
পাথর থেকে সবুজের আভায় ঐশ্বরিক মূর্ছনা: প্রাবন্ধিক চিন্ময় গুহ র ‘পাথরের ফনা ও ঈশ্বর’ সোনালী চন্দ
এতদিন তাঁর প্রবন্ধ-বিষয়ক নন ফিকশন পড়েছি। এই প্রথম প্রাবন্ধিক অধ্যাপক চিন্ময় গুহ র অলৌকিক শিল্পরসে সিক্ত এমন কিছু মাইলফলক কবিতার সঙ্গে আলাপ হল যা মন ও মননের প্রত্যন্ত গভীর কোনও গর্ভে সুরের মাধুর্য প্রোথিত করে গেল।
‘পাথরের ফনা ও ঈশ্বর ‘ নিছক কাব্যগ্রন্থ নয়। বরং লয়, তাল, সুরের মূর্ছনা যা তাঁর শব্দ ও ভাষার ললিত মাধুর্যে এই ঘন অন্ধকার অন্তহীন সুড়ঙ্গের শেষে প্রজ্জ্বলিত উজ্জ্বল প্রভা।
ভাষার গভীরতায় মননকে কতখানি ছোঁয়া সম্ভব? যে শব্দের মূর্ছনায় ভাষার প্রয়োগে পাঠক মননে আদ্যন্ত সুরের সৃষ্টি করে, তা মননে, মনে ,হৃদয়ের গভীরে অত্যন্ত নিঃশব্দে আলোময়ী এক ছাপ রেখে যায়, সেই ছাপ অনন্তকাল ধরে পাঠকের হৃদয়ে সুরের ঝংকার সৃষ্টি করে।
অধ্যাপক গুহ আসলে আদ্যোপান্ত কবি। তাঁর প্রবন্ধ, তাঁর সাহিত্য আলোচনায় যা সবথেকে প্রকট, তা হল তাঁর শব্দপ্রয়োগ এবং ভাষার চলন।
এই কবিতাসমগ্র তাঁর বিভিন্ন বয়সে লিখে রাখা এবং অনেক কবিতা পূর্ব প্রকাশিত । ছাত্রাবস্থা থেকে আজ এই নিকষ কালো সময় পর্যন্ত তাঁর লিখে রাখা একের পর এক বিস্ময়কর কবিতা আমাকে ভাবায়, ফের পড়তে বাধ্য করে। এক একটা কবিতা যেন হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া কোনও অনুরণন।
আমরা এমন এক ঘনীভূত অন্ধকার সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যা পার হতে গিয়ে কোথায় চলেছি, কতদূর আরও পাড়ি দিতে হবে, অন্তহীন এই অন্ধকারে আদৌ কোনও আলোর সন্ধান পাবো কিনা, আমরা কেউ জানি না।
এই বিমূঢ়, অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক
গুহ র এই কবিতাগুলো যেন সঞ্জীবনী।
তিনি নিজে এই কবিতাগুলোকে বলেছেন ‘ এদের কবিতা বলব, মা শুধুই লিখন ( éeriture) , জানি না।
কখনও বিষন্নতা, কখনও এমন এক ‘ পৃথিবীর গভীরতম অসুখ ‘ কখনও ঝঞ্ঝাবাতাস, কখনও পেলব কোনও ভোরের রাগিনী।
যে কবিতায় তিনি লিখছেন—
‘ চলো, জঙ্গলে যাই,
সেখানে দেবতারা আগুন রঙের মালা পরে হাঁটছে, রূপোলি- নীল বন্যার ভেতর
হাতির দাঁত রঙের চিতাবাঘিনীদের সঙ্গে।
মহুয়া ফুলের ছোটো ছোটো পাপড়ি পড়ে আছে রাস্তায়,
বিষন্ন শঙ্খের মতো তাদের শীর্ণ কররেখা ‘
কেন তিনি জঙ্গলের কথা উল্লেখ করলেন?
মানুষ নামক প্রাণী বহুল শহর তাঁকে কি ক্লান্ত করেছে? মানুষের এই জনবহুল জঙ্গলে আমরা কি সত্যিই ক্লান্ত নই? একটু শ্বাস নিতে চাই না কি আমরা?
এই জনবহুল, কোটি কোটি মানুষের ভারে ক্লান্ত শহরের শরীরও কি এই ভার বহন করতে সক্ষম?
তার থেকে তিনি জঙ্গলে যাওয়ার কথা বলছেন। কেন জঙ্গলে যেতে বলছেন?
অন্ধকার, অ-প্রেম, অসহ্য বিষাদ থেকে তিনি সরে যাওয়ার কথা বলছেন। যেন অজগরের নাগপাশে গোটা পৃথিবীর সমস্ত শহর শ্বাসরুদ্ধ। একমাত্র আশ্রয়ের খোঁজে তিনি জঙ্গলে যাওয়ার কথা বলছেন।
কেন?
তিনি সেখানে দেবতাদের দেখছেন আগুন রঙের মালা পরে হাঁটতে। এ এক আশ্চর্য মেটাফর । ‘ আগুন রঙের মালা’ বলতে কি তিনি কোনও দৈব প্রভার কথা বলছেন?
এই ঘনীভূত অন্ধকার থেকে আলোর রাস্তার সন্ধান দিচ্ছেন?
‘আগুন রঙের মালা পরে’ দেবতারা ‘হাতির দাঁত রঙের চিতাবাঘিনীদের সঙ্গে’ রুপোলি- নীল বন্যার ভেতর’ হাঁটছেন । হাতির দাঁতের রঙকে আমরা জানি ‘ দীপন্তি ‘ বলে! যার হালকা হলুদ-সাদা রং স্বপ্নে দেখেছিলেন সিদ্ধার্থের গর্ভধারিনী মাতা রানী মায়াদেবী । যা একান্তভাবে আগত শান্তির প্রতীক। সেই দীপন্তি রঙের চিতাবাঘিনীদের সঙ্গে দেবতারা আলোর মালা পরে ‘রুপোলি-নীল বন্যার ভেতর ‘ দিয়ে হেঁটে চলেছেন।
‘রুপোলি-নীল’ রং প্রসঙ্গে উইলিয়াম বাটলার ইটস এর একটা কবিতার লাইন মনে পড়ল-” ‘The blue and the dim and the dark cloths
Of night and light and the half light’
কি অদ্ভুত চিত্রকর্ম! এই চিত্রকর্ম অলৌকিক সৌন্দর্যের এক অনুভূতি জাগিয়ে তোলে, যা একটি উজ্জ্বল, ঝলমলে গুণের ইঙ্গিত দেয়।
অধ্যাপক গুহ র কবিতায় সেই অলৌকিক আলোর বন্যার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়।
যেন এক ঐশ্বরিক ‘রুপোলি-নীল বন্যার ভেতর’ দিয়ে শান্তির প্রতীক সেই ‘হাতির দাঁতের রঙের চিতাবাঘিনীদের ‘ সঙ্গে ‘আগুন রঙের মালা ‘ অর্থাৎ সোনালী বর্ণের মলা পরে সেই জঙ্গলে দেবতারা হেঁটে চলেছেন।
আমাদের তিনি ক্লান্ত, অবসন্ন, ঝুঁকে পড়া ঘনীভূত অন্ধকারময় জগত থেকে সেই জঙ্গলের সন্ধান দিচ্ছেন।
তাঁর আর একটা কবিতা প্রসঙ্গে আসি:
নৈঃশব্দ্য, ঘুমহীন রাত, চূর্ণ বিচূর্ণ আয়না, নিশ্চল- প্রতিমা গাঢ় বেদনা তাঁর কবিতায় এক অনন্য মাধুর্য সৃষ্টি করেছে।
একই সাথে তিনি নৈঃশব্দ্য এবং রাত্রিকে তাঁর নিজের তালুতে ধরতে চেয়েছেন।
কেন তিনি নৈঃশব্দ্য এবং রাত্রিকে বেছে নিলেন?
এই দুটি শব্দবন্ধ একসাথে দেখলে বোঝা যায় তিনি কোলাহল থেকে দূরে কোনও গভীর নৈঃশব্দ্য কে বেছে নিচ্ছেন একমুঠো শান্তির অবকাশ খুঁজতে।
‘আলো অন্ধকারে যাই , মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয় , কোন্ এক বোধ কাজ করে ‘… জীবনানন্দ চেয়েছিলেন এমন এক আলো-অন্ধকার। তাঁর মাথার ভিতর যে ‘বোধ কাজ করে’ আমরা কি ভেবেছি কখনও কিই সেই ‘বোধ’?
অধ্যাপক গুহ চেয়েছেন তাঁর তালুতে এক সাথে নৈঃশব্দ্য এবং রাত্রি কে ধরতে।
‘কিন্ত তা ছলকে গিয়েছে অসীম মহাবিশ্বের ছায়াপথে’ ‘ । তিনি সেই অব্যক্ত, স্থির, নিশ্চল প্রতিমার মত স্থবির সমস্ত কিছু লিখে রেখেছেন ‘শূন্যের সুষুম্নায় ‘
লিখে রাখার জন্য তিনি ‘শূন্যের সুসম্পর্ক বেছে নিয়েছেন । কেন?
অনন্ত অস্তিত্বহীনতা বলতে আমরা শূন্য বুঝি। কিন্ত সত্যিই কি শূন্যের অস্তিত্ব নেই? শূন্য সত্যিই কি রিক্ত? আসলে সনাতন ধর্ম গুলি যেমন বৌদ্ধধর্ম , জৈনধর্ম এবং ভারতীয় দার্শনিক ভাবনায় এই শূন্যের অভাবনীয় উপস্থিতি আছে।
ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যে , ‘ ‘শূন্যতার’ ধারণাটির মতবাদের প্রেক্ষাপটের উপর নির্ভর করে একাধিক অর্থ রয়েছে। এটি বাস্তবতার একটি সত্তাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। এমন একটি ধ্যানমূলক অবস্থা, অথবা অভিজ্ঞতার একটি বিষ্ময়কর বিশ্লেষণ.যা স্থির, অবিচল।
এই শূন্যের সুষুম্নায় অর্থাৎ গভীরতম ইড়া ও পিঙ্গলায় তিনি যা কিছু অব্যক্ত, স্থির, নিশ্চল প্রতিমার ন্যায় স্থবির, তার সমস্ত কিছু সেই গভীরতম সুষুম্নায় লিখে রেখেছেন।
ঘূর্নায়মান পৃথিবীকে তিনি থামিয়ে বলেছেন ‘ অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না ভস্ম আর লোহা আমায় ডাকে।’
তিনি ঘূর্নায়মান পৃথিবীকে থামিয়ে দিতে চেয়েছেন কেন? সময় কে স্থির করে দেওয়ার জন্য। কেন সময়কে তিনি স্থির করতে চেয়েছেন?
তাঁকে যতক্ষণ না ভস্ম আর লোহা ডাকে ততক্ষণ পর্যন্ত।
তিনি কেন ভস্মের আহ্বান আশা করছেন?
জীবনের এই প্রচন্ড ব্যস্ততম ঘূর্নায়মান সময়ের শেষে পড়ে থাকে ভস্ম। মাটি থেকে আমাদের জন্ম ( পৌরাণিক মতে) আবার ভস্ম আকারে মাটিতেই আমরা বিলীন। একমাত্র সত্য তাই ভস্ম। আর লোহা পৃথিবীর একটি প্রধান ধাতু। এটি পৃথিবীর ভূত্বকের চতুর্থ সর্বাধিক প্রাচুর্যপূর্ণ উপাদান এবং পৃথিবীর কেন্দ্রের প্রধান উপাদান। অপর মতে, শক্তি, দৃঢ়তা, সাহস এবং একগুঁয়েমির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছু সংস্কৃতিতে, লোহা অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার জন্যও ব্যবহৃত হত।
তাই সম্ভবত এই দুটি অনিবার্য সত্য এবং অবিনশ্বর বস্তু দুটির আহ্বানের জন্য তিনি পৃথিবীর ঘূর্নায়মান গতিকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছেন ।
এমন এক একটা কবিতায় গভীর মনস্তত্ব, বোধ, জীবনের অনন্ত সত্য, বিষাদ, আশা যেন এক একটা সময়ের রাগের মত উচ্চারিত হয়েছে।
আমরা জানি শব্দ ই ব্রহ্ম! সেই ব্রহ্মজ্ঞানের আধার বলতে যদি কিছু থাকে, তা অধ্যাপক চিন্ময় গুহর কাব্যিক অসাধারণত্বের বিস্ময় , এক অলৌকিক সৃষ্টি, যার গভীরে যত ঢোকা যায়, ততই বিস্ময়, সুরেলা মূর্ছনা,এক অতীন্দ্রীয় চেতনার উদয় হয়।
সোনালী চন্দ
অনুবাদক, সাহিত্য -আলোচক, লেখিকা, ভাষাতত্বের গবেষক
ই এফ এল বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দরাবাদ ক্যাম্পাস।


