আলোকের সাধনা (টমাস আলভা এডিসনের জীবন-কাহিনি) (ত্রয়োদশ-চতুর্দশ পর্ব) হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

আলোকের সাধনা (টমাস আলভা এডিসনের জীবন-কাহিনি) (ত্রয়োদশ-চতুর্দশ পর্ব) হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

১৩)
মেনলো পার্কের বাজিকর
এডিসন তার জীবনকালে মেনলো পার্কের বাজিকর নামে সমগ্র পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে পড়েছিলেন।যে বিস্ময়কর কাজ করে তিনি এই উপাধি লাভ করেছিলেন সেই কাজটি আমাদের পৃথিবীর রূপ সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিল। সেই কাজটি কী ছিল এবং এডিসন কীভাবে এই উপাধি পেয়েছিলেন সেই কাহিনি পরের একটি অধ্যায়ে বলা হবে। এখন আমরা এটা বললেই যথেষ্ট হবে যে ১৮৭৬ সনে এডিসন নেবার্ক ত্যাগ করে মেনরো পার্ক নামে জায়গায় দিয়ে সেখানে তার কারখানা এবং গবেষণাগার স্থাপন করলেন। যে সমস্ত উদ্ভাবনা এবং আবিষ্কারের জন্য এডিসন মানুষের ইতিহাসে অমরত্ব অর্জন করেছেন এবং আধুনিক জগতের অন্যতম নির্মাতা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছেন সেই প্রতিটি উদ্ভাবনা এবং আবিষ্কার তিনি করেছিলেন মেনলো পার্কের কারখানা এবং গবেষণাগারে। সেই জন্য এডিসনের নামের সঙ্গে মেন্লো পার্ক নামের জায়গাটা অবিচ্ছেদ ভাবে জড়িত।
যে বছর এডিসন  নেবার্ক ত্যাগ করে মেনলো পার্ক  নামের জায়গায়  তাঁর কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় আরম্ভ করেছিলেন, সেই বছর অর্থাৎ ১৮৭৬ সনে আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল নামের একজন বিজ্ঞানী টেলিফোন নামের একটি অভিনব যন্ত্র উদ্ভাবন করে প্রথমবারের জন্য তাকে মানুষের সামনে প্রদর্শন করেছিলেন।টেলিফোন কী জিনিস সে কথা আজ আর কাউকে বুঝিয়ে বলতে হয় না।  আজ থেকে মাত্র ছয় কুড়ি বছর আগেও যে জিনিসটির সম্ভাবনা মানুষের জন্য কল্পনা করা অসম্ভব ছিল সেই জিনিসই আজ আধুনিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। উন্নতির একটি প্রধান মাপকাঠি হয়ে পড়েছে টেলিফোন। এর ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া মানুষের জন্য একদিনের জন্য টেলিফোন বিকল হয়ে থাকা  মানে একটি বড়ো বিপর্যয়।
  প্রসঙ্গক্রমে এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো হবে।  ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল। ইতিহাসে এই ঘটনা শিল্প-বিপ্লব নামে বিখ্যাত।  এই বিষয়ে বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে একটি বড়ো গ্রন্থ লিখতে হবে।  খুব সংক্ষিপ্তভাবে বলতে গেলে এই সময়ে বাষ্প চালিত ইঞ্জিনকে ধরে নিয়ে অনেক নতুন নতুন যান্ত্রিক এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উদ্ভাবিত হওয়ার ফলে অনেক বড়ো বড়ো কারখানা গড়ে উঠল। এই কারখানাগুলোতে কাজ করে ধনসঞ্চয় করার জন্য গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্রোত বইতে লাগল। হাজার হাজার বছর ধরে কেবল কৃষির ওপরে নির্ভর করে থাকা মানুষ উৎপাদন এবং জীবিকা উপার্জনের একটি নতুন পথ খুঁজে পেল। আগে ছিল শুধুমাত্র কৃষি। এখন তার সঙ্গে  নতুন করে যুক্ত হল  শিল্প। শিল্পের যুগ আরম্ভ হওয়া এই ঘটনাটিকে বিপ্লব বলে এই জন্যই বলা হয় যে এর ফলে সমাজের গাঁথুনি,অর্থনীতি মানুষের জীবন ধারা এবং মনস্তত্ত্বের বিরাট পরিবর্তন ঘটতে লাগল। প্রথমে গ্রেট ব্রিটেনে আরম্ভ হওয়া এই শিল্প বিপ্লব ক্রমে ক্রমে ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ল। ইউরোপীয় দেশগুলি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ স্থাপন করার পরে এই বিপ্লবের ঢেউ এশিয়াকেও স্পর্শ করল। অবশ্য এই ক্ষেত্রে একমাত্র জাপান ছাড়া  এশিয়ার অন্য কোনো দেশই ইউরোপ আমেরিকা উন্নত দেশগুলির  সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারল না।
শিল্প বিপ্লবের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল  বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিদ্যা।  পৃথিবীর দেশে দেশে শিল্পের প্রসার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন নতুন যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হল।  মানুষের মনগুলিও নতুন নতুন যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করার চিন্তায়  মাতাল হয়ে উঠল।  শিল্প বিপ্লব মানুষের মনে যে নতুন প্রেরণা এনে ছিল তার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছিল  টমাস আলভা এডিসনের জীবনে।
শিল্প বিপ্লব মানুষের  সভ্যতায়  আরও একটি বড়ো ঘটনা ঘটাল।  সেই ঘটনাগুলির তাৎপর্য বোঝার জন্য চেষ্টা না করলে টমাস আল্ভা এডিসনের  জীবনী পড়ে বিশেষ কোনো  লাভ হবে না। শিল্প বিপ্লব আরম্ভ হওয়ার আগে পর্যন্ত মানুষ কয়েক হাজার বছর ধরে এমন একটি পৃথিবীতে বাস করত— যে পৃথিবীতে মানুষ কোনো পরিবর্তন আশা করত না।গরু, ঘোড়া, লাঙ্গল পালতোলা জাহাজ হাজার হাজার বছর ধরে এসবই ছিল মানুষের প্রধান অবলম্বন এবং এইসবের বিকাশ বা পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা ছিল না ।ফলে মানুষের মনগুলি এমনভাবে গড়ে উঠেছিল যে তারা   কলুর বলদের মতো এক জায়গায় ঘুরতে থাকাটাই একমাত্র বিধিলিপি বলে গ্রহণ করেছিল, তারা কখনও পরিবর্তনের আশা বা কল্পনা করত না।
কিন্তু শিল্প বিপ্লবের পরে প্রায় সমগ্র উনিশ শতক ধরে একের পর এক প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং যান্ত্রিক উদ্ভাবনা গুলি  আবিষ্কার হতে লাগল। টমাস আলভা এডিসন একাই  এক হাজারের বেশি নতুন জিনিস উদ্ভাবন করেছিলেন।  এই নিত্য নতুন আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনা গুলি মানুষের মনে একটি বিপ্লব নিয়ে এল।  হাজার হাজার বছর ধরে কোনো ধরনের পরিবর্তনের আশা না করা মানুষগুলি এখন প্রতিদিনই পরিবর্তনের আশা করতে লাগল। একবার উদ্ভাবিত হওয়া যন্ত্র চিরকাল একই অবস্থায় থাকতে পারে না।  অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষ অবিরাম ভাবে যন্ত্রের উন্নতি তথা পরিবর্তন ঘটিয়ে থাকে।  রেলগাড়ি, মোটরগাড়ি, এরোপ্লেন, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ, টেলিভিশন– গত একশত বছরে মানুষ আবিষ্কার এবং উদ্ভাবন করা সমস্ত জিনিসই  ক্রমান্বয়ে উন্নত হতে শুরু করেছে। প্রতিদিনই সেই জিনিসগুলি নতুন নতুন রূপ লাভ করছে। প্রতিদিন চোখের সামনে এই অবিরাম পরিবর্তন দেখে দেখে মানুষের মনে এখন এই ধারণা বদ্ধমূল  হয়ে পড়েছে যে পরিবর্তন এবং ক্রমোৎকর্ষ হল জীবনের ধর্ম। এটাকেই বলা হয় আধুনিক মন। অতীতের কোনো যুগেই মানুষের এই ধরনের একটি মন গড়ে ওঠেনি।
  এতগুলি কথা মনে এল আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের টেলিফোনের প্রসঙ্গ আসার সঙ্গে সঙ্গে।
  আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করেছিলেন যদিও তাকে ব্যবহারের উপযোগী করে নতুন রূপ দান করেছিলেন টমাস আলভা এডিসন।  তিনি নিজে এক হাজারের  বেশি নতুন যন্ত্র এবং সরঞ্জাম উদ্ভাবন করা ছাড়াও অন্যের আবিষ্কার করা অনেক যন্ত্রকে  উন্নতরূপ দান করেছিলেন। বেল টেলিফোনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি আবিষ্কার করেছিলেন;  কিন্তু তার সাহায্যে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী টেলিফোন নির্মাণ করার জন্য তিনি উপায় খুঁজে পাননি।  উদাহরণস্বরূপ টেলিফোনে প্রেরক এবং গ্রাহক যন্ত্র দুটি ছিল; কিন্তু মানুষ কথা বলার জন্য তার মধ্যে মাউথ পিস ছিল না।বেলের টেলিফোনে এডিসন  মাউথ পিস যুক্ত করলেন।  তা ছাড়া তিনি বেলের ফোনে থাকা প্রেরক চুম্বকের পরিবর্তে কার্বন প্রয়োগের ব্যবহার করে টেলিফোনকে এরকম একটি উন্নত রূপদান করলেন যে মানুষ তাকে অতি সহজে  ব্যবহার করতে সক্ষম হল।  তারপরে  টেলিফোনের ব্যাপক প্রচলন শুরু হল।
১৮৬৯ সনে এডিসন বোস্টন থেকে এসে কপর্দকহীন অবস্থায় নিউইয়র্কে উপস্থিত হওয়ার পরে চাকরির সন্ধানে তিনি যে সমস্ত কোম্পানির দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সেইসবের ভেতরে একটি ছিল ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানি। কিন্তু কোম্পানিটির কার্যালয়ের দরজার সামনে থেকে তাকে নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল। কোম্পানি তাকে  চাকরির যোগ্য বলে বিবেচনা করেন নি।
বেলের টেলিফোনের জন্য কার্বন-ট্রান্সমিটার অর্থাৎ কার্বন প্রেরক আবিষ্কার করার পরে এডিসন দ্বিতীয়বারের জন্য ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করার প্রয়োজন অনুভব করলেন। অবশ্য তার এবারের আগমনের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ পৃথক। তার মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানি তার এই নতুন আবিষ্কারের প্রতি নিশ্চয় প্রবল আগ্রহ অনুভব করবে। তাঁর অনুমান সত্য বলে প্রমাণিত হল। কোম্পানিটির অধ্যক্ষ এডিসনের হাত থেকে টেলিফোনটি নিজের হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচড়া করে দেখে উত্তেজনায় চেয়ার থেকে লাফ মেরে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপরে এডিসনের কাছে গিয়ে আদর করে তার হাতটা ধরে অধ্যক্ষ বললেন–’ মিঃ এডিসন আমি কী বলে আপনাকে অভিনন্দন জানাব সে কথা ভেবে পাচ্ছি না। আপনি এরকম একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন যা মানুষের জীবনে আগে কোনোদিন ভাবতে না পারা পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এটা পৃথিবীতে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে। এই আবিষ্কারের জন্য সমগ্র মানবজাতি আপনার কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে।’
অধ্যক্ষের প্রশংসা শুনে স্বাভাবিকভাবেই এডিসন অভিভূত হলেন। বিশেষ করে যখন অধ্যক্ষ বললেন যে এডিসনের এই আবিষ্কার পৃথিবীতে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে, তখন তিনি একটি গভীর সন্তুষ্টি লাভ করলেন। নিজের আবিষ্কার গুলির দ্বারা পৃথিবীকে আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত করে রেখে যাওয়াটাই ছিল এডিসনের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রশংসা পর্ব শেষ হওয়ার পরে কোম্পানির অধ্যক্ষ পুনরায় বললেন— মিঃ এডিসন আমরা আপনার এই যন্ত্রটির মালিকানা স্বত্ব কিনে নিতে চাই এবং তার জন্য আপনাকে এক লক্ষ ডলার দিতে চাই।
  এডিসনের আগে আবিষ্কার করা টেলিগ্রাফ প্রিন্টিং মেশিন থেকে মূল্য হিসেবে তিনি আশা করেছিলেন মাত্র পাঁচ হাজার ডলার বা তার চেয়ে কিছু কম। কিন্তু তাকে বিস্মিত করে দিয়ে গোল্ড ইন্ডিকেটর কোম্পানি তাকে দিয়েছিল আশাতীত চল্লিশ হাজার ডলার। এবারও ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। কার্বন ট্রান্সমিটারের জন্য এডিসন এক লক্ষ ডলার পাবেন বলে কখনও আশা করেননি। কিন্তু একথা ঠিক যে এডিসন তার বাল্যকাল থেকে করে আসা কঠোর তপস্যার পুরস্কার পেতে শুরু করেছিলেন।
এর কিছুদিন পরে এডিসন একদিন ইংল্যান্ড থেকে একটি চিঠি পেলেন। এবারও তিনি আশ্চর্য হলেন, কিন্তু একটু অন্যভাবে।
  চিঠিটির মাধ্যমে ইংল্যান্ডের একটি ব্যাবসায়ী প্রতিষ্ঠান এডিসনের কাছে এই বলে আবেদন করেছেন যে এডিসনের টেলিফোন তাদের দেশে ব্যবহার করার জন্য অনুমতি চাই। এডিসনের অনুমতির বিনিময়ে তারা ত্রিশ হাজার দিতে প্রস্তুত আছে।
এডিসন স্বাভাবিকভাবে কিছুটা হতাশ হলেন। মাত্র ত্রিশ হাজার? অথচ মাত্র কিছুদিন আগে একই টেলিফোনের জন্য তিনি একটি আমেরিকান কোম্পানি থেকে পেয়েছেন এক লক্ষ ডলার। কিছুটা হতাশ হলেও মাত্র ত্রিশ হাজারে ইংল্যান্ডের কোম্পানিটিকে তিনি টেলিফোনের স্বত্ব বিক্রি করতে রাজি হলেন। কিন্তু চেকটি যখন  এডিসনের হাতে পড়ল, তিনি অবাক হয়ে দেখলেন যে ত্রিশ হাজার ডলার নয় চেকটি ছিল ত্রিশ হাজার পাউন্ডের। ডলারের হিসেবে প্রায় দেড় লক্ষ ডলার!  আসলে চিঠিটা  সংক্ষেপে লেখার জন্য  তার বুঝতে ভুল হয়েছিল।
১৪

’গ্রামোফোনের আবিষ্কার

টমাস আলভা এডিসনের দুটি যুগান্তকারী আবিষ্কার হল যথাক্রমে গ্রামোফোন এবং বিজলি বাতি। প্রথমটির আবিষ্কার পৃথিবীকে শব্দময় করে তুলেছে; দ্বিতীয়টির আবিষ্কার পৃথিবীকে করে তুলেছে আলোকময়। বিজলি বাতির কথা পরের অধ্যায়ে বলা হবে। প্রথমে গ্রামোফোনের কথা বলে নেওয়া যাক।

এতক্ষণ ধরে টমাস আলভা এডিসনের কথাই বলছি । পাঠকদের অনুমতি নিয়ে এখানে প্রসঙ্গক্রমে নিজের কথাও একটু বলছি। অনেক বছর আগেই আমি যখন একটি গ্রামের ছোটো ছেলে ছিলাম তখন আমাদের গ্রামের তিনজন ধনী মানুষের বাড়িতে কলের গান তথা গ্রামোফোন ছিল। তাদেরই একজন ছিলেন আমার জ্যাঠা। ফলে জ্যাঠার বাড়িতে গিয়ে আমাদের বাড়ির ছেলেমেয়েরা ও কলের গান শোনার সুযোগ পেয়েছিল। একটি নির্জীব যন্ত্রের পেট থেকে কীভাবে এত নিখুঁতভাবে মানুষের কণ্ঠস্বর বের হতে পারে সে কথা ভেবে ভেবে আমরা কোনো কুল কিনারা পেতাম না। গান আমাদের কানে মধু বর্ষণ করত; কিন্তু মনে জাগিয়ে তুলেছিল অপার বিস্ময়। আধুনিক জগতের বিস্ময়কর বস্তুগুলির ভেতরে যার সঙ্গে আমাদের দুর্গম জকাইচুকিয়া গ্রামের প্রথম পরিচয় ঘটেছিল সেটি হল কলের গান।

কিছুদিন পরে আমাদের নিজেদের বাড়িতে ও একটি কলের গান এল। গ্রামের চতুর্থ কলের গান। কলের গানটি আমাদের বাড়িতে পৌঁছানোর সময় ঘটা নাটকীয় ঘটনা গুলির স্মৃতি আমার মনে এখন ও এমনভাবে জীবন্ত হয়ে আছে–যেন মাত্র গতকালই সমস্ত ঘটনাগুলো ঘটেছিল।

আমাদের বাড়িতে কলের গানের আগমনের আগমন বার্তা সকাল থেকেই সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রত্যেকেই জানতে পেরেছিল ডিব্রুগড় শহর থেকে দুদিন ধরে দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করে সেদিন বিকেলে কলের গানটি আমাদের বাড়িতে এসে পৌঁছানোর কথা। প্রায় বিকেল থেকেই গ্রামের ছেলে বুড়ো পুরুষ মহিলা প্রতিটি মানুষ আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের উঠোনে জমায়েত হতে শুরু করেছিল। কলের গান কাছ থেকে দেখার জন্য বা  শোনার জন্য তারা তখন পর্যন্ত কোনো সুযোগ পায়নি। নিজেদের প্রতিবেশীর বাড়িতে কলের গান এসেছে শুনে অপদেবতায় ভর করা বস্তুটি নিজের চোখে দেখার জন্য মানুষগুলি কাজকর্ম ছেড়ে দল বেঁধে আমাদের বাড়িতে এসেছে। উত্তেজনায় কাকের মতো কলরব করতে থাকা মানুষ গুলির চেঁচামেচিতে আমাদের বাড়ি  বিয়ে বাড়িতে  রূপান্তরিত হয়েছিল।

ইতিমধ্যে সন্ধ্যা হতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ তারায় ভরে উঠল। আকাশে চাঁদ ছিল না। ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসা উঠোনে বসে মানুষগুলি কলের গানের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। অনেকক্ষণ কথা বলে এবং চিৎকার চেঁচামেচি করে মানুষগুলি বোধহয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাঁরা ধীরে ধীরে নীরব হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ কোনো একজন চিৎকার করে উঠল–কলের গান এসে গেছে, কলের গান এসে গেছে।’

নীরব এবং শান্ত হয়ে পড়া মানুষগুলির  মধ্যে পুনরায় চাঞ্চল্য দেখা দিল। বসে থাকা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকেই দুয়ারের দিকে তাকাতে লাগল। প্রত্যেকেই দেখতে পেল দুটি মানুষ কাঁধে ভার বেঁধে কলের গানটা  নিয়ে দরজা দিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করছে।

ইতিমধ্যে ঘরের ভেতর থেকে দুটো ল্যাম্প উঠোনে আনা হয়েছিল। কলের গানটা রাখার জন্য একটা পাটিও পেতে রাখা ছিল। কলের গানটা পাটিতে রাখার সঙ্গে সঙ্গে সেটা সামনে থেকে উঁকি দিয়ে দেখার জন্য মানুষগুলোর মধ্যে ঠেলাঠেলি আরম্ভ হয়ে গেল। আমাদের পিতা আগেই অনুমান করেছিলেন যে কলের গানটা বাজিয়ে না শোনানো পর্যন্ত লোকেরা সন্তুষ্ট হবে না। সেই জন্য তিনি কলের গান বাজাতে জানা বুধি মাস্টার নামের একজন মানুষকে আগে থেকেই ডাকিয়ে এনে ঘরের ভেতর বসিয়ে রেখেছিলেন। কলরব বেশি হতে দেখে লোকগুলিকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে বাবা বুধি মাস্টারকে বললেন–’মাস্টার, তুমি কলের গানটায় একটা রেকর্ড  লাগিয়ে দাও তো।’

দুইজন মানুষ কলের গানটার দুপাশে ল্যাম্প দুটো তুলে ধরল। মাস্টার একটা রেকর্ড লাগিয়ে দিয়ে কলের গানের চাবি ঘোরাতে শুরু করল।চাবি ঘোরানোর সম্পূর্ণ হওয়ার পরে তিনি কলের গানের পিনটা রেকর্ডে লাগিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে এক মুহূর্তের মধ্যে একসঙ্গে দুটো ঘটনা ঘটল।প্রথমে রেকর্ড থেকে গান বের করতে লাগল, আর গানের শব্দ মানুষগুলির কানে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকের মুখ থেকে একসঙ্গে বেরিয়ে এল একটি  অস্ফুট চিৎকার।বিস্ময়ের চিৎকারটা কয়েক মুহুর্ত মাত্র স্থায়ী হল। পরের মুহূর্ত থেকেই মানুষগুলি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে নীরবে গান শুনতে লাগল। গানটার প্রথম সারি আমার এখনও খুব ভালোভাবে মনে আছে–’ মন কী করলি এরকম মজার মানব জন্ম পেয়ে।’

গানটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত মানুষগুলি একটুকু নড়াচড়া না করে চুপ করে রইল। কিন্তু যেই গান শেষ হল, প্রত্যেকেই প্রায় একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল–যন্ত্র মানুষের মতো গান গাইতে পারে– এরকম কথা আমরা কখনও বিশ্বাস করিনা। যন্ত্রটির পেটে মানুষ না হলেও নিশ্চয় কোনো ভূত-প্রেত লুকিয়ে আছে। যন্ত্রটা চিড়ে দেখতে পারলে আসল রহস্যটা বোঝা যেত।

আমি উপরে বর্ণিত ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৩৯ সনে। ঠিক একই ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল ১৮৭৭ সনে আমেরিকার মেনলো পার্ক শহরে–যেদিন টমাস আল্ভা এডিসন আবিষ্কার করা প্রথম কি কলগান থেকে বের হওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে অপার বিষয়ে তার সহকারীরা হতভম্ব হয়েছিল, এবং প্রত্যেকেই নিজেকে প্রশ্ন করেছিল–’ এটা কী? বিজ্ঞান না জাদুমন্ত্র?’

টমাস আলভা এডিশনের মনে কল গান তথা পর্নোগ্রাফের ধারণাটা প্রথম কিভাবে এসেছিল সে কথা প্রথমে বলে নিই।

এডিসন তার টেলিফোনটা ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানিকে বিক্রি করার পরে মানুষের মধ্যে টেলিফোনের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য তিনি একটি উপায় বের করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন যে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন কোম্পানির অফিসে থাকা টেলিফোনে গায়ক গান গাইবে, আর সেই গান প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরে থাকা মানুষ তাদের টেলিফোনের মাধ্যমে শুনতে পাবে। তিনি নিজের গবেষণাগারেও টেলিফোন দ্বারা সংযুক্ত করে নিলেন– সংযুক্ত করে নিলেন –যাতে সেই গান তিনি, তার পিতা এবং তার বন্ধুবান্ধবরা ও শুনতে পারে।

যথাসময়ে একটি মধুর গানের ধ্বনি টেলিফোনের মাধ্যমে শ্রোতাদের কানে ভেসে এল। প্রত্যেকেই চমৎকৃত হলেন। কিন্তু তার মধ্যে একজন মন্তব্য করলেন— অত্যন্ত সুন্দর গান সন্দেহ নেই। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের কথা যে গানের জীবন অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। চিত্রকরের একটি ছবি চিরদিনের জন্য থেকে যায়। কিন্তু অন্যদিকে একজন গায়কের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার মধুর কন্ঠ চিরকালের জন্য নিরব হয়।  তার গান যুগোতীর্ণ করে রাখার কোন উপায় নেই। ‘

কথাটা বলে লোকটি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

অন্য একজন বন্ধু তখন বলে উঠল– কিন্তু আমি ভাবি যে যে এডিশন এবং টেলিফোনের মত অত্যাচার্য যন্ত্রগুলো উদ্ভাবন করে বের করতে পেরেছে তার পক্ষে মানুষের কণ্ঠস্বর ধরে রাখা যন্ত্র তৈরি করাটা নিশ্চয় অসম্ভব হবে না।’

বন্ধুটি কথাগুলি বোধ হয় হালকা ভাবেই বলেছিল, কারণ মানুষের কণ্ঠস্বর ধরে রাখতে পারা যন্ত্রের কথা তখন পর্যন্ত মানুষের কল্পনার অতীত ছিল ।

কিন্তু তার কথা এডিসনের কল্পনাকে ভীষণভাবে উত্তেজিত করে তুলল। এরপরে কয়েকদিন ধরে তিনি দিনরাত কেবল সেই কথাটাই ভাবতে লাগলেন। চিন্তা করার সময় এরকম একটি যন্ত্রের কল্পনা তার মনে বাস্তব রূপ নিতে আরম্ভ করল। কয়েকদিন ধরে তিনি কাগজে নানা ধরনের আঁকা বুঁকি করতে লাগলেন। অবশেষে একদিন তার তার যন্ত্রের নক্সাটা সম্পূর্ণ হল।

এডিসনের কারখানায় জন ক্রুয়েসি নামে একজন দক্ষ মেকানিক ছিল। এডিসন তাকে খুব ভালোবাসতেন এবং সবচেয়ে কঠিন কাজের দায়িত্ব গুলি তাকে দিতেন। একদিন এডিসন তাকে ডেকে এনে একটা নক্সা দিয়ে বললেন–এই নক্সাটা দেখে সেই অনুযায়ী একটি যন্ত্র তোমাকে তৈরি করে দিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’

ক্রুয়েসি খুব মনোযোগ দিয়ে নক্সাটি অধ্যয়ন করল। কিন্তু এরকম একটি যন্ত্র কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে সে কথা তার মগজে ঢুকতে পারল না। নিজে নিজে অনেকক্ষণ চিন্তাভাবনা করার পর অবশেষে তিনি এডিসনকে জিজ্ঞেস করলেন–স্যার,এই অদ্ভুত যন্ত্রটি আপনি কী কাজে লাগাবেন?’

এডিসন সংক্ষেপে উত্তর দিলেন–’এই যন্ত্রটি কথা বলবে এবং গানও গাইবে।’

এডিসনের উত্তর শুনে ক্রুয়েসি তাঁর মুখের দিকে তাকালেন। এডিসনের গম্ভীর মুখে তিনি কথাটার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন না। আদেশ অনুসারে কাজ করার জন্য তিনি নিজের কারখানায় চললেন। যেতে যেতে মনে মনে ভাবতে লাগলেন–এডিসনের নিশ্চয় অন্য কোনো মতলব আছে। যন্ত্র কথা বলবে এবং গান গাইতে পারবে বলে এডিসন ও নিশ্চয় বিশ্বাস করে না। তিনি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন।

এডিসনের নক্সাটা দেখে দেখে ক্রুয়েসি যন্ত্রটা তৈরি করলেন। এডিসন ক্রুয়েসিকে সঙ্গে নিয়ে যন্ত্রটা দেখতে গেলেন। অন্য দুজন মেকানিক ইতিমধ্যে যন্ত্রটির কাছে বসে ছিল। দুজনেই যন্ত্রটিকে নানা প্রকারের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও তা দিয়ে কী কাজ হতে পারে বুঝতে না পেরে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। এডিসন তখন তিনজন মেকানিককে নিজের কাছে বসিয়ে নিয়ে যন্ত্রটির বিভিন্ন অংশের কাজগুলি ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। ব্যাখ্যা শেষ হওয়ার পরে তিনি গম্ভীরভাবে ঘোষণা করলেন–’এই যন্ত্রটির কাজ হবে মানুষের কণ্ঠস্বর চিরকালের জন্য ধরে রাখা। মানুষ তো একদিন নাই হয়ে যাবে, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর থেকে যাবে। যন্ত্রটি বাজালেই যেকোনো মুহূর্তে–এমনকি অদূর ভবিষ্যতেও–তার কন্ঠস্বর শোনা যাবে।

এডিসনের কথা শুনে মেকানিক তিন জন একে অপরের চোখের দিকে তাকাতে লাগলেন। চোখের নীরব দৃষ্টির দ্বারা তারা পরস্পরকে এই কথাই বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন যে এডিসনের নিশ্চয় মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটেছে। তার জন্য অবশ্য মানুষটাকে দোষ দেওয়া যায় না। রাতের পর রাত উজাগরে থেকে এত অমানুষিক কঠোর পরিশ্রম করলে যে কোনো মানুষেরই মগজের বিকৃতি ঘটতে পারে। অন্তত সাময়িকভাবে হলেও। এডিসনের জন্য মেকানিক তিনজন গভীর বেদনা অনুভব করলেন।

মেকানিক তিনজন মুখে কিছু না বললেও মনে মনে কী ভাবছেন সে কথা বুঝতে এডিসনের বাকি রইল না। তিনি বললেন–’তোমরা যে আমার কথা বিশ্বাস করছ না সেটা তোমাদের মুখের দিকে  তাকিয়েই আমি বুঝতে পেরেছি। আমার কথা যদি সত্যি সেটা আমাকে  এখন কাজের দ্বারা প্রমাণ করে দেখাতে হবে।’

একথা বলে তিনি যন্ত্রটি ব্যবহার করার জন্য ঠিকঠাক করে নিলেন। শৈশবে পড়া একটি কবিতা তাঁর মুখস্থ ছিল। যন্ত্রটির কথা বলা নলটির কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে তিনি কবিতাটা আবৃত্তি করতে লাগলেন–

Marry had a little lamb

It’s fleece was white as snow,

And everywhere that Marry went

The lamb was sure to go.

কবিতাটা আবৃত্তি করে থাকার সময় এডিসন যন্ত্রটার বিভিন্ন অংশের ঘোরানো পাকানোর  কাজগুলি করছিলেন। মেকানিক কয়েকজন সমস্ত দৃশ্যটা স্তব্ধ  হয়ে দেখছিলেন। এডিসন পাগল হয়ে গেছে বলে তারা আগেই অনুমান করেছিলেন। এখন এডিসনকে যন্ত্রটিকে উদ্দেশ্য করে কবিতা আবৃত্তি করা শুনে তাদের মনে সেই বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বাকি রইল না। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মনের দুঃখে মাথা ঝাঁকাতে লাগলেন।

কিন্তু এদিকে এডিসন নিজের কাজে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যে মেকানিকদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মতো সময় তার ছিল না। তখনই হঠাৎ ঘরের ভেতরে থাকা প্রতিটি মানুষকে চমকে দিয়ে যন্ত্রটি এডিসনের কণ্ঠস্বর অবিকল নকল করে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন:

Marry had little lamb…

মানুষের ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য যন্ত্র কথা বলতে সক্ষম হল, অর্থাৎ যন্ত্র মানুষের কণ্ঠস্বর ধরে রেখে প্রতিধ্বনির মতো সেই কণ্ঠস্বর পুনরাবৃত্তি করতে সক্ষম হল। সীমাহীন বিষ্ময়ে মেকানিক কয়েকজন হতবাক হল। মানুষের কল্পনা ছুঁতে না পারা ঘটনা তাদের চোখের সামনে ঘটল। অনেকক্ষণ পরে যখন ক্রুয়েসি কথা বলার শক্তি ফিরে পেল, তিনি নিষ্ঠাবান খ্রিস্টানের মতো হাত দিয়ে ক্রস চিহ্ন একে ঈশ্বরের নাম নিল। বাকি দুজন মেকানিক নাচতে নাচতে নিজেদের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। মানুষের ইতিহাসে যে একটি নতুন যুগের সূচনা হল সেই কথা অবশেষে তারা বুঝতে পারল।

এডিসন নিজেও প্রথমে এত বেশি কৃতকার্যতা আশা করেনি। আনন্দে তার মনটা ভরে উঠল। কিন্তু তিনি মনে যতখানি আনন্দ অনুভব করেছিলেন বাইরে অন্যকে দেখিয়ে ততখানি আনন্দ প্রকাশ করলেন না। তাঁর একজন আমেরিকান জীবনী লেখকের মতে এডিসন নাকি তার কোনো একজন বন্ধুকে বলেছিলেন–’আমি আমার জীবনে এত বেশি আশ্চর্য কখনও হইনি। যেকোনো কাজেই প্রথম প্রয়াসেই সম্পূর্ণ কৃতকর্ম হলে আমি মনে মনে কিছু একটা ভয় অনুভব করি?’

এডিসন এভাবে ভাবার একটা কারণ আছে। আমরা জানি যে পৃথিবীর অনেক বড়ো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ঘটনাক্রমে আকস্মিকভাবে হয়েছিল। কিন্তু এডিসনের আবিষ্কারগুলির ক্ষেত্রে সে কথা খাটে না। তিনি কিছু একটা আবিষ্কার বা উদ্ভাবনার কাজে হাত দেওয়ার আগে বিষয়টা সম্পর্কে বিস্তারিত অধ্যয়ন এবং চিন্তা করে নেন। তারপরে তিনি অশেষ ধৈর্যের সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম করে সেই বিষয়ে গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে শুরু করেন। উদাহরণস্বরূপ তিনি যখন একটি বিশেষ ধরনের ব্যাটারি (Storage Cell) নির্মাণের কাজ আরম্ভ করেন, তিনি সেই কাজে সফল হওয়ার আগে দশ হাজার বার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হয়। ১০ হাজার বার করা চেষ্টার প্রতিটি চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। একটা কাজ করতে গিয়ে দশ হাজার বার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পরে নতুন করে চেষ্টা আরম্ভ করার মতো মানসিক ধৈর্য পৃথিবীতে কয়জন মানুষের থাকে সেটা বলা কঠিন। এমনকি এডিসনের নিজের সহকারীরাও ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। একজন তো মুখের সামনে বলেই দিয়েছিলেন–’আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে সর্বতো প্রকারে চেষ্টা করে দেখলাম। কিন্তু সমস্ত চেষ্টাই নিষ্ফল হয়েছে। সত্যি কথা বলতে গেলে আমরা কিন্তু আশা হারিয়ে ফেলেছি। আপনি কী বলেন?’

সহকারিটির কথা শুনে এডিসন বিরক্ত হওয়ার পরিবর্তে বিস্মিত হলেন। তিনি বললেন–’তোমরা আশা হারিয়ে ফেলতে পার; কিন্তু আমি আশা হারানোর প্রশ্নই উঠে না। বরং আমি বলতে চাই যে আমি এখন নিজের লক্ষ্যের কাছে পৌঁছে গেছি, কারণ কোন দশ হাজার বার চেষ্টাটা ভুল ছিল সে কথা আমি এখন জানি। সেই সমস্ত ভুলের পুনরাবৃত্তি আমি আর করব না।’

এডিসনের এই সমস্ত কথাই প্রমাণ করে যে তিনি কেবল একজন অসাধারণ প্রতিভাশালী আবিষ্কারকই ছিলেন না; মানুষ হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। তার ধৈর্য- শক্তি, আশাবাদ, অধ্যবসায় এবং পরিশ্রম ক্ষমতা সমস্ত মানুষেরই অনুকরণীয়।

 

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।

অনুবাদক পরিচিতি- ১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত কুড়িটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য  Distinguished Life Membership  এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চুয়াল্লিশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes