গৌতম বসুর সুকুমারীকে না-বলা কথা <br />  দীপক রায়

গৌতম বসুর সুকুমারীকে না-বলা কথা
দীপক রায়

আমার কাছে অচেনা এই ভাষা । কিন্তু আমার ভেতরে তা ধাক্কা দিচ্ছে। ভয় ভাবনা আর আর হতশ্রী বাংলাদেশের ছবি পীড়িত করছে। না, সব কবিতা এভাবে নয় , কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে উনি বদলে দিতে চাইছেন বাংলা কবিতার ভাষা। তো এই যাঁর কবিতার ভাষা, তিনি কীভাবে আমার “স্লেজগাড়ি” নিয়ে এভাবে বলবেন। সবটা বিশ্বাস হয়নি সেদিন। পরে দেখেছি গৌতম ঠিক “অন্নপূর্ণা”-র জায়গায় সেভাবে থাকেননি পরবর্তী সময়ে। গৌতম বসুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। আজ লিখলেন কবি দীপক রায়।

কলকাতা বইমেলা তখনও পার্কস্ট্রিট থেকে সল্টলেকে চলে যায়নি। ২০০৮ সাল সম্ভবত। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের এক কোণে গৌতম বসু খুব অন্তরঙ্গভাবে জিজ্ঞাসা করলেন আমাকে – আপনার “স্লেজগাড়ি” পাওয়া যায় এখন ? ১৯৮৪তে বের হওয়া বই কার কাছেই বা থাকবে? আর আমার তো বিক্রির স্থায়ী কোনও জায়গা নেই। খুব আন্তরিকভাবে গৌতম বললেন – “স্লেজগাড়ি”-র কিন্তু একটা পুনর্মুদ্রণ হওয়া দরকার। এরপর যা বললেন তা বিশ্বাস করা কঠিন আমার পক্ষে। কারণ ১৯৮১ সালে গৌতমের বই “অন্নপূর্ণা ও শুভকাল” প্রকাশিত হয়েছে শুধু নয়, পাঠকের কাছে যে বই যথেষ্ট সমাদর পাচ্ছে। সেই ক্ষীণকায় বইটির প্রথম কবিতা
জলের পরিবর্তে এই শ্রাবণ
আর সহজ নয়,
ভূমি হয়ে উঠেছে হতশ্রী বাহু
দক্ষিণ, ক্লিন্ন গৃহশেষের শান্তি
১০ সংখ্যক কবিতার প্রথম দুটি পংক্তি
কিছু ভয় বৃষ্টির রাতের জন্য সঞ্চিত থাকতো
ঝড়ের যন্ত্র যখন অবিরাম প্রসবিনী, কিছু ভয় অনাথ;
১৬ সংখ্যক দুটি পঙক্তি
ভাতের হাঁড়ির নিচে আগুন নেই, জল
নদীতে জল নেই, আগুন; উদ্বেগ এইজন্য ।
আমার কাছে অচেনা এই ভাষা । কিন্তু আমার ভেতরে তা ধাক্কা দিচ্ছে। ভয় ভাবনা আর আর হতশ্রী বাংলাদেশের ছবি পীড়িত করছে। না, সব কবিতা এভাবে নয় , কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে উনি বদলে দিতে চাইছেন বাংলা কবিতার ভাষা। তো এই যাঁর কবিতার ভাষা, তিনি কীভাবে আমার “স্লেজগাড়ি” নিয়ে এভাবে বলবেন। সবটা বিশ্বাস হয়নি সেদিন। পরে দেখেছি গৌতম ঠিক “অন্নপূর্ণা”-র জায়গায় সেভাবে থাকেননি পরবর্তী সময়ে।
পরের বই “অতিশয় তৃনাঙ্কুর পথে”-র “গঙ্গানারায়নপুর” কবিতাটি সামনে রাখি –
অবশেষে, কোনও এক মধ্যাহ্নে L
বাঁশবনের ধারে, যদি কেউ ললাট স্পর্শ করে
ধীরে, অতি ধীরে, তাকে দিও, আমার বিরহ

তারপর গৌতমের ৪০ পাতার তৃতীয় কাব্যপুস্তিকা “রসাতল” – মলিন নিউজ প্রিন্টে ছাপা,দশ পয়সার ডাকটিকিট সাঁটা, এসে পৌঁছায় আমার কাছে । আর আমাকে স্তম্ভিত করে দেয় টানা গদ্যে লেখা কবিতাগুলি। পাতা ছাড়িয়ে যাওয়া “এবাজুদ্দিন লস্কর”-এর কয়েকটি পঙক্তি সামনে রাখি –
যতবার পার হয়েছি এবাজুদ্দিনের বাড়ি, দেখেছি, বাঁশের কঞ্চির
গেটটি নারকল দড়ি দিয়ে বাঁধা …
কখন ফিরবেন এবাজুদ্দিন?… শুনতে পাচ্ছি ভাঙা ডাল আর পাতা
মাড়িয়ে চলার শব্দ । যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে এবাজুদ্দিনের
বাড়ি স্পষ্ট দেখা যায়; উঠোনে ধান বিছানো নেই, রেডিও বাজছে না,
দাওয়ায় একটা ছেঁড়া গামছা মেলা আছে। …

এরপর অন্ধ এবাজুদ্দিনের সঙ্গে কবির অকস্মাৎ সাক্ষাৎ ঘটে গেছে। কবিতা
শেষ হচ্ছে –
… বিপুল হাওয়ায় চুলদাড়ি উড়ছে, মাথা উঁচু; গোধূলিবেলায় সেই
নিশ্চল মূর্তির সম্মুখে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থেকেছি, এক আলোকময়
সিংহদ্বারের দুই জন্মান্ধ প্রহরী।

এই পুস্তিকার টানাগদ্যে লেখা শেষ কবিতার শেষ কটি পঙক্তি উল্লেখ করি –
…দুঃখিনী আমাদের এই মেয়ে আর কোনদিন এসে দাঁড়াবে না পেয়ারাতলায়,
হাঁটবে না ভিজে ঘাসে, যেখানে পাড় ভাঙার শব্দ ডুবে যায় নদীতে, সেই
কুয়াশায়, গচ্ছিত রইল তার এই পৃথিবী।
-(নদীর বক্ষদেশ)
গত শতাব্দীর শেষ দশকের সবটা জুড়ে এই কটি কবিতার রচনাকাল। বলা চলে এই
গৌতমকে আমি আমার লেখার মধ্যে খুঁজে পেলাম যেন। পরের পুস্তিকাটি আবার
১৬ পাতার – “নয়নপথগামী”। পাঁচ পঙক্তির একটি কবিতা সামনে রাখি –
পাথরের জমির উপর সব প’ড়ে থাক
একজোড়া ঘুঙুর, সামান্য এই কবিজন্ম,
আমার প্রেম, স্বামী, অর্গল খুলে মধ্যাহ্নের
আকাশপথে মিশেছে, সুর হয়ে ঘিরে আছে
তোমার ওই ঘন নীল, উদাসীন বিগ্রহ। (মীরা দাসী)

উদাহরণ দীর্ঘ করব না। আমার বই নিয়ে গৌতমের কথাটা মেনে নিতে আর অসুবিধা হয়নি। গৌতম বসুর কবিতা অংশত চিনে আরও কয়েকটি বই পার হয়ে তার শেষ প্রকাশিত পুস্তিকার মুখোমুখি হই।

২০১৯-এ “শুধু বিঘে দুই” প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয় গৌতমের আবার ১৬ পাতার একটি এক ফর্মার পুস্তিকা –“সুকুমারীকে না-বলা কথা”। ১২ লাইনের ২৪টি কবিতা। কোনো পঙক্তিই দৃশ্যত খুব ছোটো বড়ো নয়। ২০ বা ২২মাত্রার মনে হয়। কিন্তু প্রচলিত ছন্দের হিসেবে তাদের ধরা যাবে না। ছন্দ জানা আমার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে এই কবিতা নিয়ে কথা বলেছি। কেউ বলেছেন ছন্দে লেখেননি গৌতম, কেউ স্ক্যান করতে গিয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করছেন না, কেউবা ছন্দের প্রসঙ্গ না এনে কবিতার ভালো-মন্দের কথাই বলতে চাইলেন। ছন্দের প্রসঙ্গে গৌতম অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে বললেন – “বাংলা কবিতা যতদূর এগিয়ে গেছে ততদূর ছন্দশাস্ত্রের লোকেরা এগোয়নি। ছন্দ কিন্তু এগিয়ে চলেছে ! অনেক লোকে ছন্দ তৈরি করছে, ছন্দ ভাঙছে কিন্তু হিসাবরক্ষক নেই যে সেগুলোকে ক্যাটেগরাইজ করবে।
এই কথাগুলিকে সামনে রেখে হয়তো কোনো ছন্দসন্ধানী পাঠক তাঁর এই কবিতার মধ্যে কোনো বিশেষ ছন্দ খুঁজে পাবার জন্য সচেষ্ট হবেন। কিন্তু আমি নিজে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত এই শেষ গ্রন্থটি পড়ে তথাকথিত ছন্দ ছাড়া নানাভাবে বিস্মিত ও কৌতূহলী হয়েছি । কবিতার অন্তর্ভুবনে যাবার আগেই উৎসর্গের পাতায় মুদ্রিত – “মুনিয়ার মা-কে” চোখে পড়ে, আর তার পিছনের পাতায় পাঁচশো বছর আগের কবি জন ডান(১৫৭২ -১৬৩১)- এর নাম ও তাঁর একটি স্মরণীয় পঙক্তি। প্রশ্ন জাগে কবি জন ডানকে নয়, উৎসর্গ করা হল ‘মুনিয়ার মা-কে’। আর কবিতা লেখা হল “সুকুমারীকে না-বলা কথা” নিয়ে। প্রশ্ন, মুনিয়ার মা-ই কি সুকুমারী? সুকুমারী-ই বা কে? তিনি কি কবির প্রেমিকা, তিনি কি তাঁর জীবনসঙ্গিনী, তিনি কি তাঁর পরিচারিকা ? কে তিনি – যাকে কবির সব কথা অনিবার্যভাবে বলে যাবার দায় কবির, – ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। ২৪টি ১২পংক্তির কবিতা পড়তে পড়তে সুকুমারীকে চেনবার চেষ্টা করি তাই। তার আগে গৌতমের কাব্যভাষায় কিছু শব্দের গুরুচন্ডালির ব্যবহার, যেমন, দিকে/ পানে, জন্যে/ তরে, বলি/ কই, তাকে/ তারে বা চোখ/ নয়ন এইসব বৈশিষ্ট্য মেনে নিতে হবে। এসব নিয়ে আমাদের ভাবনা নয়। আমরা বরং কবির “সুকুমারী”কে নিয়ে ভাবি। প্রথম কবিতাটি শুরু হচ্ছে –
পরিপূর্ণ নিদ্রামাঝে যখন পরিপূর্ণ জেগেছিলাম,
এই দিবালোকে, লক্ষ করলাম, সুকুমারী, একযোগে
হাসছে, তোমার নাকের নোলক আড়াল করে হাসছে
বিষম দুঃখের দিনে, দুলছে তোমার নোলকের হাসি।
প্রথম কবিতার শুরুতেই আমাদের বিস্ময় – পরিপূর্ণ নিদ্রার ভেতর কবির এই জাগরণ কেন? সুকুমারী কার সঙ্গে একযোগে হাসছে? দুঃখের দিনে এই হাসির অর্থ কী? নাকের নোলকের ভেতর দিয়ে এই হাসির অপার্থিব সৌন্দর্য দেখবার জন্যই কি কবি পরিপূর্ণ ঘুমের মধ্যে পরিপূর্ণ জেগে থাকেন?
এরপর যেন কবি নিজেকেই জিজ্ঞাসা করেন তার দুর্ভাবনার কথা কি সুকুমারী জানে, সে কি জানে এই অশুভ টিলায় তার অশ্ব ঘুমায়, সে কি জানে এখানে তার আসার কারণ? কবি বলেন – !
“আমার গায়ের উপর অবিরাম ঝরে পড়ছে শ্বেতশুভ্র, হতাশ বর্ণমালা”।
দ্বিতীয় কবিটাতে এই সুকুমারীর ওপরই যেন তাঁর সামান্য উষ্মা লক্ষ করা যায় – কবি লেখেন –
“আমায় বুঝাও না কিছু, একটি বাক্য শুনাও না আর”।
তারপর কবি বলে চলেন – “ঝড় উঠেছে সহসা, ধীবরকন্যারা ফেরেনি এখনও …এখনও ঘরে ফিরে আসেনি খঞ্জ পাঁচালি বিক্রেতা, রান্নাঘরের পিঁপড়েগণ, ডাক দিয়ে যাই তোমাদের… “ এই কবিতায় আবার সুকুমারীকে তাঁর জিজ্ঞাসা –“ কোন আলো আবার জ্বালাবে বলে এসেছিলে সুকুমারী”। এবার অকস্মাৎ কবি সাফোর প্রসঙ্গ আনেন। কেন লেখেন –“দেবী সাফো-র অবাধ্য লিখনমালার মতো নিভে যায়”। কেন সুকুমারীকে এসব বলতে হবে তা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে। ৩ সংখ্যক কবিতায় কবি স্বীকার করেন – “তোমার চোখ দিয়ে আমি সব দেখতে পাই, সুকুমারী”। লেখা চলতে থাকে।
চতুর্থ কবিতায় কবি স্বীকার করেন কী কী তিনি বলতে চেয়েছেন তার কাছে আর সব কথা কেনইবা বলা যায়নি। পরের কবিতায় এক তপ্ত মধ্যাহ্নে তন্দ্রাচ্ছন্ন জলপটির ওপারে ফুগা মাসির চাপা গলার কথা আসে। সমুদ্র পার হয়ে আসা নিবারণ কাকের কথা আসে। আর কবি শুয়ে থাকেন জানলার গরাদের নির্মম ছায়ার নীচে। এই কবিতায় দৃশ্যত সুকুমারী নেই!
ষষ্ঠ কবিতায় আবার সুকুমারীর প্রবল উপস্থিতি। কবি লেখেন – “শব্দের পিছনে লুকিয়েছি, না হলে কি তোমায় পেতাম” । রহস্য বাড়ে – সুকুমারী তাহলে কে? পরের স্তবকে কবি লেখেন –“গুম্ফার মাথায় রঙিন পতাকার মতো আমি কাঁপছি”। এরপর “রূপ” নিয়ে নানা কথা বলে যান কবি, নানা অভিযোগ তাঁর। কিন্তু সুকুমারী সেসব মানে না।
সপ্তম কবিতায় তার অনুপস্থিতিতে কবির অসহায়তার তীব্রতা লক্ষ করা যাক –

তুমি নেই, কে জানাবে, কীসের তরে এত গোপনীয়তা,
তুমি নেই, কে বলে দেবে, চারিদিকে কেন জল ঝরছে !
পরের কবিতায় কবির দুর্ভাবনা বাড়ে। কবি বলেন – “আমার আশঙ্কার কারণ তুমি বুঝবে না, সুকুমারী”। নবম কবিতায় অসামান্য কয়েকটি চিত্রকল্প লক্ষ করি –
১ … ফাঁকা ঘরের কোণে একা টেলিফোন বেজে চলেছে
২ সব হারানো পথকুকুর, শুয়ে আছে ঝরাবকুলের সংসারে
৩ পা ঝুলিয়ে বসে আছি প্রেতিনীর নাম লেখা ফেরিঘাটে
৪ কেউ নেই, শুধু পাঁচিলে হেলানো সাইকেল আর আমি
সুকুমারী ক্রমাগত আমাদের কাছে রহস্যময় হয়ে ওঠে। কবি তার উদ্দেশে লেখেন –
এই বিবরণখানি লিখে রাখা যাবে, ভাবিনি কখনো
বেশ কয়েকটি জলের তিরে বিদ্ধ হলাম, সুকুমারী… (সংখ্যা১১)
এই কবিতায় একটি চিত্রকল্প – “রাতজাগা পথকুকুর একেলা হ্রদের মতো ঘুমায়”। এই চিত্রকল্প-এ গৌতমের কল্পনা কতদূর যেতে পারে তা ভাবি।
পরের কবিতায় এক লাল গরুর উপস্থিতি। “লাল গরুকে ডাকতে বেরোয়নি বালিকা, সব নিস্তব্ধ”। – তারপর – “লাল গরুর চাহনির সমুখে উপস্থিত হতে মনে হল, এই বুঝি সূর্যাস্ত …/ কেবল দিনান্ত নয়, সুকুমারী, এই বুঝি অবসান।/ পিছনপানে তাকাই, লাল গরু এসে দাঁড়ায় পিছনে”। লাল গরুর তিনবারের উপস্থিতিতে এক পরাবাস্তবতার ছায়া এসে পড়ে। ১৩ সংখ্যক কবিতায় যখন দেখতে পাই অন্ধকার একটা ঘোড়া ছুটে বেড়াচ্ছে প্রভুর সন্ধানে, তার অশ্বক্ষুরের আঘাত, আর –“টিলার ধার বেয়ে ধোঁয়ার মতো/ উঠে আসছে সে, চোয়ালের কোন থেকে অবিরাম ফেনা/ ঝরছে …” – ভাবি পরাবাস্তবতার কী নিপুণ স্পর্শ এখানেও।
দেখতে-দেখতে গন্ধর্বলোকে এসে পৌঁছেছেন কবি। সামনে অক্লান্ত বাঁশরি আর পিছনে একজন – “একা হয়েছে কুকুর, সরাইখানায়”। ঋষি প্রজাপতির ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছেন কবি । তাঁর জিজ্ঞাসা – “এই তবে গন্ধর্বলোক, সুকুমারী, এই তবে মদিরা ।“
দু-ধারে ছড়িয়ে রইল প্রদাহ। থাকবার জায়গা নেই, অন্নজল নেই, চটিজোড়া নেই ঘুমের বিছানা নেই। এবার বুঝি সময় হল “পাথরখন্ডে ফিরে যাবার”। কিন্তু কোন পথে ফেরা হবে ?কবি বললেন –“ফিরবে যে গেঞ্জিজামা কোথায়, তোমার লণ্ঠন কোথায়? ১৮ সংখ্যক কবিতায় দেখা যাচ্ছে ভগ্নদশার করাল ছায়ায় কথকের যখন মাথা ঠুকে গেল সে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। তারপর,- “হায়, নৌকাডুবির মতো গম্ভীর হয়ে গেলে অকস্মাৎ”। নৌকাডুবির মতো গম্ভীর – কী আশ্চর্য উপমা!
“ উপমাই কবিতা” – কে বলেছিলেন? থাক সেকথা । কবি লিখলেন –
দুঃখের দিন কদাপি চিরস্থায়ী হতে পারে না ; পুরানো
বিশ্বাস তোমার, রুটি সেঁকার সমযে, টলে গেলে কেন,
কী পর্যবেক্ষণ ! আর কার উদ্দেশে এসব বলছেন কবি। সুকুমারী ছাড়া কেইবা এখন কাছে আছে তাঁর। পরপর চারটি কবিতায় সুকুমারীর নাম ছিল না। কিন্তু পাঠকের মনে সুকুমারীর অস্তিত্ব নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই। ১৯ সংখ্যক কবিতায় কবি দু-বার একই পঙক্তি লিখলেন – “তোমার নাম আবার উচ্চারণ করলাম, সুকুমারী”। সুকুমারীর কথা না-বলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই কবির । এখন তাঁকে বলতে হয় –
হাঁপ ধরেছে, এসো বসি, বটবৃক্ষের বিপন্ন ছায়ায় ।…(সংখ্যা ২০)
এবার অলীক পৃথিবীতে ফিরে আসার পালা। সুকুমারীকে ‘ক্রোধবরিষন’ করতে বলেন কবি, কোমল হবার কথা বলেন, বলেন – “এমন যেন হয়, ভ্যান-রিকশাকে তুমি পথ ছেড়ে দিচ্ছ”।
২২ সংখ্যক কবিতায় সুকুমারীকে আবার নাম ধরে বলছেন –
ওই শোনো সুকুমারী, কোকিলের সাত ধাপের সুক্ষ সিঁড়ি

আমাদের মলিন জীবন দ্রুত মুছে যাচ্ছে সুকুমারী
কবি অবসাদে ভেঙে পড়ছেন –
সান্ত্বনা পাবার যত কাছে বেঁচে থাকি, তত দূরে তুমি,
কাঁসি ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে একমনে বাসন মেজে চলেছ ;

আবার রহস্যময়ী হয়ে উঠল সুকুমারী। যার চোখ দিয়ে সবকিছু দেখতে চান কবি,
শব্দের পিছনে না-দাঁড়ালে যে সুকুমারীকে পাওয়া যেত না, যাকে কবির সবকিছু
জানাতেই হয়. যার সঙ্গে কবির গন্ধর্বলোক পর্যন্ত যাত্রা – সে আজ একমনে বাসন
মেজে চলেছে। অবগুণ্ঠনে ঢাকা এই সুকুমারী তবে কে? আমাদের রহস্য কাটে না।
ফিরে আসার সময় কবেকার ক্রুদ্ধ সিরাজুলের কথা মনেপড়ে। সেকথাও বলতে হয় সুকুমারীকে। এখনও সিরাজুল ভায়ের নামে গঞ্জে মামলা ঠোকার কথা ভাবে। পরিহাস করে কবি লেখেন –
তোমার জন্যে চটি হাতে ছুটেছিলাম বিছের পিছনে,
বলেছিলাম, ‘লড়াই গেছে থেমে’ ;তোমারই জন্যে ভূপৃষ্ঠে
জল ঢেলেছিলাম, যদি কখনো সিরাজুল রাগ-দুঃখ
ভুলে গ্রামের পথে ফেরে, যদি বিছে নড়ে ওঠে আবার।।

চটি হাতে বিছে মারতে গিয়ে কবি লিখছেন –‘লড়াই গেছে থেমে’।
রবীন্দ্রনাথের ‘বীরপুরুষ’ এসে পড়ল। পরের লাইনে আবার সিরাজুল। পরের লাইনে আবার বিছে। সব এসেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। রবীন্দ্রনাথ শুধু এখানে আসনি। ‘বিসর্জন’ নাটক থেকে রঘুপতি এসেছে। রবীন্দ্রনাথের গান থেকে ‘মিছে হতে মিছে’ এসেছে অবলীলায়।
এক ফর্মার বইয়ে বারো পাতার চব্বিশটি কবিতার শেষ কবিতায় এসে
মনে হল, সব কবিতাটিই তুলে দিই। কিন্তু না, তা থাক সম্ভ্রান্ত পাঠকদের জন্য।
বরং তা থেকে কয়েক পঙক্তি তুলে দিই। চতুর্থ পঙক্তিতে লেখা হল –
“আমি চক্ষুষ্মান কি না, প্রশ্ন ঘিরে পাখি সব করে রব।“ – বলা বাহুল্য, এসে
পড়লেন মদনমোহন তর্কলঙ্কার। কবি লিখলেন – হাতে-পায়ে বেড়ি …
“সন্ধ্যা নামছে ইছামতীর কোলে”। বোঝা গেল দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে
কবি তাঁর সামান্য ঘরে ফিরে এসেছেন। আর বলতে ইচ্ছা হয় না “পুস্তিকা”,-
লিখি এই গ্রন্থের শেষ তিনটি পঙক্তি –

কেবল একটা দালান আমাদের, ছোট্ট দু-টি ঘর;
সিঁদুরকৌটার নীচে একা ঘুমায় আমার চিরকুট,
আমি কী কী পারিনি, মনে রাখার চেষ্টা করি, সুকুমারী ।।
সুকুমারী কে ? তাকে নিয়ে কথা হবে অনেক। ২০১৯-এ প্রকাশিত এই গ্রন্থে
“পানে” “তরে” “নয়ন” এইসব শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা হবে।
কিন্তু সুকুমারীকে না-বলা কথা নিয়ে, তার জন্য সিঁদুরকৌটার নীচে রাখা
চিরকুট, যা একা ঘুমায় – তাদের নিয়ে লক্ষ কথা হবে। আর বাংলা কবিতায়
“সুকুমারী” হয়তো আর এক রহস্যময়ী বনলতা সেন হয়ে রয়ে গেলেন। আমি
সেকথা বলতে পারব না, গৌতম, আমাদের কবিতা নিয়ে, আপনি একদিন
বলেছিলেন- বাংলা কবিতা কাকে রাখবে আর কাকে রাখবে না- সে বড়ো
কঠিন প্রশ্ন !
বড্ড অপ্রস্তুত অবস্থায় আপনি আমাদের রেখে চলে গেলেন। তবু বলি
আপনার “সুকুমারী” রয়ে গেল আমাদের কাছে। রয়ে গেল সুকুমারীকে না-বলা কথা।

৪ জুলাই ২০২১

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (2)
  • comment-avatar
    koushik bazari 3 years

    অসামান্য রচনা দীপকদা। আলোচনাটি একেবারেই গতানুগতিক লেখার বাইরে কবি গৌতমকে খোঁজার এক প্রয়াস। তাকে অন্যভাবে দেখা। খুব ভাল লাগলো।

  • comment-avatar
    Abhijit Ghosh 3 years

    খুব সুন্দর আলোচনা।

  • demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes
    410 Gone

    410 Gone


    openresty