আলোকের সাধনা (টমাস আলভা এডিসনের জীবন কাহিনি) হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

আলোকের সাধনা (টমাস আলভা এডিসনের জীবন কাহিনি) হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

ফেরিওয়ালা টমাস সাংবাদিক হল

টমাস কেবল সময়ের সদ্ব্যবহারই করেন নি, তিনি মস্তিষ্কেরও উপযুক্ত সদ্ব্যবহার করেছিলেন। বেশিরভাগ মানুষই চিন্তা করতে ভালোবাসে না। চিন্তা একটি শারীরিক পরিশ্রম। মগজের পরিশ্রম। পরিশ্রম করতে পছন্দ না করা মানুষ শারীরিক পরিশ্রম যেমন অপছন্দ করে, তার চেয়ে ও বেশি অপছন্দ করে মগজের পরিশ্রম। টমাস আলভা এডিসন নিজেই পরবর্তী জীবনে কোনো একটি প্রসঙ্গে বলেছিলেন–’মগজের পরিশ্রম পরিহার করে চলার জন্য মানুষ করতে না পারা কাজ কিছুই নেই।’
টমাসের স্বভাব ছিল ঠিক তার বিপরীত। তাঁর মস্তিষ্ক ছিল প্রতি মুহূর্তেই সক্রিয়। সেই জন্য জীবনে উন্নতি বা কৃতকার্যতার কোনো সুযোগ তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে এড়িয়ে যেতে পারত না।
টমাস যে সময়ে রেলগাড়িতে ফেরিওয়ালার কাজ করত সেই সময়ে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ চলছিল। এই গৃহযুদ্ধ ছিল আমেরিকার ইতিহাসের একটি অত্যন্ত বড়ো ঘটনা। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বলে আমরা যে দেশটাকে বুঝি সেই দেশ প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত: উত্তর অঞ্চল এবং দক্ষিণ অঞ্চল। উত্তর অঞ্চলের রাজ্যগুলি আমেরিকায় বহু বছর ধরে চলতে থাকা দাস প্রথার বিলোপ সাধন করেছিল। কিন্তু দক্ষিণ অঞ্চলের রাজ্যগুলি সেটা করতে অস্বীকার করেছিল। সেটাই ছিল দুটি অঞ্চলের মধ্যে বিরোধের প্রধান কারণ। তার সঙ্গে অবশ্য আরও কয়েকটি কারণ যুক্ত হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকার–এই দুটি সরকারের মধ্যে ক্ষমতার ভাগ বাঁটোয়ারা কীভাবে হবে তা নিয়েও তিক্ত মতানৈক্য এবং বাদানুবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। অবশেষে পরিস্থিতি এরকম হয়েছিল যে দক্ষিণের কয়েকটি রাজ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে গিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। ঠিক এই সময় আমেরিকার উত্তর এবং দক্ষিণ অঞ্চলের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হল। ১৮৬১ সনে আরম্ভ হওয়া এই গৃহযুদ্ধ ১৮৬৫ সন পর্যন্ত চলেছিল। গৃহযুদ্ধের সময় আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ছিলেন আব্রাহাম লিংকন। তাকেই আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতি বলে ইতিহাস স্বীকার করে নিয়েছে। গৃহযুদ্ধে অবশেষে আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার বিজয়ী হল এবং আমেরিকার অখন্ডতা রক্ষা পেয়ে গেল। কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে যেভাবে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হলেন, ঠিক সেভাবে আমেরিকার গৃহযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার বিজয়ী হওয়ার পরের মুহূর্তে জাতির ত্রানকর্তা আব্রাহাম লিংকনকে আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারাতে হল।
যুদ্ধবিগ্রহ চলে থাকার সময় স্বাভাবিকভাবেই খবরের কাগজের বিক্রিও বেশি হয়, কারণ যুদ্ধের জয় পরাজয়ের খবর পাওয়ার জন্য মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকে। তার মধ্যে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ছিল একটি জাতির জীবন মরনের সমস্যা। সেই জন্য খবরের কাগজের চাহিদা সেই সময় দিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছিল। খবরের কাগজের ফেরিওয়ালা টমাস একদিন বিক্রির জন্য বেশ কিছু কাগজ হাতে নিয়ে লক্ষ্য করল যে শ্বিলহ নামের জায়গায় চলতে থাকা যুদ্ধের খবর, বড়ো বড়ো অক্ষরে কাগজটির প্রথম পৃষ্ঠার প্রায় সমগ্র জায়গা জুড়ে রয়েছে। বুদ্ধিমান টমাস তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল যে সেদিন খবরের কাগজের চাহিদা সাংঘাতিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে এডিসন ডেট্রয়েট ফ্রি প্রেস নামের খবরের কাগজের অফিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন এবং কাগজটির এক হাজারের বেশি কপি চাইলেন । নিজের সততার জন্য টমাস ইতিমধ্যে প্রত্যেকের বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন। টমাসের অনুরোধ শুনে খবরের কাগজের মালিক আশ্চর্য হয়েছিলেন যদিও তারা বিনা বাক্য ব্যয়ে টমাসকে এক হাজার অতিরিক্ত কপি দিয়ে দিলেন।
রেলগাড়িটির টেলিগ্রাফারদের সঙ্গে ইতিমধ্যে টমাসের বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। টমাসের অনুরোধ রক্ষা করে টেলিগ্রাফাররা আগের প্রতিটি স্টেশনেই টেলিগ্রাফির মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন যে শ্বিলহের যুদ্ধের প্রথম খবর বহন করে আনা খবরের কাগজটি কেবল টমাসের হাতে রয়েছে। ফলে প্রতিটি রেল স্টেশনে টমাসের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করে থাকা মানুষ দলবেঁধে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে রইল। টমাসের হাতে যত খবরের কাগজ ছিল তার চেয়েও গ্রাহকের সংখ্যা অনেক বেশি হল। বুদ্ধিমান টমাস তৎক্ষণাৎ কাগজের দাম বাড়িয়ে দিল। গ্রাহকের চাপে পড়ে কাগজের দাম ক্রমশ বাড়তে বাড়তে একসেন্ট দামের কাগজটি পঁয়ত্রিশ সেন্ট দামে বিক্রি করতে হল। মাত্র একদিনের মধ্যে টমাসের লাভের পরিমাণ হল একশত ডলার।
তখন টমাসের বয়স ছিল মাত্র পনেরো বছর।
এতদিন পর্যন্ত টমাস ছিল কেবল খবরের কাগজের ফেরিওয়ালা। কিন্তু এখন সে নিজে খবরের কাগজের মালিক হতে চাইল। রেলগাড়িতে আসা যাওয়া করতে করতেই সে একদিন কার ও মুখে শুনতে পেল যে কোনো একজন লোক একটি পুরোনো ছাপা মেশিন বিক্রি করতে চাইছেন। টমাস লোকটির সঙ্গে দেখা করে দর-দাম করে মেশিনটা কিনে নিল।ছাপা যন্ত্রের মালিক হয়েই সে রেলগাড়ির কামরায় অফিস পেতে ‘সাপ্তাহিক হেরাল্ড ‘ নামে একটি খবরের কাগজ প্রকাশ করল। খবরের কাগজের সম্পাদক, প্রতিবেদক, প্রুফ রিডার, কম্পোজিটর, বিক্রেতা–এই সমস্ত কিছুই ছিল একজন মানুষ: সে হল টমাস আলভা এডিসন। চলন্ত ট্রেনে অফিস পেতে নিয়ে সেখান থেকেই একটি খবরের কাগজ প্রকাশ করার ঘটনাটা এতটাই অভিনব এবং অবিশ্বাস্য ছিল যে একজন ইংরেজ পর্যটক আমেরিকা ভ্রমণের শেষে লন্ডনে ফিরে এসে বিখ্যাত টাইমস কাগজের সম্পাদককে কথাটা জানালেন। ফলে টাইমস পত্রিকায় টমাসের এই অভূতপূর্ব কৃতিত্বের কাহিনি সবিস্তারে প্রকাশিত হল।

(৬)
টমাসের গবেষণাগার
টমাসের অর্থ উপার্জনের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি গবেষণাগার গড়ে তোলা। ইতিমধ্যে তার হাতে যথেষ্ট অর্থ এল। কিন্তু তার নিজের বাড়িতে গবেষণাগারটি স্থাপিত করার কোনো প্রশ্নই এখন উঠতে পারল না, কারণ সে বাড়িতে রাতে কেবল ঘুমোতে আসে। সারাদিন অতিবাহিত হয় রেলগাড়িতে। বলতে গেলে রেলগাড়িই হয়ে উঠেছিল তার দ্বিতীয় বাড়ি। তাই হাতে যখন যথেষ্ট টাকা পয়সা এল তখন সে রেলগাড়ির একটি কামরায় গবেষণাগার স্থাপন করার কথা ভাবল। রেলগাড়িটির কন্ডাক্টর স্টিফেনসনের সঙ্গে তার ইতিমধ্যে বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। গবেষণাগার পাতার জন্য টমাস তার কাছে অনুমতি চাওয়ায় স্টিফেনশন বললেন–বিজ্ঞান এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি তোমার অনুরাগ দেখে আমি খুব আনন্দিত হয়েছি। কিন্তু গবেষণাগার পাতার জন্য আমি একা তোমাকে অনুমতি দিতে পারি না। আমার ওপরওয়ালাদের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করতে হবে। কিন্তু অনুমতি পেতে যাতে তোমার কোনো অসুবিধা না হয় তার জন্য আমি চেষ্টা করব।’
অনুমতি পেতে টমাসের সত্যিই কোনো অসুবিধা হল না। টমাস নিজের মধুর ব্যবহার দ্বারা সবার মন জয় করেছিল। কোনো মানুষের পক্ষেই একা কাজ করা সম্ভব নয়। ছোটো-বড়ো যে কোনো কাজ করার জন্য অন্যের সাহায্য সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। সৎ এবং মধুর স্বভাবের অধিকারী মানুষের পক্ষে অন্যের সহায় সহযোগিতা পাওয়া অনেকটাই সহজ হয়।টমাস ছিলেন এরকম একজন মানুষ।
গবেষণাগার পাতার অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি মুহূর্তও অপচয় না করে টমাস নিজের বাড়ির গবেষণার সরঞ্জাম এবং রাসায়নিক দ্রব্য গুলি রেলগাড়িতে এনে একটা মালগাড়ির কামরার এককোণে নিজের গবেষণাগার স্থাপন করলেন। টমাস আলভা এডিসনই পৃথিবীর একমাত্র মানুষ–যিনি খবরের কাগজ সম্পাদনা করতেন চলন্ত রেলগাড়িতে, গবেষণা করতেন চলন্ত রেলগাড়িতে।
টমাসের বহুদিনের আশা এখন পূর্ণ হল। তাঁর নিজের একটি গবেষণাগার হল। খবরের কাগজ সম্পাদনা করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে নানা প্রকারের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে শুরু করলেন। আগেই একবার বলা হয়েছে যে টমাস রেলগাড়িতে ফেরিওয়ালার কাজটা নিতে চাওয়ার দ্বিতীয় প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ডেট্রয়েট শহরে বই পড়ার সুযোগ গ্রহণ করা। ডেট্রয়েড শহরে একটি বড়ো গ্রন্থাগার ছিল। টমাস মাশুলের বিনিময়ে সেই গ্রন্থাগারের সদস্য হল। গ্রন্থাগারে গিয়ে সে দেখল–সেখানে নানা ভাষায় লেখা বিজ্ঞানের অনেক বই রয়েছে। কিন্তু সেই বইগুলি সে কীভাবে পড়বে–যদি সে সেই ভাষাগুলি না জানে? টমাসের জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ এতটাই তীব্র ছিল যে ইংরেজি ছাড়া ও অন্যান্য ভাষায় লেখা বই পড়ার লোভে সে ফরাসি এবং ল্যাটিন শিখতে শুরু করল!
একেই বলে জীবনের সাধনা। আর্থিকভাবে সফল হওয়ার জন্য মাত্র বারো বছর বয়সে রেলগাড়ির ফেরিওয়ালা হওয়া এডিসন কারও কাছ থেকে কোনোরকম সাহায্য না নিয়ে সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় খবরের কাগজ বের করেছে, চলন্ত রেলগাড়িতে গবেষণাগার পেতে নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, ফেরিওয়ালার ব্যবসার মধ্যে সময় বের করে নিয়ে গ্রন্থাগারে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়াশোনা করেছে। কিন্তু এতেও সে ক্ষান্ত হয়নি। নিজের জ্ঞানের পরিসর বৃদ্ধি করার জন্য সে ফরাসি এবং ল্যাটিন শিখতে শুরু করেছে। এই সব কাজগুলি করার জন্য তার মা বাবা বা অন্য কেউ তাকে বাধ্য করেনি বা তাকে পথ দেখায়নি। এই সমস্ত কাজের প্রেরণা এসেছে তার মনের ভেতর থেকে, কারন সে জীবনের একটি লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে, আর সেই লক্ষ্য অভিমুখে এগিয়ে যাবার জন্য তার মনের মধ্যে রয়েছে দৃঢ় সংকল্প।
টমাসের পরিকল্পনা অনুযায়ী এতদিনে সমস্ত কথা ভালোভাবেই এগিয়ে চলছিল। কিন্তু তার গবেষণাগার একদিন তার পক্ষে এক বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করল।
গবেষণার জন্য স্বাভাবিকভাবেই টমাসের অনেক রাসায়নিক দ্রব্যের প্রয়োজন হত। তাঁর গবেষণাগারের মেঝেতে রাসায়নিক দ্রব্যের বোতল গুলি সারিসারি ভাবে সাজিয়ে রাখা ছিল। একদিন সে গবেষণার কাজে মগ্ন হয়ে থাকার সময় হঠাৎ একটি বোতল মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। বোতলটিতে ফসফরাস ছিল। ফসফরাস নামের এই রাসায়নিক দ্রব্যটি হেনিং ব্রাণ্ড নামে একজন বৈজ্ঞানিক ১৬৭৪ খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কার করেছিলেন। সার, সাবান, কীটনাশক বিষ এবং নানাবিধ ঔষধ প্রস্তুত করার কাজে ফসফরাসের ব্যবহার করা হয়। বাতাসের সংস্পর্শে আসা মাত্র ফসফরাস নিজে নিজে জ্বলে উঠে। টমাসের গবেষণার মেঝেতে অনেকগুলো খবরের কাগজ পড়েছিল। ফসফরাসের বোতলটি মেঝেতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সৃষ্টি হওয়া আগুন খবরের কাগজের স্তূপটিতে ছড়িয়ে পড়ল এবং খবরের কাগজ গুলি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। সম্পূর্ণ ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে টমাসের আগুন নেভানোর চেষ্টা করা ব্যর্থ হল।
সেই একই কামরার অন্য প্রান্তে বসেছিলেন স্টিফেনশন–রেলগাড়ির কন্ডাক্টর। প্রধানত তার সাহায্যেই টমাসের পক্ষে গবেষণাগারটা স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। দূর থেকে দপ দপ করে জ্বলে উঠা আগুন দেখে স্টিফেনসনের মনে প্রথমে ভাব হল যে টমাস করা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা গুলির ফলস্বরূপ এভাবে আগুন বোধহয় লাগেই। কিন্তু আগুন দেখে তার মনে কিছুটা দুশ্চিন্তাও হল। আগুন যদি সমস্ত ট্রেনে ছড়িয়ে পড়ে যাত্রীদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তাকেই প্রধানত দায়ী করা হবে, কারণ টাসকে গবেষণাগার স্থাপন করার জন্য অনুমতির জন্য তিনিই সুপারিশ করেছিলেন। স্টিফেনশন এইসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ এবার তার চোখে পড়ল–টমাস গায়ের কোটটা খুলে তা দিয়ে আগুন চাপা দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে। স্টিফেনশনের বুঝতে বাকি রইল না যে আগুন জ্বলাটা একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা মাত্র: টমাসের গবেষণার জন্য আগুনের প্রয়োজন হয়নি।
স্টিফেনশন দৌড়ে গিয়ে টমাসের সঙ্গে মিলে কোনোভাবে আগুন নেভাল কিন্তু টমাসের ওপরে তাঁর এতটাই রাগ হল যে টমাসের কানের পাশে খুব জোরে একটি ঘুষি বসিয়ে দিল। তাছাড়া তিনি টমাসের গবেষণাগারের সমস্ত কিছু এক এক করে বাইরে ছুড়ে ফেলে দিলেন। সম্ভব হলে তিনি টমাসের ছাপার যন্ত্রটাও বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন, কিন্তু যন্ত্রটা এত ভারী ছিল যে সেটা তুলে বাইরে ছুঁড়ে ফেলা দেওয়াটা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেবল সেই জন্যই টমাসের ছাপার যন্ত্রটা রক্ষা পেয়ে গেল। কিন্তু সেটাও কেবল কিছুক্ষণের জন্য। কারণ স্টিফেনসন টমাসকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল যে এখন থেকে রেলগাড়িতে টমাসের জন্য কোনো জায়গা হবে না; সমস্ত জিনিসপত্র সামলে নিয়ে তাকে পরবর্তী স্টেশনেই নেমে যেতে হবে। কথামতো কাজ। রেলগাড়িটা যখন পরবর্তী স্টেশনে দাঁড়াল, স্টিফেনশন নিজেই কয়েকজন কুলি ডাকিয়ে টমাসের ছাপা যন্ত্রটা এবং আজ পোড়া কাগজের স্তূপটা স্টেশনের প্লাটফর্মে নামিয়ে দিল। বলাবাহুল্য মাত্র যে টমাসের সাংবাদিক জীবনের এখানেই সমাপ্তি ঘটল। কিন্তু রেলগাড়ির কণ্ডাকটরটি তার ছোটো গবেষণাগারটি লন্ডভন্ড করে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল যদিও সেই ঘটনা তাঁর গবেষণার সমাপ্তি ঘটাতে পারল না। তার জন্মই হয়েছিল গবেষণার জন্য। সেই গবেষণা চলতে থাকল তাঁর সমস্ত জীবন জুড়ে, একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।
স্টিফেনসন টমাসের কানে জোরে ঘুষি মারায় কানে খুব খারাপ ভাবে আঘাত লেগেছিল। কিন্তু কেবল সেটাই তার কানে শেষ আঘাত ছিল না। এর কিছুদিন পরে টমাস পুনরায় একটি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হন–যার ফলে তাঁর শ্রবণ শক্তি অনেক পরিমানে নষ্ট হয়, আর তিনি ক্রমশ বধির হয়ে যেতে থাকেন।
ঘটনাটা ঘটেছিল এভাবে। টমাসের খবরের কাগজটির প্রকাশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল যদিও তাঁর রেলগাড়িতে খবরের কাগজ বিক্রি করার কাজটা বন্ধ করতে হয়নি। একদিন রেল গাড়িটা একটি স্টেশনে কিছুক্ষণ সময় থেমে থাকায় টমাস রেলগাড়ি থেকে নেমে প্লাটফর্মে খবরের কাগজ বিক্রি করতে লাগল। এদিকে রেলগাড়ি যে পুনরায় চলতে শুরু করেছে সেটা টমাস খেয়াল করেনি। রেলগাড়ির চলন্ত চাকার শব্দ শুনে টমাস যখন সেদিকে তাকালেন ততক্ষণে রেলগাড়ি জোরে চলতে শুরু করেছে। টমাস দৌড়ে গিয়ে একটা কামরার হাতলটা খামছে ধরলেন ঠিকই, কিন্তু বাঁ হাতে খবরের কাগজে পুঁটলিটা থাকায় দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে পারলেন না। হাতল ধরে দরজায় ঝুলে রইলেন, এদিকে রেল গাড়ি তখন খুব জোরে চলতে শুরু করেছে। প্রাণের ভয়ে ডানহাতে দরজার হাতলটা খুব জোরে ধরে থাকার ফলে টমাসের হাতটা ক্রমশ অবশ হয়ে পড়ছে বলে মনে হতে লাগল। যেকোনো মুহূর্তে চলন্ত গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে হাড়গোড় ভেঙ্গে যেতে পারে বলে তার মনে ভয় হল। অবশেষে ভয়ে কাতর হয়ে তিনি চিৎকার করতে লাগলেন।
টমাসের চিৎকার শুনে রেলগাড়িতে কাজ করা একটি শক্তপোক্ত বলবান নিগ্রো যুবক দৌড়ে এল। টমাসের দুটো হাতই বন্দি ছিল। হাত ধরে টেনে তাকে কামরার ভেতরে ঢোকানোর কোনো উপায় ছিল না। সেই জন্য নিগ্রো যুবক টমাসের কান ধরে টেনে তাকে কামরার ভেতরে ঢোকাল। টমাসের জীবন রক্ষা হল ঠিকই, কিন্তু মাত্র একটি কানে ধরে একটি গোটা মানুষকে টেনে তোলার ফলে তার কানের পর্দা ফেটে গেল। সেই কানে শোনার শক্তি পুরোটাই নষ্ট হয়ে গেল। এরপরে টমাসের বধিরতা আরও বেড়ে গেল এবং অবশেষে তিনি শ্রবণশক্তি সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেললেন।
এই বইয়ে প্রথম অধ্যায়েই বলা হয়েছিল যে টমাস আলভা এডিসনের বিরাট গবেষণাগারটি যখন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, তখন সেটাকে বিপর্যয় বা দুর্ভাগ্য বলে ভাবার পরিবর্তে জীবনটা কে নতুন করে আরম্ভ করার একটা সুযোগ বলে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন–’আগুন কেবল আমার গবেষণাগারটি পুড়িয়ে ফেলেনি, সঙ্গে সে পুড়িয়ে ফেলেছে আমার অতীতের ভুলগুলি।’ঠিক সেভাবে শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলার পরে ও দুঃখ প্রকাশ করার পরিবর্তে তিনি বরং বলেছিলেন–’কানে না শোনার ফলে আমার উপকারই হয়েছে। আমি যেহেতু কানে শুনি না সেই জন্য কোনো কিছুই আমার মনোযোগ ভঙ্গ করতে পারে না। ফলে আমি আমার কাজের প্রতি অখন্ড মনোযোগ দিতে পারি।’
ধৈর্যশীল এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ এভাবেই সমস্ত অসুবিধাকে সুবিধায় এবং দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যে রূপান্তরিত করতে পারে।

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes