
রিনি গঙ্গোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস ঋতায়তে (নবম ও দশম পর্ব)
আটের দশকের মফসসল শহরে বেড়ে উঠছিল একটি মেয়ে। ঋতি। এক অসুস্থ শৈশবে, ভিড়ের মধ্যেও নির্জনে তার বড়ো হয়ে ওঠা। একটু যত্ন, সামান্য ভালোবাসা না পাওয়া কাঙাল এই মেয়েটির বড়ো হয়ে ওঠা এই উপন্যাসের বিষয়। দমবদ্ধ এক পারিবারিক আবহে অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা মেয়েটির জীবন, তার লড়াই! নারী হিসেবে, অসুন্দর হিসেবে, গরীব হিসেবে এই সমাজ মানসের সঙ্গে তার একার লড়াই। পাশে রয়েছে মা, নিরুপায়, অসহায়। তবু অদম্য জেদ ঋতিকে এগিয়ে দিয়েছে। যদিও এই উপন্যাস ঋতির ক্ষরণের ইতিহাস। তার নির্মল মন, তার নিখাদ ভালোবাসার ক্ষরণ। সমকাল, তার মনবদল, নববইয়ের বিচিত্র পট পরিবর্তন সবই ছুঁয়ে আছে এই উপন্যাসের শরীর! ঋতি কি শেষপর্যন্ত পৌঁছোতে পারবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে! আজ প্রকাশিত হল উৎসব পরবর্তী দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নবম ও দশম পর্ব।
নবম পর্ব
৮১
দু সপ্তাহ পেরিয়ে স্নেহময় ফোন করল। এ’কদিন দিনগুলো কিভাবে কেটেছে ঋতি জানে না। ঋতি বিশ্বাস করেছে স্নেহময় তাকে ফোন করবে! নিশ্চয়ই দেখা করবে! কিন্তু একটা করে দিন পেরিয়েছে তার উদ্বেগ বুক ঠেলে উঠেছে! স্নেহময়দা তো ভীষণ সৎ, আদর্শবান। হয়তো ও ওর মত পরিবর্তন করেছে! হয়তো ও ওর স্ত্রীকে লুকিয়ে দেখাটুকুও করতে চায় না! এমন নানা ভাবনা ঋতীকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। ঋতি তবু বিশ্বাসে মন রাখতে চেয়েছে। দু সপ্তাহ পর স্নেহময়ের নম্বরটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতে দেখে ওর মনে হল এই সেই সব পেয়েছির দেশে যাওয়ার ডাক! এই সেই নম্বর যে নম্বর ডায়াল করলেই চিচিং ফাঁক বলে জীবনের জটিল পরিস্তিতিগুলোর সব সমাধান হয়ে যাবে। ঋতিও তখন বলতে পারবে হ্যাপিলি ম্যারেড! এই কথাটা ভাবতে গিয়ে ঋতীর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। ঋতি কি কোনোদিন কোনো মানুষের সর্বনাশ করে স্বার্থপরের মতো কেবল নিজের ভালোটা ভাবতে পেরেছে! কোনোদিন তার পক্ষে এমন কিছু ভাবা সম্ভব! স্নেহময়ের সঙ্গে যদি তার কোনো সম্পর্ক গড়েও ওঠে তা হবে অবৈধ, সমাজ অস্বীকৃত। চিরকালের মতো দ্বিতীয় নারীর তকমাটা এঁটে যাবে তার গায়ে। তাতে ঋতীর কিছু এসে যায় না যদিও! সমাজ! কি দিয়েছে সমাজ তাকে! অপমান, অবহেলা আর উপেক্ষা ছাড়া আর কি দিয়েছে সমাজ তাকে! এই সমাজের পড়োয়া করবে কেন সে! আর তাছাড়া কোনটা অবৈধ! কাকে অবৈধ বলবে এই সমাজ! ঋতি যে আজ ছ’বছর ধরে একটাই মানুষকে ভালোবেসে এসেছে, একা একা বেঁচেছে, তবু কোথাও সেই ভালোবাসাকে এতোটুকু কালিমা লিপ্ত হতে দেয়নি, সে অবৈধ! আর বিয়েটা বৈধ। বিশেষ করে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ! যেখানে ছেলের রোজগার দেখে, মেয়ের সৌন্দর্য দেখে দেনা পাওনার একটা চুক্তি করা হয়! সেই চুক্তি যার মধ্যে ভালোবাসা নেই কোথাও, হিসেব আছে। ভালো থাকার হিসেব, বংশবৃদ্ধি করার হিসেব! আর আছে অভ্যেস! একসঙ্গে থাকা, পুরুষটির দৈনন্দিন কাজে সহায়তা, মেয়েটির নিরাপত্তা, সামাজিক পরিচয় – এছাড়া বিয়ে নামক প্রতিষ্ঠানটিতে তো আর কিছু নেই! সে তো চোখের ওপর দেখছে তার আত্মীয়দের! স্নেহময়দা আর মধুদিও কি এর ব্যতিক্রম হবে! তবু তাকে, তার ভালোবাসাকে দ্বিতীয় হয়ে থাকতে হবে। সে কি কোনোদিন স্নেহময়দার জীবনে প্রথম ও একমাত্র হতে পারবে! এসব কথা ঋতি ভাবছে আজ কয়েকদিন ধরে।
স্নেহময়ের ফোনটা পেয়ে এই কথাগুলো যেন আরো একবার তার মনের মধ্যে নাড়া দিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরল সে।
কেমন আছিস?
আছি। তুমি?
এই চলছে! শোননা, বলছি পরশু তোর সময় হবে! ওই তিনটে নাগাদ যদি শিয়ালদায় আসতে পারিস!
আচ্ছা।
অসুবিধে হবে?
না না, কোনো অসুবিধে নেই। আমি পৌঁছে যাব।
না, ওইদিন তোর কলেজ আছে কি না! তাই জিজ্ঞেস করছি!
না, ওইদিন কলেজ নেই। বাড়ি থেকেই বেরোবো।
ও, কি বলে বেরোবি?
আমার তো দুপুরবেলা হাই কমিশনের লাইব্রেরিটায় বা সাহিত্য পরিষৎ যাওয়া থাকে। সেখানেই যাচ্ছি বলব।
প্রবলেম হবে না তো?
না না।
ঠিক আছে। তুই এক নম্বরের টিকিট কাউন্টারটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকিস। আমি পৌঁছে যাব।
আচ্ছা।
পারবি তো!
হ্যাঁ গো! কেন পারব না! ঋতি হালকা হাসল।
ঠিক আছে। ফোনটা কেটে গেল।
ঋতি অনেকক্ষণ ফোনটাকে বুকে করে দাঁড়িয়ে থাকল এক জায়গায়। তার মনে হচ্ছে অসম্ভব সম্ভব হতে চলেছে তার জীবনে! স্বপ্নপূরণ! এমনটা সত্যি হবে! ঋতীর আনন্দ হচ্ছে ভীষণ! অদ্ভুত একটা তৃপ্তি যেন তার মন, প্রাণজুড়ে চুঁইয়ে পড়ছে! খুব জোরে হেসে উঠে পাড়ায় পাড়ায় বলে বেরানোর মতো আনন্দ তো এ নয়! কেবল নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখে উপলব্ধি করার আনন্দ! ছ’বছর! দীর্ঘ দীর্ঘ একটা সময়! দীর্ঘ অপেক্ষা! এই অপেক্ষার কোনোদিন অবসান নেই! এই তো ভেবে এসেছে ঋতী! আজ হঠাৎ করেই যেন সব অন্যরকম হয়ে গেল! ম্যাজিক যেন!
স্নেহময়ের সঙ্গে দেখা করবে বলে ঋতি একটা বেইজ আর লালের কম্বিনেশনের কাঁথাস্টিচের ছোটো কুর্তি কিনে রেখেছিল দক্ষিণাপণ থেকে। একটা সাদা পাটিয়ালা প্যান্ট তার সঙ্গে ম্যাচ করে পড়ল সে। কপালে ছোট্ট একটা টিপ। এই সাজটুকু সাজবে বলে দু সপ্তাহ ধরে অপেক্ষা করে আছে ঋতী। আজ তার নিজেকে দেখে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। একমাথা কোঁকড়া চুল তার। বড়ো বড়ো চোখ। কালো ভ্রমরের মতো পল্লব। মুখে এখন আর তার কোথাও আঁচিল নেই। চোখের তলার কালিটাও আজ যেন অনেকটাই হালকা লাগছে। ঋতীর আজ নিজেকে খুব পছন্দ হয়েছে। বারবার সে আয়নায় নিজেকে দেখছে। এতো বছর পর প্রথম দেখায় স্নেহময়ের সামনে তার অভিব্যক্তি কেমন হতে পারে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য কল্পনা করছে সে। দেখছে, সেই মুহূর্তে তাকে কেমন দেখতে লাগবে! শ্রী আজ বসে বসে মেয়েটাকেই দেখছিল। অনেক, অনেকদিন পর মেয়েটাকে এতো খুশি খুশি দেখাচ্ছে। এমনিতে তো মেয়েটা কেমন মরার মতো হয়ে থাকে। হয় পড়াশোনা করছে! নইলে উদাস হয়ে একফালি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। বেশিরভাগ দিন রাতে ও ঘুমোবার আগে কাঁদে। কখনো মাঝরাতে ঘুম ভেঙে শ্রী দেখেছে ঋতি বসে আছে। ওর নির্জনতাটুকুতে হস্তক্ষেপ করতে ইচ্ছে করেনি শ্রীর। বাকি রাত শ্রীও বিনিদ্র কাটিয়েছে। মেয়েটা যেন কেমন পাগল পাগল করে একেক সময়। কখনো আবার চূড়ান্ত নিস্পৃহ। কখন যে কেমন থাকে কিচ্ছু বোঝা যায় না! আজ ওকে খুশি দেখে শ্রীর ভালো লাগল। কী সুন্দর দেখতে লাগছে আজ ঋতীকে! মনে হচ্ছে কপালে কালো টিপ দিয়ে দি। কারো নজর না লেগে যায় আমার মেয়েটার খুশিতে! শ্রী ঋতীর কাণ্ড দেখে হাসছিল। আয়না দিয়ে মাকে দেখতে পেয়ে ঋতি লজ্জা পেয়ে সরে গেল। আজ তার মাকে সব বলে দিতে ইচ্ছে করছে! মাও তো স্নেহময়দাকে ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু আজ এভাবে গোপনে দেখা করতে যাওয়া… সেখানে মার না যাওয়াই ভালো! আজকের দিনটা শুধু তার আর স্নেহময়দার!
ঋতি শিয়ালদার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। ট্রেন কারশেডে দাঁড়িয়ে পড়েছে। স্নেহময়দা ফোন করল। কোথায় ?
ঋতির ভিতরে একটা ভয় খুব গোপনে দানা বাঁধছিল। আসবে তো স্নেহময়দা! যদি না আসে! ফোনটা পেয়ে ঋতি নিশ্চিন্ত হলো। ঘড়িতে তখনও তিনটে বাজতে পনেরো মিনিট বাকি! স্নেহময়দা এতো আগে চলে এসেছে! ঋতীর ভিতরটা ছটফট করছে! কখন ট্রেনটা ছাড়বে! অবশেষে যখন শিয়ালদায় দাঁড়ালো ট্রেনটা ঋতি দ্রুত পা চালিয়ে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোল।
দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে সে স্নেহময়দাকে! স্নেহময়দা হাজারো লোকের মাঝে তাকে খুঁজছে! ওর চোখে মুখে উন্মুখতা ধরা পড়ছে। আতিপাতি করে যেন ঋতীকে খুঁজছে স্নেহময়। ঋতি হাঁটার গতি সামান্য কমিয়ে ধীরে সুস্থে গিয়ে দাঁড়ালো স্নেহময়ের সামনে! স্নেহময়দার মাথায় কাঁচা পাকা চুলের ভিড়। ভুঁড়িটাও ভালোই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু ঋতি তাকিয়ে আছে স্নেহময়ের চোখের দিকে! সেই চোখ! সেই যে ঈষৎ ঝিরঝিরে পাতা! অল্প লালচে! আর অনেকটা মায়া! কয়েক সেকেন্ড ওরা দুজনেই চুপ। তাকিয়ে আছে একে অপরের দিকে! স্নেহময় প্রথম হেসে উঠল। চল। বসবি তো কোথাও!
ঋতি মাথা নাড়ল।
আয়, তার আগে একটু গলা ভিজিয়ে নি। মুসুম্বির রস খাবি?
না। ঋতি জানে শিয়ালদার এই চত্বরে নানা কিছু বিক্রি হয়। কিন্তু শুরুতেই তার কিছু খেতে ভালো লাগলো না!
স্নেহময় রসটা খুব তাড়াহুড়ো করে খেল। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করল। ঋতি স্নেহময়ের অস্বস্তিটা টের পাচ্ছে। ওরা কলেজ স্ট্রিটের দিকে এগোচ্ছে। স্নেহময় আগে হাঁটছে। ঋতি পেছনে খানিকটা দূরত্ব রেখে এগোচ্ছে।
একটু ফাঁকা হতেই হঠাৎ স্নেহময় ঘুরে জিজ্ঞেস করল, তুই আমাকে ভালোবাসিস রুতু!
ঋতি প্রথমটায় চমকে উঠেছে! তারপর স্নেহময়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে মাথা নিচু করে নিল।
স্নেহময় আবার এগোতে এগোতে বলল, আমি তোর থেকে কত বড়ো জানিস!
ঋতি এবার হালকা হেসে উত্তর দিল, এগুলো জানার মতো কোনো বিষয় নয়! বড়ো ছোটো, মোটা রোগা, কালো ফর্সা, ধর্ম অধর্ম কোনোটাতেই কি কিছু যায় আসে! ঋতীর মনে হলো গেয়ে ওঠে, ‘না উমর কি সীমা হো/ না জন্মোকা হো বন্ধন/ যব প্যায়ার করে কোয়ি তো দেখে কেবল মন/ নয়ি রীত চলা কর তুম ইয়ে রীত অমর কর দো!’ কিন্তু গাইল না।
উফফ… পাকামি করিস না।
ঋতি এবার পেছন থেকেই জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা স্নেহময়দা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব!
বল।
তুমি খুব বড়ো চাকরি করো বলে তোমার বউ ফর্সা,রোগা, একমাথা চুল – এমনটা হতেই হবে?
তোকে কে বলল, মধু ফর্সা, রোগা, একমাথা চুল!
না, মনে হলো।
ওরা কলেজ স্কোয়ারের ভেতরে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল। মাঝে আরেকজন বসতে পারে এতোটা দূরত্ব রেখে। দুজনেই চুপ করে আছে। কীভাবে কথা শুরু করবে ভেবে পাচ্ছে না দুজনেই! অস্বস্তিটা ওদের আচরণে স্পষ্ট। ওরা কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। সামনে তাকিয়ে আছে।
স্নেহময় কথা শুরু করল। তোকে খুব সুন্দর দেখতে হয়েছে রুতু!
ঋতি একবার আড় চোখে স্নেহময়ের দিকে তাকিয়ে নিল। তারপর সামনে তাকিয়ে হালকা হাসল।
তোর মনে আছে কি না জানি না, একদিন অফিস সেরে তোদের ফ্ল্যাটে গেছিলাম। তুই একা ছিলি। মনে আছে?
হ্যাঁ, তুমি সেদিন কিছু বলতে চেয়েছিলে আমাকে! কিন্তু বলা হয়নি শেষপর্যন্ত।
কী করে বুঝলি? স্নেহময় একটু অবাক হয়েই ঋতীর দিকে তাকাল।
আমার মনে হয়েছিল!
জানিস রুতু, আমার একটা তেরো বছরের সম্পর্ক ভেঙে গেছিল। যখন আমি কল্যাণী ছেড়ে ব্যারাকপুরে থাকতে চলে যাই তখন মেয়েটির বিয়ে হচ্ছিল।
ঋতি শুনছে। ঋতীর মনে পড়ছে সেদিন স্নেহময়দার সব দুঃখ শুষে নিতে ইচ্ছে হয়েছিল ঋতির। ঋতি বলল, আমাকে বললে না কেন!
বলব ভেবেছিলাম। তারপর ভাবলাম তুই কত ছোটো আমার থেকে!
ছোটো তো কি হয়েছে! এখন তো বুঝতেই পারছ যে আমি…
স্নেহময় হালকা মাথা নাড়ল। তারপর বলল, আমি ভেবেছিলাম সবটাই ইনফ্যাচুয়েশন! তুই তো আর যোগাযোগ করলি না। আমি ভাবলাম তুই হয়তো…
জ্যেঠুর মৃত্যুর খবর আমাকে দেওয়া হয়নি। বাবা খবরটা দিতে দেয়নি। আমি তো অপেক্ষা করছিলাম।তারপর ভেবেছিলাম রেজাল্ট বেরোলে ফোন করব। কিন্তু…
কিন্তু! ফোন করলি না কেন?
জানাবার মতো রেজাল্ট হয়নি। তাই লজ্জায়… যতদিনে সাহস করে ফোন করলাম তোমার বোন বলল, তুমি বিয়ে করেছ। আর যোগাযোগ করিনি।
আমি কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার খবর দিয়েছিলাম তোর জ্যেঠুর বাড়িতে! তারপরও একদিন ফোন করেছিলাম। রুশি ফোন ধরেছিল। আমি তোকে চেয়েছিলাম ফোনে। রুশি আমাকে বিচ্ছিরি ভাবে অপমান করেছিল।
অপমান! কেন!
তোর জ্যেঠু রুশিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিল আমাকে। আমি সম্মতি দিতে পারিনি।
রুশি দিদির সঙ্গে বিয়ে! তোমার! কিন্তু…ঋতীর চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেছে! রুশি দিদি স্নেহময়দাকে ভালোবেসেছিল! আর স্নেহময়দা সেটা মেনে নেয়নি বলে…ষড়যন্ত্র! এতোবড়ো ষড়যন্ত্র করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে! আর সে কিচ্ছু টের পেল না!
কিন্তু কী?
কিন্তু বাবা তো জানত যে আমি তোমাকে…
স্নেহময় সবটাই বুঝতে পারছে। কিন্তু এখন রুতুকে এসব বেশি ভাবতে দেওয়া যাবে না। তাই সে কথা ঘুরিয়ে বলল, রুতু, আমি মধুকে খুব ভালোবাসি। ওর অসম্মান হয়, এমন কোনো কাজ আমি করতে পারব না।
ঋতি একটু থেমে বলল, আমি তো তোমাকে বলিনি কাউকে অসম্মান করতে! শুধু যোগাযোগটুকু রাখতে চেয়েছি। সেটাও কি সম্ভব নয়! ঋতি এবার সরাসরি স্নেহময়ের মুখের দিকে তাকিয়েছে। তার চোখ ভর্তি জল টলটল করছে।
স্নেহময় তাকাতেই ঋতি মুখটা নামিয়ে নিল।
কাঁদিস না রুতু! তুই পড়াশোনাটা মন দিয়ে কর। তোর যা কাজ সেগুলো কর। আমি আছি। আমার সঙ্গে ঠিক যোগাযোগ থাকবে!
ঋতি আবার স্নেহময়দার দিকে তাকিয়ে আছে। স্নেহময়ের কথা, স্নেহময়ের উদাসী চাহনি সবকিছুর প্রতি ঋতীর মুগ্ধতা ঝরে পড়ছে।
স্নেহময় খেয়াল করেনি। হঠাৎ রুতুর দিকে তাকিয়ে ওর মুখ, ওর চোখের দৃষ্টি দেখে স্নেহময় অবাক হয়ে গেল!
ঋতি অবশ্য সেকেন্ডের মধ্যে মুখটা নামিয়ে নিয়েছে।
স্নেহময় উঠে পড়ল। বলল, আমার খুব খিদে পেয়েছে। চল কোথাও একটু কিছু খাই!
ঋতিও উঠে পড়ল। মুখে কিছু বলছে না। ওর চোখদুটো কালো হয়ে উঠেছে। স্নেহময় আড়চোখে ঋতিকে দেখছে। কিছু বলছে না। ওরা দিলখুসায় গিয়ে বসল। বাইরে জায়গা নেই। কেবিনেই বসতে হলো। অর্ডার নিয়ে চলে যাওয়ার পর ঋতি আর সামলাতে পারল না নিজেকে! হঠাৎই দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল স্নেহময়কে। ঋতির মুখটা স্নেহময়ের বুকের কাছে। স্নেহময় শক্ত হয়ে বসে আছে। কয়েক সেকেন্ড বাদে স্নেহময় বলল, ছাড়! কেউ এসে পড়তে পারে!
ঋতি ছিটকে সরে গেল। এই মুহূর্তে তার ভীষণ লজ্জা করছে! সে এতটা বিহ্বল হয়ে পড়ল কেন! সে আর চোখ খুলতে পারছে না!
স্নেহময় ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, তুই ঠিক আছিস রুতু!
ঋতি তখন কাঁপছে লজ্জায়। কোনোরকমে মাথাটা নাড়ল সে। খেতেও পারল না প্রায় কিছুই। বেরিয়ে এলো ওখান থেকে।
আকাশে ততক্ষণে ঘন কালো মেঘ করে এসেছে। ঠান্ডা ঠান্ডা একটা জোলো হাওয়া ঋতীর শরীরে খেলা করছে। ঋতীর মনে হচ্ছে প্রচণ্ড জ্বরের পর সে যেন স্নান করছে! শিয়ালদা পৌঁছতে পৌঁছতে স্নেহময় বলল, আমাদের এখনও কোনো সন্তান হয়নি।
ও, কোনো অসুবিধে?
হ্যাঁ, মধুরই একটা সমস্যা… আমরা খুব চেষ্টা করছি জানিস তো!
এই কথাটা শুনে ঋতীর শরীরটা শিরশির করে উঠল! পরক্ষণেই তার মনে হলো এসব ট্রিটমেন্টে তো শারীরিক ও মানসিক নানা যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়! স্নেহময়দা সেটাই মিন করতে চেয়েছে। সে আর কোনো উত্তর করল না।
স্নেহময় হাত নেড়ে এবার এগিয়ে গেল। বলল, তুই ভাবিস না। মন দিয়ে তোর কাজগুলো কর। যোগাযোগ থাকবে!
ঋতি ভিড় স্টেশনে একা একা দাঁড়িয়ে থাকল খানিকক্ষণ।
৮২
পরদিন দশটা বাজতে না বাজতেই স্নেহময় ফোন করল। তুই ঠিক আছিস?
ঋতিচুপ করে থাকল। একথার কোনো উত্তর নেই ঋতীর কাছে। কাল স্নেহময়দা যে কথাগুলো বলেছে তাতে মানুষের প্রতি স্বাভাবিক বিশ্বাসটুকু হারিয়ে গেছে ঋতীর। জ্যেঠু, রুশি দিদি ওরা এমনটা করল তার সঙ্গে! রুশি দিদির স্নেহময়দাকে পছন্দ ছিল! সেইজন্যই হঠাৎ ছবি আঁকতে শুরু করেছিল রুশি দিদি! কিন্তু স্নেহময়দা তো কোনোদিনই ওকে… তারই প্রতিশোধ নিল এভাবে! সারাজীবনের মতো এক অসহ্য, নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে তাকে ফেলে দিল! এই যন্ত্রণা, এই কষ্ট থেকে তার কি কোনোদিন মুক্তি ঘটবে! কাল স্নেহময়দা যে কথা বলেছে তাতে তো স্পষ্ট যে ও ওর স্ত্রীকে ভালোবাসে! এরপর তো আর কোনো কথা থাকতে পারে না, তাই না!
রুতু! এই রুতু! শুনতে পাচ্ছিস! রুতু!
ঋতি চমকে উঠল স্নেহময়দার ডাক শুনে। হ্যাঁ বলো!
কী ভাবছিস!
কিছু না।
বল?
কিছু না স্নেহময়দা! তুমি যে কথাগুলো কাল বলেছ সেগুলো তো ঠিক আমার ভালো লাগার মতো কথা নয়! আর ওই কথাগুলোর পর তোমার সঙ্গে আর কোনো কথা থাকতেও পারে না। তবু একটা কথা না বলে পারছিনা স্নেহময়দা! ঋতির গলাটা ধরে গেল।
কী কথা? বল?
ঋতি কোনোরকমে ঢোক গিলে বলল, আমার সঙ্গে যোগাযোগটা রেখো। আর কিছু নয়।
রাখব তো রুতু! আমি তো তোকে বারবার বলছি, আমাকে নিয়ে তুই দুশ্চিন্তা করিস না। আমি আছি। তুই কেরিয়ারে ফোকাস কর।
হুম।
চিন্তা করিস না কেমন! আমি এবার একটু কাজ করি। অনেক কাজ রে!
ঋতি হ্যাঁ বলে তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিল।
দুদিন স্নেহময়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ হলো না ঋতির। এই দুদিন ঋতি অনেকটা সময় লাইব্রেরিতে কাটিয়েছে। সাহিত্য পরিষদে গেছে। ফিরেছে দেরি করে। স্নেহময় যে সময়ে যে ট্রেনে বাড়ি ফেরে সেই ট্রেনই ঋতি শিয়ালদা থেকে ধরেছে। স্টেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারিদিকে চোখ চালিয়ে স্নেহময়কে খুঁজেছে। যদি দেখা হয়ে যায়! কিন্তু দেখা হয়নি। ঋতি লেডিজ কামরায় উঠে সেই আগের মতো এই ভেবে আনন্দ পেয়েছে যে একই ট্রেনে স্নেহময়দাও উঠেছে! কিন্তু সে আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ঋতি বারবার মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখতে শুরু করেছে কোনো ম্যাসেজ এলো না কি! তৃতীয় দিন দশটা বাজতে না বাজতেই ঋতিফোন করেছে স্নেহময়কে। হ্যালো?
হ্যাঁ বল।
এমনি ফোন করলাম আমি। তুমি ব্যস্ত?
হ্যাঁ রে। আজ ব্যস্ত থাকব। তোরও তো ব্যস্ত থাকারই কথা, তাই না!
হ্যাঁ, মানে আমি ভাবলাম…
স্নেহময় ঋতীর কথা শেষ করতে দিল না। বলল, আমি তো তোকে যা বলার বলেছি। তারপরও তোর কেন এতো অসুবিধে হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না।
ঋতি এমন একটা কথা স্নেহময়ের কাছ থেকে একেবারেই আশা করেনি। স্নেহময়দা অত্যন্ত গম্ভীর গলায় কথাগুলা বলল। ঋতীর কানদুটো গরম হয়ে উঠেছে! স্নেহময়দা তাকে অপমান করছে! এভাবে আঘাত করে কথা বলছে! তার তো এখনই ফোন রেখে দেওয়া উচিত। ঋতি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, আমি রাখছি।
ওপাশে আর কোনো কথা শোনা গেল না। ফোনটা কেটে গেল।
ঋতি বিছানায় বসে পড়ল। তার কান্না পাচ্ছে! মনে হচ্ছে চিৎকার করে কাঁদে সে! কিন্তু হঠাৎ করেই পিছন থেকে শ্রী ডেকে উঠেছে। কার সঙ্গে কথা বলছিলি?
ওই, তপতীদির সঙ্গে।
ও, কি বলছিল রে? এ মাসে মাইনে দেবে?
না মা, এ মাসে ক্লাসও নেই। পরীক্ষার ডিউটিও নেই। এ মাসে কোনো টাকা পাব না। প্রসঙ্গ পাল্টে যাওয়ায় ঋতি কিছুটা স্বস্তি পেল।
দেখতে দেখতে ঋতির ডিসার্টেশনের কাজ শেষ হলো। এম ফিলের লিখিত পরীক্ষা এসে পড়েছে। ঋতি পড়াশোনা করছে। কিন্তু সেই পাগলামি নেই। ঋতি কেমন শান্ত হয়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে সে প্রত্যেকটা সেকেন্ডে স্নেহময়দার ফোনের জন্য অপেক্ষা করে আছে। একটা করে দিন চলে যাচ্ছে! ঋতির প্রাণশক্তি একটু করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওপরে শান্ত, নিষ্প্রাণ!
শ্রী বেশ কয়েকদিন ধরে ঋতির মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল। চাকরি পাওয়ার পর পরই মেয়েটা বেশ খুশিতে ছিল। কিন্তু তারপর যত পরীক্ষা এগিয়ে আসছে তত কেমন যেন চুপচাপ, অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। আজকাল একবার ডেকে ঋতির সাড়া পাওয়া যায় না। ঋতি যেন সারাক্ষণ কি ভাবে! ওর মনের ভেতরে যে কি চলছে বুঝতে পারে না শ্রী। শুধু বোঝে মেয়েটা ভালো নেই।
পরদিন ঋতির এম ফিলের প্রথম পরীক্ষা। ঋতি সন্ধেবেলা একবার রিভিশন করতে বসেছে। শ্রী হঠাৎ কি দরকারে ও ঘরে ঢুকে দেখে ঋতি বসে বসে কাঁদছে!
বাবু? কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন তুই!
ঋতি তাড়াতাড়ি মুখটা আড়াল করতে গিয়ে আরো জোরে কেঁদে ফেলল।
শ্রী ঘাবড়ে গেছে। পরীক্ষার আগে ঋতিতো কোনোদিন এভাবে কাঁদে না! কী হয়েছে!
মা, আমার সঙ্গে স্নেহময়দার যোগাযোগ হয়েছে।
শ্রী আকাশ থেকে পড়ে! স্নেহময়! এতো বছর পর! কীভাবে!
ঋতি এতোদিন মার কাছ থেকে সমস্ত লুকিয়েছে। আজ কিন্তু আর পারল না। সবটা বলে বসল। সেই প্রথমদিনের ফোন থেকে দেখা করা, জ্যেঠু,বাবা, রুশিদিদির ষড়যন্ত্র সব বলে দিল।
শ্রী অবাক হয়ে সবটা শুনল। এতোকিছু ঘটে গেছে। ঋতি কিচ্ছু বুঝতে দেয়নি!
ঋতি বলছে আর কাঁদছে। ওর চোখদুটো কাঁদতে কাঁদতে ফুলে উঠেছে।
শ্রী ওর দিকে তাকিয়ে বলল, কাল পরীক্ষা ঋতি! আর আজ তুই গোটা সন্ধেটা এভাবে নষ্ট করলি!
ঋতির কান্না নিমেষে থেমে গেছে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
এতো লড়াই, এতো আশা ভরসা, তার পরিণতি তাহলে এই! পড়াশোনা বাদ দিয়ে একটা বিবাহিত ছেলের জন্য কান্নাকাটি!
ঋতি ভাবতে পারেনি মাও তাকে এভাবে আঘাত করবে!
স্নেহময় যদি তোকে ভালোই বাসত তবে তো ও আসত আবার এ বাড়িতে! রুশি অপমান করেছে। তুই যোগাযোগ করিসনি! তবু ওর নিজের গরজেই তো আসতে পারত! ঋতি, স্নেহময় তোকে কোনোদিনই ভালোবাসেনি। ও তোর থেকে কত বড়ো বলত! তুই এইটুকু একটা মেয়ে হয়ে ওর সংসার সামলাতে পারতিস! কখনোই না। তোর মতো মেয়ে ওদের বাড়ির জন্য নয়! সংসারের কি বুঝিস তুই! কতটুকু জানিস! আর ও যদি আসতোও , তুই ভাবলি কি করে আমি তোর সঙ্গে ওর বিয়ে দিতাম! তোর মাকে দেখেও তোর শিক্ষা হয়নি ঋতি! পরীক্ষার আগের দিন তুই এসব ভেবে বসে বসে কাঁদছিস! ছিঃ!
ঋতি হতভম্বের মতো মার দিকে তাকিয়ে আছে। সত্যিই তো! স্নেহময়দা তো আসেনি একবারও! তাহলে! মা যা বলছে তাই ঠিক তবে! স্নেহময়দা তাকে কোনোদিনই… বাকি কথা ঋতি আর মনে মনেও উচ্চারণ করতে পারল না।
পরদিন থেকে ঋতির পরীক্ষা শুরু হলো।
৮৩
এম. ফিল এ ঋতি ইউনিভার্সিটির মধ্যে চতুর্থ হলো। এবার সে সি এস সি তে বসতে পারবে। কিন্তু সি এস সি প্রায় চার বছর হলো হয়নি। একদিন কলেজে ইংরেজি বিভাগের কাকলিদি এই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্তব্য করল, সি এস সি আর কোনোদিনই বসবে না। অধ্যাপকদের অবসরকালীন বয়সের সীমা বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। নতুন রিক্রুটমেন্ট হওয়া মুশকিল। ঋতীর দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা কিসের অপেক্ষায় আছ! তবু তো এস এস সি হচ্ছে এখনো। ওতেই চেষ্টা করো। কলেজে কিছু হবে না।
ঋতি দাঁতে দাঁত চেপে তখনকার মতো কথাগুলো হজম করে নিলেও বাড়িতে এসে কান্নাকাটি শুরু করল। তার সমস্ত রাগের কারণ অনন্ত। ঋতীর মনে হয়, বাবা যদি একটু স্বচ্ছল একটা অবস্থার মধ্যে তাকে রাখতে পারত তাহলে অন্তত তাকে এতোটা চাপ নিতে হতো না! তার বন্ধুরাও তো চেষ্টা করছে। কিন্তু এমন মরণ বাঁচন লড়াই কাকে লড়তে হচ্ছে! ঋতি ঠিক করল সে আরো একটা কলেজে পার্ট টাইম পড়াবে। ইতিমধ্যে নতুন ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে তার বিভিন্ন অধ্যাপকদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। নতুন ইউনিভার্সিটিতে যেদিন খাতা দেখার ডাক এলো সেদিন অধ্যাপক হাসান বললেন, আমি তোমাকে নিয়ে যাব। নতুন জায়গা। তুমি একা চিনে যেতে পারবে না।
ঋতি রাজি হলো। সেদিন আর ঋতি শাড়ি পরেনি। পাটিয়ালার সঙ্গে ছোটো কুর্তি পরেছে। তাকে দেখেই অধ্যাপক হাসানের মুখের অভিব্যক্তি এমন হলো যে ঋতির সেটা দৃষ্টি এড়িয়ে গেল না। বাইকে করে যাওয়া হলো। অধ্যাপক হাসান বাইক চালাতে চালাতে বারবার লুকিং গ্লাসের দিকে দেখছিলেন। ইউনিভার্সিটিতে পৌঁছে তিনি মন্তব্য করলেন, তোমার সঙ্গে এতোটা রাস্তা কত অল্পসময়ে পেরিয়ে এলাম! পুরো রাস্তাটাই কেমন মোহময় হয়ে উঠল যেন!
উত্তরে ঋতি সামান্য হাসল। ভিতরে ভিতরে অত্যন্ত বিরক্ত হলো। লোকটাকে ভদ্র সভ্য বলেই জানত ঋতি। বিবাহিত; ছেলে, মেয়ে আছে। অথচ দেখো, সুযোগ পেয়ে অসভ্যতা করছে। ঋতি আর কথা বাড়ালো না। ফেরার সময় একা একা ফিরবে ঠিক করল।
ইউনিভার্সিটিতে অনেক সিনিয়র প্রফেসর বিভিন্ন পেপারের হেড এক্সামিনার হয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে একে একে ঋতির আলাপ হলো। সবাই ঋতিকে তুই সম্বোধন করতে লাগল। ঋতি সবচেয়ে ছোটো এঁদের মধ্যে। তপতীদি ঋতির খুবই প্রশংসা করলেন। খাতা দেখা শুরু হলো। এক একটি খাতার জন্য দশ টাকা ধার্য। যত খাতা দেখতে পারবে ততই ভালো। এককালীন একটা ভালো টাকা পাওয়া যাবে। ঋতি মন দিয়ে খাতা দেখতে শুরু করল। এই দুবছর কলেজে পড়িয়ে তার বেশ কিছুটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। চোখ বুলিয়ে সে মোটামুটি বুঝতে পারছে কেমন উত্তর লেখা হয়েছে। তাছাড়া তপতীদি তাকে বলেছেন, শোনো খাতা পড়ে নম্বর দিতে গেলে পাশ করাতে পারবে না। খুব অসুবিধে না হলে সকলকে পাশ করাতে হবে। ঋতি সেকথা মাথায় রেখে খাতা দেখা শুরু করল। অল্প সময়ের মধ্যে সে অনেকটা খাতা দেখে ফেলল। এই সময়টা রোজই এখন ইউনিভার্সিটি যেতে হবে। খাতা দেখাটাই এখন কাজ। ঋতি এবার একা একাই যাতায়াত শুরু করল। স্টেশন থেকে ভিড় বাসে করে অনেকটা পথ গিয়ে সেখান থেকে প্রায় আধঘণ্টা ভ্যানে যেতে হয়। রোদ, বৃষ্টি যা ই ঘটুক এছাড়া পথ নেই। যাঁদের নিজেদের গাড়ি আছে তাঁদের কথা আলাদা। ঋতি সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে। সারাদিন খাতা দেখে। সন্ধে নাগাদ বেরোয়। তখন অনেকসময় ভ্যান পাওয়া যায় না। অপেক্ষা করতে হয়। বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায়।
কিন্তু ঋতি বেশি পরিমাণে খাতা দেখছে বলে ইউনিভার্সিটিতে কোনো কোনো অধ্যাপকের মধ্যে একটা অসন্তোষ তৈরি হচ্ছিল। তাঁরা একদিন ঋতির ইভ্যালুয়েট করা এক প্যাকেট খাতা নিয়ে উপস্থিত হলেন সিনিয়র মোস্ট একজন অধ্যাপকের কাছে। তাঁর কাছে ঋতি সম্পর্কে আগেই অভিযোগ জমা পড়েছে। তিনি ধৈর্য ধরে প্রায় প্রতিটি খাতা রিচেক করে ঋতির প্রশংসাই করলেন- এতো অল্প সময়ে এতো খাতা এমন নিখুঁত ভাবে দেখে ফেলা যথেষ্ঠ কঠিন কাজ। মেয়েটি যথেষ্ঠ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আপনাদের ওকে নিয়ে সমস্যাটা কি!
একথার কোনো উত্তর নেই। যাঁরা অভিযোগ করেছিলেন তাঁরা বিষয়টায় হতাশ হলেন। কিন্তু এই ঘটনা চাপা থাকল না। ঋতিকে যাঁরা পছন্দ করছিলেন এই ঘটনায় ঋতির প্রতি তাঁদের আস্থা বাড়ল। ঋতি অনেকেরই আদরের হয়ে উঠল। বিভিন্ন সময়ে মার্কিং স্কিম বানানোতে ঋতি তাঁদের সাহায্য করতে লাগল। ফলে ঋতির দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকল না। এখানেই ঋতি খবর পেল দমদমের একটি কলেজ পার্ট টাইম লেকচারার নেবে। বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। এই ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের প্রধান যিনি তিনিই ইন্টারভিউ নেবেন। ঋতিকে তিনি ভালো মতোই চেনেন। তপতীদির কাছ থেকে ঋতির বাড়ির অবস্থাও কিছু কিছু জেনেছেন। ইন্টারভিউয়ের দিন ঋতিকে তিনি অনেক প্রশ্ন করলেন। অলংকারশাস্ত্র, আধুনিক পাশ্চাত্য তত্ত্ববিষয়ক প্রশ্নগুলোর ভালো উত্তর দিতে পারল ঋতি। হইহই করে দমদমের কলেজে ঋতি চাকরি পেয়ে গেল। প্রিন্সিপাল স্যার ইন্টারভিউ বোর্ডে ছিলেন। তিনি বুঝলেন মেয়েটি ভালো। কাজও শিখেছে কিছু কিছু। একে তাঁর কাজে লাগবে। ঋতি একইসঙ্গে দুটো কলেজে পড়াতে শুরু করল। সেইসঙ্গে নেট পরীক্ষার টেক্সট সমস্ত পড়ে ফেলেছে ঋতি। এবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল জোর কদমে। শ্যামশ্রীর সঙ্গে যৌথভাবে পড়াশোনা চলতে লাগল।
ইতিমধ্যে একদিন নতুন কলেজের আর একজন কনট্রাকচুয়াল লেকচারার দেবাশিসদা ঋতিকে জানাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য ফর্ম দিচ্ছে। ঋতি পিএইচডি করার কথা ভাবেনি। সে ভেবেছে নেট পাশ করে আগে চাকরি পেয়ে তারপর ধীরেসুস্থে পিএইচডি করা যাবে। কিন্তু দেবাশিসদা একরকম তাকে জোর করল। বলল, তুই একটা ডিমান্ড ড্রাফ্ট করেনে। আমি ফর্ম তুলে নিচ্ছি। একেবারে জমা করে দেব দুজনে একসাথে। ঋতি খানিকটা নিমরাজি হয়ে যাদবপুর পৌঁছোলো। দেবাশিসদা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছে। এই সেই যাদবপুর! বাবা নানা ভুল বুঝিয়ে যেখানে পড়তে দেয়নি তাকে। সেখানে আবার এতো বছর বাদে ফিরে আসা! ইন্টারভিউয়ের দিন তার আর দেবাশিসদার নাম পরপর লিস্টেড হয়েছে। কিন্তু একেবারে শেষ ক্যান্ডিডেট তারা দুজন। সকাল দশটায় তারা পৌঁছে গেছে যাদবপুরে। সারাদিন অপেক্ষা করতে হবে। ঋতির ভালো লাগছিল না। সে বারবার বলতে লাগল, দেবাশিসদা, আমি চলে যাই। আমার এমনিতেও এখানে হবে না। অন্য ইউনিভার্সিটির ক্যান্ডিডেট হিসেবে চান্স পাওয়া কঠিন। তুমি ইন্টারভিউটা দাও। তোমার হয়ে যাবে।
দেবাশিস এখানকার একজন অধ্যাপকের সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ করে রেখেছে। ওর এখানে হয়ে যাবে। ঋতির অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেবাশিস ঋতিকে আটকালো। বলল, এসেছিস যখন ইন্টারভিউটা দিয়ে যা।
অগত্যা ঋতি সারাদিনের অপেক্ষার পর ইন্টারভিউ দিতে ঢুকল। ঘরে ঢুকে দেখল এক্সটার্নাল হিসেবে অধ্যাপক দে বসে আছেন। ঋতি মনে মনে একটু স্বস্তি পেল। ঋতি নিজের এম ফিলের ডিসার্টেশনের কাজটাই বড়ো আকারে করার ইচ্ছে প্রকাশ করল। সেই নিয়ে দু চার মিনিট কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলো তাকে। তারপর শুরু হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব। নানারকম প্রশ্ন করে ঋতিকে নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা চলল। ঋতি নিজের মতো করে চেষ্টা করল সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। কিছু উত্তর শুনে উপস্থিত কেউ কেউ হাসলেন। ভয়ে ততক্ষণে ঋতির বুক শুকিয়ে গেছে। কোনোরকমে সে ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে ছাড়া পেল। ঋতি বেরোবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় দেবাশিস ঘরে ঢুকেছে। দেবাশিস শুনল অধ্যাপক দে বলছেন, মেয়েটি কিন্তু সিরিয়াস। কাজ ভালো করবে!
দেবাশিস নিজে ইন্টারভিউতে তেমন সুবিধে করতে পারল না।
কয়েকদিন পর রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেল ঋতি পিএইচডিতে চান্স পেয়েছে। দেবাশিসের হয়নি। দেবাশিস সর্বত্র রটিয়ে দিল অধ্যাপক দে ঋতিকে সুযোগ করে দিয়েছেন। ঋতির কানেও সেকথা পৌঁছোলো। ঋতি কোনো উত্তর করল না।
৮৪
ঋতি এখন দুটো কলেজে পড়ায় এবং পিএইচডি করে। ঋতিকে কোর্স ওয়ার্ক করতে হয়নি। ওর এমফিল ছিল। ইউনিভার্সিটি থেকে তার গাইড অ্যালোকেশন হলো। যাদবপুরের পরিবেশ ঋতির কাছে একেবারেই অন্যরকম। এখানে ছেলেমেয়েরা অনেক খোলামেলা মেশে। জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে, তর্ক করে, সিগারেট খায় একসঙ্গে। প্রথাগতভাবে ভালোকে ভালো আর খারাপকে খারাপ বলার পক্ষপাতি নয় তারা। সব ভালো খারাপের পেছনেই তারা প্রশ্ন জাগিয়ে রাখে। সাদা কালো নয় এই দুনিয়াটা। ঋতির নিজের ইউনিভার্সিটির মতো দমচাপা নয় এই পরিবেশ। ঋতির ভালো লাগে এখানে আসতে। এর মধ্যেই একটি অদ্ভুত নির্দেশিকা জারি হলো সরকারের তরফ থেকে। বিভিন্ন কলেজে যত পার্ট টাইম লেকচারার আছেন তাদের সবাইকে মিনিমাম স্যালারি দিয়ে পার্মানেন্ট করে নেওয়া হবে। ঋতি খবরটা পেয়ে আনন্দিত হলেও তার মনটা দমে গেল। দুটো কলেজে একসঙ্গে তো আর পার্টটাইম পড়ানো যাবে না। আবার এটাও ঠিক মাস গেলে একটা ফিক্সড ইনকাম তার পরিবারে ঢুকবে। সেটা দশহাজার টাকার কাছাকাছি। কম কি! ঋতি গোপীনাথচন্দ্রদাস কলেজে খোঁজ খবর করে দেখল ওখানে কাগজপত্রে সমস্যা আছে। পার্টটাইম হিসেবে নিয়োগ হলেও ঋতীদের ওখানে অতিথি অধ্যাপকের হিসেবে টাকা দেওয়া হয়েছে। এই কাগজপত্র দিয়ে সরকারি অ্যাপ্রুভাল পাওয়া সম্ভব নয়। ঋতি দমদম কলেজের প্রিন্সিপাল স্যারের সঙ্গে কথা বলল। তিনি বললেন, তোমার সিনিয়রিটি অবশ্যই গোপীনাথ দাস কলেজে বেশি। কিন্তু ওই কাগজে তো তুমি অ্যাপ্রুভাল পাবে না। আমার কলেজে সমস্ত কাগজপত্র ঠিক আছে। তুমি এই কলেজ থেকে অ্যাপ্রুভাল নাও। এটাই ভালো হবে।
ঋতি দেখল কথাটায় যুক্তি আছে। ঋতি রাজি হলো। ফলে গোপীনাথ দাস কলেজ ঋতিকে ছাড়তে হলো। জীবনের প্রথম চাকরি! এই কলেজ ঋতিকে অনেক কিছু দিয়েছে। আর আজ এই কলেজ ছেড়ে, এই অদ্ভুত সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ ছেড়ে তাকে চলে যেতে হচ্ছে। চলে যেতে হচ্ছে তার জীবনে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রদের ছেড়ে! ঋতির মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু উপায় নেই। গোপীনাথ দাস কলেজের অন্যান্য পার্টটাইম অধ্যাপক যারা ঋতির বন্ধু স্থানীয় তারা ঋতিকে বারবার থেকে যাওয়ার অনুরোধ করল। তপতীদি বললেন, কাগজপত্র নিয়ে সমস্যা হবে না। তুমি এই কলেজ ছেড়ে যেও না। বিপুলদা এই কলেজের অঙ্কের অধ্যাপক। বিপুলদা বললেন, যেও না ঋতি।
ঋতি বিপুলদার চোখের আর্তি বুঝল। বিপুলদা বিবাহিত। তারপরও যাতায়াতের পথে, কলেজে নানা বিষয়ে নানা আলোচনায় বিপুলদার আগ্রহ ঋতি বুঝেছে। আজ তার নিষেধে যে আর্তি বেরিয়ে এলো তা অনেককিছুই স্পষ্ট করে দিল। কি অদ্ভুত না! হাসান স্যার, বিপুলদা এরা বিবাহিত হয়েও ঋতির প্রতি তাদের আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করতে পারছে না। স্নেহময়দাও তো বিবাহিত! স্নেহময়দার কোনো আকর্ষণ নেই ঋতির প্রতি! কিচ্ছু নেই! কোনোদিন ছিল না! যাই হোক, ঋতি গোপীনাথ দাস কলেজে রেজিগনেশন দিল। পরদিন সে দমদমের কলেজে এসে ক্লাস নিচ্ছে। এমন সময় তপতীদির ফোন। ঋতি, তুমি কী বলেছ স্টুডেন্টদের? বলেছ আমরা তোমাকে তাড়িয়ে দিয়েছি?
না তো। এমন কথা বলব কেন দিদি! কী হয়েছে?
স্টুডেন্টরা কলেজ ঘেরাও করেছে। ওদের দাবি তোমাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তুমি একবার এসো ঋতি। নইলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যাচ্ছে।
এসব শুনে ঋতির মাথা কাজ করছে না। এমন কিছু ঘটবে ও ভাবতেও পারেনি। কাল ছাত্রছাত্রীরা কান্নাকাটি করছিল। বলছিল , ম্যাম আপনি চলে গেলে কে পড়াবে আমাদের? আমরা তো পাশ করতেই পারব না।
ঋতি ওদের কান্নার কারণ বুঝতে পারছিল। কিন্তু ঋতি কি করবে! সে যে নিরুপায়!
কিন্তু তারপর আজ যে ওরা কলেজ ঘেরাও করবে এ ঋতি ভাবতেই পারেনি। ঋতি দৌড়ে গেল দমদম কলেজের প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে। স্যার সব শুনে বললেন, গোপীনাথ দাস কলেজের কথা তুমি ভুলে যাও ঋতি।
একথার পর তো আর কথা চলে না। কিন্তু ঋতির ভীষণ চিন্তা হচ্ছে! ঋতি বারবার তপতীদির সঙ্গে কথা বলে ওই কলেজের ইউনিয়নের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে শুরু করল। তাদের নানা ভাবে বোঝালো যে ভালো সুযোগ পেয়ে ও গোপীনাথ দাস কলেজ ছেড়ে এসেছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনভাবেই দায়ী নয়। ছেলেমেয়েরা প্রথমে তা মানছিল না। যখন মানল তখন শুরু হলো অনুরোধ উপরোধের পালা। তাদের একটাই কথা, আপনি ফিরে আসুন ম্যাম!
ঋতি তাদের নানাভাবে বুঝিয়ে নিরস্ত করল। একটা গোটা দিন কলেজ ঘেরাও হয়ে থাকল ঋতির জন্য। ঋতির লজ্জা করছিল বিষয়টা ভেবে। আবার আনন্দও হচ্ছিল। ছেলেমেয়েগুলো তাকে এতো ভালোবাসে! অথচ ঋতি যখন ওই কলেজে নতুন জয়েন করেছে অনেকেই ঋতীর কাছে প্রাইভেটে পড়তে চেয়েছিল। ঋতি রাজি হয়েছিল। দু মাস যাওয়ার পর ঋতি বুঝতে পারে এরা ঠিক মতো মাইনে দিচ্ছে না। প্রত্যেক সপ্তাহে ঋতি অপেক্ষা করত। আজ হয়তো মাইনে দেবে। কিন্তু দিত না ওরা। ওদের প্রত্যেকের হাতে মোবাইল। ওদের সাজগোজ পোশাক আশাকের অভাব নেই। শুধু ঋতির মাইনেটাই ওরা দিতে পারে না। ওরা ঘর খালি করে চলে যাওয়ার পর ঋতি পাগলের মতো কাঁদত। তার তো টাকা চাই। সংসার চালানোর জন্য টাকা। মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য টাকা। বাবার ওষুধের টাকা! কোথা থেকে পাবে সে! পরিশ্রম করেও তার প্রাপ্যটুকু সে পাচ্ছে না! ঋতিখু ব কাঁদত। আজ এতোদিন পর সেসব কথা ঋতির মনে পড়ে যাচ্ছিল। ওদের ওপর রাগ নয়, মায়া হচ্ছিল।
যেদিন দমদম কলেজে অ্যাপ্রুভালের কাগজ এলো সেদিন কিন্তু ঋতিসহ আরো দুজনের নাম বাদ পড়ল। একইসঙ্গে ইন্টারভিউ হওয়া সত্ত্বেও ঋতি, অর্চিতা আর সহেলীর ডেট অফ জয়েনিং দেরিতে। তাই ওদের অ্যাপ্রুভাল আসেনি। ঋতির পায়ের তলা থেকে আবার একবার মাটি সরে গেল। এর অদূরপ্রসারী ফলাফল কি হতে পারে না বুঝতে পারলেও ঋতি ভয় পেল।
৮৫
স্নেহময়দা সেই অপমানটা করার পর ঋতি আর স্নেহময়দার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখেনি। বেশ কয়েকমাস পর স্নেহময় একদিন সন্ধেবেলা একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল। ঋতি চমকে উঠেছিল ম্যাসেজটা দেখে। ঋতি ভেবেছিল শেষ হয়ে গেছে সবকিছু। আর কখনো কথা হবে না, দেখা হবে না! আর কখনো বলা হবে না ভালোবাসি! ঋতি সব কাজ করত। তাকে একটা ভালো চাকরি পেতেই হবে। যে চাকরির জোরে সে সারাজীবন একা থাকতে পারে। সে স্নেহময়দার! এ জীবনে আর কারো হওয়া সম্ভব নয় তার। তাই ঋতি প্রাণপণ চেষ্টা করছিল পড়াশোনা করে চাকরি পাওয়ার। যে কোনো চাকরি নয় অবশ্যই। তার যোগ্যতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ স্তরের চাকরি! এসব ভাবে ঋতি সারাক্ষণ। তার মনের সেই ইউটোপিয়া নষ্ট হয়ে গেছে। সে জানে স্নেহময়দা তার কেউ নয়। কোনোদিন ছিল না। তবু কোথায় যে অপেক্ষা বেঁচে থাকে! কিসের অপেক্ষা! কেন! ঋতি জানে না। কিচ্ছু জানে না। তবু ঋতি অপেক্ষা করে। সেদিনও মনে মনে ঋতি স্নেহময়দার কথাই ভাবছিল। এমন সময় স্নেহময় ম্যাসেজ করল। জানাল অফিসের কাজে বাইরে আছে। সামান্য কথা বলে ঋতি চুপ করে গেল। স্নেহময়ও চুপ। অনেক রাতে আবার ম্যাসেজ ঢোকার আওয়াজ হলো। স্নেহময় ম্যাসেজ করেছে। এতো রাতে! ঋতি ম্যাসেজটা খুলে দেখল সেখানে ‘চুমু’ লেখা আছে। ঋতি প্রায় বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঝাঁকিয়ে উঠেছে। এই ম্যাসেজের মানে কি! স্নেহময়দা তাকে চুমু খেতে চায়! আদর! যা এতো বছর ধরে ঋতি চেয়ে এসেছে, যাকে ভেবে এসেছে এক অসম্ভব চাওয়া, সেটাই সত্যি হচ্ছে! স্নেহময়দা তাকে চাইছে! ঋতি উত্তরে ‘চুমু’ লিখে পাঠাল। তারপর সারারাত ফোনটাকে বুকের সঙ্গে চেপে রাখল। গোটা রাতে ঋতি আর ঘুমোতে পারল না। বারবার শিহরিত হতে লাগল। ভিজে যাচ্ছে তার সারা শরীর! পরের দুটোদিন ঋতি কোনো কিছুতেই মন দিতে পারলনা। প্রত্যাশার শিখর থেকে দেখতে চাইছিল সে তার প্রেমাস্পদকে! উষ্ণতার নরম হয়তো আবার দ্বিধার শীতলতায়, কর্তব্যের ধারে কঠিন হয়ে উঠবে! তবু ওই মুহূর্তটুকু, ওই চাওয়াটুকু থেকে যাবে! এসব ভেবে ঋতি দুটোদিন আরাম বোধ করেছিল। অন্য একটা দুনিয়া সে যে গড়ে নিয়েছে তার মনের ভেতরে সেই দুনিয়ায় বসন্ত এসেছিল। ফুলেদের বাহারে রঙিন হয়ে উঠেছিল ধাক্কা খাওয়া প্রতারণাময় দিনগুলো! দুদিন বাদে স্নেহময় ফোন করেছিল। নর্মাল কথা হয়েছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে পারবে ঋতি- একথায় উচ্ছ্বসিত হয়েছিল স্নেহময়। টাকা পয়সা কিরকম লাগতে পারে জেনেছিল। অসুবিধে হলে জানাতে বলেছিল। আর কোনো কথা নেই। কোনো বিশেষ ইঙ্গিত! নাহ্ তাও নেই। আবার সেই নীরবতা। দ্বিধান্বিত সামাজিকের শেষ আশ্রয়! কিন্তু ঋতি যে মরে যাচ্ছে! এই নিবিড় করে পাওয়ার প্রত্যাশা তাকে যে আর স্থির থাকতে দিচ্ছে না। তার দিন রাত, তার কাজকর্ম, তার পড়াশোনা সব যে থেমে গেছে! একটা অনিবার্য কক্ষপথকে কেন্দ্র করে তার নিরন্তর ঘুরে মরা! নিস্তার নেই! মুক্তি নেই! গমনান্তর নেই! ঋতি আর থাকতে না পেরে আরো তিন চারদিন পর স্নেহময় যে সময়টা বাইরে আড্ডা দিতে বেরোয় সে সময় তাকে লাভ ইউ লিখে পাঠাল। তার কোনো উত্তর এলো না সেদিন। পরদিন ঋতি ইউনিভার্সটিতে বসে খাতা দেখছিল। এমন সময় স্নেহময় ফোন করল। ঋতি তাড়াতাড়ি উঠৈ বাইরে আসতে গিয়ে কয়েকজনের চোখে পড়ে গেল। তাদের বুঝতে বাকি রইল না ঋতীর জীবনে বিশেষ কেউ আছে। কিন্তু এ কি! স্নেহময়ের গলা কাঁপছে! স্নেহময় তোতলাচ্ছে! ঋতি বুঝতে পারছে না কি হয়েছে! তারপর স্নেহময় যা বলল তাতে ঋতির নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
তোর ম্যাসেজ কাল মধু দেখেছে। কাল সারারাত এ নিয়ে চরম অশান্তি! আমরা তো একটা ক্রাইসিসের মধ্যে আছি। আমাদের কোনো সন্তান নেই। তার মধ্যে এসব জটিলতা! আমি তো মধুকে সামলাতে পারছি না রুতু! তুই এটা কি করলি!
ঋতি চুপ। ঋতিশুনছে। কথা বলার মতো অবস্থা নেই ঋতির।
এখন কিছুদিন যোগাযোগ করিসনা প্লিজ। আমি একটু সামলেনি। তুই তোর কাজগুলো কর। প্লিজ যোগাযোগ করিস না।
ঋতি একথারও কোনো উত্তর করল না। তার চোখদুটো তখন জলে ভরে গেছে। গলার কাছে ঠেলে উঠছে কান্না, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা!
ফোনটা কেটে গেল। তারপর যে ঋতি কিভাবে সারাদিন স্বাভাবিক থাকল, খাতা দেখল, স্ক্রুটিনি করল তা ঋতি জানে না! প্রাণহীন যন্ত্রের মতো হাতদুটো কাজ করে গেল। মন যে তার কোথায় কোন্ সুদূরের পারে হারিয়ে গেল তার হদিশ রইল না তার কাছে।
তারপর কেটে গেছে আরো একমাস। ঋতি জানে স্নেহময়দা হয়তো আর কোনোদিনই ফোন করবে না। এমনিতেই সৎ মানুষ। একবার বিশ্বাস হারানোর ব্যথা দিয়ে ফেলেছে মধুদিকে। আর সেই জটিলতায় কখনোই যেতে চাইবে না স্নেহময়দা! কিন্তু ঋতি কি করবে! ঋতির যে দিন কাটে না! নির্ঘুম রাতে তার কানে বাজে ‘ আমি তো মধুকে ভালোবাসি রুতু!’ ‘এতো চেষ্টা করছি আমরা!’ ঋতির মনটা প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত হয়ে যায়! কেন তবে দেখা হয়েছিল স্নেহময়দার সঙ্গে! কোনো তো যোগসূত্র ছিল না! দেখা হওয়ার কথাই নয়। তবু কেন দেখা হলো! এই যন্ত্রণা পাওয়ার জন্য! এই প্রচণ্ড মানসিক চাপ কেন তাকে নিতে হল ঈশ্বর! ঋতির জীবনে তো সমস্যা কিছু কম নেই! মনের এতোখানি কষ্ট না হয় নাই বা দিত তাকে ঈশ্বর! সেখানে না হয় কিছুটা স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখত! কিছু আশা! সব দিক থেকে এভাবে তাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে কেন ঈশ্বর! কিসের জোরে লড়াইটা করবে সে! কে আছে তার! মা তার দায়িত্ব! মাকে ভালো রাখতে হবে তাকে। মা তার অনুপ্রেরণাও বটে! কিন্তু মনের ঘরে কি ঋতি তালা দিয়ে রাখবে! ওঘরে ধুলো পড়বে, ঝুল হবে! অপেক্ষার চাদর মলিন হয়ে উঠবে! জং ধরে যাবে তালায়! আর একটি প্রতীক্ষারত মন সর্বনাশী যক্ষের মতো সে ঘরে হৃদয়ের প্রহরা দেবে! কোনো আনমনা হাওয়া, অন্য কোনো স্পর্শ, কাঁধে রাখা একটা হাত – এসব কোনোদিন ছুঁতে পারবে না তাকে! ছুঁতে পারবে না তার আজন্ম নির্ভরতাহীন চেতনাকে! তার ভীত সন্ত্রস্ত আমিটাকে! ঋতি যে আর পারছে না। একটু স্পর্শের জন্য আকুল তার শরীর,মন বিদ্রোহ করছে! নিজেকে পেষণ করে অতৃপ্তি তার আগুনের হল্কার মতো লেলিহান হয়ে উঠেছে! এতো অভাববোধ নিয়ে ঋতি বাঁচবে কি করে!
পুজো আসছে। চারিদিকে সাজ সাজ রব। কলেজ এক মাসের জন্য ছুটি পড়ে যাবে। বাড়িতে থাকাটা আজকাল খুব অসহ্য হয়ে উঠেছে। মা বাবা কেউ থাকে না। একা একা ঋতির মনে হয় ওই স্যাঁতসেঁতে মেঝে, খুপরি একটা ঘর, ড্যাম্পধরা দেওয়াল, বাইরে ধোপাদের চিৎকার তাকে যেন গিলে খেতে আসছে। সেদিন তৃতীয়া। পাড়ায় পাড়ায় টুনি বাল্ব জ্বলে উঠেছে। প্যান্ডেল প্রায় হয়ে এসেছে। পঞ্চমীর দিন প্রতিমা আসবে। ঋতি অন্ধকারে বারান্দায় বসে ছিল। চারদিকের এই রোশনাই তাকে স্পর্শ করছে না যেন! তার চোখে জল। নিঃশব্দে কাঁদছে ঋতী। সন্ধে থেকে এমন করে কান্নাকাটি করা এখন নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রীর ঠাকুরের সিংহাসনটায় মাথা ঠেকিয়ে ঋতিঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। তার কিছু চাওয়ার নেই। তার যে খুব বিশ্বাস আছে এমনটাও তো নয়! তবু সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজে! কেন তার জীবনেই এমন দুর্বিপাক নেমে এসেছে! একই বাড়ির অন্য ছেলেমেয়েরা একরকম ভাবে বড়ো হলো; সে আরেকরকম ভাবে! এই পক্ষপাত কেন! এরপর যদি ঋতি একটা ভালো চাকরিও পায় এই দিনগুলো কি তার ফিরে আসবে! জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টাই তার শেষ হয়ে যাচ্ছে শুধু অভাব, অতৃপ্তি এই নিয়ে। ঋতির মনে পড়ে ছোটোবেলা রুশিদিদির একটা বড়ো পুতুল ছিল। ভীষণ সুন্দর দেখতে পুতুলটা! ঋতীর খুব ইচ্ছে করত পুতুলটা একবার ছোঁয়; একবার হাতে নেয়। রুশি দিদি কোনোদিন দেয়নি। চাইতে গেলে চিৎকার করে, কান্নাকাটি করে এমন সিন ক্রিয়েট করেছে যে ঋতিকে জ্যেঠুর হাতে মার খেতে হয়েছে। বাবার কাছে ঋতি একবার বলেছিল, ওরম একটা পুতুল আমায় দেবে?
অনন্ত উত্তর দিয়েছিল, তুমি বড়ো হও। ভালো চাকরি করো। নিজের ইচ্ছে নিজেই পূরণ করতে পারবে।
ঋতি সেকথা মনে রেখে দিয়েছিল। কিছুদিন আগে অবধিও ঋতি একথাই বিশ্বাস করেছে। কিন্তু আজ ঋতি বোঝে যে দিন চলে যায় তা যায়! পরে আর তাকে ফিরে পাওয়া যায় না। আজ হয়তো ঋতি একটা পুতুল কিনতে পারে নিজের টাকাতেই। কিন্তু আজ কি আর তার পুতুল খেলার বয়স আছে! না ইচ্ছে আছে! জীবনটা তার না পাওয়াতেই কাটল! যেটুকু জুটল তা হলো অকারণ মার, অপমান, অবহেলা, উপেক্ষা। ঋতি এসব ভাবছে আর কাঁদছে। এমন সময় স্নেহময় ম্যাসেজ করল। কেমন আছিস?
ঋতি চোখ মুছে একটু ধাতস্থ হয়ে উত্তর দিল, আছি।
কলেজে ছুটি পড়ে গেছে?
না, এখনো পড়েনি।
ও। পুজোর পর তুই ফ্রি থাকবি রুতু!
ফ্রি থাকব মানে! কলেজ ছুটি থাকবে। যাদবপুর যাওয়া থাকবে।
হ্যাঁ, তাই জিজ্ঞেস করছি। আমার পুজোর পর একাদশীর দিন অফিস খুলে যাচ্ছে। ওইদিন একটু চাপ কম থাকবে। তুই ওইদিন আসতে পারবি?
অফিসে?
না, কোথাও একটা গেলাম দুজনে। বসলাম। কথা বললাম। আসবি?
ঋতীর ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। স্নেহময়দা নিজে থেকে দেখা করতে চাইছে! একবছর পর স্নেহময়দার সঙ্গে দেখা হবে! ঋতি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল।
পুজোটা যে ঋতির কিভাবে কাটল সে ঋতিই জানে! এক একটা দিন যেন আর শেষ হচ্ছে না। ঋতি সাজগোজ করল না। প্যান্ডেলে গেল না। নিরন্তর অপেক্ষা তার। একাদশীর দিন সকাল থেকে বৃষ্টি। ঋতির ভয় করছে। এই বুঝি স্নেহময়দা ম্যাসেজ করে বলে আসতে পারবে না। দুরুদুরু বুকে লাইব্রেরি যাওয়ার নাম করে ঋতি বেরোলো।
স্নেহময় ঋতিকে দেখে চিনতে পারেনি। তুই এতো রোগা হয়ে গেছিস রুতু!
ঋতি হালকা হাসল।
ওরা দুজনে একটা পার্কে গিয়ে বসেছে। বেশ কিছু কাপল এদিক ওদিক ছড়িয়ে বসে আছে। স্নেহময় এটা সেটা বলছে। ঋতি শুনছে। চারপাশে তাকিয়ে ঋতি দেখছে অনেকেই খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে বসে আছে। কেউ কেউ ছাতার আড়ালে একে অপরকে চুমু খাচ্ছে। ঋতি দেখছিল। ভাবছিল স্নেহময়দা তাকে এখানে নিয়ে এলো কেন! হঠাৎই স্নেহময় ঋতির ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেল। ঋতীর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে! ঋতি চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে রেখেছে। স্নেহময় ওর মুখটা তুলে ধরল। বলল, তাকা রুতু! আমাকে দেখ!
ঋতীর চোখের পাশ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। স্নেহময় দুহাত দিয়ে ঋতীকে কাছে টেনে নিয়ে ওর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।
বাড়ি ফেরার পথে ঋতীর কানে কানে স্নেহময় বলল, তুই আজ থেকে আমার ঋ!
ঋতি অবাক চোখে তাকালো স্নেহময়ের দিকে! ঋতির কতদিন ইচ্ছে হয়েছে স্নেহময়দাকে পোশাকি নাম বাদ দিয়ে একেবারে গোপন কোনো নামে ডাকে! সাহস হয়নি অতদূর এগোতে! আজ স্নেহময় তাকে অতোটাই কাছের জন করে নিল।
স্নেহময় সামান্য এগিয়ে গেছিল। ভিড়ের জায়গায় স্নেহময় দূরে দূরে হাঁটছে। যদি কারো চোখে পড়ে যায়! কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে বারবার পিছনে ফিরে দেখছে ঋতি ঠিক মতো আসছে কি না! একসময় হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে স্নেহময় বলল, ঋ, আগে কেন বললিনা!
ঋতি দাঁড়িয়ে পড়েছে। হাঁটার শক্তি চলে গেছে ঋতির। পায়ের তলায় মাটি পাচ্ছে ঋতি। চোরাবালি কি পেরিয়ে এলো সে!
৮৬
স্নেহময়দার সঙ্গে এখন মাঝে মাঝেই দেখা হয়। স্নেহময়দা অফিস ফেরত কোথাও একটা চলে আসে। অচেনা কোনো স্টেশন। অচেনা রাস্তা। তারপর দুজন মিলে হাঁটতে থাকে। হাত ছুঁয়ে যায়! চুমু খায়। স্নেহময়ের হাত এখন ঋতীর শরীরে ঘোরাফেরা করে। এর মধ্যে একদিন স্নেহময় ঋতীদের ফ্ল্যাটেও এসেছিল। বাড়িতে সেদিন কেউ ছিল না। ওরা একে অপরকে সেদিন প্রথম উন্মুক্ত দেখল। কত যত্ন, কতদূর ভালোবাসা, কতখানি নিবিষ্টতা স্নেহময়দার স্পর্শে আছে ঋতি অনুভব করেছিল সেদিন। প্রথমে অবশ্য ঋতি ভয় পাচ্ছিল। কাঁপছিল ঠকঠক করে। ঋতি অনেকবার একথা ভেবেছে বিয়ের পর ফুলশয্যার রাতটা তার কেমন হতো! ঋতি নীল রঙের বেনারসি পরে গলায় জুঁই ফুলের মালা পড়ত। হাতে,কানে জুঁই ফুলের সাজ। সাদা চন্দনের টিপ কপালে। আকাশে সেদিন পূর্ণ চন্দ্র! জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর! স্নেহময় সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরত। দুজনে মিলে তারা জ্যোৎস্না ভেজা এই প্রকৃতিকে দেখত! কোনো বাধা থাকত না। কোনো দ্বিধা থাকত না তাদের মিলনে। একে অপরের কাছে নিজেদের সমর্পণ করে তারা তৃপ্ত হতো! আনন্দে মন ভেসে যেত! কিন্তু কোথায় সেসব মুহূর্ত! কোনোদিন কি এই মুহূর্ত সত্য হয়ে উঠবে তার জীবনে! বরং জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে গেলে নিজের এক চিলতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঋতি গায় ‘আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে/ যদি আমায় পড়ে তাহার মনে/বসন্তের এই মাতাল সমীরণে’। সেই স্বপ্ন আর আজকের বাস্তব। দ্বিধা সংশয় ঋতির ভেতরটা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে! ঋতি যতই সমস্ত সংস্কার মুছে ফেলার চেষ্টা করুক না কেন মাথার মধ্যে কোথাও তার নিষিদ্ধের পাপ জমা হয়! সবসময় মনে হয় অন্য একজনের ক্ষতি করে ফেলছে! তারপর ভাবে স্নেহময়দা তো মধুদির প্রতিই সমস্ত কর্তব্য পালন করে। স্নেহময়দা রোজ কোনো না কোনো অছিলায় মধুদির কথা তুলে বুঝিয়ে দেয় ও মধুদিকে কতটা ভালোবাসে! এসবের পরেও তবে কেন ঋতি দেখা করে স্নেহময়ের সঙ্গে! কারণ স্নেহময়কে ছেড়ে থাকা ঋতির পক্ষে সম্ভব নয়। ঋতি পারবেনা। জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে অন্যের বাধ্য হয়ে থাকতে থাকতে ঋতি হাঁপিয়ে উঠেছে। নিজের ভাগ্য সে নিজে গড়ে নেবে! জিতে নেবে সে স্নেহময়দাকে! নিজের অস্তিত্বের বীজ রেখে যাবে স্নেহময়ের কাছে! তারপর সত্যিই অনেকদূরে চলে যাবে ঋতি। হ্যাঁ, ঋতি এসব ভাবে! ভাবে সে স্নেহময়কে সন্তান দেবে। স্নেহময় তাকে ন’মাস কোথাও লুকিয়ে রাখুক। সন্তানের জন্ম দিয়ে ঋতি আর পিছনে ফিরে তাকাবে না। ওদের নিঃশঙ্কিত করে দূরে, অনেক দূরে চলে যাবে। কখনো ঋতি ভাবে স্নেহময়দা বাড়িতে তার কথা জানিয়ে দিক। তাতে সবার আগে যেটা হবে যে স্নেহময়দার চাকরি চলে যাবে। চলে যাক। ঋতি যা রোজগার করে তাই দিয়ে ওরা দুজন বস্তিতে থাকবে। স্নেহময়দা প্রাইভেটে ছেলেমেয়েদের পড়াবে। আর সে যেমন চাকরির চেষ্টা করছে, করবে। তারপর চাকরি পেয়ে গেলে ওরা দুজন ভালো থাকবে। কখনো বলে তুমি আমাকে গোপনে রেখেই বাড়ি ছেড়ে দাও। টাকাপয়সা সব ওকে দিয়ে দাও। আমি যা রোজগার করি তাই দিয়েই আমরা একটা দুনিয়া গড়ে নেব। আমাদের পৃথিবী! ঋতি আর স্নেহময়ের পৃথিবী!
স্নেহময় ঋতীর এসব কথা শুনে হাসে। বলে, তুই এতো পাগল কেন! কখনো আবার গম্ভীর হয়ে যায়। বলে, তোকে কে বলল ওর শুধু আমার টাকাটা চাই। আর কিছু চাই না! ওর সঙ্গে আমার কেবল টাকার সম্পর্ক এমন ধারণা তোর কোথা থেকে হলো ঋ!
ঋতি উত্তর করে না। কিন্তু মনে মনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ভাবে তুমি ভালো চাকরি না করলে মধুদির বাবা তোমার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিত! ঋতি মধুমালতীর ছবি দেখেছে।ফর্সা, সুন্দরি, বিরাট লম্বা চুল… স্নেহময়দা তো তাহলে এমন মেয়েকেই বিয়ে করেছে! ঋতি তো তাহলে কিছু ভুল ভাবেনি! কিন্তু স্নেহময়দা জানে ঋতি, তার ঋ তাকে ঠিক কতটা… ঋতির গলাটা আটকে আসে… চোখ দুটো লাল হয়ে ওঠে… তাই হয়তো স্নেহময়দা তার ঋকে অস্বীকার করতে পারছে না! ঋতিকে স্নেহময় কোনোদিন কোনো উপহার দেয়নি। ঋতি জানে দেনা পাওনার মালিন্য এই সম্পর্ককে স্পর্শ করুক স্নেহময়দা চায় না। তাহলে! ঋতির মতো নিখাদ, পবিত্র, স্বার্থহীন ভাবে স্নেহময়দাকে আর কে ভালোবাসতে পেরেছে! একদিন ফোনে এইসব নানা কথা হতে হতে ঋতীর মাথাটা কেমন যেন বিগড়ে গেল। নিজের ইচ্ছে, আকাঙ্ক্ষাকে অবদমিত করে রাখতে রাখতে ঋতি পাগল হয়ে যাচ্ছে। শীতের রাতে ঠাণ্ডা পাঁশুটে, পুরনো গন্ধমাখা কম্বলের তলায় তার উষ্ণ হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে! তীব্র বৃষ্টির একটানা একঘেয়ে আওয়াজে তার মনে পড়ে ‘শূন্য মন্দির মোর’! ওম, একটু ওমের প্রত্যাশায় ঋতি যেন হাহাকার করে ফেরে! ওর আর্তি কোথাও প্রকাশ পায় না। শুধু ওর মনের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে মনের অতলে ঘুরে মরে। সেদিন ঋতি কথা বলতে বলতে এতোটাই বিরক্ত, ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল যে ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, আমার ক্ষমতা থাকলে আমি ওকে খুন করে দিতাম!
উল্টোদিকে স্নেহময় ততধিক জোরে বলে উঠল, কি বলছিস এসব! ছিঃ
স্নেহময়দা তাকে ছিঃ বলছে! ধিক্কার দিচ্ছে! ঋতি সহ্য করতে পারছিল না। দমদম স্টেশনে এক প্লাটফর্ম ভর্তি লোকের মাঝে দাঁড়িয়ে ঋতি নিঃশব্দে কাঁদছিল। ঋতি বুঝতে পারছিল সে একটা অসম্ভব চেষ্টাকে সফল করতে চাইছে! যা কোনোদিন সম্ভব নয়! স্নেহময়দার প্রতি তার অধিকার তৈরি হয়ে যাচ্ছে! সেই অধিকারবোধে আঘাত লাগলে সে পাগলের মতো করছে! কিন্তু সে তো অবৈধ! তার তো কোনো অধিকার নেই! সে তো স্নেহময়কে ভালোবাসে! ভালোবাসায় অধিকারবোধ আসবে কেন! তাহলে তো সেই ভালোবাসা নিয়েই প্রশ্ন উঠে যাবে! কেন ভালোবেসেছিল ঋতি স্নেহময়কে! এ প্রশ্ন অনেকবার ঋতি করেছে নিজেকে! ঋতি কি স্নেহময়ের চাকরি দেখে ভালোবেসেছিল! ঋতি তাদের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অভাব থেকে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল স্নেহময়ের হাত ধরে! স্নেহময়কে তার ভরসা যোগ্য বলে মনে হয়েছিল, তাই ভালোবেসেছিল! কিন্তু এগুলো কোনোটাই তো সত্যি নয়! ঋতিতো কোনোদিন জানতে চায়নি স্নেহময় কী চাকরি করে! কত টাকা মাইনে পায়! ঋতি তো কোনোদিন ভাবেনি বাবা মার দায়িত্ব অস্বীকার করে সে একা একা ভালো থাকবে! এমন স্বার্থ চিন্তা ঋতি করতে পারলে তো ছ’বছর স্নেহময়ের জন্য অপেক্ষা করার কোনো দরকার ছিল না। নিজেকে একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে, নিজের যোগ্যতার একটা আভাস অন্তত সামনে রেখে স্নেহময়দার কাছে নিজেকে প্রকাশ করার দরকার ছিল না! সে তো মুভ অন করতে পারত! সে তো ইউনিভার্সিটিতে কোনো বন্ধুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারত! অধ্যাপক সরখেল! তিনি তো ঋতীকে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন , তুমি আমার কাছে পিএইচডি করো। আমি ফর্ম তুলেছি তোমার জন্য। চান্স পেতে কোনো অসুবিধে হবে না।
কিন্তু ঋতি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। পিএইচডির করার সুযোগ হেলায় হারিয়েছে। অধ্যাপক সরখেল বিয়ে করেছেন। নিজের সন্তানের নাম রেখেছেন ঋতির নামে। এর থেকেই তো কতকিছু স্পষ্ট হয়ে যায়! কিন্তু ঋতিতো অবিচল থেকেছে সমস্ত ক্ষেত্রে। ঋতিতো নিজের কৌমার্য, যৌবন, এমনকি আত্মসম্মানটাও স্নেহময়কে সমর্পণ করেছে। শ্যামশ্রী তাকে কতবার বলেছে, ঋতি মুভ অন করতে জানতে হয়! তুই সেই একটা জায়গাতেই আটকে রয়েছিস! বেরিয়ে আয়! আর ওর বৌ তো ইনোসেন্ট! ওর বৌয়ের কি দোষ বল! তুই কেন তাকে ঠকাচ্ছিস!
মধুদি ইনোসেন্ট! আর ঋতি! ঋতি ইনোসেন্ট নয়! ঋতি তো কিচ্ছু না ভেবে মরণকূপে ঝাঁপ দিয়েছে! তবু সে অপরাধী! ভালোবাসা অপরাধ! সে তো কোনোদিন মধুদির অধিকারে হস্তক্ষেপ করেনি। তার জীবনে যে এতো বিপর্যয় চলছে… বাড়িতে এতো অভাব! মাকে কাজ করতে হচ্ছে! সে চাকরির চেষ্টা করে চলেছে! নিত্যদিনের অশান্তি! কই! সে তো একবারও স্নেহময়দাকে বলেনি তার দায়িত্ব নিতে! এই যে সে পাগলের মতো চাকরির চেষ্টা করছে সে তো একা একা বাঁচার জন্য! নাহ্ কোনো মহানুভবতা নয়! সে তো আসলে স্নেহময়কে ছাড়া অন্য কাউকে জীবনে মেনে নিতেই পারবে না। শুধুমাত্র স্নেহময়ের হয়ে চিরজীবন কাটাবে বলে ঋতি কি পাগলের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছে না! তাও ঋতি ক্ষতি করে ফেলছে! তাও ঋতি ইনোসেন্ট নয়! কতবার সে স্নেহময়কে বলেছে, ঠিক আছে, তুমি মধুদিকে বেশি ভালোবাসো। আমাকে না হয় একটু কম বেসো। শুধু ছেড়ে চলে যেও না! সে তো নিজেকে সকলের আড়ালে লুকিয়ে গুমড়ে গুমড়ে বেঁচে আছে! এভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব নয় জেনেও সে তো স্নেহময়ের হাতটা ছাড়তে পারছেনা! সে মরে যাবে! সত্যি মরে যাবে! স্নেহময়দাকে ছেড়ে থাকার চেষ্টা সে করেছে। ছ’মাস যোগাযোগ রাখেনি। বলেছে, ভালো থেকো। আমার খোঁজ করো না।
স্নেহময় মেনে নিয়েছে।
কিন্তু সেই ছ’মাস মরণ যন্ত্রণা ভোগ করেছে ঋতি। কাঁদতে কাঁদতে তার বুক হালকা হয়ে গেছে। গোটা পৃথিবীটা শূন্য হয়ে গেছে! রিক্ত, নিঃস্ব হয়ে গেছে সে! নিজেকে আর কত কষ্ট দেবে সে! মরে যাচ্ছে তো সে! শেষবারের মতো আবার একবার ফিরতে চেয়েছে স্নেহময়ের কাছে। স্নেহময় কখনো মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। ঋতি অনেক দিন পর আবার বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়েছে। সেদিনটা বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পেরেছে। এই সবই চলছিল। এর মধ্যেই স্নেহময় জানাল মধু প্রেগন্যান্ট। স্নেহময়ের গলা থেকে আনন্দ ঝরে পড়ছিল। ঋতিও খুশি হলো। শুধু তার মনে হলো স্নেহময়দার জীবনে তার উপস্থিতির শেষ সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে গেল! যেদিন স্নেহময় ওদের সন্তানকে বাড়িতে নিয়ে এলো ঋতি সেদিন অন্ধকারে পা ছড়িয়ে বসে আকুল হয়ে কাঁদল! তার তো আনন্দ পাওয়ার কথা! স্নেহময়দাদের এতো স্ট্রাগল! শেষপর্যন্ত ওরা বাবা মা হতে পারল! ওদের পরিবারটা সম্পূর্ণ হলো! কিন্তু ঋতি! ঋতি তো কোথাও রইল না! ঋতি যে চিরকাল বাইরের হয়েই থেকে গেল! ঋতি যে নিষিদ্ধ, গোপন, অবৈধ হয়েই থেকে গেল! স্নেহময় নিজেই তো তার ঋকে কোনোদিন বৈধ ভাবতে পারল না! চিরকাল লুকিয়ে অপরাধীর মতো দেখা করতে এলো ঋতির সঙ্গে! স্নেহময় তো তাকে কোনোদিন বলল না, ঋ, ভালোবাসায় বৈধ – অবৈধ বলে কিছু হয় না! বলল না তো! কোনোদিন নয়! একদিনের জন্যও নয়।
৮৭
অনন্ত এই ক’বছর বাড়িতেই বসেছিল। দাদার বাড়ির ফাইফরমাস খাটাই তার একমাত্র কাজ। বিশ্বদেব এখন মোবাইলেই নানা নির্দেশ দিতে থাকে। অনন্ত রোদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে মুদিখানার দোকান থেকে ব্যাঙ্কের কাজ সব সারে। তারপর যখন বাড়ি ফেরে মুখচোখ লাল হয়ে তেতে ওঠে। শ্রীর তখন অনন্তকে দেখে কষ্ট হয়। অনন্তরও তো বয়স হচ্ছে। শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। প্রেশারটা বেড়েছে। ওষুধ চলছে। অনন্ত সারাজীবন দাদার বাড়ির বিনা মাইনের চাকর হয়েই থেকে গেল! এক একদিন অনন্ত বাড়ির নিচে পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বদেব বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে লম্বা লিস্ট ধরিয়ে দেয়। অনন্তকে ওপরে ওঠার সুযোগ দেয় না। অনন্ত বিরক্ত হয়। বাড়িতে এসে গজগজ করে। শ্রী শোনে। কোনো মন্তব্য করে না। শ্রী জানে, দাদার বিরুদ্ধে কোনো কথা শুনতে অনন্ত প্রস্তুত নয়। কোনোদিনই ছিল না। শুধু দাদা কেন! নিজের বাড়ির যে কোনো লোক সে যতই অন্যায় করুক না কেন অনন্ত তাদের বিরুদ্ধে একটা কথাও বলবে না। যদিও অনন্তর আজকাল বয়স হচ্ছে। কখনো সখনো মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু শ্রী বললে অনন্ত মোটেই সেটা ভালো মনে নেবে না। সেদিন অনন্তর জন্মদিন ছিল। কদিন আগে থেকেই অনন্ত বেশ আনন্দ করে শ্রীকে বলছিল, ওরা মনে হয় আমার জন্য কোনো উপহার কিনেছে; বলেনি সরাসরি; মনে হলো! জন্মদিনের দিন সকালে অনন্ত একটু তাড়াহুড়ো করেই ও বাড়িতে পৌঁছোলো। ফিরল যখন তখন চোখ মুখ কালো হয়ে উঠেছে। সারা সকাল রোদের মধ্যে দাদা নানা কাজে দৌড় করিয়েছে। এক কাপ চাও জোটেনি। সব কাজ সেরে চলে আসার সময় রুশি বুধুর হাতে দুটো লজেন্স ধরিয়ে দিয়েছে। অনন্ত বাড়ি ফিরে টেবিলের ওপর লজেন্সদুটো ছুঁড়ে ফেলল। দাদার সারাজীবনের রোজগারের বেশ বড়ো অংশ জমানো আছে। রুচি চাকরি করছে। রুশি একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সামান্য বেতনে পড়াচ্ছে অবশ্য। কিন্তু বিজু ভালো টাকা পাঠায় দাদাভাইয়ের জন্য। এতোগুলো সোর্স অফ ইনকাম! দাদার জন্মদিনে দাদার জন্য জামাকাপড় সবই দেয় মেয়েরা! অথচ তার বেলা দুটো লজেন্স! একটা স্যান্ডো গেঞ্জিও তো দিতে পারত! অনন্ত ভাবে, ঋতি কিন্তু দেয়। যবে থেকে চাকরি পেয়েছে বম্মা, জ্যেঠুকে ভালো জামাকাপড় অথবা ওদের দরকারি পছন্দের জিনিস কিনে দেয়। যদিও সেগুলো কোনোটাই ওদের কারো পছন্দ হয় না। ওরা আবার সেসব দোকানে গিয়ে চেঞ্জ করে আনে। সেই সুযোগে দামটাও জানা হয়ে যায়!
ঋতি ও বাড়িতে গেলেই রুশি ওর কাছে গলা শুকিয়ে বলে, আমার বাবার ইকোনমিক কনডিশন যে কি খারাপ সে আর কি বলব! ঋতি অবাক হয়ে শোনে! কাকে বলে ইকোনমিক কনডিশন খারাপ হওয়া! রুশিদিদি সেটা জানে! ওদের যা স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং তাতে কোনদিক থেকে ইকনমিক কন্ডিশন খারাপ বলা যায়! রুচি সারাবছর ধরে শাড়ির পর শাড়ি কেনে! রাই সন্ধেবেলা রোস্টেড কাজু দিয়ে জলখাবার সারে। এখানে ওখানে বেড়াতে যাওয়া, কেনাকাটি লেগেই আছে! তাও নাকি ইকনমিক কন্ডিশন খারাপ! ঋতীর হাসি পায় এসব কথা শুনে। ঋতীদের তো আজও নুন আনতে পান্তা ফুরোয় দশা। আজও মাছের পিস ছোটো ছোটো। আধখানা ডিম! দুধের বালাই নেই! ফল তো নেই ই। অনন্তও কি বোঝে না সেসব! তবু দাদার প্রতি তার অগাধ আস্থা! দাদা তাকে দেখবে! সারাজীবনে এতোরকম বিপর্যয় গেল কোনোদিন কোনো সুপরামর্শ তো দিতে পারল না বিশ্বদেব! তবু অনন্তর ভরসা অটল। আসলে অনন্ত শ্রীকে কোনোদিনই কন্ট্রোল করতে পারেনি। এখন ঋতিকেও পারে না। ঋতি যা রোজগার করে নিজে হিসেব করে খরচ করে। বাবার হাতে তুলে দেয় না। রুশি কিন্তু তার সামান্য রোজগার বাবার হাতেই দেয়। রোজের গাড়ি ভাড়ার টাকাটা বাবার কাছ থেকে নেয়। একদিন এ নিয়ে অনন্ত শ্রীর কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গেলে শ্রী বলেছিল, রুশি যা রোজগার করে তার তিনগুণ টাকা ওর জন্য ডাক্তারের পিছনে যায়! ওর টাকা ওর জন্যেই খরচা হয়। একথা আমি বলছি না। তোমার দাদাই বলেছে। জিজ্ঞেস করে দেখো। অনন্ত আর কথা বলতে পারে না। ভেতরে ভেতরে তার রাগ জমা হয়। বিশ্বদেব সেই রাগের কথাগুলো শোনে। প্রতিদিন অনন্তর কাজ ও বাড়িতে বসে বসে ঋতি আর শ্রীর নামে নিন্দে করা। শ্রীর বাপের বাড়ি তুলে গালাগাল করা। এগুলোকে প্রশ্রয় দেয় বিশ্বদেব। ভাইকে বোঝানোর বদলে উস্কে দেয় আরো বেশি। কোনোদিন অনন্তর অভিযোগ শুনে শ্রী বা ঋতিকে ডেকে একটা কথাও জিজ্ঞেস করে না। জানতে চায় না সত্যিটা কি! ওদের এ বিষয়ে কি বলার আছে! মেজ ভাইয়ের কথা শুনে মেজ বৌ আর ওই কেলটি মেয়েটাকে নখে টিপে মারে।
এ পাড়াতে ঋতিকে ছোটো থেকেই অনেকে খুব ভালোবাসেন। সান্যাল বাড়ির লোকজন তো ঋতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মাঝে মাঝেই তারা সেকথা বিশ্বদেবের সামনেও বলে। বিশ্বদেবের গা জ্বলে যায়! আমার মেয়েরা এতো সুন্দর! আমার মেয়েরা ভালো। তাদের প্রশংসা না করে ওই কেলটিটাকে নিয়ে আদিখ্যেতা! একদিন সান্যাল বৌদি বলছিলেন, আপনাদের বংশের মুখ উজ্জ্বল করল ঋতী! একেবারে সোনার মতো মেয়ে।
বিশ্বদেব আর সহ্য করতে না পেরে বলে ফেলেছিল, চকচক করলেই সোনা হয়না বৌদি। ও যে কি জিনিস তা তো জানেন না!
সান্যাল বৌদি অবাক হয়ে গেছিল একথা শুনে। জ্যেঠু তার ভাইঝি সম্পর্কে একথা বলছে! বলা বাহুল্য একথা শ্রী ও ঋতির কানে পৌঁছোতেও বেশি সময় লাগেনি।
এই যখন পরিস্থিতি তখন শ্রী একদিন চঞ্চলের সঙ্গে কথা বলল। তোমাদের কোম্পানির তো অনেকগুলো অফিস আছে। সেখানে নানারকম কাজ হয়। সেখানে কোনো একটা ক্ল্যারিকাল জবে ঋতির বাবাকে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়? ও তো এমনিতে খুবই এফিসিয়েন্ট! দেখো না একটু চেষ্টা করে!
চঞ্চল খুব বেশি সময় নিল না। অনন্তকে বসিরহাট লাইনের একটা অফিসে ঢুকিয়ে দিল। এতো বছর পর আবার চাকরিতে ঢুকে অনন্ত আনন্দই পেল। শুধু যাতায়াতে খুব পরিশ্রম হয়। শ্রী কিছুটা স্বস্তি পেল। দাদার বাড়িতে বসে মেয়ে,বৌ আর শ্বশুরবাড়ির গুষ্টি উদ্ধার করাটা একটু কমবে এতে।
কিন্তু শ্রীর জীবনে অশান্তির শেষ থাকল না। চঞ্চল সুযোগ পেলেই টুয়াকে নিয়ে কথা বলতে চায় শ্রীর সঙ্গে। টুয়ার পুরুষ বন্ধু, টুয়ার চাহিদা, টুয়ার ফোনে ব্যস্ততা, টুয়ার পার্টিস- সব কিছুই এখন চঞ্চলের বিরক্তির কারণ। চঞ্চল শ্রীদিকে কাছে পেলেই দোকানে বসে বসে একনাগাড়ে টুয়ার নিন্দে করে। শ্রীও আজকাল টুয়ার বাড়াবাড়ি দেখতে দেখতে ক্লান্ত। টুয়ার আচরণ শ্রীকে লজ্জিত করে। টুয়া নিজের সম্মান নিজেই নষ্ট করল। এ চত্বরে দোকানদার থেকে ব্যবসায়ী সবাই জানে টুয়া চঞ্চলের শালী এবং তার চেয়ে কিছু বেশিই। সবাই ওদের নিয়ে আড়ালে আলোচনা করে। চঞ্চল অবশ্য সেটা এনজয় করে। টুয়ার মতো সুন্দরীর নাম তার সঙ্গে জুড়ে গেছে বলে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু টুয়ার পুরুষ বন্ধুদের মেনে নিতে পারে না। সেই নিয়ে তার ক্ষোভ বাড়ছে দিনে দিনে। একদিন টুয়া সম্পর্কে এই ধরনের কথা শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে শ্রী বলেছিল, ও এতো পার্টি করার, বেড়াতে যাওয়ার, পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার সুযোগটা পাচ্ছে কি করে! তুমি টাকা দিচ্ছ বলেই তো না কি! নয়তো ওর নিজের টাকা কোথায়! তো তুমি টাকা দেওয়া বন্ধ করে দাও! ও আর উড়তে পারবে না!
চঞ্চল শ্রীর মুখে নিজের বোনের সম্পর্কে একথা শুনে থমকে গেছিল। বুঝেছিল শ্রীদিকে চিনতে এখনো তার ঢের বাকি। অন্যায় সহ্য করার মতো মানুষ নয় শ্রীদি! সে নিজের বোন হলেও নয়!
কিন্তু শ্রীরও অসহায়তা আছে। এই দোকানে কাজ করা নিয়ে তাকে নানা কথা শুনতে হচ্ছে। হলদিরামের দোকানে মিষ্টি, স্ন্যাকস ইত্যাদি বিক্রি হয়। কখনো সব মাল বিক্রি হয়ে যায়। কখনো উদ্বৃত্ত হয়। উদ্বৃত্ত মিষ্টি বা স্ন্যাকস আর বিক্রি করার মতো থাকে না। সেগুলো তখন শ্রী বাড়িতে নিয়ে যায়। অনন্ত ওই শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া মিষ্টিই আনন্দ করে খায়। সেইসঙ্গে মেজ বৌয়ের কাছে বিশ্বদেব মাঝে মাঝেই বায়না করে। সিমুই এনো তো মেজ বৌ। সনপাপড়ি এনো তো মেজ বৌ। সপ্তাহে একদিন করে হলদিরামের নানা দামি দামি খাবার নিয়ে ভাসুরের মুখের সামনে ধরতে হয় শ্রীকে। শ্রী যদিও সেগুলো দাম দিয়েই কিনে নিয়ে যায়। চঞ্চল আর মৃন্ময়ী সবই জানে। বিভিন্ন পুজো পার্বণে শ্রী বেশি করে মাল আনিয়ে বিক্রির ব্যবস্থা করে। সেই সব দিনগুলোয় লাভ কয়েকগুণ বেশি হয়। শ্রীর কাছে সেসবের হিসেব থাকে। শ্রী জানে সবটাই। তবু চঞ্চল না কি দোকান থেকে লাভ পাচ্ছে না! দোকান লসে রান করছে। শ্রীকে একদিন একথা বলাতে শ্রী গোটা মাসের হিসেব কষে দেখিয়ে দিয়েছিল সে মাসে কত টাকা লাভ হয়েছে। চঞ্চল বলল, ওসব তো খাতায় কলমে। হাতে তো কিছুই পাচ্ছি না। শ্রী বলল, এখান থেকে টাকা হিসেব করে রোজ নিয়ে যাও। তারপর সে টাকা কি করো তা তো আর আমি জানি না।
চঞ্চল জানে সে সব টাকা বাড়িতে রাখে। তারপর আর টাকার হিসেব পায় না। ব্যাপারটা টুয়া আর শ্রীও জানে। মৃন্ময়ী দোকানের টাকা থেকে টাকা সরায়। হয়তো চঞ্চলও বোঝে। কিন্তু মুখে কিছু বলে না। তার ভেতরে অপরাধবোধ কাজ করে। সে ভাবে সে তো নিজের বৌকে ঠকাচ্ছে। তাই বৌয়ের অপরাধ সে সকলের সামনে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে।
কিন্তু বিষয়টা লুকনো থাকে না। চঞ্চলের দোকান থেকে লাভ হচ্ছে না একথা আত্মীয় মহলে প্রচার হয়ে যায়। আলোচনা পর্যালোচনা চলে। একদিন এমন আলোচনার সময় মৃন্ময়ী বলে ওঠে, লাভ হবে কি করে! সব তো চোর!
শ্রীর মার বুকে একথা তীরের মতো লাগে। এতো অসুবিধে করে জীবন কাটিয়েছেন তাঁরা। তবু কেউ একদিনও আঙুল তুলে একটা কথাও বলতে পারেনি। সম্মানটুকুই তো তাঁদের আছে। আর আজ কি না বোনের মেয়ে তাঁর মেয়েদের চোর বলল! যে বোনের ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট তিনি করালেন, যে বোনের সম্পত্তি আগলে রেখে নিজের গয়না বেচে রেজিস্ট্রি করিয়ে দিলেন, যে বোনের মা মরা ছেলেমেয়েগুলোকে কোলের কাছে টেনে নিলেন, দাঁড়িয়ে থেকে ব্যবস্থা করে বিয়ে দিলেন, সেই তারাই আজ তাঁর সন্তানদের চোর বলছে! শ্রীর মা শ্রীকে বললেন, তোর যদি খুব দরকার না থাকে তুই ছেড়ে দে ওদের কাজ!
শ্রী মলিন হাসল। হ্যাঁ মা, মেয়েটার একটা কিছু হয়ে গেলেই ছেড়ে দেব। ততদিন সহ্য করা ছাড়া তো গতি নেই মা!
৮৮
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যে টাকাটা লাগবে সেটা একেবারে দেওয়া ঋতির পক্ষে সম্ভব নয়। ঋতি ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে টাকার কথা শুনে অফিসের লোকজনের সঙ্গে কথা বলল। তারা ঋতিকে ডিন অফ আর্টসের সঙ্গে কথা বলতে বললেন। ঋতি ম্যাডামকে দু একবার দূর থেকে দেখেছে। কাছে যাওয়ার সাহস হয়নি কোনোদিন। কথা বলার প্রশ্নই নেই। আজ কিন্তু উপায় না দেখে সরাসরি ম্যাডামের অফিসে কথা বলতে ঢুকতেই হলো। ম্যাডাম খুবই রাশভারি। কম কথা বলেন। দেখেই মনে সমীহ জাগে। কিন্তু ঋতির এইমুহূর্তে সেসব কিছুই মাথায় নেই। তার মনে তখন ঝড় চলছে। টাকাটা দিতে না পারলে পিএইচডি করার সুযোগটা চলে যাবে। ওদিকে সিএসসি বেশ কয়েকবছর হচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ ছেলেমেয়ে সমস্তরকমের ডিগ্রি নিয়ে অপেক্ষা করছে। সেখানে তার তো কেবল এম ফিল আছে। নেট পরীক্ষা দিয়েছে। এখনো রেজাল্ট বেরোয়নি। এই যোগ্যতা নিয়ে লড়াই করে তো সে লক্ষে পৌঁছতে পারবে না। টাকাটা তাকে জোগাড় করতেই হবে। কিন্তু কীভাবে! ম্যাডাম যদি তার কথা না শোনেন তাহলে সে কি করবে! ভাবতে ভাবতেই ঋতি পৌঁছোলো ম্যাডামের চেম্বারে।
হ্যাঁ বলো?
ঋতি নিজের নাম পরিচয় দিয়ে সমস্যার কথাটা জানাল।
টাকাটা তো দিতেই হবে। তবে তোমার যখন অসুবিধে হবে বলছ তখন তুমি ইনস্টলমেন্টে টাকাটা দাও। তাতে নিশ্চয়ই সুবিধে হবে?
হ্যাঁ ম্যাম।
ঠিক আছে। তুমি আমাকে একটা অ্যাপ্লিকেশন দাও। আমি বিষয়টা দেখে নিচ্ছি।
ঋতি বেরিয়ে এলো। অ্যাপ্লিকেশন লিখে জমা করে দিল। অফিসের লোকেরা জানাল ছমাস অন্তর চারটে ইনস্টলমেন্টে টাকাটা দিতে হবে।
ঋতি তখনকার মতো মাথা নেড়ে বেরিয়ে এলো। কিন্তু ইনস্টলমেন্টে দিতে হলেও তার অসুবিধেই হবে। কি করবে ঋতি!
নতুন ইউনিভার্সিটিতে এখন আর বসে খাতা দেখতে হয় না। খাতা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেখার পারমিশন পাওয়া গেছে। একমাত্র খাতা দেখেই এই টাকাটা তোলা সম্ভব। অ্যাপ্রুভাল না আসার কারণে কলেজ থেকে একটা অ্যাডহক টাকা দেওয়া হয় ঋতিকে। সংসার চালিয়ে সে টাকার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ঋতি তাই ইউনিভার্সিটি থেকে বেশি বেশি খাতা আনা শুরু করল। বিরাট একটা পিঠের ব্যাগে অন্তত দশ প্যাকেট খাতা, দুহাতে আরো কিছু। এই নিয়ে ভ্যানে করে, বাসে করে, হেঁটে ঋতি বাড়ি ফেরে। পিঠ বেঁকে যায়। হাঁফ ধরে যায়। কিন্তু বিশ্রাম নেওয়ার সময় নেই। সময় পেলেই খাতা নিয়ে বসে পড়ে ঋতি। কিন্তু এতো লড়াইয়ের পরেও ঋতির জীবনে বিপর্যয় বাকি ছিল। সেদিন ঋতি স্টাফ রুমে বসে আছে। ব্যারাকপুর লোকালের সময়টা আর একটু পরে। তাদের কলেজের সিনিয়র মোস্ট প্রফেসর আনন্দীদি তাকে ডেকে বললেন, ঋতি এখন তো পরীক্ষা শুরু হয়েছে। ক্লাস নেই। তাই এইসময়টা আর তোকে দরকার নেই। আবার ক্লাস শুরু হলে তখন প্রিন্সিপাল স্যার ভেবে দেখবেন।
ঋতীর মুখে প্রথমে কথা সরলো না। একটু ধাতস্থ হয়ে ও বললো, কিন্তু আমি তো পার্ট টাইমার। গেস্ট নই তো যে ক্লাস নেই বলে…
আনন্দীদি অত্যন্ত নির্বিকার ভাবে বললেন, তোদের তিনজনের তো সরকারি অ্যাপ্রুভাল আসেনি। কলেজকে তোদের মাইনেটা বিয়ার করতে হচ্ছে। কলেজের পক্ষে সম্ভব নয়।
ঋতি আর কথা বাড়ালো না। যেমন বসেছিল তেমনই বসে থাকল চুপ করে। তারপর একসময় স্টাফরুমে বসেই কান্নায় ভেঙে পড়ল।
আনন্দীদি এসে ওর পিঠে হাত রাখলেন।
আনন্দীদি, আমার টাকায় সংসার চলে আমাদের। এমন হঠাৎ করে মাইনে বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের তো পথে বসতে হবে।
কি করব বল! এটা জিবির সিদ্ধান্ত।
ঋতি বুঝল এরা আটঘাট বেঁধেই কাজটা করেছে। এই সিদ্ধান্তের বদল হবে না। ঋতি কাঁদতে কাঁদতেই বাড়ি ফিরল। ফোনে যোগাযোগ করতে শুরু করল ওর মতো অ্যাপ্রুভাল না পাওয়া বাকি দুজনের সঙ্গে।তারাও হঠাৎ চাকরি চলে গিয়ে অথৈ জলে পড়েছে। ঋতি বুঝতে পারল না তার কি করা উচিত। শুধু অন্ধকার নেমে আসছে তার চোখের সামনে! সে কি তবে হেরে যাবে? পারবে না সবাইকে দেখিয়ে দিতে শত অবহেলা সয়ে, শত প্রতিকূলতার পেরিয়ে সে তার লক্ষে পৌঁছতে পারল! কি হবে এবার! সংসার চলবে কি করে! ঋতি পাগলের মতো কাঁদছে। জলের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সে! খড়কুটোটুকুও নেই! কি করে বাঁচবে সে!
এর মধ্যেই নেট পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলো। ঋতি নেট পায়নি। শ্যামশ্রী পেয়েছে। ঋতি অবাক হয়ে গেল। সে নিজে হাতে নোটস তৈরি করেছিল। কলেজ সামলে পড়াশোনা করেছিল। এতো ভালো পরীক্ষা হয়েছিল তার। সে নেট পেল না! শ্যামশ্রীকে ফোন করল ঋতি, কী হলো বলতো শ্যামশ্রী! আমরা তো উত্তরগুলো সব মিলিয়ে ছিলাম। দুজনে অবজেক্টিভ সমস্ত ঠিক করে এসেছি। আর মাঝারি বা বড়ো প্রশ্ন তো রেডিই ছিল। কোথায় আটকাল বলতো! বলতে বলতে ঋতি কাঁদছে।
শ্যামশ্রী চুপ করে আছে। কোনো কথা বলছে না!
হ্যালো! হ্যালো!
শ্যামশ্রী এবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, তুই হয়তো বড়ো প্রশ্নগুলোর উত্তর গুছিয়ে লিখতে পারিসনি। তাই হয়নি!
ঋতি অবাক হয়ে গেল একথা শুনে। বড়ো প্রশ্নের নোটসগুলো তো তারই তৈরি। শ্যামশ্রী তো তার নোটস পড়েই পরীক্ষা দিল। আর এখন একেবারে উল্টো কথা বলছে!
ঋতি আর কথা বাড়ালো না। ফোনটা রেখে দিল।
ঠিক এর পরের দিনই ঋতীর দাদু দীর্ঘ রোগভোগের পর মারা গেলেন! শ্রী বাপীর জন্য প্রাণপাত করে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কিডনি ফেইলিওর। বাপীকে বাঁচানো গেল না। এতগুলো ধাক্কা একসঙ্গে… ঋতিকেমন দিশেহারা হয়ে পড়ল। স্নেহময়দাও তার পাশে থাকল না সেভাবে। ফোনে দুএকটা সান্ত্বনার কথা বলে ছেড়ে দিল। ঋতিতার চারপাশে তাকিয়ে দেখল তার কেউ নেই।
৮৯
জীবন যখন খাদের ধারে দাঁড় করিয়ে দেয় তখন ছদ্মবেশে শয়তান এসে হাতটা ধরে! খাদ থেকে টেনে তোলে! বাঁচায়। আরো ভয়ঙ্কর মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার জন্য। মুখোশের আড়ালে মুখের অভিসন্ধি বুঝে নিতে না পারলে সে বোকা! আর ঋতির মতো বোকা এই পৃথিবীতে কে আছে!
কয়েকদিন আগে একটা সেমিনারে গিয়ে দেখা হয়েছিল এক অধ্যাপকের সঙ্গে। জেলার একটি বিখ্যাত ইউনিভার্সিটির সিনিয়র প্রফেসর তিনি। তাঁর নাম ঋতি শুনেছে অনেকের কাছেই। তাঁর লেখা বই পড়েছে। কিন্তু সামনাসামনি আলাপের সুযোগ ঘটেনি। তাঁর বক্তৃতা আজ প্রথম ঋতি শুনল। শুনে যারপরনাই মুগ্ধ হলো। সকলে একবাক্যে অধ্যাপক চন্দ্রের বক্তৃতার প্রাসঙ্গিকতা ও অভিনব পরিবেশনার কথা বারবার বলতে লাগলেন। সেই সেমিনারে ঋতিও একটি ছোটো পেপার প্রেজেন্ট করল। এতোজন অধ্যাপকের সামনে ঋতির ভয় ভয় করছিল। কিন্তু পেপারটা নিয়ে তার কনফিডেন্স ছিল। এই প্রথম সে সেমিনারে পেপার পড়ল। সকলেই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন ঋতির। অধ্যাপক চন্দ্র প্রথম সারিতে বসে সাধু সাধু বলে উঠলেন। ঋতি মনে মনে ভীষণ আনন্দ পেয়েছিল সেদিন। অধ্যাপক চন্দ্রের মতো মানুষ তার প্রশংসা করছেন! এর থেকে বড়ো পাওয়া আর কি হতে পারে! ঋতি সেমিনার শেষে নিজে গিয়ে পরিচয় করল তাঁর সঙ্গে। তাঁর মোবাইল নম্বরটি লিখে নিল। অধ্যাপক চন্দ্র স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই বললেন, যোগাযোগ করবেন ভাই! একদিন আপনার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে রইল!
ঋতি পরেরদিনই যোগাযোগ করলেন তাঁর সঙ্গে। তিনি অত্যন্ত অমায়িক। বললেন, আমি এখন কলকাতায় আছি। আপনি সুযোগ মতো দেখা করবেন। ঋতি একেবারে আপ্লুত হয়ে পড়ল। এই মাষ্টারমশাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে পারলে ঋতি অনেক কিছু শিখতে পারবে। সদ্য গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে তার। সে ব্যাপারেও সুপরামর্শ দিতে পারবেন তিনি। ঋতি বলল, আমি আজই যেতে পারি স্যার, যদি আপনার সময় থাকে।
হ্যাঁ, আমার কোনো অসুবিধে নেই। চলে আসুন।
দক্ষিণ কলকাতায় তাঁর একটি ফ্ল্যাট আছে। ঋতি দুপুর রোদে হাঁপাতে হাঁপাতে সেখানে পৌঁছোলো। স্যার বাড়িতে একাই আছেন। ঋতির অবশ্য সেসব নিয়ে বিশেষ ভাবনাচিন্তা নেই। উনি বয়স্ক মানুষ। পড়াশোনা পাগল। ওঁর কাছে এইসব অনাবশ্যক বিষয়ের কোনো মূল্য নেই – এমনটাই ঋতি ভাবল। কথা শুরু হলো। গবেষণার বিষয় থেকে পরিবার সব খবরই অধ্যাপক চন্দ্র খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেন। ঋতি এতোটাই বিপর্যস্ত হয়ে আছে যে নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ কিছুই তার মগজে ঢুকছে না। সে হুড়হুড় করে তার পরিস্থিতির কথা বলে চলেছে। অধ্যাপক চন্দ্র সব শুনে বললেন, তোমাকে তো এই লড়াইটা লড়তে হবে। কঠিন! খুব কঠিন! কিন্তু হাল ছেড়ে দিলে তো চলবে না।
এইটুকু কথাতেই ঋতির ক্লান্ত, বিষণ্ন চেতনায় কে যেন একফোঁটা আরাম ঢেলে দিল। তার জীবনে যে আঘাত নেমে এসেছে, যে ভাগ্য দুর্বিপাকের মুখোমুখি সে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে যেন কেউ শান্তির ললিত বাণী শোনালো। ঋতি অনেকখানি উদ্বুদ্ধ হয়ে ফিরল। সেইসঙ্গে তার গবেষণার বিষয় নিয়ে একটি বড়ো পত্রিকায় একটি লেখার কথাও অধ্যাপক চন্দ্র বললেন। ঋতি এহেন সুযোগ পেয়ে বর্তে গেল। খেয়াল করল না যে কথা বলতে বলতে অধ্যাপক চন্দ্র কখন যেন ঋতীর পাশে এসে বসেছেন। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য অধ্যাপক চন্দ্রের হাত উঠে এসেছে তার থাইয়ের ওপর। একসময় তিনি ঋতীর পিঠের বেশ অনেকটা অংশ জুড়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। ঋতি তখন ভেঙে পড়েছে। ঋতি তখন ডুবে যাচ্ছে। খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চাইছে। অধ্যাপক চন্দ্রের কথাগুলো তখন ঋতির কানে এতোটাই মধুবর্ষণ করছে যে ঋতি আর অন্য কিছু খেয়ালই করল না।
শুরু হলো লেখার প্রস্তুতি। প্রায় প্রতিদিনই লেখা বিষয়ে অধ্যাপক চন্দ্র খোঁজ খবর নেন। ঋতি যে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছে তা নিয়ে বাংলা ডিসিপ্লিনে কোনো কাজ নেই। ফলে বিষয়টা অধ্যাপক চন্দ্রেরও জানা নেই সেভাবে। ঋতির কাছ থেকে আপডেট নিচ্ছেন। শেষপর্যন্ত লেখা তৈরি হলো একমাসের চেষ্টায়। ঋতি আবার পৌঁছোলো অধ্যাপক চন্দ্রের ফ্ল্যাটে। আজও ওঁর স্ত্রী নেই। অধ্যাপক চন্দ্র ঋতির লেখা দেখে খুবই উচ্ছ্বসিত হলেন। বললেন, এ লেখা তুমি একা একা লিখেছ?
হ্যাঁ।
তোমার গাইডের সাহায্য নিয়েছ?
না তো। উনি জানেন না আমি এই বিষয়ে লিখছি যে…
তুমি এতো ভালো লেখো! অথচ ইতিপূর্বে কোনো লেখাই লেখোনি!
ঋতি একথার কি উত্তর দেবে! আলতো করে হাসছে।
অধ্যাপক চন্দ্র লেখাটিকে একটি বড়ো পত্রিকায় ছাপাবেন বলে কথা দিলেন। তারপর বললেন, এসো, একটু চা করি।
রান্নাঘরে চা বসিয়েছেন। ঋতি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে। কথা হচ্ছে নানারকম। হঠাৎই তিনি ঋতির সামনে দাঁড়িয়ে ঋতির ঠোঁটে চুমু খেতে এগোলেন। ঋতি চমকে উঠে সরে গেছে। অধ্যাপক চন্দ্র বললেন, তুমি চাওনা?
ঋতি মাথা নাড়ল। কথা বলতে পারছে না। আকস্মিক এই ঘটনা ঋতিকে বিমূঢ় করে তুলেছে।
অধ্যাপক চন্দ্র তখন ঋতির হাত ধরে বললেন, তুমি না চাইলে আমি তোমাকে জোর করব না সোনা!
ঋতি আরো চমকিত। এতো নৈকট্য, এতো আদরের ডাক… সে ইচ্ছে থাকলেও স্নেহময়কে কখনো এভাবে ডাকতে পারেনি। তবে! অধ্যাপক চন্দ্র তাকে ভালোবেসে ফেললেন! তার পড়াশোনা, তার লেখা এসব দেখে এতোবার মুগ্ধতা প্রকাশ করছেন! উনি তো নিজেও পড়াশোনা পাগল মানুষ! তাই হয়তো… ঋতি দ্বিধায় পড়ে গেল পুরো বিষয়টা নিয়ে। ট্রেনে করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার মাথার মধ্যে একই কথা ঘুরতে লাগল। তবে কি এই প্রথম জীবনে কেউ তাকে চাইল! সে কি তবে সাড়া দেবে! দীর্ঘ আঠাশ বছরের জীবনে এই তার প্রথম প্রেম! স্নেহময়দাকে তো সে চেয়েছিল! সে নিজেকে নিবেদন করেছিল। স্নেহময়দার প্রথম প্রথম আগ্রহ আর এখনকার অনাগ্রহ সবই ঋতির কাছে স্পষ্ট। সন্তান হওয়ার পর থেকে ঋতার প্রতি মনোযোগ কমে গেছে স্নেহময়দার। সপ্তাহে একদিন -দুদিন যোগাযোগ করে। তেমন কথা হয় না। ঋতির জীবনে কি চলছে তার কতটুকু খোঁজ রাখে স্নেহময়দা! অথচ অধ্যাপক চন্দ্র মন দিয়ে ঋতির কথা শোনে। ঋতিকে গুরুত্ব দেয়। ঋতির পড়াশোনা নিয়ে উচ্ছ্বসিত। তাহলে… আজ ঋতি ওঁকে প্রত্যাখ্যান করার পরও উনি তো একবারও বিরক্তি প্রকাশ করলেন না! বরং আদর করে কথা বললেন! ঋতির ভেতরে ভেতরে একটা ভাবনা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঋতি ভাবতে না চাইলেও ভাবনাটা ঋতিকে ছেড়ে যাচ্ছে না।
এসব ভাবতে ভাবতে ব্যারাকপুর স্টেশনে নেমে হাঁটছিল ঋতি। পিছন থেকে কে যেন বলে উঠল, চেহারাটা তো একেবারেই অধ্যাপকের মতো নয়! ক্লাসে ছাত্ররা মানে!
ঋতি ঘুরে দেখল পুলু কাকু। বাবার বন্ধু। ব্যারাকপুরেই থাকে। ঋতি হাসল।
কেমন চলছে ম্যাডাম?
এই চলছে। তুমি ভালো আছ?
আমি তো অলওয়েজ ফাইন! তারপর এখন কি কলেজ থেকে ফেরা হচ্ছে?
না, অন্য কাজ ছিল।
পুলু কাকু মাথা নাড়ল। তা তোর এমন চেহারা হয়েছে কেন! ডায়েট করছিস!
না, এমনিই… তোমার তো ভুঁড়িটা বাড়ছে দিনে দিনে।
পুলু কাকু হাসল। স্টেশন থেকে বেশ খানিকটা রাস্তা পুলু কাকুর সঙ্গে গল্প করতে করতে এলো ঋতি। এতোক্ষণ যে ভাবনাগুলো থেকে বেরোতে পাচ্ছিল না সেগুলো যেন একটু হালকা হলো।
৯০
ঋতির কলেজ আবার শুরু হয়েছে চার মাস বাদে। এই চারমাস ঋতি বাড়িতে কোনো টাকাপয়সা দিতে পারেনি। অনন্ত সাড়ে তিন হাজার টাকা পায়। আর শ্রী এখন পায় আড়াই হাজার টাকা। ওই দিয়েই চলেছে সংসার। খাতা দেখার টাকা দিয়ে ঋতি পিএইচডির প্রথম কিস্তির টাকাটা দিতে পেরেছে। কলেজ যাওয়া ছিল না বলে ঋতি নেটের প্রিপারেশন নেওয়ার জন্য এবারে অনেকটা সময় পেয়েছে। সামনেই পরীক্ষা। এই ক’মাসে বাড়ির পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। ঋতি অনন্তকে যেন আর সহ্য করতে পারছে না। তার জীবনের যাবতীয় দুর্বিপাকের জন্য ঋতি অনন্তকেই দায়ি করে! তুমি বিয়ে করতে গেছিলে কেন বাবা! তোমার একটা টেম্পোরারি আড়াইশ টাকা মাইনের চাকরি। তার ওপর ভরসা করে কেউ বিয়ে করে! যদি বা বিয়ে করলে তোমার বাচ্চার কি দরকার ছিল! তুমি তো তার দায়িত্ব নিতে পারলে না! তার জীবনে এতো বিপর্যয় ঘনিয়ে তোলার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছিল বাবা! তোমার বাড়ির লোক তো চায়নি তুমি বাচ্চা নাও! তাহলে কেন! কিসের ভরসায় তুমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে!
অনন্ত এইসব প্রশ্নের সামনে বাক্যহারা হয়ে যায়। হয় দাঁতে কটকট আওয়াজ করে; না হয় ব্যঙ্গ করে হুঁ, হাঁ করতে থাকে।
ঋতি সেটা আরোই মেনে নিতে পারে না। বলে এ বাড়ির বাকি ছেলেমেয়েরা ভালো আছে। কেবল আমিই খারাপ আছি। আমি খেতে পাইনা, পরতে পাই না। একটা প্যাডের প্যাকেটও তো কোনোদিন কিনে দাওনি আমায়। অথচ এ বংশের সব থেকে কৃতী সন্তান আমিই। সবথেকে পড়াশোনায় ভালো আমিই!
অনন্ত তখন হাত পা নেড়ে বলে, আপনারে বড় বলে, বড় সেই নয়/ লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়।
শুনে ঋতির পিত্তি জ্বলে যায়! আরো চিৎকার করতে থাকে ঋতি। বলে, এই না হলে অনন্ত ঘোষাল! নিজের মেয়ের কৃতিত্ব নিজেই দেখতে পায়না! দাদার মেয়েদের বড়ো বলতে গিয়ে নিজের মেয়েকে যে ছোটো করছে সে জ্ঞান নেই!
হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকে ঋতি। বলে, আমি তো নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নিয়েছিলাম। তুমি ষড়যন্ত্র করলে কেন তোমার দাদার সঙ্গে যোগসাজশ করে! লজ্জা করে না!
অনন্ত তখন কোমড় দুলিয়ে বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি করে বলে, কি করে জানব তোমার গুপ্ত প্রেমের কথা!
বাবার এই আচরণ দেখে ঋতির মাথা নিচু হয়ে যায়। বাবা এতো অসভ্য, এতো নিম্নমানের! এমন একটা কথা এভাবে বলতে বাবার আটকালো না! ঋতিবারান্দায় বসে কাঁদতে থাকে। তার মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে ‘একদিন সে এসে পড়েছিল এই ভুল মানুষের অরণ্যে’। বা শক্তির ওই কবিতাটা, ‘আমায় তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে’।
কলেজ থেকে ডাকার পর ঋতি, অর্চিতা ও সহেলীর সঙ্গে আলোচনা করে ওদের কলেজের পার্মানেন্ট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর দিব্যেন্দুদার সঙ্গে কথা বলল। দিব্যেন্দুদা জানাল এই কলেজের জিবি মেম্বারদের মধ্যে নিকটবর্তী পৌরসভার মেয়র হচ্ছেন আসল লোক। তার কথামতোই প্রিন্সিপাল চলেন। তাঁকে ধরতে হবে। সে বর্তমান শাসকদলের লোকও বটে। সে চাইলে অনেক কিছুই সম্ভব। ঋতিরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাইল। দিব্যেন্দুদাই ব্যবস্থা করল। ঋতি, অর্চিতা, সহেলীকে নিয়ে দিব্যেন্দু একদিন দুপুরবেলায় হাজির হলো পৌরসভায় মেয়রের ঘরে। ঋতি, অর্চিতা ও সহেলীর তুলনায় বড়ো। দিব্যেন্দু পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর ঋতি কথা শুরু করল। খানিকটা বলতে না বলতেই মেয়র ঋতিকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমি বুঝেছি। অর্চিতার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কিছু বলুন ম্যাডাম।
ঋতির পুরো ব্যাপারটা বুঝতে এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। অর্চিতা এককথায় সুন্দরি। তাই মেয়র লোকটা ঋতি আর সহেলীকে একঝলক দেখে নিয়ে সেই যে অর্চিতার দিকে তাকিয়েছে, আর চোখ সরাচ্ছে না। ব্যাপারটা অর্চিতাও বুঝেছে। অর্চিতার বয়স কম। ও ভয় পাচ্ছে। তবু আমতা আমতা করে ও কিছু কথা বলল। শেষে বলল, পুরো বিষয়টা ঋতিদিই আপনাকে ভালো বোঝাতে পারবে।
ঋতিসেই সূত্র ধরে আবার বলতে শুরু করল। ঋতির তখন বিরক্ত লাগছে। লোকটা যে লম্পট বুঝতে বাকি নেই ঋতির। এবং অশিক্ষিত ও বটে। তার কাছে এসে হাত পাততে হচ্ছে উচ্চশিক্ষিত তিনজন মানুষকে। ক্ষমতা এমনই বিষম বস্তু! ঋতি প্রিন্সিপালের কথা এবার সরাসরি বলল। ডেট অফ অ্যাডভার্টাইসমেন্ট, ডেট অফ ইন্টারভিউ সব এক থাকা সত্ত্বেও ডেট অফ জয়েনিং কলেজ নিজের সিদ্ধান্তে পিছিয়েছে। ঋতিরা যখন এ বিষয়ে প্রিন্সিপালকে জানাতে গেছিল তখন উনি বাহাদুরি মেরে বলেছিলেন, ওসব ডেট ফেট কিছু না। তোমাদের অ্যাপ্রুভাল হওয়া নিয়ে কথা তো! ঋতিরা এর উত্তরে কিছুই বলতে পারেনি। প্রিন্সিপালের উপর ভরসা করে ঋতি আগের কলেজে রেজিগনেশন দিয়েছে। ওই কলেজে কাগজপত্রে সমস্যা থাকলেও সকলের অ্যাপ্রুভাল এসেছে। কিন্তু এই কলেজে তাদের তিনজনের অ্যাপ্রুভাল এলো না। তারা পুরো মাইনে পাচ্ছে না। উপরন্তু চার মাস করে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঋতি শেষে বলতে বাধ্য হলো, দাদা, আমার টাকায় আমার সংসার চলে। এভাবে বসিয়ে দিলে মা বাবাকে নিয়ে কোথায় যাব!
মেয়র পুরো বিষয়টা বুঝলেন কি না বোঝা গেল না। হয়তো ভাবলেন এদের সমস্যা জিইয়ে রাখলে এই অর্চিতা ম্যাডাম বারবার তার সামনে আসবে। কথা হবে। বেশি কিছু দাবি করলেও আপত্তি করবেনা। মুখে বললেন, আপনারা কয়েকমাস পর আবার আসুন। আমি দেখছি ব্যাপারটা। আপনাদের যাতে বসিয়ে দেওয়া না হয় সেটা দেখে নিচ্ছি। কিন্তু অ্যাপ্রুভালের ব্যাপারটা জটিল। তার জন্য দৌড়াদৌড়ি আছে। যোগাযোগ রাখুন আমার সঙ্গে। দেখছি। সব কথাগুলোই অর্চিতার দিকে তাকিয়ে বলে গেল।
ঋতি আর না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে এলো। গা ঘিনঘিন করছে তার! অর্চিতা ঋতির ছোটো বোনের মতো। ঋতির মনে হচ্ছিল অর্চিতাকে বলে, আর কোনোদিন আসিসনা এই লোকটার সামনে। নোংরা লোক একটা। কিন্তু সামনে দিব্যেন্দুদা আছে। ঋতি মনের রাগ মনে মনেই গিলে ফেলল।
দশম পর্ব
দশম পর্ব
৯১
বিজু এসেছে কলকাতায়। অনন্ত মুম্বাই থেকে চলে আসার পর বিজু এই প্রথম এলো। সম্রাজ্ঞীর বিয়ে ঠিক করেছে বিজু আর সম্পূর্ণা। বিয়ে হবে সম্পূর্ণার বাপের বাড়ি থেকে। ছেলের পৈতে সম্পূর্ণা ভাসুরের বাড়ি থেকে দিতে বাধ্য হয়েছিল। এবার সে তার স্বামীকে নানা যুক্তি দেখিয়ে রাজি করাতে পেরেছে। বিয়ে হবে সম্পূর্ণার মেজদির বাড়ি থেকে। মেজদির দোতলা বাড়ি। কিন্তু আত্মীয় স্বজনের সংখ্যা তো আর কম নয়। আরো ঘর হলে ভালো হতো। বিজু মেজদির বাড়ির তিনতলায় আরো দুটো ঘর, আধুনিক সুবিধে যুক্ত বাথরুম ইত্যাদি করে নিল। চন্দননগরে সব ব্যবস্থা করে বিজু এলো ব্যারাকপুরের বাড়িতে। রুশির সঙ্গে বিজুর এখন প্রায়ই ফোনে কথা হয়। রুশি একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে অনেক কষ্টে সামান্য বেতনের একটা চাকরি জোগাড় করেছে। ঋতীর মতো কলেজে পড়ানোর জন্য চেষ্টা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ঋতী কলেজে পার্টটাইম পড়াচ্ছে বলে খুব অহংকার। ঋতী এসএসসি দেবেনা বলেছে। এতো ঔদ্ধত্য! এসব কথা রুশি আলোচনা করেছে বিজুর সঙ্গে। অনন্ত বম্বেতে গিয়েও ঋতির সম্পর্কে এই ধরনের কথাই বলেছে। তবে অনন্ত পুরোপুরি ঋতিকে দোষ দেয় না। বলে, শ্রী ওর মাথাটা খাচ্ছে! যাই হোক না কেন এসব শুনে বিজু ভেতরে ভেতরে ঋতির প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠেছে। এমনই অসভ্য তৈরি হয়েছে মেজদার মেয়েটা যে মেজদাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে ছাড়ল! কি একটু পড়াশোনা করেছে তাতে এতো অহংকারই বা হবে কেন! বিজু চেষ্টা করেছে নিজের ছেলেমেয়ের জন্য যাতে তারা উচ্চশিক্ষিত হতে পারে। মেয়েটার এইচ এসের রেজাল্ট ভালো না হলেও মোটা টাকা খরচ করে ওকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি করে দিয়েছিল বিজু। একবছর পড়ার পর মেয়ে জানাল সে কিছু বুঝতে পারছে না। তার পড়তে ভালো লাগছে না। বিজু তখন আবার মোটা টাকা খরচ করে মেয়েকে ম্যানেজমেন্ট কোর্সে ভর্তি করে দিল। ছেলেকে বিজু স্বয়ং ভোলানাথ মনে করে। ওর জন্মের পরই বিজুর আয়পয় এতো বেড়েছে। ছোটো থেকে কখনোই ছেলেকে শাসন করেনি বিজু। ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ছেলে স্কুলে যাওয়ার নাম করে শপিং মলে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পরীক্ষা না দিয়ে গেম খেলে। ধরা পড়ে গেলে এমন একটা ভাব দেখায় যেন কিছুই ঘটেনি। সম্পূর্ণা চেঁচামেচি করে। সম্পূর্ণা ছেলেকে মারধোর করে। বিজু তখন সম্পূর্ণার ওপর রাগ করে নিজের গায়ে বেল্ট দিয়ে মারতে থাকে। এসব নাটক মুম্বাইয়ের বাড়িতে চলে। ছেলেটা মাধ্যমিকটুকু পাশ করলেও বিজু অনেক মনে করবে! আর সেখানে মেজদার মেয়েটা ভালো খেতে, পরতে পায় না, ওই একটা খুপরি ঘরে থেকে, আমার কাছেই ভিক্ষে করে টাকা চেয়ে পড়াশোনা করে এখন দেমাগ দেখায়। বিজু ব্যাপারটা সহ্য করতে পারে না। দাদাভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করেও বিজু বুঝতে পারে মেয়েটার বাড় বেড়েছে।
ঋতি এতো কথা জানে না। অনন্ত সেই সময় মনের দুঃখে অনেক কথা বললেও মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে তার মধ্যেও একটা প্রচ্ছন্ন গর্ব তৈরি হয়েছে। কারণ ঋতি এর মধ্যে নেট পাশ করেছে। যেদিন রাতে নেটের রেজাল্ট বেরোলো অনন্ত কেঁদে ফেলেছিল। ঋতি সারারাত ঘুমোতে পারেনি। ভোরবেলা উঠে জ্যেঠুর বাড়িতে পৌঁছেছিল। আনন্দে ঋতি কাঁদছিল। বিশ্বদেব খুব নিস্পৃহ ভাবে বলেছিল এতো কাঁদার কি হলো! ঋতি চোখ মুছে নিয়েছিল। যদিও জ্যেঠুর নিস্পৃহতা তার চোখ এড়িয়ে যায়নি। ঋতির এতোবড়ো একটা অ্যাচিভমেন্টের খবর বিজুর কাছেও পৌঁছেছিল। অনন্ত এতোদিনে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে মেয়ে তার কলেজে পড়াবার যোগ্যতা রাখে। তাই সে আনন্দ করে এই খবর শুনিয়েছিল বিজুকে। বিজু ঋতির অহংকার আরো বাড়ল ভেবে মনে মনে বিরক্তই হয়েছে।
ঋতি সেদিন বিজুর সঙ্গে দেখা করতে এ বাড়িতে এসেছে। বিজুর অভ্যেস আছে সে সুযোগ পেলেই নিজের অ্যাচিভমেন্টের কথা, স্ট্রাগলের কথা ফলাও করে বলে। সেইসঙ্গে বিজু মনে করে তার ক্ষমতার বলেই সব বিষয়ে কথা বলার তার অধিকার আছে। সব বিষয়ই সে অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই বোঝে। টাকা হলে মানুষের কথাও বাড়ে। সেদিনও বিজু ফলাও করে নিজের কথা বলছিল । তারপর হঠাৎই ঋতীকে পড়াশোনা বিষয়ে নানা প্রশ্ন করতে শুরু করল। ঋতির আনন্দ হচ্ছিল উত্তর দিতে। বিজু তো কখনো জানতে চায়নি এসব কথা। আজ জিজ্ঞেস করছে বলে ঋতিও খুবই বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিচ্ছে। হঠাৎই বিজু রুশিকে বলল, রুশি মা, তুমিও নেট পরীক্ষাটা দাও। তোমার জন্যেও কঠিন হবে না।
রুশি বলল, না বিজু আমি নেট পরীক্ষা দিতে পারব না।
কেন?
ঋতী একটু আগ বাড়িয়েই উত্তর করল, আসলে পিজি তে ৫৫%নম্বর না পেলে নেট দেওয়া যায় না।
সে আবার কি! একটা পরীক্ষা সবার জন্যই ওপেন থাকা উচিত। পিজিতে কোনো বছর কারো নম্বর কোনো কারণে কমে যেতেই পারে! তার সঙ্গে নেট পরীক্ষা দেওয়ার কি সম্পর্ক!
আসলে বিজু এটা তো ইউজিসির নিয়ম।
না না, এই নিয়মের তো কোনো মানে নেই। পরীক্ষা সবাই দিতে পারবে না কেন! যে কম নম্বর পেয়েছে সে তার মানে কলেজে পড়াতে পারবে না। সে অন্যদের থেকে খাটো! আর নেট পাশ করলেই সে মহাপণ্ডিত!
এইকথাটা যে আসলে ঋতিকেই খোঁচা মেরে বলা হলো ঋতি সেটা বুঝতে পারেনি। ঋতি তারপরও বোঝাতে গেছে, একটা ক্রাইটিরিয়া তো থাকবেই। আর তাছাড়া কোনো স্টুডেন্টের একটা বা দুটো পরীক্ষা খারাপ হতেই পারে। অসুবিধে হতে পারে। সব পরীক্ষা তো আর খারাপ হতে পারে না! যদিও এটাও ঠিক যে নম্বরের সঙ্গে জ্ঞানের গভীরতার যোগাযোগ নেই। অনেক নম্বর পেয়েও সে হয়তো তেমন কিছুই জানে না। আবার তেমন নম্বর পায়নি, অথচ তার জ্ঞান অসীম। এমনটা তো হয়ই।
একথার পর তো আর কোনো কথাই বলা চলে না। তবু বিজু একনাগাড়ে তর্ক করে গেল এই বলে যে নম্বরের বেরিয়ারটা তুলে দেওয়া দরকার।
তার কথার মধ্যে একটা ঝাঁজ লক্ষ করে ঋতি চুপ করে গেল।
বাইরে বেরিয়ে অনন্ত বলল, তুই অতো কথা বলতে গেলি কেন!
বাবা তুমি দেখলে বিজু কেমন অবান্তর তর্ক করে গেল। রুশিদিদি নেট দিতে পারবে না। ওর সেই নম্বর নেই। তাতে আমি কি করব! ও পারছেনা বলে আমি পারলেও করব না!
অনন্ত বলল, বিজু এসব পড়াশোনার কতটুকু বোঝে। ও ওর মতো যা বলছিল তুই শুনে নিতিস। তর্ক করতে গেলি কেন!
ঋতি আর কোনো কথা বলল না। মনে মনে ভাবল, এই জন্য কোনোদিনই বিজুকে পছন্দ করে উঠতে পারল না ঋতি। এই আস্ফালন, অবান্তর জটিলতা আর নাটক করার জন্য।
বিজুর মেয়ের বিয়ের এলাহি আয়োজন হলো। গা ভর্তি গয়না থেকে তিন ধাতুর বাসনকোসন কিছুই বাদ গেল না। বিয়ে উপলক্ষে সম্পূর্ণা সমস্ত আত্মীয়স্বজনকে দামি দামি পোশাক উপহার দিল। তার মেয়ের বিয়ের গ্র্যান্ড পার্টিতে মানানসই পোশাক না হলেই নয়। সেই পোশাক দেখে রুশি এতো এক্সাইটেড হয়ে গেল যে সেটা অনন্তর পর্যন্ত চোখে লাগল। সম্পূর্ণাকে আদর করে জড়িয়ে ধরে চুমুতে চুমুতে অস্থির করে তুলল রুশি। ঋতীর মনে হলো ওদের দেখলে কে বলবে যে কয়েকবছর আগে ভাইয়ের পৈতের খাবার নিয়ে কাকিমা ভাইঝির ঝগড়া আর চিৎকারে তাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটে লোক জড়ো হয়ে গেছিল। ঋতি ওদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবছিল এরা এতো কৃত্রিম কেন! এতো তাড়াতাড়ি রঙ বদল করে কি করে! টাকার কি মহিমা!
বিয়ে উপলক্ষে সবাই উপস্থিত হলো চন্দননগরে। আনন্দ, হইহুল্লোড়,মজা চলছে। সেইসঙ্গে চলছে নিয়ম পালন! বাপরে কত নিয়ম! ঋতি যে দুনিয়াটায় চলাফেরা করে সেখানে এসব রীতিনীতি, নিয়মকানুন, কুসংস্কারের কোনো জায়গা নেই! শহরকেন্দ্রিক অনেক পরিবারেই সেটা নেই। এমনকি পুরনো দিনের মানুষেরাও অনেক সংস্কারমুক্ত। ঋতি নিজের নিনানকেই দেখেছে। স্নান করে সারাদিনে একবার সূর্য প্রণাম করে। আর কোনো ঠাকুরদেবতা নিয়ে কোনোদিন কোনো বাড়াবাড়ি করতে দেখেনি ঋতি নিনানকে। অথচ মায়ের, অস্মি মাসির পুজো আর শেষ হয়না। এদের দেখেও ঋতি অবাক হলো। মুম্বাইয়ের মতো আধুনিক শহরে থেকে এতো কুসংস্কারাচ্ছন্ন! যাই হোক, মেয়ে বিদায়ে সবাই খুব কাঁদল। সম্রাজ্ঞীও কাঁদল। খানিকটা কান্নাকাটির পর অবশ্য চুপ করে গেল। তার নতুন বর বাঁকুড়ার ছেলে। কিন্তু থাকে মুম্বাইতে। ফলে সম্রাজ্ঞী বাবা মায়ের কাছাকাছিই থাকবে। বিয়ের আগেই সে ছেলেকে শর্ত দিয়েছিল যে সে কোনোদিন কলকাতায় থাকতে যাবে না। ছেলে সে শর্ত মেনে নিয়েছে।
সকালে মেয়ে বিদায়ের পর তিনতলার ঘরে সবাই মিলে তত্ত্ব দেখতে বসেছে। মিষ্টি, জামাকাপড় সব ভাগ করে করে সবাইকে দিতে হবে। ঋতিকে একের পর এক সম্পূর্ণা আর বিজু মিলে হুকুম করে যাচ্ছে। নিচ থেকে ছোটো ছোটো কনটেইনার নিয়ে আয়। প্লাস্টিকের প্যাকেট নিয়ে আয়। গার্ডার নিয়ে আয়। ঋতি একবার করে তিনতলা থেকে নামছে আর উঠছে। মিষ্টিগুলো বের করে রাখা হয়েছে। বিজুর ছেলে তত্ত্বের আলপিনগুলো নিয়ে মিষ্টির মধ্যে গাঁথছে। বিজু দেখছে। কিছুই বলছে না। ঋতীদের বয়সী আর একটি মেয়ে ওখানেই একটা চেয়ার পেতে বসে মিষ্টি খাচ্ছে। খেতে খেতে গুঁড়ো গুঁড়ো নিচে পড়ছে। সবাই দেখছে। কেউ কিছু বলছে না। ঋতি গার্ডার দিতে উপরে এসে দেখল আনন্দনাড়ুর কৌটো খোলা হয়েছে। সবাই হইহই করছে সেই নিয়ে। ঋতিও একবার বলল, আমার জন্য আনন্দনাড়ু রেখো। খাব। বলে আবার কি একটা আনতে নিচে গেছে। এমনসময় অনন্ত বিজুর সামনে হাত পেতে বলেছে, বিজু ওই সন্দেশটা একটু দে তো! খাই! বিজু শুনেও না শোনার ভান করছে। অনন্ত বুঝতে পারছে না। হাত পেতে রয়েছে। পিছন থেকে বিজুর শাশুড়ি বিড়বিড় করে বললেন, দুপুরে ভাত খেয়েই এখন মিষ্টি খাওয়া যায়! বলেই দেখল শ্রী ওঁর দিকে তাকিয়ে আছে। বিজুর শাশুড়ি মুখটা ঘুরিয়ে নিল। ঠিক তখনই ঋতি কি সব নিয়ে এসে ঘরে রেখে বলে উঠেছে, দাও, আনন্দ নাড়ু দাও!
হঠাৎই চিৎকার করে উঠল বিজু বীভৎস জোরে। অত্যন্ত অপমানজনক ভাষায় বলল, এই, কী চাই এখানে! এখন আনন্দ নাড়ু টাড়ু হবে না। যাও, যাও এখান থেকে চলে যাও! একটা মঙ্গল অমঙ্গলের বোধ নেই! যাও!
এতো জোরে কথাগুলো বলেছে যে গোটা ঘর স্তব্ধ হয়ে গেছে। ঘাবড়ে গিয়ে অনন্তও হাত গুটিয়ে নিয়েছে।
ঋতিও চমকে উঠেছে। সে প্রথমে বুঝতেই পারেনি কথাটা তাকে বলা হচ্ছে। যখন বুঝল ওখানে আর না দাঁড়িয়ে ম্যাজেনাইন ফ্লোরে একটা ঘরে এসে একা বসে রইল। এখান থেকে অবশ্য স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে ওই ঘরে আবার গুলতানি শুরু হয়েছে। ঋতি থম মেরে বসে আছে। তার মুখ চোখ লাল হয়ে আছে। সে এতখানি অপমানিত জীবনে কখনো হয়নি। খানিকটা বাদে ওঘরে এসে ঢুকল সম্পূর্ণার ভাই। রুতু!
এই ডাকটুকু শুনেই ঋতী হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। সম্পূর্ণার ভাই ঋতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
ঋতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, আমি কী করেছিলাম! শুধু শুধু আমাকে অপমান করল কেন!
রুতু তুই জানিস তো, তোদের বাড়ির ছেলেরা কেমন অকারণেই সিনক্রিয়েট করে। তোর কাছে তো নতুন নয় বল।
ঋতি আর কোনো কথা বলল না।
শ্রী তখনও ওপরের ঘরেই বসেছিল। শ্রীর প্রথমে মনে হলো এখনই মেয়েটার হাত ধরে বিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। রইল তোদের মঙ্গল অমঙ্গল। রইল তোদের আনন্দ! তারপরই শ্রীর মনে হলো অনন্ত তো সবসময় বলে আমাকে কিছু বলার সুযোগ দাও না কখনোই। তখনই একটা উত্তর না দিয়ে শান্তি নেই! শ্রী তাই ভাবল, দেখা যাক, অনন্ত কি করে!
কিন্তু অনন্ত গম্ভীর হয়ে গেলেও একটি কথাও এ প্রসঙ্গে খরচ করল না।
পরদিন বাসে করে বৌভাতের অনুষ্ঠানে যাবে সবাই। অনন্ত অনেকক্ষণ থেকে একভাবে শাসিয়ে চলেছে। ৪টেয় বাস ছাড়বে। শ্রী তোমার জন্য যেন দেরি না হয়!
শ্রী কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না।
অনন্ত তাই রেগে বেরিয়ে গেল। বাসে উঠে একনাগাড়ে গজগজ করে চলেছে। ঘোষাল বাড়ির সবচেয়ে লেটুটার জন্যই সবচেয়ে দেরি হবে! আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি আত্মীয়স্বজন হাসছে। শ্রী কিন্তু ঠিক সময়েই পৌঁছোলো। কিন্তু বাস ছাড়তে তারপরেও দেরিই হলো। কারণ সম্পূর্ণার দুজন আত্মীয় সেজেগুজে আসতে দেরি করল!
ফেরার সময় বাসে করে এসে তারপর খানিকটা হেঁটে ফিরতে হবে। অনন্তর শরীর ভালো লাগছে না। অনন্ত ঋতিকে বলল, বাবু আমার শরীরটা ভালো লাগছেনা!
ঋতি এবার শুনেও না শোনার ভান করে এগিয়ে গেল।
বাড়িতে ফিরে অনন্ত সেই নিয়ে চেঁচামেচি শুরু করল। ঋতি শুধু বলল, যে আমার অপমানে আমার পাশে থাকে না, আমিও তার বিপদে তার পাশে থাকব না।
হ্যাঁ হ্যাঁ, বাপ মরে গেলেও মুখে আগুন দিবি না, আমি জানি!
শ্রী তখন বলল, তুমি কিছু বললে না কেন! ঋতিকে অকারণে ওভাবে অপমান করল। বাবা হিসেবে তোমার বলাটা কর্তব্য ছিল কি না!
আমি পরে বলব।
পরে বলবে মানে! ও অপমান করল সবার সামনে! আর তুমি পরে আড়ালে বলবে! কেন!
এই নিয়ে এক দু কথায় অশান্তি লেগে গেল। বিশ্বদেব শুনতে পেয়ে বেরিয়ে এসে বলল, ওখানে কোন্ শ্রাদ্ধটা হচ্ছিল যে আনন্দনাড়ু খাওয়া যেত না! বাকিরা তো খাচ্ছিল। সম্পূর্ণা পরদিন সকালে ভাইয়ের কাছে দাদাভাইয়ের মুখের ওই কথাটা শুনে যারপরনাই বিরক্ত হলো। দাদাভাই একটা বিয়ের অনুষ্ঠানকে শ্রাদ্ধের সঙ্গে তুলনা করল! ফলে অশান্তি আরো বাড়ল।
৯২
ন’ দিন পর চন্দননগরে অষ্টমঙ্গলা সেরে নতুন জামাই মেয়েকে নিয়ে ব্যারাকপুর বাড়িতে এলো বিজু আর সম্পূর্ণা। ফলে শ্রী এবং ঋতির ডাক পড়ল। নতুন জামাইকে দেখাতে হবে তো একান্নবর্তী পরিবার ও তার একাধিপত্য অভিভাবকত্ব! শ্রী ও ঋতি বিরক্তি নিয়েই উপস্থিত হলো। সম্রাজ্ঞী এসে থেকে তার বরের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে! ছেলেটি খুবই শিক্ষিত। মুম্বাইতে বিরাট চাকরি করে। অথচ সে সম্রাজ্ঞীর কথায় চলে। তার বোধবুদ্ধি, ভালোমন্দের ভার সে দিয়ে রেখেছে সম্রাজ্ঞীর দায়িত্বে। এমনটা দেখাতে গিয়ে নতুন বরের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করছে সম্রাজ্ঞী।আসলে অযোগ্য ব্যক্তি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পেয়ে গেলে যেমন অহংকারে মটমট করে সম্রাজ্ঞীর হয়েছে সেই অবস্থা। বিশ্বদেব জামাইয়ের প্রোফাইল শুনে বিয়ের আগেই বলেছিল, সম্রাজ্ঞী গেইনার, ছেলেটি লুজার হলো। এখন তো দেখা যাচ্ছে কথাটা হাড়ে হাড়ে সত্যি। যাই হোক সম্রাজ্ঞী এসে নানা কথা বলছে। মুম্বাইতে সে কত বড়ো চাকরি করে। গাড়ির ইএমআই তো সেই মেটাচ্ছে! তার শ্বশুরবাড়ির তরফ থেকে যা জামাকাপড় অষ্টমঙ্গলায় আনা হয়েছে সব সেই কিনেছে। তার বর এতো বোকা যে সে দামি জুতো কিনেছে সেটা নিজের বোনকে বলে দিয়েছে। একটুও ভাবেনি যে ওর বোনের মেয়ের জামাটার দাম সম্রাজ্ঞীর জুতোর দামের চেয়ে কম! মুম্বাইতে গিয়ে তাকে আবার চাকরিতে জয়েন করতে হবে। তার চাকরিটা তো আর যখন ইচ্ছে পেলাম, যখন ইচ্ছে ছেড়ে দিলাম এমন নয়! রুচির দিকে তাকিয়ে সে বলল, তোর স্কুলের চাকরি চলে গেলে আবার পেয়ে যাবি। আমার চাকরি পাওয়াটা কঠিন!
ঋতী একথা শুনে একবার রুচির দিকে তাকিয়ে নিল। দিদিভাই স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরি করে। সেটা না কি পাওয়া সহজ! আর সম্রাজ্ঞী একটা কোম্পানিতে এইচ আর এর চাকরি করে। সেটা পাওয়া কঠিন! ঋতী ওর কথা শুনে হাসবে না কাঁদবে ভেবে পাচ্ছিল না।
খানিকক্ষণ বাদে সম্রাজ্ঞী হঠাৎ ঋতিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে শুরু করল, এই তো এরপর নেট দেব। তাহলে আমি যেখান থেকে পড়ে পাশ করলাম সেখানেই অ্যাবসর্ভ হয়ে যাব। ওখানে স্টার্টিং এই ওয়ান ল্যাক!
ও এসব বলছিল। সবাই শুনছিল। সবাই ওকে অ্যাপ্রিসিয়েট করছিল। কত টাকা রোজগার করছে! দারুণ ব্যাপার!
হাটে হাঁড়িটি ভাঙল নতুন জামাই। খুব মিষ্টি করে বলল, কত টাকা মাইনে পাও সোনা যে গাড়ির ইএমআই থেকে সব তুমি করছ! পাও তো ওই কটা টাকা! আর কাজ তো লোকের ছুটির হিসেব রাখা!
শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল সম্রাজ্ঞী। নতুন বরকে আরো খানিকটা দাঁত খিঁচোতে লাগল।
এদিকে ও বাড়িতে যাওয়ার পর থেকে বিশ্বদেব ঋতিকে একের পর এক হুকুম করেই চলেছে। টেবিল মুছে দেওয়া থেকে জল বেড়ে দেওয়া সবই ঋতি করছে। কিন্তু বিশ্বদেবের বলার ধরণ ভালো না। মনে হচ্ছে যেন ঋতি এ বাড়ির চাকর! চোখ পাকিয়ে পাকিয়ে ইশারা করে, কখনো চেঁচিয়ে ঋতিকে হুকুম করে চলেছে বিশ্বদেব। ঋতি সব কাজই করে দিয়েছে জ্যেঠুর কথা মতো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার কষ্ট হচ্ছে। একে তো বিজুদের বৈভব দেখে সে বুঝতে পারে ওরা কত উদ্বৃত্তের মধ্যে বাঁচে! আর তার পড়াশোনার খরচটুকু চালানোর মতো টাকা নেই। ওইভাবে কষ্ট করে খাতা বাড়িতে বয়ে এনে এনে টাকা জোগাড় করে ইউনিভার্সিটিতে দিতে হচ্ছে। তারওপর এই মেয়েটার এতো অহংকার! পড়াশোনা করেনি, ফাঁকি মেরেছে। তবু ওর বাবার টাকা আছে বলে ওর কত কদর! আর ঋতিকে সারাক্ষণ দুচ্ছাই করে যাচ্ছে বিশ্বদেব! অথচ এ বাড়িতে ঋতিই সবচেয়ে উচ্চশিক্ষিত! সবচেয়ে মন দিয়ে পড়াশোনাটা ঋতিই করেছে! পাড়ায় সবাই তাকে ভদ্র, ভালো মেয়ে বলে জানে! সেই সম্মানটুকু সে বাড়ি থেকে কোনোদিন পেল না! হঠাৎ চমকে উঠল ঋতি। বিশ্বদেব ডাকছে। এই, ওঘর থেকে টুলটা নিয়ে আয় তো!
ঋতী নিয়ে এসে বিশ্বদেবের সামনে রাখল।
পা টা উঁচু করে বিশ্বদেব ইশারা করল টুলটা পায়ের তলায় বসিয়ে দিতে।
ঋতী তাই দিল।
পাঁচ মিনিটও হয়েছে কি না সন্দেহ! আবার ঋতিকে ডাকছে বিশ্বদেব!
ঋতি সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বিশ্বদেব ইশারা করল পায়ের তলা থেকে টুলটা নিতে।
ঋতী নিচু হয়ে টুলটা আস্তে করে সরিয়ে নিল।
যা ঘরে রেখে দিয়ে আয়।
এবার ঋতির মনে হলো সে চিৎকার করে বলে, আমি এবাড়ির চাকর নই! কিন্তু যাবতীয় বিরক্তি হজম করে টুলটা ঘরে রেখে দিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে আসতে না আসতেই বিশ্বদেব বলল, এই, চেয়ারগুলো ঠিক করে রাখ!
এবার ঋতি সত্যিই সহ্য করতে পারল না। শ্রীর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, জ্যেঠু আমাকে দেখলেই কন্টিনিউয়াসলি হুকুম করতে থাকে!
বিশ্বদেব চেঁচিয়ে উঠল, কি বললি!
ঋতী ওভাবেই বলল, কিছু না। মা আমরা বাড়ি যাব না?
শ্রী আর কথা না বাড়িয়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে এলো।
খানিক পর অনন্ত ফিরল। ওর মুখটা থমথম করছে। শ্রীর বুঝতে বাকি থাকল না ঋতিকে নিয়ে চলে আসার পর ও বাড়িতে কি ঘটেছে।
তারও খানিক পরে নতুন জামাই মেয়েকে নিয়ে সদলবলে বিজু এলো অনন্তর ফ্ল্যাটে। মুখ চোখ লাল করে সে লেকচার দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বদেব তার ভায়েদের জন্য কি করেছে! কিভাবে তাদের বড়ো করেছে তার ফিরিস্তি! বলা বাহুল্য ঋতিকে শুনিয়ে শুনিয়েই কথাগুলো বলা হচ্ছে।
ঋতি ভাবল একবার বলে যে শুধু তো জ্যেঠু নয়, বাবাও তো পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে মিলের চাকরিতে ঢুকেছিল যাতে সংসার চলে; যাতে ছোটো ভাই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে পড়াশোনাটা করতে পারে! কই সেকথা তো একবারও বলো না! আর পড়াশোনা করে নকশাল হয়ে তুমি কি করলে! আমার বাবাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে নিজে পালিয়ে গেলে কৃষ্ণনগরে মামারবাড়িতে! আমার বাবা তোমার জন্য ছ’মাস অকথ্য অত্যাচার সহ্য করল। সারাজীবনের মতো সরকারি চাকরি পাওয়ার আশা তার শেষ হয়ে গেল। ঋতির মনে হচ্ছিল চিৎকার করে বলে, আমাদের আজকের অবস্থার জন্য তোমরা দায়ি! তোমরা দুই ভাই দায়ি! তোমাদের জন্য আমার বাবা চিরকাল অপদার্থ, অকর্মণ্য এসব তকমা গায়ে এঁটে জীবন কাটাতে বাধ্য হলো! তোমাদের জন্য! ভাবতে ভাবতে ঋতির শরীর খারাপ করছিল। ঘাড় শক্ত হয়ে যাচ্ছে। মাথার শিরাগুলো দপদপ করছে। ঋতী আস্তে করে উঠে বাইরে বারান্দায় চলে গেল।
৯৩
সব বই আজকাল কেমন অসম্পূর্ণ মনে হয়। জানা ভাষাও অচেনা লাগে। পরিচিত ঘরবাড়ি আর চেনা আশ্রয় দিতে পারে না। রঙজ্বলা পর্দায় রোদের আঁচ লাগে। ছায়াহীন দিন কাটে। অতীতের সব সম্ভাবনা ধূসর হয়ে গেছে। ভবিষ্যতের কুয়াশায় কার উদাসীন পদচারণা। সে যেন নিঃস্ব ঋতিকে কেবল মৃত্যুর লোভ দেখায়। ক্লান্ত ঋতি মৃত্যুর লোভের সর্পিল গতি দেখে। তার নিঃশব্দ চলাচল ঋতির শব্দহীন দুনিয়ায় আর একটু নৈঃশব্দ সঞ্চার করে। বাকিটা স্টিল ছবির মতো গল্পহীন, স্থবির। ঋতি বুঝতে পারছে ঋতি তলিয়ে যাচ্ছে। জলের তলায় চেতনাহীন নিস্পন্দ পড়ে আছে। বেঁচে থাকার আর কোনো প্রয়োজন অনুভব করছে না। কোনো চেষ্টা করছে না। ক্লান্ত, ভীষণ ক্লান্ত কোনো পাখি সূর্যাস্তের পথে নিরাসক্ত ডানায় মুছে দিচ্ছে শেষ ইচ্ছেটুকু। বাঁচার শেষ ইচ্ছে…. আর কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। নিজেকে প্রমাণ করার কোনো তাগিদ নেই। কারো জীবনের বিফলতার উত্তর হতে চায় না ঋতি। কারো জীবনের অন্ধকারকে আলো দিয়ে ঘিরে দিতে চায় না সে আর। সে শুধু চলে যেতে চায়। সবাইকে ছেড়ে… সব ছেড়ে… সে কেবল চলে যেতে চায়। বাবার সঙ্গে বিরোধ, বাড়ির লোকেদের নিরন্তর অপমান, বাইরে অশিক্ষিত গুণ্ডাদের হাতে পায়ে ধরে চাকরি বাঁচানোর চেষ্টা, স্নেহময়দাকে হারিয়ে ফেলার উদ্বেগ… এই সবকিছু থেকে পালিয়ে যেতে চায় ঋতি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে সে আর দাঁড়ায় না! অনন্তর তেজ, মেজাজ তাকে স্পর্শ করতে পারে না। সে মনে মনে কেবল হাঁটছে, হাঁটছে, চলে যাচ্ছে এই সব কিছু থেকে দূরে। হ্যাঁ, ঋতি পালাতেই চাইছে। কে বলেছে জীবনে সমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জয় পেতেই হবে। ঋতি হেরে গেল। হ্যাঁ,হেরে গেল। মেনে নিচ্ছে ঋতি যে সে হেরে গেছে। এই পৃথিবীটা তো আসলে সুন্দর নয় যে জয়ী হয়ে এখানে থেকে যেতেই হবে। এই পৃথিবীটা ঋতির কাছে অন্ধকারময় একটা জগৎ। যে জগতে কেবল ভয় আছে, হিংসে আছে, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার আছে, বঞ্চনা আছে, যন্ত্রণা আছে… আনন্দ কোথায়! কোথায় আনন্দ! ঋতি যে কতদিন হাসেনি ঋতি নিজেই জানে না। ঋতি ভুলে গেছে আনন্দে থাকলে তাকে ঠিক কিরকম দেখায়! সেই যে ছোটোবেলায়, যখন চোখের তলায় কালি ছিল না, গাল বেয়ে নেমে আসেনি কোনো বিষণ্নতা, যখন চোখদুটো আলোর মতো উজ্জ্বল ছিল, উমনোঝুমনো চুল আর একগাল হাসি… কোনো জটিলতা নেই, হিংসে নেই, বিদ্বেষ নেই… সেই যে সরল বিশ্বাসে এই পৃথিবীটাকে দেখতে চাওয়া ঋতি… সে কোথায়! সে তো নেই! কবেই মরে গেছে সে! শুধু তার শরীরটা আজও টিকে আছে। একে শেষ করে দিতে পারলেই তো আহ্… মুক্তি! আর কোনো যুদ্ধ নেই! আর কোনো চাওয়া পাওয়ার হিসেব নেই! উৎকণ্ঠা নেই! ওই মুক্তিটুকুই চাই ঋতির। তার জন্য আর একটু কষ্ট করতে হবে। একবারই। তারপর আর কিছু নেই। কেউ নেই। সেই যে কাফকা লিখেছিলেন না যে “The meaning of life is that it ends” তার চেয়ে সত্য আর কিছু নেই।
ঋতি স্টাফ রুমে বসে বসে এসব ভাবছিল। এমন সময় আরাধ্যাদি এসে ডাকল, কি রে? ক্লাসে যাবি না?
ঋতি ধড়মড় করে উঠল। চারপাশটা তাকিয়ে দেখে বুঝতে এক সেকেন্ড সময় নিল। ঋতি এইমুহূর্তে বসে আছে উত্তর চব্বিশ পরগণার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি কলেজে। সদ্য চাকরি পেয়েছে সে এই কলেজে। আজ দ্বিতীয় দিন। দমদমের কলেজটায় চাকরির নিশ্চয়তা নিয়ে এতো জটিলতা তৈরি হয়েছে বলেই ঋতি আবার নতুন করে চাকরি খোঁজা শুরু করেছিল। উত্তর চব্বিশ পরগণার এই কলেজটায় ও ইন্টারভিউ দেয়। আরাধ্যাদি ওর পূর্ব পরিচিত। খাতা দেখতে গিয়ে পরিচয়। আরাধ্যাদির খুব ইচ্ছে ছিল ঋতিকে ওর কলেজে গেস্ট লেকচারার হিসেবে নেওয়ার। আপত্তি তুলেছিল নতুন ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপক। ভারি মুশকিল তো! সব জায়গায় ঋতি ঘোষাল ইন্টারভিউ দিতে গেলে তো অন্য কাউকে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। ও একসঙ্গে কটা কলেজে পড়াবে?
আরাধ্যাদি বলেছিল, স্যার, আসলে দমদমের কলেজটায় ওর অ্যাপ্রুভাল আসেনি। ফলে কলেজ ওকে মাঝে মাঝেই বসিয়ে দিচ্ছে। সেইজন্য ও আর একটা কলেজে গেস্ট লেকচারার হিসেবে ঢুকতে চাইছে।
না, না, এতো সুযোগ দেওয়া যাবে না আরাধ্যা। আরো তো ছেলেমেয়েরা আছে।
না স্যার, সুযোগ দিতে হবে না। ইন্টারভিউ নিয়ে আপনি যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাই হবে।
কিন্তু তারপরও চাকরিটা ঋতিরই হয়। কারণ ঋতির মতো ইন্টারভিউ আর কেউ দিতে পারেনি। চর্যাপদ থেকে জয় গোস্বামীর কবিতা – কোনো কিছু নিয়ে প্রশ্ন করেই ঋতীকে আটকানো যায়নি। ফলে চাকরিটা ঋতি পেয়েছে। এখানে সপ্তাহে তিনদিন আসতে হয়। চারটে করে ক্লাস থাকে। ক্লাস পিছু একশ টাকা দেয়। এই কলেজটি মর্নিং কলেজ। ঋতি সপ্তাহে তিনদিন এখানে আসে। তারপর এখান থেকে ট্রেন ধরে যাদবপুর বা কোনো লাইব্রেরিতে যায়। বাকি তিনদিন দমদমে যায়। ঋতির পরিশ্রম প্রচণ্ড বেড়েছে। ক্লান্তি ততোধিক। ভোরবেলা পাঁচটায় উঠে ছটার মধ্যে তাকে রেডি হয়ে বেরোতে হয়। সে যেন আর পারে না। পা দুটো তার চলে না। তবু জোর করে মনের বিরুদ্ধে সব কাজ করতে হয় তাকে। রবিবার সকালে ঋতি পড়ে পড়ে ঘুমোয়। নটা বেজে গেলেও উঠতে ইচ্ছে করে না। খেতে ভালো লাগে না। পোশাক আশাক ভালো লাগে না। কোনোরকম প্রসাধনী ব্যবহার করে না ঋতি। কেবল রোজ রাতের দিকে তার মিষ্টি খেতে ইচ্ছে হয়। মনে হয় প্লেটে করে অনেক মিষ্টি নিয়ে খায়। খেতে খেতে গা গুলিয়ে উঠবে বেশ! ঋতির মনটা তখন একটু ভালো লাগবে। এক একদিন সত্যি ঋতি মিষ্টির দোকানে ঢুকে একসঙ্গে চারটে পাঁচটা মিষ্টি খায়। তার খাওয়া দেখে মনে হয় সে অনেকদিন খেতে পায়নি। বড়ো বড়ো রসের মিষ্টি গোটা গোটা মুখে ফেলে গপগপ করে খেতে থাকে। ঠোঁটের পাশ দিয়ে রস গড়িয়ে পড়ে। ঋতি জিভ বের করে চেটে নেয়। কে দেখছে না দেখছে সেই নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই। মিষ্টিগুলো খেয়ে তার সাময়িক কিছুটা আনন্দ হয়। কিন্তু বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারে না সে আনন্দ। তারপর খানিকক্ষণ পর কেন যে তার আবার মন কেমন করে সে বুঝতে পারে না। স্টেশনের ওভারব্রিজ দিয়ে হাঁটার সময় ঋতি নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কি যে দেখে সেই জানে! ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে রেললাইনের দিকে তাকিয়ে থাকে। রোদ পড়ে লাইনটা ইস্পাতের ফলার মতো চকচক করে। একবার ওখানে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলে আর কিছু নেই। কোনো কষ্ট নেই। বাসে করে যাওয়ার সময় তার মনে হয় বাসটা যদি অ্যাক্সিডেন্ট করে! স্পট ডেড! ঋতি নিজেও জানে না সে সারাক্ষণ মরে যাওয়ার কথা ভাবে। আর কোনো চিন্তা নেই তার! পিএইচডির কাজ নিয়েও সে আর ভাবে না। কিচ্ছু জানার নেই তার। কিচ্ছু বোঝার নেই। শুধু মরে যাওয়ার আছে। তার মাথায় ঘোরে, ‘কোনদিন জাগিবে না আর/ জানিবার গাঢ় বেদনার/অবিরাম অবিরাম ভার/সহিবে না আর-’…
৯৪
অবিরাম বৃষ্টি পড়ুক আত্মজীবনীর পাতা জুড়ে
যে কথা অসমাপ্ত হয়ে আছে বৃষ্টিতে ধুয়ে যাক তার আখর
যে প্রেম অসম্পূর্ণ থেকে গেল ঘোলা হয়ে উঠুক তার মাটি
তার চোখের মায়ার কাছে আমি রেখে যাব আমার তীব্র অনীহা
তার আকুতির কাছে রেখে যাব আমার শ্মশান ভাবনা
তার শরীরের পাশে রেখে যাব নির্বাপিত যজ্ঞের ওম
তার গোপনকে আমি দিয়ে যাব অন্তরমহলের বন্ধ দরজা
তাই আত্মজীবনীর পাতায় পাতায় লিখে যাব দুর্বোধ্য কবিতা
বৃষ্টির অস্ফুট শব্দে জানিয়ে যাব আমার অপ্রেম যাপনের বেদনা।
খাতার পিছনে এই পংক্তিগুলো লিখে ঋতী বসেছিল। একমনে দেখছিল পংক্তিগুলোর দিকে… আস্তে আস্তে তার চোখদুটো জলে ভরে গেল। খাতায় ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে ভিজে যাচ্ছে। বুকের ভিতরে চাপ বেঁধে আছে তার। আজকাল ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারে না। বারবার মনে হয় স্নেহময়দার সঙ্গে কেন দেখা হলো! স্নেহময়দার পুরনো খাতার পিছনে লেখা ছিল, ‘এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া’! ঋতীর কেন মনে হয়েছিল গানের এই কথাটা তাকে উদ্দেশ্য করেই স্নেহময়দা লিখে রেখেছিল! স্নেহময়দা একদিন কথায় কথায় বলেছিল, ‘আজি বিজন ঘরে নিশীথ রাতে’ রবীন্দ্রনাথের এই গানটা স্নেহময়দার প্রিয় গান। ঋতি তারপর কতবার গানটা গাইল! বিজন ঘরে, নিশীথ রাতে তার পরাণবন্ধু তো তার হাতদুটো ধরল না! ঋতি কী ভীষণ একা রয়ে গেল! একাকিত্বই নিজের কাছে ঋতির একমাত্র পরিচয় হয়ে থেকে গেল! স্নেহময়দার নম্বরটা আজকাল কেমন যেন ভুল হয়ে যায়! মনে হয় সংখ্যাগুলো গুলিয়ে যাচ্ছে! ওই সংখ্যাগুলোই তো স্নেহময়দা! একটা মানুষের অস্তিত্ব হলো কতকগুলো সংখ্যা! একদিন অনেক রাতে ঋতির মাথার মধ্যে স্নেহময়দার নম্বরটা এরকমই জট পাকিয়ে গিয়েছিল। কিছুতেই পর পর সংখ্যাগুলো সাজিয়ে নিতে পারছিল না ঋতি। তার মনে হচ্ছিল আর কখনো, কোনোদিন স্নেহময়দার সঙ্গে ফোনে কথাটুকুও বলা যাবে না! হারিয়ে গেল স্নেহময়দা তার জীবন থেকে! বিছানায় ধড়মড় করে উঠে বসে ঋতির মনে হয়েছিল এক্ষুনি একবার স্নেহময়দার গলার স্বর শুনতে না পেলে ঋতি মরে যাবে! অন্ধকারে হাতড়ে মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে সময়ের বিবেচনা না রেখেই ঋতি স্নেহময়দার নম্বরটা অত্যন্ত সংশয় নিয়ে প্রেস করেছিল। ফোনটা বাজতে শুরু করলে ঋতির চমক ভাঙে। ঋতি তাড়াতাড়ি ফোনটা কেটে দেয়। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে। বাকি রাতটা টেনশনে ঋতির আর ঘুম আসেনি। আটটা বাজতে না বাজতেই সে দৌড়েছিল বাইরের ফোন বুথ থেকে স্নেহময়দাকে ফোন করে কথা বলতে। কারণ সেদিন রবিবার। স্নেহময়ের অফিস বন্ধ। অচেনা নম্বর থেকে ফোন পেয়ে স্নেহময় ফোনটা ধরলেও ঋতির গলার আওয়াজ পেয়ে কেটে দিয়েছিল। তারপর একটা এস এম এস করে স্নেহময়, দয়া করে আমাকে বাঁচতে দে! দয়া করে যোগাযোগ করিস না!
ঋতি বুঝেছিল ঋতি ভুল করেছে। অতো রাতে ফোন করা উচিত হয়নি। কিন্তু ঋতির সত্যিই নম্বরটা গুলিয়ে গেছিল। ঋতি ছটফট করছিল। মনে হচ্ছিল আর কোনোদিন স্নেহময়দার গলার স্বর…
এরপর স্নেহময় তিনমাস ঋতির সঙ্গে কথা বলেনি। সেই তিনটে মাস ঋতি যে যন্ত্রণা পেয়েছিল তার থেকে ঋতির মরণ ভালো ছিল! কত ঘটনা স্নেহময়দার সঙ্গে! তারিখ ধরে ধরে ঋতি সব বলে দিতে পারবে! সেই যে সেদিন ঋতির খুব আদর পেতে ইচ্ছে হয়েছিল! ঋতি মুখ ফুটে চেয়েছিল স্নেহময়দার কাছে। কিছুই না, দুটো চুমু লেখা এস এম এস! স্নেহময়দা ব্যস্ত বলে এড়িয়ে গেছিল। পরদিন যখন কথা হচ্ছে স্নেহময়দা বলে ফেলেছিল গতকাল দেরি করে ঘুমনোর কথা।
দেরি করে ঘুমোলে! মধুদিকে আদর করছিলে!
স্নেহময় আদুরে গলায় বলেছিল হুমম।
ঋতির মনে হয়েছিল এর থেকে নিষ্ঠুর আর কিছু হতে পারে! ব্যস্ত বলে আমাকে প্রত্যাখ্যান করল; আর সেদিনই মধুদিকে… ঋতি আর কথা বলতে পারেনি। আজকাল তার কান্নাগুলো কেমন হাহাকারের মতো শোনায়! মুখ বিকৃত হয়ে যায়! মনটাও তো তার বিকৃতই হয়ে গেছে। নইলে কেউ কোনো দম্পতির সেক্স করা নিয়ে প্রশ্ন করে! একেই কি পারভার্শান বলে! ঋতি তাহলে বিকৃত রুচির মানুষ হয়ে উঠছে। সত্যি তো, স্নেহময়দা মধুদিকে আর ওদের ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে গেলে ঋতির তো কষ্ট হয়! ঋতি কোনোদিন বেড়াতে যায়নি! ঋতি কোনোদিন সমুদ্র দেখেনি! পাহাড় দেখেনি। নৈঃশব্দ আর স্রোতোচ্ছ্বাসের পার্থক্য ঋতী জানে না। একলা ফ্ল্যাটে অন্ধকার ঘরে বসে ঋতি ভাবছিল তার কথা শোনার মতো কেউ নেই। সে একা। সারাদিন সে অপেক্ষা করে থাকে কখন একটা ফোন আসবে। কখনো কখনো নিস্তব্ধতা খুব অসহ্য হয়ে উঠলে ঋতী একটা কাজ করে। মা কাজ শুরু করার পর চঞ্চল মেসো একটা টাটা কোম্পানির ল্যান্ডফোনের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। তখনও মোবাইলে সরগর হয়ে ওঠেনি জনজীবন। সেই ল্যান্ড ফোনটা তো এখন আর খুব একটা কাজে লাগে না। ঋতি তবু তাতে একটা অল্পদামের কার্ড লাগিয়ে রাখে। মাঝে মাঝে নিস্তব্ধ ফ্ল্যাটে ওই ল্যান্ড ফোনটা থেকে ঋতী নিজের মোবাইলে ফোন করে। মোবাইলটা বাজতে থাকে। ঋতী একটা লাউড মিউজিক লাগিয়ে রেখেছে মোবাইলে। সেটা এতো জোরে বাজে যে মনে হয় কানে তালা লেগে যাবে। ঋতি ফোনটাকে বাজতে দেয়। মোবাইলটা বেজে ওঠার ওই কানফাটানো আওয়াজটা ঋতির ভালো লাগে। মনে হয় কেউ ডাকছে ঋতিকে। তার অনেক কথা আছে। ব্যস্ততা আছে ঋতির সঙ্গে কথা বলার। ঋতিকে সে চাইছে। ফোনের আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেলেই আবার সেই স্তব্ধতা! ঋতি ভাবে এভাবে সে কাকে ভোলাচ্ছে! নিজেকেই নিজের চোখ ঠেরে কোথায় পৌঁছোবে ঋতি শেষ পর্যন্ত! অ্যাসাইলামে! ঋতি বুঝতে পারছে ঋতি সুস্থ নয়। তার মানসিক স্থিতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ঋতী আবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমন সময় সত্যি সত্যি ফোনটা বেজে উঠল। ঋতি ভেবেছে স্নেহময়দা নিশ্চয়ই ফোন করেছে। কদিন কোনো যোগাযোগ নেই। আজ হয়তো সুযোগ পেয়েছে। ঋতি আর স্নেহময়ের দেখা হওয়া, কথা হওয়া সবটাই স্নেহময়ের সুযোগসুবিধে অনুযায়ী হয়! ঋতির ইচ্ছের কথা সেখানে বাহুল্য। তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরতে গিয়ে ঋতি দেখল স্নেহময় নয়, সত্যজিৎদা ফোন করেছে। সত্যজিৎদার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে যাদবপুরে। সত্যজিৎদাও পিএইচডি করছে। আর অন্য রাজ্যের একটি কলেজে পড়ায়। ঋতি ফোনটা ধরল।
সত্যজিৎদা খোঁজ নিচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গে সিএসসি বেরোলো কি না! কবে বেরোতে পারে ঋতি কিছু শুনেছে কি না!
ঋতি এ ব্যাপারে কিছুই জানে না।
সত্যজিৎদার গলায় হতাশা ঝরে পড়ল। বাবা মাকে ছেড়ে অতোদূরে সে আর থাকতে পারছে না। নিজের রাজ্যে কোনোদিন ফিরতে পারবে কি না জানে না সত্যজিৎ। এই নিয়ে তীব্র এক অনিশ্চয়তা গ্রাস করেছে সত্যজিৎকে।
ঋতি বুঝতে পারছিল সত্যজিৎদাও তার মতো একাকিত্বে ভুগছে। তবু তো ঋতি একটা পরিচিত পরিবেশের মধ্যে আছে। সত্যজিৎ তো সেটা থেকেও দূরে! ঋতি সত্যজিতের সঙ্গে পড়াশোনা, লেখালেখি, পিএইচডির কাজ এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করল। বেশি কিছু বলতে হলো না অবশ্য। সত্যজিৎ কথা বলতে ভালোবাসে। সত্যজিৎ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে লাগল। ঋতির লেখালেখি, সেমিনারে পেপার পড়া এসবের খুবই প্রশংসা করছিল সত্যজিৎ। ঋতিও সত্যজিতের কথা যাদবপুরে কিছু কিছু শুনেছে। সত্যজিৎ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। কথা হতে হতে বাকি সন্ধেটা কেটে গেল।
পরদিন থেকে সত্যজিৎ প্রায় রোজই ফোন করতে লাগল। কথা হতে লাগল ওদের।
৯৫
অনেকদিন পর পাবলিক সার্ভিস কমিশনে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের পোস্ট বেরিয়েছে। ঋতি খবরটা জানত না। সত্যজিৎ তাকে খবর দিল। ঋতি খুবই উৎসাহিত হয়ে উঠল। একটা এমসিকিউ পরীক্ষা হবে। তারপর ইন্টারভিউ। সত্যজিৎ আর ঋতি যৌথভাবে পড়াশোনা শুরু করল। সন্ধে থেকে দুজনে মিলে ফোনে কথা বলতে বলতে অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নগুলোকে বিভিন্ন টেক্সট থেকে দাগিয়ে রাখছিল। তারপর নিজেদের মতো মুখস্থ করছিল। তবে সবদিন যে পড়াশোনা হচ্ছিল এমন নয়। সত্যজিতের বাড়িতে বাবা – মা অসুস্থ। সেই নিয়ে নানারকম টেনশন আছে সত্যজিতের। সেইসঙ্গে ভিন্ রাজ্যে একা একা পড়ে থাকার যন্ত্রণা! সত্যজিৎ এক একদিন ভীষণই বিমর্ষ হয়ে পড়ে। রান্না করে না। খায় না। ঋতির কষ্ট হয়। ঋতি তখন সত্যজিৎকে নানা কিছু বোঝায়। ঋতির বোঝানোর ধরন দেখে মনে হয় সত্যজিৎ যেন তার খুব কাছের কেউ। বলে, সত্যদা, লক্ষ্মীটি, খেয়ে নিন প্লিজ!
আমি আর পারছিনা ঋতি! এই নানাখানা হয়ে বেঁচে থাকা আমি আর নিতে পারছিনা। আদৌ কোনোদিন রাজ্যে ফিরতে পারব আমি?
কেন পারবেন না সত্যদা? আপনি এতো ভালো স্টুডেন্ট! এই তো পিএসসি বেরিয়েছে। আমাদের ঠিক হয়ে যাবে দেখবেন!
ভালো স্টুডেন্টের সঙ্গে আজকাল আর চাকরি পাওয়ার সম্পর্ক নেই ঋতি। ভেতরে অন্য খেলা চলে।
সে চলুক! তবু সততার দাম আছেই। আপনি,আমি, আমরা ঠিক পারব, দেখবেন!
সেদিনের মতো উপরোধ অনুরোধ করে ঋতি সত্যদাকে খাওয়ায়। ফোন ধরে থাকে যতক্ষণনা সত্যদার খাওয়া হচ্ছে। পরদিন আবার দুজনে মিলে পড়তে বসে।
এর মধ্যেই সত্যজিৎ কলকাতায় এসেছিল। ঋতি সেই সুযোগে তার কলেজে একটা সেমিনার অ্যারেঞ্জ করে সত্যজিৎদাকে বক্তা হিসেবে ডেকেছিল। সত্যজিৎ ভালো ছাত্র হলেও ওর এখানে তেমন পরিচিতি নেই। ঋতি নিজের দায়িত্বে বক্তা হিসেবে তাকে ডেকে আনল। সত্যজিৎ দারুণ বক্তব্য রাখল। হৈ হৈ করে দিনটা কাটল তাদের। বাড়ি ফেরার পথে সত্যজিৎ আর ঋতি মিলে অনেকক্ষণ আড্ডা দিল রাস্তায় দাঁড়িয়ে। ঋতির ভালো লাগছিল। অনেকদিন পর মন খুলে কারো সঙ্গে কথা হচ্ছে। সবই পড়াশোনা,কেরিয়ার এসব নিয়ে কথা। ঋতির সাম্প্রতিক লেখালেখি নিয়ে খুব আগ্রহ। আর সত্যজিতের চর্চা উনিশ শতক নিয়ে। দুজনের মধ্যে আদান প্রদান চলে। সেদিন কথা বলতে বলতে অদ্ভুত একটা আবেশ তৈরি হচ্ছিল। ঋতির হঠাৎ খুব আনন্দ হচ্ছিল। এমন আনন্দ তার বহুদিন হয়নি! ঋতির নানাকিছু নিয়ে সত্যজিতের অ্যাপ্রিসিয়েশন ঋতিকে যেন ঘোরের মধ্যে ফেলে দিচ্ছিল। কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝেই চোখাচোখি হয়ে যাচ্ছিল ওদের। সত্যজিৎদার চোখে ঋতির জন্য মুগ্ধতা পড়ে নিতে ঋতির অসুবিধে হচ্ছিল না। মনের মধ্যে একটা সম্ভাবনা যেন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল। তাহলে কি সত্যজিতের ঘাটে নোঙর বাঁধবে ঋতি! সত্যজিৎদা স্নেহময়দার নাম না জানলেও বিষয়টা আবঝা আবঝা জানে! ফলে গোপন করার কিছুই নেই। সত্যজিৎ পড়াশোনায় এতো ভালো! ওর এখানে নিশ্চয়ই কিছু হয়ে যাবে। আর ঋতিও তো চেষ্টা করছে! দুজনের ওয়েবলেন্থ ম্যাচ করে ভীষণ ভালো! ভালোই তো! সত্যজিৎদাকে পেয়ে ঋতি আবার নতুন করে শুরু করবে। পুরনো সব ভুলে নতুন করে জীবনটাকে নিয়ে ভাববে! এতো নেগেটিভিটি ঋতির জীবনে এসে পড়েছে যে ঋতি চোখের সামনে শুধু অন্ধকার দেখে! আর সত্যজিৎ এই অন্ধকারে যেন সেই দারুচিনি দ্বীপ, যে দ্বীপ হাল ভাঙা নৌকার নাবিক দেখেছিল, যেমন করে বনলতা সেনকে কবি খুঁজে পেয়েছিলেন অন্ধকারে! ঋতি এসব ভাবে আর নিজের মনে হাসে। একটা আলগা আনন্দ লেগে থাকে তার ঠোঁটে।
সত্যজিৎ ফিরে গেছে। পৌঁছেই ফোন করেছে ঋতিকে। একটা দারুণ খবর আছে।
কি?
দেবযানীদি ফোন করেছিলেন। দেবযানীদি সত্যজিতের গাইড। উনি জানিয়েছেন, পিএসসির এবারের কমিটিতে উনি আছেন।
তাই না কি!
বললেন, এমসিকিউ পরীক্ষার জন্য কিভাবে পড়ব উনি বলে দেবেন।
আরে, এ তো সত্যিই দারুণ ব্যাপার! ওঁর গাইডেন্স পেলে কে আটকায় আর!
আগামীকাল ফোন করতে বলেছেন।
আমাকে জানাবেন প্লিজ উনি কি বললেন!
আরে সে আর বলতে! অবশ্যই!
পরদিন ঋতি অপেক্ষা করছে সন্ধে থেকে সত্যজিৎ ফোন করবে বলে। কিন্তু প্রায় পৌনে এগারোটা বাজে। সত্যজিৎ ফোন করছে না। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে ঋতি ফোন করল সত্যজিৎকে। হ্যালো? ফোন করেছিলেন?
হ্যাঁ, করেছিলাম। সত্যজিতের গলাটা কিরকম ম্রিয়মাণ শোনায়।
কী বললেন?
বললেন, বাড়িতে গেস্ট এসেছে। কাল কথা বলবেন।
ও, এবার ঋতির গলাটাও একটু ম্লান শোনাল।
পরদিন ঋতি আবার অপেক্ষা করছে। সত্যজিৎ ফোন করছে না। সাধারণত সত্যজিৎই দিনের মধ্যে দু তিনবার ফোন করে। দুদিন ধরে করছেনা কেন! মনখারাপ! দেবযানীদি তবে কি…ঋতি আর অপেক্ষা না করে নিজে থেকেই ফোন করল।
সত্যজিৎ জানাল, দেবযানীদি সিলেবাসটা জানাল।
সিলেবাস! সে তো ওয়েবসাইটেই আছে!
হ্যাঁ, ওটাই আবার বললেন!
তাই! প্রশ্ন কিরকম হতে পারে সে বিষয়ে কিছু বললেন না!
নাহ্! সত্যজিতের গলায় হতাশা স্পষ্ট।
ঋতির মনটাও দমে গেল। যাক্, আমরা তো নিজেদের মতো করে প্রিপারেশন নিচ্ছি।
হ্যাঁ, সেই আর কি!
কিন্তু সত্যজিৎ এরপর আর ঋতির সঙ্গে মিলে যে খুব প্রিপারেশন নিল, এমনটা নয়।
দেখতে দেখতে পরীক্ষা এসে গেল। ওদের দুজনের একই সেন্টারে পরীক্ষা পড়েছে। ট্রেনে করে যাওয়ার সময় সত্যজিৎ দু একটা প্রশ্ন করল ঋতিকে। ঋতি উত্তর দিল। পরীক্ষার হলে গিয়ে ঋতি দেখল সেই প্রশ্নগুলো পরীক্ষায় এসেছে। ঋতি ভাবল সত্যজিৎদার দারুণ অনুমান ক্ষমতা! এগুলো নিয়েই তো ট্রেনে কথা বলতে বলতে এলাম আমরা!
পরীক্ষা শেষে ওরা দুজনেই খুব খুশি। দুজনেরই পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। আনন্দ করে দুজনে বাড়ি ফিরল।
সত্যজিৎ এখন কয়েকটা দিন কলকাতায় আছে। ঋতি এই সুযোগে একদিন সত্যজিৎকে নেমতন্ন করল নিজের বাড়িতে। শ্রী আর অনন্ত ইতিমধ্যেই এই ছেলেটির কথা শুনেছে। ওরাও বোধহয় মনে মনে কিছু আন্দাজ করেছে। ওরা সাদরে অভ্যর্থনা জানাল সত্যজিৎকে। শ্রী সাধ্যমতো রান্না করল। অনন্ত নিজের পরিবারের গল্প করছিল সত্যজিতের সঙ্গে। আর ঋতির হাতদুটো অনেকক্ষণ হলো ঠাণ্ডা হয়ে আছে। ভেতরে ভেতরে অদ্ভুত আনন্দ, ভয়, উদ্বেগ সব মিলিয়ে একটা অনুভুতি হচ্ছে। বাবা-মার কেমন লাগবে সত্যজিৎকে কে জানে! ঋতি চুপ করেই আছে। আর সত্যজিৎ প্রায় কথা বলছেই না। যে মানুষ এতো কথা বলতে ভালোবাসে সে সংক্ষেপে সঙ্গত করা ছাড়া বাড়তি কোনো কথা বলছে না। উল্টে মারাত্মক ঘামছে! অথচ তেমন গরম নেই। ঋতি বুঝতে পারছে সত্যজিৎও মনে মনে টেনশন করছে! ঋতির বাবা মা ওকে অ্যাকসেপ্ট করবে কি না এই নিয়ে হয়তো দ্বিধায় আছে। এতোটাই ঘামছে সত্যজিৎ যে ভালো করে খেতেই পারল না। বিকেল হতেই কাজ আছে বলে বেরিয়ে পড়ল।
শ্রীও বিকেলবেলা দোকানে গেল।
অনন্ত আর ঋতি কথা বলতে বসল। সত্যজিৎকে নিয়েই কথা হচ্ছে। সত্যজিৎ ব্রাহ্মণ। উচ্চবংশ। ঋতিরও মনে হয় সত্যজিৎকে পছন্দ। অনন্ত আর রিস্ক নিতে চাইল না। যদি ঋতি চায় এই ছেলেটির সঙ্গে নম নম করে ঋতির বিয়ে দিয়ে দেবে অনন্ত। পিএসসিতে ঋতির চাকরিটা হয়ে গেলেই বিয়েটা লাগিয়ে দেবে অনন্ত। অনন্ত তাই সরাসরিই ঋতিকে জিজ্ঞেস করল, তোর সঙ্গে আলাদা করে সত্যজিতের কোনো কথা হয়েছে?
না, তেমন কিছু নয়। পড়াশোনার কথাই তো হয়!
সত্যজিৎকে তোর পছন্দ? তেমন হলে না হয় আমিই কথা বলি!
ঋতি জানে সত্যজিৎ অত্যন্ত ভদ্র মানুষ। ও মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইবে না হয়তো! বাবা কথা বললে অসুবিধে তো কিছু নেই! ঋতি রাজি হয়ে গেল।
অনন্ত সত্যজিৎকে ফোন করল। এটা ওটা কথার পর আসল কথা পারল।
সত্যজিৎ প্রথমটায় একটু চুপ করে থেকে তারপর বলল, আসলে কাকু আমার পরিস্থিতি এতোটাই খারাপ হয়ে আছে যে আমি এখনই কিছু ভাবতে পারছি না। আমার বাবা মা অসুস্থ। আমি এখানে থাকি না। এই দুটো স্থানিক দূরত্ব নিয়েই আমি নাজেহাল। এখনই কোনো কমিটমেন্টে যাওয়ার মতো অবস্থা আমার নেই।
অনন্ত বুঝতে পারল ভিন্ রাজ্য থেকে নিজের রাজ্যে ফিরে না আসা পর্যন্ত সত্যজিতের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। অনন্ত বলল, ঠিক আছে। তোমরা দুজনেই এখন কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। আগে সেটা সামলে নাও, তারপর না হয় সিদ্ধান্ত নিও।
সত্যজিৎ একথার আর কোনো উত্তর করল না।
পরদিন বিকেলের দিকে একটা আননোন নাম্বার থেকে ঋতির কাছে একটা ফোন এলো।
হ্যালো? ঋতি বলছিস?
হ্যাঁ! ঋতির উত্তরে প্রশ্নচিহ্ন স্পষ্ট।
বল্ তো আমি কে বলছি!
ঋতিও কৌতূহলী হয়ে পড়েছে। কে কথা বলছেন! ঋতির গলাটা খুব চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু ঠিক যেন বুঝতে পারছে না।
রানিদিকে মনে আছে?
ওওওও, রানিদি! আরে! কেমন আছ?
এই চলছে রে!
তুমি তো এসএসসি পেয়েছ না রানিদি? কোথায় গো তোমার স্কুল?
বাড়ির কাছেই রে…
ও, তারকেশ্বরে?
নাহ্, তারকেশ্বরে থাকি না রে। বাবা মার কাছেই থাকি।
ঋতি অবাক হয়। তবে যে শুনেছিল রানিদি বিয়ে করেছে।
ঋতিকে চুপ করে থাকতে দেখে রানিই বলে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে।
ঋতি প্রায় আৎকে ওঠে, ডিভোর্স!
হ্যাঁ রে, বিয়ের পর নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছি। যৌন হেনস্থা থেকে আরম্ভ করে কি না হয়নি!
মানে! তোমরা তো ভালোবেসে…
ভালোবেসে আর কি… বাবা মাই দেখে বিয়ে দিয়েছিল। তারপর তো জানা গেল হ্যান্ডিক্যাপ্ট।
হ্যান্ডিক্যাপ্ট?
হ্যাঁ, একটা কানে কম শুনত।
ও।
তারপর নানারকম অত্যাচার রে… সে অবর্ণনীয়। যাক্, বাদ দে, তোর তো দারুণ খবর! পিএইচডি, পেপার পাবলিকেশন, সেমিনার, কলেজ সব নিয়ে চুটিয়ে আছিস তো!
ঋতি হালকা হাসল। চাকরি পাইনি এখনো রানিদি!
সে পেয়ে যাবি। তোর সব খবরই আমি রাখি।
তাই? কীভাবে?
সে আছে একজন!
কে গো! বলো! ঋতির কৌতূহল হচ্ছে।
তুই চিনিস তাকে।
তাই! কে বলো না!
হঠাৎই রানির গলার স্বরটা একটু নরম হয়ে আসে। তোকে একটা কথা বলব ঋতি?
হ্যাঁ বলো।
সত্যজিৎকে একটু দেখে রাখিস।
ঋতি অবাক হয়। ভাবে সত্যজিৎদার সঙ্গে রানিদির যোগাযোগ হলো কীভাবে? আর রানিদি এভাবেই বা সত্যজিৎদার কথা বলছে কেন!
রানিই বলে ওঠে, তোর একটু সময় হবে? একদিন দেখা করবি। অনেক কথা বলার আছে তোকে।
ঋতি রাজি হয়।
কয়েকদিন পর ঋতির সঙ্গে দেখা হলো রানির। এর মধ্যে ঋতি সত্যজিৎকে জিজ্ঞেস করেছে রানিদির কথা।
সত্যজিৎ বলেছে, ওরা একসঙ্গে পার্টি করত। সেই সূত্রে পরিচয়। আর কথা বাড়াতে চায়নি। ফলে ঋতির মধ্যে একটা অস্বস্তি শুরু হয়েছে। রানাদি সেদিন যেভাবে সত্যজিৎদার কথা বলল সেটা তো কেবল পরিচয় নয়। তার মধ্যে আরো কিছু আছে। সত্যজিৎদা ব্যাপারটা বলতে চাইল না। ওদিকে রানি বেশ জোর করছে দেখা করার জন্য। ঋতির মধ্যে একটা দুর্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটা যেন ঠিক জোর পাচ্ছে না। অবশ্য সেটা মিথ্যে হলেই ঋতি বাঁচে। কিন্তু…
রানির সঙ্গে দেখা হতেই রানি গড়গড় করে সব বলে গেল। যেন বলার জন্য অপেক্ষায় ছিল রানি। রানির স্বামী ইমপোটেন্ট। তার যৌনলালসাকে সে বিকৃতির পর্যায়ে নিয়ে গেছিল। রানির যৌনাঙ্গে সাঁড়াশি ঢুকিয়ে দেওয়া থেকে কিছুই বাদ যায়নি। রানি শেষপর্যন্ত ডিভোর্স নেয়। সত্যজিতের সঙ্গে রানির বহুদিনের পরিচয়। একদিন হঠাৎই কলেজস্ট্রিটে দুজনের দেখা হয়ে যায়। তখনও রানির ডিভোর্স হয়নি। রানি প্রায় সবই বলে সত্যজিৎকে। সেখান থেকেই তাদের সম্পর্কের সূত্রপাত। ইতিমধ্যে স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সাহায্যের জন্য রানি সত্যজিৎকে ফোন করে। সত্যজিৎ নানাভাবে উদ্বিগ্ন হয় এবং সাহায্য করে। তারপর রানির ডিভোর্স হয়। এবার সত্যজিতের সঙ্গে রানির সম্পর্কে সিলমোহর দেওয়ার পালা। কিন্তু বেঁকে বসেন সত্যজিতের মা। তিনি একমাত্র ছেলের বিয়ে ডিভোর্সি মেয়ের সঙ্গে দেবেন না। সত্যজিৎ মায়ের বিরুদ্ধে যেতে চাইছে না। কারণ মায়ের শরীর ভালো নেই। এই পরিস্থিতিতে আরো জটিলতা তৈরি হয় যখন রানি প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ে। সত্যজিৎ সেই সন্তানের বাবা। রানি বলে, তুই ভাবতে পারবিনা ঋতি, আমি একা একা অ্যাবর্শান করিয়েছিলাম। সত্যজিৎ নেই তখন কলকাতায়। আমার টুইনবেবি ছিল।
ঋতি হাঁ করে এসব কথা শুনল। ভাবল এতো কিছু যখন চলছে তখন সত্যজিৎদা আমার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে চাইলেন কেন! নাহ্, সত্যজিৎদা মুখে কোনোদিন কিছু বলেননি। কিন্তু দিনের মধ্যে বারবার ফোন, রাতে অনেকক্ষণ অবধি কথা বলা, চোখের অভিব্যক্তি, নিজের একান্ত ব্যক্তিগত সমস্যার কথা আলোচনা করা, সর্বোপরি এতো নিবিড় মেলামেশা… এ থেকে তো ঋতির মধ্যে একটা এক্সপেকটেশন তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক! সত্যজিৎদা এসব কেন করলেন! ঋতির মনে হচ্ছিল জীবন তাকে আবার একবার খাদের ধারে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এবার আর ঋতি সামলাতে পারবেনা। এবার পতন অনিবার্য।
৯৬
রানিদির সঙ্গে দেখা করে আসার পর দুদিন কেটে গেছে। সত্যজিৎদা ফোন করেনি। রানিদিও আর যোগাযোগ করেনি। ঋতি সেদিন বাড়ি ফিরে গুম মেরে বসেছিল কিছুক্ষণ। বারবার তার মনে হচ্ছিল, তার সঙ্গেই এমন সব ঘটনা ঘটছে কেন! মানুষের জীবনে কোনো একটা দিকে তো একটু ভরসা থাকে। কিন্তু ঈশ্বর তার সবদিকগুলোই এমন শূন্য করে দিচ্ছেন কেন! তার কি অপরাধ! জীবন তার কাছ থেকে আর কত পরীক্ষা নেবে! ঋতির চোখদুটো জলে ভরে যাচ্ছে আবার। মুখটা কালসিটে মেরে গেছে। ঋতি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু হাতে মুখ ঢেকে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
দুদিন পর সত্যজিৎ ফোন করল। ঋতি স্বাভাবিকভাবেই ফোনটা ধরল। হ্যাঁ বলুন।
কি খবর! কোনো যোগাযোগ নেই!
আপনি ব্যস্ত ভেবে আমি আর যোগাযোগ করিনি।
রানির সঙ্গে খুব আড্ডা দিয়েছ তো?
হ্যাঁ, অনেকদিন পর কথা হলো। অনেককথা জানলাম।
রানির সঙ্গে আমার বহুদিনের পরিচয়। ইউনিভার্সিটির দিনগুলোতে। তারপর আবার ওর বিয়ের পর দেখা হয়েছিল। ও যে কেন একদিন রাতে বিপদে পড়ে চুপিচুপি আমাকে ফোন করেছিল, আমি জানি না। বাবা মাকে ফোন না করে আমাকে কেন আমি বুঝিনি। এখনো জানিনা।
আপনি তো ওর সন্তানের বাবা। যদিও সে সন্তানকে জন্ম দেওয়া ওর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
একথার উত্তরে সত্যজিৎ চুপ করে থাকল একটু। তারপর বলল, ঋতি, আমি একজন অ্যাডাল্ট। আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও এইটুকু বোধ অন্তত আছে যে আমি কতদূর এগিয়েছিলাম আর তার পরিণতি কি হতে পারে!
তার মানে!
এর থেকে পরিষ্কার করে আমি তোমাকে কিছু বলতে পারব না ঋতি। তুমি বুঝে নাও।
ঠিক আছে বলতে হবে না। কিন্তু আপনি যখন এ ব্যাপারে এতোটাই শিওর তখন ওকে বলছেন না কেন! এ তো রীতিমতো ব্ল্যাকমেল!
সত্যজিৎ বলল, আমার বাড়িতে এই সম্পর্কটা কেউ মেনে নিচ্ছে না।
আপনি রানিদিকে ভালোবাসেন?
ভালোবাসতাম ঋতি। কিন্তু দিনের পর দিন ও যেভাবে আমাকে নানাভাবে ইন্স্টিগেট করে গেছে, আমি আর এই প্রতিদিনের উদ্বিগ্নতা, উৎকন্ঠা নিতে পারছিনা। যতদিন ও শ্বশুরবাড়িতে ছিল ততদিন স্বামীর অত্যাচারের কথা ও আমাকেই দিনের পর দিন বলে গেছে। সেখান থেকে ওর প্রতি আমার একটা সিমপ্যাথি তৈরি হয়েছিল। আমি সেটাকেই ভালোবাসা ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে ওর আমাকে বিয়ের জন্য জোর করা, ওর প্রেগন্যান্সি সবটা মিলিয়ে আমি ঘেঁটে গেছি ঋতি!
আপনাকে একটা কথা বলি সত্যজিৎদা। ওর বিয়েটা কিন্তু প্রেমের বিয়ে। এবং বিয়ের আগে থেকেই ওদের একটা শারীরিক সম্পর্কের জায়গা তৈরি হয়েছিল। ওরা একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল। সেখানেই…. ওর স্বামী ইমপোটেন্ট হলে তখনই তো বোঝা যেত!
সে কি আর আমি বুঝিনি ভেবেছ ঋতি! ও হাইস্কুলের টিচার। আর ওর বর প্রাইমারির। প্রেমের বিয়ে না হলে এটা সম্ভব!
আপনি যখন সবই বুঝছেন তখন এরকম একটা সম্পর্কের মধ্যে আছেন কেন! কারো প্রতি দয়া করে তার উপকার করা যায়। ভালোবাসা যায় না। আর আপনাদের সম্পর্কের মধ্যে ইতিমধ্যেই মিথ্যে, ব্ল্যাকমেইলিং এসব বাসা বেঁধেছে! এই সম্পর্ক হলেও টিকবে কতদিন! আপনার সঙ্গে আমার একটা যোগাযোগ তৈরি হয়েছে বলেই রানিদি এতোদিন বাদে যোগাযোগ করে আমাকে এসব কথা বলল। যাতে আমি অন্য কোনো এক্সপেকটেশন তৈরি করে না ফেলি। তাই তো!
হ্যাঁ, সেরকমই তো মনে হচ্ছে।
শুনুন সত্যজিৎদা, সম্পর্ক নিয়ে এর আগেই আমি জটিল পরিস্থিতির শিকার হয়েছি। সেটা আমি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আর কোনো জটিলতা আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। আমি নিজেকে আর কষ্ট দিতে চাই না। তার থেকে আমার একাকিত্ব ভালো। ঋতি কথাগুলো বলল বটে কিন্তু তার বুক কাঁপছিল। সে মনে মনে জানে যে সে মিথ্যে বলছে। তার কষ্ট হচ্ছে। সত্যজিতের প্রতি তার সামান্য হলেও দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ঋতি সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাটিয়ে উঠবে। স্নেহময়দাকে মনে মনে আঁকড়ে রেখে যন্ত্রণা ছাড়া ঋতি আর কি পেল! আবার একটা ত্রিকোণ সম্পর্ককে সে তার জীবনে প্রশ্রয় দেবে না। কিছুতেই না।
এসব চলতে চলতেই পিএসসির লিখিত পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলো। সত্যজিৎ লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছে। সেকথা জানিয়ে সত্যজিৎই ঋতিকে ফোন করল। ঋতি স্বভাবতই নিজের কথা জানতে চাইল। সত্যজিৎ বলল, সার্ভার ডাউন আছে। সবার রেজাল্ট দেখাচ্ছে না। ঋতি সেদিন রাতে প্রায় একটা অবধি চেষ্টা করল। কিন্তু তার রেজাল্ট দেখা গেল না। শ্রী আর অনন্তও চিন্তায় পড়ে গেছে। মেয়েটা অনেক আশা করে আছে। পাশ করবে তো!
ঋতি সারারাত ঘুমোতে পারল না। ভোর হতে না হতেই আস্তে আস্তে উঠে দরজা খুলে নিজেদের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে ধোপাদের ঘরের সামনেটায় দাঁড়িয়ে আবার ওয়েবসাইটে রেজাল্ট দেখার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু দেখাচ্ছে না। তার রোল নম্বর লিখে সার্চ দিলে কোনো পেজ খুলছে না। সত্যজিৎদারটা খুলছে। তারটাই কেবল খুলছে না। ঋতি বুঝতে পারছে না কি হলো! তার তো অবশ্যই পাশ করার কথা। তাহলে কি নেটওয়ার্কের জন্যই সমস্যা হচ্ছে!
ওদিকে শ্রী ঘুম ভেঙে দেখে মেয়েটা পাশে শুয়ে নেই। শ্রীর বুকটা ছ্যাৎ করে উঠেছে। পিএসসির রেজাল্ট নিয়ে এতো টেনশনে আছে ঋতি। হয়েছে কি না তাই তো বোঝা যাচ্ছে না। ওর মনের যা অবস্থা! ঝোঁকের মাথায় কিছু করে বসল না তো! শ্রী অনন্তকে ডেকে তুলে বলল, ঋতি কোথায়!
কোথায় মানে! অনন্ত ঘুম চোখে বুঝতে পারছে না।
ঋতি ঘরে নেই তো!
নেই মানে! কোথায় গেল এতো সকালে!
শ্রী আর উত্তর না দিয়ে বাথরুমটা একবার দেখে নিয়ে বারান্দায় এসেই দেখতে পেল ঋতি উল্টোদিকে ধোপাদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রী যেন ধরে প্রাণ ফিরে এলো। মেয়েটা এতো ডিস্টার্ব হয়ে আছে! কি যে চলছে ওর মনের ভেতরে! সত্যজিতের সঙ্গে সম্পর্কটাও এরকম একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল!
ঋতি বারান্দায় মাকে দেখতে পেয়ে ঘরে ঢুকে এলো। ও তখনও ভাবছে নেটওয়ার্কের জন্যই ওর পেজটা খুলছে না। ওর তো হবেই। পাশ ও করবেই। ঋতি অপেক্ষা করতে লাগল দশটা বাজলে সাইবার ক্যাফে খুললে ও যাবে। ভোর পাঁচটা থেকে সকাল দশটা! অনন্ত অপেক্ষা যেন! ঋতি ছটফট করছে। অনন্ত আর শ্রী ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা আর পজিটিভ কিছু ভাবতে পারছে না। মেয়েটা এবার কি করবে! যদিও ঋতির সামনে এসব কিছুই বলা যাবে না। অনন্ত আর শ্রী যেন দমবন্ধ করা একটা পরিস্থিতিতে আটকে পড়েছে। আর ঋতি এই মুহূর্তে অন্য কিছু ভাবছে না। কখন দশটা বাজবে সেটাই ক্রমাগত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছে!
সকাল থেকে চাটুকুও খায়নি ঋতি। অপেক্ষা অপেক্ষা আর অপেক্ষা।
দশটা বাজতে তখনও মিনিট দশেক বাকি। ঋতি ছুটল। সাইবার ক্যাফে তখনও খোলেনি। ঋতি দাঁড়িয়ে আছে।
ছেলেটা আসতেই ঋতি ওকে হুড়মুড় করে সব বলতে লাগল।
ছেলেটা বুঝতে পারছে দিদি খুবই উতলা হয়ে আছে রেজাল্টটা নিয়ে। ও তাড়াতাড়ি কম্পিউটার অন করল।
ঋতির মনে হচ্ছে এতো সময় লাগছে কেন! উফফফ!
যাই হোক। ছেলেটির কম্পিউটারেও ঋতির পেজটা খুলল না। ছেলেটি বলল, দিদি তুমি পাশ করলে অটোমেটিকালি এখানে একটা কাগজ ডাউনলোড হতো যেটা নিয়ে তুমি ইন্টারভিউ দিতে যেতে পারতে! সেটা হচ্ছে না মানে রিটিন এ তুমি পাশ করোনি।
ঋতি খানিকক্ষণ ভ্যাবলার মতো ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বাড়ি ফিরে এলো। ওর রকমসকম দেখেই শ্রী আর অনন্ত যা বোঝার বুঝেছে।
ঋতি এসে চুপ করে বসে থাকল। এই পরীক্ষার শুরু থেকে যা যা হয়েছিল সব ওর মনে পড়ছিল। সত্যজিৎদা আর ঋতি একসঙ্গে পড়াশোনা শুরু করেছিল। দেবযানীদির কথা সত্যজিৎ খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিল। তারপর একেবারে চুপ করে যায়। আর একসঙ্গে পড়াশোনাও ওরা করেনি। তারপর থেকেই পরীক্ষা নিয়ে কথা বলতে গেলে সত্যজিৎদা নানা সমস্যার কথা বলে এড়িয়ে গেছে। যেদিন পরীক্ষা সেদিন ট্রেনে যেতে যেতে সত্যজিৎদা যে প্রশ্নগুলো জিজ্ঞেস করেছিল সেগুলো সব পরীক্ষায় এসেছিল। সব কটা অ্যাসাম্পশান মিলে গেছিল! সবই কি অনুমান ছিল! না কি….
যদি ধরেও নেওয়া যায় সত্যজিৎদা প্রশ্ন জানত তাতে ওর চান্স পাওয়াটা সিকিওর হয়। ঋতি প্রশ্ন না জানলেও পরীক্ষা ভালো দিয়েছিল। তাও ঋতির হলো না কেন! তাহলে কি ঋতি যতটা ভাবছে ষড়যন্ত্রটা তার থেকেও বড়ো। একজনকে সুযোগ পাইয়ে দেওয়া হলো। আর একজনকে ইচ্ছে করে বাদ দিয়ে দেওয়া হলো! কিন্তু কেন! ঋতি তো সত্যজিৎকে নিজের কম্পিটিটর মনেই করে না। সত্যজিৎ তার থেকে অনেক ভালো পড়াশোনায়। এটাই তো ঋতি এতোকাল ভেবে এসেছে। কিন্তু সত্যজিৎ! সত্যজিৎ তাহলে অন্যরকম ভাবে! সেইজন্যই ঋতিকে পথের কাঁটার মতো উপড়ে ফেলা হলো! আর এই যে রানিদিকে নিয়ে এতো অভিযোগ সত্যজিৎদার! এই যে ঋতিকে কনফিডেন্সে নিয়ে এতো কথা সত্যজিৎ বলল! এসব মিথ্যে! বানানো! অভিনয়! আসল সত্যিটা তাহলে এই! নির্লজ্জ একটা মিথ্যাচার!
কয়েকদিনের মধ্যেই ইন্টারভিউ হয়ে পিএসসির চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হলো। সত্যজিৎ চৌধুরী পিএসসিতে ফার্স্ট হয়েছে। ঋতির আর কিছুই বুঝতে বাকি থাকল না।
৯৭
এক একদিন সারারাত ঘুম আসে না। ঘর-বাড়ি জুড়ে ভূতের মতো ঘুরে বেড়াতে হয়। এ ঘর, ও ঘর, সে ঘর… ঘর জুড়ে জল থইথই করে। নোনা জল গোড়ালি ভিজিয়ে দেয়। ঠিক তখনই সিন্দবাদ এসে হাতে হাল ধরিয়ে দেয়। বলে, চলো রান্না চড়াই। কি বিশাল আয়োজন তার… হালের মতোই মস্ত খুন্তি তার… বলে, মহাক্ষুধা আর মহাশূন্য, এই তো জীবন। চলো আবার রওনা দি মহাশূন্যের পথে… কিন্তু সেই ছোটবেলার মতোই তার মাটি কাঁপে… মাটি,গাছ সব… সব হঠাৎ বিরাট তিমি হয়ে উলটে পালটে দেয়… আর ঠিক তখনই আকাশ থেকে উড়তে উড়তে নামে সিমন ম্যাগাস…. হা হা করে হাসে, ওগো এই তো মানুষের জীবন, নিরন্তর পতন আর নিরন্তর পচন… আমি বিহ্বল হয়ে উঠি! তবে যে এতো শুদ্ধি চতুর্দিকে!! সব মিথ্যে!! সব?? সিমন কবরের মাটিতে শুয়ে শুয়ে বলে সব ভেল্কি!
মিশরের বাজারে বিকোয় এসব, গেলেই শেখা হয়ে যায়!
রবিশঙ্কর বলের একটা উপন্যাস পড়তে পড়তে এই কথাগুলো ভাবছিল ঋতি। নিজের ক্লান্ত শরীর, মন নিয়ে নিরন্তর পতন আর নিরন্তর পচনের দিকেই এগিয়ে চলেছে ঋতি। সত্যজিতের ঘটনা ঋতিকে একটা অদ্ভুত সত্যির সামনে দাঁড় করিয়েছে। ঋতি খেয়াল করল সত্যজিৎ তার উদ্দেশ্য বিধেয় নিয়ে সামনে আসার পর থেকেই ঋতির জীবনে স্নেহময় যেন আরো যন্ত্রণা নিয়ে ফিরে এলো! আবার স্নেহময় জনিত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠাগুলো ফিরে আসছে! স্নেহময়কে না পাওয়ার বেদনা, স্নেহময়ের জন্য আকুলতা যেন দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এলো ঋতির জীবনে! সেইসঙ্গে ঋতি অস্থির হয়ে উঠেছে তার শরীর নিয়ে! শরীরটা তার জ্বলে যাচ্ছে! বাসনার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে ঋতির সমস্ত চেতনা। নিজেকে পীড়ন করেও তার মুক্তি নেই! শরীর চাই! এখনি তার শরীর চাই! ঋতি অধ্যাপক চন্দ্রকে ফোন করল। সেই যে লেখাটা জমা পড়েছিল তার আর কোনো খোঁজ নেই! ঋতি সত্যজিতে এতোটাই মগ্ন হয়ে ছিল যে অধ্যাপক চন্দ্রের কথা একরকম ভুলতে বসেছিল। এইবার তার মনে হলো এমন একজন এই পৃথিবীতে আছে যে তাকে চেয়েছিল! মনটাকে চেয়েছিল কি না ঋতি জানে না! শরীরটা অবশ্যই চেয়েছিল।
মন! মন তো তার নেই! মনটাকে সে বাঁধা রেখেছে সেই যে সেই প্রথম প্রেমের কাছে। তার আর নড়চড় নেই! ঋতি সত্যজিৎকে নিয়ে নতুন করে শুরু করতে চেয়েছিল! কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে তার জীবনে নতুন বলে আর কিছু নেই। সবই পুরনো প্রেমের হ্যাংওভার! কিন্তু শরীর! শরীর তো শুচিতা, পবিত্রতা এসব বোঝে না! যখন শরীর পেতে ইচ্ছে করে তখন আকাঙ্ক্ষা সর্বগ্রাসী হয়ে ছোবল মারে সর্বত্র।
অধ্যাপক চন্দ্র এতোদিন পর ঋতির ফোন পেয়ে খুবই আহ্লাদিত হলেন। তার কামুকতাও তার গলার স্বরে স্পষ্ট হয়ে উঠল!
ঋতি পরেরদিনই দৌড়োলো অধ্যাপক চন্দ্রের বাড়ি।
অধ্যাপক চন্দ্র অদ্ভুত একটা পারফিউম ব্যবহার করেন। মিষ্টি চড়া গন্ধ। ঘরে ঢুকেই গন্ধটা ঋতির নাকে লাগল। এ গন্ধ তার পরিচিত। কিন্তু গন্ধটার মধ্যে যে একটা মাদকতা আছে সেটা ঋতি আজ টের পেল। অধ্যাপক চন্দ্র কোনো কথা না বলে ঋতির ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলেন। ঋতির মনে হচ্ছে অমৃত ছড়িয়ে পড়ছে তার শরীর জুড়ে। বেশ অনেকটা সময় চুমু খাওয়ার পর অধ্যাপক চন্দ্র ঋতিকে সোফায় বসিয়ে পিঠে একটা হাত রেখে গল্প করতে লাগলেন। ঋতি কথা বলছে। কিন্তু তার মনে হচ্ছে কতক্ষণে সে নিজের নগ্ন শরীরটা দেখাবে অধ্যাপক চন্দ্রকে। সে ছটফট করছে দেখে অধ্যাপক চন্দ্র নিজেই বললেন, তোমার মনে হচ্ছে না কতক্ষণে তুমি পোশাক খুলবে?
ঋতি হাসল।
আগে ওপর থেকে আদর করি। তারপর…
অধ্যাপক চন্দ্র এবার ঋতির বুকে হাত বোলাতে লাগল। বাবা! তোমার কি ভরাট বুক গো!
ঋতি বলল, সুন্দর সোনা?
খুউব সুন্দর সোনা।
অধ্যাপক চন্দ্র চুড়িদার ব্রা এর ওপর থেকেই ঋতির নিপলে সুড়সুড়ি দিতে লাগল। নিপলটা জামার ওপর দিয়ে সজাগ হয়ে উঠেছে।
ঋতি ভিজে গেছে। ও আর পারছে না। ঋতি হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল অধ্যাপক চন্দ্রকে। অধ্যাপক চন্দ্র এবার ঋতির পিঠের জামাটার ভিতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ব্রা এর স্ট্র্যাপটা খুলে দিল। তারপর ঋতিকে সোজা করে বসিয়ে দুহাতের দু আঙুল দিয়ে ঋতির নিপল খুঁটতে লাগল। ঋতি বেশিক্ষণ সোজা হয়ে বসতে পারল না। গলে পড়ে গেল সোফার পিছনের অংশে। তার চোখ বন্ধ। অধ্যাপক চন্দ্র এবার ঋতির জামা খুলে ওর নিপল ঠোঁটে করে টানতে লাগল। ঋতির বুকে কাঁটা দিয়ে উঠেছে। ঋতি জড়ানো গলায় বলে উঠল পুরো বুকে হাত দিন প্লিজ… পুরো বুকে! অধ্যাপক চন্দ্র কিন্তু দু আঙুলে নিপল টানছেন। পুরো বুকে হাত দিচ্ছেন না। ঋতির পাগল পাগল লাগছে… অধ্যাপক চন্দ্র হঠাৎ সরে গেলেন পাশ থেকে। ঋতি প্রায় হাহাকার করে উঠেছে, সোনা! প্লিজ! প্লিজ!
অধ্যাপক চন্দ্র এবার উল্টোদিকের সোফায় বসে বললেন, তুমি নিজে পোশাক খোলো সোনা! আমি দেখি!
মুহূর্ত মাত্র সময় লাগল না। ঋতি ন্যাংটো হয়ে দাঁড়াল অধ্যাপক চন্দ্রের সামনে।
অধ্যাপক চন্দ্র মুচকি হেসে বললেন, সুন্দর। চলো ঘরে চলো সোনা। বলে আগে আগে হেঁটে ভেতরের ঘরে ঢুকে গেলেন।
ঋতি প্রায় দৌড়ে ঢুকল।
অধ্যাপক চন্দ্র বড়ো লাইট জ্বালিয়ে বললেন, শুয়ে পড়ো।
ঋতি পাছা উঁচু করে হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় কিভাবে শুচ্ছে অধ্যাপক চন্দ্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন। তারপর বললেন, তোমার খুব ইচ্ছে করছে সোনা?
ঋতি তখন মরিয়া হয়ে উঠেছে।
তাহলে আমি যা করব, তুমি আপত্তি করতে পারবে না।
যা ইচ্ছে করুন। মেরে ফেলুন আমাকে! কিন্তু কাছে আসুন প্লিজ।
অধ্যাপক চন্দ্র খাটে উঠে ঋতির হাত পিছন থেকে বেঁধে ফেলল দড়ি দিয়ে। পা দুটো ছড়িয়ে খাটের দুপাশে বেঁধে রাখল। তারপর সরাসরি যোনিতে আঙুল ছোঁয়ালেন।
ঋতি কেঁপে উঠেছে। মুখ দিয়ে তার অদ্ভুত গোঙানির আওয়াজ বেরোচ্ছে।
অধ্যাপক চন্দ্র হাতের আঙুল দিয়ে যোনিতে খেলা করছে। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়, একটু সময় পরেই ঋতির অর্গাজম হয়ে গেল। ঋতির শরীরটা খানিকটা কেঁপে কেঁপে উঠল। কিন্তু তাতে অধ্যাপক চন্দ্র থামলেন না। ঋতির যোনিতে আঙুল দিয়ে তার খেলা চলতে লাগল । একহাতে নিপল টানছেন, এক আঙুল যোনির ভেতর নাড়াচাড়া করছেন। ঋতি তখন পাগলের মতো ছটকাচ্ছে। স্যার আর না। আর না। প্লিজ। আর পারছি না স্যার। কিন্তু অধ্যাপক চন্দ্র কোনো কথাই শুনছেন না। ঋতির হাত পা বাঁধা। শরীরটা তার বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে। ক্রমাগত এই রকম চলতে চলতে ঋতি একসময় নেতিয়ে পড়ল। অধ্যাপক চন্দ্র তখন তার হাত পা খুলে দিয়ে তাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে উবু করে বসিয়ে দিলেন। নাও পেচ্ছাপ করো সোনা!
ঋতি তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে চাইলে তাকে চেপে ধরে বসিয়ে দিলেন অধ্যাপক চন্দ্র। পেচ্ছাপ করো। আমি দেখব।
ঋতির তখন কিছুতেই পেচ্ছাপ হচ্ছে না। এভাবে কারো সামনে তো…
কিন্তু অধ্যাপক চন্দ্র নাছোড়বান্দা।
শেষে ঋতি পেচ্ছাপ করল। যোনি ধুল। তবে অধ্যাপক চন্দ্র তাকে উঠতে দিল। বলল, চলো এবারে চা করি। ঋতি জামা পরতে চাইলে অধ্যাপক চন্দ্র জামাকাপড়গুলো দূরে সরিয়ে রাখল। ঋতি ন্যাংটো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা করল। ন্যাংটো বসে খেল। অধ্যাপক চন্দ্র ভালো জলভরা সন্দেশ এনে রেখেছে। সেগুলোও ঋতি ন্যাংটো হয়েই খেলো। তারপর বইয়ের ঘরে ঋতির কাজের জন্য দু একটা বই উঁচু তাক থেকে মইতে উঠে পেরে নিয়ে এলো ঋতি ন্যাংটো অবস্থাতেই। এই পুরো সময়টা অধ্যাপক চন্দ্র কখনো ঋতির নিপল, কখনো নাভি, কখনো যোনি, কখনো পাছায় হাত দিতে লাগলেন। ঋতি তাতে কিছুই বলল না। কেবল আলতো হাসল। মইতে উঠে বই পারার সময় নিচ থেকে হাত বাড়িয়ে ঋতির ঝুলে থাকা স্তন ধরলেন। বললেন, রবীন্দ্রনাথ হয়তো এভাবেই ওকাম্পোর স্তনে হাত দিয়েছিলেন। ঋতি একথার উত্তরেও কিছু বলল না। ঋতির আর কিছু বলার নেই। তার মাথায় কেবল ঘুরছে নিরন্তর পতন আর নিরন্তর পচন… ঋতি বাড়ি ফিরে এলো। বাবার কাছে উচ্ছ্বসিত হয়ে অধ্যাপক চন্দ্রের প্রশংসা করল। বইগুলো দেখালো। ঋতির মুখটা যেন ঝলমল করছে।
৯৮
প্রায় প্রত্যেক মাসেই ঋতি ছোটে স্যারের বাড়ি। অন্তত দুবার তো যাওয়া হয়ই। একটু একটু করে ঋতির সহ্য ক্ষমতা বাড়ছে! এখন অনেকটা সময় অধ্যাপক চন্দ্র খেলা করতে পারেন ঋতিকে নিয়ে। ঋতি সহ্য করতে থাকে। তবে কেবল সহ্য করে না। তার ভালো লাগে। সেও এনজয় করে। তবে একেবারে মাত্রাছাড়া হয়ে গেলে ঋতির স্বাভাবিক হতে একটু সময় লাগে। বাড়ি ফিরতে দেরি হয়।
পিএইচডির কাজ ঋতি অনেকটা গুছিয়ে এনেছে। লাইব্রেরি, কলেজ, খাতা দেখা সবই তার চলছে। তার মধ্যেই রয়েছে এই নিষিদ্ধ ডাক। এই নিষেধের বেড়া ডিঙোতে ঋতির আর কোনো দ্বিধা নেই। স্নেহময়ের মতো সততা আর শরীরী আকর্ষণের দ্বন্দ্ব নেই অধ্যাপক চন্দ্রের। অনেক মেয়েকে নিয়েই তিনি এই কাজ করেছেন। করে চলেছেন। ঋতি তার মধ্যে একজন। স্নেহময়ের অপরাধ বিদীর্ণ চেতনা থেকে এই শরীরী খেলা মুক্ত। কিন্তু তারপরও ঋতি জানে ঋতি স্নেহময়কে ভালোবাসে। হ্যাঁ, স্নেহময়ের জন্য দেহের শুচিতা সে বজায় রাখতে পারল না। কিন্তু দেহের শুচিতা বলে কোনো অলীক বস্তুতে ঋতি আর বিশ্বাস করে না। যদিও তার যোনি এখনও অক্ষত। স্নেহময় কোনোদিন ওই গভীরতাকে ছোঁয়ার চেষ্টাই করেনি। আর অধ্যাপক চন্দ্রের তো সবটাই খেলা। আর একটা ব্যাপার ঋতি আগেও খেয়াল করেছে, এখনও করে। সারাদিন নানা ব্যস্ততা, পরিশ্রম, পড়াশোনা, যৌনবিকৃতি যাই ঘটুক না কেন সামান্য সময় ফাঁকা থাকলেই ঋতি আবার সেই নীরবতার কাছে ফিরে যায়। যে নীরবতায় তার বেদনা বাজে। এক একদিন কাজ করতে করতে হঠাৎ আয়নার দিকে তাকিয়ে ঋতি অবাক হয়ে যায়। তার চোখের মধ্যে আজও লুকিয়ে রয়েছে সেই প্রথম প্রেমের নিষ্পাপ সরল নিবেদন। এই আত্মসমর্পণ থেকে নিজেকে উইথড্র করে নিতে পারেনি ঋতি। ঋতি যে পথে পা বাড়িয়েছে হয়তো তার জীবনে অনেক পুরুষ আসবে। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে সে কি কখনো বলতে পারবে যে স্নেহময়কে ছাড়া আর কাউকে কোনোদিন সে ভালোবাসতে পেরেছিল! স্নেহময় তার জীবনে প্রথম, স্নেহময়ই শেষ। এ জীবনে মন আর কাউকে দেওয়া হলো না ঋতি ঘোষালের। কারণ মনটাই তার আর রইল না।
এসব কথা কাউকে বোঝাবার নয়। এই সমাজ শরীরের পবিত্রতা ছাড়া আর কোনো প্রেমকে স্বীকার করে না। বেশ্যাও যে ভালোবাসতে পারে তা এই সমাজে মান্যতা পায় না। আর বিয়ের মতো একটা চূড়ান্ত ব্যবসায়িক লেনদেনের ব্যাপারকে এখানে প্রেমের মোড়কে উদযাপন করা হয়। বেশ্যা – শব্দটা উচ্চারণ করেই ঋতি থমকে গেল। নিজেকে সে বেশ্যা ভাবছে। হ্যাঁ বেশ্যাই তো! শুধু শরীরটা সে বেচে না। কিন্তু দুজন পুরুষের ভোগ্য সে হয়ে উঠেছে। আচ্ছা স্নেহময়দা তাকে কি ভাবে! গোপন প্রেমিকা! না কি… যদিও স্নেহময় তাকে কোনোদিন একটা বইও উপহার দেয়নি। কাজেই রক্ষিতা শব্দটা এখানে খাটবে না। সে স্নেহময়ের নিষিদ্ধ রমণী! স্নেহময় সুযোগ পেলেই যাকে গোপনে রমণ করে! তাও চূড়ান্ত আনন্দ দিতে চায় না স্নেহময়দা। ভয় পায় নিশ্চিত। তারপর কেবল সকালের গুডমর্নিং আর বিকেলের বাই ছাড়া কোনো কথা থাকে না তাদের। স্নেহময় জানে না ঋতির জীবনে কি চলছে! ঋতির শরীর ঋতিকে কোন্ নরকে নামিয়েছে! স্নেহময়ের কাছে ঋতির স্ট্রাগলেরও কোনো খোঁজ নেই আর সেখান থেকে সাময়িক মুক্তির উপায় হিসেবে ঋতির এই যৌন বিকৃতিরও হদিস নেই। একে কার ব্যর্থতা বলে মানবে ঋতি! স্নেহময়ের! যে ঋতির পাগলের মতো ভালোবাসার বদলে খানিকটা রঙিন শরবত তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল! না কি এ ঋতির ব্যর্থতা যে সেই রঙিন শরবতে ভুলতে না পেরে সে মদের বোতল হাতে তুলে নিল! না কি এ ঋতির প্রেমের ব্যর্থতা যা কেবলমাত্র সামাজিক স্বীকৃতির বদান্যতা না পেয়ে চূড়ান্ত ব্যভিচারে প্রতিপন্ন হলো! যে প্রেমে নিষিদ্ধ গোপনীয়তাটাই এতো বড়ো হয়ে উঠল যে স্বাভাবিক মিলনটুকু অধরা থেকে গেল! কোনোদিন পূর্ণতা পেল না!
এইসব ভাবতে ভাবতেই ঋতি দেখে মা আর বাবার মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে আজও। বাবা সুযোগ পেলেই মেয়ে আর বউয়ের নামে নিন্দে করছে জ্যেঠুর বাড়ির লোকজনকে খুশি করতে। ওদের ইগো স্যাটিসফাই করছে। সে খবর নানা অছিলায় এ বাড়িতে এসে পৌঁছোলে অশান্তি চরমে উঠছে। তেজ দেখিয়ে বাবা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। মা দিনের পর দিন না খেয়ে শুয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে চলছে মায়ের দোকানের অশান্তি, চোর বদনাম… টুয়া মাসির বাড়াবাড়ি, চঞ্চল মেসোর ইনসিকিউরিটি, মায়ের কাছে অবিরাম অভিযোগ, মায়ের ক্লান্তি… সব… সব চলছে। পুজো আসছে। পুজো যাচ্ছে। অশান্তি যাচ্ছে না। অভাব যাচ্ছে না।
৯৯
বিশ্বদেবের বাড়িতে প্রত্যেকবছর পাঁচটি করে লক্ষ্মীপুজো হয়। বছরের চার মাসে চারটি আর কালীপুজোর দিন অলক্ষ্মী বিদায়। সরস্বতী পুজো কোনোদিন হতে দেখেনি ঋতি এ বাড়িতে। স্বাভাবিক, যারা জ্ঞানকে টাকার অঙ্কে বিচার করে তারা তো লক্ষ্মীকে এগিয়ে রাখবেই। আবার রবীন্দ্রনাথের শ্রী ও হ্রী ভেবেও লাভ নেই। ওসব রাবীন্দ্রিক ন্যাকামি এ বাড়িতে চলে না। লক্ষ্মীপুজো করা হচ্ছে আসলে টাকার পুজো করা। তাছাড়া নানারকম উপোস কাপাস লেগেই আছে। শ্রী সংসারের কাজ সেরে, দোকানে দৌড়ে আর মন্দিরে যাওয়ার সুযোগ পায় না। মাধুরীই মন্দিরে গিয়ে সকলের নামে পুজো দেয়। এই নিয়ে বিশ্বদেবের বিরক্তি আছে। মাধুরী পুজো করে ফিরে এলে ঋতি প্রসাদ নিতে আসে। বিশ্বদেব তখন ঋতিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, আর কতদিন প্রক্সি দিয়ে চালাবে? পুজোতেও প্রক্সি! তুমি না থাকলে তো সংসারটাই করা হতো না। এইভাবে করে দিয়ে দিয়ে অভ্যেস খারাপ করে দিয়েছ।
ঋতি শোনে। কোনো উত্তর করে না। মনে মনে ভাবে মায়ের পুজো করার দরকারটা কি! সারাদিন এমনিতেই এতো পরিশ্রম হয়! তার মধ্যে উপোস! ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকেন তিনি এমনিও দেখছেন না, ওমনিও দেখবেন না! মা যেদিন থেকে অনন্ত ঘোষালের বউ হয়েছে সেদিন থেকে মায়ের কপালে দুঃখ লেখা হয়ে গেছে। হাজার পুজো করলেও তা মুছে যাবে না। কিন্তু মাকে একথা বোঝানো অসম্ভব! তবু তো মাথার ওপর ছাদটা আছে! হয়তো আরো বিপদ হতে পারত। এতো ঠাকুর ডাকি বলে ঠাকুর এটুকু রক্ষা করেছেন!
এসব কথা শুনে ঋতি আজকাল মনে মনে হাসে। মা কোনোদিন চোখের জল না ফেলে শ্বশুরবাড়ির ভাত খেতে পেল না। ঋতি তার আদর্শগুলোকে জলে ভাসিয়ে একটা পারভার্ট লোকের বিকৃতিতে মদত দিচ্ছে! এর থেকে খারাপ আর তাদের জীবনে কি ঘটবে! এই জীবন বাঁচার চেয়ে আত্মহত্যা করা ভালো ছিল। ঋতি এখন মাঝে মাঝে ভাবে মাকে বিষ খাইয়ে সে নিজেও বিষ খাবে। আপদ বালাই একেবারে চুকে যাবে। কিন্তু ওই ভাবনাটুকুই। বিষ জোগাড় করার শক্তিটুকুও সে আর খুঁজে পায় না নিজের মধ্যে। অধ্যাপক চন্দ্রের কাছে প্রথম কয়েকমাস নিজের তাগিদেই গেছে ঋতি। এখন আর ভালো লাগে না। প্রত্যেকবার এই যৌনদাসিত্ব…. এই বিকৃতি… এই অবনমন ঋতি মন থেকে মেনে নিতে পারে না। নিষিদ্ধ – এই শব্দটা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। স্নেহময়, অধ্যাপক চন্দ্র দুজনের জীবনেই সে নিষিদ্ধ! কারো কাছেই তার কোনো স্বীকৃতি নেই। শুধু তাদের শরীরে কাম জাগলে তাদের ঋতি ঘোষালের কথা মনে পড়ে।
যাই হোক, কোন্ কথায় কোন্ কথা এসে পড়ল।
বিশ্বদেবের বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় শ্রীর থাকার কথা। কিন্তু প্রত্যেকবারই পুজোর দিন ও বাড়ি যেতে শ্রীর বারোটা বাজে। বাড়ির সব কাজ সেরে, বাড়ির ঠাকুরকে পুজো দিয়ে তবে তো যাওয়া! এ নিয়ে সকাল থেকে মাধুরী গজগজ করে! বাবা! মেজবৌ কখন আসবে গো! পুজোর দিনেও দেরি করে! বাড়িতে কি করে কে জানে! বারবার ঘড়িতে সময় দেখে আর রাজ পেয়াদার মতো ঘোষণা করে দশটা বাজলে, এখনো মেজ বৌ এলো না!
এগারোটা বাজল, এখনো মেজ বৌ এলো না…
আর এই কথাগুলো তাকে বিশ্বদেবের কানের কাছেই বলতে হবে। বিশ্বদেব রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বসে থাকে। শ্রী বাড়িতে পা রাখতেই বলে ওঠে, মাধু! কটা বাজল?
শ্রী বোঝে কথাটা তাকে শুনিয়ে বলা হচ্ছে। শ্রী উত্তর করে না। হাত পা ধুয়ে ভোগ রান্নার জোগাড় করে। লক্ষ্মীপুজোর ভোগ থেকে, দুপুরের রান্না সবই শ্রী করে একা হাতে। সময় মতোই রান্না শেষও হয়। তবু তাকে চারটে কথা শুনিয়ে তবে বিশ্বদেবের ভাত হজম হয়। অনন্ত যথারীতি মৌনব্রত পালন করে এসব সময়ে। কারণ সে মনে করে দাদা ঠিকই বলে। শ্রী এতো দেরি করবে কেন!
দ্বিতীয়ত, দাদা ভুল বললেও দাদা বলেই তার মুখের ওপর কিছু বলা চলবে না। দাদা আপদে বিপদে দেখবে!
ঋতি এই নির্ভরতার, এই অন্ধভক্তির কোনো অর্থ খুঁজে পায় না। ঋতির মনে হয়, বাবা যতটা না মনে মনে দাদার ভক্ত তার থেকে দেখায় বেশি। মার যেহেতু বাপের বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক এতো ভালো, বাবাও তাই দাদার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো সেটাই দেখাতে চায়। কম্পিটিশন চলে কে কার বাড়ির প্রতি বেশি অনুগত। মা যেমন মায়ের সেজ কাকার, টুয়ার, অস্মির ভুলগুলো দেখেও দেখে না, অন্তত অনন্তর সামনে ওদের নিন্দেমন্দ করে না, বাবাও তাই! ঋতির এখন মনে পড়ে, এই দুই বাড়ির কম্পিটিশনের মাঝে পড়ে তার জীবনটাকে নরক করে তুলেছিল বাবা সেই কোন্ ছোটোবেলাতেই! একটু আদর পাওয়ার আশায় দাদুর বাড়ির গল্প বাবার কাছে করেছিল ঋতি। আর বাবা তাই নিয়ে মায়ের সঙ্গে কি অশান্তিটাই না করেছিল! মাও কিন্তু সেদিন বোঝেনি ঋতিকে! লাগানি ভাঙানি বলে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। সেজ কাকার অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়েছিল!
আজ অলক্ষ্মী বিদায় পুজো। আজকের দিনে পাড়ার সব বাড়িতে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। শ্রী আজও বারোটার সময়ই এসেছে। কিন্তু এসে থেকে এক মিনিট আর বসার সুযোগ পায়নি। দু হাঁড়ি খিচুড়ি, লাবড়া, পাঁচ রকম ভাজা, চাটনি সবই করেছে। মাধুরী লুচি আর পায়েসটা বানিয়েছে। ঋতি সকাল থেকে এসে পুজোর জোগাড়ে বম্মাকে সাহায্য করেছে। পুজো মিটতেই শ্রী কোনোরকমে দুটো মুখে দিয়ে দোকানে ছুটল।
রুশি আর ঋতি মিলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রসাদ দিয়ে এলো। তারপর বসে কথা হচ্ছিল ঋতি,বিশ্বদেব আর অনন্তর। ঋতিদের বাড়িতে অশান্তি লেগেই থাকে। বিশ্বদেব চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি রে পূর্ণিমা না অমাবস্যা! যেন কি একটা মজার ব্যাপার! সেদিনও বিশ্বদেব কথা তুলতেই ঋতি বলল, জ্যেঠু, বাবা ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
কেন?
বাবাকেই জিজ্ঞেস করো।
অনন্ত দাঁতে কটকট আওয়াজ করছে। মুখটা শক্ত করে রেখেছে।
বিশ্বদেব বলল, কি রে বুধু! ওষুধ খাচ্ছিস না কেন!
অনন্ত অপেক্ষা করছিল এই প্রশ্নটার। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলতে আরম্ভ করল, কি হবে ওষুধ খেয়ে! ওষুধে কোনোদিন রোগ সারে না। নিয়মে না চললে শরীর ভালো থাকবে না। সকাল থেকে দুটো অবধি আমি না খেয়ে থাকি। আমাকে খেতে দেয় না!
মিথ্যে কথা বলছ কেন বাবা! তুমি তো সকালে অফিস যাও। তার আগে সাতটার সময় মা তোমাকে মাছের ঝোল, ভাত খাইয়ে পাঠায়। টিফিন করে দেয়। তুমি কোথায় দুটো অবধি না খেয়ে থাক!
থাক! থাক! মায়ের হয়ে আর শালিসি মারতে হবে না! হুঁ, যেমন মা তার তেমন মেয়ে!
ঋতির মাথাটা আস্তে আস্তে গরম হয়ে উঠেছে। তেমন মেয়ে মানে! কিরকম মেয়ে! কি বলতে চাইছ তুমি! আমি পড়াশোনা করি না, আঠারো বছর বয়স থেকে প্রেম করি… কোনটা! কোনোদিন কোনো বেচাল করতে দেখেছ আমায়!
কথাটুকু শেষ হতে দেরি! অনন্ত ভেবে নিল ঋতি এই কথাটা রুচির সঙ্গে তুলনা করে বলেছে। ফলে অনন্ত বার্স্ট করল! চিৎকার করে বলে উঠল, হ্যাঁ, তোমার গোপন প্রেমের কথা কেউ জানে না মনে করেছ! আঠারো বছর বয়স থেকে একটা নিচু জাতের ছেলের সঙ্গে… ছিঃ
ঋতি বুঝল বাবা তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটায় ঘা দিচ্ছে! ইচ্ছে করে তাকে দমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে! সত্যি কথাগুলো প্রকাশ হয়ে পড়লে বাবার মিথ্যে দিয়ে বানানো সিমপ্যাথির দুনিয়াটা ভেঙে যাবে! তাই বাবা নিজের মেয়ের চরিত্র তুলে কথা বলছে! ঋতির মাথাটা আর কাজ করল না। বীভৎস জোরে চিৎকার করে ঋতি বলে উঠল, কি করেছি আমি! কি করেছি! কেন তুমি এভাবে আমাকে অপমান করছ!
ঘর থেকে ততক্ষণে রুচি, রুশি ছুটে এসেছে। অনন্তও চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে।
বিশ্বদেব রুচিকে ইশারা করল ঋতিকে ঘরে নিয়ে যেতে। রুচি আর রুশি মিলে টানতে টানতে ঋতিকে ঘরে নিয়ে গেল। ঋতি টের পেল অনন্ত সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে।
ঋতি ঘরে ঢুকে কেঁদে ফেলল। রুচি, রুশি কেউ তার সঙ্গে একটা কথাও বলল না। এমনকি তার পিঠে একটা হাতও রাখল না।
খানিক পরে ঋতি কান্না বন্ধ করে চোখ মুছে বেরোতে যাবে এমন সময় বিশ্বদেব ওকে আটকালো। বোস, তোর সঙ্গে কথা আছে।
ঋতি দাঁড়াল।
তুই আজকে যেটা করলি সেটা যে একেবারে বস্তিবাসীরা করে সেটা কি তুই বুঝলি! আমার এ পাড়ায় একটা সম্মান আছে। তুই সেটাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিলি! পড়াশোনা করে এই তৈরি হয়েছিস!
ঋতি শুনছে। ঋতির বলতে ইচ্ছে করছে, তোমার বড়ো মেয়ে যখন সাতটা ছেলের সঙ্গে প্রেম করে বেড়াত তখন তোমার সম্মান নষ্ট হয়নি! তোমার জামাই যখন পাড়ার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেয়েকে কান ধরে ওঠবোস করিয়েছে তখন সম্মান নষ্ট হয়নি! আজ হলো!
তোর মা তোকে এ বাড়ি থেকে নিয়ে গেছিল তোর আপডেশনের জন্য। আপডেশনের বদলে ডিটোরিয়েট করেছিস! এই শিক্ষা পেয়েছিস মায়ের কাছে!
ঋতি এ কথার সামনে বাক্যিহারা হয়ে গেল। তার ডিটোরিয়েশন হয়েছে। সে যাদবপুর থেকে পিএইচডি করছে। দুটো কলেজে পড়াচ্ছে। সমস্ত মাস্টারমশাই, দিদিরা তাকে ভালোবাসে তার ব্যবহারের জন্য! আর তার নাকি অধঃপতন হয়েছে! একে অধঃপতন বলে! তাহলে উন্নত কে! রুচি দিদি! যে স্কুলের পরীক্ষায় ফেল করেছে বলে সই নকল করত! কোনোদিন ভালো রেজাল্ট করেনি! এমন একটা ছেলেকে বিয়ে করেছে যে কি না আসলে একটা লুচ্চা! ডিভোর্স করে এসেও সে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে! মেয়েটার দিকেও খেয়াল নেই! আর রুশিদিদি! কত সম্বন্ধই না নিয়ে এলো জ্যেঠু! কিন্তু তারা মেয়ে দেখতে এলে ভদ্রবাড়ির সেই সমস্ত সম্ভ্রান্ত লোকেদের ক্রমাগত অপমান করে গেছে রুশিদিদি। সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে ব্যস্ত থাকে। রেজাল্টের ওই হাল! তারা উন্নতি করেছে জীবনে! আর সে অধঃপাতে গেছে! এসব ভাবছে ঋতি। কিন্তু মুখে কিছুই বলছে না।
মাধুরী এসে কখন সামনে বসেছে ঋতি খেয়াল করেনি।
বিশ্বদেব বলে যাচ্ছে, তোর মা একসঙ্গে সংসার করতে চাইল না বলে আমি তোদের ফ্ল্যাট কিনে দিলাম। তারপরও শান্তি নেই!
ঋতি অনেকদিন পর্যন্ত এ কথা বিশ্বাস করেছে। তারপর অনন্তই একদিন ঋতিকে জানিয়েছিল সত্যিটা কি! জ্যেঠু এ বাড়ি করার সময় যে টাকা ধার নিয়েছিল তাই সুদে আসলে শোধ করেছে। নিজে থেকে একটা টাকাও দেয়নি! ঋতি সবটা জানে! অথচ জ্যেঠু দিনের পর দিন নিজের মেয়েদের, পাড়ার লোক, আত্মীয় স্বজন সকলকে এই মিথ্যে কথাটা বলে নিজের মহানুভবতা জাহির করেছে। আর তাছাড়া মা তো এ বাড়ি থেকে চলে যেতে চায়নি! তোমরা আমাদের তাড়িয়ে ছেড়েছ। আমাদের একটা না খেতে পাওয়া দশায় ফেলে দিয়েছ। পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে চেয়েছ। বাবার একার রোজগারে যে একটা সংসার চলতে পারে না সেটা তোমরা খুব ভালো জানতে। তাও আমাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছ। আমার মা এতো ভালো যে তারপরও তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যতদিন এ বাড়িতে ছিলাম আমরা ততদিন অন্তত চোখের জল ফেলে হলেও দুবেলা খাওয়া জুটেছিল আমাদের! কিন্তু কতদিন! ভাইয়ের সংসারের দায়িত্ব দাদা নেবেই বা কেন! আমাদের ঝেড়ে ফেলে দিয়েছ বেশ করেছ। কিন্তু মিথ্যে বলে বেড়াও কেন! আমাদের পরিত্রাতা এমন একটা ভান করে সকলের কাছে আমাদের ছোটো করো কেন! ঋতির মাথার ভেতরে কথা গিজগিজ করছে। ঋতি বলছে না কিছুই।
ওদিকে বিশ্বদেব বলে যাচ্ছে তোদের বাড়িতে এতো সমস্যা, তুই আমাকে এসে বলতে পারতিস!
ঋতি এবার মুখ খুলল। আস্তে আস্তে বলল, আমাদের বাড়িতে অশান্তি, অভাব সে তো তোমার থেকে ভালো কেউ জানে না! অশান্তি এতোটাই যে বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। বম্বে চলে গেল! আমার আর মায়ের খাওয়ার চালটুকুও ছিল না! তোমরা তো জান! তোমাদের বাড়ি থেকেই তো সুটকেস নিয়ে বাবা বেরিয়েছিল। সাইকেলটা তোমাদের বাড়িতেই রাখা ছিল। মা আর আমি বাবাকে খুঁজছিলাম! কিন্তু তোমরা একবারও বলোনি যে বাবা তোমাদের জানিয়েই বম্বে গেছে!
বিশ্বদেব একথা শুনে এমন ভান করল যেন আকাশ থেকে পড়ছে! বলল, এরম ঘটনা কবে ঘটল মাধু! তুমি জানো!
মাধুরী হাত উল্টে এমন ভাব করল যেন একথা প্রথম শুনছে।
ঋতি আর সহ্য করতে পারল না। জ্যেঠু, বম্মা! মাকে এতো কষ্ট দেওয়ার পরও যাদের সে শ্রদ্ধা করেই এসেছে! বাড়ির মাথা বলে সম্মান জানিয়ে এসেছে। তারা আজ নির্লজ্জ মিথ্যে বলছে তার সামনে! ঋতি হাউহাউ করে এবার কেঁদে ফেলল। কোনোরকমে মুখে হাত চাপা দিয়ে সে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করেছে।
মাধুরী বলে উঠল, কাঁদতে কাঁদতে চলে যাচ্ছে! প্রসাদটাও তো নিয়ে যাচ্ছে না।
বিশ্বদেব কি বলল আর শুনতে পেল না ঋতি। ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো।
১০০
শ্রী রাতে বাড়ি ফেরার সময় দেখল ঋতি অন্ধকারে একা বারান্দায় বসে আছে। রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, বাবু? কী হয়েছে?
ঋতি চোখ মুছে বলল, কিছু না। ভেতরে এসো।
শ্রী ভেতরে ঢুকে দেখল অনন্ত বসে বসে বিড়ি খাচ্ছে। ঋতির চোখমুখ ফুলে উঠেছে। ঋতিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে। শ্রীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। ঋতি কোনো কথার উত্তর দিল না। যেমন বারান্দায় বসেছিল তেমন করেই বসে থাকল। শ্রী হাত মুখ ধুয়ে দেখল প্রসাদ আসেনি এ বাড়িতে। অনন্তকেই সামনে পেয়ে শ্রী জিজ্ঞেস করল, প্রসাদ পাঠায়নি ও বাড়ি থেকে!
তোমার মেয়ে তেজ দেখিয়ে আনেনি।
শ্রী উত্তর শুনেই বুঝল বাবা মেয়ের মধ্যে আবার অশান্তি হয়েছে। রোজ বাড়ি ফিরে এই অশান্তি শ্রী আর নিতে পারে না। মাঝে মাঝে মনে হয় যেদিকে দুচোখ চায় চলে যায়!
শ্রী বিরক্ত হয়ে রান্নাঘরের দিকে এগোতেই অনন্ত ও বাড়ির ঘটনা সাতকাহন করে বলতে শুরু করল। সেই সঙ্গে চলল ছিছিক্কার! লেখাপড়া শিখে এই মানুষ হয়েছে! এর থেকে তো মূর্খ হয়ে থাকা ভালো ছিল।
অনন্তর কথা শুনে শ্রীও আর মাথাটা ঠিক রাখতে পারল না। ঋতিকে গিয়ে সরাসরি চার্জ করল। তুই ও বাড়িতে এসব নাটক করে এসেছিস?
ঋতি দেখল মায়ের মুখে চূড়ান্ত বিরক্তি। ক্লান্ত, অবসন্ন একটা চেহারা। ও কথা না বাড়িয়ে বলল, মা আমি তোমাকে সব পরে বলব। এখন ভাত বসাচ্ছি।
থাক! তোমার আর কিছু করে দরকার নেই! এতোক্ষণ বারান্দায় বসে না কেঁদে ভাতটাতো করে রাখলে পারতে!
ঋতি মায়ের কথা শুনতে শুনতেই উঠে রান্নাঘরে ঢুকেছে। আজ যে সে কার মুখ দেখে উঠেছিল সকালে! উপুর্যপরি এতো আঘাত তার সইবে তো! আজ মাও সহ্যের সীমা পার করে তাকেই কটু কথা বলছে! আর কত সহ্য করতে হবে ঈশ্বর! আর কত!
রাতে অনন্ত আর শ্রী খেলেও ঋতি খেতে পারল না। তার প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা করছে। বমি হচ্ছে। সে না খেয়েই শুয়ে পড়ল।
সকালবেলা অনন্ত অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর ঋতি মাকে কালকের সব কথা বলল। এমনকি অনন্ত চলে আসার পর জ্যেঠু,বম্মা তার সঙ্গে যে ব্যবহার করেছে সেকথাও জানাল। তারপর বলল, মা তোমার মনে হয় আমাদের আর এ বাড়িতে থাকা উচিত! এ বাড়িতে আমার আর তোমার কোনো সম্মান নেই! সকলে আমাদের পায়ে ঠেলছে! আমরা তবু কেন পড়ে আছি এ বাড়িতে!
শ্রী অসহায়ের মতো বলে উঠল, কোথায় যাবি?
মালতীদির বাড়ির একতলার একটা ঘরে ওরা পেয়ইংগেস্ট রাখে। ঘরটা আপাতত ফাঁকা আছে। আমি ওখানেই চলে যাব।
আর আমি?
তুমি টুয়া মাসির কাছে যাও। নিনান আছে তো এখনো। তারপর আমি দেখছি কি করা যায়!
শ্রী আর কথা বাড়ালো না।
ঋতি মালতীদিকে ফোন করল। তোমার বাড়িতে একতলার ঘরটায় পেইংগেস্ট রাখবে আমাকে?
মালতীদি এতো সকালে ঋতির ফোন পেয়ে এমনিতেই অবাক হয়েছে। এই কথা শুনে আরোই চমকে উঠল। কী হয়েছে ঋতি? বাড়ি থেকে চলে আসতে চাইছিস কেন?
পরে বলব। আপাতত থাকতে দেবে কি না বলো!
হ্যাঁ, আমার আপত্তি নেই।
তাহলে আমি এখনই যাচ্ছি।
এখনই! কী হয়েছে ঋতি? কিছু অন্তত বল!
পরে বলব মালতীদি। এখন সময় নেই। আমি রাখছি।
শোন্ শোন্, আমি তো বাড়িতে নেই। শান্তিনিকেতন এসেছি। বাবা মা আছে। আমি মাকে বলে রাখছি।
অসুবিধে হবে?
নাহ্, অসুবিধে কিসের! কিন্তু তোর কি হয়েছে আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
পরে বলব মালতীদি। ঋতি ফোন কেটে দিল। কাছেই পাড়ার এক ড্রাইভারের সঙ্গে দেখা করে একটা গাড়ি ঠিক করল।
বাড়িতে ফিরে বই আর জামাকাপড় গুছিয়ে নিল। শ্রীও নিজের জামাকাপড় একটা চাদরে বেঁধে নিল। শ্রী প্রথমে যাবে বলে ঠিক করেও এখন বোধহয় দ্বিধায় ভুগছে। ঋতিকে হঠাৎই বকাবকি করতে শুরু করল। ঋতি বুঝতে পারছে মা টেন্সড হয়ে আছে। তাই এতো কথা বলছে। কিন্তু ঋতি ডিটারমাইন্ড। ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে ও এ বাড়িতে আর থাকবে না। ঋতি মার কথার উত্তর না দিয়ে নিজের মতো উপস্থিত যতটুকু মনে হলো গুছিয়ে নিল। সে একটা ইনডাকশান কিনেছিল টাকা জমিয়ে। তার সঙ্গে একটা স্টিলের হাঁড়ি গিফট করেছিল দোকান থেকে। সেটাও নিল ঋতি। হঠাৎই ঋতির মনে পড়ে গেল এই ইনডাকশান বাবা আর সে গিয়ে কিনে এনেছিল। মা পরদিন সকালে ধোসার ব্যাটার করে দিয়েছিল আর ঋতি একটা একটা করে ধোসা ভেজে বাবা মাকে খাইয়েছিল। বাবা খুব আনন্দ পেয়েছিল। সেই সামান্য আনন্দটুকু তাদের শেষ হয়ে গেল! ঋতির চোখ জলে ভরে গেল। শ্রী ঋতির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রীর চোখেও জল। ঋতি বলল, মা একবার বাবাকে ফোন করে জানাতে হবে।
কথাটা শুনে শ্রী ঘাবড়ে গেল ভীষণ। হাত পা কাঁপছে ওর।
ঋতি মায়ের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিল।
অনন্ত হ্যালো বলতে শ্রী একটু থতমত খেল। তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, আমরা চলে যাচ্ছি বাড়ি ছেড়ে।
যা ভালো বোঝো… অনন্ত ফোনটা কেটে দিল।
গাড়িতে কয়েকটি চাদরের বড়ো বড়ো পুঁটুলি তুলে নিয়ে শেষবারের মতো তাদের এই ছোট্ট এককামরার স্যাঁতসেঁতে ফ্ল্যাটটাকে দেখে নিয়ে ঋতি দরজায় তালা দিয়ে দিল। চাবিটা রাখল ধোপাদের ঘরে। গাড়িতে ওঠার সময় দেখল পাড়ার বেশ কয়েকটা বাড়ি থেকে লোকজন বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তাদের দেখছে। চোখেমুখে প্রশ্ন। ঋতি আর দাঁড়াল না। গাড়ি স্টার্ট দিল।
ঋতির কোনো শিকড়ের অনুভূতি নেই। জ্যেঠুর বাড়িটাকেই একসময় তার নিজের বাড়ি বলে মনে হতো। সেখান থেকে উৎখাত হয়ে যখন এই ফ্ল্যাটে এসেছিল তারা ঋতি ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। এই ফ্ল্যাটটা তার কোনোদিনই নিজের হয়ে উঠতে পারেনি। এই ফ্ল্যাটের স্মৃতি বলতে শুধু অশান্তি আর অভাব! জ্যেঠুর বাড়িও আস্তে আস্তে চেতনা থেকে মুছে গেছে। ওদের আচরণই তার জন্য দায়ি। শেষদিন পর্যন্ত ওরা ঋতিকে চাকরের মতো হুকুম করেছে। অকারণ মেজাজ দেখিয়েছে, নিন্দে করেছে। ঋতি সংকীর্ণ মনা, ঋতি হিংসুটে, ঋতি ওর দিদিদের হিংসে করে- এই ছিল ওদের মুখের বুলি! ফলে জ্যেঠুর বাড়িটা আর নিজের বাড়ি হয়ে থাকেনি ঋতির মনে! ঋতির মনে পড়ে যাচ্ছিল কোনো এক বছর পুজোর আগে একদিন রুচি, রুশি, রাই হাতিবাগানে যাবে। ওরা প্রায় জোর করেই ঋতিকেও সঙ্গে নিল। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছে। হাতিবাগানে জল জমে গেছে। সেই জলে পা ডুবিয়ে ডুবিয়ে রুচি, রুশি, রাইয়ের জন্য বেশ কতকগুলো দামি দামি জামা, জুতো ইত্যাদি কেনা হলো। শুধু ঋতির জন্য কিচ্ছু কেনার কথা কারো মনে হলো না। ঋতির নিজের তো টাকা নেই যে ও নিজের জন্য কিছু কিনবে! রুচি বড়ো দিদি হিসেবেও ঋতিকে কিছুই কিনে দিল না। ঋতি একটা টপ পছন্দ করেছিল। রুচি বলল, দামটা দেখে নে! তুই নিতে পারবি!
না রে, অনেক দাম।
আমিও পারব না রে। এতো কিছু কিনে টাকা শেষ হয়ে গেছে।
ঋতি বলল, না না থাক। কিনতে হবে না। ছেড়ে দে!
সেদিন বাড়ি ফিরে সকলের নতুন জামা জুতো দেখার পর বিশ্বদেব রুচিকে বলে ফেলেছিল, ঋতির জন্য কিছু কিনিসনি!
না, ঋতির টাকা ছিল না। আর আমারও টাকা শেষ হয়ে গেছিল।
বিশ্বদেব কটমট করে রুচির দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ওর জন্য অল্প হলেও কিছু কেনা উচিত ছিল।
এসব ঘটনা আজ এতো মনে পড়ছে! এরা এই আচরণ সারাজীবন করে গেছে। আর হিংসুটে, সংকীর্ণ মনা হওয়ার বদনাম হয়েছে ঋতির! এসব ভেবে ঋতির আজকাল এদের প্রতি করুণা হয়। কি নিচ! কি ছোটো এরা! নিজেরাই নিজেদের চেনেনা!
আজ এই ফ্ল্যাট থেকে বেরোবার সময় ঋতির মনে হলো, আজ থেকে এই ফ্ল্যাটটাও তার আর রইল না। নিজের বলতে তার আর কিছুই নেই আসলে! মাও নেই! মার কাছেও তো সে থাকতে পারবে না। মা টুয়া মাসির কাছে থাকতে পারলেও ঋতির পক্ষে সম্ভব নয়। ঋতি টুয়া মাসির উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন একেবারেই মেনে নিতে পারে না। তাই ঋতিকে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করে নিতে হবে। স্নেহময়দাকে শুধু খবরটা জানাল ঋতি গাড়িতে যেতে যেতেই। স্নেহময়দা ব্যস্ত বলে এড়িয়ে গেল। ঋতির মনে হলো আজ থেকে এই পৃথিবীতে সে যথার্থই একা হয়ে গেল।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)

