
কার্ল মার্কসের কবিতাগুচ্ছ অনুবাদ-হিন্দোল ভট্টাচার্য
কার্ল হাইনরিখ মার্ক্স ছিলেন জার্মান দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, সমাজতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, সাংবাদিক এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী। অর্থনীতি, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বে তাঁর কাজ—বিশেষত পুঁজিবাদের সমালোচনা—পরবর্তী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করে। জীবদ্দশায় মার্ক্স বহু গ্রন্থ রচনা করেন; এর মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য দ্য কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো (১৮৪৮) এবং দাস ক্যাপিটাল (১৮৬৭–১৮৯৪)। আজও মার্ক্সের চিন্তা প্রাসঙ্গিক, কারণ তাঁর বিশ্লেষণ অর্থনৈতিক বৈষম্য, শ্রেণিসংগ্রাম এবং শোষণের কাঠামো বোঝার জন্য এক গভীর সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। তাঁর ধারণা এখনও বিশ্বের নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে প্রভাব বিস্তার করে, এবং তাঁর রচনা ইতিহাস, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের বহু ক্ষেত্রে গভীরভাবে পাঠিত হয়। মার্ক্সের লেখনী মূলত কাব্যিক ছিল না; তিনি প্রধানত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণেই মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁর গদ্যভঙ্গি ছিল প্রত্যক্ষ, বিশ্লেষণাত্মক, তীক্ষ্ণ এবং প্রায়শই তর্কপ্রবণ। ব্যঙ্গ, যুক্তি ও ঐতিহাসিক উদাহরণের সাহায্যে তিনি পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব উন্মোচন করেন। তাঁর অন্যতম প্রধান পদ্ধতি ছিল “ঐতিহাসিক বস্তুবাদ” (Historical Materialism)—যার মাধ্যমে তিনি সমাজ ও ইতিহাসের পরিবর্তনকে অর্থনৈতিক কাঠামো এবং উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করেন। মার্ক্স এমন এক সময়ে সক্রিয় ছিলেন, যখন ইউরোপে শিল্পবিপ্লব সমাজকে আমূল রূপান্তরিত করছিল। শিল্পপুঁজিবাদের উত্থান, শ্রমিকশ্রেণির বিকাশ, নগরায়ণ, এবং নতুন শ্রেণিবিভাজন তাঁর চিন্তার সামাজিক প্রেক্ষাপট নির্মাণ করে। এই পরিবর্তনশীল সময়ে জন স্টুয়ার্ট মিল, জি. ডব্লিউ. এফ. হেগেল, এবং পিয়ের-জোসেফ প্রুধোঁ-র মতো চিন্তাবিদরাও সমাজ ও আধুনিকতার প্রশ্ন নিয়ে কাজ করছিলেন, এবং বিভিন্নভাবে মার্ক্সের ভাবনাকে প্রভাবিত করেছিলেন। মার্ক্সের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শে নয়; তিনি আধুনিকতার গভীরে নিহিত ক্ষমতা, শ্রম, পুঁজি ও মানুষের বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নকে এমনভাবে উত্থাপন করেন, যা আজও বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে রয়ে গেছে। এ বুক অফ ভার্স (রচিত: ১২ এপ্রিল ১৮৩৭-এর পূর্বে) উৎস: Marx Engels Collected Works, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৮৩–৬৮৫ প্রকাশক: International Publishers (১৯৭৫) প্রথম প্রকাশ: Marx/Engels, Gesamtausgabe, বিভাগ ১, খণ্ড ২, ১৯২৯ অনুবাদ: ক্লেমেন্স ডাট
জেনির জন্য একটি কবিতা
আমার কাছে পৃথিবীর খ্যাতি—
যে খ্যাতি দেশ থেকে দেশে উড়ে যায়,
জাতি থেকে জাতিকে মোহাবিষ্ট করে রাখে
তার সুদূর প্রতিধ্বনির মায়ায়—
তার কোনো মূল্যই নেই তোমার চোখের তুলনায়,
যখন তারা পূর্ণ দীপ্তিতে জ্বলে ওঠে;
তোমার হৃদয়ের তুলনায়, যখন উল্লাসে তা উষ্ণ;
অথবা সেই দুই গভীর উৎসারিত অশ্রুবিন্দুর তুলনায়,
যা গানের আবেগে তোমার নয়ন থেকে ঝরে পড়ে।
সানন্দে আমি আমার আত্মা বিলিয়ে দিতাম
বীণার গভীর সুরেলা দীর্ঘশ্বাসে,
এমনকি মহাশিল্পীর মতো মৃত্যুকেও বরণ করতাম,
যদি সেই মহিমান্বিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারতাম—
যদি জিতে নিতে পারতাম শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার—
তোমার আনন্দ ও বেদনা দুটোকেই শান্ত করতে।

অনুভূতি
আমি কখনও শান্তিতে থাকতে পারি না
যা আমার আত্মাকে আচ্ছন্ন করে রাখে;
কখনও সহজভাবে নিতে পারি না কিছুই—
আমাকে ছুটতেই হয়, বিরামহীন।
অন্যেরা শুধু উল্লাসই করতে জানে
যখন সব কিছু শান্ত নিয়মে চলে,
নিজেকে অভিনন্দন জানিয়ে নিশ্চিন্ত,
প্রতি প্রার্থনায় কৃতজ্ঞতা জানায়।
আমি বন্দী অন্তহীন সংঘাতে,
অন্তহীন আলোড়নে, অন্তহীন স্বপ্নে;
জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি না,
স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলতেও চাই না।
আমি স্বর্গকে বুঝতে চাই,
সমস্ত পৃথিবীকে টেনে আনতে চাই নিজের কাছে;
ভালোবাসা ও ঘৃণায় দীপ্ত হয়ে
চাই আমার নক্ষত্র জ্বলে উঠুক উজ্জ্বলভাবে।
সব কিছু জয় করতে চাই আমি,
দেবতাদের দেওয়া সব আশীর্বাদ;
সমস্ত জ্ঞানের গভীরে পৌঁছতে চাই,
গান ও শিল্পের অতল স্পর্শ করতে চাই।
আমি ধ্বংস করতে চাই সমস্ত জগৎ,
যেহেতু নিজে কোনো জগৎ গড়তে পারি না;
যেহেতু আমার আহ্বান কেউ শোনে না,
মূক জাদুচক্রে ঘুরে ফিরে।
নির্বাক, নিথর তারা চেয়ে থাকে
আমাদের কর্মের দিকে ঔদাস্যে;
আমরা ও আমাদের সব কাজ ক্ষয়ে যাই—
তারা নির্বিকার নিজ পথে চলে।
তবু তাদের নিয়তি আমি কখনও চাই না—
বন্যার স্রোতে ভেসে চলা,
শূন্যতার দিকে ছুটে যাওয়া,
অস্থির আড়ম্বর আর অহংকারে।
দ্রুতই পতন হয়, ধ্বংস হয়
প্রাসাদ, দুর্গ, সাম্রাজ্য একে একে;
শূন্যে বিলীন হতে না হতেই
আরেক সাম্রাজ্যের জন্ম হয়।
এভাবেই ঘুরে চলে বছর থেকে বছরে,
শূন্য থেকে সর্বস্বে,
দোলনা থেকে কফিনে,
অন্তহীন উত্থান, অন্তহীন পতন।
এভাবেই আত্মারা পথ চলে
যতক্ষণ না তারা সম্পূর্ণ নিঃশেষিত,
যতক্ষণ না তারা নিজেদের প্রভু ও অধীশ্বরকে
সম্পূর্ণ বিনাশ করে।
তাই এসো, আমরা সাহস ভরে অতিক্রম করি
ঈশ্বরনির্ধারিত সেই বৃত্ত;
আনন্দ ও বেদনা দুটোকেই ধারণ করি
ভাগ্যের দাঁড়িপাল্লার দোলায়।
তাই আমাদের সর্বস্ব বাজি রাখা হোক—
না থেমে, না ক্লান্ত হয়ে;
নিস্তব্ধ, বিষণ্ণ, জড়তায় নয়,
নিষ্ক্রিয়তায় নয়, বাসনাহীনতায় নয়।
না আত্মমগ্ন অন্ধ চিন্তায়,
বেদনার জোয়ালে নত হয়ে—
যাতে আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, কর্ম
অপূর্ণ থেকে না যায় আমাদের।

সামঞ্জস্য
চেনো কি সেই মায়াময় মধুর প্রতিমা,
যখন দুটি আত্মা একে অন্যের গভীরে মিশে যায়,
আর এক কোমল নিঃশ্বাসে ঝরে পড়ে—
সুরেলা, প্রেমময়, শান্ত, পরিপূর্ণ?
তারা জ্বলে ওঠে এক গোলাপ-ফুলের রঙে,
লাজুক হয়ে মনকে রাঙায়;
তারপর নিভৃতে লুকিয়ে পড়ে
শ্যাওলা-ঢাকা কোনো স্নিগ্ধ শয্যায়।
পৃথিবীজোড়া ঘুরে বেড়াও,
তবু সেই মায়াবী প্রতিমা খুঁজে পাবে না;
কোনো তাবিজ তাকে বেঁধে রাখতে পারে না,
সূর্যের তীক্ষ্ণ রশ্মিও তার আগমনী নয়।
কোনো সূর্যালোক তাকে জন্ম দেয়নি,
পৃথিবীর পুষ্টি সে কখনও জানেনি;
তবু সে থাকে চিরদীপ্ত,
নিজস্ব মহিমায় অক্ষয়।
সময় তার দ্রুত ডানা ঝাপটাক,
উজ্জ্বল অ্যাপোলো তার রথ চালাক,
বিশ্বসমূহ শূন্যে বিলীন হোক—
তবু সে অমলিন।
নিজ শক্তিতেই সে নিজেকে সৃষ্টি করেছে—
যাকে জগৎও নয়, ঈশ্বরও নয়,
কখনও বশ করতে পারে না।
হয়তো সে সেই সিথারার সুরের মতো,
যা এক অনন্ত বীণায় বাজে;
অবিরাম জ্যোতিতে, অনন্ত অগ্নিতে,
আকাঙ্ক্ষার উচ্চারণে অনুরণিত।
একবার যদি নিজের অন্তরে
সে তারের ধ্বনি শুনতে পাও—
তবে আর তোমার পদক্ষেপ
ভ্রান্ত পথে ঘুরে বেড়াবে না।
অরণ্যের ঝরনা
ফুলেল বনের গভীরে আমি পথ হারালাম,
যেখানে অরণ্যের ঝরনা রূপালি ছটা ছড়িয়ে
মৃদু গুঞ্জনে ঝরে পড়ে;
মাথার ওপর
উঁচু গাছেরা ছায়া মেলে দাঁড়িয়ে।
তারা দেখে তাকে চিরকাল
দ্রুত বেগে ছুটে যেতে,
তাদের পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে যেতে;
মধুর ছায়ায় জ্বলে ওঠে সে,
সাগর আর আকাশের সঙ্গমে মিলতে চায়।
কিন্তু যখন সে কঠিন ভূমির বন্ধন ছিঁড়ে পালায়,
প্রচণ্ড গর্জনে আঘাত হানে পাথুরে প্রাচীরে;
মাথা ঘুরে যায় সেই প্লাবনের,
নিঃশব্দ কুয়াশা-বলয়ে ঘুরপাক খায়।
আবার সে ফুলভরা বনের পথে ঘুরে বেড়ায়,
মৃত্যুযন্ত্রণার গভীর পানপাত্র থেকে চুমুক দেয়;
আর তখনই সেই দীর্ঘ বে-গাছেরা
ঝরিয়ে দেয় মধুর স্বপ্নাবেশ।
প্রথম এলেজি
ওভিদের ট্রিস্টিয়া অবলম্বনে
স্বাধীন বঙ্গানুবাদ
যাও, ছোট্ট বই, ত্বরিত যাও তুমি,
যাও সেই বিজয়ের উল্লাস-আসনে;
আমি যাই না তোমার সঙ্গে—আমায় থাকতে হবে এখানে,
কারণ জোভের বজ্রাঘাতে বিদ্ধ আমি।
যাও, দীনবেশে, শোকার্ত পোশাকে,
ধারণ করো প্রভুর নির্বাসনের ছায়া;
আজকের এই দুঃসময়ে
বিষাদের বস্ত্রই তোমার মানায়।
তোমার গায়ে না থাক বেগুনি আভা,
না থাক দেবদারুর সুগন্ধ;
রৌপ্যখচিত দণ্ড নয়—
আজ তোমার অলংকার শুধু অন্ধকার।
সৌভাগ্য-ধন্য গ্রন্থেরই শোভা পায়
ঐশ্বর্যের উজ্জ্বল সাজ;
তোমার সাথী হবে শুধু
আমার যন্ত্রণা, আমার নিশীথ-দুঃখ।
রুক্ষ হও, অমসৃণ হও,
অযত্নে ঝরা চুলের মতো;
পিউমিস-পাথরের কোমল স্পর্শে
তোমায় মসৃণ হতে হবে না।
যদি তোমার মুখ আরও বিবর্ণ হয়,
জেনো—সে আমার অশ্রুর দাগ;
আমার চোখের উষ্ণ জল
অবিরাম ঝরে পড়েছে তোমার পাতায়।
যাও, বই, গিয়ে অভিবাদন জানিও
সেই পবিত্র নগরীকে—
যেখানে স্বপ্নে আমি উড়ে যাই
শব্দের ডানায়, কল্পনার জাদুতে।
যদি কেউ তোমায় দেখে জিজ্ঞেস করে—
“তোমার প্রভু কোথায়?”
বলবে—সে এখনো বেঁচে আছে,
উদ্ধারের আশায় বুক বেঁধে।
আর যদি বলে—
“সে কি অপরাধী?”
সাবধানে কথা বলো;
অবিবেচক শব্দ যেন না বাড়ায় ক্ষত।
অনেকে তিরস্কার করবে,
বলবে—“দোষ তারই ছিল”;
তুমি নত চোখে শুনবে,
নীরবতাই হোক উত্তর।
কারণ আগুনে আগুন নেভে না,
দুই অন্যায় মিলে ন্যায় হয় না।
তবু কেউ কেউ থাকবে—
চোখে কোমল অশ্রু নিয়ে বলবে,
“যদি সিজার ক্ষমা করতেন!”
যে আমার জন্য ঈশ্বরের দয়া চায়,
তার জন্য আমিও প্রার্থনা করি—
বজ্র যেন তাকে কখনও স্পর্শ না করে।
হায়, যদি এমন হতো—
আমার নির্বাসন ঘুচত,
সিজারের ক্রোধ নিভে যেত!
তবু যদি কেউ বলে—
“এ কাব্যে নেই আর আগেকার লাবণ্য,”
তবে তাকে বলো—
দুঃখের ভিতর কবিতা বদলে যায়।
আনন্দের বক্ষ থেকেই
উচ্ছ্বসিত গান জন্ম নেয়;
কিন্তু শোকের কালো ছায়া
কবির কপালে জমে এলে
সুরও হয়ে ওঠে নির্বাসিত।
আমি আজ ভয়ে আচ্ছন্ন,
নিঃসঙ্গ, পরবাসী;
দেখো—দূরে হত্যার তরবারি ঝলসে ওঠে।
হোমারকেও যদি
আমার মতো দুর্দশায় নিক্ষেপ করা হতো,
তবে তার দেবশক্তিও ম্লান হয়ে যেত।
যাও, বই, রোমে যাও—
আমার হয়ে দেখো সেই মহিমা;
যদি আমিই যেতে পারতাম!
তবে সাবধানে চলবে—
আমার নাম তোমার রঙেই ধরা পড়বে।
আমার প্রেমের গান আর নয়—
আজ দেবতাদের কঠোর বিধান
আমায় অন্য ভাষা শিখিয়েছে।
সিজারের প্রাসাদের দিকে যেয়ো না;
সেই উচ্চ অট্টালিকা
আজ আমার জন্য নিষিদ্ধ।
বজ্র যেখানে নেমেছিল,
সেই স্থান এড়িয়ে চলো।
আহত পায়রা যেমন
বাজপাখির আঘাতের পর
মৃদু বাতাসেও কেঁপে ওঠে,
আমিও তেমনি ভীত।
জোভের আগুনকে ভয় করি;
আকাশে মেঘ ডাকলেই মনে হয়—
বজ্র আবার আমাকেই লক্ষ্য করছে।
তাই সাধারণ মানুষের কানে পৌঁছোও,
উচ্চ আসনের লোভ কোরো না।
সময় এলে,
যখন ক্রোধ স্তিমিত হবে,
যখন স্নেহ ফিরে আসবে—
তখনই এগিয়ে যেও।
কারণ যে আঘাত দেয়,
সেই-ই কখনও আরোগ্যও দিতে পারে—
অ্যাকিলিস যেমন টেলেফাসকে।
কিন্তু সাবধান—
সংশোধনের প্রয়াসে
আরও বিষ ঢেলে দিও না।
যদি মিউজদের মন্দিরে
তোমার জন্য স্থান থাকে,
তবে সেখানে দীপ্ত হও—
যেখানে সাহিত্য আর গৌরব মিলিত।
সেখানে দেখবে আমার অন্যান্য গ্রন্থ,
গর্বে দীপ্ত, নাম উন্মুক্ত;
শুধু তিনটি—
প্রেমের শিল্প—
এখনও অন্ধকারে আচ্ছন্ন।
আর দেখবে রূপান্তর—
আগুন থেকে বেঁচে ফেরা সেই গান,
যেখানে জগতের বদল লেখা আছে।
আজ তুমি-ও বলো—
আমার ভাগ্যের রূপান্তরের কথা;
কীভাবে সৌভাগ্যের উষ্ণ ঠোঁট
আজ অশ্রুতে পরিণত।
পথ দীর্ঘ,
আর আমি দূর সিথিয়ার দেশে
নির্বাসিত—
পৃথিবীর বাকি সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন।

কবিতা
স্রষ্টার অগ্নির মতো একদিন
তোমার বক্ষ থেকে শিখারা ঝরে পড়েছিল আমার দিকে;
ঊর্ধ্বলোকে তারা সংঘাতে দীপ্ত হয়ে উঠেছিল,
আর আমি তাদের লালন করেছি নিজের হৃদয়ের গভীরে।
তোমার রূপ জ্বলে উঠেছিল
এওলাসের বীণার সুরের মতো উচ্চাকাশে;
প্রেমের কোমল ডানায়
সে আগুনকে তুমি সযত্নে আড়াল করেছিলে।
আমি দেখেছিলাম সেই জ্যোতি, শুনেছিলাম সেই ধ্বনি—
যা আকাশ পেরিয়ে বহুদূর ছুটে যায়;
উঠে যায়, আবার নেমে আসে,
আর নেমেও যেন আরও উচ্চে উড়ে ওঠে।
তারপর, যখন অন্তরের দ্বন্দ্ব
অবশেষে স্তব্ধ হলো,
দুঃখ আর আনন্দ মিলেমিশে
আমার চোখের সামনে হয়ে উঠল সঙ্গীত।
অতিশয় কোমল রূপের সন্নিকটে
আত্মা দাঁড়িয়ে থাকে, মায়াবন্ধনে আবদ্ধ;
আমার ভেতর থেকে প্রতিমারা উড়ে গিয়েছিল
তোমারই প্রেমে প্রজ্বলিত হয়ে।
প্রেমের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ,
যা একদিন আত্মা মুক্ত করেছিল,
আবারও দীপ্ত হয়ে জেগে ওঠে
তাদের স্রষ্টারই অন্তরে।
রূপান্তর
আমার চোখ আজ বিভ্রান্ত,
গাল ফ্যাকাশে,
মস্তিষ্ক যেন আচ্ছন্ন—
এক রূপকথার রাজ্য।
আমি চেয়েছিলাম দুর্বার সাহসে
সমুদ্রযাত্রার পথ ধরতে,
যেখানে সহস্র শিলাখণ্ড মাথা তোলে,
আর প্লাবন বয়ে যায়
নিঃসঙ্গ, শূন্য, কঠোর।
আমি আঁকড়ে ধরেছিলাম
ঊর্ধ্বগামী চিন্তাকে,
তার দুই ডানায় ভর করে উড়েছিলাম;
ঝড় যতই গর্জে উঠুক,
সব বিপদকেই তুচ্ছ করেছি।
সেখানে থামিনি কখনও,
অবিরাম এগিয়েছি—
বুনো ঈগলের দৃষ্টিতে
অসীম যাত্রাপথে।
সাইরেন যদিও
তার মোহময় সুর বুনেছিল,
হৃদয় হরণ করতে—
আমি তবু শুনিনি।
কানে ফিরিয়ে নিয়েছি
সে মধুর আহ্বান;
আমার বক্ষ চেয়েছিল
আরও উচ্চতর পুরস্কার।
কিন্তু হায়—
ঢেউ ছুটে চলল,
স্থির হতে জানল না;
অসংখ্য স্রোত বয়ে গেল
আমার চোখেরও অতিদ্রুত।
মন্ত্রে, জাদুশব্দে
আমি তাদের থামাতে চেয়েছি,
তবু গর্জন তুলে
তারা মিলিয়ে গেল দৃষ্টির বাইরে।
প্রবল প্লাবনে পিষ্ট হয়ে,
দৃষ্টিভ্রমে ক্লান্ত,
আমি পড়ে গেলাম
কুয়াশাঘেরা রাত্রিতে।
যখন পুনরায় উঠলাম
ব্যর্থ পরিশ্রম শেষে,
আমার সব শক্তি নিঃশেষ,
হৃদয়ের দীপ্তি নিভে গেছে।
কম্পিত, বিবর্ণ হয়ে
নিজের অন্তরে তাকিয়ে রইলাম;
কোনো ঊর্ধ্বমুখী গান
আমার বেদনাকে আশীর্বাদ করল না।
আমার গান উড়ে গেছে—
মধুরতম শিল্প হারাল;
কোনো দেবতা তা ফেরাল না,
অমর করুণাও নয়।
যে দুর্গ একদিন
অদম্য সাহসে দাঁড়িয়েছিল,
তা ডুবে গেল;
অগ্নির দীপ্তি নিমজ্জিত,
অন্তর হলো শূন্য।
তখনই উদ্ভাসিত হলো
তোমার জ্যোতি—
আত্মার নির্মলতম আলো,
যার চারপাশে
স্বর্গ পৃথিবীকে ঘিরে নৃত্য করে।
তখনই আমি বন্দী হলাম,
তখনই দৃষ্টি হলো স্বচ্ছ;
কারণ সত্যিই খুঁজে পেলাম
আমার অন্ধ সংগ্রামের অর্থ।
আত্মা তখন আরও প্রবল,
আরও মুক্ত ধ্বনিতে
উথলে উঠল হৃদয়ের গভীর থেকে—
স্বর্গীয় বিজয়ে,
নির্মল আনন্দে।
আমার প্রাণ তখন
উল্লাসে উড়ে গেল,
আর জাদুকরের মতো
আমি তাদের গতি নিয়ন্ত্রণ করলাম।
আমি ছেড়ে এলাম
উন্মত্ত ঢেউ,
পরিবর্তনশীল প্লাবন,
যা উচ্চ পর্বতে আছড়ে পড়ে—
তবু বাঁচিয়ে রাখলাম
অন্তরের আগুন।
আর যা আমার আত্মা
নিয়তির তাড়নায়ও
উড়ে গিয়ে কখনও পায়নি—
তা-ই আমার হৃদয়ে এল,
তোমার এক দৃষ্টির দানে।
সৃষ্টি
অসৃষ্ট স্রষ্টা-আত্মা
দ্রুত তরঙ্গে ভেসে যায় সুদূরে;
বিশ্ব উত্থিত হয়, প্রাণের জন্ম হয়,
তার দৃষ্টি বিস্তৃত অনন্তে।
তার মুখচ্ছবির প্রেরণায়
সবকিছু প্রাণময়;
তার দহনময় জাদুর ভিতর
রূপেরা ঘনীভূত হয়ে ওঠে।
শূন্যতা স্পন্দিত হয়, যুগ গড়িয়ে যায়,
তার সম্মুখে গভীর প্রার্থনায়;
গোলকসমূহ ধ্বনিত হয়, সমুদ্রস্রোত ফুলে ওঠে,
সোনালি নক্ষত্র ছুটে চলে।
পিতৃসত্তা আশীর্বাদের ইঙ্গিত দেয়,
আর সমগ্র সৃষ্টিই
দিব্য আলোর স্নানে ভেসে যায়।
নিজস্ব সীমায় স্ব-অনুভূত
চিরন্তন নীরবে গমন করে,
গভীর মননে—
যতক্ষণ না আদিম, পবিত্র চিন্তা
রূপ ধারণ করে,
কবিতার শব্দ হয়ে ওঠে।
তখন, দূর আকাশের বজ্র-বীণার মতো,
ভবিষ্যদ্রষ্টা সৃষ্টির উল্লাসধ্বনি শোনা যায়—
“আরও কোমল আলোয় জ্বলো, ভাসমান তারা;
আদিম শিলায় এখন বিশ্বসমূহ বিশ্রাম নিক।
হে আমার আত্মার প্রতিমারা,
আত্মার দ্বারাই নব আলিঙ্গনে জাগো;
যখন আন্দোলিত হৃদয় তোমাদের দিকে ধায়,
তখন প্রকাশিত হও
ভক্তি আর প্রেমে।
শুধু প্রেমের কাছেই উন্মুক্ত হও;
চিরন্তনের চিরাসন যেমন
স্নিগ্ধ হাতে তোমাদের দিয়েছি,
তেমনি নিক্ষেপ করি
আমার আত্মার বিদ্যুৎ তোমাদের মধ্যে।
কারণ সামঞ্জস্যই কেবল
তার সমকক্ষ খুঁজে পায়;
শুধু আত্মাই পারে
অন্য আত্মাকে বাঁধতে।”
আমার থেকেই তোমাদের আত্মা জ্বলে ওঠে
মহিমান্বিত অর্থের রূপে;
আবার স্রষ্টার কাছেই ফিরে যাও তোমরা—
আর নিছক প্রতিমা হয়ে নয়।
মানবের প্রেমময় দৃষ্টির
অগ্নিবলয়ে দীপ্ত হয়ে,
তোমরা তার মধ্যে বিলীন হও—
আর সে বিলীন হয় আমার মধ্যে।
জাদুবীণা
একটি ব্যালাড
কেমন এক অদ্ভুত সুর কানে বাজে—
কম্পমান বীণার মতো,
থরথর তারের মতো;
ঘুমন্ত গায়ককে তা জাগিয়ে তোলে।
“কেন এমন ভয়ে কাঁপে হৃদয়?
এ কোন ধ্বনি—
নক্ষত্র আর আত্মার অশ্রুসুরের
অদ্ভুত সামঞ্জস্য?”
সে উঠে দাঁড়ায়, শয্যা ছাড়ে,
অন্ধকারের দিকে মুখ ফেরায়—
আর দেখে
সোনালি তারের ঝলক।
“এসো, গায়ক, ওঠো-নামো—
আকাশের উচ্চতায়,
মাটির গভীরে;
কিন্তু এই তারগুলো
তুমি কখনও বশে আনতে পারবে না।”
সে দেখে—
তা বাড়ছে, বিস্তৃত হচ্ছে,
শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে পড়ছে;
তার আত্মা অস্থির হয়ে ওঠে,
আর সুর ফুলে ওঠে
চারপাশের বাতাসে।
সে অনুসরণ করে—
সুর তাকে টেনে নিয়ে যায়
প্রেতসিঁড়ি বেয়ে
উপরে, নিচে,
এদিক-ওদিক, সর্বত্র।
হঠাৎ সে থামে।
এক বিশাল দ্বার খুলে যায়।
ভেতর থেকে সঙ্গীতের বিস্ফোরণ
তাকে ভাসিয়ে নিতে চায়।
সেখানে এক সোনালি মহিমাময় বীণা
দিনরাত গান গেয়ে চলে—
কিন্তু তাকে বাজায় কেউ না।
তৃষ্ণার মতো,
যন্ত্রণার মতো
তা তাকে গ্রাস করে;
তার বক্ষ ফুলে ওঠে,
হৃদয় হয়ে ওঠে দুর্বার।
“এই বীণা তো বাজছে
আমার নিজের হৃদয় থেকেই!
এ তো আমি নিজেই—
এর বেদনা, এর শিল্প,
আমার আত্মা থেকেই উৎসারিত!”
উন্মত্ত আনন্দে
সে তারে আঙুল ছোঁয়ায়;
সুর ঝরতে থাকে
পর্বত-ঝরনার মতো উচ্চস্বরে,
আবার অতল গহ্বরের মতো
গম্ভীর গর্জনে ডুবে যায়।
তার রক্ত উন্মাদ হয়ে ওঠে,
তার গান দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে;
আকাঙ্ক্ষার যন্ত্রণা
এত প্রবল আগে কখনও ছিল না—
সে আর পৃথিবীকে দেখতে পায় না।
নক্ষত্রদের উদ্দেশে গান
তোমরা নেচে চলো, ঘুরে ঘুরে,
কম্পমান আলোর রশ্মিতে;
তোমাদের ঊর্ধ্বগামী রূপ
অসংখ্য, অসীম।
এখানেই ভেঙে পড়ে
মহত্তম আত্মা;
পূর্ণ হৃদয় দ্বিখণ্ডিত হয়,
আর সোনায় বাঁধানো রত্নের মতো
মরণশীল বেদনায় আবদ্ধ থাকে।
সে তোমাদের দিকে চায়
অন্ধকার, তীব্র আকর্ষণে;
শিশুর মতো তোমাদের কাছ থেকে
শুষে নিতে চায়
আশা আর অনন্তকাল।
কিন্তু হায়—
তোমাদের আলো তো কেবল
দূর আকাশের ক্ষীণ দীপ্তি;
কোনো দেবসত্তা
কখনও তার অগ্নি
তোমাদের মধ্যে নিক্ষেপ করেনি।
তোমরা মিথ্যা প্রতিমা,
দীপ্ত অগ্নিমুখ—
কিন্তু হৃদয়ের উষ্ণতা,
স্নেহ,
বা আত্মা—
কিছুই তোমাদের নেই।
তোমাদের এই জ্যোতি
কর্ম, যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষার
উপহাসমাত্র;
তোমাদের বুকে ভেঙে পড়ে
সব বাসনা,
হৃদয়ের অগ্নিগান।
শোকে শোকে
আমাদের ধূসর হতে হয়,
নৈরাশ্য ও যন্ত্রণায় শেষ হতে হয়;
তারপর দেখতে হয়—
পৃথিবী আর স্বর্গ
তবু একইভাবে বিদ্রূপে অটল।
আমাদের অন্তর্জগৎ
যখন কেঁপে ওঠে,
যখন আমাদের ভিতরের বিশ্বসমূহ
ডুবে যায়—
তখনও কোনো বৃক্ষকাণ্ড বিদীর্ণ হয় না,
কোনো নক্ষত্র
আছড়ে পড়ে না নিচে।
অন্যথা হলে
তোমরাও মৃত হতে—
নীল সমুদ্র হতো তোমাদের সমাধি;
নিভে যেত সব দীপ্তি,
শেষ হয়ে যেত
তোমাদের সমস্ত আগুন।
তবে হয়তো
নীরবে সত্য বলতে—
মৃত আলোর ঝলকানিতে
প্রতারণা না করে;
স্বচ্ছ জ্যোতিতে না ভেসে—
চারদিকে নেমে আসত
নিশীথের গভীর রাত্রি।
ধূসর কুমারী
একটি ব্যালাড
কুমারী দাঁড়িয়ে থাকে—
এত ফ্যাকাশে,
এত নীরব,
এত অন্তর্মুখী;
তার মধুর দেবদূত-আত্মা
যন্ত্রণায় বিদীর্ণ।
সেখানে কোনো আলোর রেখা
আর প্রবেশ করে না;
ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে—
সেখানে প্রেম ও বেদনা
একে অন্যকে প্রতারিত করে।
সে ছিল কোমল,
নম্র,
স্বর্গনিবেদিতা;
গ্রেসদের বোনা
এক নির্মল প্রতিমা।
তারপর এলো
এক মহিমান্বিত নাইট—
অশ্বারোহী, দীপ্ত;
তার উজ্জ্বল চোখে
ভেসেছিল প্রেমের সমুদ্র।
প্রেম বিদ্ধ করল
কুমারীর অন্তর—
কিন্তু সে ছুটে গেল দূরে,
যুদ্ধজয়ের তৃষ্ণায়;
কিছুই তাকে থামাল না।
তারপর
সমস্ত মানসশান্তি হারাল,
স্বর্গ ডুবে গেল;
হৃদয় হয়ে উঠল
দুঃখের সিংহাসন,
আকাঙ্ক্ষায় উন্মত্ত।
দিনশেষে
সে হাঁটু গেড়ে বসে
পবিত্র খ্রিস্টের সামনে—
আবার প্রার্থনায়।
কিন্তু সেই পবিত্র রূপের উপর
আরেকটি মুখ এসে ভর করে,
তার হৃদয়কে ঝড়ের মতো দখল করে—
নিজেরই অনুশোচনার বিরুদ্ধে।
“তোমার প্রেম তো
আমার জন্য—
অন্তহীন কালের জন্য।
স্বর্গের কাছে আত্মা দেখানো
শুধুই ভান।”
ভয়ে সে কেঁপে ওঠে—
বরফশীতল আতঙ্কে;
অন্ধকারে ছুটে যায়
ভয়ার্ত বিস্ময়ে।
শুভ্র শাপলার মতো হাত
মুচড়ে ধরে;
অশ্রু ঝরে।
“এভাবেই আগুন
বক্ষকে দগ্ধ করে,
এভাবেই আকাঙ্ক্ষা
হৃদয়কে জ্বালায়।
এভাবেই আমি
স্বর্গ হারিয়েছি—
আমি জানি;
ঈশ্বরনিষ্ঠ আত্মা
এখন নরকের জন্য নির্বাচিত।
সে কত উচ্চ,
কত দেবতুল্য!
তার চোখ কত অতল,
কত মহৎ!
তবু সে
একবারও
আমার দিকে তাকায়নি;
আমাকে নিঃশেষ পর্যন্ত
আশাহীন দহনেই ফেলে রেখেছে।
অন্য কেউ
তার বাহুতে আশ্রয় পেতে পারে,
তার সুখ ভাগ করে নিতে পারে;
আর সে অজান্তেই
আমাকে দেয়
অসীম যন্ত্রণা।
আমার আত্মা,
আমার আশা—
সবই ছেড়ে দিতাম,
যদি সে
একবার শুধু
আমার দিকে তাকাত,
হৃদয় খুলে দিত।
যে স্বর্গে
সে জ্বলে না,
সে স্বর্গ কত শীতল—
যন্ত্রণাময়,
দগ্ধ এক দেশ।
কিন্তু এখানে
এই উত্তাল প্লাবন
আমায় মুক্তি দিতে পারে;
হৃদয়ের উত্তপ্ত রক্ত,
বক্ষের আগুন
শীতল করতে পারে।”
তারপর সে
সমস্ত শক্তি দিয়ে
ঝাঁপ দেয় ফেনিল জলে।
শীতল, অন্ধকার রাত্রি
তাকে বয়ে নিয়ে যায়।
তার হৃদয়ের
দহনশিখা
চিরতরে নিভে যায়;
তার দীপ্ত চোখের দেশ
মেঘে ঢাকা পড়ে।
তার কোমল, মধুর ওষ্ঠ
বর্ণহীন, শীতল;
তার স্বর্গীয় সরু দেহ
ধীরে ধীরে
বিলীন হয়ে যায়।
কোনো শুকনো পাতাও
শাখা থেকে পড়ে না;
স্বর্গ ও পৃথিবী
বধির—
এখন আর কেউ
তাকে জাগাবে না।
পর্বত, উপত্যকা পেরিয়ে
নিঃশব্দ ঢেউ
তার কঙ্কালকে বয়ে নিয়ে যায়
কোনো পাথুরে তটে
আছড়ে ফেলতে।
আর সেই উচ্চ, গর্বিত নাইট—
সে তখন
নতুন প্রেমিকাকে আলিঙ্গন করে;
সিথারার সুরে
বেজে ওঠে—
“সত্যিকারের প্রেমের আনন্দ!”

