
সৃজিতা সান্যাল-এর কবিতাগুচ্ছ
এসকর্ট
তুমি বলছ ‘ভালো লাগছে’, তুমি বলছ “প্রাণচঞ্চল”
অথচ শেষ রক্তবিন্দু মিশে যাচ্ছে অভিনীত প্রেমে
বেড়াতে যাওয়ার গল্প, কোন বই ছিটকে দিল কাল
মুগ্ধতায়, এ জীবনে কত নারী এল আর গেল,
রক্তহীন ক্লান্তিহীন আমি শুধু টেনে নিই শ্বাসে
সুবাতাসশূন্য বায়ু, উগড়ে দিই নায়িকার ছল,
হাস্যকণা, সঙ্গ আর একটুকরো শীতার্ত গোধূলি
বারংবার মরে যাওয়া জোম্বিদেহ নিজমূর্তিধারী
তার থেকে নিংড়ে নিই উজ্জ্বলতা, অপচেষ্টায়
ঢেকে দিচ্ছি মৃতচোখ, গোঙানি ও আর্তচিৎকার
লোকসকল ভালো থাক, হে ঠাকুর, ভ্রান্ত বোঝাতে!
এনকোর
রাত্রের স্বপ্নে তুমি বেঁচে ওঠো, আগের মতোই
মৃত্যু নিয়ে ভয় পাও, কী বা যেন দুরারোগ্য ব্যাধি
বেশিদিন আয়ু নেই, এইবার আগে জেনেছিলে
শীতের ছাদের পাশে দেখি চোখ জলভারে নত
এইবার দিয়ে ফেলি অগণিত ভীরু সান্ত্বনা
অন্ধকারে আশরীর ঢাকা ছিল, যা পারিনি দিতে
আগে, ঝরে পড়ে হিম সেইসব অনাদর ক্ষত
স্বপ্নে, শীতের রাত্রে, তীব্র হয় কন্যার আকুতি
আর যেন এই ঘরে কালান্তক মৃত্যু না ঢোকে!
হঠকারী রোদস্পর্শে স্বপ্ন আর প্রার্থনাগান
যুগপৎ ভেঙে পড়ে, আলো পড়ে না-থাকার গায়ে
নিজ মৃত্যুভয় থেকে ঘরে ফেরো, নিজেরই মরণে।
একাঙ্ক
অনন্ত বন্ধুতাজল, মধ্যে এই নামমাত্র দ্বীপ
রাতের প্রগাঢ় স্নেহে অজাত কুসুম জেগে ওঠে
হে নশ্বর, পানপাত্র, তার স্পর্শে আমিও প্রকৃতি
ছুঁয়ে যাচ্ছি প্রত্নমেঘ, অবিরাম বিদ্যুৎবর্ষণ
কী আশ্চর্যসমূহের মানচিত্র, শরীরদ্রাঘিমা
ছেনে সে খুঁজেছে যাকে তার দিকে অগণিত শর
ছুঁড়ে দাও, জরা নেই, মৃত্যুতেই তৃপ্ত সে আধার!
ভয় লাগে। মনে হয়, সুখস্বপ্ন, অন্ধতাপ্রলাপ,
এ মুহূর্তে ভেঙে যাবে, শোনা যাবে স্পষ্ট চুরমার।
পাষাণে প্রতিষ্ঠা তবু প্রাণ আজ সেই দেবীটির
অকালবোধন আর আশ্রয়ে সিক্ত হয় মাটি
ভোরের উঠোন জানে আমাদের লিপ্ততার কথা
অসম্ভবপ্রায় কোনও সমীকৃতি, যার সবই অজ্ঞাত রাশি,
একমাত্র ধ্রুবকটি রাখা থাক নীহারিকাস্নানে!
এসো, সুসংবাদ
সত্য সেলুকাস, তুমি এরপরও সেই তীর্থে যাবে
যেখানে পৌঁছতে গেলে এত ঈর্ষা, এত রক্তপাত!
বন্ধুতার বুক জুড়ে বিঁধে দেওয়া বিদ্যুৎভোজালি
ফিসফাস, গোপনতা, ইতি গজ ছলনার সুতো
ঢেকে দেয় আমাদের অবারিত কথোপকথন
অথবা আঙুল বদ্ধমুঠি করা, যার নিষ্পেষণে
ঝরে যায়, মরে যায় সকালের স্নিগ্ধতাগুলিও
মিথ্যে হয়। সেলুকাস, আয়নার সমীপে দাঁড়িয়ে
বলতে পারো, এ লীলায় অন্য কোনও প্রবঞ্চনা নেই?
সকলে সমান পেল? কারও ভাগ্যে আঁধার জোটেনি?
তবে কেন একই ভুল, ওই প্রান্তে কী বৈভব পেলে
যার কাছে তুচ্ছ হল এ যাবৎ সঞ্চিত কাহন?
এ কী লাবণ্যে
যে কোনো সহজ স্থান স্মৃতির উদ্রেককারী বলে
ছেড়ে আসি লোকালয়, উন্মথিত বিলোল জনতা
ছেড়ে যাই কতিপয় আলোকিত প্রাচীন সরণী
সময় রৈখিক নয়। যা মৃত তা জেগে ওঠে রোজ।
সময় রৈখিক নয়, বৃত্তাকারে বাহিত বৈভব…
যা ছেড়েছি প্রতিবার সেখানেই ফিরে ফিরে আসা।
সময় রৈখিক নয়, সে কখনও রাখে না নিশান।
আবার রাখেও খুব, ঋতুচিহ্ন গাছের পলাশে
ঝরে যায় বসন্তের আরও কিছু সমূহ সংরাগ
জীর্ণবাস ছেড়ে সেও নতুন বসনে মেতে ওঠে
আমার মধ্যেই তুমি জন্ম নাও অদম্যজাতক!

