
রাধাবল্লভ চক্রবর্তীর কবিতা
গুচ্ছ কবিতা
মব
এত নিপুণ ধ্বংস যেন আগে কখনও ঘটেনি
কোথাও — এখন ঈশ্বর, এখন মিডিয়া এসে
অবাক হয়, প্রশ্ন তোলে, চিত্র সংগ্রহ ক’রে
নিয়ে যায় তুলনামূলকভাবে কল্পিত স্বর্গের দেশে —
কে যেন আমার মৃত্যুর পরও ভুলে যেতে
পারেনি বিদ্বেষ; কে যেন আমার হাতে হাত
ছুঁয়ে আরও প্রতিজ্ঞা ক’রে, নিজেকে উন্মাদ
প্রমাণিত করে — তেমন হত্যা এই ভুবনে পূর্বাপরে
ঘটেনি কি? বা, এখানে দৃশ্য এ-ই? তারপর
অনিয়ন্ত্রণ? তারপর ঘটনার আড়ালের চক্রান্ত, পরিকল্পনা?
প্রতিক্রিয়ায় তুমি সজীবতা পেলে? অন্ধত্বের অধিকার নয়
তবে? কেবল বাদ্যি বাজে — অথবা, বাজে না
তা-ও; আমাদের, মানে এক ধর্মপোশাক পরিহিত আমাদের,
আর্তনাদের ধ্বনি, কান্নার প্রতিধ্বনির মতো মুখরিত রাখে…
গণ
মরে যদি যেতে হয়, মরে যেতে পারি —
প্রত্যাশা নেই কোনও; উন্মাদনাও নেই সমান্তরালে —
শুধু ভাবো: এভাবে নষ্ট হ’য়ে গেলে, কে
তবে কুড়িয়ে নিয়ে, পুড়িয়ে ফেলবে পুনরায়
আমাদের কুশপুত্তল? আগুন কি তপ্ত? লেলিহান
শিখা তার জ্বলে কি সমানভাবে এখনও?
ধর্ম মানে যা আজীবন ধারণ করে; আমি
তাই পতন নিশ্চিত জেনেও ভেবেছি: কীভাবে
সাবলীল, কীভাবে স্বাভাবিক, গ্রহণযোগ্য হ’য়ে
ওঠে কবিতা। দেশ যদি জ্বলে যায় আমাদের
সাথে, তবে যাক — আমাদের কাজ তবু ইজ়ম্
খোঁজা — সে-কথা তোমরা কেউ ভুলেটুলে
যাচ্ছো না তো? যেও না — মনে রেখো:
শিরদাঁড়া জারজ হ’লে, নিজেদের পরিচয়ে
অনাথ বলাটা স্বাভাবিক; কোনও অন্যায় নয়…
নপুংসক
যখনই আমার হাতে চাবুক ধরিয়ে তুমি বলেছ
গর্জন ক’রে: ‘যাও — শাসন করো!’, সেই থেকে
পিটিয়ে-পিটিয়ে, ছাল-চামড়া সবই তুলে নিয়েছি;
এবং অবশেষে খুন ক’রে ফেলেছি নিজেকে —
এখনও এইসব গড়িয়ে যাওয়া রক্তের স্রোত,
কলধ্বনি করে, অপার্থিবতা তৈরি ক’রে, বীররসে
ভিজিয়ে দেয় চারদিক — যেন প্রজনন — যেন
নপুংসকের, রাত্রিকালীন এক বীর্যপাতে, সুখ
ছিল! তীব্র ব্যথাময় জীবনে, নিয়ম ভাঙার সার্থকতাও…
দেখা
গণহত্যার পরে লাশ হ’য়ে পড়ে থাকা মানুষ
যারা, তাদের নাম ধরে ডাকোনি কখনও;
যে-দেশ হাতে-ভাতে হত্যার কথা ভাবে
অহরহ, ষড়যন্ত্র করে, ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে কদাচিৎ
স্বাচ্ছন্দ্যে, তাকেও পুনর্দখলের ডাক দাওনি আজও;
যে মা-র কোলের শিশু-সন্তান লুটিয়ে পড়েছে
(ঘুমে?), এবং যেহেতু তার বুকের দুধ সবটুকু
শুকিয়ে গিয়েছে, অথবা, উদ্বায়ী হ’য়ে মিশে
গেছে এই খগে, বায়ুমণ্ডলে, কিন্তু তুমি একটি
ফোঁটাও অশ্রুপাত করোনি, কিংবা, যে তুমি
ধনধান্যে, পুষ্পে ভরা জীবনকে আদর্শ ক’রে বড়
হওনি, কখনও ভাবতে শেখোনি, সে তুমি তো
অপাপবিদ্ধ — তবে কেন, কেঁপে ওঠো এত?
তবে কেন একা হও, একা ভাবো এত?
দৈন্য
যেহেতু মানুষ আমি, এবং আর কিছু না,
কেবল মানুষ, ঈশ্বরের দিকে ঠেলে দিয়ে
যাবতীয় দায়ভার, শ্রান্ত হয়েছি, ক্ষান্ত হয়েছি —
যেন-বা গণধর্ষণ, যেন-বা মব্-লিঞ্চিং, ছিল
সবই নিয়তির কপটতা, প্রস্তাবনা? ধর্ম কাকে
বলে আজ? আর কি প্রশ্ন তোলা যায়?
সচক্ষে যা দেখি তা কি আমার অন্ধকার
প্রতিবিম্ব? এখানে জীব নেই? এখানে শিব
নেই তবে? আছে মূর্তিমান শয়তান কোনও?
আমার নিন্দা এই বন্দীদশায় — একা ঘরে —
শোনা যায়? কতদূর? তোমাদেরও বধির হওয়ার
সময় ঘনিয়ে এল তবে! অথবা নিয়তি এ-ই —
তীব্র ঘৃণাও, অসংশোধিত রূপে তাদের কাছে,
প্রশংসার এক চূড়ান্ত স্থায়ী রূপ নেয়!

