
জাফর পানাহির ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ – অসম্পূর্ণ, ভঙ্গুর, উদ্বিগ্ন মানবজীবনের দলিল
জাফর পানাহি ইরানি নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক। ইরানি নিউ ওয়েভের কেন্দ্রে ছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মোহসেন মাখমালবাফ, দারিউশ মেহরজুই প্রমুখ। কিন্তু পানাহি খুব দ্রুত নিজের স্বর খুঁজে নেন। আব্বাস কিয়ারোস্তামির সিনেমা ছিল অধিকতর দার্শনিক, ধ্যানমগ্ন এবং অস্তিত্ববাদী; পানাহির সিনেমা আরও তীক্ষ্ণভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক। তবে দুজনের মধ্যেই একটি গভীর মিল ছিল—দৈনন্দিন জীবনের ভিতর সত্যকে খুঁজে পাওয়া। পানাহির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র “দ্য হোয়াইট বেলুন” একটি ছোট্ট মেয়ের গোল্ডফিশ কেনার গল্প। আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত সাধারণ এই কাহিনির মধ্য দিয়েই তিনি ইরানি সমাজের শ্রেণিবিভাজন, অর্থনৈতিক অসাম্য, শিশুমন এবং সামাজিক সম্পর্কের গভীর বাস্তবতা তুলে ধরেন। এখানেই তাঁর মৌলিকতা—তিনি কখনও বড় রাজনৈতিক বক্তৃতা দেন না; বরং ছোট ঘটনাকে রাজনৈতিক সত্যে পরিণত করেন। এরপর “দ্য মিরর”, “দ্য সার্কল”, “ক্রিমসন গোল্ড”, “অফসাইড”, “থ্রি ফেসেস”, “ট্যাক্সি তেহরান”—প্রতিটি ছবিতেই দেখা যায় রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সংঘাত। বিশেষত “দ্য সার্কল” চলচ্চিত্রে নারীদের জীবনকে তিনি এমনভাবে দেখিয়েছিলেন যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নৈতিকতার মুখোশ ছিঁড়ে দেয়। ছবির নারীরা যেন এক অন্তহীন কারাবৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আইন, ধর্ম, পরিবার, সমাজ—সব মিলিয়ে তারা এমন এক বৃত্তে বন্দি যেখান থেকে বেরোনোর কোনও পথ নেই। “অফসাইড”-এ মেয়েদের ফুটবল স্টেডিয়ামে ঢোকার উপর নিষেধাজ্ঞাকে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে দেখিয়েছিলেন। এই ছবির শক্তি ছিল—এটি কোনও স্লোগানধর্মী নারীবাদী বক্তৃতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার হাস্যকরতা উন্মোচন। মেয়েরা ফুটবল দেখতে চায়, অথচ রাষ্ট্র মনে করে তাদের চোখে পুরুষদের খেলা দেখা বিপজ্জনক! এই অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়েই পানাহি দেখান কীভাবে মৌলবাদী রাষ্ট্র নারীদেহকে নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখে। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও নন্দনতাত্ত্বিক যাত্রারই পরিণতি।
জাফর পানাহির “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু একটি চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করলেই হয় না; বরং সমগ্র ইরানি রাষ্ট্র, ইসলামি মৌলবাদ, রাষ্ট্রীয় সেন্সরশিপ, আধুনিক স্বৈরতন্ত্র, নজরদারির রাজনীতি, নাগরিকের মানসিক অবদমন, এবং চলচ্চিত্রের নৈতিক দায়িত্ব—এই সবকিছুকে একসঙ্গে দেখতে হয়। কারণ পানাহির সিনেমা কোনও বিচ্ছিন্ন শিল্পকর্ম নয়; তা তাঁর জীবন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, তাঁর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, তাঁর চলচ্চিত্রভাষা এবং তাঁর সমগ্র মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” এই অর্থে শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ভাষার বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক সাক্ষ্য। এখানে “অ্যাক্সিডেন্ট” শব্দটি নিছক একটি ঘটনা নয়; বরং ক্ষমতার অভিধানে দায় অস্বীকারের এক কৌশল। আধুনিক রাষ্ট্র বিশেষত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র সবসময় অপরাধকে প্রশাসনিক ভাষায় ঢেকে দিতে চায়। পুলিশি হত্যাকে বলা হয় “দুর্ঘটনা”, হেফাজতে মৃত্যুকে বলা হয় “আত্মহত্যা”, গুমকে বলা হয় “অজানা নিখোঁজ”, আর নাগরিক স্বাধীনতার বিনাশকে বলা হয় “জাতীয় নিরাপত্তা”। পানাহির ছবির শিরোনাম সেই সরকারি ভাষার মুখোশ ছিঁড়ে দেয়।

জাফর পানাহি ইরানি নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক। ইরানি নিউ ওয়েভের কেন্দ্রে ছিলেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মোহসেন মাখমালবাফ, দারিউশ মেহরজুই প্রমুখ। কিন্তু পানাহি খুব দ্রুত নিজের স্বর খুঁজে নেন। আব্বাস কিয়ারোস্তামির সিনেমা ছিল অধিকতর দার্শনিক, ধ্যানমগ্ন এবং অস্তিত্ববাদী; পানাহির সিনেমা আরও তীক্ষ্ণভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক। তবে দুজনের মধ্যেই একটি গভীর মিল ছিল—দৈনন্দিন জীবনের ভিতর সত্যকে খুঁজে পাওয়া। পানাহির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র “দ্য হোয়াইট বেলুন” একটি ছোট্ট মেয়ের গোল্ডফিশ কেনার গল্প। আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত সাধারণ এই কাহিনির মধ্য দিয়েই তিনি ইরানি সমাজের শ্রেণিবিভাজন, অর্থনৈতিক অসাম্য, শিশুমন এবং সামাজিক সম্পর্কের গভীর বাস্তবতা তুলে ধরেন। এখানেই তাঁর মৌলিকতা—তিনি কখনও বড় রাজনৈতিক বক্তৃতা দেন না; বরং ছোট ঘটনাকে রাজনৈতিক সত্যে পরিণত করেন। এরপর “দ্য মিরর”, “দ্য সার্কল”, “ক্রিমসন গোল্ড”, “অফসাইড”, “থ্রি ফেসেস”, “ট্যাক্সি তেহরান”—প্রতিটি ছবিতেই দেখা যায় রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সংঘাত। বিশেষত “দ্য সার্কল” চলচ্চিত্রে নারীদের জীবনকে তিনি এমনভাবে দেখিয়েছিলেন যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নৈতিকতার মুখোশ ছিঁড়ে দেয়। ছবির নারীরা যেন এক অন্তহীন কারাবৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আইন, ধর্ম, পরিবার, সমাজ—সব মিলিয়ে তারা এমন এক বৃত্তে বন্দি যেখান থেকে বেরোনোর কোনও পথ নেই। “অফসাইড”-এ মেয়েদের ফুটবল স্টেডিয়ামে ঢোকার উপর নিষেধাজ্ঞাকে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে দেখিয়েছিলেন। এই ছবির শক্তি ছিল—এটি কোনও স্লোগানধর্মী নারীবাদী বক্তৃতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার হাস্যকরতা উন্মোচন। মেয়েরা ফুটবল দেখতে চায়, অথচ রাষ্ট্র মনে করে তাদের চোখে পুরুষদের খেলা দেখা বিপজ্জনক! এই অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়েই পানাহি দেখান কীভাবে মৌলবাদী রাষ্ট্র নারীদেহকে নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখে। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক ও নন্দনতাত্ত্বিক যাত্রারই পরিণতি।

এই ছবির কাহিনি আপাতদৃষ্টিতে একটি ছোট্ট ঘটনা থেকে শুরু হয়। কিন্তু পানাহির চলচ্চিত্রের মতোই এখানে দৈনন্দিনতা ধীরে ধীরে আতঙ্কে পরিণত হয়। একটি আকস্মিক পরিস্থিতি, একটি সংঘর্ষ, একটি ভুল, অথবা একটি অসাবধান মুহূর্ত—এসবের মধ্য দিয়েই চরিত্ররা বুঝতে শুরু করে যে তারা এমন এক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিতরে বাস করছে যেখানে কোনও ঘটনাই নিছক ব্যক্তিগত নয়। ছবির চরিত্ররা সাধারণ মানুষ—শ্রমজীবী, নিম্নমধ্যবিত্ত, পারিবারিক দায়িত্বে জর্জরিত, অথবা মানসিকভাবে ক্লান্ত। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দমন তাদের প্রত্যেকের শরীরে ও আচরণে ছাপ রেখে গেছে। তারা সাবধানে কথা বলে, হঠাৎ চুপ করে যায়, চারদিকে তাকায়, নিজেদের বাক্য মাঝপথে থামিয়ে দেয়। তাদের শরীরী ভাষাই যেন রাজনৈতিক। এই ছবির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—পানাহি কোনও চরিত্রকে “নায়ক” বানান না। কারণ স্বৈরতান্ত্রিক সমাজে নায়কোচিত স্বাধীনতা থাকে না; থাকে শুধু টিকে থাকার চেষ্টা। ফলে চরিত্রগুলির মানসিক জটিলতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ফুটে ওঠে। কেউ হয়তো নিজের অতীত থেকে পালাতে চাইছে, কেউ রাষ্ট্রীয় অপমানের স্মৃতি বহন করছে, কেউ নিজের সন্তানকে এই সমাজে কীভাবে বড় করবে তা নিয়ে আতঙ্কিত। তাদের ব্যক্তিগত সংকটই ধীরে ধীরে সমষ্টিগত রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়। চরিত্রচিত্রণের ক্ষেত্রে পানাহির দক্ষতা অসাধারণ। তিনি সংলাপের চেয়ে আচরণকে বেশি গুরুত্ব দেন। একটি অসমাপ্ত বাক্য, একটি ক্লান্ত মুখ, একটি দীর্ঘ নীরবতা—এসব দিয়েই তিনি চরিত্রের ইতিহাস নির্মাণ করেন। তাঁর চরিত্ররা কখনও আদর্শিক প্রতীক নয়; তারা রক্তমাংসের মানুষ। কিন্তু তাদের প্রতিটি দৈনন্দিন কাজের উপর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়া পড়ে আছে। কোনও চরিত্র হয়তো হঠাৎ রাস্তার মোড়ে থেমে যায়, কোনও চরিত্র অকারণে ভয় পায়, কোনও চরিত্র পরিবারের সামনে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে। এই ক্ষুদ্র আচরণগুলির মধ্য দিয়েই পানাহি দেখান—স্বৈরতন্ত্র মানুষের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দেয়। ফলে মানুষ নিজেই নিজের সেন্সর হয়ে ওঠে। এই ছবিতে পানাহির রাজনৈতিক বীক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সরাসরি প্রচারধর্মী রাজনৈতিক সিনেমা বানান না। বরং দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামোকে প্রকাশ করেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান গভীরভাবে মানবতাবাদী, কিন্তু সেই মানবতাবাদ কোনও নিরীহ উদারনৈতিকতা নয়। বরং তা মৌলবাদ, রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক মৌলিক অবস্থান। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”-এ তিনি দেখান কীভাবে ইসলামি মৌলবাদ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে গ্রাস করে। ধর্ম এখানে আধ্যাত্মিকতার ভাষা নয়; বরং নিয়ন্ত্রণের ভাষা। রাষ্ট্র নাগরিকদের কী পোশাক পরতে হবে, কীভাবে কথা বলতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে—সবকিছু ঠিক করে দেয়। বিশেষত নারীদের উপর এই নিয়ন্ত্রণ আরও নির্মম। কিন্তু পানাহির রাজনৈতিক শক্তি এখানেই যে তিনি নিপীড়নের পাশাপাশি প্রতিরোধকেও দেখান। তাঁর নারীরা শুধুই ভুক্তভোগী নয়; তারা নীরব বিদ্রোহের প্রতিনিধি।

পানাহির সিনেমায় রাষ্ট্রকে খুব কমই সরাসরি দেখা যায়। পুলিশ, আদালত বা শাসকের উপস্থিতি প্রায়ই পরোক্ষ। কিন্তু সেই অদৃশ্য উপস্থিতিই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। তাঁর চরিত্ররা এমনভাবে আচরণ করে যেন তারা সবসময় নজরদারির মধ্যে আছে। এই জায়গায় মিশেল ফুকোর “প্যানঅপ্টিকন” তত্ত্বের কথা মনে পড়ে। ফুকো দেখিয়েছিলেন আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—মানুষকে এমন অনুভূতি দেওয়া যে তাকে সবসময় দেখা হচ্ছে। ফলে মানুষ নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। পানাহির ছবিতে এই মানসিক নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর চরিত্ররা অনেক সময় এমনকি একা থাকলেও সাবধানী। যেন রাষ্ট্র তাদের মনের ভিতর ঢুকে পড়েছে। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” এই দমবন্ধ মানসিক পরিবেশকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নির্মাণ করে। সিনেমাটোগ্রাফির দিক থেকেও ছবিটি অসাধারণ। পানাহির ক্যামেরা কখনও আড়ম্বরপূর্ণ নয়। বরং বাস্তব লোকেশন, প্রাকৃতিক আলো, সীমিত ফ্রেম, দীর্ঘ শট—এসব ব্যবহার করে তিনি এক ধরনের ডকুমেন্টারি বাস্তবতা তৈরি করেন। অনেক সময় ক্যামেরা স্থির থাকে, চরিত্ররা ফ্রেমে ঢোকে ও বেরিয়ে যায়। এই ভঙ্গি দর্শককে পর্যবেক্ষক করে তোলে। ছবিতে আলো-অন্ধকারের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আধো-আলো ঘর, ফাঁকা রাস্তা, জানালার ভিতর দিয়ে দেখা শহর—সব মিলিয়ে ছবিতে তৈরি হয় স্থায়ী উদ্বেগ। মনে হয় যেন কোনও বিপদ সবসময় কাছেই আছে।
পানাহির ছবিতে গাড়ি একটি পুনরাবর্তিত মোটিফ। “ট্যাক্সি তেহরান”-এ যেমন একটি গাড়ি হয়ে উঠেছিল সমগ্র ইরানি সমাজের ক্ষুদ্র সংস্করণ, তেমনই “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”-এও রাস্তা ও যাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তা এখানে স্বাধীনতার প্রতীক নয়; বরং অনিশ্চয়তার। মানুষ চলেছে, কিন্তু কোথাও পৌঁছতে পারছে না। যাত্রা এখানে স্থায়ী উদ্বাস্তুতার প্রতীক। শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পানাহি অনন্য। তিনি খুব কম ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করেন। বাস্তব শব্দ—দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ, গাড়ির শব্দ, দূরের মানুষের কথা, রাস্তাঘাটের কোলাহল—এসবই ছবির আবহ তৈরি করে। এই বাস্তব শব্দ ছবিটিকে আরও সত্য করে তোলে। আবার নীরবতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় চরিত্ররা দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকে। সেই নীরবতাই সবচেয়ে রাজনৈতিক। কারণ স্বৈরতান্ত্রিক সমাজে মানুষ জানে—বেশি কথা বিপজ্জনক। এই ছবির প্রতীকবাদ অত্যন্ত গভীর। দরজা মানে নিয়ন্ত্রণ—কে ঢুকবে, কে বেরোবে। জানালা মানে বাইরের পৃথিবীর আভাস। রাস্তা মানে চলাচল, কিন্তু একই সঙ্গে নজরদারি। ক্যামেরা মানে সাক্ষ্য। আর “অ্যাক্সিডেন্ট” মানে রাষ্ট্রীয় দায় অস্বীকার। এই প্রতীকগুলি কখনও জোর করে চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং কাহিনির ভিতর স্বাভাবিকভাবে মিশে থাকে।

পানাহির চলচ্চিত্রভাষার সঙ্গে ইতালীয় নব্যবাস্তবতার গভীর সম্পর্ক আছে। ভিত্তোরিও দে সিকার “বাইসাইকেল থিভস”-এর মতোই তিনি সাধারণ মানুষকে কেন্দ্র করেন। কিন্তু তাঁর বাস্তবতা আরও রাজনৈতিক। যুদ্ধোত্তর দারিদ্র্যের বদলে তিনি দেখান রাষ্ট্রীয় দমন, মতপ্রকাশের সংকট এবং মানসিক কারাবাস। তাঁর চরিত্ররা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নিপীড়িত নয়; তারা মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত।
শিশুদের উপস্থিতিও তাঁর ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ। শিশু এখনও সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় ভাষা আয়ত্ত করেনি। ফলে তার চোখে সমাজের ভণ্ডামি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। “দ্য হোয়াইট বেলুন”-এর শিশুটির মতোই পানাহির অন্য ছবিতেও শিশুরা ভবিষ্যতের প্রশ্ন তুলে ধরে। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”-এও শিশুর সম্ভাব্য উপস্থিতি এই প্রশ্ন তোলে—এই সমাজ আগামী প্রজন্মকে কী দিচ্ছে? ভয়, নাকি স্বাধীনতা?
জাফর পানাহির ব্যক্তিগত ইতিহাস তাঁর সিনেমাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। ২০০৯ সালের গণআন্দোলনের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১০ সালে তাঁকে চলচ্চিত্র নির্মাণ, সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং বিদেশযাত্রা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞাই তাঁর শিল্পকে আরও র্যাডিকাল করে তোলে। “দিস ইজ নট আ ফিল্ম” ছবিতে তিনি গৃহবন্দি অবস্থাকে সিনেমায় রূপান্তর করেন। “ক্লোজড কার্টেন”-এ এক বন্ধ ঘরের ভিতর মানসিক অবরুদ্ধতার ছবি আঁকেন। “ট্যাক্সি তেহরান”-এ তিনি নিজেই ট্যাক্সিচালক হয়ে শহরের মানুষের কথা শোনেন। অর্থাৎ রাষ্ট্র তাঁকে যত সীমাবদ্ধ করেছে, তিনি সেই সীমাবদ্ধতাকেই চলচ্চিত্রভাষায় পরিণত করেছেন।
এই জায়গায় তাঁর সঙ্গে আন্দ্রেই তারকোভস্কি, থিও অ্যাঞ্জেলোপোলস, কিংবা রবার ব্রেসোঁর মতো পরিচালকদের তুলনা করা যায়। তবে পানাহির বিশেষত্ব হলো—তিনি গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও মানবিক উষ্ণতা হারান না। তাঁর ছবিতে হতাশা আছে, কিন্তু সম্পূর্ণ নৈরাশ্য নেই। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন—মানুষ এখনও কথা বলতে পারে, হাসতে পারে, একে অপরকে সাহায্য করতে পারে।
হাস্যরস তাঁর একটি বড় অস্ত্র। “অফসাইড”-এ যেমন রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞাকে তিনি ব্যঙ্গ করেছিলেন, তেমনই “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”-এও “অ্যাক্সিডেন্ট” শব্দটির ভিতর ভয়ঙ্কর ব্যঙ্গ আছে। স্বৈরতন্ত্র নিজেকে অত্যন্ত গুরুতর ভাবে দেখতে চায়; হাস্যরস সেই ক্ষমতার অহংকার ভেঙে দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে পানাহি বিপুল সম্মান পেয়েছেন। কান, বার্লিন, ভেনিস—সব বড় চলচ্চিত্র উৎসব তাঁকে সম্মানিত করেছে। অথচ নিজ দেশে তিনি বারবার নিপীড়িত। এই বৈপরীত্য তাঁকে শুধু একজন পরিচালক নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত করেছে।, “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” আধুনিক বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চলচ্চিত্রগুলির একটি। এটি কেবল ইরান সম্পর্কে নয়; বরং সমগ্র পৃথিবীতে ক্রমবর্ধমান নজরদারি, রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ এবং নাগরিক স্বাধীনতার সংকট সম্পর্কে। যখন ক্ষমতা প্রতিটি অন্যায়কে “দুর্ঘটনা” বলে চালিয়ে দিতে চায়, তখন পানাহির সিনেমা স্মরণ করিয়ে দেয়—ইতিহাসের কোনও অপরাধই নিছক আকস্মিক নয়। প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি ভয়, প্রতিটি দমন—একটি বৃহত্তর ক্ষমতার কাঠামোর অংশ। তাঁর সিনেমা তাই কেবল শিল্প নয়; সাক্ষ্য। কেবল কাহিনি নয়; প্রতিরোধ।
জাফর পানাহির “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” এমন এক চলচ্চিত্র যেখানে প্রতিরোধ কোনও সরাসরি স্লোগান নয়, কোনও বিপ্লবী ভাষণ নয়, কোনও সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘোষণাও নয়। বরং প্রতিরোধ এখানে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রতম অঙ্গভঙ্গির ভিতর ছড়িয়ে থাকে। একটি থেমে যাওয়া বাক্য, একটি জানালার দিকে তাকিয়ে থাকা, একটি অস্বস্তিকর নীরবতা, একটি দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কিংবা একটি সাধারণ “দুর্ঘটনা”—এসবের ভিতর দিয়েই ছবিটি রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এই কারণেই “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ-নথি। ছবির প্রতিটি প্রতীক, প্রতিটি দৃশ্যরচনা, প্রতিটি ফ্রেম যেন ক্ষমতার ভাষার বিরুদ্ধে আরেকটি গোপন ভাষা নির্মাণ করে। এই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় প্রতীক অবশ্যই “অ্যাক্সিডেন্ট” বা “দুর্ঘটনা”। আধুনিক রাষ্ট্র বিশেষত স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার অপরাধকে সবসময় দুর্ঘটনার ভাষায় ঢাকতে চায়। কোনও বন্দির মৃত্যু হলে বলা হয়—সে আত্মহত্যা করেছে। কোনও প্রতিবাদকারীর মৃত্যু হলে বলা হয়—দুঃখজনক ঘটনা। কোনও নারীকে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার নামে অপমান করা হলে বলা হয়—আইন রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। অর্থাৎ রাষ্ট্র অপরাধকে ব্যক্তিগত ও আকস্মিক ঘটনার রূপ দিতে চায়, যাতে তার কাঠামোগত দায় অদৃশ্য হয়ে যায়। পানাহি এই ভাষাকে উল্টে দেন। তিনি দেখান—যে সমাজে মানুষের স্বাধীনতা নিয়মিতভাবে দমন করা হয়, সেখানে কোনও দুর্ঘটনাই নিছক দুর্ঘটনা নয়। প্রতিটি ছোট ঘটনা ইতিহাসের দীর্ঘ সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” নামটিই রাষ্ট্রীয় ভাষার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। এই প্রতিরোধের আরেকটি বড় প্রতীক হলো নীরবতা। পানাহির ছবিতে চরিত্ররা খুব কম উচ্চস্বরে কথা বলে। তারা দ্বিধাগ্রস্ত, থেমে থেমে কথা বলে, মাঝপথে বাক্য থামিয়ে দেয়। এই নীরবতা নিছক নান্দনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাজনৈতিক বাস্তবতা। স্বৈরতান্ত্রিক সমাজে মানুষ জানে—ভুল কথা বিপজ্জনক। ফলে ভাষা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যায়। কিন্তু পানাহি এই নীরবতাকেই প্রতিরোধে পরিণত করেন। কারণ রাষ্ট্র চায় মানুষ তার ভাষা ব্যবহার করুক। রাষ্ট্রের দেওয়া শব্দে কথা বলুক। অথচ নীরবতা সেই ভাষাকে প্রত্যাখ্যান করে। এই নীরবতার ভিতর জমে থাকে অস্বীকৃতি।
ছবিতে দরজা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। পানাহির প্রায় সব ছবিতেই দরজা আছে—বন্ধ দরজা, আধখোলা দরজা, অপেক্ষমাণ দরজা। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”-এ দরজা মানে নিয়ন্ত্রণ। কে প্রবেশ করবে, কে বেরোবে, কে আটকে থাকবে—এসবই ক্ষমতা নির্ধারণ করে। কিন্তু একই সঙ্গে দরজা সম্ভাবনারও প্রতীক। কারণ প্রতিটি বন্ধ দরজার মধ্যেই থাকে খোলার সম্ভাবনা। ফলে দরজা দ্বৈত অর্থ বহন করে—দমন এবং প্রতিরোধ। যখন কোনও চরিত্র দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন সেটি শুধু শারীরিক অবস্থান নয়; বরং অস্তিত্বগত প্রশ্ন। সে কি ভেতরে থাকবে, নাকি বাইরে যাবে? সে কি ভয় মেনে নেবে, নাকি বেরিয়ে আসবে? জানালাও এই ছবিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জানালা সবসময় বাইরের পৃথিবীর আভাস দেয়, কিন্তু সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয় না। জানালার ভিতর দিয়ে দেখা যায় আকাশ, রাস্তা, মানুষ—কিন্তু ছোঁয়া যায় না। এই প্রতীকটি স্বৈরতান্ত্রিক সমাজের নাগরিক অবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। মানুষ স্বাধীনতার ধারণা জানে, কিন্তু তা পুরোপুরি অর্জন করতে পারে না। ফলে জানালা হয়ে ওঠে অসম্পূর্ণ মুক্তির প্রতীক। পানাহির ক্যামেরা প্রায়ই জানালার ভিতর দিয়ে বাইরে তাকায়। এই দৃষ্টি আসলে বন্দি মানুষের দৃষ্টি। কিন্তু একই সঙ্গে তা প্রত্যয়ের দৃষ্টিও। কারণ দেখা মানেই এখনও কল্পনা করা সম্ভব। আর কল্পনা রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু।
রাস্তা ও যাত্রা ছবিটির অন্যতম প্রধান প্রতীক। পানাহির সিনেমায় রাস্তা কখনও সরল গন্তব্যে পৌঁছানোর উপায় নয়। বরং রাস্তা মানে অনিশ্চয়তা। “ট্যাক্সি তেহরান”-এর মতোই এখানে চলমানতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ চলেছে, কিন্তু কোথাও পৌঁছতে পারছে না। রাস্তা যেন এক অন্তহীন স্থগিতাবস্থা। এই যাত্রা আধুনিক নাগরিকের রাজনৈতিক অবস্থার প্রতীক। রাষ্ট্র তাকে চলতে দেয়, কিন্তু মুক্ত হতে দেয় না। ফলে যাত্রা হয়ে ওঠে উদ্বাস্তুতার অভিজ্ঞতা। কিন্তু এই চলমানতার মধ্যেই আবার প্রতিরোধও আছে। কারণ চলাচল মানে এখনও সম্পূর্ণ স্থবিরতা আসেনি। মানুষ এখনও রাস্তা ব্যবহার করছে, কথা বলছে, দেখা করছে। অর্থাৎ জীবন এখনও শেষ হয়ে যায়নি। গাড়ি ছবিতে এক চলমান রাজনৈতিক থিয়েটার। ইরানি সিনেমায় গাড়ি বহুদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ। আব্বাস কিয়ারোস্তামি থেকে শুরু করে পানাহি—অনেকেই গাড়িকে ব্যবহার করেছেন সামাজিক ক্ষুদ্রজগত হিসেবে। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”-এ গাড়ির ভিতরকার কথোপকথন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গাড়ি এক অদ্ভুত স্থান—এটি ব্যক্তিগতও নয়, সম্পূর্ণ পাবলিকও নয়। ফলে সেখানে মানুষ সাময়িকভাবে নিজেদের খুলে দিতে পারে। কিন্তু সেই কথোপকথনের উপরও থাকে ভয়। যেন যে কোনও মুহূর্তে কেউ শুনে ফেলতে পারে। ফলে গাড়ি হয়ে ওঠে আধুনিক নাগরিকতার প্রতীক—চলমান, অনিশ্চিত, নজরবন্দি।
পানাহির ক্যামেরাও এই ছবিতে প্রতিরোধের প্রতীক। রাষ্ট্র যখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন ক্যামেরা হয়ে ওঠে সাক্ষ্যদানের মাধ্যম। পানাহির নিজের জীবনই তার প্রমাণ। তাঁকে চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র বুঝেছিল—ক্যামেরা বিপজ্জনক। কারণ ক্যামেরা স্মৃতি তৈরি করে। ক্ষমতা সবসময় চায় মানুষ ভুলে যাক। কিন্তু সিনেমা ভুলতে দেয় না। ফলে “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”-এ ক্যামেরা শুধু দৃশ্য ধারণ করছে না; বরং ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে উঠছে। এই ছবিতে আলো ও অন্ধকারের ব্যবহারও প্রতীকী। আধো-আলো ঘর, ফাঁকা রাস্তা, ছায়ায় ঢাকা মুখ—এসব শুধু বাস্তব পরিবেশ নয়; বরং মানসিক অবস্থার চিত্র। অন্ধকার এখানে ভয়, নজরদারি এবং অজানার প্রতীক। কিন্তু আলোও কখনও সম্পূর্ণ মুক্তির নয়। অনেক সময় আলো কৃত্রিম, ম্লান, অসম্পূর্ণ। যেন স্বাধীনতার সম্ভাবনাও এখনও সম্পূর্ণ নয়। এই আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্ব পুরো ছবির রাজনৈতিক টোন তৈরি করে।
পানাহির ছবিতে শিশুর উপস্থিতি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। শিশু রাষ্ট্রীয় ভাষা পুরোপুরি শেখেনি। ফলে সে সমাজের ভণ্ডামি আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পারে। “দ্য হোয়াইট বেলুন”-এর শিশুটির মতোই এখানে শিশুর সম্ভাব্য উপস্থিতি ভবিষ্যতের প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্র কেমন মানুষ তৈরি করছে? ভয়-শিক্ষিত নাগরিক, নাকি স্বাধীন কল্পনাশক্তিসম্পন্ন মানুষ? শিশুর চোখে সমাজকে দেখানো আসলে রাষ্ট্রীয় ভাষার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। কারণ শিশু এখনও পুরোপুরি রাষ্ট্রের আদর্শগত কাঠামোয় বন্দি হয়নি। ছবির নৈঃশব্দ্যও গভীর প্রতীকী অর্থ বহন করে। পানাহি খুব কম ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করেন। এর ফলে দর্শক বাধ্য হয় বাস্তব শব্দ শুনতে—দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ, দূরের গাড়ির শব্দ, মানুষের হাঁটার শব্দ। এই বাস্তব শব্দগুলি ছবিকে ডকুমেন্টারি বাস্তবতা দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে নৈঃশব্দ্যকে তীব্র করে। যখন কোনও চরিত্র দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থাকে, তখন সেই নীরবতা এক ধরনের রাজনৈতিক আর্তনাদ হয়ে ওঠে। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট”-এর সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ সম্ভবত স্মৃতির ভিতর নিহিত। স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র সবসময় স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। ইতিহাস পুনর্লিখন করে, সত্য মুছে দেয়, মানুষকে ভুলতে বাধ্য করে। কিন্তু পানাহির সিনেমা স্মৃতিকে জীবিত রাখে। তাঁর চরিত্ররা হয়তো সরাসরি অতীতের কথা বলে না, কিন্তু তাদের আচরণের ভিতর সেই ইতিহাসের ছাপ থাকে। একটি ভীত দৃষ্টি, একটি আচমকা চুপ করে যাওয়া, একটি দরজা বন্ধ করার ভঙ্গি—এসবই অতীতের দমনকে বহন করে। ফলে স্মৃতি হয়ে ওঠে প্রতিরোধ। কারণ যতক্ষণ মানুষ মনে রাখে, ততক্ষণ ক্ষমতা সম্পূর্ণ সফল হতে পারে না।
নারী চরিত্রগুলিও এই ছবিতে প্রতিরোধের প্রতীক। ইরানি রাষ্ট্র নারীদেহকে নিয়ন্ত্রণের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে। পোশাক, চলাফেরা, কণ্ঠস্বর, সম্পর্ক—সবকিছুর উপর থাকে রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার নজর। কিন্তু পানাহির নারীরা এই নিয়ন্ত্রণের ভিতরেও নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করে। তারা হয়তো প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করে না, কিন্তু তাদের দৈনন্দিন আচরণেই থাকে অস্বীকৃতি। এই নীরব প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পানাহি বুঝতে পারেন—স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সবসময় প্রকাশ্য বিপ্লব নয়; অনেক সময় তা ছোট ছোট অস্বীকৃতির ভিতর বেঁচে থাকে। পানাহির হাস্যরসও প্রতিরোধের অংশ। স্বৈরতন্ত্র নিজেকে অত্যন্ত গুরুতর ভাবে দেখতে চায়। ফলে ব্যঙ্গ তার জন্য বিপজ্জনক। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” নামটির মধ্যেই আছে এক ভয়ঙ্কর ব্যঙ্গ। রাষ্ট্র যেটিকে দুর্ঘটনা বলে চালাতে চায়, পানাহি সেটিকেই ইতিহাসের অপরাধ হিসেবে দেখান। এই ব্যঙ্গ ক্ষমতার ভাষাকে ভেঙে দেয়। এই ছবিকে প্রতিরোধের চলচ্চিত্র করে তোলে এর নির্মাণপদ্ধতিও। পানাহি নিজেই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার। তাঁকে চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি থামেননি। অর্থাৎ তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রের অস্তিত্বই প্রতিরোধ। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” তাই কেবল বিষয়গতভাবে রাজনৈতিক নয়; তার নির্মাণ নিজেই রাজনৈতিক কর্ম। একটি নিষিদ্ধ পরিচালক যখন এখনও সিনেমা বানান, তখন সেই সিনেমা নিজেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

এই ছবির প্রতীকবাদকে আরও গভীরভাবে বুঝতে গেলে দেখতে হবে কীভাবে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক এখানে একে অপরের ভিতর মিশে যায়। কোনও ব্যক্তিগত ভয় আসলে ব্যক্তিগত থাকে না; তা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ফল। কোনও পারিবারিক উত্তেজনাও শুধু পারিবারিক নয়; তা সামাজিক দমনের প্রতিফলন। ফলে ছবির প্রতিটি ক্ষুদ্র মুহূর্ত বৃহত্তর রাজনৈতিক সত্য বহন করে। জাফর পানাহির চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তিনি কখনও দর্শককে সহজ সমাধান দেন না। তাঁর সিনেমা কোনও বিজয়গাথা নয়। বরং অসম্পূর্ণ, ভঙ্গুর, উদ্বিগ্ন মানবজীবনের দলিল। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণতার মধ্যেই থাকে প্রতিরোধের সম্ভাবনা। কারণ মানুষ এখনও অনুভব করছে, প্রশ্ন করছে, স্মরণ করছে। “ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট” তাই শেষ পর্যন্ত একটি নৈতিক চলচ্চিত্র। এটি আমাদের শেখায়—যখন রাষ্ট্র সত্যকে মুছে দিতে চায়, তখন শিল্পের দায়িত্ব হলো সাক্ষ্য দেওয়া। যখন ক্ষমতা বলে “এ তো দুর্ঘটনা”, তখন সিনেমা বলে “না, এর ইতিহাস আছে।” আর এই ইতিহাসকে মনে রাখার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে প্রতিরোধের সবচেয়ে গভীর শক্তি।


