
আলোকের সাধনা (টমাস আলভা এডিসনের জীবন-কাহিনি) (দ্বাদশ পর্ব ) হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস
আবিষ্কারের পরে আবিষ্কার
বাড়ি পৌঁছে এডিসন প্রিন্টিং মেশিনটার নির্মাণের কাজ আরম্ভ করলেন ।একবার কাজ আরম্ভ করলে এডিসন খাওয়া দাওয়ার কথা ভুলে যান। কাজ করার আনন্দ তার মনে কোনো ধরনের দুঃখ-ক্লান্তি ,চিন্তা আসতে দেয় না।অবশেষে একদিন তাঁর কল্পনার প্রিন্টিং মেশিনটা সাকার রূপ লাভ করল। তিনি তার নাম দিলেন ইউনিভার্সাল প্রিন্টার।তারপরে তিনি যন্ত্রটির পেটেন্ট পাওয়ার জন্য যথাবিধি আবেদন করলেন এবং আবেদন সঙ্গে সঙ্গে মঞ্জুর হল। অর্থাৎ তিনি পেটেন্ট পেলেন ।
(কেউ কোনো একটি নতুন জিনিস আবিষ্কার বা উদ্ভাবন করলে জিনিসটার ওপরে যাতে তার একচেটিয়া অধিকার থাকে, আর অন্য কেউ বিনা অনুমতিতে সেটা নকল করে ব্যাবসা করতে না পারে–সেই উদ্দেশ্যে আইনে থাকা ব্যবস্থাকে পেটেন্ট বলা হয়ে থাকে।)
এডিসনের নতুন যন্ত্রটির কথা মানুষের মুখে মুখে এবং খবরের কাগজের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। যন্ত্রটি যে টেলিগ্রাফ ব্যবস্থায় বিরাট উন্নতি সাধন করবে সেই কথা বুঝতে কারও বেশি সময় লাগল না। অনেক কোম্পানি যন্ত্রটা কেনার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করল। কিন্তু এডিসন যন্ত্রটা তার নিয়োগকর্তাকে বিক্রি করে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবেন বলে ঠিক করলেন।
কোম্পানির পরিচালক এডিসনকে জিজ্ঞেস করলেন– ‘যন্ত্রটির জন্য আপনি কত টাকা আশা করেন?’
প্রশ্নটা শুনে এডিসন ভাবনায় পড়লেন। তিনি পাঁচ হাজার ডলার দাবি করার কথা মনে মনে চিন্তা করলেন। কিন্তু কে জানে পরিচালক দামটা যদি বেশি হয়েছে বলে ভাবে!চার হাজার…তিন হাজার…দুই হাজার… তিন হাজার ডলার চাইলে কী রকম হয়?
এডিসন মনে মনে এই সমস্ত চিন্তা করার সময় পরিচালকটি নিজেই বলে উঠলেন– মিঃ এডিসন আমরা আপনাকে চল্লিশ হাজার ডলার দেবার কথা ভাবছি।’
পরিচালকের কথা শুনে কিছু সময়ের জন্য এডিসন এটা স্বপ্ন না বাস্তব বুঝে উঠতে পারলেন না। চল্লিশ হাজার ডলার! চল্লিশ হাজার ডলার! তিনি নিজের মগজের ভেতর তালগোল পাকিয়ে গেছে বলে মনে করলেন।তিনি সত্যিই এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেছেন– যার মূল্য হতে পারে চল্লিশ হাজার ডলার!তিনি স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
এদিকে পরিচালক এডিসনের নীরবতার ব্যাখ্যা করলেন অন্য ভাবে। তিনি ভাবলেন যে এডিসন যন্ত্রটির দাম চল্লিশ হাজার ডলার নিশ্চয় কম বলে ভাবছেন; সেই জন্য তিনি নিজের সম্মতি জানাতে ইতস্তত করছেন। নীরবতা ভঙ্গ করে পরিচালক বলে উঠলেন –’মিঃ এডিসন, আপনার যন্ত্রটি নিশ্চয় অতিশয় মূল্যবান। কিন্তু তার জন্য আমরা যত টাকা দিতে চাইছি তার চেয়ে বেশি দেওয়াটা ঠিক এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এখন আপনি কী করবেন সেটা আপনাকে নিজেই ঠিক করতে হবে।’
এডিসন আর কী ঠিক করবে?আশাতীত ধন পেয়ে তিনি নিজেকে পরম ভাগ্যবান বলে বিবেচনা করলেন।চোখের নিমেষে তিনি একজন ধনী মানুষে পরিণত হলেন। এখন থেকে আর তাঁর জীবন আগের মতো হয়ে থাকবে না। তাঁর জীবনে আসবে অনেক বড়ো পরিবর্তন।
এডিসনকে পুরো টাকাটা দেওয়া হল চেকের মাধ্যমে। এর আগে পর্যন্ত এডিসন চেক কখনও ছুঁয়ে দেখেনি। জীবনে এটি ছিল তার জীবনে প্রথম পাওয়া চেক।চেকটা পেয়েই উৎসাহে অধীর হয়ে তিনি বেঙ্কের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।কিন্তু কাউন্টারের ক্যাশিয়ার চেকটাতে চোখ বুলিয়ে মুখে কিছু একটা বিড়বিড় করে চেকটা এডিসনের দিকে ছুঁড়ে দিলেন। কর্মচারীটির আচরণ দেখে এডিসন আশ্চর্য হলেন।কিন্তু পরের মুহূর্তে এডিসন এই সিদ্ধান্তে এলেন যে কোম্পানি নিশ্চয় তাকে ভুয়া চেক দিয়ে ঠকিয়েছে। চেকের বিনিময়ে টাকা পাবার মতো বেঙ্কটিতে কোম্পানির টাকাই নেই।প্রচন্ড ক্রোধে তিনি কোম্পানির পরিচালকের কাছে ফিরে গেলেন।
এডিসনের কথা শুনে পরিচালকটি জোরে জোরে হাসতে লাগলেন। কয়েক মুহূর্ত পরে হাসি সামলে তিনি এডিসনকে বললেন–’আপনি একজন এত বড়ো ধনী মানুষ, অথচ বেঙ্কে কীভাবে চেক ভাঙ্গাতে হয় সে কথাও জানেন না ?চেকের পেছনে আপনি সই না করে দেবার জন্যই কাউন্টারের কর্মচারীটি চেকটা আপনাকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এখন যান, চেকটাতে সই করে বেঙ্কে জমা করে দিন।
এতগুলি টাকা হাতে আসার পরে এডিসন অন্যের অধীনে চাকরি না করে স্বাধীনভাবে ব্যাবসা এবং গবেষণা করবেন বলে স্থির করলেন। সেই উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৭০ সনে নিউ জার্সি রাজ্যে নেবার্ক শহরে গিয়ে সেখানে একটি ছোটো কারখানা স্থাপন করলেন।সেই কারখানায় তিনি টেলিগ্রাফের কাজে ব্যবহৃত নানা ধরনের যন্ত্রপাতি তৈরি করে নতুন নতুন উন্নত সরঞ্জাম উদ্ভাবন করার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। কারখানায় তাকে অনেক সহকারী নিয়োগ করতে হয়েছিল। কিন্তু অধীনস্থ কর্মচারীদের চেয়ে তিনি নিজে অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করতেন।এমনকি দিনের শেষে কর্মচারীদের বাড়িতে চলে যাওয়ার পরেও তিনি কাজ করে যেতেন। কিছুদিনের ভেতরে এডিসনের কারখানায় উৎপাদিত সামগ্রির চাহিদা এতটাই বাড়তে লাগল যে রাতের দিকেও কাজ করার জন্য তিনি একটি নতুন শাখা খুলতে বাধ্য হলেন। কারখানা দিনে রাতে সমানতালে চলে, কিন্তু ফোরম্যান মাত্র একজনই।এডিসন নিজে। অর্থাৎ কারখানার কর্মচারীরা বিশ্রামের জন্য ছুটি পেলেও এডিসনের নিজের কিন্তু ছুটি নেই। অসাধারণ পরিশ্রম শক্তির অধিকারী মানুষ ছিলেন টমাস আলভা এডিসন।
এডিসন কিন্তু বিক্রিযোগ্য যান্ত্রিক সরঞ্জাম তৈরি করেই ক্ষান্ত থাকলেন না। তার জীবনের প্রধান নেশা় ছিল বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং নানা ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা।প্রতি মুহূর্তে তার মগজে নতুন নতুন চিন্তা এবং কল্পনা ঘোরাফেরা করত ; তার পত্নী মিনা এডিসনের মতে এডিসন স্বপ্নেও নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন।গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা তিনি সেই সমস্ত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চেষ্টা করেছিলেন।কারখানা পরিচালনার অবিরাম ব্যস্ততার মধ্যে তিনি গবেষণার জন্য সময় বের করে নিয়েছিলেন। ১৮৭০ সনে নেবার্রকে কারখানা স্থাপন করার দিন থেকে ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে এডিসন ১২২টা নতুন যন্ত্র উদ্ভাবন করে সেগুলির পেটেন্ট নিয়েছিলেন।

