
এনহেদুয়ান্না রচিত ইনান্নাকে নিবেদিত স্তোত্র (জেইন হার্শফিল্ড-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায়) অনুবাদ- বেবী সাউ
এনহেদুআন্না ছিলেন এক আক্কাদীয় রাজকন্যা, মহাপূজারিনী এবং বিশ্বের ইতিহাসে পরিচিত প্রথম লেখিকা। খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৩০০ সালের দিকে মেসোপটেমিয়ায় বসবাসকারী এনহেদুআন্নার রচনাই মানবসভ্যতার প্রথম ব্যক্তিনির্ভর বর্ণনার উদাহরণ। তাঁর লেখায় নিজস্ব নাম-স্বাক্ষরিত লেখকঘোষণা রয়েছে—যা ছিল যুগান্তকারী, কারণ তখনকার সাহিত্যে লেখকের পরিচয় সাধারণত প্রকাশ করা হতো না। এনহেদুআন্না ছিলেন আক্কাদের সার্গন-এর কন্যা—যিনি সুমেরীয় ও আক্কাদীয় জনগোষ্ঠীকে একত্রিত করে মানব ইতিহাসের প্রথম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উত্তর আक्कাদীয় সাম্রাজ্যকে দক্ষিণ সুমেরীয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করতে এবং নিজের শাসনকে সুসংহত করতে সার্গন তাঁর কন্যাকে উরের শক্তিশালী চন্দ্রদেব নান্না (সীন)-এর এন-পূজারিণী (উচ্চপদস্থ মহাপূজারিণী) হিসেবে নিয়োগ দেন। এই পদ ছিল বিপুল ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন—যেখানে তিনি বিশাল মন্দিরসম্পত্তি ও কর্মীবাহিনী পরিচালনা করতেন। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের মাধ্যমে তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ডের বিবরণ জানা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো “এনহেদুআন্নার ডিস্ক”—পেন মিউজিয়ামের সংগ্রহে থাকা একটি অ্যালাবাস্টার রিলিফ—এবং তাঁর ভৃত্যদের নলাকার সিলমোহর, যেগুলোর প্রত্যেকটিতেই তাঁর নাম ও উপাধি উৎকীর্ণ রয়েছে। এনহেদুআন্নার সাহিত্যকীর্তি, যা কিউনিফর্ম লিপিতে খচিত ট্যাবলেটের মাধ্যমে সংরক্ষিত, তাঁর মৃত্যুর বহু শতাব্দী পরেও নকল ও পাঠ করা হতো—যা তাঁর প্রভাবের দীর্ঘস্থায়িত্বের উজ্জ্বল প্রমাণ। তাঁর নামে যেসব রচনা পরিচিত, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ১. ইনান্নার মহিমাগান (Nin-me-šár-ra): ১৫৩ পঙ্ক্তির এই স্তোত্রটিকে তাঁর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রচনা মনে করা হয়। এখানে তিনি দেবী ইনান্নাকে (আক্কাদীয় ইশতারের সুমেরীয় রূপ) সম্বোধন করেছেন ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংকটের সময়—যখন লুগালআন্নে নামে এক দখলদার তাঁকে পূজারিণীর পদ থেকে বহিষ্কৃত করেছিল। এই কবিতা দেবীর প্রতি তাঁর আর্ত আবেদন, ইনান্নার হস্তক্ষেপের জন্য এক শক্তিশালী প্রার্থনা, এবং তাঁর উদ্ভাবনী প্রথম-ব্যক্তি লেখনশৈলীর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ২. ইনান্নাকে উৎসর্গিত স্তোত্র (In-nin ša-gur-ra): আরেকটি দীর্ঘ স্তোত্র, যেখানে ইনান্নার নানা শক্তি, গুণাবলি ও বিস্তৃত আধিপত্যের তালিকা রয়েছে। এটি সুমেরীয় ইনান্না ও আक्कাদীয় ইশতার—এই দুই দেবীর আত্মীকরণ ও সমন্বয়কে আরও সুদৃঢ় করে। ৩. ইনান্না ও এবিহ: একটি পৌরাণিক আখ্যান, যেখানে দেবী ইনান্না চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া এক পর্বতশ্রেণির (আধুনিক ইরাকের জাবাল হামরিন) সঙ্গে যুদ্ধ করেন—কারণ তারা তাঁর কর্তৃত্ব মানতে অস্বীকার করে। অনেক গবেষক মনে করেন, এটি আkkাদীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহের প্রতীকী রূপক হতে পারে। ৪. মন্দির-স্তোত্রসমূহ (The Temple Hymns): সুমের ও আkkাদের বিভিন্ন মন্দিরকে উৎসর্গ করা ৪২টি স্তোত্রের একটি সংকলন। এটি একধরনের কাব্যিক ও ধর্মতাত্ত্বিক মানচিত্র, যা তাঁর পিতার সাম্রাজ্যে ধর্মীয়-রাজনৈতিক ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে ভূমিকা রেখেছিল। এই রচনার একেবারে শেষে তিনি নিজের নাম লিপিবদ্ধ করেন এবং লেখেন— “হে প্রভু, এমন কিছু সৃষ্টি করেছি যা আগে কেউ সৃষ্টি করেনি।” এনহেদুআন্নার উত্তরাধিকার তাঁর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভূমিকার সীমা ছাড়িয়ে বহুদূর প্রসারিত। তিনি আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসে যেমন অগ্রদূত, তেমনি নারীবাদী ইতিহাসেও এক অদ্বিতীয় পথিকৃৎ—প্রাচীন বিশ্বের এক অভিজাত নারীর অন্তর্জীবন, ভাবনা ও পেশাগত দায়িত্ব সম্পর্কে যে অমূল্য ঝলক তিনি আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, তার তুলনা বিরল। প্রথম-ব্যক্তি বয়ান, আত্মবিশ্লেষণ ও ব্যক্তিগত কণ্ঠস্বরকে সাহিত্যে কেন্দ্রস্থলে এনে তিনি পরবর্তী যুগের রচনাশৈলীতে গভীর প্রভাব ফেলেছেন। কিছু গবেষক তাঁর লেখার ছায়া খুঁজে পান পরবর্তী কালের বাইবেলের গীতসংহিতা কিংবা হোমারীয় কবিতার ধারা পর্যন্ত। আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও গবেষকদের প্রচেষ্টায় তাঁর রচনাবলি পুনরাবিষ্কৃত হওয়ার ফলে এনহেদুআন্না আজ স্বীকৃত—বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম পরিচিত লেখক হিসেবে।

