
রবীন্দ্রনাথের ধর্ম সব্যসাচী মজুমদার
কবির ধর্ম পালন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। আত্ম দ্বন্দ্বে ও দ্বৈরথে নির্মাণ করেছেন তাঁর কবি জীবনের দর্শনকে। প্রতি মুহূর্তে চিন্তা করেছেন সম্পর্ক নির্মাণ বিষয়ে। প্রতি মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্ক তৈরি করেছেন মননের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে, পৃথিবীর সঙ্গে। একটি জীবন্ত অস্তিত্বের ভেতর আরেকটি জীবন্ত অস্তিত্ব যেমন নিয়ত সক্রিয় থেকে যায়, এই পৃথিবীর রবীন্দ্রনাথ ঠিক তেমন।
কবি ধর্মে রবীন্দ্রনাথ কি কেবলই পিওর পোয়েট! মানে, ব্যকরণানুসারে পিওর পোয়েট্রি বলতে যা বোঝায়, রবীন্দ্রনাথের কবিতা কি কেবলই সেই স্বভাবেই স্নাত ! আমরা যারা চেষ্টা করেছি রবীন্দ্রনাথের কবিতা সম্ভারকে মোটামুটি জেনে রাখতে, আমরা জানি, কেবল তো বিশুদ্ধ কবিতাই নয়, একজন অতিসক্রিয় মানুষের জীবন যত রকম বাঁক বদল করতে পারে, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ঠিক ততটাই বহু বিস্তারি। সে কখনও ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’, কখনও ” কবিদল চিৎকারিছে জাগাইয়া ভীতি/ শ্মশান কুক্কুরদের কাড়াকাড়ি গীতি”, কখনও ‘ কাল পারাবার করিতেছ পার/ কেহ নাহি জানে কেমনে ! ” আবার সে আহ্বান রাখে ‘ সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরে’ আবার আর্তি স্বর উদ্বেল করে, ‘ নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ, / ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।’
অর্থাৎ, ঘটমান ভারতের যাবতীয় মনস্তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক বিবর্তনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন — এ কথায় আমরা সকলেই সহমত পোষণ করব সম্ভবত। মানুষের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথ সমানভাবে ওয়াকিবহাল ও প্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন। এবং ডি এন এ-র মতো ক্রিয়াশীল ধর্ম বোধ স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে অবশ্যই ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। এ বিষয়ে আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছু প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। আমরা এও জানি যে, রবীন্দ্রনাথের প্রত্যেকটি ধারণা একটি সুস্পষ্ট পথে বিবর্তিত হয়েছে। মনোযোগী পাঠকেরা এও জানেন, কখনও কখনও আত্মবিরোধীতার ঐক্য নির্মাণ হয়েছে। পরমুহূর্তেই সে ধারণা ভেঙে তৈরি হয়েছে ভিন্ন মাত্রা। কখনও সে ধারণা অন্যমাত্রা থেকে পূনর্নিমাণ করেছে পূর্ববর্তী ধারণাকে।
যদি আমরা এই প্রসঙ্গে অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ধর্ম প্রসঙ্গে প্রবেশ করি, তাহলে সে প্রসঙ্গ দুটি স্পষ্ট ভাগে বিন্যস্ত হতে পারে। প্রথমত কবি ধর্ম, দ্বিতীয়ত মানুষের ধর্ম।
রবীন্দ্রনাথের কবি ধর্ম প্রসঙ্গে ইতোমধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়ে গেছে। সে পথে পা দেওয়ার দুরূহ আয়াস আমার নেই। কিন্তু, যদি মানুষের ধর্ম সম্পর্কে কথা তৈরি হয়, তবে, বলার আছে, যে লোকটি ‘রিলিজিয়ন অফ ম্যান’, সভ্যতার সংকট, কালান্তর নির্মাণ করেছেন— আমরা, আমি কি তাকে আদৌ অতিক্রম করতে পেরেছি যে সে সম্পর্কে মন্তব্য করব ! এখনও রবীন্দ্রনাথ কথিত ধর্মে, একশো বছর পরেও আমরা স্বস্থ হতে পারিনি। ব্যর্থ হয়েছি। সে পাঠ এখনও আমার সম্পূর্ণ হতে বাকি। তবে, এ প্রসঙ্গে, আলোচনায় উল্লেখ করা যেতে পারে, ‘ধর্মের সরল আদর্শ শীর্ষক’ প্রবন্ধটির কথা। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ ধর্ম বলতে এমন এক আচরণের কথা আমাদের বোঝাতে চাইতেন, যে ধর্ম বা সঙস্কৃতি বসুধৈব কুটুম্বকমের প্ররোচনায় উদ্বেল। যে ধর্ম বলে ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া/ বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া ‘। যে ধর্মে ভালোবাসা আছে অকারণের,যে ধর্ম একটিই বিশ্ব মানচিত্রের কথা ভাবে। এবং এও স্বীকার করে,
“ধর্ম আমাদের পক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ আবশ্যক সন্দেহ নাই–কিন্তু সেইজন্যই তাহাকে নিজের উপযোগী করিয়া লইতে গেলেই তাহার সেই সর্বশ্রেষ্ঠ আবশ্যকতাই নষ্ট হইয়া যায়। তাহা দেশকালপাত্রের ক্ষুদ্র প্রভেদের অতীত, তাহা নিরঞ্জন বিকারবিহীন বলিয়াই তাহা আমাদের চিরদিনের পক্ষে আমাদের সমস্ত অবস্থার পক্ষে এত একান্ত আবশ্যক। তাহা আমাদের অতীত বলিয়াই তাহা আমাদিগকে নিত্যকাল সমস্ত পরিবর্তনের মধ্যে ধ্রুব অবলম্বন দান করে।
কিন্তু ধর্মকে ধারণা করিতে হইবে তো। ধারণা করিতে হইলে তাহাকে আমাদের প্রকৃতির অনুযায়ী করিয়া লইতে হয়। অথচ মানবপ্রকৃতি বিচিত্র,–সুতরাং সেই বৈচিত্র্য অনুসারে যাহা এক, তাহা অনেক হইয়া উঠে। যেখানে অনেক, সেখানে জটিলতা অনিবার্য–যেখানে জটিলতা, সেখানে বিরোধ আপনি আসিয়া পড়ে।”
এই বিরোধাভাস কতদিন আগে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানিয়েছেন। আমরা বোধহয় এর প্রায়োগিক অভিঘাতকে ধারণা করতে পরিনি।ধারণা করতে পারিনি বলেই ধর্ম সম্পর্কে আমাদের বিবিধ ভ্রম। এ এক চর্চা। এটি একটি ক্রম বিস্তারের বহু মাত্রিক হয়ে ওঠার একটি পন্থা। একথা বুঝিনি বলেই বোধহয় আমাদের ও ধর্মের সম্পর্কে এতো দ্বিধা ও আঁধার। এই ধারণায় সম্যক উত্তীর্ণ হতে পারাটা এখনও সম্ভবত বহু দশকের আমাদের আয়াসের সম্ভাব্য ফল হতে পারে। কিন্তু, এ প্রবন্ধে মানুষের ধর্মকে অত্যন্ত সহজভাবে রবীন্দ্রনাথ শেখাচ্ছেন এভাবে,
“ধর্মের সরল আদর্শ একদিন আমাদের ভারতবর্ষেরই ছিল। উপনিষদের মধ্যে তাহার পরিচয় পাই। তাহার মধ্যে যে ব্রহ্মের প্রকাশ আছে, তাহা পরিপূর্ণ, তাহা অখণ্ড, তাহা আমাদের কল্পনা-জালদ্বারা বিজড়িত নহে। উপনিষদ্ বলিয়াছেন–
সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম
তিনিই সত্য, নতুবা এ জগৎসংসার কিছুই সত্য হইত না। তিনিই জ্ঞান, এই যাহা-কিছু তাহা তাঁহারই জ্ঞান, তিনি যাহা জানিতেছেন তাহাই আছে, তাহাই সত্য। তিনি অনন্ত। তিনি অনন্ত সত্য, তিনি অনন্ত জ্ঞান।”
তবে, চর্চায় ন্যস্ত হওয়ারও আগে, মানুষের সহজ ধর্মের বহু মাত্রা, বহুস্তরকে স্পর্শ করারও আগে আমাদের মনে রাখা দরকার বলে মনে হয়, সেই কথা কটি এরকম,
“অধর্মেণৈধতে তাবৎ ততো ভদ্রাণি পশ্যতি
ততঃ সপত্নান্ জয়তি সমূলস্তু বিনশ্যতি।
অধর্মের দ্বারা আপাতত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হওয়া যায়, আপাতত মঙ্গল দেখা যায়, আপাতত শত্রুরা পরাজিত হইতে থাকে, কিন্তু সমূলে বিনাশ পাইতে হয়।
একদিন নানা দুঃখ ও আঘাতে বৃহৎ শ্মশানের মধ্যে এই দুর্যোগের নিবৃত্তি হইবে–তখন যদি মানবসমাজ এই কথা বলে যে, শক্তির পূজা ক্ষমতার মত্ততা স্বার্থের দারুণ দুশ্চেষ্টা যখন প্রবলতম, মোহান্ধকার যখন ঘনীভূত এবং দলবদ্ধ ক্ষুধিত আত্মম্ভরিতা যখন উত্তরে-দক্ষিণে পূর্বে-পশ্চিমে গর্জন করিয়া ফিরিতেছিল, তখনও ভারতবর্ষ আপন ধর্ম হারায় নাই, বিশ্বাস ত্যাগ করে নাই, একমাত্র নিত্যসত্যের প্রতি নিষ্ঠা স্থির রাখিয়াছিল–সকলের ঊর্ধ্বে নির্বিকার একের পতাকা প্রাণপণ দৃঢ়মুষ্টিতে ধরিয়াছিল– এবং সমস্ত আলোড়ন-গর্জনের মধ্যে মা ভৈঃ মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া বলিতেছিল–
আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান্ ন বিভেতি কুতশ্চন–
একের আনন্দ, ব্রহ্মের আনন্দ, যিনি জানিয়াছেন, তিনি কিছু হইতেই ভয়প্রাপ্ত হন না।
ইহাই যদি সম্ভবপর হয়, তবে ভারতবর্ষে ঋষিদের জন্ম, উপনিষদের শিক্ষা, গীতার উপদেশ, বহুশতাব্দী হইতে নানা দুঃখ ও অবমাননা, সমস্তই সার্থক হইবে–ধৈর্যের দ্বারা সার্থক হইবে, ধর্মের দ্বারা সার্থক হইবে, ব্রহ্মের দ্বারা সার্থক হইবে–দম্ভের দ্বারা নহে, প্রতাপের দ্বারা নহে, স্বার্থসিদ্ধির দ্বারা নহে।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।”

