যেমন থাকবে তেমনই চরিত্রের নামের প্রভাবও থাকবে। তাহলে কি অনুবাদ হবে না? নাকি অনুবাদের ক্ষেত্রে চরিত্রের নাম, জায়গার নাম বদল করে অনুবাদ করতে হবে? সেও এক অসম্ভব বিষয়। কারণ মূল লেখার পটভূমিকা বদল করলে সরাসরি লেখাটিকেই বদলে ফেলা হয়। সেক্ষেত্রে অন্তত মূল ভাষাটির উপরে অনুবাদকের দখল থাকলে সেই অনুবাদে অন্তত কাছাকাছি ধরনের এক ভাবনার সমুখে পাঠককে নিয়ে যেতে পারে এইমাত্র। ‘মার্কিন অধ্যাপক বার্টন রাফায়েল এর কথা অনুযায়ী, এমন দুটো ভাষা নেই যার ফনোলজি বা ধ্বনিবিজ্ঞান অভিন্ন। কোনো দুই ভাষা নেই যার সাংস্কৃতিক ইতিহাস অভিন্ন, সে-কারণে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় তার সাংস্কৃতিক চরিত্র – রাফায়েলের ভাষায় ‘লিটারেরি ফর্ম’ – পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। আর তা সম্ভব নয় বলেই অনুবাদে যা অর্জন সম্ভব তা বড়জোর মূলের একটি ভাষান্তর, বাঙালি অনুবাদক রাধা চক্রবর্তী রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গেই যাঁকে বলেছেন ‘ইন্টারপ্রিটেশন’। ঠিক একই কথা বলেছেন ইংরেজ লেখক থিয়োডোর সাভোরি। তাঁর কথায় ‘দোভাষী’ হিসেবে অনুবাদকের কাজ ‘মূল লেখক ও তাঁর পাঠকদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধের দায়িত্ব পালন।’ এই কারণে একই রচনা ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদকের হাতে স্বতন্ত্র রূপান্তর অর্জন করে। কবি শঙ্খ ঘোষ এই সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি হিসেবে প্রস্তাব করেছিলেন অনুবাদকে ‘অনুসর্জন’ বলাই অধিক সংগত।’ বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, কোনো সাহিত্য সৃষ্টিকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করার সময় মূল সংস্কৃতির কিছু অংশ এবং ভাষাগত সূক্ষ্মতা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রবীন্দ্রনাথ নিজের ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে মন্তব্য করে বলেছিলেন যে এই অনুবাদগুলো মূল রচনার সম্পূর্ণ প্রতিফলন নয়। গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে অনুবাদ করার সময় তিনি কখনই আক্ষরিক অনুবাদের দিকে ঝোঁকেননি। আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্টের একটি বিখ্যাত উক্তি হলো, “Poetry is what gets lost in translation.”
এই যা কিছু হারায় তার সবটুকু হারায় না। কিছু রয়ে যায়। তেমন কবিতা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ যা কিছুর অনুবাদ হয় তার যাকিছু রয়ে যায় তা হলো এক নতুন সাহিত্যধারা। মূল রচনার ছায়ায় লিখিত অনুবাদ এক নতুন অবয়ব পায়। সে অবয়ব কিঞ্চিৎ অনুবাদকের, কিঞ্চিৎ মূল লেখকের আর অনেকখানি মূল সাহিত্যের। সব মিলিয়ে মিশিয়ে এক নতুন সাহিত্যচর্চা যা বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে এক ভাষায় লিখিত আখ্যানকে অন্য ভাষার কাছে পৌঁছে দেয় এক নতুন ভাবধারায়।

তথ্যঋণ: কালি ও কলম অনলাইন পত্রিকা

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes