
কুমার অম্বুজ -এর কবিতা অনুবাদ : দেবলীনা চক্রবর্তী
কবি পরিচিতি: সুপরিচিত কবি কুমার অম্বুজের জন্ম ১৩ এপ্রিল ১৯৫৭ সালে, মধ্যপ্রদেশের গুনায়। কবিতা-আলোচনার জগতে তাঁর প্রবেশ ১৯৮৯ সালে ‘কিওয়াড়’ কবিতার মাধ্যমে, যা নেমিচন্দ্র জৈন ভারতভূষণ আগরওয়াল কবিতা পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করেছিলেন। সেই থেকে তাঁর কবিতা-যাত্রা অব্যাহত, এবং তাঁর পাঁচটি কবিতা-সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। সংখ্যার একঘেয়েমি থেকেই হয়তো শব্দের জন্ম হয়েছিল, আর আজ আবার সবকিছুই সংখ্যায় পরিণত হচ্ছে। আমাদের ব্যর্থতার তো হিসাব ছিলই, এখন সুখ আর অসন্তোষেরও মাপজোক হচ্ছে। এই সংখ্যাগত মানদণ্ড কি মানুষের মাপের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে? অ্যালগরিদম কি আমাদের জীবনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে? সভ্যতার এই সরলীকরণের বহুজাতিক প্রয়াসে, শেষ পর্যন্ত কবিতাই এমন এক আশ্রয়—যা তার বহুমাত্রিক অর্থ, ভিন্নার্থ এবং গভীর অর্থবহতার জন্য এখনো অর্থ কোনো ‘শিল্প’-এর শিকার হয়ে ওঠেনি। মেশিন নীরবতাকে ডিকোড করতে পারে না, আড়ালকে পড়তে পারে না। রাজনৈতিক হিংসা, ধর্মের নিরর্থকতা, অমানবিক পরিস্থিতি এবং মানুষের একাকীত্ব ও অসহায়তার বিরুদ্ধে যে সূক্ষ্ম অথচ শক্তিশালী প্রতিবাদ—হিন্দি কবিতায় তারই এক উজ্জ্বল স্বর কুমার আম্বুজের এই কবিতাগুলো। এগুলো পড়তে পড়তে উন্মোচিত হয় তীক্ষ্ণ বর্তমান পরিস্থিতি যা আমাদের আঘাত করে। আর সেই ব্যথা দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের অনুভবে জেগে থাকবে, আর ওই ক্ষত সেরে উঠতেও সময় লাগবে। বিষ্ণু খরের ভাষায়— “...কুমার অম্বুজের কবিতা ভাষা, শৈলী এবং বিষয়বস্তুর স্তরে এমন এক দীর্ঘ পদক্ষেপ নেয় যে তাকে ‘কোয়ান্টাম জাম্প’ বলাই যায়। তাঁর কবিতায় এই দেশের রাজনীতি, সমাজ এবং তার কোটি কোটি নিপীড়িত মানুষের সংকটপূর্ণ অস্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। প্রকৃত অর্থে তার রচনা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি , মতামত ও প্রতিশ্রুতির কথা। কিন্তু ধর্মীয় স্তরে এগুলো পৃথিবীর এবং মানব-অস্তিত্বের সংশয় ও সংকীর্ণ প্রকাশ করে না। এই সেই কবিতা, যার দৃষ্টিসম্পন্ন শিল্পরূপ স্থাবর-জঙ্গম সবকিছুকেই কবিতায় রূপান্তরিত করার ক্ষমতা রাখে। কুমার অম্বুজ হিন্দির সেই বিরল কবিদের মধ্যে একজন, যিনি নিজের উপর একটি বস্তুনিষ্ঠ সংযম এবং নিজের সৃষ্টির চূড়ান্ত ফলাফলের উপর এক দায়িত্বশীল গুণগত দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখেন। তাঁর রচনায় এক ধরনের সূক্ষ্ম-ঘনত্ব এবং দৃঢ়তা রয়েছে। অভিব্যক্তি ও ভাষা নিয়ে এমন আত্মনিয়ন্ত্রণ—যা আসলে বহুমাত্রিক নৈতিকতা ও প্রতিশ্রুতি থেকে উদ্ভূত হয়। অম্বুজের উপস্থিতি শুধু উৎকৃষ্ট সৃজনশীলতার নয়, কঠোর নৈতিক শুদ্ধতারও প্রতীক।” ‘কিওয়াড়’ (১৯৯২), ‘ক্রুরতা’ (১৯৯৬), ‘অনন্তিম’ (১৯৯৮), ‘অতিক্রমণ’ (২০০২) এবং ‘অমিরি রেখা’ (২০১১) তাঁর কবিতা-সংকলন। তাঁর গল্পগুলো ‘ইচ্ছায়েঁ’ (২০০৮) গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এছাড়া, চিন্তাধর্মী প্রবন্ধের সংকলন ‘মনুষ্য কা অবকাশ’ এবং ডায়েরি ও সৃজনাত্মক মন্তব্যের সংকলন ‘থলচর’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মধ্যপ্রদেশ সাহিত্য অকাদেমির মাখনলাল চতুর্বেদী পুরস্কার, ভারতভূষণ আগরওয়াল স্মৃতি পুরস্কার, শ্রীকান্ত বর্মা পুরস্কার, গিরিজাকুমার মাথুর সম্মান, কেদার সম্মান এবং বাগীশ্বরী পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর প্রথম কবিতা সংগ্রহ কিওয়াড় কাব্য গ্রন্থের অন্তর্গত কয়েকটি কবিতা আমি বাংলায় অনুবাদ করলাম।
কবি : কুমার অম্বুজ
কবিতা সংগ্রহ : কিওয়াড়
অনুবাদ : দেবলীনা চক্রবর্তী
১) নিদ্রা ও জাগরণে
আমার ভিতর একান্তে যে গভীর ঘুম আছে
তা একটি রাতের শেষ পর্যন্ত’ই সীমিত
আমার কাছে নিজস্ব একটি পৃথিবী আছে
যেখানে শৈশবের ফুল ঝরে পড়ে অনবরত
আর ঝরে আনাজের দানা
খিদের স্বপ্ন
ঘুমের উষ্ণ তরলের ওপর
সেই দানা ফুটে ওঠার টগবগ শব্দ
পুরো ব্রহ্মাণ্ডএ ধ্বনিত হয়
নদী তো কেবল অশ্রু বিন্দু
পৃথিবীর গাল বেয়ে যা গড়িয়ে পড়ে
আমার জাগরণের পৃথিবীতে
এই জীবনের অন্তহীন সময় নিঃশেষ হয়ে
ঝরে পড়ে যৌবন
খিদে ঝরতে থাকে শুকনো পাতার মতো
আর নদীর গভীরতাকে আরো গহীন করতে
শীর্ণ হয় পৃথিবীর গাল
জাগ্রত অবস্থায় ঘুম সে এক দূরহ স্বপ্ন
যেখানে শুধুই রক্তের প্রতিধ্বনি
তাছাড়া নেই কোথাও কোন আওয়াজ।
২) গুহা
যেখান থেকে শুরু হয়
ভয় ও অন্ধকার
আবার ভয় ও অন্ধকার
অতিক্রম করার ইচ্ছেও
জন্মায় এখান থেকেই।
৩) প্রবেশদ্বার
এটা শুধুমাত্র একটা প্রবেশদ্বার নয়
কারণ যখন দ্বারটি দুলে ওঠে
তখন মা’ও যেন নড়ে ওঠে
আর তার সজাগ দৃষ্টি
তাকিয়ে দেখে – কি হলো ?
মোটা শেকলের
চারটি কড়ায়
একটা পুরো জীবন ও স্মৃতি
গেঁথে আছে
তাই যখন শেকলটি বেজে ওঠে
অনেক কিছু বেজে যায় ঘরের ভিতরে
এর গায়ে চন্দ্র সূর্য আর নাগ দেবতা
চিত্রিত আছে
অর্থাৎ এখানে বিশ্বাস আর সুরক্ষা খোদিত
আছে দেখে
আমাদের বাবার কথা মনে পড়ে
দাদা যখনই এই পাল্লা বদলানোর কথা বলে
মা তখনই ভয়ে কেঁপে ওঠে
আর কয়েক রাত জুড়ে
মায়ের স্বপ্নে তখন বাবা আসেন
এই দ্বার পুরনো হলেও কমজোর নয়
এর দুলুনিতেও একটা ওজন আছে
যখন এটা খোলা হয় তখন যেন
আমাদের সামনে একটা গোটা বিশ্ব
খুলে যায়
আর যেদিন এটা থাকবে না
সেদিন এই ঘর আর
ঘর থাকবে না ।
৪) সকালের জন্য
রান্না – খাওয়ার পর
মা কিছুটা আগুন ঢেকে রাখে
ছাই চাপা দিয়ে
কারণ , সামান্য আগুন তো
সকালের জন্যও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
৫) দায়িত্ববান পুরুষ
তার কাছে যথেষ্ট সময় আছে
যার ফলে সে সকলকে প্রীতি সম্ভাষণ জানিয়ে
বলতে পারেন – কি খবর ! কেমন আছেন ?
পাড়া প্রতিবেশীর সুখ দুঃখের
খবর নেওয়ার জন্য
সদাহাস্য মুখ ও সুন্দর শব্দ বন্ধনী আছে
তার আছে কিছু নিজস্ব ব্যাঙ্কেরখাতা
এবং কিছু জীবন বীমা – পলিসি
কখনো কখনো সে সঙ্গীতের বিষয়ে কথা বলে
কখনো নৃত্য বিষয়ে তার রুচি ব্যক্ত করে
রামলীলা বা দুর্গাপূজায় খোলা হাতে চাঁদা দেন
আবার অবলীলায় বলে উঠেন –
“আপনার সাথে পরিচয় হয়ে খুব ভালো লাগলো”
হিসেব করে তিনি জমি
এবং কিছু সেয়ার্স কেনেন , গড়ান কিছু অলঙ্কার
বাকি টাকা জমিয়ে রাখেন বাড়ির আলমারিতে
উপরুন্তু ব্যাঙ্কে লকারের জন্য দরখাস্ত জমা করেন
একটি নতুন গাড়ি কিনতে গিয়ে
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন
আর ভাবেন জীবন ঠিক পথেই চলছে
সার্থক হতে চলেছে এই মানব জীবন
এতকিছু ঠিকঠাকের মধ্যেও একদিন
সেই দায়িত্ববান পুরুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
তাঁর মৃত্যুর কথা ভাবেন
আর অঝোরে কেঁদে ওঠেন
কারণ ভয় সর্বপ্রথম
দায়িত্ববান পুরুষের হৃদয়েই
প্রবেশ করে।
৬) আমার কাছে …
আমার কাছে কিছু পাথর ও
শুকনো বাঁশ ছিলো
যার মাধ্যমে আমায় নির্ধারণ করতে হবে
আমার সংস্কারের পথ
পুরনো সংস্কার তার জমা স্তূপ থেকে উদ্ধার চাইছিলো
আর আমি আমার নব্য সংস্কারকে ওই স্তূপ থেকে
বাঁচাতে চাইছিলাম
পরিধীর বাইরে রোদ আর ভিতরে ঘুণের বাসা,
কিছু প্রথা ও তার বীজমন্ত্র উপহাস করলেও
আমার কাছে শাস্ত্র ছিলো শাস্ত্রের জায়গায়
আমার নিজস্ব যে ইচ্ছে ঝুলি আর
ছোট্ট সময়ের জাদুকাঠি ছিলো
তার ভরসাতেই আমি পার হতে চাই
এই অনিঃশেষ অরণ্য
বিস্মৃতির তরলে দোদুল্যমান
কিছু অস্পষ্ট ছায়া ,
শুকনো অশ্রু আর গলে যাওয়া প্রাণ
আর কিছু বাসি ফুলে ভরা এক নরক
আমার সামনে
যার গা ঘেঁষে আমার মোক্ষ প্রাপ্তির পথ
কিছু অলৌকিক লোক
একটি স্বপ্ন থেকে আর একটি স্বপ্নে
ভ্রাম্যমাণ
আর আমার মাত্র দুটি স্বপ্নের মাঝের অনিদ্রা
এবং যেটুকু আশীর্বাদ অবশিষ্ট ছিল তা
অভিশাপ হয়ে তাড়া করে বেড়ানো
এমনি একটি একান্ত জীবন
যার মধ্যেকার সামঞ্জস্য খুঁজে ফিরি ।
৭) এমতাবস্থায়
চড়া রোদ সোজা এসে পড়লেও
দুধ উথলিয়ে উঠবে না
জল তার শীতল সন্তুষ্টির স্বভাব হারাবে
ব্যারোমিটার এর পারদ নিচে মেনে যাবে
গাছের ডাল শূন্য হয়ে যাবে
সাতাশ বছর বয়সীও থেকে যাবে অবিবাহিত
আর উৎসব চলে যাবে চুপচাপ
তবু আলোর ঝিকিমিকি উচ্ছ্বাস ঠিক জন্মাবে
গাছ তার শিকড়ের জোড়ে টিকে থাকার লড়াই চালাবে
গো সন্তানের গলার আওয়াজে থাকবে না
সেই জোর
হাওয়া
ক্রমশ বিষ হয়ে উঠবে
আর আমরা আমাদের কখনো না শুকোনো
স্বেদ জল
গুমোট গরমকে সমর্পণ করবো।
৮) কালো মেয়েটি
নিজের সামাজিক কালো অন্ধকার থেকে
বেরিয়ে কালো মেয়েটি
আমার স্বপ্নের উজালায় প্রবেশ করলো
আলোর প্রকাশে রাতের কালিমা ঝেরে ফেলে
লাবণ্যে ভরে ওঠে মেয়েটির দেহ
সপ্ত ধাতুর অতুলনীয় মূর্তির মতো
চকচক করে কালো মেয়েটির শৈল্পিক শরীর
বর্ষার দিনের বিদুৎতের মতো ঝলসে ওঠে হাসি
শুভ্র হাঁসেদের এক দল আকাশ গঙ্গা পাড় করে যায়
কালো মেয়েটির চোখদুটোও ছিল ঘন কালো
সে আমার স্বপ্ন আলোর ঘেরাটোপ থেকে বেরোতে চায় না
কারণ, এই উজ্জ্বল স্বপ্নের মধ্যে
তার চোখের সাদা বর্ণের অনুভব থেকে জমাটবাঁধা
অন্ধকার টুকরো টুকরো হয়ে ঝরে পড়ে
আর অ্যাটলাসের মতো ঘূর্ণিত রাত্রি
প্রতিবার এসে থেমে যায়
আমার স্বপ্নের আফ্রিকার ওপর।

