ধারাবাহিক উপন্যাস ঋতায়তে (তৃতীয় পর্ব) রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

ধারাবাহিক উপন্যাস ঋতায়তে (তৃতীয় পর্ব) রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

আটের দশকের মফসসল শহরে বেড়ে উঠছিল একটি মেয়ে। ঋতি। এক অসুস্থ শৈশবে, ভিড়ের মধ্যেও নির্জনে তার বড়ো হয়ে ওঠা। একটু যত্ন, সামান্য ভালোবাসা না পাওয়া কাঙাল এই মেয়েটির বড়ো হয়ে ওঠা এই উপন্যাসের বিষয়। দমবদ্ধ এক পারিবারিক আবহে অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা মেয়েটির জীবন, তার লড়াই! নারী হিসেবে, অসুন্দর হিসেবে, গরীব হিসেবে এই সমাজ মানসের সঙ্গে তার একার লড়াই। পাশে রয়েছে মা, নিরুপায়, অসহায়। তবু অদম্য জেদ ঋতিকে এগিয়ে দিয়েছে। যদিও এই উপন্যাস ঋতির ক্ষরণের ইতিহাস। তার নির্মল মন, তার নিখাদ ভালোবাসার ক্ষরণ। সমকাল, তার মনবদল, নববইয়ের বিচিত্র পট পরিবর্তন সবই ছুঁয়ে আছে এই উপন্যাসের শরীর! ঋতি কি শেষপর্যন্ত পৌঁছোতে পারবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে! আজ তৃতীয় পর্ব।

পূর্বে প্রকাশিত পর্ব– ,

তৃতীয় পর্ব

২১
টুয়াকে আর রাখা গেল না। ভাড়া বাড়িতে ওর অসুবিধে এতো বেশি হচ্ছিল যে ও ওই বাড়ি থেকে চিরকালের মতো চলে যাওয়ার আয়োজন করল। এমনিতেই এই দুবছর বেশিরভাগ সময়টাই ও শ্রীর কাছে কাটিয়েছে। বিশ্বদেব টুয়াকে স্নেহ করে। টুয়া ‘দাদা দাদা’ করে, বিশ্বদেবও ওকে সেইমতোই দেখে। তাছাড়া টুয়া সুন্দরী, ছটফটে, গায়ের রঙ ঠিকরে বেরোচ্ছে। এসব বিশ্বদেব পছন্দ করেন। ইদানিং শ্রীর বাপের বাড়ির সঙ্গে বিশ্বদেবের যোগাযোগ একটু গাঢ় হয়েছে। তার কারণও আছে। বিশ্বদেব শাড়ির ব্যবসা করছেন। পিয়ারলেসের সেই আগের রমরমা এখন আর নেই। ইনকাম যে একেবারে হয় না, তা নয়। তবে সেটুকু নিয়ে সন্তুষ্ট হয়ে বসে থাকার মানুষ বিশ্বদেব নয়। তাই বাড়িতেই শাড়ির ব্যবসা শুরু করল। মেজ বৌয়ের ঘরে একটা এক্সট্রা আলমারি ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। অনন্তকে সঙ্গে করে শান্তিপুরের তাঁতিদের থেকে নিজেই শাড়ি বাছাই করে আনা শুরু করল। ব্যবসা করতে নেমে বিশ্বদেব বুঝতে পারল মেজ বৌয়ের এই চত্ত্বরে ভালো পরিচিতি আছে। পাড়ায় যেমন তাকে সবাই পছন্দ করে, তেমনই তালপুকুর গার্লস হাইস্কুলের বিভিন্ন দিদিমণিদের সঙ্গে তার নানা সূত্রে পরিচয় আছে। ঋতি, রুশির সূত্রে বারাকপুর গার্লসের দিদিমণিরাও তার পরিচিত। ব্যবসার প্রচার তার মাধ্যমেই হওয়া সম্ভব। হঠাৎই বাড়িতে শ্রীর দর বেড়ে গেল। না, কোনো বিশেষ সুযোগ সুবিধে তাকে দেওয়া হলো না। তবে বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে কথা বলাটা বন্ধ হল। শ্রী বাড়ির কাজ সামলে শাড়ি ভর্তি ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল। দুপুরের গরমে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন স্কুলে যাতায়াত শুরু হল। আস্তে আস্তে খবর ছড়িয়ে পড়ল। লোকে বাড়িতেও আসতে শুরু করল। বিশেষ করে ঋতির বন্ধুদের মায়েরা স্কুলের পড়ে বাড়িতে চলে আসত শাড়ি দেখতে, কিনতে। শ্রীর ঘরটা আর ব্যক্তিগত রইল না।অনন্ত সেই ভোরে উঠে মিলে যায়। দুপুরে ওর একটু বিশ্রাম না নিলে হয় না। কিন্তু তার আর উপায় রইল না। বিশ্বদেব মনে মনে খুশি হলেন। মেজ ভাইয়ের এই দুপুরে ঘুমনোর ব্যাপারটা বিশ্বদেব কোনোদিনই সহ্য করতে পারে না।
কিন্তু একইসঙ্গে ঋতিও মুশকিলে পড়ল। এমনিতেই বাবার গলায় দড়ি দিতে যাওয়া দেখে ফেলার পর থেকে ঋতির দুপুরে ঘুমনো ব্যাপারটা কেমন আতঙ্কের হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারওপর এখন নতুন উপসর্গ। হঠাৎ হঠাৎ দুপুরে ঘুম ভেঙে সে দেখে যে ঘরে অচেনা কিছু মানুষ বসে আছে। শ্রী ওর মধ্যেই মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ঋতি একবার উঠে এসব দেখে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। কখনো হয়তো শ্রী দুপুরবেলাই মেয়েটাকে পড়তে বসিয়ে দেয়। খাটের একদিকে ও কাস্টমারদের কাপড় দেখাচ্ছে। আর একদিকে বসে ঋতি পড়ছে। এই করে কাপড়ের ব্যবসা বেশ দাঁড়িয়ে গেল। শ্রীর ভাই একদিন মাকে বলল, মা বাপী কোনোদিন আমাদের টিউশনটুকুও করতে দেয়নি। আর দিদিকে বাড়ি বাড়ি কাপড় বিক্রি করতে হচ্ছে! শ্রীর মা ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
শান্তিপুরের সমৃদ্ধ তাঁতিরা এখন বাড়িতে আসতে শুরু করেছে কাপড় নিয়ে। শ্রী নানারকম ফন্দি ফিকির করে তাদের কাছ থেকে কম দামে শাড়ি নেওয়ার চেষ্টা করে। কখনো আত্মীয়দের জন্য, কখনো নিজেদের পড়ার জন্য শাড়ি নেওয়ার কথা বলে দাম কমাবার চেষ্টা করে। একবার এই ভাবে পাঁচটা জামদানি শাড়ি নেওয়া হয়েছে। শ্রী বলেছে এই লাল -কালো জামদানিটা আমি পড়ব। আমার জন্য আপনি কিছুটা কনসিডার করুন নীলকমলদা। এইভাবে সুন্দর দেখতে পাঁচটা শাড়ি কেনা হয়েছে। বিকেলের দিকে হঠাৎই রুচি শ্রীর ঘরে ঢুকে বলল , কাকিমা, ওই কালো শাড়িটা আমার মায়ের জন্য নেওয়া হয়েছে। আমার মা পড়বে। বুঝেছ!
শ্রী খুব অবাক হয়। বলে, ওই শাড়িগুলো তো বিক্রির জন্য কেনা হয়েছে। নিজেদের জন্য তো নয়!
না, তুমি বললে তো ওই শাড়িটা তুমি পড়বে।
সে তো নীলকমলদার কাছে কম দামে নেওয়ার জন্য বানিয়ে বলেছি।
রুচি তবু গোঁয়ারের মতো বলে, ওটা আমার মা পড়বে।
বাইরে বিশ্বদেব আর মাধুরী সবই শোনে। কোনো কথা বলে না।
যাই হোক, এই সূত্রেই শ্রীর বাপের বাড়িতে বিশ্বদেবের যাতায়াত বেড়ে গেল। টুয়ার প্রতি স্নেহও খানিক বাড়ল। টুয়াকে মাঝেমাঝেই এ বাড়িতে নিয়ে চলে আসত বিশ্বদেব। বিশেষ করে মাসিকের সময়টা কাপড় ব্যবহার করতে হয়। তার মধ্যে ওই নোংরা বাথরুম। টুয়াই বলত, দাদা, আমি তোমাদের বাড়ি যাব। বিশ্বদেব আনন্দ করেই নিয়ে আসত। কিন্তু এভাবেই বা আর কতদিন। টুয়ার গ্র্যাজুয়েশন শেষ হতে চলল। টুয়া ঠিক করল সে বিয়ে করে এখান থেকে চলে যাবে। তাকে দেখতে সুন্দর। কাজেই ভালো ঘরেই তার বিয়ে হবে। টাকাপয়সার অভাব হবে না। মা বাবা পাত্র খোঁজার আগেই দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বিয়েতে গিয়ে বরের বন্ধুকে তার পছন্দ হয়ে গেল। ছেলেটাকে দেখতে খুব সুন্দর। চাকরি করে। স্বচ্ছল। টুয়া গোঁ ধরে বসল একেই সে বিয়ে করবে। শ্রীর বাপী রাজি হয়ে গেলেন। তাঁর এই শেষ কন্যাটি রয়েছে। এর বিয়ে দিয়ে দিতে পারলে খানিক ফাঁকা হওয়া যায়। কিন্তু শ্রীর মা বেঁকে বসলেন। বললেন, ঠিক মতো খোঁজ খবর না নিয়ে বিয়ে দেবেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল ছেলের বাবা একটি অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে তার মাকে ছেড়ে চলে গেছে। তিন বোনের মধ্যে একজনের বিয়ে হয়েছে মুসলমানের ঘরে। আরেক বোন অবিবাহিত। চাকরি করে। ছেলের মদ খাওয়ার অভ্যেস আছে। চাকরির জায়গায় রগচটা বলে দুর্নাম আছে। এতো কিছুর পরেও কেবল টুয়ার আগ্রহেই বিয়ের কথাবার্তা এগোলো। ছেলের মা তো এসে টুয়াকে আদর করে চুমুই খেয়ে ফেলল। এসব দেখে শুনে শ্রী মনে মনে বিরক্ত হচ্ছিল। মেজ বোনটা তো ওইরকম একটা নিষ্কর্মার পাল্লায় পড়েছে। টুয়া কার পাল্লায় পড়তে যাচ্ছে কে জানে! শেষমুহূর্তে টুয়াও যে একটু দুশ্চিন্তায় পড়েনি তা নয় ! একবার বললও যে, এই দিদি, তোরা ভালো না বুঝলে বিয়েটা ক্যানসেল করে দে। কিন্তু ততদিনে বিয়ের নেমন্তন্ন অবধি হয়ে গেছে। আর কিছু করার নেই। টুয়ার বিয়ে হয়ে গেল।
২২
ফুলশয্যার রাতেই টুয়া বুঝতে পারল জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল সিদ্ধান্তটা সে নিয়েছে। এই ছেলেকে বিয়ে করা তার উচিত হয়নি। ফুলশয্যার রাতে অর্জুন ঘরে ঢুকতেই টুয়া একটা বিকট গন্ধ পেল। বুঝল অর্জুন এতোক্ষণ মদ খাচ্ছিল বন্ধুদের সঙ্গে। বিয়ের পুরো আসরটাই অর্জুন বন্ধুদের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ির নানা অসুবিধে নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছে। সবসময়ই তার ভুরু কুঁচকে আছে, মেজাজ দেখাচ্ছে। আজ ফুলশয্যার দিনও সে মদ খেয়ে ঢুকল। ঢুকেই বলল, তোমার বাবা, এই ঘড়িটা কোথা থেকে কিনেছে? বিলটা দিও। এটা চেঞ্জ করব। এতো কম দামি জিনিস আমি পরি না।
টুয়ার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, বাবু তো দামি ঘড়িই দিয়েছে। তুমি যেমন চেয়েছিলে। বলতে বলতেই টুয়ার গালে ঠাস করে একটা চড় পড়ল। টুয়া প্রথমটায় হকচকিয়ে গেছে। তাকে তার স্বামী মারল! তাও আবার ফুলশয্যার দিনে!
ততক্ষণে অর্জুনের আঙুল নড়তে শুরু করেছে টুয়ার নাকের ডগায়। আমার মুখের ওপর কথা বলবেনা বুঝেছ! আমি যা বলব শুনে চলবে। না হলে কিন্তু… অর্জুন আবার চড় দেখায়।
টুয়ার ঠোঁটের কোণটা কেটে গিয়েছে। টুয়া হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে। অর্জুন তার মুখ চেপে ধরে। দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে অকথ্য গালাগালি দিতে দিতে বলে এসবে অভ্যস্ত হয়ে যাও মামনি। এইটুকুতে এতো কাঁদলে হবে!
টুয়া বিস্ফারিত চোখে অর্জুনকে দেখে। ভাবে, এতো সুন্দর চেহারার পিছনে এতো শয়তানি!
কয়েদিনের মধ্যে সে বুঝতে পারে এ বাড়িতে সকলেরই গায়ে হাত তোলার অভ্যেস আছে। ইতিমধ্যেই ননদ একদিন চুলের ঝুঁটি ধরে নেড়ে দিয়েছে। শাশুড়ি সব দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। খোকন বলতে তিনি অজ্ঞান। তার খোকনের একটু মাথা গরম এই যা!
অষ্টমঙ্গলাতেই টুয়া এলো কাঁদতে কাঁদতে। সব শুনে শ্রীর বাপী -মা কি যে বুঝলেন, তারাই জানেন! শুধু বললেন, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। একটু মানিয়ে গুছিয়ে নে। শ্রী কিন্তু পুরো ব্যাপারটায় অত্যন্ত হতাশ হলো। টুয়ার ওপর তার রাগই হলো। একটু সময় দিল না মেয়েটা। এ বাড়িতে থাকতে পারছিনা বলে আগে ভাগে বিয়ে করে বসল। এই ছেলেটার রূপ দেখেই গলে গেল। আরো পাত্র খোঁজা খবর করার সুযোগই দিল না। টুয়া দেখতে সুন্দর। কত ভালো সম্বন্ধ ওর হতে পারত! শ্রী প্রেম বিষয়টাকে আর ভালো চোখে দেখতে পারে না। প্রেম করে মেয়েগুলো নিজেদের সর্বনাশ করে। তার নিজের জীবনের ঘটনাটাও তো তাইই। বাবা মার ওপর অভিমান করে বিয়ে করে বসল অনন্তকে! তারপর থেকেই তো চলছে! এবার টুয়াকে নিয়ে শুরু হলো। যদিও টুয়ার সবে বিয়ে হয়েছে। এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। এখনো বদলানো যেতে পারে সবটা! কিন্তু ওই ভাবনাটুকুই সার। টুয়া পরেরবার এসেই খবর দিল ও প্রেগনেন্ট। শ্রীর আরো খানিকটা হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
ওদিকে আর একটি কাণ্ড ঘটল। অনন্তর হঠাৎ অর্জুনকে পেয়ে খুব নিজের বলে মনে হলো। সে এই কদিনেই তার শ্বশুরবাড়ির লোকের বেশ ভালোরকম শত্রু হয়ে উঠতে পেরেছে। অনন্তর হীনমন্যতা বোধ অনন্তকে এদের বাড়িতে ব্রাত্য করে রেখেছে বলেই অনন্ত বিশ্বাস করে। ফলে অনন্ত কথা বলার লোক পেয়ে গেল। এবং একদিন সুযোগ পেয়ে শ্বশুরবাড়ির সম্পর্কে প্রায় সবরকমের খারাপ কথা অর্জুনকে বলল। এমনকি সেজ কাকুর সঙ্গে শ্রীর মার সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহের কথাটাও বলল। অর্জুন সেদিনই বাড়ি ফিরে সর্বস্ব টুয়াকে বলল। খানিক গালিগালাজ করল। এবং টুয়া জিজ্ঞেস করায় অনন্তর কথাও বলল।টুয়া পরদিন শ্রীকে ফোনে সবটা জানাল। অনন্ত বোধহয় ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছিল। শ্রী কিছু বলার আগেই অনন্ত বিকেলের দিকে স্টেশনে ছুটল।যে ট্রেনে অর্জুন বাড়ি ফেরে সেই ট্রেনে অর্জুনের সঙ্গে দেখা করে এই পুরো বিষয়টা থেকে অনন্তর নাম বাদ রাখতে বলল। কিন্তু অর্জুন সেই কথাটাও টুয়াকে গিয়ে বলে দিল। সেইসঙ্গে অনন্তকে ভেড়ুয়া বলে টিটকিরি করল। টুয়া এই সব ঘটনায় অবাক হয়ে গেছিল। অনন্তদা, তার বড় জামাইবাবু। তার কোলে বসে টুয়া গান শিখেছে। সে কি না টুয়ার বিরুদ্ধে এমন ষড়যন্ত্র করছে! অর্জুন টুয়ার শরীরের এই অবস্থার মধ্যেও ওকে চড়থাপ্পর মেরে চলেছে। টুয়া কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে শ্রীকে। শ্রী ভাবে কোন্ নরকে সে পড়ে আছে। আর কোন্ নরকে গিয়ে পড়ল তার ছোট্ট বোনটা! বাপী -মা মেয়েকে ফিরিয়ে আনার কথা বলতে ভয় পায়। কী ভবিষ্যৎ হবে মেয়েটার! আবার পেটে বাচ্চা এসে গেছে। শ্রীর বাপী কি করে পারবে এই দায়িত্ব সামলাতে! অস্মি তো জামাইসহ মোটামুটি বাপীর ঘাড়েই আছে। সেও অন্তঃসত্তা। তার স্বামীও সুস্থ নয়। আস্তে আস্তে অস্মি স্বীকার করেছে ওর বরের প্রচণ্ড সন্দেহ বাতিক মন। অস্মি কোনো পুরুষ মানুষের দিকে তাকালেই সমস্যা। বাসে উঠে অস্মিকে তাই জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। বাসের ভেতরে তাকানোর হুকুম নেই। সেইসঙ্গে ওর দাদা বৌদির সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে নানা গোলমাল আছে। অস্মি যাতে সেসব বুঝতে না পারে তাই অস্মিকে বেশিরভাগ সময়ই বাপের বাড়ি রেখে দেওয়া। এসব দেখে শুনে শ্রী কি করবে ভেবে পায় না। একমাত্র ভাইটা পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছে। বাপীর পাশে আর্থিক ভাবে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। বোনেদের অবস্থা দেখে তার আর নিজের কথা ভাবতে ইচ্ছে করে না। তাকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে খেতে হবে সে পরিশ্রম করে যায়। বাড়ির কাজ, রোদ – জল মাথায় করে শাড়ি নিয়ে নিয়ে নানা বাড়িতে বিক্রি করা, বাড়িতে কাস্টমার এলে তাদের সামলানো, ধার বাকির টাকা চাইতে গিয়ে অপমানিত হওয়া এসবই চলতে থাকে তার জীবনে। এর থেকে মুক্তির আশু কোনো সমাধান সে পায় না। ঋতির বন্ধুদের মায়েদের দেখে শ্রী। ওরা কত সুখী! বাড়িতে রান্নার লোক, কাজের লোক। মেয়েদের পড়াশোনা, নিজেদের আড্ডা, বেরাতে যাওয়া এই নিয়েই আছে। শ্রী তো কোনোদিন বেড়াতেই যেতে পারল না। সেই বিয়ের পর একবার দীঘা গেছিল। তারপর থেকে বারদুয়েক বম্বে গেছে ছোট দেওড়ের বাড়িতে। কিন্তু সেখানেও বাসন মেজে, ঘরের কাজ করে তাকে খেতে দিয়েছে। ওকে কি আর বেড়াতে যাওয়া বলে! ভালো করে শহরটা কেউ তাকে দেখালই না। এভাবেই তবে তার জীবনটা চলবে!
২৩
ঋতিকে আঁকার স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। ঋতি একদমই আঁকতে পারে না। একটা সোজা দাগ কাটাও তার পক্ষে সম্ভব নয়। এদিকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন ছবি আঁকতে হয় পরীক্ষায়। ফলে তাকে আঁকার স্কুলে ভর্তি করা হলো। যদিও প্রথমে রুশিকে ভর্তি করা হয়েছে। তারপর ঋতিকে। বলাবাহুল্য আঁকার মাষ্টারমশাইয়ের মাইনে অনন্তর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে ওটা গিয়ে পড়ল বিশ্বদেবের ঘাড়ে। বিশ্বদেব বিরক্ত হলেন। কিন্তু কিছু উপায়ও পেলেননা। ভাইয়ের ওপর রাগ আরো খানিকটা বাড়ল। রুশি ইতিমধ্যেই ভালো ছবি আঁকতে শিখেছে। প্যাস্টেল শেষ করে ওয়াটার কালার ধরেছে। মাষ্টার সুবল সরকার ওকে নিয়ে বেশ আশাবাদী। ঋতি মূলত বিজ্ঞানের আঁকাগুলোই প্র্যাকটিস করে। কিন্তু মাঝে মাঝেই অন্যরকম ছবি আঁকার চেষ্টা করে। প্যাস্টেলেই আঁকে। তখন বোঝা যায় চেষ্টা করলে আঁকাটা ঋতিরও হবে বৈকি। তাছাড়া আঁকার স্কুলে ভারি মজা। ওখানে ঋতির কিছু বন্ধুও আঁকা শিখছে। মাস্টারমশাই মাঝে মধ্যে ওদের খেলতে পাঠিয়ে দেন। ভিতরের উঠানে বেশ বড়ো জায়গায় ওরা ছুটোছুটি করে খেলে। ঋতি স্কুলের টিফিন টাইমেও ছুটোছুটি করে খুব। টিফিন খাওয়ার তার সময়ই হয় না। আবার এক একদিন অবশ্য অন্যরমও হয়। সেদিন ঋতির খেলতে ভালো লাগে না। স্কুলের মাঠে ঘুরে ঘুরে ও টিফিন খায় অথবা খায় না, আর কি যেন ভাবে! ওদিকে কাক ডিম সেদ্ধ নিয়ে উড়ে পালায়। আগে এমনটা মাঝেসাঝে হতো। এখন প্রায়ই হয়। ছুটির সময় ওর বন্ধুরা শ্রীর কাছে অভিযোগ করে, কাকিমা, ঋতির টিফিন আজকেও কাকে খেয়ে নিয়েছে। ঋতি হাঁ করে থাকে। কথা বলে না।
সেদিন আঁকার স্কুলে একটা অন্যরকম ঘটনা ঘটে গেল। সেদিন বেলার দিকে ঋতি আঁকা শিখতে গেছে। বড়ো বড়ো দিদিদের ক্লাস হচ্ছিল। তারা মূলত ন্যুড ফিগার আঁকছিল। ঋতিকেও মাস্টারমশাই একটা কঠিন আঁকা দিয়ে বসিয়ে রেখেছিল। সেদিন রুশি যায়নি। দুপুর হয়ে গেলে মাষ্টারমশাই একে একে দিদিদের ছেড়ে দিচ্ছিল। ঋতির আঁকা অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। কিন্তু মাষ্টারমশাই ঋতিকে কিছুতেই ডাকছেনা। সবাই চলে গেলে তার ডাক পড়ল। মাষ্টারমশাই ওর খাতাটা নিয়ে হঠাৎই লাইট এন্ড শেড বোঝাতে শুরু করল। ঋতি মন দিয়ে শুনছে। মাষ্টারমশাই একে একে জানলা দরজা বন্ধ করে দূরের একটি জানলার একটা পাল্লা খোলা রেখে ঋতির গায়ে সেই আলো কেমন করে পড়ছে বোঝাচ্ছে। বোঝাতে বোঝাতে ঋতির ফ্রকটা মাষ্টারমশাই অল্প অল্প নিচ থেকে তুলছে। ঋতির অস্বস্তি হচ্ছে। ঋতি বলতে পারছে না। ভয় করছে তার। মাষ্টারমশাই পেট অবধি জামাটা তুলে হঠাৎ ঋতিকে জিজ্ঞেস করল, আর তুলব? ঋতি হতভম্বের মতো মাথা নাড়ল। মাষ্টারমশাই জামাটা ছেড়ে দিয়ে ঘরের দরজা খুলে ঋতিকে বাড়ি চলে যেতে বলল। ঋতি খাতাপত্র গুছিয়ে বেড়িয়ে এলো। তখন দুপুরের চড়া রোদ। ঋতি যেন কেমন ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফিরল। এবং কাউকে কিচ্ছু জানাল না। ও যেন কেমন করে জানে এসব কথা বলতে নেই। মাকে তো নয়ই, বাবাকেও না।ঋতির কোনো কষ্ট হচ্ছে না। মাষ্টারমশায়ের ওপর রাগও হচ্ছে না। মনে হচ্ছে মাষ্টারমশাই একটা অন্যায় করলেন। কিন্তু কি সে অন্যায় তাও সে ভালো করে বুঝতে পারছে না। আজ স্নান করতে করতে ঋতি নিজের গায়ে হাত বোলাচ্ছিল। ঠিক যেমন করে মাষ্টারমশাই তার পেটে হাত বোলাল। আরো নিচে কেমন একটা আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিল। ওইরকম আলতো করে আঙুল ছুঁয়ে কেমন শিরশির করে উঠল। ঋতির আরো ভেতরে হাত দিতে ইচ্ছে করছে। ভিতরটা ভিজে। ঋতি আঙুল দিয়ে খেলছে। তার ভালো লাগছে। খুব ভালো লাগছে। শরীরের ভিতর কি যেন একটা হতে চলেছে ঋতি টের পাচ্ছে। কি যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি! মিনিট দুয়েকের মধ্যে ঋতির শরীরটা দুলে উঠল। প্রচণ্ড একটা ঝাঁকুনি লাগল। তার আঙুল দিয়ে গড়িয়ে নামছে আঠা আঠা যেন কি। ঋতির কেমন হালকা লাগছে। তার এখন আর একদম ভয় লাগছে না। কারো কথা মনে পড়ছে না। শুধু একটা বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর। আর সে দৌড়োচ্ছে। ভীষণ দৌড়চ্ছে। দুকানের পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে। ঋতি দৌড়চ্ছে। তার চুলগুলো হাওয়ায় ঘোড়ার ঘাড়ের লোমের মতো উড়ছে। চোখে মুখে এতো হাওয়া লাগছে যে ঋতি চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। কিন্তু দৌড় থামায়নি। শূন্যের মধ্যে ভেসে থাকা ওই বিস্তৃত প্রান্তরে ঋতি দৌড়চ্ছে। একটুও হাঁপাচ্ছে না। কষ্ট হচ্ছে না। পাগলের মতো মনের মধ্যে আনন্দ হচ্ছে। ভীষণ আনন্দে ঋতি জোরে জোরে গান গাইছে। আর দৌড়চ্ছে। হঠাৎই বিশ্বদেব মুখ বাড়িয়েছে বাথরুমের জানলা দিয়ে। এতক্ষণ কী করছিস! ঋতি তখন ল্যাংটো। বিশ্বদেব একবার ঋতির দিকে তাকিয়ে চোখ লাল করে বলে শিগগিরই বেরিয়ে আয়। ঋতি তাড়াতাড়ি করতে পারছে না। হাত পা অবশ লাগছে। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। পা দুটো যেন তার চলছেনা। ওদিকে বিশ্বদেব তার নামধরে ডাকছে। চিৎকার করছে। তাড়াতাড়ি বেরোতে গিয়ে বাথরুমের দেওয়ালটা ঋতির মাথায় ঠুকে গেল। জ্যেঠুর কাছে দৌড়ে ঋতি পৌঁছেছিল মনে আছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন হুঁশ ফিরল তাকিয়ে দেখল মা তাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। আর জ্যেঠুকে বলছে, আপনি ওকে ওভাবে চিৎকার করে ডাকছিলেন কেন! বলুন, কেন ডাকছিলেন! বলুন! মার গলাটা যেন একটু কেঁপে গেল। ঋতি উঠে বসল। মাথায় বরফ দেওয়া হলো। বাকি দিনটা ঋতি গম্ভীর হয়ে রইল। তার কিছু ভালো লাগছে না। ভয় করছে। মনে হচ্ছে সে খুব গুরুতর কোনো অন্যায় করেছে। তাকে শাস্তি পেতে হবে। সারাটাদিন মনটা তার অজানা আশঙ্কায় কাঁটা হয়ে থাকল।
২৪
বিজয়দেব আর্থিক ভাবে খুবই দূরবস্থার মধ্যে পড়েছে। পিয়ারলেসের রমরমার সময়টা বিজয়দেব এতোটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে চাকরিটা ছেড়ে দেয়। ইনকামও হচ্ছিল ভালোই। বিশ্বদেব লোন নিয়ে তাকে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছে। সেই লোন শোধের ভার বিজয়দেবের। কিন্তু হঠাৎই পিয়ারলেস ডুবতে শুরু করেছে। বিজয়দেব পড়েছে ফাঁপরে। অন্য রাজ্যে মেয়ে-বউ নিয়ে থাকা। মেয়েটার পড়াশোনা আছে। অন্য খরচ-খরচাও আছে। বিশ্বদেব কিছু কিছু করে টাকা পাঠাচ্ছে। কিন্তু সে আর কতটুকু! ডাল-ভাত-আচার খেয়ে কোনোরকমে তাদের দিন কাটছে। মেয়েকে অবশ্য রোজ একগ্লাস দুধ খাওয়ায় সম্পূর্ণা। বিজয়দেব শেষপর্যন্ত পেন তৈরির ব্যবসায় নেমে পড়ল। বাড়িতেই মেশিন কিনে পেন বানাতে শুরু করল। একটা পেনের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হলো। কিন্তু তাতেও সমস্যা মিটছে না। বিজয়দেব নানা কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে থাকে। সেদিন মেয়েটা কিছুতেই পাউরুটি টোস্ট খেতে চাইছিল না। বিজয়দেব প্রথমে খানিকটা বকাবকি করল। তারপর জোড় করে মেয়ের মুখে পাউরুটিটা ঠুসে দিতে গিয়ে মেয়েটার টাকরা কেটে গিয়ে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে গেল। অনুশোচনায় বিজয়দেব নিজের গালেই চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করল। দেওয়ালে মাথা ঠুকতে শুরু করল। সম্পূর্ণাও মেয়েটাকে খুব মারে। কথায় কথায় মারে। কিন্তু এখন সম্পূর্ণা মেয়েকে কোলে করে বিজয়দেবকে দুষে চলেছে। পরিস্থিতি এতোটাই জটিল হয়ে গেল যে বিশ্বদেব ফোনে খবর পেয়ে ভাইকে কিছুদিন কলকাতায় এসে থাকতে বলল। বিজয়দেব উপায়ান্তর না দেখে কিছুদিনের জন্য কলকাতা আসাই মনস্থ করল। সম্পূর্ণার ইচ্ছে ছিল বাপেরবাড়ি চন্দননগরে যাবে। সেখানে তার মেজ জামাইবাবুও বড়ো ব্যবসায়ী। দিলদরিয়া মানুষ। সব ঠিক সামলে নেবে। কিন্তু বিজয়দেব বা বিশ্বদেব কেউই এই প্রস্তাবে রাজি হলো না। ফলে ব্যারাকপুরের বাড়িতেই সম্পূর্ণাকে থাকতে হলো। মাধুরী কোনোদিনই সম্পূর্ণাকে পছন্দ করে না। সম্পূর্ণা ফর্সা, রোগা, মাথা ভর্তি চুল। বিশ্বদেব যেন একটু বিশেষভাবেই পছন্দ করে সম্পূর্ণাকে। সম্পূর্ণাও খোলাখুলি এমন কথা বিশ্বদেবের সঙ্গে বলতে পারে যা শুধু রাগেশ্রী নয়, মাধুরীরও বলতে অসুবিধে হয়। মাধুরীর বাপের বাড়ি বিরাট পরিবার; চোদ্দ জন ভাইবোন। তাদের বিয়ে- থাওয়া, দেওয়া -দেওয়ি চলতে থাকে। বিশ্বদেব বিরক্ত হয়। গ্রামের শ্বশুরবাড়ি, শ্বশুরমশাই দুই শালার কেন্দ্রিয় সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, ফলে তাদের নির্দিষ্ট আয়, জমিজমা থেকেও ভালোই আয় হয়, এসব বিশ্বদেব মেনে নিতে পারে না। তার বাবা তো তাদের ভাইবোনেদের জন্য কিছুই করে যেতে পারেনি। সে একজন সেলফমেড ম্যান। ভাইবোনেদের বড়ো করেছে। এ নিয়ে অহঙ্কার এবং ক্ষোভ দুইই আছে বিশ্বদেবের। মাধুরী এসব সময়ে বিশ্বদেবকে নানা কিছু বোঝায়। বলে, ভালো জিনিস, সোনা এসবই উপহার দিতে হবে। তা নাহলে তোমার সম্মান থাকবে না। ওদের মধ্যে তুমিই তো সবচেয়ে অবস্থাপন্ন। তোমার বাড়ি,গাড়ি…. যদিও গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে বিশ্বদেব। হাতিপোষা হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মাধুরীর এই টোপটা বিশ্বদেব খায় ভালো। সে বড়োলোক। তার শালা -শালীদের সেসব দেখাতে হবে বৈকি। ফলে মাধুরীর বাপের বাড়ির যে কোনো অনুষ্ঠানে দামি উপহার দেওয়া হয়। কিন্তু একদিনের জন্যও যদি গ্রাম থেকে কেউ মাধুরীর সঙ্গে দেখা করতে আসে বিশ্বদেবের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। তাদের খাওয়া -দাওয়া, ওঠা-বসা সব কিছু নিয়েই অপমান করতে থাকে বিশ্বদেব। সব বুঝেও মাধুরী কিছু বলতে পারে না। বাপের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না বিশেষ। সম্পূর্ণার বাড়ির লোককেও হৈমবতী নানাভাবে অপমান করতেন। তাদের অ্যাসবেস্টেসের ঘর, সম্পূর্ণার পড়াশোনা না করা, মেজো জামাইয়ের পয়সায় থিয়েটার,সিনেমা দেখে বেড়ানো এসব নিয়ে নানা কটূ কথা সম্পূর্ণাকে ও তার পরিবারকে শুনতে হয়েছে। কিন্তু বিশ্বদেব বাড়ির কর্তা হওয়ার পর থেকে সম্পূর্ণার জায়গাটা বিশেষ হয়ে উঠেছে। বিশ্বদেব স্নেহ করে সম্পূর্ণাকে। তার রূপে মুগ্ধও বটে। ফলে ব্যারাকপুরের বাড়িতে এসেও সে নানাভাবে খবরদারি করে। মাধুরী তাই সম্পূর্ণা এলে খুশি হতে পারে না।তার চোখ আরো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। সবসময় সে শশব্যস্ত থাকে। মাধুরী বিশ্বদেবের সঙ্গে আলাদা করে নানা কথা আলোচনা করে। মাধুরীর তখন মেজাজ তুঙ্গে ওঠে। অকারণে রাগ করে। রুশিকে মারধর করে। বেশি বেশি কাজ করে। সেই সঙ্গে আছে সম্পূর্ণার মেয়ে। সে বেশ সরেস। রুশিকে সে মারে। রুশি কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করে মায়ের কাছে। মাধুরী সম্রাজ্ঞীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে বম্মা, রুশিদিদি তো ঋতিকে ধরে মারছিল। রোজই মারে। তাই আজকে আমি ওকে মেরেছি। মাধুরীর নিজের মেয়ের গায়ে হাত পড়ায় মাথা গরম হয়ে ওঠে। ঋতি যে রোজ মার খায় রুশির কাছে তার জন্য মেয়েকে শাসন করার কথা মনে থাকে না।
সম্পূর্ণার সঙ্গে আবার রাগেশ্রীর খুব বন্ধুত্ব। বিশ্বদেব তার কাছে শ্রীর নামে নিন্দেমন্দ করলে সম্পূর্ণা তার প্রতিবাদ করে। শ্রীর সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের খতিয়ান দেয়। এসব মাধুরী একেবারেই মেনে নিতে পারে না। তার মনে হয়, এ সংসার তার। তারই কর্তৃত্ব চলবে। দেওররাও তাকেই মান্য করবে। কিন্তু সেটা যেন কিছুতেই হয় না। সে না পারছে তার স্বামীকে ধরে রাখতে। না পারছে ছোট দেওরকে। একমাত্র মেজ দেওরই যা বৌদি বৌদি করে। এসব নিয়ে ঘোষাল বাড়িতে ভিতরে ভিতরে অশান্তি চলতেই থাকে। কেউ এখানে কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়ে না। যে যার নিজের স্বার্থ নিয়ে আছে। অথচ যৌথ পরিবার, বাড়ির কর্তা এসব বিষয়ে দেখনদারি আছে ষোলো আনা। কিন্তু সেই নমনীয়তা নেই। সেই দৃঢ় বাঁধন নেই। টাকার বিচারে এখানে সম্মান নির্ভর করে।
২৫
বিজয়দেবকে কিন্তু বেশিদিন কলকাতায় থাকতে হলো না। বম্বেতে যাদের সঙ্গে তার টিম ছিল তারা একটি নতুন ক্রেডিট কার্ডের ব্যবসা শুরু করবে বলে পরিকল্পনা করল। বিজয়দেব নিজের জমানো পুঁজি এই ব্যবসায় খাটাতে রাজি হলো। ফলে সে দ্রুত বম্বে ফিরল। বিশ্বদেবও এই ব্যবসায় যোগ দেবে। সেও মতামত জানিয়ে রাখল। কিন্তু এখনই ইনভেস্ট করল না। ক্রেডিট কার্ডের ব্যবসা তখনও তেমন জনপ্রিয়তা পায়নি। মানুষ কতটা বিশ্বাস করবে সে নিয়ে বিশ্বদেবের সংশয় ছিল। তাছাড়া সে সেই সত্তর সাল থেকে পিয়ারলেস করে ভালো ইনকাম করেছে। দুই মেয়ের পড়াশোনা, বিয়ে, তার আর মাধুরীর দুজনের বাকি জীবন ভালো ভাবেই চলে যাবে। তাই এখনই কোনো নতুন ব্যবসায় ইনভেস্ট করতে তার মন সায় দিল না। বিজয়দেব চলে যেতে সকলেরই খুব মন খারাপ হলো। কেবল মাধুরী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আর স্বস্তি পেল ঋতি। ঋতি তার ছোটো কাকা – কাকিমাকে ঠিক পছন্দ করতে পারে না। ছোটো কাকা অর্থাৎ রুচি, রুশি আর ঋতি যাকে বিজু বলে ডাকে সেই বিজু যেন কেমন রাগী। অবশ্য তার জ্যেঠুও রাগী। কিন্তু জ্যেঠুকে ঋতি ভালোবাসে। জ্যেঠু মারে ঠিকই, আবার নতুন জামা কিনে আনে বম্বে থেকে। ভয় পেলেও জ্যেঠুর প্রতি একটা টান আছে ঋতির। বিজু কিন্তু খুবই অদ্ভুত। অকারণে বকাবকি, রাগারাগি এসব করে। সেদিন তারা সবাই খেতে বসেছে। রুচি মাছের ছাল খায় না। বিজু হঠাৎ রুচিকে কিছু না বলে ঋতিকে চোখ রাঙিয়ে বলতে শুরু করেছে মাছের ছালটা খেয়ে উঠবি। ঋতি আবার মাছের ছাল খেতে ভালোবাসে। সে ওটা আলাদা করে সরিয়ে রেখেছে সবার শেষে খাবে বলে। ঋতি বলে ওঠে, আমি তো মাছের ছাল খাই। ভালোবাসি। ওমনি বিজু চোয়াল শক্ত করে ফেলেছে। ওর দিকে স্থির নিষ্পলক তাকিয়ে বলেছে, তুমি আমার মুখে মুখে কথা বলছ! ঋতি হাঁ হয়ে গেছে। সে আবার মুখে মুখে কথা বলল কখন! সে তো মাছের ছাল খেতে ভালোবাসে সেটুকুই বলেছে। ঋতি হাঁ করে থেকেও বোঝে দিদিভাই মাছের ছাল খায় না বলে দিদিভাইকে সরাসরি কিছু না বলে তাকে বলা হলো। এ আবার কি অদ্ভুত শাসন রে বাবা! রাগেশ্রীও সব বোঝে, বড়োলোক দাদার মেয়েকে শাসন করা যায় না। গরীব দাদার মেয়েকে যখন তখন চোখ রাঙানো যায়। মেয়েটা তার এমনিতেই ভীতু প্রকৃতির। তার ওপর সর্বক্ষণ শাসন করলে ও তো কথা বলতেও ভয় পাবে!
কিন্তু যত যাই হোক, ঋতিকে এভাবে দমিয়ে রাখা যাবে না। ঋতি পড়াশোনায় ভালো, স্কুলে প্রত্যেক বছর সে রাঙ্ক করে। বেশিরভাগ সময়ই সব সেকশন মিলিয়ে ক্লাসে ফোর্থ হয়। কেন একবারও ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড হতে পারে না সে নিয়ে অনেক ভেবেছে রাগেশ্রী। খুব অদ্ভুত ভাবে ফার্স্ট টার্ম, হাফ-ইয়ারলিতে ঋতি প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকে। পরীক্ষার খাতা দেখতে গিয়ে শ্রী দেখেছে ঋতির খাতা চমৎকার। গোটা গোটা লেখা। খাতায় কোথাও কাটাকুটি নেই। এমন খাতায় নম্বর না দিয়ে উপায় নেই। কিন্তু ফাইনালে কি হয়! ফাইনালে প্রত্যেকবার ঋতির নম্বর কমে যায় কেন! ওর ফাইনাল পরীক্ষার দিনগুলোতে শ্রী ঋতিকে খানিকটা বাধ্যই করে স্কুলে পরীক্ষা দিয়ে এসে আবার বাড়িতে তিন ঘণ্টা সময়ে পরীক্ষা দিতে। ঋতি বিরক্ত হয়, কখনো কখনো কান্নাকাটি করে। কিন্তু মার ভয়ে বাধ্য হয়। শ্রী দেখে ও আগের পরীক্ষা গুলোর মতো এই পরীক্ষাগুলোতেও চমৎকার লেখে। তাহলে নম্বর কমে যায় কেন! ঋতির এক দিদিমণি একবার শুধু একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বোঝেনই তো সব! শ্রী বোঝে, ব্যক্তিগতভাবে ঋতিকে যদি প্রাইভেটে ওর স্কুলের দিদিমণিদের কাছে পড়তে পাঠানো যেত, ঋতিও প্রথম তিনজনের মধ্যেই থাকত। কিন্তু সেটাতো শ্রীর পক্ষে সম্ভব নয়। অনন্ত বলে ছাড় তো, এই ক্লাস টু/ থ্রিতে কি রেজাল্ট করছে সেটা কোনো ব্যাপারই নয়। ক্লাস এইট থেকে বোঝা যাবে সবটা! মাধ্যমিকের রেজাল্টটাই আসল। ঋতি কিন্তু এতো বোঝে না। সে প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকতে পারল কি না তা নিয়েও তার বিশেষ ভাবনা চিন্তা নেই। তার বন্ধু প্রত্যেকবছর প্রথম হয় – এটাই তার আনন্দ। ঋতি স্কুল থেকে দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি ফিরে আগে বন্ধুর কথা বলে, জানো মা দিতি আবার ফার্স্ট হয়েছে। শ্রী মেয়েটার সারল্যে হাসে। বলে তুই কি হয়েছিস! ঋতি হাসি হাসি মুখে বলে, আমি আবার ফোর্থ হয়েছি। শ্রী বোঝে ঋতি আসলে মনের দিক থেকে খুব খাঁটি। ও কাউকে হিংসে করতে জানে না।
গানটাও ঋতি ভালো গায়। এর মধ্যেই ওর ক্ল্যাসিকালে ফার্স্ট ইয়ারের পরীক্ষা দেওয়া হয়ে গেছে। পরীক্ষক তো ওকে দেখেই অবাক। এইটুকু মেয়ে পরীক্ষা দেবে কি! কিন্তু তারপর ও যখন চয়েজ রাগটাগ গেয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল তখন পরীক্ষক যারপরনাই খুশি। বিশেষত এইটুকু মেয়ে ঝাঁপতাল হাতে ভেঙে দেখিয়ে দিল। এসব ওকে অনন্ত হাতে ধরে শিখিয়েছে। শেষে পরীক্ষককে প্রণাম করতে গেলে ভদ্রলোক নিজেই হাত জোড় করে মাথার ওপর ঠেকিয়েছেন। ঋতি খুব মজা পেয়েছিল। গানেতেও ঋতি কিন্তু রুচির থেকে বেশি নম্বর পেয়েছে। তবু গান নিয়েও মেয়েটাকে নানাভাবে ঐলিক করা হয়। স্বপ্নাদি বিশ্বদেবকে খুব ভালো বোঝেন। বিশ্বদেবের সামনে ইচ্ছে করে ঋতিকে গান নিয়ে বকাঝকা করেন। রাগেশ্রী যেদিন দুই মেয়ের হাত ধরে খড়দায় আসে গান শেখাতে সেদিন কিন্তু স্বপ্নাদি দুজনকেই যত্ন করে গান শেখান, ওদের গান শোনেন। কিন্তু বিশ্বদেব সামনে থাকলেই স্বপ্নাদি ঋতিকে বলেন, গানটা শেষ করতে পারলেই বাঁচিস না কি! এতো তাড়াহুড়ো করছিস কেন! বিশ্বদেব কটমট করে ঋতির দিকে তাকায়। বলে, তুই গান গাইতে গাইতে হেঁচকি তোলার মতো করিস কেন! ঋতি একথার মানে বোঝে না। সে হাঁ করে থাকে। সে ভাবে আগেরদিন তো পিসিমণি এই গানটা শুনে ভালোই বলল। এরকমই তো সে গেয়েছিল। আজ কি হল! সঠিক কথাটা কিন্তু বলে শিবপ্রসাদদা। ওদের দুজনের গানের জন্য শিবপ্রসাদদা সপ্তাহে একদিন করে এসে তবলায় সঙ্গত করেন। শিবপ্রসাদদা ঋতির গান পছন্দ করেন। বরং রুশীকে তাড়া দেন, বলেন, এতো ঝিমিয়ে পড়ছিস কেন! যে গান যে লয়ে গাওয়ার কথা, তাই তো গাইবি! রুশি সব গানই ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে গাইতে ভালোবাসে। শিবপ্রসাদকে তার একেবারেই পছন্দ নয়।সে বিরক্ত হয়। বাবার কাছে নালিশ করে। ঋতি কিন্তু শ্রীকে কিছুই বলেনা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলে তবে উত্তর পাওয়া যায়। শ্রী সবই বোঝে। এ বাড়িতে তার মেয়েটাকে স্বাভাবিকভাবে বড়ো হতে দেবে না। বকে -ধমকে ওর ব্যক্তিত্ব নষ্ট করে দেবে। শ্রীর মনে হয় সত্যি যদি মেয়েটাকে নিয়ে সে অন্য কোথাও চলে যেতে পারত! কিন্তু কোথায় যাবে! বাপীর এই অবস্থা বোঝার পরও শ্রী একবার অনন্তর সঙ্গে ভীষণ ঝগড়া হওয়ায় মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়িতে উঠেছিল। কিন্তু সে আর কদিন। বাপীর কাছে খাওয়া দাওয়ার অভাব হবে না। কিন্তু পড়াশোনা, গান, আঁকা, এসব তো বাপী চালাতে পারবে না। তাছাড়া ঋতিও ওখানে মানিয়ে নিয়ে থাকতে পারেনি। ঋতি ওর বাবাকে খুবই ভালোবাসে। অথচ অনন্তর ওপর বিশেষ করে সেজ কাকু ভীষণ বিরক্ত।ঋতির সামনেই সেদিন অনন্তর নিন্দে করছিল সেজকাকু। ঋতি ক্ষেপে গেছিল। বারবার বলেছিল, আমার বাবার সম্পর্কে তুমি খারাপ কথা বলবেনা! তারপর কাঁদতে শুরু করল। শ্রীকে বারবার বলছিল, মা,আমি বাবার কাছে যাব! শ্রী চুপ করেছিল। কাকুই আর রাগ সামলাতে না পেরে বলে ওঠে, তুমি দেখছি তোমার বাবার চেয়েও বেশি তেঁদড়! ঋতি তারপর আর কিছু বলে না। চুপ করে যায়। শ্রী তার মেয়েকে চেনে, এই মেয়ে ও কথা ভুলবেনা। ঠিক বাবাকে বলবে। হলোও তাই। অনন্ত মাঝেমাঝেই এসে ঋতিকে ও বাড়িতে নিয়ে যেতে শুরু করল। ঋতিকে জিজ্ঞেস করে করে এবাড়ির খোঁজ খবর নিতে শুরু করল। ঋতিও সরল বিশ্বাসে বাবাকে সর্বস্ব বলত। ঋতি খেয়াল করছিল, দাদুর বাড়ি চলে যাওয়ার পর থেকে জ্যেঠুর বাড়ির সবাই তাকে যেন বেশি বেশিই ভালোবাসছে। বাবা তো আছেই। জ্যেঠুও তাকে মা মা করে কথা বলছে। ভালো ভালো খেতে দিচ্ছে। তার কথা সবাই শুনছে। ঋতি এই গুরুত্বটুকু পেয়ে বর্তে গেল। এমনটাই চলছিল। শ্রীর মাসতুতো বোনের বিয়ে লেগেছে এর মধ্যে। মা মরা মেয়েকে শ্রীর মাই যত্ন করে নিজের ওইটুকু ভাড়া বাড়ি থেকেই বিয়ে দিচ্ছে। সেই নিয়ে শ্রীও কদিন খুব ব্যস্ত হয়ে রইল। অনন্ত মনে মনে হিসেব করল এই বিয়ে বাড়িতে মার সঙ্গে কাজকর্ম করতে হবে বলেই শ্রী ঝগড়া করে চলে এসেছে বাপের বাড়িতে। ফলে অনন্ত বিয়ে মিটতেই ও বাড়িতে ঝগড়া করতে ছুটল। পরিস্থিতি তৈরি হয়েই ছিল। একথায় দুকথায় লেগে গেল। শ্রী দাঁতে দাঁত চেপে অনন্তর অসভ্যতা সহ্য করছিল। শেষপর্যন্ত যখন এ বাড়ির সব কথা অনন্তর মুখে শুনতে শুরু করল, শ্রীর বুঝতে বাকি রইল না ঋতিই এসব কথা বাবাকে গিয়ে বলেছে। মেয়েটাও আসলে তার আপন নয়। বাবার রঙ দেখাচ্ছে। ভাবতে ভাবতেই চোখের সামনেটা কেমন অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। শ্রী অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
২৬
ঋতি ক্লাস ফোরে উঠেছে। বেশ খানিকটা লম্বা হয়েছে। রুচির থেকে ওর হাইট বেশি। দৌড়াদৌড়ি করে খেলে ঋতি। কিন্তু চেহারাটা ঢলঢলে। হাতগুলো গোল গোল। মুখখানাও ছিল বাটির মতো। কিন্তু যত বড়ো হচ্ছে তত একটু যেন লম্বাটে হয়ে যাচ্ছে। ঠিক অনন্তর মতো। কিন্তু খোলামনে ছুটে বেড়ানোর দিন আর ঋতির রইল না। ক্লাস থ্রির ফাইনাল পরীক্ষার আগেই ঋতির পিরিয়ড হয়ে গেল। সেদিন ঋতি বারান্দার দোলনায় বসে ছবি আঁকছিল। সাদা রুমাল ছাঁট টেপ ফ্রক পরে মন দিয়ে ছবি আঁকতে আঁকতে এতোটাই মগ্ন হয়ে গেছিল যে কখন মায়াদি এসে ওকে দেখে শ্রীর কাছে গিয়ে হাতপা নেড়ে কি সব বলতে শুরু করেছে খেয়াল করেনি ঋতি। হঠাৎ মাকে ছুটে আসতে দেখে হাঁ করে মার দিকে তাকিয়ে ছিল ঋতি। শ্রী এসেই ঋতির টেপ ফ্রকটা উল্টে পাল্টে দেখে একজায়গায় চোখ রেখে স্থির হয়ে গেল। মায়ের চোখ অনুসরণ করে ঋতি দেখল সাদা টেপ ফ্রকের একটা জায়গায় লাল লাল ছোপ। ঋতি তাড়াতাড়ি মাকে বলল, মা রঙ লেগে গেছে। আমি ধুয়ে দিচ্ছি। অনেকক্ষণ থেকে তার হিসু পেয়েছে। যাওয়া হয়নি। ঋতি মার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বাথরুমে যেতে চাইছিল। কিন্তু শ্রী ঋতির হাত ছাড়ল না। ওকে সঙ্গে করে বাথরুমে ঢুকল। মাধুরী এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। মনে মনে ভাবল, মেয়েটা যা পাকা! সব কথা গিলছে আর জায়গা মতো উগড়োচ্ছে। তার ওপরে হয়েছে তর্কবাগীশ। হবে না! যেমন মা, তার তেমন ছা। ওই জন্যই দেখোনা, দশ বছর বয়স হয়নি, শরীর খারাপ হয়ে গেল। এখন এসব নিয়ে যত রেলা ভোগ করো।
শ্রী বাথরুমে গিয়ে যা বোঝার বুঝল। ওর কান্না পাচ্ছিল। এতটুকু মেয়ে! হে ভগবান! ও কি করে সামলাবে এতো কিছু! কিন্তু মনের মধ্যে যত তোলপাড়ই চলুক বাইরে শ্রী চূড়ান্ত গম্ভীর হয়ে গেল। ঋতিকে একটা কথাও বলল না। কিছুই বোঝাল না। ঋতি বুঝতে পারছে না হিসু করতে গিয়ে তার অতো রক্ত বেরোচ্ছে কেন! তার তো কোথাও কেটে যায়নি। পেটে অল্প একটা ব্যথা যেন টের পাচ্ছে সে। কিন্তু ব্যাপারটা কিছুই সে বুঝতে পারছে না। মা তাকে কাপড় মুড়ে কি একটা বানিয়ে পরিয়ে দিল। তার হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছে। পেটে ব্যথাটা ক্রমশ বাড়ছে। ঋতি বিছানায় শুয়ে পড়েছে। খানিক বাদে শ্রী এসে দেখল বিছানায় রক্তের দাগ লেগে গেছে। শ্রী কাঁদত কাঁদতে ঋতিকে আবার বাথরুমে নিয়ে গেল। মুখে বলতে লাগল, এই নরক এখন ঘাঁটতে হবে…ঋতি মাকে দেখে বুঝতে পারছিল তার কোনো একটা রোগ হয়েছে। রোগটা গোপন। কাউকে জানানো যাবে না। কিন্তু মা তার সঙ্গে কথা বলছে না। মা রেগে আছে কেন সেটা পরিষ্কার নয়। সে তো আজ দিদিদের ঘরে যায়নি। কাউকে বিরক্ত করেনি। পড়াশোনাও ঠিক মতো করেছে। তাহলে শুধু শুধু মা রেগে আছে কেন! কিন্তু এতো কিছু আর ভেবে উঠতে পারছে না ঋতি। মা বিছানার চাদর পাল্টে দিচ্ছে। তাকে আলাদা করে মাদুরের ওপর শুতে দিচ্ছে – এসব কিছুই আর বুঝতে পারছে না ঋতি। ঋতির ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে। হাত-পা গুলো কাঁপছে। ঋতি কাঁদতে শুরু করল। কিন্তু কেমন করে যে ও বুঝল এই কান্না জোরে জোরে নয়, গুমড়ে গুমড়ে আওয়াজ না করে কাঁদতে হবে।
অনন্ত মিল থেকে ফিরলে শ্রী সব বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল। অনন্ত বিষয়টার গুরুত্ব কিছুই বুঝল না। মেয়ে হয়ে জন্মেছে। এতো হওয়ারই ছিল। রুচিরও নিশ্চয়ই হয়েছে। রুশিরও একদিন হবে। ঋতির একটু তাড়াতাড়ি হলো এই যা। এতে এতো ভেঙে পড়ার কি হলো! শ্রীর সবেতেই বাড়াবাড়ি। কিন্তু শ্রী যখন অনন্তকে বলল ওর জন্য এবার থেকে প্রতি মাসে প্যাড এনে দিও। ওইটুকু বাচ্চা কাপড় সামলাতে পারবে না, তখন অনন্ত যারপরনাই বিরক্ত হলো বটে। আবার একটা বাড়তি খরচা! কাপড় দিয়েই তো চলতে পারে! তা না শ্রীর আবার মেয়ের জন্য প্যাড লাগবে! সবেতেই বাড়াবাড়ি। যদিও এসব কথা এখন না বলে অনন্ত শ্রীর হাতেই টাকা দিল। শ্রীই মেয়ের জন্য প্যাড কিনে আনবে। অনন্ত ওসব বলে দোকান থেকে কিনে আনতে পারবে না। কিন্তু ওই এক মাসই। পরের মাস থেকে অনন্তর মিলে আবার তালা ঝুলল। অনন্ত বলল, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কাপড় দাও ওকে। শ্রী বুঝল কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। ঋতিকে স্নানের সময় কাপড় কেচে বাথরুমের এক কোণে সকলের চোখের আড়ালে রেখে দিতে হয়। রাতে সবাই শুয়ে পড়লে ছাদের এক কোণায় গিয়ে সে কাপড় মেলে আসতে হয়। আবার ভোরবেলা সবার ওঠার আগে ঘুম চোখে সেগুলো তুলে নিয়ে এসে একটা টিনের কৌটোয় রেখে দিতে হয় সকলের চোখের আড়ালে পুরনো জিনিসের ছোট্ট গোডাউনে। সেখানে মাকড়সা,আরশোলা সবই আছে। হাজার পেটে ব্যথা হোক, কষ্ট হোক, কাঁদুক, ঋতির ছুটি নেই। শ্রী কড়া হাতে ঋতিকে দিয়ে এসব কাজ করায়। তাও একদিন ভোরবেলা বৃষ্টি হচ্ছিল বলে ছাদ থেকে কাপড়গুলো তোলা যায়নি। বেলার দিকে বিশ্বদেব ফুলগাছ দেখতে ছাদে উঠে এই রক্তমাখা কাপড় দেখে খুবই বিরক্ত হয়ে মাধুরীকে জানিয়েছে। শ্রী তাড়াতাড়ি ঋতিকে ছাদে পাঠিয়ে কাপড়গুলো তুলিয়েছে। কাপড়ের রক্তের দাগ সাবান দিয়ে ভালো করে পরিষ্কার করেনি বলে ঋতিকে বকেছে। তারপর বাড়ির পিছন দিক দিয়ে সেই কাপড় নিয়ে ঋতিকে বাথরুমে পাঠিয়েছে। সাড়ে ন’বছরের বাচ্চার সঙ্গে এমন আচরণ করতে কারো অসুবিধে হয়নি। কারো মায়া হয়নি। কারো ওর স্বাস্থ্য এবং পরিচ্ছন্নতার কথা মাথায় আসেনি। ঋতি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এই চূড়ান্ত পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকার হয়ে গিয়েছে।
২৭
এমন অশান্তি, অভিযোগ আর অপরাধবোধের মধ্যে থাকতে থাকতে ঋতির আজকাল এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে। অনেক অনেক দূরে সে চলে যাবে। বাড়ির কেউ আর চাইলেই তার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। সেই যে খ্রিস্টান মিশনারী স্কুলগুলোতে যেমন হয়। বাচ্চাদের সঙ্গে বাবা-মায়ের কেবল ছুটির সময় দেখা হয়। ঋতির তাও হবে না। ছুটির সময়ও ঋতি কারো সঙ্গে দেখা করবে না। শুধু পড়াশোনা করবে, ছবি আঁকবে, আর গান গাইবে। এই করতে করতে অনেকগুলো বছর এক লহমায় পেরিয়ে যাবে। বড়ো হয়ে যাবে সে। আর বড়ো হয়ে সে হয়ে যাবে নান; যেমন সিনেমায় দেখায়। কোনোকিছুর প্রতি তার আর কোনো আসক্তি থাকবে না। সে শুধু ভালো ভালো কথা বলবে! সকলের মনের শান্তি ফিরিয়ে দেবে। তারপর আবার দূরে, অনেক দূরে চলে যাবে। বাড়িতে সকলে তার কথা ভাববে। তার প্রশংসা করবে। মা তাকে নিয়ে গর্ব করবে। ছোটোবেলা খুব মেরেছে বলে কষ্ট পাবে। সে কিন্তু আর এসব শোনার জন্য সেখানে থাকবে না। সে চলে যাবে অনেক দূরে… অনেক দূরে… যেখানে আর কেউ তাকে ছুঁতে পারবে না।
ঋতি এখন মাঝে মাঝে গল্পের বই পড়ে। মৃত্যুঞ্জয় তাকে জন্মদিনে, ভাইফোঁটায় গল্পের বই উপহার দেয়। বাবাও একবার জন্মদিনে বই দিয়েছে। ঋতি এই বইগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ে। আর নানা কিছু ভাবে। নতুন নতুন বাংলা শব্দ শেখে। পড়ার বইয়ের কবিতা,গল্প পড়তে তার ভালো লাগে। নিজে নিজে সে নানা কিছু ভাবে। মনে হয় তার ভাবনাগুলো যদি সে লিখে রাখতে পারত। মাঝে মাঝে লেখে অবশ্য। ক্লাসের কোনো পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে ঋতির খুব দুঃখ হয়। মনে হয় সে মরেই যাবে বোধহয়। তার আগে তার এই ছোট্ট জীবনটার কথা লিখে রেখে যেতে হবে তো! কাকাদাদু তাকে না দেখেই হসপিটাল থেকে বেরিয়ে গেছিল। তাকে এখনো খারাপ খারাপ কথা বলে। বাবার সম্বন্ধে বাজে কথা বলে। তার কি ভীষণ কষ্ট হয়! সেই কষ্টের কথা সে লিখে রাখবে লুকিয়ে লুকিয়ে। কাউকে জানাবে না। তার মরে যাওয়ার পর সবাই জানবে সে কত দুঃখী ছিল। মা তাকে ভালোবাসে না। এতো তাড়াতাড়ি শরীর খারাপ হয়ে গেছে বলে মা তাকে ঘেন্না করে। বাবা তাকে ভালোবাসে! কিন্তু বাবা কেন মাকে সব বলে দিল! দাদুর বাড়িতে যা যা কথা হয়েছিল সব সে বাবাকে বলেছিল। বাবা জিজ্ঞেস করেছিল বলেই তো বলেছিল। সেই কথা বাবা মাকে বলে দিল! আর কত খারাপ খারাপ কথা বলছিল দাদু, নিনান সকলের নামে। ধুর! কেউ ভালো নয়। কেউ না! কেউ আসলে ঋতিকে ভালোবাসে না। আগে মনে হতো বম্মা বোধহয় তাকে ভালোবাসে। রোজ স্কুল থেকে ফেরার পর তাকে চিনি -জল খেতে দেয়। সেদিন তো বিকেলবেলা রান্নাঘরে লুকিয়ে চিনি খেতে গিয়ে গলায় আটকে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যা তা অবস্থা হয়েছিল। ঋতি দৌড়ে বম্মার কাছেই গেছিল। মনে হচ্ছিল মার কাছে গেলেই মা মারবে! চিৎকার শুনে অবশ্য মা ছুটে এসেছিল। পরে আর বকাবকি করেনি। তবু ঋতির কেমন ভয় ভয় করছিল। সে চুরি করে খেতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। কিন্তু বাবা- মা কেউ না থাকলেই পিসি নানাভাবে তাকে উত্যক্ত করে। তাকে তাদের ঘরে থাকতে দেবে না। লাইট -পাখা নিভিয়ে দেবে। তার সঙ্গে ঝগড়া করবে। বই পড়তে দেবে না। আর সে কিছু বললেই বম্মা বলবে, দেখেছ, এইটুকু মেয়ে কিরকম ঝগড়া করতে শিখেছে! একেবারে মায়ের মতো! বাবা – মা বাড়ি ফিরতেই নালিশ করবে! বাবা তখন তাকে বকবে! অবশ্য সেদিন সে বাবার দেওয়া সব অঙ্ক করে রেখেছিল। সব ঠিক হয়েছিল। তাই বাবা তাকে কিছু বলেনি। কিন্তু চোয়াল শক্ত করে রেখেছিল। আর দাঁতে কটকট আওয়াজ করছিল। ঋতির ভয় করছিল। বাবা তাকে মারবে না তো!
স্কুলের সময়টা অবশ্য ঋতি ভালো থাকে। ক্লাস ফোরে ওঠার পর ঋতিদের হাইট অনুযায়ী সাজিয়ে বসিয়ে দিল খেলার মাস্টারমশাই। ঋতির পাশে বসল শুভলক্ষী। শুভলক্ষীকে ঋতি ছোটো থেকেই চেনে। ওদের একটা দল আছে। ওরা পাঁচজন সবসময় একসঙ্গে থাকে। তার মধ্যে আছে দীপ্তিশিখা, সুচেতনা, নন্দিতা, আলী। ওদের সঙ্গে ঋতি কথা বলে। কিন্তু বন্ধুত্ব হয়নি। মাস্টারমশাই বসিয়ে দেওয়াতে শুভলক্ষী ওদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসতে পারল না। তার খারাপ লাগছিল। মন খারাপ করছিল। ঋতি বলল, শুধু ক্লাসের সময়টাই তো! অন্যসময় তো তুই ওদের সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে পারবি। তাছাড়া আমিও তো আছি। আমার বন্ধু হবি? ঋতি শুভলক্ষীকে নানা ভাবে সান্ত্বনা দেয়। দিদিমণি পড়া জিজ্ঞেস করলে ঋতি চুপিচুপি বলে দেয়। আঁকার ক্লাসে শুভলক্ষীর খাতায় ছবি এঁকে দেয়। শুভলক্ষী প্রশংসা করলে ঋতির ভালো লাগে। শুভলক্ষী তার নামটা নিয়ে মজা করে। ঋতি রেগে যায়। শুভলক্ষীকে তেড়ে মারতে ছোটে। শুভলক্ষী দৌড় দেয়। ঋতিও দৌড়োয়। ওর খুব আনন্দ হয়। ঋতি তাই একদিনও স্কুল কামাই করে না। বর্ষার দিনে মা স্কুলে যেতে না দিলে ঋতি বাড়ির সামনের জলভারনত ছোট্ট ঘাসজমিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ দিয়ে নীরবে জল পড়ে। মনে হয় দৌড়ে শুভলক্ষীর কাছে চলে যায়। পরদিন স্কুলে গিয়ে শুভলক্ষীকে দেখে তবে ওর শান্তি। ঋতি শুভলক্ষীকে বলে আমি যখন মরে যাব তুই গান গাইবি আমার মৃতদেহের সামনে। আমি আকাশ থেকে শুনব। গাইবি, ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি’… ঋতি গানটা বাবার মুখে শুনেছে। শুভলক্ষী এসব শুনে হাসে। ঋতিকে ‘পাগলি’ বলে খেপায়। ঋতির দুঃখ হয়। শুভলক্ষীর সঙ্গে আড়ি হয়ে যায়। ঋতি তখন মনে মনে গায়, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব… তবু আমারে দেব না ভুলিতে’… এই গানটাও ঋতি বাবার কাছেই শুনেছে। ঋতি মনে মনে গায়, আর চোখ দিয়ে জল পড়ে। কিন্তু পরদিনই নানা অছিলায় শুভলক্ষীর সঙ্গে ভাব করে নেয়। শুভলক্ষী বলে, ঠিক আছে ভাব করব, কিন্তু তোকে পাগলি বলেই ডাকব।
তাই সই, যা খুশি বলে ডাকিস। ঋতি মনে মনে ভাবে, শুধু আড়ি করে দিসনা আমার সঙ্গে। তোর সঙ্গে কথা না বললে বড্ডো মন কেমন করে!
কিন্তু প্রাণের বন্ধুর সঙ্গে বেশিদিন ঋতি এক বেঞ্চে পাশাপাশি বসতে পারল না। ক্লাস ফাইভে উঠতেই একদল নতুন মেয়ে এসে ওদের স্কুলে ভর্তি হলো। চারটে সেকশনে সব মেয়েদের ভাগ করে দেওয়া হলো। ঋতি পড়ল এ সেকশনে। শুভলক্ষী সি সেকশনে। ঋতি এসব কিছুই জানত না। শুভলক্ষীর মা বলল, ঋতি বন্ধু বিচ্ছেদ হয়ে গেল যে! কথাটা ঋতির কানে গিয়ে ধাক্কা মারল। দৌড়ে গিয়ে দেখল শুভলক্ষী ওর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে সি সেকশনে বসে আছে। ঋতিকে ডেকে কথাও বলল না। ঋতি মাথা নিচু করে নিজের জায়গায় ফিরে এলো। কিন্তু তারপর প্রত্যেক পিরিয়ডের শেষে একবার করে শুভলক্ষীর ঘরের সামনে দিয়ে ঘুরে আসছে। শুভলক্ষী সব বুঝছে। বন্ধুদের নিয়ে হাসাহাসি করছে। ওদের দলে আলি একমাত্র ঋতির কাছে এসে বলেছে, তুই আমাদের ক্লাসের সামনে দিয়ে যাতায়াত করিস বলে ওরা হাসছে। তুই এরম করিস না। ঋতি লজ্জা পায়। ভাবে শুভলক্ষীকে না দেখে ও থাকবে কি করে! আর আলি, আলি তাকে এতো ভালোবাসে। অথচ ঋতি একদিন আলিকে তার বাড়িতে নিয়ে গেছিল। তখন বিজয়দেব ছিল বাড়িতে। তার কিছুদিন আগেই বিশ্বদেব একটা সরবতের বোতল নিয়ে এসেছিল বাড়িতে। সবুজ রঙের বোতল। খুব ঝাঁঝালো। কেউই খেতে পারেনি। বিজয়দেব ঋতির বন্ধুরা মুসলমান বলে ওদের ওই সরবতই খেতে দিতে বলল। ঋতি আপত্তি করেছিল। ওর কথা কেউ শোনেনি। বিজয়দেব ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিল, ওরা এসবই পছন্দ করে! ওরা মানে! ওরা আলাদা কি সে! ঋতি বুঝতে পারেনি। তার খুব মনখারাপ হয়েছিল তার বন্ধুকে ওই বাজে সরবতটা দেওয়া হয়েছিল বলে! সেই আলি আজ এসেছে ঋতিকে জানাতে যে ঋতিকে নিয়ে শুভলক্ষী হাসাহাসি করে! কিন্তু তারপরও কি ঋতি শুভলক্ষীকে ছেড়ে থাকতে পারবে! কোথায় গেল তার মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে খেলা! কোথায় তার ক্লাসরুমে গান গেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেওয়া! টিফিন টাইমে তার একটাই কাজ দূর থেকে শুভলক্ষীকে দেখা। ওর হাসি, ওর মজা করা, ঋতির দিকে আঙুল দেখিয়ে কি সব বলা… সব ঋতি দেখে। বাড়িতে ফিরে বাথরুমে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। আর নিজেকে আদর করে। তারপরই অপরাধবোধে ভোগে। কিন্তু পরদিনই আবার সেই একই কাজ করে।
২৮
ঋতি আর রুশির খেলার মাস্টারকে ওদের সাইকেল চালানো শেখাবার জন্য রাখা হয়েছে। রুচিও শিখছে। কিন্তু রুচির মৃত্যুঞ্জয়ের পাশাপাশি এই মাস্টারকেও খুব ভালো লেগে গেল। রুচি মাস্টারের প্রেমে পড়ে গেল। যদিও এর মধ্যে সে একবার মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে জোড়াসাঁকো ঘুরে এসেছে। মৃত্যুঞ্জয়কে ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখাও তার অব্যাহত আছে। তারপরও মাস্টারকে তার ভালো লেগে গেল। মাস্টার গরিব। কাছেই একটা প্রাইমারি স্কুলে একটা ঘরে কোনোরকমে থাকে। রুচি যখন তখন তার ওই ছোটো ঘরে গিয়ে হানা দেয়। পুজোর সময় ঠাকুর দেখতে যাওয়ার নাম করে বোনেদের নিয়ে মাস্টারের ঘরে গিয়ে ঢোকে। অদ্ভুত প্রেম প্রেম চোখে মাস্টারের দিকে তাকায়। মাস্টার ব্যাপারটা খুব ভালো বোঝে। সেও যখন তখন এ বাড়িতে চলে আসে। মনে হয় যেন সে ধরেই নিয়েছে সে এ বাড়ির বড়ো জামাই হবে! শ্রী তো ব্যাপারটা খেয়াল করেছে বটেই। এবার আর বিশ্বদেবেরও চোখ এড়ালো না। বিশ্বদেব মেয়েকে কিছুই বললেন না। মাস্টারকে ইগনোর করা শুরু করলেন। মেয়েদের সাইকেল শেখা বন্ধ করে দিলেন। মাস্টারও ব্যাপারটা বুঝে মরিয়া চেষ্টা শুরু করল। কিন্তু সে আর কোনো সুযোগই পেল না। কারণ ততদিনে রুচির মন গিয়ে পড়েছে রুশির নতুন মাস্টারের ওপর। ফলত পুরনো খেলার মাস্টার সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলো। তার রাগ হলো। হাতের কাছে সে পেল ঋতিকে। একদিন ঋতিকে স্কুলে সে ভয়ানক বকাবকি করল ইউনিফর্ম বাদ দিয়ে অন্য রঙের সোয়েটার পরে আসার জন্য। ঋতি বন্ধুদের মাঝে বকুনি খেয়ে অপমানিত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরল।
ওদিকে রুচি মাধ্যমিকে টেনেটুনে ফার্স্ট ডিভিশন পেল। বিশ্বদেব ভেবেছিল মেয়ে সায়েন্স নিয়ে পড়বে। ফলে রেজাল্ট বেরোনোর আগে থেকেই ফিজিক্স,ক্যামিস্ট্রি, ম্যাথ, বায়োলজির প্রাইভেট টিউটর রেখে পড়াশোনা শুরু হয়ে গেল। মাধুরী লোকের কাছে বড়ো মুখ করে বলতে লাগল মেয়ে সায়েন্স পড়ছে। পড়াশোনার ভীষণ চাপ। কিন্তু রেজাল্ট বেরোনোর পর রুচিকে আর্টস নিয়ে ভর্তি হতে হলো।এমনকি ভূগোল নেওয়ার মতো নম্বরও তার ছিল না। উচ্চ মাধ্যমিকেও যথারীতি ফাঁকি মারা শুরু হলো রুচির। তার বাংলার মাস্টারমশাই সিলেবাসের বাইরে গিয়ে তাকে রবীন্দ্রনাথ পড়ান। রুচি যেন ধীরে ধীরে রবীন্দ্রনাথের নায়িকাদের মতো মনে করতে থাকে নিজেকে। বাংলার মাস্টারমশাই -ই তার কাছে যেন সাক্ষাৎ রবীন্দ্রনাথ। রুচি তার প্রেমেও পড়ে। এদিকে বাংলা ছাড়া অন্য কিছুই তার পড়া হয় না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের দিন শেষপর্যন্ত শ্রীর কাছে সারেন্ডার করে রুচি। কাকিমা জানোতো, আমি ফিলজফির ফ্যালাসি কিছুই বুঝিনা। করতেও পারিনা। শ্রী আবার ফ্যালাসি খুব ভালো পারত। উচ্চ মাধ্যমিকে তার ইংরেজিতে ব্যাক থাকলেও দর্শনে ভালো নম্বর উঠেছিল। শ্রী রুচিকে নিয়ে বসে। ওকে ফ্যালাসি বোঝায়। রুচি উচ্চ মাধ্যমিক ও টেনেটুনে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করে। তাকে ভৈরব গাঙ্গুলী কলেজে ইংরেজি অনার্স নিয়ে ভর্তি করা হলো।
ক্লাস ফাইভ থেকে ঋতির ইংরেজি পড়া শুরু হলো। অবশ্য তার আগে থেকেই শ্রী নানাভাবে ঋতিকে ইংরেজি পড়াতে চেয়েছে। ছোটো ছোটো ওয়ার্ড বুক, গ্রামারবুক জোগাড় করে এনেছে। ইংরেজি পড়তে কিন্তু ঋতির বেশ কিছুটা গোঁয়ার্তুমি ছিল। কিছুতেই পড়তে চাইত না। জোর করে পড়ালেও মনে রাখতে পারত না। ক্লাস ফাইভ থেকে রুচিকে তাই ঠিক করা হলো ঋতিকে পড়াবার জন্য। রুচি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে সেজেগুজে পাশের ঘরে ঋতিকে পড়াতে যায়। পড়তে বসে অবশ্য অন্য কথা বেশি হয়। কখনো মৃত্যুঞ্জয়ের কথা। কখনো কলেজের বন্ধুদের কথা। বেশিরভাগই রুচির বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারার বিষয়। সেই সব বিষয় নিয়ে ঋতির সঙ্গে আলোচনাটা শ্রী ভালো চোখে নিচ্ছিল না। সেই সঙ্গে জুটল আরেক বিপদ। রুচি এক একদিন পড়া ধরে। ঋতির সামান্য ভুল হলেই এমন চিৎকার চেঁচামেচি করে যে বিশ্বদেব উঠে গিয়ে ঋতিকে দুচার থাপ্পড় বসায়। ঋতি কাঁদে। সামান্য ভুলের জন্য মাও তো তাকে এতো বকে না। অথচ দিদিভাই বকছে, জ্যেঠু মারছে! আর কিছু বলতে গেলেই রুচি ঋতিকে ভয় দেখায়, তুই আমাকে এরম বললি তো! আমি তোকে পুজোর সময় সাজিয়ে দেব না। পুজোর সময় সাজিয়ে দেওয়াটা একটা বিশেষ ব্যাপার ঋতির কাছে। ব্যাস, ঋতি হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকে। শ্রী দাঁতে দাঁত চেপে সবটা সহ্য করছিল। কতদিন মেয়েটাকে বুঝিয়েছে আমার কাছে আয়, আমি সাজিয়ে দিচ্ছি। না, ওর দিদিভাইয়ের কাছেই সাজতে হবে। আর দিদিভাই এইভাবে ওকে কাঁদাবে। কিন্তু এসবের মাঝে পড়াশোনাটাই লাটে উঠছে বুঝতে পেরে শ্রী ই আবার মেয়েকে নিয়ে বসে।
ওদিকে রুশিকে অঙ্ক করাবার জন্য একজন মাস্টার ঠিক করা হয়েছে। অরিজিৎ ছেলেটি বড়ো পরিবারের ছেলে। নিজে এম এস সি পড়ছে। ওর ভাই ডাক্তারি পড়ছে। অরিজিৎকে অসম্ভব ভালো দেখতে। ফর্সা, লম্বা, চোখ নাক মুখ এককথায় অপূর্ব। ফলে রুচি এবার এর প্রেমে পড়ল। ঠিক যে সময়টা রুশিকে অরিজিৎ পড়াতে আসে সেই সময়টাতেই রুচির ও ঘরে দরকার পড়ে যায়। একটা পাতলা ম্যাক্সি পরে রুচি ও ঘরের আলমারি থেকে রবীন্দ্র রচনাবলীতে কি যেন খুঁজতে থাকে। প্রায় প্রত্যেকবারই এই ঘটনা ঘটে। ব্যাপারটা শ্রীর দৃষ্টি এড়ায়নি। একদিন সে সরাসরি রুচিকে জিজ্ঞেস করাতে রুচি কাকিমাকে খানিক কথা শোনালো। বলল, তোমার মনটা নোংরা। তাই তুমি সব কিছুতেই নোংরামি দেখো। বিশ্বদেব আর মাধুরী সব শুনেও কোনো মন্তব্য করল না। উল্টে বিশ্বদেব ভাবলেন, ছেলেটি দেখতে শুনতে ভালো। পাল্টি ঘর। পড়াশোনায় ভালো। কম্পিটেটিভ পরীক্ষা দিয়ে ভালো চাকরিই পাবে। মন্দ কি! ফলে রুচির অসভ্যতা চলতে থাকল।
২৯
এরই মাঝে ঘোষাল বাড়িতে যেন বাজ পড়ল। অন্তত শ্রীর তাই মনে হলো। সেদিন সকালে রুচি যথারীতি কলেজ গেছে। বিশ্বদেব ছাদে গাছের পরিচর্যা করছিলেন। বিশ্বদেবের এই আর একটি শখ। বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ এনে টবে লাগানো, মাটি পরিবর্তন করা, সার দেওয়া, ফুল ফুটলে আত্মীয় -পরিজন সকলকে দেখানো। বেশ কিছু ইন্ডোর প্লান্ট দিয়ে গোটা বাড়িটা সাজিয়েছেন বিশ্বদেব। সকালের দিকে সেই গাছগুলোকে ছাদে নিয়ে গিয়ে খানিক জলটল দেন। আবার বেলার দিকে খানিক রোদ খাইয়ে ঘরে এনে রাখেন। এই সময়টা ডাক পড়ে ঋতির। মাঝারি মাপের টবগুলো ঋতিকে দিয়ে বয়ে নিয়ে আসেন। ঋতি আনন্দ করেই কাজটা করে। জ্যেঠুর কাজ করে দিতে পারলে ঋতি নিজেকে কৃতার্থ মনে করে। কিন্তু ওইটুকু মেয়েকে দিয়ে টব বয়ে আনানো শ্রীর পছন্দ হয় না। বিশ্বদেব কিন্তু নিজের মেয়েদের বলেন না এসব কাজ করতে। বললেও রুশি হয়তো একটা টব সরালো। ঋতিকে সেখানে হয়তো পাঁচটা টব সরাতে হলো। তাছাড়া বিশ্বদেবের গলায় হুকুমের স্বর। ভাই,ভাইয়ের পরিবারকে থাকতে দিয়েছেন বলে হুকুম করে বুঝিয়ে দিতে চান এ বাড়িতে তারা আশ্রিত, পরজীবী। মেয়েটাকে এমন করে খাটালে শ্রী সহ্য করতে পারে না। ওর এখন মাসিক হয়। কোনো কোনো মাসে দুবারও হয়। এতো ব্লিডিং হয় যে এক ঘণ্টাও কাপড় রাখতে পারে না। বারবার বাথরুমে গিয়ে কাপড় কেচে নতুন করে আবার কাপড় পরে আসতে হয়। এতোটুকু বাচ্চা কি এসব পারে! অথচ ওর যে এতো বেশি ব্লিডিং হচ্ছে তার কোনো চিকিৎসা নেই। শ্রী কয়েকবার অনন্তকে বলেছে। অনন্ত এসব কথা শুনতেই চায় না। মেয়ে সন্তানের বাবা! তার কোনো দায়িত্ব নেই। শ্রী তাদের পুরনো পাড়ায় এক হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছে মেয়েকে নিয়ে যায়। ঋতির গায়ে গন্ধ হয়, ঘেমে গেলে আরো বেশি। শ্রী খানিক সস্তা পদ্ধতিতে ঋতির বগলের লোম পরিষ্কার করে দেয়। ঋতির বগলে একটা কালো কালো ছোপ পড়েছে। হাতকাটা জামা পড়া তার বারণ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু গায়ের গন্ধের জন্য ওকে নানা কথা শুনতে হয়। বন্ধুরা ওকে বলে, তুই স্নান করিস না! গায়ে এতো গন্ধ কেন! মাসিক হলে তো কেমন একটা আঁশটে গন্ধ ঋতি টের পায়। কি করবে সে বুঝতে পারে না। বন্ধুদের সামনে আরো খানিকটা গুটিয়ে যায়। হোমিওপ্যাথি দিয়েই এসবের চিকিৎসা চালায় শ্রী। তাতে হিতে বিপরীত হয়। এবার দেড় মাস, দু- মাস অন্তর অন্তর মাসিক হয়। আর পেটে ব্যথায় মেয়েটা কাতরাতে থাকে। তারপরও অনন্ত ভালো ডাক্তার দেখায় না। শ্রী এসব নিয়ে নাজেহাল হয়ে থাকে। সেইসঙ্গে আছে টুয়ার বাড়ির ঝামেলা। টুয়াকে মেরে মেরে শেষ করে ফেলছে ওরা। টুয়া কাঁদতে কাঁদতে ফোন করে। বাপি বা ভাইকে নিয়ে শ্রীকে ছুটে যেতে হয়। নরমে গরমে সামলাতে হয়। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। পরেরদিন ওরা টুয়াকে আবার মারে। পণ বা ইত্যাদির জন্য নয়। মারাটাই ওদের স্বভাব। ওরা হিংস্র, জংলিদের মতো। সব সময় দাঁত -নখ বের করে রাখে।
এর মধ্যেই সেদিন বেলার দিকে বাড়িতে রুচির কলেজ থেকে ফোন এলো। প্রিন্সিপাল স্যার স্বয়ং ফোন করেছিলেন। কালকের মধ্যে বিশ্বদেবকে দেখা করতে বললেন তাঁর সঙ্গে। হঠাৎ এমন কী হলো যে রুচির গার্জেন কল হলো! ইন্টারনাল পরীক্ষায় কি রুচি কম নম্বর পেয়েছে! না কি অন্য কোনো সমস্যা! রুচি বিকেলে বাড়ি ফিরলে বিশ্বদেব জিজ্ঞেস করল। রুচি কিন্তু কোনো সদুত্তর দিতে পারল না। কেমন এড়িয়ে গেল যেন। বিশ্বদেব ভাবল, মেয়েকে বেশি ঘাটিয়ে লাভ নেই।কাল ওর কলেজে গিয়েই বিষয়টা বোঝা যাবে। প্রিন্সিপালের রুমে পরিচয় দিয়ে ঢুকল বিশ্বদেব আর মাধুরী। বিশ্বদেব সেইসঙ্গে অনন্তকেও নিয়ে গিয়েছে। মেয়েদের ব্যাপারে কোনো বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হলে বা ওদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করতে হলে বিশ্বদেব অনন্তকে এগিয়ে দেন। রুচি যখন স্কুলে পড়ে তখন স্কুল থেকে ওদের ক্লাসকে সাইন্স সিটি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিশ্বদেবের ইচ্ছে নয় যে রুচি যায়। কিন্তু বিশ্বদেব নিজে কিছু বলবে না। অনন্তকে দিয়ে বলাবে। রুচি এতো কিছু জানে না। সে বলে, বুধু সব ব্যাপারে বাধা দেয়। বিরক্তিকর। অনন্ত অবশ্য সত্যিই মেয়েদের একা একা কোথাও ছাড়তে ভয় পায়। আর স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে তো একেবারেই নয়। কোথায় কি অঘটন ঘটে কিচ্ছু বলা যায় না! এবারেও বিশ্বদেব অনন্তকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। তেমন কোনো সিচুয়েশন তৈরি হলে অনন্ত সামলাবে। প্রিন্সিপাল খুব গম্ভীর ভাবে ওদের বসতে বললেন। বিশ্বদেব নিজের পরিচয় দিয়ে মাধুরী ও অনন্তর পরিচয় দিল। প্রিন্সিপাল স্যার সামান্য সম্ভাষণটুকুও করলেন না। গম্ভীরভাবে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকে মেয়ের কোনো খোঁজ রেখেছেন? মেয়ে কলেজে এসে কি করে, কাদের সঙ্গে মেশে? জানেন?
বিশ্বদেব মাথা নেড়ে কিছু বলতে গেলে প্রিন্সিপাল স্যারই আবার বলে ওঠেন। অবশ্য মেয়ের ব্যাপারে সব খোঁজ খবর রাখলে আজকে এভাবে আমার সামনে আপনাদের বসে থাকতে হতো না
অনন্ত আর ধৈর্য রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করে, রুচি কী করেছে?
প্রিন্সিপাল স্যার একবার অনন্তর দিকে তাকিয়ে বিশ্বদেবের দিকে ফেরেন, বলেন, বয়েজ হস্টেলের একটি রুমে আপনার মেয়েকে একটি ছেলের সঙ্গে অপ্রীতিকর অবস্থায় পাওয়া গেছে।
বিশ্বদেব প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। হাতদুটো চেয়ারের হাতল থেকে পড়েই গেল। মাধুরী আওয়াজ করে কেঁদে উঠল। আর অনন্ত অবাক হয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।। নিজের কানকে ও এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। রুচি, রুচি এই কাজ করেছে! তাদের পরিবারের বড়ো মেয়ে! কত আদরের প্রথম সন্তান। সে এভাবে পরিবারের নাম ডোবাল!
কিছুক্ষণের নীরবতার পর প্রিন্সিপাল স্যারই আবার কথা শুরু করলেন। ছেলেটা লোকাল। পাসকোর্সে পড়ছে। পড়াশোনা করে না। মেয়ে ঘটিত ব্যাপারে এর আগে দুবার মার খেয়েছে রাস্তায়। আপনাদের দেখে তো ভদ্র বলেই মনে হয়। আপনাদের বাড়ির মেয়ে এমন ছেলের পাল্লায় পড়ল কি করে?
এর কোনো উত্তর বিশ্বদেব, অনন্তর কাছে নেই। মাধুরী তো যেন বোবা হয়ে গেছে।
যাই হোক, রুচিকে আর এই কলেজে রাখা যাবে না। আপনারা ওকে অন্য কোথাও ভর্তি করার ব্যবস্থা করুন।
বিশ্বদেব বলে উঠল, এই বছরের মাঝখানে আমরা ওকে কোথায় ভর্তি করব স্যার? ওকে তো কোনো কলেজ ভর্তি নেবে না।
দেখুন, এখানে ও যে কাণ্ড ঘটিয়েছে, তারপর আর এখানে ওর পক্ষে পড়াশোনা করা সম্ভব নয়। আমি টিসি লিখে দিচ্ছি।
স্যার, দয়া করুন। মেয়েটার বছর নষ্ট হয়ে যাবে!
প্রিন্সিপাল স্যার উত্তরে কিছু বলতে চাইছিলেন। তার আগেই হঠাৎ মাধুরী টেবিলের তলা দিয়ে প্রিন্সিপালের পা দুটো চেপে ধরেছে। স্যার, আমার মেয়েটাকে তাড়িয়ে দেবেন না!
প্রিন্সিপাল খুবই অস্বস্তিতে পড়ে তাড়াতাড়ি বললেন, কি করছেন! কি করছেন! ছাড়ুন, ছাড়ুন। আপনি উঠে আসুন। উঠে আসুন।
অনন্ত অবাক হয়ে বৌদিকে দেখছে। বৌদি এটা পারল কি করে! মেয়ের জন্য অন্যের পায়ে পড়ে গেল!
প্রিন্সিপাল স্যার বললেন, দেখুন, ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করুন। আপনাদের মেয়ে যা ঘটিয়েছে তার সঙ্গে ইউনিয়ন জড়িয়ে গেছে। এই কলেজে ইউনিয়নের ছেলেরাই ওকে টিকতে দেবে না। তার থেকে অন্য কলেজে নতুন পরিবেশে ও আবার নতুন করে শুরু করতে পারবে!
বিশ্বদেব বললেন, কিন্তু স্যার কোথায় ভর্তি করব? কোন্ কলেজে ও এখন অ্যাডমিশন পাবে? আপনি যদি একটা ব্যবস্থা করে দেন। মেয়েটার নয়তো ইয়ারলস হয়ে যাবে।
ঠিক আছে। আমি লিখে দিচ্ছি। আপনার বাড়ির কাছাকাছি একটি কলেজে ওর ভর্তির ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
বাইরে বেড়িয়ে বিশ্বদেব হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন! এমন একটা কাজ করল রুচি! ওকে নিয়ে এতো অহংকার বিশ্বদেবের! আর সেই কিনা বিশ্বদেবের মাথাটা এমন করে গুঁড়িয়ে দিল। বিশ্বদেব তাকিয়ে দেখলেন, প্রিন্সিপালের ঘরের থেকে কিছুটা দূরে একদল ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ওদেরকেই দেখছে। মনে হলো এরাই বোধহয় ইউনিয়নের ছেলে। কি ভাবছে ওরা! আমাদের দিকে কতটা অসম্মানের চোখে দেখছে! বিশ্বদেব আর দাঁড়াল না। বেরিয়ে এলো।
৩০
অনন্ত কলেজ থেকে ফেরার পথে সমস্ত রাস্তা দাদাকে বোঝাতে বোঝাতে এলো, দাদা, কোনোরকম বকাবকি, মারধোর করিসনা। তাতে হিতে বিপরীত হবে। তার থেকে বুঝিয়ে শান্ত ভাবে যা বলার বলবি। বিশ্বদেব প্রথমে ভেঙে পড়লেও এখন তার মনে হচ্ছে রুচির গালে একটা চড় মারতে। কিন্তু ভাইয়ের কথার গুরুত্ব বুঝলেন। এই বয়সের মেয়ে! গায়ে হাত তোলা ঠিক হবে না। তারপর ওই ছেলেটার সঙ্গে কী সম্পর্কে জড়িয়েছে তাও তো পরিষ্কার নয়। মারধোর করলে যদি আরো বড়ো কোনো গোলমাল করে বসে!
বাড়িতে ফিরে রুচিকে কিছুই বলা হলো না। শুধু আগামীকাল তাকে সকালে তৈরি থাকতে বলা হলো, তাকে নতুন কলেজে ভর্তি করা হবে। রুচি একথা শুনে কেঁদে ফেলল। বিশ্বদেব, অনন্ত, মাধুরী এই ঘটনা নিয়ে নানা কথা বলছিল। শ্রী ওদের চা করে দিল।শ্রীও সবই শুনছিল। তখন দুপুরবেলা রুশি ঋতি ঘরে আছে। ঘুমোচ্ছে। এমনটাই ধরে নিয়েছিল সবাই। কিন্তু ঋতি দুপুরে ঘুমোয় না। ছবি আঁকে বা খেলা করে বা কখনো কখনো বারান্দায় বসে বসে গরমের দুপুরের ফেরিওলাদের ডাক শোনে। শিইইইল কাটাহো বলে একটা লোক শীল কাটাই করতে আসে। লোকটার গলাটা শীল-নোড়ার মতোই ঠান্ডা, গম্ভীর। মনে হয় যেন কুঁয়োর ভিতর থেকে আওয়াজ আসছে। ঝাড়ু ঝাড়ু ফুলঝাড়ু বলে লোকটা মাথায় একগোছা ঝাড়ু দোলাতে দোলাতে আসে। রঙবেরঙের ঝাড়ু যেন ফুলের মতো হাওয়ায় দুলছে। কুলফি মালাই বিক্রি করতে আসে যে লোকটা সে ঠুং ঠুং করে ঘণ্টা বাজায়। ঋতির মনটা দুলে ওঠে। কেমন যেন ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা স্পর্শ পায় সে তার জিভে। এসব শুনলে তার অমলের কথা মনে হয়। বাবা তাকে শুনিয়েছে অমলের গল্প। অমলের ভারি কঠিন অসুখ। ইস্ তারও যদি কোনো কঠিন অসুখ হতো। সেও যদি খুব তাড়াতাড়ি মরে যেতে পারত! বেঁচে থাকলেই তাকে অনেক বড়ো হতে হবে! চাকরি করতে হবে। বাবা বলেছে তাকে, তুমি যখন রোজগার করবে তখন তোমার যা ইচ্ছে হয় কিনতে পারবে! ঋতির ছোট্ট বুক থেকে কেমন দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। হঠাৎই চোখের ওপর ঝুলন্ত কাপড় ভেসে ওঠে।ফেরিওলাদের ডাক শুনে ঋতির মরে যেতে ইচ্ছে হয়। আচ্ছা এটা কি স্বাভাবিক! তার বন্ধুদেরও কি এমনটা হয়! দিদিভাই একবার একটা লেখায় লিখেছিল, দুপুরে ফেরিওলাদের ডাক কতটা রোমান্টিক! কেমন সুদূরের আহ্বান! কই, ঋতির তো এমন কিছু মনে হয় না! সেদিনও ঋতি দুপুরে বসে বসে এসবই ভাবছিল। ভাবছিল সে যে নিজেকে এমন করে আদর করে একথা সে কখনো কাউকে বলবে না। কিন্তু এই পাপ কাজের শাস্তি তাকে পেতেই হবে! পাপী,সে একজন পাপী, নষ্ট মেয়ে! ভাবতে ভাবতেই সে দেখল দুটো রিক্সা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। বাবা, জ্যেঠু আর বম্মা রিক্সা থেকে নেমে গম্ভীর মুখে বাড়ি ঢুকল। বম্মার মুখটা কেমন ফোলা ফোলা! খুব কাঁদলে ঋতির চোখ -মুখ যেমন ফুলে যায়! তারপর ওরা যেন কিসব নিয়ে আলোচনা করছে। ঋতি ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ওদের সব কথাই শুনতে পাচ্ছে। দিদিভাইকে নিয়ে কথা হচ্ছে। আপত্তিকর অবস্থা কথাটার একটা হালকা ছায়া যেন সে টের পাচ্ছে। দিদিভাই কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকে গেল। ঋতি আবছা আবছা বুঝতে পারছে দিদিভাইয়ের কলেজে কিছু একটা হয়েছে। দিদিভাই আর ওই কলেজে পড়বে না। ঋতির কেমন ভয় করছে! দিদিভাই কি তবে একটা ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে! দিদিভাইয়ের সঙ্গে তার আর দেখা হবে না! দিদিভাইয়ের তো ভীষণ কষ্ট হবে! তার যেমন কষ্ট হয় শুভলক্ষীর জন্য। দিদিভাইয়েরও তেমনই কষ্ট হবে! কি করবে তবে দিদিভাই! ভাবতে ভাবতে ঋতির চোখে জল ছলকে উঠল। ঋতির বুক মুচড়ে কেমন একটা ব্যথা উঠছে যেন! ঋতি তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে এলো।
পরদিন রুচিকে নিয়ে কাছের একটা কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হলো। রুচি শান্ত মেয়ের মতো সবটা মেনে নিল। তার পরের দিন সকালে তার যেমন দমদমে পড়তে যাওয়া থাকে তেমন পড়তে গেল। ঋতির খুব ইচ্ছে করছে দিদিভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে। দিদিভাইয়ের হাতে হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু দিদিভাই গম্ভীর বলে পারছে না। সেদিন সন্ধেবেলা ঋতি সুযোগ পেয়ে দিদিভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। রুচি ওর দিকে তাকিয়েছে। ঋতি কিছু বলতে পারছে না। হঠাৎ রুচি মিচকে হাসল! ঋতি চোখ বড়ো বড়ো করে দেখছে! মুখটা যথারীতি হাঁ হয়ে গেছে। রুচি শুধু বলল, কিচ্ছু করতে পারবে না। আমাদের আলাদা করা অতো সহজ নয়। বলে রুচি হাসছে। ঋতিও হাসছে। দিদিভাই, তোর ভয় করছে না!
ধুস, ভয় পাব কেন! প্যায়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া! বলে রুচি আবার সেই ফিচেল হাসিটা হাসছে। ঋতির মনে হচ্ছে ওর বুক থেকে একটা পাথর নেমে যাচ্ছে। বুকটা খালি খালি লাগছে!

(ক্রমশ)

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes