
এ.জে. থমাস : কবিতাগুচ্ছ অনুবাদ : শাশ্বত গঙ্গোপাধ্যায়
A.J. Thomas সমকালীন ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যের এক বিশিষ্ট কবি, অনুবাদক ও সাহিত্য-সম্পাদক। তিনি Sahitya Akademi-এর প্রকাশিত প্রভাবশালী পত্রিকা Indian Literature-এর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে Singing in the Dark, The Shadow and the Rain এবং The Goldsmith’s Apprentice, যেখানে তিনি গভীর সংবেদনশীলতার সঙ্গে সংস্কৃতির স্মৃতি, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবজীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলিকে তুলে ধরেছেন। একজন অনুবাদক হিসেবে তিনি Kumaran Asan ও Balamani Amma-এর মতো প্রখ্যাত মালয়ালম কবিদের রচনাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বৃহত্তর পাঠকমহলের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি Katha Award সহ একাধিক সম্মাননা অর্জন করেছেন এবং Sahitya Akademi-এর তরফ থেকেও সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতা ভারতীয় আঞ্চলিক সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন রচনা করেছে।
শরণার্থী
সে এসেছিল এক শরণার্থীর মতো
অন্য এক পৃথিবী থেকে, মানুষের সঙ্গের আকাঙ্ক্ষায়।
মরণব্যাধিতে জর্জরিত, যেন খুঁজছিল
নতুন প্রাণশক্তি আর আশার আলো
তার অতীত গড়িয়ে পড়ছিল ঠোঁট থেকে,
স্বীকারোক্তির মতো—
বলতে বলতে যেন হালকা হয়ে উঠছিল,
এক অদ্ভুত স্বস্তিতে ভরে উঠছিল সে।
জীবন আর মৃত্যু—একই মুদ্রার দুই পিঠ…
সে যেন হেঁটে চলেছিল তাদের মাঝের
সেই সূক্ষ্ম সীমানা ধরে।
যেন কোনো প্রহরী, উঁচু টাওয়ারের মাথায় দাঁড়িয়ে,
যে দেখতে পায় রেললাইনের দু’পাশ
এবং একই পথে দ্রুত এগিয়ে আসা
দুটি ট্রেন—
যাদের থামানোর কোনো উপায় নেই,
তবুও সে ভান করে নির্লিপ্ততার।
ভাগ্যের এত কাছে এসে পড়া,
এবং হঠাৎ তাকে চিনে ফেলার বেদনা—
তাকে এমন করে তুলেছিল যেন
নিজের কথাতেই তার বিশ্বাস নেই…
এখন সে বলছিল দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে,
ইঙ্গিতের ভেতর দিয়ে,
আগের সেই দৃঢ় উচ্চারণে নয়
যার সঙ্গে সে ছিল অভ্যস্ত।
তার পৃথিবীতে থাকার দিনগুলো নির্ধারিত—
একটি স্মারক যেন
তাদের জন্য, যারা এখনো রয়েছে অন্ধ লড়াইয়ে
ম্লান হয়ে যাওয়া
আমার মায়ের চামড়া-কঠিন মুখ,
দাঁতহীন, বসে যাওয়া ঠোঁট—
ভাঙা হাত প্লাস্টারে মোড়া,
ঘষে যাচ্ছে সেই বাঁ দিকের স্তনের পাশে,
যেখান থেকে একদিন আমাকে দুধ খাইয়েছিলেন,
এখন যা পচে গিয়ে সংক্রমিত।
তিন মাসের হাসপাতালের জীবন
তাকে যেন আবার একটু ফিরিয়ে দিয়েছিল—
কিন্তু যে কোনো মুহূর্তে কেড়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত
আমরা জানতাম, মৃত্যু ওঁত পেতে আছে।
যিনি একদিন জীবন আর আশায় ভরপুর ছিলেন,
হঠাৎ একদিন আমার দিকে ফিরে বললেন—
‘আমি আর কেন বেঁচে থাকব?
আমার সময় ফুরিয়ে গেছে।
আমাকে যেতে দাও। আমার জন্য চিন্তা কোরো না।’
তার চোখে-মুখে তখন এক অদ্ভুত
শূন্য, ক্লান্ত নির্লিপ্ততা।
শেষবার হাসপাতালে থাকার সময়,
যখন তিনি চেতনার ছোট ছোট ঘরগুলোর মধ্যে
যাওয়া-আসা করছিলেন,
তার ঘুরে বেড়ানো চোখ আর দেখতে পায়নি
ছেলের এনে দেওয়া সান্ত্বনা,
নিরাপত্তার সেই আশ্বাস—
দেখেছিল শুধু শূন্যতা,
শুধু শূন্যতা।
চোখ
মাস্কের বাইরে আমি শুধু তোমার চোখই দেখতে পাই—
হালকা মুগ্ধতার ছায়া, তারপর হঠাৎ ঝলমলে
আমার মুখ চিনে নেওয়ার সেই মুহূর্ত।
তোমার হৃদয় যখন ঢেউ তোলে,
চোখে জ্বলে ওঠে আগুন,
ঠোঁটের লাজুক ভাঁজ
কাপড়ের আড়ালে লুকোনো।
আমার বুকে এসে পড়ার জন্য
তোমার শরীরের সামনের দিকে ঝুঁকে আসা
হঠাৎ থেমে যায় মাঝপথে,
‘দূরত্ব বজায় রাখো’—এই দ্বিতীয় ভাবনায়।
বাড়ানো হাতটা ফিরিয়ে নেওয়া,
গ্লাভস নেই বলে একটু সংকোচে সরে যাওয়া।
ক্যাম্পাসে দেখা হয়নি—
এক বছরেরও বেশি সময় ধরে লকডাউন,
তোমার আলিঙ্গনকে কতদিন মিস করছি,
ভুলতে বসেছি শরীরের সেই উষ্ণ স্পর্শ।
কমপক্ষে হাতটা ধরতে চাইছিলাম,
তবু তুমি সরে গেলে।
এই অদ্ভুত কোরিওগ্রাফির
সব নড়াচড়ার ভেতর
অদৃশ্য এক জ্বলন্ত চুম্বনের আকুলতা কেঁদে ওঠে।
এখন আমরা শুধু দাঁড়িয়ে থাকি
দুই মিটার দূরে,
বুকের ওপর হাত ভাঁজ করে—
আর চোখ দিয়েই ভালোবাসি,
নবরসের সব অনুভূতি উজাড় করে।
থাকা
চওড়া বিছানায় তির্যক হয়ে শুয়ে,
অস্পষ্টভাবে শুনছি ভোরের শব্দ—
পাখির ডাক, মাঝেমধ্যে গাড়ির হর্ন,
ধীরে পড়া বৃষ্টির স্নিগ্ধ গুঞ্জনের সঙ্গে মিশে,
মাথার ওপর পাখা ঘুরছে ঝড়ের গতিতে…
অতীতের ভার থেকে যেন আলগা হয়ে আছি,
ভবিষ্যতের মরীচিকার হাসিও দূরে সরে গেছে…
একষট্টি বছরের লড়াই আর আনন্দ,
রক্তের বন্ধনে জড়িয়ে থাকা আপনজন—
হঠাৎ সবই যেন এক বিশাল শূন্যতা…
‘যদি এমন হতো’—সেসব তাড়না আজ নেই,
দ্বিধা-দ্বন্দ্বেরও কোনো জায়গা নেই আর
প্রতিটি জীবনের পথ আলাদা আলাদা দিকে
মিশে যাচ্ছে এক অস্পষ্ট দিগন্তে…
তন্দ্রা ছড়িয়ে পড়ছে চাদরের মতো,
ওজনহীন এক অনুভূতি এনে—
যেন সুতো কাটা ঘুড়ি, মন ভাসছে
চেতনার আশেপাশে…
জীবনের নাটক
মনের ভেতরের চোখে খুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে…
এটাই কি তবে?
শূর্পণখা
আমার মোহনীয় হাসি—হায়,
তাতে প্রকাশ পায় শুধু দাঁতের ভয়ালতা।
তোমার সুন্দর কাঁধে আমার স্নেহভরা স্পর্শ
আসলে নখের আঁচড় হয়ে ওঠে।
তোমার প্রেমে জ্বলা আমার চোখ
হয়ে যায় দুটো দাউদাউ আগুনের কণা,
তোমার জন্য আকুল আমার বুকের কাঁপন
দেখায় শুধু রুক্ষ, অমসৃণ এক রূপ!
এইসব প্রতারণাময় বাহ্যিকতা নিয়ে
আমি কীভাবে তোমায় ভালোবাসি, রাম?
আমার ভালোবাসা তো তোমার প্রতি—
সেই চিরন্তন ‘তুমি’-র জন্য আকুলতা,
কিন্তু আমায় এভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে,
আর তুমি—সবাইকে দেখে বুঝতে পারো যে তুমি—
আমাকেই কি না প্রত্যাখ্যান করলে!
তুমি তো সর্বজ্ঞ, তাই না?
তবে কি করে দেখো না আমার হৃদয়—
পঞ্চাগ্নির তাপে জ্বলছে,
তোমার সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষায় কাঁপছে?
তোমার সেই ক্ষীণদেহা স্ত্রী,
যাকে তুমি বলো তোমার অর্ধেক শরীর আর প্রাণ,
শীঘ্রই চঞ্চল হয়ে উঠবে,
আর তোমার দাস-ভ্রাতার টানা সীমানা
লঙ্ঘন করে বেরিয়ে যাবে—তোমারই কারণে।
নারীত্বকে তুমি এভাবে অস্বীকার করে
রেহাই পাবে না।
আমি শূর্পণখা—
স্বর্গ আর মর্ত্যের বিজেতার একমাত্র বোন,
তবু তোমার সামনে আমি পরাজিত, রাম।
আমার অশ্রুর গলিত লাভা
তোমার মহাকাব্যকে গ্রাস করবে একদিন
ধ্বংসের দিকে

