
রবীন্দ্রনাথের ‘হিন্দুত্ব’ সন্দীপন মজুমদার
রবীন্দ্রনাথের “হিন্দুত্ব” বা ভারতীয় আত্মপরিচয়-বিষয়ক ভাবনাকে যদি তার গভীরতম দার্শনিক উৎসে পৌঁছে বুঝতে হয়, তবে আমাদের অবশ্যই তাঁর বেদ-উপনিষদ-প্রসূত ঈশ্বরচেতনা এবং “সনাতন” ধারণার দিকে ফিরে যেতে হবে। কারণ রবীন্দ্রনাথের কাছে “সনাতন” কোনো গোঁড়া, স্থির, অপরিবর্তনীয় সামাজিক বিধিব্যবস্থার নাম নয়; এটি কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানাও নয়। তাঁর “সনাতন” মূলত এক চিরন্তন আত্মসন্ধান—মানুষ, বিশ্ব ও ব্রহ্মের অন্তর্লীন ঐক্যের উপলব্ধি। এইখানেই তিনি আধুনিক রাজনৈতিক “হিন্দুত্ব”-এর ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর সনাতন ধর্মচেতনা আচারের চেয়ে অন্তর্জাগতিক, সম্প্রদায়ের চেয়ে বিশ্বাত্মক, এবং পরিচয়ের চেয়ে উপলব্ধিমূলক। রবীন্দ্রনাথের মানসগঠনের কেন্দ্রে ছিল উপনিষদ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্ম-ঐতিহ্য তাঁকে যে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেয়, তার মূল উৎস বেদান্ত, বিশেষত উপনিষদের সেই চেতনা যেখানে ঈশ্বর কোনো anthropomorphic বা মানবসদৃশ ব্যক্তিসত্তা নন, বরং সর্বব্যাপী ব্রহ্ম—“সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম”, “ঈশাবাস্যমিদং সর্বং”, “যো দেবঃ অগ্নৌ যো অপ্সু”—অর্থাৎ বিশ্বসত্তার সর্বত্র বিরাজমান এক অন্তর্যামী সত্য। রবীন্দ্রনাথ এই ব্রহ্মচেতনাকে নিছক ধর্মতাত্ত্বিক সত্য হিসেবে নয়, জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর “সাধনা” গ্রন্থে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ভারতীয় সাধনার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আত্মাকে বিশ্বসত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। তাঁর কাছে ঈশ্বর বাইরের কোনো শাসক নন; তিনি অন্তরের মধ্যে ও বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে প্রকাশমান। এইজন্যই তাঁর গানে—“তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম”, “আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে”, “জীবনদেবতা”—ঈশ্বর ব্যক্তিমানুষের আত্মিক অভিজ্ঞতার অংশ। এটি ভক্তি, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য নয়; এটি অনুভব, উপলব্ধি, আত্মবিস্তার।
এই উপনিষদিক চেতনার একটি প্রধান দিক হলো একত্ববোধ। বহুর মধ্যে এক, এবং একের মধ্যে বহু। সনাতন ধর্ম, রবীন্দ্রনাথের পাঠে, কোনো একমাত্রিক dogma নয়; এটি “একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি”—সত্য এক, তার প্রকাশ বহু। এই ধারণাই ভারতীয় ধর্মচিন্তার সহিষ্ণুতা, গ্রহণশীলতা ও বৈচিত্র্যবোধের ভিত্তি। তাই রবীন্দ্রনাথের কাছে হিন্দুধর্মের মহত্ত্ব তার ritual purity-তে নয়, তার spiritual inclusiveness-এ। তিনি বহুবার বলেছেন, ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক শক্তি বহুকে ধারণ করার ক্ষমতায়। তাঁর “ভারততীর্থ” এই সনাতন ধারণার কাব্যিক রূপ—আর্য, অনার্য, শক, হূণ, পাঠান, মোগল—সবাই মিলিত। অর্থাৎ, সনাতন মানে timeless continuity, কিন্তু rigid uniformity নয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। রবীন্দ্রনাথ “সনাতন ধর্ম”কে কখনোই কেবল সামাজিক বিধি, জাতিভেদ, বা প্রথাগত ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের সমার্থক হিসেবে মানেননি। বরং তিনি দেখেছেন, হিন্দু সমাজের বহু ঐতিহাসিক রূপ সনাতন আত্মার পরিপন্থী হয়ে উঠেছে। জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, সামাজিক নিষ্ঠুরতা—এসবের সমালোচনায় তিনি দ্বিধাহীন। কারণ তাঁর কাছে সনাতন ধর্মের সত্য মানুষের আত্মমর্যাদা-বিরোধী হতে পারে না। যদি ব্রহ্ম সর্বভূতে বিরাজমান, তবে কোনো মানুষই অপবিত্র বা বর্জনীয় হতে পারে না। এইখানেই তাঁর সনাতন ধর্মচেতনা সামাজিক সংস্কারের নৈতিক ভিত্তি। অর্থাৎ, তিনি tradition-কে মানেন, কিন্তু tradition-এর নামে injustice-কে নয়। “গোরা” উপন্যাসে এই সনাতন ধর্মচেতনা নাটকীয়ভাবে কাজ করে। গোরা প্রথমে হিন্দুধর্মকে পরিচয়গত ও সাংস্কৃতিক দুর্গ হিসেবে দেখে; কিন্তু শেষে উপলব্ধি করে, ভারতীয় সত্য তার চেয়ে বৃহত্তর। এই উত্তরণ আসলে ritual Hinduism থেকে spiritual India-তে উত্তরণ। রবীন্দ্রনাথ যেন বলতে চান, সনাতন ধর্মের প্রাণ আচার নয়—আত্মার প্রসার।
শান্তিনিকেতন এই ভাবনার শিক্ষামূলক রূপ। আশ্রমের প্রার্থনায় উপনিষদের মন্ত্র—“অসতো মা সদ্গময়”, “তমসো মা জ্যোতির্গময়”, “মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়”—শুধু ধর্মীয় আবৃত্তি নয়; এগুলি মানবিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক যাত্রার প্রতীক। অসত্য থেকে সত্যে, অন্ধকার থেকে আলোতে, সীমা থেকে অমৃতে—এই যাত্রাই রবীন্দ্রনাথের সনাতন ধর্ম। এখানে ধর্ম মানে মুক্তি, জাগরণ, প্রসারণ। তাঁর শিক্ষাদর্শে তাই প্রকৃতি, শিল্প, বিশ্বসংলাপ—সবই আধ্যাত্মিক। কারণ ব্রহ্ম কেবল মন্দিরে নন; জগতে, জ্ঞানে, সৃষ্টিতে। রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রেও বারবার এই ঔপনিষদিক বিশ্বাস ফিরে আসে। ব্যক্তিগত শোক—কাদম্বরী, স্ত্রী, সন্তানহানি—তাঁকে নিছক নৈরাশ্যে ডুবায়নি; বরং জীবনের গভীরতর অর্থ অনুসন্ধানে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর ঈশ্বরচেতনা ব্যক্তিগত সান্ত্বনার চেয়ে ontological faith—অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত অর্থে বিশ্বাস। তাই তাঁর কাছে মৃত্যু শেষ নয়; বিচ্ছেদও সর্বনাশ নয়। “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান”—এমন উচ্চারণ কেবল কবিত্ব নয়; এটি সনাতন আত্মার বিশ্বাস।
“মানুষের ধর্ম” বক্তৃতায় তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ধর্মের মূল কথা কোনো বাহ্য আচার নয়; মানুষের বৃহত্তর সত্তার অনুভব। তিনি লিখেছেন, মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ছাড়িয়ে বৃহতের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই ধর্মের জন্ম। এই বৃহৎ—উপনিষদের ভাষায় ব্রহ্ম। ফলে, তাঁর সনাতন ধর্মচেতনা simultaneously spiritual and ethical। এটি মন্দিরকেন্দ্রিক নয়; মানবকেন্দ্রিক, কিন্তু নাস্তিক মানবতাবাদও নয়—আত্মার বিশ্বগত অর্থে প্রতিষ্ঠিত মানবতাবাদ। “সভ্যতার সংকট”-এ পশ্চিমী বস্তুসভ্যতার নৈতিক ব্যর্থতার মুখে রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সনাতন চেতনার গুরুত্ব অনুভব করেন নতুনভাবে। কিন্তু এখানে কোনো triumphalism নেই। তিনি বলেন না যে ভারতীয় সভ্যতা নিখুঁত; বরং ইঙ্গিত করেন, ভারত যদি তার গভীর আত্মিক ঐতিহ্য—মানবঐক্য, সত্যসন্ধান, আত্মসংযম—পুনরুদ্ধার করতে পারে, তবে সে বিশ্বসভ্যতায় অবদান রাখতে পারে। এই আত্মিক ঐতিহ্যই তাঁর কাছে সনাতন।
তাঁর বহু গানে এই সনাতন ধর্মচেতনা সৌন্দর্যময় হয়ে ওঠে। “নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে”—এখানে ঈশ্বর transcendent yet immanent। “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে”—এখানে আধ্যাত্মিক শুদ্ধি। “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে”—এখানে বিশ্বব্রহ্মের লীলারস। এই ধর্ম neither sectarian nor secular in the reductive sense; এটি cosmic spirituality। সুতরাং, রবীন্দ্রনাথের সনাতন ধর্মচেতনা কয়েকটি মৌল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে: (১) ব্রহ্মের সর্বব্যাপিতা; (২) আত্মা ও বিশ্বাত্মার ঐক্য; (৩) বহুত্বের মধ্যে সত্যের বহুরূপী প্রকাশ; (৪) মানুষের মর্যাদা ও আত্মবিস্তার; (৫) আচার-নির্ভরতার চেয়ে উপলব্ধি; (৬) ঐতিহ্যের আত্মসমালোচনামূলক নবায়ন। এই অর্থে তিনি সনাতন, কারণ তিনি চিরন্তন সত্যে বিশ্বাসী; কিন্তু তিনি গোঁড়া নন, কারণ সেই সত্যকে জীবন্ত ও বিবর্তনশীল মনে করেন।
আজকের প্রেক্ষাপটে, যখন “সনাতন” শব্দটি প্রায়শই রাজনৈতিক বা পরিচয়গত স্লোগানে সংকুচিত হয়, রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে করিয়ে দেন—সনাতন মানে প্রাচীনতার জড়তা নয়; চিরন্তনের সৃজনশীল পুনরাবিষ্কার। বেদ-উপনিষদের যে ঈশ্বরচেতনা তাঁকে গড়ে তুলেছিল, তা বিভাজনের নয়, সংহতির; আধিপত্যের নয়, অন্তর্দীপ্তির; বর্জনের নয়, বিশ্বমানবতার। তাঁর কাছে সত্যিকারের হিন্দু বা সনাতন সেই, যে বিশ্বে ব্রহ্মকে দেখে, মানুষের মধ্যে দেবত্ব অনুভব করে, এবং নিজের ধর্মকে অন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র নয়, আত্মবিস্তারী আলোক হিসেবে ধারণ করে। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের সনাতন ধর্মচেতনা আধুনিক ভারতীয় চিন্তায় এক অনন্য সেতু—ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদ, ভারতীয়তা ও বিশ্বজনীনতার মধ্যে।
রবীন্দ্রনাথের “হিন্দুত্ব” বা ভারতীয় আত্মপরিচয়-বিষয়ক ভাবনাকে যদি তার গভীরতম দার্শনিক উৎসে পৌঁছে বুঝতে হয়, তবে আমাদের অবশ্যই তাঁর বেদ-উপনিষদ-প্রসূত ঈশ্বরচেতনা এবং “সনাতন” ধারণার দিকে ফিরে যেতে হবে। কারণ রবীন্দ্রনাথের কাছে “সনাতন” কোনো গোঁড়া, স্থির, অপরিবর্তনীয় সামাজিক বিধিব্যবস্থার নাম নয়; এটি কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় পরিচয়ের সীমানাও নয়। তাঁর “সনাতন” মূলত এক চিরন্তন আত্মসন্ধান—মানুষ, বিশ্ব ও ব্রহ্মের অন্তর্লীন ঐক্যের উপলব্ধি। এইখানেই তিনি আধুনিক রাজনৈতিক “হিন্দুত্ব”-এর ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর সনাতন ধর্মচেতনা আচারের চেয়ে অন্তর্জাগতিক, সম্প্রদায়ের চেয়ে বিশ্বাত্মক, এবং পরিচয়ের চেয়ে উপলব্ধিমূলক।
রবীন্দ্রনাথের মানসগঠনের কেন্দ্রে ছিল উপনিষদ। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্ম-ঐতিহ্য তাঁকে যে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেয়, তার মূল উৎস বেদান্ত, বিশেষত উপনিষদের সেই চেতনা যেখানে ঈশ্বর কোনো অ্যানথ্রোপোমরফিক বা মানবসদৃশ ব্যক্তিসত্তা নন, বরং সর্বব্যাপী ব্রহ্ম—“সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম”, “ঈশাবাস্যমিদং সর্বং”, “যো দেবঃ অগ্নৌ যো অপ্সু”—অর্থাৎ বিশ্বসত্তার সর্বত্র বিরাজমান এক অন্তর্যামী সত্য। রবীন্দ্রনাথ এই ব্রহ্মচেতনাকে নিছক ধর্মতাত্ত্বিক সত্য হিসেবে নয়, জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর “সাধনা” গ্রন্থে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ভারতীয় সাধনার মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আত্মাকে বিশ্বসত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। তাঁর কাছে ঈশ্বর বাইরের কোনো শাসক নন; তিনি অন্তরের মধ্যে ও বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে প্রকাশমান। এইজন্যই তাঁর গানে—“তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম”, “আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে”, “জীবনদেবতা”—ঈশ্বর ব্যক্তিমানুষের আত্মিক অভিজ্ঞতার অংশ। এটি ভক্তি, কিন্তু অন্ধ আনুগত্য নয়; এটি অনুভব, উপলব্ধি, আত্মবিস্তার।
এই উপনিষদিক চেতনার একটি প্রধান দিক হলো একত্ববোধ। বহুর মধ্যে এক, এবং একের মধ্যে বহু। সনাতন ধর্ম, রবীন্দ্রনাথের পাঠে, কোনো একমাত্রিক ডগমা নয়; এটি “একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি”—সত্য এক, তার প্রকাশ বহু। এই ধারণাই ভারতীয় ধর্মচিন্তার সহিষ্ণুতা, গ্রহণশীলতা ও বৈচিত্র্যবোধের ভিত্তি। তাই রবীন্দ্রনাথের কাছে হিন্দুধর্মের মহত্ত্ব তার রিচুয়াল পিউরিটি-তে নয়, তার স্পিরিচুয়াল ইনক্লুসিভনেস-এ। তিনি বহুবার বলেছেন, ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক শক্তি বহুকে ধারণ করার ক্ষমতায়। তাঁর “ভারততীর্থ” এই সনাতন ধারণার কাব্যিক রূপ—আর্য, অনার্য, শক, হূণ, পাঠান, মোগল—সবাই মিলিত। অর্থাৎ, সনাতন মানে টাইমলেস কন্টিনিউইটি, কিন্তু রিজিড ইউনিফর্মিটি নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। রবীন্দ্রনাথ “সনাতন ধর্ম”কে কখনোই কেবল সামাজিক বিধি, জাতিভেদ, বা প্রথাগত ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের সমার্থক হিসেবে মানেননি। বরং তিনি দেখেছেন, হিন্দু সমাজের বহু ঐতিহাসিক রূপ সনাতন আত্মার পরিপন্থী হয়ে উঠেছে। জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, সামাজিক নিষ্ঠুরতা—এসবের সমালোচনায় তিনি দ্বিধাহীন। কারণ তাঁর কাছে সনাতন ধর্মচেতনার সত্য মানুষের আত্মমর্যাদা-বিরোধী হতে পারে না। যদি ব্রহ্ম সর্বভূতে বিরাজমান, তবে কোনো মানুষই অপবিত্র বা বর্জনীয় হতে পারে না। এইখানেই তাঁর সনাতন ধর্মচেতনা সামাজিক সংস্কারের নৈতিক ভিত্তি। অর্থাৎ, তিনি ট্র্যাডিশন-কে মানেন, কিন্তু ট্র্যাডিশন-এর নামে ইনজাস্টিস-কে নয়।
“গোরা” উপন্যাসে এই সনাতন ধর্মচেতনা নাটকীয়ভাবে কাজ করে। গোরা প্রথমে হিন্দুধর্মকে পরিচয়গত ও সাংস্কৃতিক দুর্গ হিসেবে দেখে; কিন্তু শেষে উপলব্ধি করে, ভারতীয় সত্য তার চেয়ে বৃহত্তর। এই উত্তরণ আসলে রিচুয়াল হিন্দুইজম থেকে স্পিরিচুয়াল ইন্ডিয়া-তে উত্তরণ। রবীন্দ্রনাথ যেন বলতে চান, সনাতন ধর্মের প্রাণ আচার নয়—আত্মার প্রসার।
শান্তিনিকেতন এই ভাবনার শিক্ষামূলক রূপ। আশ্রমের প্রার্থনায় উপনিষদের মন্ত্র—“অসতো মা সদ্গময়”, “তমসো মা জ্যোতির্গময়”, “মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়”—শুধু ধর্মীয় আবৃত্তি নয়; এগুলি মানবিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক যাত্রার প্রতীক। অসত্য থেকে সত্যে, অন্ধকার থেকে আলোতে, সীমা থেকে অমৃতে—এই যাত্রাই রবীন্দ্রনাথের সনাতন ধর্ম। এখানে ধর্ম মানে মুক্তি, জাগরণ, প্রসারণ। তাঁর শিক্ষাদর্শে তাই প্রকৃতি, শিল্প, বিশ্বসংলাপ—সবই আধ্যাত্মিক। কারণ ব্রহ্ম কেবল মন্দিরে নন; জগতে, জ্ঞানে, সৃষ্টিতে।
রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্রেও বারবার এই ঔপনিষদিক বিশ্বাস ফিরে আসে। ব্যক্তিগত শোক—কাদম্বরী, স্ত্রী, সন্তানহানি—তাঁকে নিছক নৈরাশ্যে ডুবায়নি; বরং জীবনের গভীরতর অর্থ অনুসন্ধানে ঠেলে দিয়েছে। তাঁর ঈশ্বরচেতনা ব্যক্তিগত সান্ত্বনার চেয়ে অন্টোলজিক্যাল ফেইথ—অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত অর্থে বিশ্বাস। তাই তাঁর কাছে মৃত্যু শেষ নয়; বিচ্ছেদও সর্বনাশ নয়। “মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান”—এমন উচ্চারণ কেবল কবিত্ব নয়; এটি সনাতন আত্মার বিশ্বাস।
“মানুষের ধর্ম” বক্তৃতায় তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ধর্মের মূল কথা কোনো বাহ্য আচার নয়; মানুষের বৃহত্তর সত্তার অনুভব। তিনি লিখেছেন, মানুষ যখন নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ছাড়িয়ে বৃহতের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই ধর্মের জন্ম। এই বৃহৎ—উপনিষদের ভাষায় ব্রহ্ম। ফলে, তাঁর সনাতন ধর্মচেতনা সিমালটেনিয়াসলি স্পিরিচুয়াল অ্যান্ড এথিক্যাল। এটি মন্দিরকেন্দ্রিক নয়; মানবকেন্দ্রিক, কিন্তু নাস্তিক মানবতাবাদও নয়—আত্মার বিশ্বগত অর্থে প্রতিষ্ঠিত মানবতাবাদ।
“সভ্যতার সংকট”-এ পশ্চিমী বস্তুসভ্যতার নৈতিক ব্যর্থতার মুখে রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সনাতন চেতনার গুরুত্ব অনুভব করেন নতুনভাবে। কিন্তু এখানে কোনো ট্রায়াম্ফালিজম নেই। তিনি বলেন না যে ভারতীয় সভ্যতা নিখুঁত; বরং ইঙ্গিত করেন, ভারত যদি তার গভীর আত্মিক ঐতিহ্য—মানবঐক্য, সত্যসন্ধান, আত্মসংযম—পুনরুদ্ধার করতে পারে, তবে সে বিশ্বসভ্যতায় অবদান রাখতে পারে। এই আত্মিক ঐতিহ্যই তাঁর কাছে সনাতন।
তাঁর বহু গানে এই সনাতন ধর্মচেতনা সৌন্দর্যময় হয়ে ওঠে। “নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে”—এখানে ঈশ্বর ট্রান্সসেন্ডেন্ট ইয়েট ইম্যানেন্ট। “আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে”—এখানে আধ্যাত্মিক শুদ্ধি। “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে”—এখানে বিশ্বব্রহ্মের লীলারস। এই ধর্ম নিধার সেক্টেরিয়ান নর সেক্যুলার ইন দ্য রিডাকটিভ সেন্স; এটি কসমিক স্পিরিচুয়ালিটি।
সুতরাং, রবীন্দ্রনাথের সনাতন ধর্মচেতনা কয়েকটি মৌল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে: (১) ব্রহ্মের সর্বব্যাপিতা; (২) আত্মা ও বিশ্বাত্মার ঐক্য; (৩) বহুত্বের মধ্যে সত্যের বহুরূপী প্রকাশ; (৪) মানুষের মর্যাদা ও আত্মবিস্তার; (৫) আচার-নির্ভরতার চেয়ে উপলব্ধি; (৬) ঐতিহ্যের আত্মসমালোচনামূলক নবায়ন। এই অর্থে তিনি সনাতন, কারণ তিনি চিরন্তন সত্যে বিশ্বাসী; কিন্তু তিনি গোঁড়া নন, কারণ সেই সত্যকে জীবন্ত ও বিবর্তনশীল মনে করেন।
আজকের প্রেক্ষাপটে, যখন “সনাতন” শব্দটি প্রায়শই রাজনৈতিক বা পরিচয়গত স্লোগানে সংকুচিত হয়, রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে করিয়ে দেন—সনাতন মানে প্রাচীনতার জড়তা নয়; চিরন্তনের সৃজনশীল পুনরাবিষ্কার। বেদ-উপনিষদের যে ঈশ্বরচেতনা তাঁকে গড়ে তুলেছিল, তা বিভাজনের নয়, সংহতির; আধিপত্যের নয়, অন্তর্দীপ্তির; বর্জনের নয়, বিশ্বমানবতার। তাঁর কাছে সত্যিকারের হিন্দু বা সনাতন সেই, যে বিশ্বে ব্রহ্মকে দেখে, মানুষের মধ্যে দেবত্ব অনুভব করে, এবং নিজের ধর্মকে অন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র নয়, আত্মবিস্তারী আলোক হিসেবে ধারণ করে। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের সনাতন ধর্মচেতনা আধুনিক ভারতীয় চিন্তায় এক অনন্য সেতু—ঐতিহ্য ও আধুনিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতাবাদ, ভারতীয়তা ও বিশ্বজনীনতার মধ্যে।
রবীন্দ্রনাথকে “হিন্দুত্ব”-এর পরিসরে ফেলা প্রকৃতপক্ষে ঐতিহাসিক ও দার্শনিকভাবে বিভ্রান্তিকর। কারণ তিনি যে বেদ, উপনিষদ, ব্রহ্মচেতনা, ভারতীয় আত্মা বা “সনাতন” নিয়ে ভাবেন, তা আধুনিক রাজনৈতিক “হিন্দুত্ব” তো নয়ই, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক “হিন্দুধর্ম”-এর সঙ্গেও সরলরৈখিকভাবে মেলে না। বরং তাঁর চিন্তা বহু ক্ষেত্রেই “হিন্দু” পরিচয়ের প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোকেও অতিক্রম করে।
রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক উৎস মূলত উপনিষদীয়—অর্থাৎ অস্তিত্ব, আত্মা, বিশ্ব, মানুষ ও অসীমের সম্পর্ক নিয়ে এক দার্শনিক অনুসন্ধান। এখানে “ধর্ম” কোনো সম্প্রদায়গত পরিচয় নয়; এটি সত্তার প্রশ্ন, চেতনার প্রশ্ন, ঐক্যের প্রশ্ন। উপনিষদের “তত্ত্বমসি”, “অহং ব্রহ্মাস্মি”, “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”—এসব কোনো ধর্মীয় বিধি নয়; এগুলি অস্তিত্বতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি। এগুলি মানুষকে “হিন্দু” বানায় না; বরং ব্যক্তি-সত্তাকে বিশ্বসত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত করে। রবীন্দ্রনাথ এই ঐতিহ্যকে গ্রহণ করেছেন “মানুষের ধর্ম” হিসেবে, কোনো সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস হিসেবে নয়।
এইখানেই “হিন্দুধর্ম” এবং “উপনিষদীয় দর্শন”-এর মধ্যে পার্থক্য জরুরি। “হিন্দুধর্ম” ঐতিহাসিকভাবে একটি বহুমাত্রিক সামাজিক-ধর্মীয় গঠন—যেখানে আচার, পুরাণ, মন্দির, জাতিভেদ, সম্প্রদায়, লোকাচার, দর্শন—সব মিশে আছে। কিন্তু উপনিষদীয় জিজ্ঞাসা সেই গঠনের কেবল একটি দার্শনিক স্তর, এবং বহু ক্ষেত্রেই তা আচারনির্ভর ধর্মের সীমা অতিক্রম করে। রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণ ছিল এই দার্শনিক স্তরের প্রতি, সামাজিক ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রতি নয়। তিনি ব্রাহ্ম পরিবারে মানুষ; তাঁর ধর্মভাবনা মূর্তিপূজা, জাতিভেদ, শাস্ত্রীয় অনুশাসনের বাইরে। দেবেন্দ্রনাথীয় ব্রাহ্মধর্মের মধ্য দিয়ে তিনি যে উপনিষদীয় চেতনাকে আত্মস্থ করেন, তা মূলত বিশ্বজনীন আধ্যাত্মিকতা।
“গোরা” উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ আসলে এই পরিচয়-সংকটই বিশ্লেষণ করেছেন। গোরা প্রথমে হিন্দু পরিচয়কে পরম সত্য বলে মানে; কিন্তু উপন্যাসের শেষে সে উপলব্ধি করে, সত্য কোনো সম্প্রদায়গত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতবর্ষ তার কাছে হিন্দু-রাষ্ট্র নয়; বরং বহুস্বরের মানবভূমি। এই রূপান্তর রবীন্দ্রনাথের নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করে—তিনি হিন্দু পরিচয়-রাজনীতির প্রবক্তা নন, বরং পরিচয়-অতিক্রমী চেতনার চিন্তক।
“ধর্ম” সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতাগুলি—বিশেষত “মানুষের ধর্ম”—স্পষ্ট জানায় যে ধর্ম তাঁর কাছে মানুষের বৃহত্তর সত্তার উপলব্ধি। তিনি সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন না। বরং বলেন, মানুষ যখন সীমিত অহং অতিক্রম করে বিশ্বমানবিক সত্যে পৌঁছায়, তখনই ধর্মের জন্ম। এই ধর্ম প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে হিন্দু নয়, মুসলমান নয়, খ্রিস্টানও নয়। এটি অস্তিত্বমুখী ও আধ্যাত্মিক।
রবীন্দ্রনাথের “সাধনা” গ্রন্থে ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার যে পাঠ, তা-ও “হিন্দুধর্ম প্রচার” নয়। তিনি ভারতীয় দর্শনের কিছু মৌল তত্ত্ব—ঐক্য, অসীম, আত্মবিস্তার—বিশ্বমানবতার ভাষায় অনুবাদ করেন। তাঁর কাজ ছিল আধ্যাত্মিক দর্শনকে বিশ্বজনীন মানবতাবাদে রূপান্তর করা। ফলে তাঁকে “হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি” বললেও তা অসম্পূর্ণ; “হিন্দুত্ববাদী” বলা সম্পূর্ণ ভুল।
আধুনিক “হিন্দুত্ব” (বিশেষত সাভারকরীয় অর্থে) একটি রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী নির্মাণ, যার কেন্দ্রে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক পরিচয়, ভূখণ্ড, এবং প্রায়শই সংখ্যাগুরুতাবাদী চেতনা কাজ করে। রবীন্দ্রনাথ এর বিপরীত মেরুতে। তিনি জাতীয়তাবাদের উগ্রতাকে সন্দেহ করেছেন, পরিচয়-আসক্তিকে প্রশ্ন করেছেন, এবং বারবার মানুষকে সম্প্রদায়ের চেয়ে বড় বলেছেন। তাঁর “ভারততীর্থ” কোনো একরৈখিক হিন্দু সভ্যতার কাব্য নয়; এটি বহুস্রোতসমন্বিত সভ্যতার কাব্য।
এমনকি “সনাতন” শব্দটিও রবীন্দ্রনাথের কাছে গোঁড়া হিন্দু ধারাবাহিকতা নয়। তিনি চিরন্তন মানবিক-আধ্যাত্মিক সত্য বোঝাতে পারেন, কিন্তু কোনো স্থির সামাজিক ধর্মীয় আধিপত্য নয়। তিনি ঐতিহ্যকে গ্রহণ করেন যখন তা মুক্তির পথ; প্রত্যাখ্যান করেন যখন তা শৃঙ্খল। জাতিভেদ, নারী-অবদমন, সামাজিক সংকীর্ণতা—এসবের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তা-ই প্রমাণ করে।
শান্তিনিকেতনও এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব রূপ। সেখানে উপনিষদ আছে, কিন্তু সাম্প্রদায়িক হিন্দুধর্ম নেই; প্রার্থনা আছে, কিন্তু সম্প্রদায়গত বর্জন নেই; ভারতীয়তা আছে, কিন্তু জাতীয়তাবাদী অহংকার নেই। এটি “ব্রহ্মবিদ্যালয়”—অর্থাৎ আধ্যাত্মিক উন্মুক্ততার স্থান।
অতএব, রবীন্দ্রনাথকে বোঝার জন্য “হিন্দুত্ব”, “হিন্দুধর্ম”, “উপনিষদীয় দর্শন”, “ব্রাহ্মধর্ম”, “ভারতীয় সভ্যতা”—এই শব্দগুলিকে এক করে ফেললে ভুল হবে। তাঁর চিন্তা মূলত সম্প্রদায়োত্তীর্ণ আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ। তিনি ভারতীয় দর্শনের নির্যাস গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তাকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় পরিচয়ের কারাগারে রাখেননি। তাঁর কাছে উপনিষদ ছিল ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, দার্শনিক মুক্তি।
সবচেয়ে বড় কথা, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় মানুষ ধর্মের আগে। “মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ”—এই উচ্চারণই তাঁর প্রকৃত ধর্মতত্ত্ব। এখানে মানুষ কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের উপশ্রেণি নয়; বরং নৈতিক ও সৃজনশীল সত্তা। তাই তাঁর ব্রহ্মচেতনা বিশ্বজনীন, তাঁর ভারতচেতনা বহুত্ববাদী, তাঁর ধর্মচেতনা মানবতাবাদী।
সুতরাং, বলা অধিকতর সঙ্গত যে রবীন্দ্রনাথ না “হিন্দুত্ববাদী”, না প্রচলিত “হিন্দুধর্মীয়” চিন্তক; তিনি ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের—বিশেষত উপনিষদীয়—এক সৃজনশীল পুনর্নির্মাতা, যিনি সেই ঐতিহ্যকে মানবমুক্তির বিশ্বজনীন ভাষায় রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর কাছে বেদ-উপনিষদ কোনো পরিচয়চিহ্ন নয়; তারা অস্তিত্বময় আলোকপ্রাপ্তি। এই পার্থক্যটিই রবীন্দ্রনাথকে আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক করে।

