ধারাবাহিক উপন্যাস ঋতায়তে (দ্বিতীয় পর্ব ) রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

ধারাবাহিক উপন্যাস ঋতায়তে (দ্বিতীয় পর্ব ) রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

আটের দশকের মফসসল শহরে বেড়ে উঠছিল একটি মেয়ে। ঋতি। এক অসুস্থ শৈশবে, ভিড়ের মধ্যেও নির্জনে তার বড়ো হয়ে ওঠা। একটু যত্ন, সামান্য ভালোবাসা না পাওয়া কাঙাল এই মেয়েটির বড়ো হয়ে ওঠা এই উপন্যাসের বিষয়। দমবদ্ধ এক পারিবারিক আবহে অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা মেয়েটির জীবন, তার লড়াই! নারী হিসেবে, অসুন্দর হিসেবে, গরীব হিসেবে এই সমাজ মানসের সঙ্গে তার একার লড়াই। পাশে রয়েছে মা, নিরুপায়, অসহায়। তবু অদম্য জেদ ঋতিকে এগিয়ে দিয়েছে। যদিও এই উপন্যাস ঋতির ক্ষরণের ইতিহাস। তার নির্মল মন, তার নিখাদ ভালোবাসার ক্ষরণ। সমকাল, তার মনবদল, নববইয়ের বিচিত্র পট পরিবর্তন সবই ছুঁয়ে আছে এই উপন্যাসের শরীর! ঋতি কি শেষপর্যন্ত পৌঁছোতে পারবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে! আজ দ্বিতীয় পর্ব

পূর্বে প্রকাশিত পর্ব–

দ্বিতীয় পর্ব

১১
ঋতি এখন বসতে পারে। বিছানায় বসে সে উঁকি মেরে দেখে মা জল আনছে, বাসন মাজছে, রান্না করছে। দেখতে দেখতে মাথাটা ঝুঁকে গিয়ে টুপুস করে মুখ থুবড়ে পড়ে। কোনো কোনো দিন আবার দেখতে দেখতে হামাগুড়ি দিয়ে একেবারে খাটের কিনারায় পৌঁছে যায়। শ্রী তখন দৌড়ে যায়। শ্রী কে দৌড়ে আসতে দেখে ফোকলা মুখে কী তার হাসি! শ্রী তাকে আলতো করে কোলে নেয়। ভিজে কাপড়েই তাকে খানিক দুধ খাওয়ায়।বিকেল বেলা পাউডার লাগিয়ে,কাজল পড়িয়ে মেয়েকে সাজায়। হৈমবতী বলে, আ মলো যা, অতো পাউডার ঘষছিস কেন রে! বড়ো বৌমা দেখ, শ্রী মেয়েকে পাউডার লাগিয়ে ফর্সা করবে। শ্রী ভাবে, নিজেরই তো নাতনি। তার সম্বন্ধে এমন কথা বলতে ভালো লাগে। ঋতিকে যে এ বাড়িতে কেউ ভালো ভাবে নেয়নি সে তো বোঝাই যায়। ওইটুকু ২বছরের মেয়ে রুশি, সে পর্যন্ত সুযোগ পেয়ে ঋতির চোখে, পেটে কামড়ে দিয়েছে। ঋতি জোরে কেঁদে ওঠে। টের পেয়ে শ্রী দৌড়ে গিয়ে দেখে এই কাণ্ড। এমন করে বোনকে কামড়ে দিলে কেন রুশি?
রুশি গম্ভীর হয়ে উত্তর দেয়, ও কেন কামার কাছে শোবে? আমি শোবো।
রুশি না হয় ছোটো, অবুঝ, অবোধ। বড়োরা তো তা নয়। ঋতিকে নিয়ে একটু খেলবে, ওর পাশে একটু বসবে এটুকু দয়াও কেউ করে না। বাচ্চাটাকে মাটিতে ছেড়ে রেখে শ্রীকে কাজ করতে যেতে হয়। কখনো যদি হৈমবতী রাখেও বাচ্চা পেচ্ছাপ করলেই হৈমবতী তেড়ে ওঠে। নে নে তোদের বাচ্চা ধর, দিল আমার কাপড় চোপড় নোংরা করে। অথচ রুশি পেচ্ছাপ করলে ওই কাপড়ই নিংড়ে নিয়ে আবার পড়া চলে। কখনো কখনো অবশ্য বিশ্বদেব বলে, মেজ বৌ, ওকে এখানে আমার কাছে সোফায় বসিয়ে দাও। শ্রী তাই করে। ঋতি একইভাবে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মাকে দেখে। বেশ খানিক পর যখন শ্রী আবার ওকে কোলে নেয় দেখে মেয়েটার চোখ ছলছল করছে। কোলে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। শ্রী বোঝে মেয়েটা ওর জ্যেঠুকে ভয় পায়। তাই চুপ করে আড়ষ্ঠ হয়ে বসে থাকে আর মার জন্য অপেক্ষা করে। অস্মি আর টুয়া মাঝে মাঝেই দৌড়োতে দৌড়োতে আসে ঋতিকে নেওয়ার জন্য। হৈমবতী তখন অদ্ভুত ব্যবহার করেন। বলেন, দেখবি, ও কেমন আমার কোলে আসে! বলে ঋতিকে কোলে নিয়ে রাখেন। অস্মিদের হাতে নিতে দেননা না। শ্রী দুপুরে একসঙ্গে দুজনকে নিয়ে খাওয়াতে বসায়। ননদ কদিন দেখেশুনে মাধুরীর কাছে অভিযোগ করে, শ্রী নিজের বাচ্চাকেই সব খাইয়ে দেয়। রুশিকে খাওয়ায় না। এসব দেখে শুনে শ্রীর এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। সে ভাবে এরা যা খুশি অভিযোগ করুক। নিজের বিবেকের কাছে সে পরিষ্কার। যারা তার সম্পর্কে এমন কুকথা বলে তারা নিজেরাই একদিন নিজেদের ভুল বুঝবে।
কদিন ধরে হৈমবতীর জ্বর। ওষুধ খেয়েও জ্বর কমছে না। বিকেল হলেই ঘুষঘুষে জ্বরে কাবু হয়ে পড়ছে। কম্পাউন্ডার বাবুকে ডেকে নিয়ে আসা হলো। তার অভিজ্ঞ চোখে ব্যাপারটা ভালো ঠেকল না। হৈমবতীর গলার নিচে পটলের মতো কি যেন একটা ঠেলে উঠছে। বাঁ হাতটাও একেবারেই তুলতে পারছেন না।প্রথমে ভাবা হলো হয়তো বেকায়দায় লেগেছে। গরম স্যাঁক করা হলো। কিন্তু ব্যথা কিছুতেই কমছে না। সেইসঙ্গে জ্বর। কম্পাউন্ডার বাবুই বলে দিলেন কোন্ ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। বিশ্বদেবই সমস্ত ব্যবস্থা করে হৈমবতীকে নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে। এফ এন এস সি টেস্টে জানা গেল হৈমবতীর লিভারে ক্যান্সার হয়েছে। লাস্ট স্টেজ। বিশ্বদেব নির্দেশ দিল এ খবর মাকে জানানো যাবে না। জিজ্ঞেস করলে সাধারণ কোনো অসুখের কথা বলতে হবে। ওষুধপত্র শুরু হলো হৈমবতীর। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থার অবনতি হতে শুরু করল। গলার আওয়াজ খসখসে হয়ে যাচ্ছে হৈমবতীর। মাথার চুল উঠতে শুরু করেছে। গায়ের রঙ ক্রমশ কালচে হয়ে উঠছে। সারা শরীরে ব্যথা। খেতে পারেনা ভালো করে। বিজয়দেব সব শুনে সম্পূর্ণা আর মেয়েটাকে নিয়ে চলে এল টিটাগড়ে। বিশ্বদেব পাগলের মতো ডাক্তারদের কাছে দৌড়াদৌড়ি করছে। যেখানে যে ডাক্তারের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই দৌড়চ্ছে। কিন্তু হৈমবতীর সুস্থতার লক্ষণ নেই। শেষপর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো সরোজ দত্ত ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হবে হৈমবতীকে। সরোজ দত্ত নিজে হৈমবতীকে পরীক্ষা করলেন। ভীষণ অমায়িক মানুষ। বিশ্বদেব হৈমবতীর আগের চিকিৎসার সব রিপোর্ট দেখাল। সরোজবাবু একটি মেডিকেল বোর্ড তৈরি করলেন হৈমবতীর কেস নিয়ে। বোর্ড জানাল এই কেসে কিছুই আর করার নেই। লাস্ট স্টেজ অফ লিভার ক্যান্সার।রোগ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন আর হসপিটালে না রেখে ওঁকে বাড়িতে রাখাই ভালো। যন্ত্রণা কমানোর জন্য উনি পাঁচ দফা ওষুধ লিখে দিলেন। প্রত্যেকটি স্টেপে ওষুধের পাওয়ার বাড়িয়ে দিতে হবে। বিশ্বদেব হৈমবতীকে নিয়ে বাড়ি ফিরল। বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেল। মাধুরী, শ্রী, সম্পূর্ণা সকলেরই চোখে জল। অনন্ত,বিজয়দেব নিজেকে সামলাতে পারছে না। কিন্তু মার সামনে কান্নাকাটি করা চলবে না। মাধুরী আর শ্রী রাতে পালা করে হৈমবতীর কাছে শোয়। রাতে হৈমবতী ব্যথায় ঘুমোতে পারেনা। কথা বলতে থাকে। পুরনো দিনের কথা। খিদে পায় এসময়টা তার। রাতে হরলিক্স গুলে দেওয়া হয়। গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে হয়। যন্ত্রণায় হৈমবতীর মাথাটাও কাজ করে না মাঝেমাঝে। মাধুরীর হাতে খেতে চায়না। বলে, ওর বরের আমার জন্য টাকা খরচ হচ্ছে বলে ওর খুব রাগ। ও চায় আমি মরে যাই। সম্পূর্ণাকেও সহ্য করতে পারেনা। সারাক্ষণ শ্রীর খোঁজ করে। শ্রী খাইয়ে দেবে। শ্রী চুল বেঁধে দেবে। সকলের সামনেই বলেন শ্রী বড়ো বাড়ির মেয়ে। ওর মনটা বড়ো। ও আমাকে অবহেলা করবে না। মাঝে মাঝে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে বলেন, আমার ক্যান্সার হয়েছে না রে! শ্রী মিথ্যে বলে। নানা সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে।
সেদিন দুপুরে ঠাণ্ডাটা বড্ড বেশি পড়েছে বলে মাধুরী চৌকি পেতে মেয়েদের নিয়ে রোদ পোহাচ্ছিল। বাচ্চাগুলো কেমন যেন শান্ত হয়ে গেছে। বাড়িতে অসুখ। ওরা যেন কেমন করে টের পেয়েছে। অনন্ত বসার ঘরটায় বসে খবর কাগজ পড়ছিল। বিশ্বদেব নিজের কাজে ব্যস্ত। বিজয়দেব আর সম্পূর্ণা কাছাকাছিই রয়েছে। শ্রী বোরোলীন মাখতে মাখতে একবার মার ঘরে উঁকি দিতে গেছে। মা এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল। শ্রী ঘরে ঢোকামাত্র খেয়াল করে মার মুখটা কেমন বেঁকে বেঁকে যাচ্ছে। শ্রী মার পাশে বসে চিৎকার করে ওঠে। বাইরে থেকে সবাই চিৎকার শুনে দৌড়ে আসে। হৈমবতী তখন শ্রীর মাথায় একটা হাত দিয়ে আশীর্বাদ করছেন। চোখ বেয়ে জল পড়ছে। সবার মা মা ডাকের মধ্যেই হৈমবতীর আশীর্বাদের হাতটা আলগা হয়ে শ্রীর কোলে পড়ে গেল।
১২
শ্রী হৈমবতীর কথাই ভাবছে কদিন ধরে। মানুষটা জীবনে কিছুই পেল না। সেই ন বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। চার চারটে ছেলেমেয়ের মা। শুনেছে একবার যমজ সন্তান হয়ে মারা যায়। সেই শোক বহুদিন পর্যন্ত ছিল। স্বামী যতদিন ছিল ততদিন তবু একরকম কেটেছে। অল্প বয়সেই বিধবা হলেন। তারপর থেকে ঠাঁইনাড়া। এ বাড়ি ও বাড়ি করে ঘুরে বেরিয়েছেন। নিজে না খেয়ে ছেলেমেয়ের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। ভাড়া বাড়িতে কত অপমান অপদস্ত হতে হয়েছে। শেষজীবনে বড়ো ছেলের দৌলতে যাও বা একটু সুখের মুখ দেখলেন, সেও সইল না। এমন একটা রোগে কষ্ট পেয়ে, যন্ত্রণা পেয়ে চলে যেতে হলো। মানুষ যে কত দুর্ভাগ্য বয়ে নিয়ে বেড়ায়…
বিশ্বদেব এখন পিয়ারলেসের উঁচু তলার অফিসার। বি. ডি. ঘোষালকে এখন একডাকে চেনে বেশ কিছু মানুষ। বাড়িতে মিটিং লেগেই রয়েছে। ট্যুরে বাইরে যেতে হয়। আজ বম্বে, কাল আমেদাবাদ, পরশু দিল্লি। টাকা পয়সাও ভালোই করেছে। মাঝে মাঝেই পার্টি লেগে থাকে। তখন বিশ্বদেব শ্রীর বিয়ের শাড়ি, শাল, গয়না মাধুরীর জন্য চেয়ে নেয়। শ্রী আনন্দ করেই দেয় তার বড়দিকে। হৈমবতী বড়োবৌমার সেজেগুজে পার্টিতে যাওয়া পছন্দ করতেন না। কখনো কখনো কটাক্ষে সে কথা বলেওছেন। এখন তো আর…বিশ্বদেব ভেবেছিল মায়ের মৃত্যুর আগে একটা বাড়ি করে মাকে সেখানে রাখতে পারবে। সেইমতো জমি কেনা হয়েছিল। বিশ্বদেবই মোটা টাকাটা দিয়েছে। কিন্তু পঁচিশ হাজার মতো কম পড়ল। অনন্ত এখন পার্মানেন্ট হয়েছে। ফলে সে টাকাটা মিল থেকে লোন করে দাদার হাতে তুলে দিয়েছে। জমি মার নামেই কেনা হয়েছিল। কিন্তু মাই তো আর রইল না। যাই হোক, বাড়ি তৈরির ব্যবস্থা করবে বলে সব ঠিক করতে গিয়ে বিশ্বদেব আবিষ্কার করল ওই জমির কাগজপত্র ঠিক নেই। ভায়েদের সঙ্গে আলোচনা করে শেষপর্যন্ত ওই জমি বিক্রি করে ব্যারাকপুরে জমি কেনা হলো। স্টেশনের কাছেই ভালো জায়গা পাওয়া গেছে। পাড়াটাও বেশ বর্ধিষ্ণু। এবার কিন্তু জমি কেনা হলো মাধুরীর নামে। ব্যারাকপুরে বাড়ি করা শুরু হলো।
ওদিকে সেদিন হয়েছে এক অদ্ভুত কাণ্ড। রুচি,রুশিকে নিয়ে মাধুরী পড়াতে বসেছে। রুচি তো এই বয়সেই পড়ার বইয়ের ভিতর গল্পের বই নিয়ে পড়া শুরু করেছে। শুকতারা, নবকল্লোল তার জন্য বাড়িতে আসে। সিনেমার ম্যাগাজিনও সে গোগ্রাসে গেলে। রুশির আবার পড়তে একদম ভালো লাগে না। সামান্য পড়াই তার হয়ে ওঠে না। সে কিছুতেই মন দিতে পারে না। তার মনে পড়ে থাকে রেডিওতে। কেমন সুন্দর গান হয় সেখানে। রুশি রেডিওটা কানে চেপে শুয়ে থাকে। চোখ দুটো তার যেন সুদূরের পিয়াসী। একমাথা ঝাঁকড়া চুল, গাট্টাগোট্টা চেহারা। রুশি শ্রীর খুব আদরের। সেদিন নামতা পড়া চলছে। রুশি যথারীতি পড়তে বসে অন্য কথা ভাবছে। পড়া বলছে না।পাশে বসে ঋতি খেলছিল। তার খেলা মানে তো একটা সুতোকে দুদিক থেকে খিটিমিটি করে টানা। অথবা একটা দেশলাই বাক্সের সব কাঠি একবার ফেলে দিয়ে আবার গুছিয়ে গুছিয়ে তোলা। অথবা খুচরো পয়সার কৌটো খালি করে একটা একটা করে পয়সা আবার টিনের কৌটোতে রাখা। সেদিন সে খেলতে খেলতে হঠাৎ বলে উঠেছে, বল না বল, পাঁচ নয়ে পঁয়তাল্লিশ। শ্রী রান্নাঘরে ছিল। শুনে সে চমকে এগিয়ে এসেছে। বিশ্বদেব সোফায় বসে কাজ করছিল। সেও যারপরনাই অবাক হয়েছে। শ্রী তো হেসেই পাগল। মেয়েটা বলে কি! শুনে শুনে নামতা মুখস্থ করে ফেলেছে। বিশ্বদেব আরো কয়েকঘর নামতা জিজ্ঞেস করল ঋতিকে। ঋতি একটু থতমত খেল। কিন্তু সবটা বলতে পারল। বিশ্বদেব বলল, মেজ বৌ, কাল থেকে ওর জন্য লেখাপড়ার ব্যবস্থা করো। বুধু কে বলো ওর স্লেট পেন্সিল কিনে দিতে।
সকালবেলা ওরা দুই বোন মিলে ছোট্ট উঠোনে খেলা করে। রুশি সুযোগ পেলেই ঋতিকে মারে। কিন্তু অন্য কেউ যদি ঋতিকে মেরেছে তো সঙ্গে সঙ্গে বোনের হাত ধরে সে সেই বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়। তোতলাতে তোতলাতে বোনকে মারার কৈফিয়ত চায়। পারলে খানিক মেরে আসে। তবে ঋতি সারাক্ষণ ওর বাবার সঙ্গে থাকতে ভালোবাসে। বাবা ওর প্রাণ। বাবা বাড়ি থাকলে ঋতি আর কারো কাছে থাকবে না। বাবার সঙ্গে তার খেলা, কত কথা। ঋতি কিন্তু তুতলিয়ে কথা বলে না। তার উচ্চারণ প্রথম থেকেই স্পষ্ট। অনন্ত ওকে ঠাকুরমার ঝুলির গল্প বলে, ছোটোদের গান শোনায়। ঋতি হাঁ করে গেলে। হাঁ করে থাকাটা ঋতির স্বভাব। মামাবাড়িতে গেলে অস্মি যখন তাকে গোদা বাঁদরের গল্প বলে তখনও সে হাঁ করে শোনে। অস্মি খানিক পরপরই থেমে যায়। ঋতি তখন বলে ওঠে, তাপ্পর… অস্মি ওর এই তারপর শোনার জন্যই চুপ করে। খানিক হেসে ঋতিকে খানিক চটকে আবার বলতে শুরু করে। ঋতির ঘেন্নাপিত্তি বেশি। সম্পূর্ণা তাকে আদর করে ডেকে তার পায়ে কাদা লাগিয়ে দেয়।ঋতি পা টা গুটিয়ে নিয়ে কাঁদতে শুরু করে। শ্রী বলে, সম্পূর্ণা, তুই কেন আমার মেয়েটাকে কাঁদাচ্ছিস রে। এই নিয়ে দুই জায়ে খুব খানিক হাসাহাসি হয়। মাধুরীও ভালোবাসে ঋতিকে। বলে, কালিয়া কোথায় গেলি! ঋতির সঙ্গে বম্মার ভাব চিনি খাওয়া নিয়ে। ঋতি কড়মড় করে চিনি খেতে খুব ভালোবাসে।
১৩
বিশ্বদেবের বাড়ি জোর কদমে এগোচ্ছে। বিশ্বদেব খুব একটা দেখাশোনা করার সময় পাননা। অনন্তই দৌড়াদৌড়ি করে। মিল থেকে ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে মিস্ত্রিদের কাজ দেখতে ছোটে। আবার কখনো সকাল থেকে গিয়ে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তদারকি করে। এ পাড়ার কয়েকজনের সঙ্গে ওদের দুভাইয়ের বেশ আলাপ হয়েছে। বিশেষত বিশ্বদেবের বাড়ির উল্টোদিকে সান্যাল পরিবার থাকে। হাঁড়ি আলাদা হলেও এঁরা বিরাট যৌথ পরিবার। চার ভাই, তাঁদের স্ত্রী, ছেলেমেয়ে সকলে একসঙ্গে এই বাড়ির চারটি ফ্ল্যাটে থাকে। বড়ো ভাই বেশ রাশভারী মানুষ। চাকুরীজীবী মানুষ। এখন রিটায়ার করেছেন। এই সান্যালদার সঙ্গে বিশ্বদেবের বিশেষ বন্ধুত্ব হলো। তিনিও বাড়ির ব্যাপারে বিশ্বদেবকে নানা পরামর্শ দেন। কখনো কখনো তদারক করেন কাজকর্ম। অনন্ত এদের খুব পছন্দ করে উঠতে পারেনা। এরা আসলে সবাই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। সি পি আই বা সি পি আই এম কাউকেই অনন্ত সমর্থন করতে পারেনা। তার মনে পড়ে যায় সাঁইবাড়ি হত্যাকাণ্ডের কথা। কী বীভৎস! ছেলের গায়ের রক্ত নিয়ে মায়ের গায়ে ছিটিয়ে দিয়েছিল ওরা। এই তো সেদিনের কথা। মাত্র ১০/১৫ বছর আগে বরানগরে যে হত্যালীলা ওরা চালিয়েছিল… বাচ্চা বাচ্চা নকশাল ছেলেগুলোকে যেভাবে মেরেছে! অনন্ত অবশ্য এসব কথা কাউকে বলতে যায় না। রাজনীতি বিষয়ে কথা বলতে তার একরকম ভীতি কাজ করে। দাদা এ পাড়ায় নতুন। পাড়ার সবার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে চাইছে, রাখুক। সেও দাদার মতেই চলবে। নিজস্ব মতামতের দরকার কি!
বিশ্বদেব বহু চেষ্টা করল। কিন্তু মিলের কোয়ার্টারটা কিছুতেই অনন্তর নামে করা গেল না। অগত্যা অনন্ত রাগেশ্রী আর ঋতি সমেত ওরা উঠে গেল ব্যারাকপুরে, ওদের নতুন বাড়িতে। বিশ্বদেব ছোট থেকেই ভাইদের জন্য অনেকটা করেছে। ছোটবেলা দিদার কাছে কৃষ্ণনগরে থাকলেও দিদার মৃত্যুর পর টিটাগড়ে বাবা মারা কাছেই চলে এসেছিল বিশ্বদেব।এখান থেকে ম্যাট্রিক পাশ করতে না করতেই বাবা মারা গেলেন। ছোট দুই ভাই, বড়ো মেয়েকে নিয়ে হৈমবতী তখন অসহায়। বিশ্বদেব কাজে লেগে পড়লেন। অনন্তও মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে ওয়েভারলি জুটমিলে কুলির কাজ করতে শুরু করেছিল। তারপর তো সুশীল বাবু, মানে অনন্তর স্কুলের হেডমাস্টারের চেষ্টায় অনন্ত মাধ্যমিক পাশ করে। বিশ্বদেব অনন্তকে কলেজেও ভর্তি করে দিয়েছিল। কিন্তু অনন্ত খানিকটা জেদ করেই আর পড়াশোনা করল না। জুটমিলে কাজে লেগে গেল। ওদিকে বিজয়দেব মামার বাড়িতে থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বম্বে তে চাকরি পেল। বিশ্বদেবই কষ্ট করে বিজয়দেবের পড়াশোনা চালিয়েছিল। দুই ভাই তাই দাদা অন্ত প্রাণ। দাদা ওদের যেন বাবার মতো। বিজয়দেব দাদার দেখাদেখি পিয়ারলেস করছে। বেশ উন্নতিও করেছে। বিশ্বনাথ নিজের নামে লোন নিয়ে বিজয়দেবকে বম্বেতে একটা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছে। লোন পরিশোধের দায়িত্ব অবশ্য বিজয়দেবেরই। অনন্তকেও বিশ্বদেব পিয়ারলেসে ঢোকাতে চেয়েছিল। কিন্তু অনন্ত ভীষণ মুখচোরা। টাকার কথা বলতে তার লজ্জা। সে ওই মিলের চাকরি নিয়েই পড়ে আছে। বিয়ে করেছে। বাচ্ছা হয়েছে। অথচ কোনো দায়িত্ববোধ নেই। মিল বন্ধ তো বাড়িতে বসে বিড়ি খাবে আর বউয়ের সঙ্গে খিটমিট করবে। বিশ্বদেব আজকাল আর অনন্তকে ঠিক পছন্দ করে উঠতে পারেনা। ওকে মিল কোয়াটারে রেখে গেলে ও নিজের দায়িত্বে সংসারটা করত। কিন্তু সে তো আর হবার নয়। ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে যেতে হলো নতুন বাড়িতে।
যেদিন প্রথম নতুন বাড়িতে আসা হলো বাড়ি দেখে শ্রী একেবারে চমকে গেল। বিরাট বড়ো বাড়ি। তিনখানা বড়ো বড়ো ঘর। বড়ো একটা খাবার ঘর ও বসার ঘর। ঘরগুলোর কোলে চওড়া বড়ো বারান্দা। রান্নাঘর , বাথরুম, কলতলা সব মিলিয়ে জমজমাট একেবারে। কত আলো হাওয়া এ বাড়িতে! কেমন মনের আরাম! এতো বড়ো বাড়িতে এতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষদের মাঝে থাকতে পারবে ভেবে শ্রীর খুব আনন্দ হচ্ছিল। এখানে সে ঋতিকে ভালোভাবে মানুষ করতে পারবে। ভোরবেলা থেকে কলাপাড়ের ঝগড়া আর দেহাতি গালাগালি শুনতে হবে না ঋতিকে। এসব ভেবে শ্রীর বেশ তৃপ্তি হচ্ছিল। সে মনের আনন্দে কাজ করছিল, জিনিসপত্র গোছগাছ করছিল। নানাকিছু মাধুরীকে জিজ্ঞেস করছিল। কোথায় কোনটা রাখা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। শ্রী খেয়াল করল মাধুরী যেন কেমন দায়সারা ভাবে উত্তর দিচ্ছে। ঠিকমতো কিছু বলছে না যেন। শ্রীর খটকা লাগে। নতুন বাড়িতে এসে মাধুরীরও তো মন ভালো হওয়ারই কথা। তাহলে এমন গম্ভীর হয়ে আছে কেন! হৈমবতী মারা যাওয়ার পর মাধুরীই এখন এ সংসারের কর্ত্রী। দুই মেয়ে স্বামী নিয়ে তার ভরাট সংসার। এ নিয়েই তার ভালো থাকার কথা ছিল। বাপের বাড়িতে তারা অনেক ভাইবোন। সকলের সঙ্গে সকলের ভালোই যোগাযোগ। শুধু মাধুরীই একটু আলাদা হয়ে পড়েছে। বিশ্বদেব বাড়ির বৌদের বাপের বাড়ি নিয়ে মাতামাতিটা পছন্দ করেনা। মাধুরীও গ্রামের বাড়ি, পুকুরে স্নান এসব অভ্যেস হারিয়েছে। ফলে স্বামী আর সন্তান নিয়ে তার সুখের সংসার হতেই পারত। কিন্তু হলো না। হৈমবতী মারা যাওয়ার আগে বড়ো বৌমার দুহাত ধরে বলে গিয়েছিলেন, বৌমা, বূধুকে তুমি তোমার কাছে রেখো। ভেন্ন করে দিওনা। তাহলে ও না খেতে পেয়ে মরবে! সেই হলো কাল! ফলে ঠাকুরপো,মেজ বৌ সঙ্গে ওই কেলেমানিক মেয়েটাকে সঙ্গে করে আনতে হলো এ বাড়িতে।
১৪
বিশ্বদেবের চিরকাল কুকুরের বড়ো শখ। রাগেশ্রী বিয়ে হয়ে এসে দেখেছে এ বাড়িতে দুটো বড়ো বড়ো কুকুর। তারা কি জাতের অতশত রাগেশ্রী জানতনা। কুকুর দুটোকে হৈমবতীও ভালোবাসত। দুই জানলায় দুই মূর্তিমান বসে থাকত। একদিন পাঁঠার মাংস খেয়ে ফেলায় দুজনেই বেদম মার খেয়েছিল অনন্তর কাছে। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন তাদের মধ্যে একজন মারা গেল। দুদিনের মাথায় আরেকজন। তখনও হৈমবতী ছিলেন। কিন্তু তারপর আর এই মিল কোয়ার্টারে কুকুর পোষা হয়নি। ব্যারাকপুরের বাড়িতে এসে বিশ্বদেবের শখ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। বিশ্বদেব নিয়ে এলেন জার্মান শেফার্ড জাতের একটি কুকুর। তার নাম রাখা হল টাইগার। সবই ঠিক আছে, শুধু কুকুরটার গায়ে খুব লোম। সারা বাড়িতে লোম উড়ে বেড়ায়। রাগেশ্রী খিতখিত করে। সকাল থেকে রাগেশ্রীর কাজ পিছনের কলতলা পরিষ্কার করা, জল ভরা, সকলের জন্য টিফিন বানানো, সকলের জামাকাপড় কাচা এবং স্নান করা। এসব করতে করতেই তার ১১টা বেজে যায়। কোনোরকমে খেয়ে সে ছোটে রুশি আর ঋতিকে স্কুল থেকে আনতে। এখানকার একটি কিন্ডার গার্ডেন স্কুলে ওদের দুজনকে দেওয়া হয়েছে। ঋতি সবে তিন এ পড়েছে। রুচিকে ব্যারাকপুর গার্লস হাই স্কুলে ভর্তির চেষ্টা চলছে। ঋতিকেও শ্রী একটু একটু করে তৈরি করার চেষ্টা করছে। যদি ওখানে ঋতিকেও ভর্তি করা যায়। রুচির জন্য বিশ্বদেব যেমন নানা জনের সঙ্গে কথা বলছে, দরকারে ডোনেশন দেবে বলছে, ঋতির জন্য তেমন কেউ করার নেই। ঋতিকে মেরিটের বেসিসেই চান্স পেতে হবে। কিন্ডার গার্ডেন স্কুলের মিসদের সঙ্গে কথা বলে, ওখানকার অন্য বাচ্চাদের মায়েদের কাছ থেকে বই ধার করে এনে শ্রী ঋতিকে পড়ায়। বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান এইসব। কখনো কখনো অনন্তকে বলে, তুমি একটু ওকে অঙ্ক প্রশ্ন করে দিয়ে যাও না! তোমার হাতের লেখা সুন্দর। মেয়েটা খুশি হয়। অনন্ত একসময় প্রাইভেট টিউশনি করত। বেশ কিছু ছেলেমেয়েকে সে নামকরা সমস্ত স্কুলে ভর্তির জন্য তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন তার ইচ্ছে করেনা। সারাদিন মিলের কাজ, তারওপর বাড়ির বাজার হাট, দোকান পাট, দাদার নানা কাজ এসব লেগেই আছে। তার মধ্যে আর মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে মাথা ঘামাতে তার ইচ্ছে করে না। কিন্তু শ্রী জোরাজুরি করে। অবশ্য মেয়েটা ভালো। মন দিয়ে অঙ্ক করে, বাংলা লেখে। খাতা দেখার সময় সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত নাড়তে থাকে টেনশনে, যদি ভুল হয়! কিন্তু ভুল ওর হয় না। সব ঠিক লিখলে বাবা হিসেবে অনন্তর গর্ব হয়। সে ভাবে, একদিন ঋতি তার মুখ উজ্জ্বল করবে। সে যা করে দেখাতে পারেনি, ঋতি তাই করে দেখিয়ে দেবে। ভাবে আর গর্বে বুকটা তার চওড়া হয়ে ওঠে। কিন্তু ওটুকুই। ওর বেশি মেয়ের জন্য কিছু করতে তার ইচ্ছে করে না। শ্রী মোটামুটি আধাজল খেয়ে লেগেছে মেয়েটাকে নিয়ে। তার জন্য অবশ্য কথাও শুনতে হয়েছে।
বিশ্বদেব বলেছে, মেয়ে কি তোমার এম এ, বিএ পড়ছে না কি যে অত পড়াচ্ছ। এতো কিছুর দরকার কি! ব্যারাকপুর গার্লসে না হলে না হবে। অন্য স্কুলও তো আছে।
শ্রী ভাবে নিজের কথা। সেই ছোটবেলায় তার ইচ্ছে হয়েছিল ব্যারাকপুর গার্লসে পড়তে। তার সে ইচ্ছে বাড়িতে গুরুত্বই পায়নি। মেয়েটার ক্ষেত্রে এমনটা সে হতে দেবে না।
বিকেল বেলা সেদিন কাজের বউ আসেনি। শ্রী গোটা বাড়ি ঝাঁট দিচ্ছে। মাধুরী ঘুম থেকে উঠে পড়েছে দেখে শ্রী বলে, বড়দি, আগে ঝাঁট দিয়েনি। তারপর জল ভরে দিচ্ছি।
মাধুরী সে কথা শুনলনা। একমাথা খোলা চুলে শ্রীর ঝাঁট দেওয়ার মাঝেই জল ভরতে শুরু করে দিল। মাধুরীর এই এক সমস্যা। সারাদিন মাধুরী বিশ্বদেবকে দেখিয়ে দেখিয়ে কাজ করতে চায়। সে মনে করে কাজ করলেই এ বাড়িতে তার গুরুত্ব বজায় থাকবে। এ সংসারে তার কর্তৃত্ব বজায় থাকবে। এই হয়েছে তাকে নিয়ে মুশকিল।
সকাল থেকে সে রান্নাঘরে গজগজ করতে থাকে, কি যে করে না শ্রী। এখনো টিফিন খাওয়ার সময় হল না। শ্রী না খেলে সে খেয়ে নিতে পারছেনা।
বিশ্বদেব রেগে ওঠে। মেজ বৌ কি করছেটা কি?? হু্ এখনো টিফিন খাওয়ার সময় হল না!
মেজ বৌ যে সকলের জন্য টিফিন বানিয়ে তারপর বালতি বালতি জামাকাপড় নিয়ে কাচতে বসেছে একথাটা তাকে কেউ বলার নেই।
সেদিনও একই কাণ্ড। মাধুরী জল ভরছে। এদিকে খানিকটা করে জল উপচে পড়ছে ধুলোর ওপর। টাইগারের লোম উড়ছে ঝাঁটার সঙ্গে। সেসবও জলে গিয়ে পড়ছে। শ্রীর রাগই হলো। বিশ্বদেবকে বলল, দেখলেন দাদা, আমি কিন্তু বড়দিকে মানা করলাম এখন জল ভরতে। বড়দির জেদটা দেখলেন। ওই জলটায় ধুলো, টাইগারের লোম সব পড়ছে। ওই জল খাওয়া যাবে!
বিশ্বদেব কিছু বলছে না। চোয়াল শক্ত করে বসে আছে।
দাদা, আপনি তো চোখের সামনে দেখছেন, বড়দি আজকাল কী শুরু করেছে। সামান্য সামান্য বিষয় নিয়ে অশান্তি হচ্ছে।
তোমার বড়দি বোকা মানুষ তো। তাই ওর ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেওয়া সহজ।
শ্রী আকাশ থেকে পড়ে। এরা কী চোখ থাকতেও অন্ধ। দেখছে একজন পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করছে। তবু তার নামেই দোষ দেবে।
এমন নিত্যদিন ঘটেই চলেছে। রোজই ননদ, ভাসুরের কাছ থেকে তাকে নানা কথা শুনতে হয়। রোজ তাকে নিয়ে বাড়িতে অশান্তি হয়। শ্রী ঠিক বুঝতে পারে না তার কি করা উচিত।
আপাতত সে ঋতিকে নিয়ে পড়ল। ঋতির পরীক্ষা। শ্রীর মনে হচ্ছিল এ যেন তারই পরীক্ষা। এ পাড়ায় এক ভদ্রলোক থাকেন, অবিবাহিত। তিনি রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের মাস্টারমশাই। ব্যারাকপুর গার্লসের সঙ্গে তার যোগাযোগ খুবই ভালো। বিশ্বদেব তাকে গিয়েই ধরেছেন রুচির ব্যাপারে। শ্রীও তাকে বলতে গেছিল। ভদ্রলোক শ্রীর মাথায় হাত রেখে বলেছেন, মেয়েটিকে ভালো করে তৈরি করো। আর কিছু ভাবতে হবে না।
অ্যাডমিশন টেস্টের দিন স্কুলের বাইরে শ্রী আর অনন্ত অন্তহীন অপেক্ষা করছে যেন… মেয়েটা ভিতরে কী করছে কে জানে! লিখবে তো সব কিছু! পারবে তো! ভয় পাবে না তো! ঘণ্টা পড়ার পর সব বাচ্চারা একে একে বেরিয়ে আসছে। কেউ কাঁদছে, কেউ মাকে দেখে ছুটে আসছে, কেউ চিৎকার করছে… ঋতি বেরোল সবার শেষে। মুখটা হাঁ করে আছে। ও সবসময় যেমন করে থাকে। বাবাকে দেখে মেয়ের একগাল হাসি। অনন্ত ভিড় ঠেলে ওর সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে ওকে এক এক করে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল কী প্রশ্ন এসেছিল পরীক্ষায়। ঋতি তো একেবারেই তোতলা নয়। খুব স্পষ্ট তার উচ্চারণ। সে বলতে শুরু করেছে প্রশ্ন ও উত্তর। গোটা প্রশ্নটাই তার মুখস্থ।
সে বলছে, বাবা ঝুড়িতে ৫০টা আমি ছিল। ১৫টা আম পচে গেছে। পচে গেছে মানে তো বাদ চলে গেছে। বিয়োগ করেছি। ৩৫ টা থাকছে। টিয়া পাখির রচনা থেকে জেনারেল নলেজ সব সে এক নিঃশ্বাসে বলে গেল।
অনন্ত যেন নিজেকে ধরে রাখতে পারছেনা। মেয়েটা সব পেরেছে। সব লিখে এসেছে। পাশে দাঁড়িয়ে শ্রীর চোখে জল। অন্যান্য অভিভাবকরাও তখন ঋতিকে ঘিরে ধরেছে। তাদের অবাক করে দিয়েছে ওইটুকু মেয়ে।
কয়েকদিন পর একদিন বিকেলবেলায় রেজাল্ট বেরোল। সেই ভদ্রলোক জানালেন, ঋতি ফোর্থ হয়েছে। কোনো সুপারিশের প্রয়োজনই হয়নি। ও নিজের যোগ্যতায় চান্স পেয়েছে। রুচিকেও ভর্তি করা গেছে।
১৫
শ্রী ঋতির ব্যাপারে সামান্য নিশ্চিন্ত হলেও বাপের বাড়ি নিয়ে খুবই ব্যস্ত হয়ে উঠল। বাপি এর মধ্যে প্রোমোশন পেয়ে পুলিশ কোয়ার্টারে চার তলা বিল্ডিংয়ে উঠে এসেছিলেন। তারপর অস্মির বিয়ে হল। অস্মি কিছুতেই পড়াশোনা করল না। দু দুবার মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েও ব্যাক এলো। অস্মি দেখতে খুবই সুন্দর। কিন্তু ভারীর দিকে চেহারা। সে নিয়ে হাসি ঠাট্টা তাকে কম শুনতে হয় না। বয়সও তুলনায় বেশি মনে হয়। কিন্তু মুখখানি তার দুর্গা প্রতিমার মতো। গায়ের রঙও দুধে আলতা। ফলে ভালো ভালো সম্বন্ধই তার জন্য এসেছিল। কিন্তু একটাও শেষ পর্যন্ত টিকল না। মিনিমাম একটা পাশ ছাড়া… এই বলে সব সম্বন্ধই কেটে গেল। শেষপর্যন্ত কলকাতার এক ব্যবসায়ী পরিবার অস্মিকে পছন্দ করল। ওদের মূলত হুন্ডির ব্যবসা। ছেলেটি বিএসসি পাশ। বাবার ব্যবসাই সামলায়। দাদা ইঞ্জিনিয়ার। দাদার দুই মেয়ে। ওরা মেয়ের রূপ দেখেই মেয়েকে ঘরের বউ করল। কিন্তু বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে বোঝা গেল ছেলে আসলে কিছুই করেনা। বাপের টাকায় ফূর্তি করে, বেড়াতে বেরিয়ে, বই পড়ে দিন কাটায়। আরো একটা ব্যাপার শ্রী খেয়াল করল। ওরা অস্মিকে বেশিদিন শ্বশুর বাড়িতে রাখতে চায় না। বর সমেত অস্মি প্রায় সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনটাই বাপের বাড়ি থাকে। একদিনের জন্য শ্বশুর বাড়ি গেলেও ফিরে আসে পরদিনই। এতে শ্রীর বাবার ওপর যথেষ্ট চাপ পড়ে। একে তো তার বাড়িতে এসোজন বসোজন লেগেই আছে। তার ওপর জামাইও যদি থাকতে শুরু করে তবে তো সংসার চালানো দায়। শ্রীর মায়েরও এতো জনের রান্নাবান্না সামলাতে, ঘরের সব কাজ করতে বেশ কষ্টই হয়। অস্মি তো আগেও কোনো কাজ করত না। পাড়া বেরিয়ে, এর গাছের পেয়ারা, ওর গাছের বাতাবি লেবু এই করে দিন কাটাতো। এখন বিয়ের পর এবাড়িতে সে নিজেকে অতিথি মনে করে। ফলে কোনো কাজে হাত লাগায় না। টুয়াকে এগিয়ে আসতে হয় মাকে সাহায্য করার জন্য। সেদিন শ্রী যাওয়াতে টুয়ার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। টুয়ারও পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না। বই নিয়ে বসলে বমি পায়। কিন্তু পাশ করার জন্য পড়াটুকু ও করে।টুয়া তাই বলছিল, জানিস দিদি, ছোড়দি সেই যে এসে এবাড়িতে ঢোকে, নড়ে না চড়ে না। সব কাজ আমি আর মা করি। ওদের ঘরের বিছানাটাও আমাকে করে দিতে হয়।
শ্রী শোনে। মনে মনে বিরক্ত হয়।
জানিস দিদি, ছোড়দিকে মেজ জামাইবাবু কত শাড়ি কিনে দেয়। দামি দামি গার্ডেন, বালুচরী।আরো কত কী!! কত গয়না ছোড়দির। বাপী যা দিয়েছে তাতো আছেই। তারপরও জড়োয়া সেট, সোনার বালা,মাকড়ি কত গয়না!!
তাতে কী টুয়া! ওর বর ওকে দিচ্ছে তাই ওর হচ্ছে।
না দিদি দেখ, ছোড়দির তো এতো আছে। আমাকে বা তোকে ছোড়দি তো কিছু দিতে পারে বল! কখনো দেয় না কিন্তু দেখবি!
ছিঃ টুয়া। ওভাবে ভাবতে নেই। তুমি পড়াশোনা করো।বাপী তোমারও ভালো ঘরে বিয়ে দেবে। তখন তোমারও অনেক কিছু হবে।
আর দিদি তোর! অনন্ত দা তো তোকে…
থাক না টুয়া এসব কথা। আমি ভালো আছি। বেশ আছি। সবার জীবনে সব কিছু হয় না।
শ্রীর মা আড়াল থেকে ওদের কথা শুনছিল। বড়ো মেয়েটার জন্য তার চিন্তার অন্ত নেই। সেই কোন ছোটবয়েসে বিয়ে হয়ে গেল। ও বাড়িতে ওর খুব কষ্ট। সারাদিন পরিশ্রম করে, ঠিক মতো খেতেও পায়না। জা ভাসুরের সংসারে একরকম আশ্রিত হয়েই থাকতে হচ্ছে।
শ্রীর বাপীর রিটায়ারমেন্টের সময় হয়ে এসেছে। ভদ্রলোক বাড়ির বড়ো ছেলের দায়িত্ব পালন করতে করতে নিজের একটা আস্তানা তৈরির কথা ভাবেইনি। শ্রীর মা বহুবার বলা সত্ত্বেও একটা জমি কিনতে পারেননি। শ্রীর মার তো বাপের বাড়ির জমির টাকা। শ্রীর দাদু মারা যাওয়ার পর বোনেদের মধ্যে জমি ভাগ হয়েছে। সেই জমি বিক্রির টাকা এনেও স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছে শ্রীর মা। একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই যে দরকার সেটা তিনি ভালো মতোই বোঝেন। বোঝেনা শ্রীর বাপী। মালদায় তাদের আদি বাড়ি। সেখানেই সবশুদ্ধ চলে যাবেন ঠিক করেছেন। তাতে সায় দেয় সেজ ভাইও। কিন্তু ছোট মেয়েটির এখনো বিয়ে হয়নি। ছেলেটাও পড়াশোনা করছে। ওর চাকরি বাকরির চেষ্টা। সবশুদ্ধ মালদা চলে গেলেই হল!
যাই হোক, কম পয়সায় বাড়ি ভাড়া খোঁজা শুরু হল। একটু ভদ্র মতো জায়গায় অন্তত দুটো ঘর যদি পাওয়া যায়। পেনশনের টাকায় এর বেশি তিনি পারবেন না। কিন্তু বহু খুঁজেও তেমনটা ঠিক পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাড়াটা ভালো না। কোথাও আবার ভাড়ায় পোষাচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত টুয়াই একটা ভাড়া বাড়ির খোঁজ নিয়ে এলো। ওর এক বন্ধু, মলিদের বাড়ির নিচের তলাটা ভাড়া দেওয়া হবে। ভাড়াও বেশি নয়।
শুরু হয়ে গেল জিনিসপত্র বাঁধা ছাদার কাজ। শ্রীকে এই সময়টা বাপের বাড়িতে থাকতে হবে। মাকে সাহায্য না করলে মার পক্ষে এতো বড়ো সংসার একা গুছানো সম্ভব নয়। কিন্তু শ্রী ছুটি পেলে তো! অনন্তর সঙ্গে এই নিয়ে এক প্রস্ত অশান্তি হয়ে গেল। একরকম রাগ করেই বাপের বাড়ি এলো শ্রী।
যেদিন তারা এই কোয়ার্টার ছেড়ে চলে যাচ্ছে টুয়া একটা হলুদ রঙের সিফন শাড়ি পড়েছিল। নিচে দাঁড়িয়ে প্রতিবেশীদের সামনে টুয়া খুব কাঁদছিল। লাটবাগানের মতো জায়গা ছেড়ে চিরতরে চলে যাওয়া… টুয়া কষ্টটা আর চেপে রাখতে পারছিল না। ওদিকে ওপরের বারান্দায় বসে ঋতি দেখছিল নিচের দৃশ্য। টুয়ার কান্না, প্রতিবেশীদের সান্ত্বনা। কেন কে জানে দৃশ্যটা যেন তার চোখে গেঁথে গেল। ছোট্ট বুক থেকে একফোঁটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ঠাঁই নাড়া হওয়ার যন্ত্রণা অতোটুকু মনে দাগ ফেলে গেল কি না বোঝা গেল না। কিন্তু কী যেন একটা বলে গেল।
এই কোয়ার্টারে তারও ইতিমধ্যে বেশ কিছু স্মৃতি তৈরি হয়ে গেছে। সেই যে লাল গাড়িটা! দাদুর কাছে কত করে আবদার করে পেয়েছিল সে। কিন্তু আবদারের কথাটা সে কিছুতেই ঠিক করে বলতে পারত না, বলত, যদি পাও তাহলে আনবা না, যদি না পাও তাহলে আনবা।
দাদু বলত, আচ্ছা দিদিভাই, পেলে আনব না, না পেলে আনব।
ঋতি তখন তার ভুল বুঝতে পারত। শুধরে নিয়ে ঠিকটা বলার চেষ্টা করত। কিন্তু চাওয়ার কথা ঋতি কোনোদিনই ঠিক করে বলে উঠতে পারত না। শ্রী যেমন পারেনি তার সামান্য চাওয়াটুকু অনন্তকে বলতে ঋতিও পারে না। ওর আবদারের এই ভুলটুকু যে ওর জীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসেব হয়ে দাঁড়াবে সে কী ছোট্ট ঋতির পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল। যা সহজে পাওয়া যায় তা ওর জন্য নয়, কিন্তু যা কঠিন, যা দুর্লভ তাও কী ওর জুটবে!
ভাড়াবাড়িতে এসে টুয়ার কান্না আরো বেড়ে গেল। এ বাড়ির নিচের তলাটা দুভাগ করে দুটো ভাড়াটে রাখা হয়েছে। খুব ছোট ছোট দুটো ঘর। একফালি রান্না ঘর। সামনে খানিকটা উঠান। তারপরে কলতলা। সব থেকে খারাপ অবস্থা বাথরুমের। শ্যাওলা ভর্তি মেঝে, নোনা ধরা দেওয়াল, ঝুল কালিতে নিদারুণ নোংরা। ওই বাথরুম একদিনও কী করে ব্যবহার করবে টুয়া। ভেবেই ও হাঁপিয়ে উঠেছে। শ্রী, ওর মা, ভাই সকলেরই বাড়ির অবস্থা দেখে মন খারাপ হয়ে গেছে। অতোবড়ো কোয়ার্টার ছেড়ে এ বাড়িতে, এই ঘুপচি আলো বাতাসহীন ঘরে তারা থাকবে কী করে!
১৬
বিশ্বদেবের বম্বে, আমেদাবাদ যাওয়া একই রকম চলছে। যেটুকু সময় বাড়িতে থাকে রুশি আর ঋতিকে নিয়ে পড়তে বসায়। হাতের লেখা করায় দুজনকেই। বিশ্বদেবের নিজের হাতের লেখাও খুব সুন্দর গোটা গোটা। ঋতিও জ্যেঠুর মতো লিখতে শুরু করেছে। এ পাড়ায় ঋতির বেশ সুনাম হয়েছে। এক বয়স্ক ভদ্রমহিলা, পাড়ায় তাকে সবাই মামী বলে সম্বোধন করে, সে একদিন তার মেয়েকে নিয়ে হাজির ঋতির হাতের লেখা দেখাবার জন্য। বলে, ওইটুকু মেয়ের কি সুন্দর লেখা দেখ! স্কুলেও দিদিমণিরা ঋতির হাতের লেখার সুখ্যাতি করে।শ্রী মেয়ের প্রশংসায় খুশি হয়। অনন্তর লেখা টানা হাতের। কিন্তু মেয়ে দাদার কাছে লেখা শিখছে বলে তার আপত্তি নেই। সে এসব বিষয়ে ভাবেই না।
কিন্তু পরদিনই ‘ক’ এর ইলেকটা একটু বেঁকে যায় বলে ঋতি জ্যেঠুর কাছে মার খায়।বিশ্বদেবের পড়াতে বসিয়ে গায়ে হাত তোলার অভ্যেস আছে। অঙ্ক ভুল হলে রুশির মাথায়ও চাঁটি পড়ে। কিন্তু ঋতিকে সামান্য সামান্য কারণে বিশ্বদেব মারধোর করেন। ওইটুকু মেয়েকে এভাবে মারলে শ্রীর কষ্ট হয়। মেয়েটা কেমন সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে। শ্রীর ব্যাপারটা ভালো লাগে না।
সেদিন শ্রীর বাবা মা এসেছেন এ বাড়িতে শ্রীর সঙ্গে দেখা করতে। এখন তো দুই পরিবারই স্টেশনের পুবদিকে থাকে। ফলে যাতায়াতের সুবিধে হয়েছে। ঋতি তখন বিশ্বদেবের কাছে পড়ছিল। দাদু, নিনান এসেছে শুনে ও উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছে। কিছুটা ছটফটও করেছে নিশ্চই। বিশ্বদেব সব দেখেছে। কিন্তু বাচ্চাটাকে পড়া ছেড়ে উঠে আসতে দেয়নি। শ্রীর মা তাই নিজে থেকেই ও ঘরের জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাস, সামান্য কারণেই বিশ্বদেব ঋতিকে মারতে শুরু করল। জুলফি ধরে এমন টেনে দিল যে ঋতি আঁ করে কেঁদে উঠেছে। শ্রীর মা সব বুঝলেন। তাদের আসাটা পছন্দ হয়নি বলে ওদেরই নাতনিকে মেরে সেটা বোঝাচ্ছে বিশ্বদেব। শ্রীর মার চোখে জল এসে গেল। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলেন।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা ঋতিকে নিয়ে পড়াতে বসেছে শ্রী। পড়া মুখস্থ হয়ে গেছে। এবার পড়া ধরা চলছে। ঋতি বিছানায় শুয়ে শুয়ে উত্তর দিচ্ছিল। হঠাৎই বিশ্বদেব এসে ওর চুলের মুঠি ধরে ওকে বিছানা থেকে টেনে তুলে দিল। শ্রী পর্যন্ত অবাক হয়ে গেছে। ঋতি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আপনি ওকে এভাবে মারলেন কেন?
শুয়ে শুয়ে পড়াশোনা হয় না মেজ বৌ।
ও তো সন্ধে থেকে মন দিয়ে পড়েছে। এখন আমি পড়া ধরছিলাম। ও খেলতে খেলতে উত্তর দিচ্ছিল। আপনি শুধু শুধু মেয়েটাকে মারলেন কেন?
বেশ করেছি মেরেছি। আমার বাড়িতে আছ। আমার অনুশাসন মেনে চলতে হবে।
এ কথার সামনে শ্রীর আর বাক্যস্ফুর্তি হয় না। মনে মনে ভাবে মেয়েটাকে একেবারে সহ্য করতে পারেনা বিশ্বদেব। না কি ভাইয়ের ওপর রাগ করে ভাইয়ের মেয়েকে শাসন করে। অকর্মণ্য ভাই আজ চার মাস হল বাড়িতে বসে আছে। বারান্দায় বসে বিড়ি টানা আর বাজার করা ছাড়া তার কোনো কাজ নেই।
শ্রী ঘরে গিয়ে অনন্তকে বলে এখানে আর থাকা যাবে না। আমার সঙ্গে যা হচ্ছিল সব সহ্য করেছি। মেয়েটার ওপর অনর্থক অত্যাচার করলে আমি মেনে নেব না।
কোথায় যাবে?? যাওয়ার জায়গা আছে?? আমি আলাদা থাকতে পারব না।
আলাদা থাকতে পারবে না যখন, নিজেরটা নিজে চালাতে পারবে না যখন তখন বিয়ে করতে গেছিলে কেন!
সে কৈফিয়ত আমি তোমাকে দেব না। ইসস দাদা একটু শাসন করেছে তাতেই ওনার এতো কথা। দাদা যখন বম্বে থেকে মেয়ের জন্য জামা এনে দেয়, খেলনা এনে দেয় তখন মনে থাকে না!
হ্যাঁ, নিজের মেয়েদের জন্য চারটে আনলে আমার মেয়ের জন্য একটা আসে বটে। কিন্তু চাই না। আমার মেয়ে সাধারণ জামাকাপড় পড়েই বড়ো হোক। ভয়ে ভয়ে বড়ো হতে দিতে পারি না।
অনন্ত আর কথা খুঁজে না পেয়ে বলে, শোনো, এখানেই থাকতে হবে। ওরা লাথি মারলেও ওদের পা ধরে এ বাড়িতেই পড়ে থাকতে হবে। বুঝেছ!
চিৎকার করে এসব কথা বলতে বলতে অনন্ত বেরিয়ে যায়। ঝগড়া হলেই সে সুইসাইড করব বলে শাসায়। আর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। ঋতি হাঁ করে এতোক্ষণ কথা গিলছিল। এবার বাবার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।গোটা বাড়ির লোক শোনে অনন্তর কথাবার্তা। সবাই সব বোঝে। রাগে ফুঁসতে থাকে বিশ্বদেব।
পরদিন ঋতির পড়া হয়ে গেছে। শ্রী বারবার বারণ করেছে তাকে দিদিদের ঘরে যেওনা কেমন। ঋতির একটি মাত্র ভালো পুতুল, যেটা সে ব্যারাকপুর গার্লসে ভর্তি হতে পারার পুরস্কার স্বরূপ পেয়েছে সেটাই বের করে দেয় শ্রী। তুমি এটা নিয়ে খেল। ও ঘরে যেও না কেমন!
ঋতি মাথা নাড়ে ।
কিন্তু একটু পরেই পাশের ঘর থেকে রুচি চেঁচায়। বাবা দেখ ঋতি না আমাদের পড়তে দিচ্ছে না। বিশ্বদেব ঋতির নাম করে বীভৎস জোরে চেঁচায়, ওকে বেরিয়ে আসতে বলে। ঋতির পিলে চমকে যায় যেন। ঋতি বলার চেষ্টা করে, জ্যেঠু ওরা দুজন গল্প করছিল। পড়ছিল না। তাই আমি…
কিন্তু ঋতির কথা শোনার আগেই তাকে খানিক বকাঝকা করে তাকে আবার অঙ্ক নিয়ে বসিয়ে দেয় বিশ্বদেব। ঋতি এতক্ষণ পড়াশোনা করে উঠে আবার পড়তে বসতে হচ্ছে বলে কেঁদে ফেলে।
এই ঘটনা আরো একদিন ঘটলে শ্রীই হাত ধরে টেনে নিয়ে এসে ঋতিকে মারতে শুরু করে। মারতে মারতে মনে হয় মেরেই ফেলবে ঋতিকে। ওদের ওপর যত রাগ হয় ততই ঋতিকে মারে। এমনটা প্রায়শই হতে থাকে।
ঋতি যে শুধু মা আর জ্যেঠুর হাতে মার খায় তাই নয়, রুশিও ঋতিকে মারে। ছাদে বিকেলবেলা খেলতে গিয়ে দুই বোনে খিটিমিটি লেগে যায়। রুশি তখন একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে গোল হয়ে ঘুরে যায়। হাতটা গিয়ে ঠাস করে পড়ে ঋতির গালে। ঋতি রেগে যায়। মুখচোখ তার লাল হয়ে যায়। কিন্তু সে মারতে পারে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপে। মাধুরী নিচ থেকে চেঁচায় ঋতি রুশি তোরা মারামারি করছিস। বলে মাধুরী হাসতে থাকে। এটাকে যে মারামারি বলে না, একতরফা মার বলে সেকথা মাধুরীর মাথায় আসে না।
১৭
মাকে আজকাল ঋতি খুব ভয় পায়। মা তাকে মারে। মা সবসময় কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে। হাসে না,কথা বলে না। মায়ের ছোট ছোট চোখে কাজল পড়লে মাকে আরো ভয়ংকর দেখায়। ঋতি তাই মায়ের কাছে ঘেঁষতেই চায় না। সেদিন বর্ণপরিচয়ের পিছনের পাতা থেকে মা শব্দার্থ ধরছিল। ঋতির পড়াটা ভালো হয়নি। বারবার ভুল করছিল। মা বঁটিতে সবজি কাটছিল। হঠাৎ মায়ের আঙুলটা কেটে গেল। মা রেগে গিয়ে ওই কাটা আঙুল নিয়েই ঋতিকে মারল।
ঋতি শুধু ভালো থাকে বাবার সঙ্গে। বাবা মাঝে মাঝে বিকেলবেলা তাকে নিয়ে সাইকেলে বসিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর ঋতির ছোটবেলার কথা বলে। ঋতি যখন জন্মালো তখন মায়ের কাকা, ঋতি যাকে আত্তা দাদু বলে সে কি করেছিল সেই কথা। সে নাকি ঋতির মুখ না দেখেই বাসে উঠে চলে গেছিল। ঋতির নিনান না কি বলেছিল, আবার মেয়ে! কালো বলে ঋতিকে না কি ও বাড়িতে কেউ ভালোবাসেনা। ঋতির এসব শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে। তবু বারবার বারবার বাবা তাকে এসব কথাই বলে। আর বলে যে মা যা বলছে শুনবে। নইলে মা মারবে। বাবার তাতে কষ্ট হবে। মা তো অবুঝ। শুধু মারে।
ঋতি এসব শোনে। ঋতির মাকে ভালোলাগেনা। কিন্তু দাদু নিনান! ওরা তো ঋতিকে ভালোবাসে। ঋতি দাদুর বাড়ি গেলে একটা মজার খেলা খেলে। দাদু আন্ডারওয়্যার পরে উবুর হয়ে শুয়ে বাজারের হিসেব লেখে। আর ঋতি দাদুর পিঠের ওপর বসে দাদুর পিঠে অপারেশন অপারেশন খেলে। কখনো দাদুর হার্টে পেসমেকর বসায়, কখনো দাদুর কিডনি বাদ দিয়ে দেয়। দাদুও মুখে নানারকম আওয়াজ করে তার সঙ্গে খেলে।
দাদুর একটা পয়সার কৌটো আছে। সেখানে দশ পয়সা, পাঁচ পয়সা, দু পয়সা,এক পয়সা সব আছে। ঋতি সেগুলোকে সাজায়। সেগুলো দিয়ে মিছিমিছি বাজার করে। আবার দাদুর বাড়িতে কোনো অতিথি এসে ঋতিকে লজেন্স খাওয়ার পয়সা দিলে ঋতি বলে এই কৌটোয় রেখে দি। দাদু বিড়ি কিনে খাবে। সেই নিয়ে দাদু নিনান খুব একচোট হাসে।
সেদিন দুপুরবেলা ঋতি ঘুমোচ্ছিল। হঠাৎই চেঁচামেচিতে তার ঘুম ভেঙে গেল। সে দেখল বারান্দায় রাখা চেয়ারটা তার পাশে খাটের ওপর রাখা। বাবা তার ওপর দাঁড়িয়ে ফ্যান থেকে মার একটা কাপড় ঝুলিয়েছে। তারপর তাতে ফাঁস দিয়ে বাবা গলায় পড়ছে। মা দূরে দাঁড়িয়ে। মার চোখে কাজল। মুখটা থমথম করছে। কেমন হিংস্র লাগছে মাকে। জ্যেঠু নেই। বম্মা আর পিসিও এসে ঘরে দাঁড়িয়ে বাবাকে নামাবার চেষ্টা করছে। ঋতি হাঁ করে সব দেখে। ঋতিকে কেউ খেয়াল করে না। বম্মা আর পিসি সর্বনাশী সর্বনাশী করে কিসব বলছে। বাবা খুব কাঁদছে।
তারপর সন্ধে থেকে বাবার মাথার যন্ত্রণা শুরু হল। ঋতি বাবার মাথা টিপে দেয়। বাবা অবেলায় স্নানে যায়।
ঋতি আজকাল সব কিছুতে ভয় পায়। খালি তার মনে হয় কে যেন তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। একটু অসতর্ক হলেই তাকে চেপে ধরবে। বীভৎস কোনো মুখ হয়তো বা। মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে সে কেঁপে ওঠে ঘুমের মধ্যে। দেখে এবড়ো খেবড়ো একটা মুখ ক্রমশ তার দিকে এগিয়ে আসছে। তার চোখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। বড়ো বড়ো দাঁত বের করে সে ঋতিকে খেতে আসছে। ভয়ে ঋতির গলা শুকিয়ে যায়। এর মধ্যে একদিন শ্রী রুচি রুশির ঘরে যাওয়ার জন্য ঋতিকে বাথরুমে বন্ধ করে লাইট নিবিয়ে দিয়েছিল। ভয়ে সেদিন ঋতি কাঁদতেও পারেনি।ঋতি তাই এখন ওদের ঘরে যায় না। ওদের ঘরে যে বড়ো পুতুলটা আছে, সবুজ জামা পরা, দুটো বিনুনি বাঁধা, এই এত্তো বড়ো, যেটা রুশি দিদির অসুখের সময় জ্যেঠু এনে দিয়েছিল সেটা নিয়ে খেলতেও চায় না। তার খালি মনে হয় তাকে যদি কেউ একটু জড়িয়ে ধরত। একটু ভালোবাসত! একটু আদর করত। রাতে শুয়ে যতক্ষণনা বাবা ঘুমোতে আসছে ঋতি জেগে থাকে। বারবার ঘরের বাইরে উঁকি মেরে দেখে বাবা কোথায়! অনন্ত খানিক বাধ্য হয়েই তাড়াতাড়ি শুতে আসে । অনন্ত শুতে আসার পরেও অবশ্য ঋতি খানিকটা ছটফট করে। অনন্ত তখন ধমক দেয়, আর একবার পাশ ফিরবি তো বিছানা থেকে নামিয়ে দেব। ঋতি সঙ্গে সঙ্গে কাঠ হয়ে যায়। কিন্তু নিজের অজান্তেই আরেকবার পাশ ফেরে সে। তারপর বাবার হাতটা বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
১৮
নতুন স্কুলে ভর্তি হয়ে ঋতি ঠিক স্বস্তি পেল না। এতো বড়ো স্কুল, এতো মেয়ে, মা বলল,সবাই নাকি তার বন্ধু। কিন্তু ঋতির পুরোন স্কুলের জন্য মন কেমন করে। সেই যে ছোট্ট একটা স্কুল! সামনে একটুখানি মাঠ। বৃষ্টি হলেই জলে টইটুম্বুর। তখন যাতায়াতের জন্য ইঁট পেতে দেওয়া হতো। সেই ইঁটের ওপর পা রেখে রেখে লাফিয়ে লাফিয়ে স্কুলে ঢুকতে হত। সেখানে মালা আন্টি, শিখা আন্টি তাকে খুব ভালোবাসত। একদিন মনে আছে ইংলিশ লিখতে গিয়ে কিছুতেই আর্টিকেল ঠিক জায়গায় লেখা হচ্ছে না বলে মালা আন্টি মাথায় মেরে ছিলেন। তারপর যখন লেখা শেষ হল তখন কত আদর করলেন, লজেন্স দিলেন।
এই স্কুলে দিদিমণিদের দেখলেই ভয় লাগছে ঋতির। এরা যেন কেমন কেমন। মিষ্টি করে কথা বলে না। আদর করে না। শুধু বকছে আর ধমকাচ্ছে।
এদিকে হয়েছে আরও এক মুশকিল। ঋতি ওর বয়সীদের তুলনায় লম্বা বলে ওকে বসিয়ে দিয়েছে লাস্ট বেঞ্চে। ঋতির লাস্ট বেঞ্চে বসতে একদম ভালো লাগে না। খালি মনে হয়, সামনে কত কিছু হচ্ছে, সে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তার পাশে এসে বসেছে প্রতিমা। প্রতিমা নস্কর। প্রতিমার মুখে কিরকম সাদা ছোপ ছোপ। জামাকাপড়ও পরিষ্কার নয়। ঋতি খেয়াল করেছে প্রতিমা বাড়ি থেকে মাত্র দুটো বিস্কুট টিফিন আনে। আর কিছু নয়। ওর সামনে খেতে ঋতির লজ্জা করে। প্রতিমা স্কুলের পড়াও কিছু করে না। বসে বসে খাতায় আঁকিবুঁকি কাটে। পিছনের বেঞ্চ বলে দিদিমণি খেয়াল করেননা।
একদিন ঋতির পেন্সিলের শিস ভেঙে গেছে। ওদিকে দিদিমণি বোর্ডে অঙ্ক করাচ্ছে । ঋতি তাড়াতাড়ি প্রতিমাকে বলে, তোর কাছে পেন্সিল আছে? আমাকে একটু লিখতে দিবি?
প্রতিমার হাতে একটা প্রায় শেষ হয়ে আসা পেন্সিল ছিল। পেনের খাপ পিছনে আটকে সেটাকে একটু লম্বা করা হয়েছে। প্রতিমা সেটাই দেয়। ঋতি লেখে। তারপর ঋতি আবার পেন্সিল ফেরত দেয়। কিন্তু প্রতিমার কী হল কে জানে! পরদিন থেকেই ও ঋতির কাছে পেন্সিল দাবি করে বসল। তুই আমার পেন্সিল ফিরিয়ে দে।
সে তো আমি তোকে কালই দিয়ে দিয়েছি।
না দিসনি। আমার পেন্সিল দে!
ঋতি ওকে অনেকবার বলে পেন্সিল ফেরত দেওয়ার কথা। প্রতিমা কিন্তু কিছুতেই শোনে না।ওর পেন্সিল চাই ই চাই।
ঋতির একটাই পেন্সিল। সেটা দিয়ে দিলে সে লিখবে কেমন করে! ঋতি চুপ করে থাকে। প্রতিমা কেমন মিচকে মিচকে হাসে আর পেন্সিল চায়।
কদিন এমনই চলছে। ঋতি মাকে কিছু বলতে পারে না। মা তো ঋতিকে দুটো পেন্সিল দেবে না। ঋতি জানে সে কথা। কিন্তু প্রতিমা তাকে রোজ বিরক্ত করে পেন্সিল নিয়ে। ঋতি চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না তার। বাথরুমে পায়খানা করতে করতে ঋতি কাঁদে। কেমন কষ্ট হয় তার। প্রতিমা তার সঙ্গে এমন করছে কেন!
প্রতিমা কিন্তু রোজ বাড়িয়েই চলেছে। সেদিন দিদিমণির কাছে গিয়েও নালিশ করেছে ঋতির নামে। দিদিমণি ঋতিকে ডেকে ধমক দিয়ে বলেছে,অ্যাই তুই ওর পেন্সিল ফেরত দিয়ে দিবি।
ঋতির খুব কান্না পাচ্ছিল। তাই দিদিমণিকে সে কিছু বলতে পারেনি। কিন্তু ছুটির সময় মাকে দেখে ও ছুটে গিয়ে মার কোমড় জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। শ্রী বুঝতে পারে না কী হয়েছে। মেয়েকে শান্ত করে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে সবটা জানতে পারে। আজ কয়েক মাস ধরে এমনটা চলছে। অথচ মেয়েটা বাড়িতে কিচ্ছু বলেনি! তার মেয়েটা এতো চাপা স্বভাবের! এমনিতেই বাড়িতে কারণে অকারণে মেয়েটা মার খায়, কাঁদে। স্কুলেও যদি এই পরিস্থিতি হয় তাহলে তো…
শ্রী পরদিনই একটা পেন্সিল কিনে প্রতিমাকে দেয়। বলে, শোনো, তুমি পেন্সিল চেয়েছিলে, পেয়েছ। আর ঋতিকে একদম বিরক্ত করবে না। প্রতিমা ঘাড় নাড়ে। কিন্তু পরদিন থেকেই ঋতিকে বলতে শুরু করে তার বড়ো পেন্সিল চাই না। তার ছোট পেন্সিলটাই ফেরত চাই। ঋতি তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। সে বুঝবেনা। ঋতি আবার লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে।
সেদিন রাতে বিছানায় শুয়ে ঋতি কিছুতেই ঘুমোচ্ছে না। অনন্ত একবার ধমক দিয়েছে। তাও ঋতি হাত পা নাড়াচ্ছে। অনন্ত বিরক্ত হয়ে উঠে দেখে ঋতি শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। প্রতিমা কাল আবার দিদিমণির কাছে নালিশ করবে বলে শাসিয়েছে। ঋতি তাই ভয়েতে কাঁদছে। অনন্ত শ্রীকে বলে, তুমি কাল গিয়ে একবার ওদের ক্লাস টিচারের সঙ্গে কথা বল।
জানা যায়, প্রতিমার বাবা রিক্সা চালায়। ঘরে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে। ঠিকমতো খেতে পড়তেও পায় না। দিদিমণির স্বাভাবিক সিমপ্যাথি তার প্রতি। শ্রী বলে দেখুন, ওর জন্য নিশ্চই আলাদা করে ভাবার দরকার আছে। কিন্তু তাই বলে ঋতি ঘোষালকে ও এমন করে বিরক্ত করলে তো মুশকিল। ঋতি কান্নাকাটি করছে। স্কুলে আসতে চাইছে না।
পরদিন থেকে প্রতিমা আর কথা বলে না ঋতির সঙ্গে। ঋতি ওর দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখে। কিন্তু প্রতিমা আর ঋতির দিকে ফিরেও তাকায় না। কথা বলে না। এই করে বছর কেটে যায়।
১৯
শ্রীর খুব শখ মেয়েকে নাচ শেখায়। অনন্ত রুচি, রুশি,ঋতিকে নিয়ে গান গাইতে বসে মাঝে মাঝে। শ্রীও গান ভালোবাসে। কিন্তু ছোটবেলা সেই যে স্কুলে মহিষাসুরমর্দিনীতে দুর্গা হয়ে সে নেচেছিল, সেই কথা মনে করলে আজও তার গায়ে কাঁটা দেয়। দিদিমণিরা কত প্রশংসা করেছিল। ঋতিকে তাই নাচ শেখাতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু টাকা কোথায়! অনন্তর ক্ষমতা নেই। শ্রীকেই কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
অনন্তর মিল খুলেছে। তার বেশিরভাগ মর্নিং ডিউটি থাকে। সন্ধেবেলাটা বাড়িতে থাকলে আজকাল অনন্ত মেয়েকে নিয়ে পড়তে বসায়। মূলত অঙ্ক আর বিজ্ঞান করায়। বাকি সাবজেক্টগুলো শ্রীই পড়ায়। ইংরেজি পড়ানো হয় না এখানে। ক্লাস ফোর অবধি ইংরেজি নেই। ফাইভ থেকে শুরু হবে। শ্রী কিন্তু আলাদা করে মেয়েকে একটু একটু করে ইংরেজি ওয়ার্ড বুক পড়ায়। বাড়িতেই যদি ইংরেজিটা একটু তৈরি করা যায়, পরে অসুবিধে হবে না।
ওদিকে রুশিকে পড়ানোর জন্য বাড়িতে আলাদা করে দিদিমণি রাখা হয়েছে। ঋতির জন্য তো সেসবের বালাই নেই। তাই সেদিন শ্রী অনন্তর কাছে কথাটা পাড়ল। সেদিনের ঝগড়ার পর শ্রী অনন্তর সঙ্গে বেশ কিছুদিন কথা বলেনি। কিন্তু পাশাপাশি একই ঘরে থাকতে হলে কথা না বলে উপায় নেই। তারওপর মেয়েটা আছে। ও এই ঝগড়া দেখে কী ভাবে কে জানে! আজ শ্রী একটু আহ্লাদ করেই শুরু করল, শোনো না, বলছি ঋতির তো কোনো মাস্টার নেই। আমিই বেশিরভাগটা পড়াই। বলছি যে, বাইরের মাস্টার রাখলে তো তোমাকে মাইনে দিতে হত। তার বদলে আমাকে তুমি কিছু টাকা মাস গেলে দেবে।
টাকা? মেয়েকে পড়াচ্ছ বলে?
না, ঠিক তা নয়। আমারও তো একটু হাত খরচ লাগে। একটা বোরোলিন কেনার টাকাও আমার কাছে থাকে না। ব্রেসিয়ারগুলো ছিঁড়ে গেছে। গিঁট দিয়ে দিয়ে পড়ছি।
কেন? বউদি তো তোমায় ব্লাউজ সায়া সব কিনে দেয়।
বউদি নয়, দাদা দেয়। দাদার টাকায় ওসব পড়তে আমার ভালো লাগে না।
অনন্ত কথা বলে না। দাঁতে দাঁত ঘষে কড়মড় করে আওয়াজ করতে থাকে।
তাছাড়া বড়দির চারটে কেনা হলে আমার একটা হয়। তাই দিয়ে তো সবটা চলে না। বাড়িতে ভাসুর রয়েছে। তার সামনে তো আর…
তাহলে কী করতে হবে??
আমাকে মাসে কিছু টাকা হাতখরচ দেবে। আমি আমার টুকটাক প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে নেব।
ও, সেটাই বলো! হাতখরচ চাই।
অনন্ত এমনভাবে কথাটা বলল যেন শ্রী ভীষণ অন্যায্য কিছু চেয়েছে। ভিতরে ভিতরে শ্রীর রাগ হচ্ছে। বলল, আমাকে কিছু দিলে আমি মেয়েটাকে নাচ শেখাব।
নাচ?? নাচ শিখে কী হবে? ওসব আমাদের বাড়িতে হবে না। বড়ো হয়ে মেয়ে ধেই ধেই করে নাচবে!
ঋতি শুনছে এসব কথা। বুঝতে পারছে সে নাচ শেখে বাবার ইচ্ছে নয়।
শোনো, দাদা বলেছে, স্বপ্নাদির কাছে ওদের তিনজনকেই ভর্তি করে দেবে। ওরা গান শিখবে। আলাদা করে নাচ শেখার দরকার নেই।
আমার মেয়ে কী শিখবে না শিখবে সেটা আমি ঠিক করব। ও গান অবশ্যই শিখবে, নাচও শিখবে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, মেয়েকে একেবারে সর্ববিষয়ে পণ্ডিত না করে তুলতে পারলে তো চলছে না! দাদার মেয়েরা গান শিখবে। আর ওনাকে মেয়েকে নাচও শেখাতে হবে!
দাদার মেয়েদের সঙ্গে কী সম্পর্ক! ওর যদি ক্ষমতা থাকে, ও যদি নিতে পারে, আলাদা করে শেখালে দোষ কী!
অনন্ত আর কথা বাড়ায় না। মুখে বিকৃত আওয়াজ করে বারান্দায় বসে বিড়ি খেতে শুরু করে।
শ্রী প্রায় জোর করেই অনন্তর কাছ থেকে ঋতির নাচ শেখার জন্য টাকা আদায় করে। শুরু হয় ঋতির নাচের ক্লাস। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার যে মেয়ের সবকিছুতে আগ্রহ সে মোটে নাচ করতে চায় না। ভারতনাট্যমের স্টেপগুলো করতে হলে পা বিশেষ ভঙ্গিতে আধভাঁজ করে বসতে হয়। ঋতির না কি তাতে পায়ের যন্ত্রণা করে। মাস্টারমশাই দুপায়ের ফাঁকে ছপটি দিয়ে মারে। ঋতি কাঁদে। বাড়িতে নাচ প্র্যাকটিস করতে গিয়েও ঋতি নানা বাহানা করে। জোর করলে কাঁদে। বিশ্বদেব খাবার টেবিলে বসে মেজ বৌয়ের মরিয়া চেষ্টা দেখে বাঁকা হাসি হাসে। শ্রী বোঝে মেয়েটা শয়তানি করছে। বাবার যেহেতু পছন্দ নয়, তাই ও নাচ করবেনা। তাই পায়ে ব্যথার বাহানা করছে। এতো দৌড়াদৌড়ি করে খেলে তাতে পায়ে ব্যথা হয় না। নাচতে গেলেই….শ্রী মেয়ের কান মুলে দেয়। এতো কিছুর পরও ঋতির নাচ শেখা চলছিল। তবে তা দুমাসের বেশি এগোল না। অনন্ত প্রথম মাসটা শ্রীর হাতে টাকা দিয়েছিল। দ্বিতীয় মাসে দশ তারিখ পেরিয়ে গেছে। তাও দেয়নি। শ্রী চাইতে গেলে অনন্ত টাকা তো দেয়ই না, উল্টে বলে, তুমি তো দেখছি কাবুলিওয়ালার মতো করছ টাকা টাকা করে!
শ্রী আর কিছু বলতে পারে না। ঋতির নাচ শেখার ওখানেই ইতি ঘটে।
তবে গানটা ঋতি ভালো করছে। স্বপ্নাদি সুপ্রভা সরকার আর পূরবী দত্তর ছাত্রী। মধুর মতো গলা। মূলত ক্ল্যাসিকাল শেখান। সঙ্গে নজরুল গীতি। রবীন্দ্র সঙ্গীত খুবই কম।
বাড়িতে একটাই হারমোনিয়াম। রুচি জন্মানোর পর কেনা হয়েছিল। তার আগে কীর্তন দলের একটা পুরনো হারমোনিয়ামে অনন্ত আর বিশ্বদেব গান গাইত। ওদের ছোট থেকে কেউ গান শেখায়নি। একদিন হঠাৎই অনন্ত শখ করে এই হারমোনিয়াম টা কম পয়সায় কিনে এনেছিল। তখন অনন্তর কম বয়স। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। মিলে চাকরি করে দুই ভাই মিলে। সেইসময় মিল থেকে ফিরে এসে দুই ভাই গলা ফাটিয়ে গান গাইত। এই করতে করতেই কেমন করে যেন স্বপ্নাদির সঙ্গে পরিচয়। প্রথমদিন স্বপ্নাদিকে গেয়ে শুনিয়েছিল, মেরে স্বপ্নো কি রাণি কব আওগি তুম। কিশোর কুমার কে নকল করে নানারকম আওয়াজ করেছিল গানের মধ্যে। সেসব কথা ভাবলে এখন অনন্ত লজ্জা পায়। দিদি কিন্তু স্নেহ ভরেই নিয়েছিল পুরো ব্যাপারটা।
আজ অনন্ত ঋতি আর রুচিকে দুটো নজরুল গীতি শিখিয়ে দিদির সামনে নিয়ে গিয়েছিল। রুশি গাইল নিশি নিঝুম ঘুম নাহি আসে। আর ঋতি গাইল আজি এ শ্রাবণ নিশি কাটে কেমনে। দিদি তো এইটুকু বাচ্চাদের মুখে এমন গান শুনে অবাক হয়ে গেছিল। স্কেল ঠিক করে এরপর শুরু হলো দুজনের গান শেখা। রুচিও বসে। ওর গলাটাও ভারি মিষ্টি। কিন্তু বড্ড তালকাণা। তবে গানের ব্যাপারে বিশ্বদেব অন্তত রুশিকে এগিয়ে রাখে। রুশির চিকন গলা। ওকে সুকান্ত সদনে ভীমসেন যোশীর অনুষ্ঠান দেখতে নিয়ে গেছিল বিশ্বদেব। টিকিট কম বলে ঋতিকে নিয়ে যাওয়া হয়নি। তারপর থেকে রুশি পায়ে তোয়ালে চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করে গান গায়। ঋতির ঠিক এসব আসে না। ও চোখ খুলেই গায়। ঠিক সুরে গায়। অনন্ত অবশ্য ঋতিকে নিয়ে গানের ব্যাপারে আলাদা করে কিছুই ভাবে না। ঋতি পড়াশোনা করবে। ওটাই ওর জোরের জায়গা। বিশ্বদেব ভাবেন রুশি পড়াশোনায় কমা তো কী! একদিন গান গেয়েই ওর নামডাক হবে। এভাবে দুই বাবার স্বপ্ন এগোতে থাকে মেয়েদের নিয়ে।
২০
এ পাড়াতে আসার পর থেকেই সান্যাল পরিবারের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে ঘোষালদের।সান্যাল পরিবারের বড়দা যিনি, তিনি কিছুদিন আগেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। এখন পারশিয়ালি প্যারালাইজড। কিন্তু রোজ তিনি বেলার দিকে লাঠিতে ভর দিয়ে এসে ওঁর বাড়ির বারান্দায় দাঁড়াবেন। আর রুশি, ঋতি তখন বারান্দায় পুতুল নিয়ে খেলে। বড়ো জ্যেঠুর সঙ্গে ওদের দুজনের গল্প হয়। বিশেষ করে ঋতি বড়ো জ্যেঠুকে সাপের মাংস রান্না করে খাওয়াবে বলেছে।
বড়ো জ্যেঠু জড়িয়ে জড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছেন কেমন করে রান্না করবে ঋতি দিদি??
ঋতি হাত-পা নেড়ে উত্তর দিয়েছে এই তো সাপটাকে এইভাবে ধরব, তারপর কুচি কুচি করে কেটে নুন হলুদ লঙ্কা মাখিয়ে ভাজব। তারপর তরকারি করব। শুনে বড়ো জ্যেঠু খুব একপ্রস্ত হেসেছে। এই বড়ো জ্যেঠুর দুই ছেলে। মৃত্যুঞ্জয় আর সিদ্ধার্থ। ওদের বাড়িতে এই দুই ভাইয়ের খুড়তোত, পিসতুতো বোনেরা থাকে। তারা এই দুই ভাইকে বড়ো ভাইয়া আর ছোট ভাইয়া বলে ডাকে। ওদের দেখাদেখি রুচি, রুশি, ঋতিও ওদের ওভাবেই ডাকতে শুরু করে। বিশ্বদেব এদের সঙ্গে বিশেষ করে ভালো সম্পর্ক তৈরি করার জন্য পুজোর পর বড়ো করে ভাইফোঁটার আয়োজন করে। তাতে বিরক্ত হয়ে মৃত্যুঞ্জয়ের এক কাকিমা মাধুরীর কাছে বলেছেন, এ তো ভাইফোঁটা নয়, এ হলো গিয়ে কাকাফোঁটা। মাধুরী সাতখান করে বিশ্বদেবকে লাগিয়েছে। ঠিক যেমন করে মাধুরী মেজ বৌ আর ননদের কথা বিশ্বদেবের কানে তোলে। ওই কালিয়া মেয়েটাকে নিয়েও তার অনেক কথা বলার থাকে।
মৃত্যুঞ্জয় বিয়ে করেনি। চাকরি করে। আর রাজনীতি করে। তীব্র বামফ্রন্ট সমর্থক। পার্টির নামে একঘটি জল বেশি খায়। কিন্তু বাচ্চাদের সঙ্গে খুব সুন্দর মিশতে পারে। রুশি আর ঋতির মজা করে দুটো নাম দিয়েছে মৃত্যুঞ্জয়। রুশি ওঁরাও আর ঋতি মুর্মু। দুজনেরই নাকের ওপর সাঁওতালরা মাদল বাজিয়ে গেছে। রুশি এসব শুনে খেপে যায়। বড়ো ভাইয়াকে তার ঠিক পছন্দ নয়। ঋতি খালি হাসে। মৃত্যুঞ্জয় এ বাড়িতে আসতে ভালোবাসে। বাচ্চাগুলো আছে বলেই হয়তো। ঋতির সঙ্গে তার বেশ দ্ব্যর্থক কথোপকথন হয়। যেমন শ্রীকে কোনোদিন গম্ভীর দেখে মৃত্যুঞ্জয় জিজ্ঞেস করে, কি মুর্মু! আবহাওয়া কেমন?
ঋতি পঠিত কবিতা থেকে বেছে নিয়ে উত্তর করে, শালবনে হুল্লোড় লেগেছে।
ব্যস আর যায় কোথায়! মৃত্যুঞ্জয় প্রবল হাসতে থাকে। আর বলতে থাকে এটা তুই কি বললি! কী পেকেছিস মুর্মু তুই!
কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় ঋতিকে ভালোবাসে। ঋতি, শান্ত ও শার্প। পড়াশোনায় ভালো। এই কারণে অবশ্য এ পাড়ার অনেকেই ঋতিকে ভালোবাসে। আর ভালোবাসে শ্রীকে। শ্রীর মিষ্টি ব্যবহার সকলকে মুগ্ধ করে রাখে। শ্রীর হাতের সেলাইয়ের জন্যও এ পাড়াতে তার নামডাক আছে। পাড়ার বয়স্ক কাকিমারা তাকে ডেকে নতুন নতুন ডিজাইন শিখিয়ে দেয়। শ্রীর ননদ তাদের কাছে গিয়ে যে সমস্ত কথা বলে বেড়ায় সেসব তারা শ্রীকে বলে দেয়। বলে, জানো, তোমার ননদ এসে বলছিল, ওর বড়ো ভাই, বড়ো বউয়ের কত কষ্ট। তুমি আর তোমার স্বামী না কি ওদের ঘাড়ে বসে খাও। তুমি না কি মাধুরীর খাবার কেড়ে খেয়ে নাও। ঋতিকে ভালো ভালো খাবার খাইয়ে দাও। আর রুচি, রুশি খেতে পায় না। শ্রী এসব শুনে হাসে। কী বা বলবে! বিরোধীতা করে কিছু বলতে গেলে ঘরের বিবাদ বেআব্রু হয়ে পড়বে। সকলের হাসির খোরাক হতে হবে।
কিন্তু বিশ্বদেব শ্রীএর এই পাড়ায় মেলামেশার ব্যাপারটা ভালো চোখে দেখে না। একদিন মৃত্যুঞ্জয়ের সামনেই বিশ্বদেব শ্রী প্রসঙ্গে বলেছে, ওটা তো একটা গাধা! ঘরের কথা পাঁচকান করবে আর হাসির খোরাক হব আমরা।
শ্রী সেদিন আর থাকতে না পেরে বলে উঠেছিল, কী কথা পাঁচকান করব বলুন তো! আপনার সংসারে কী এমন কথা আছে যা পাঁচকান করলে আপনার অসুবিধে হবে?
সে আমি কী করে জানব! তুমি কাকে কী বলে বেড়াও!
আপনিই তো জানবেন! নইলে আপনার এতো ভয় কিসের! ভায়েদের পরিত্রাতা হিসেবে নিজের ইমেজ তৈরি করতে চাইছেন। করুন। ঘরে বাইরে এক হলেই তো আর ভয়টা থাকে না। মনে মুখে এক নয় নিশ্চয়ই! কাজে কথায় এক হলে এতো ভয় পেতেন না।
সেদিন মৃত্যুঞ্জয়ের সামনেই একটা কেলেঙ্কারি হতো। কোনোরকমে ব্যাপারটা সামলে গেল।
এদিকে আবার রুচিকে নিয়ে হয়েছে এক অশান্তি। সে তো একেবারেই পড়াশোনা করেনা। অঙ্কে ফেল করে সেই খাতায় নিজেই মায়ের নাম করে সই করে স্কুলে জমা দিয়ে দেয়। মাধুরীই সেকথা জানতে পেরে শ্রীকে বলেছে। পড়ার বইয়ের ভিতর লুকিয়ে লুকিয়ে গল্পের বই পড়া তার ছোটবেলার অভ্যেস। এখনও সে সেসব চালিয়ে যাচ্ছে। শ্রী সেটা বারবার ধরে ফেলে বলেই শ্রীর ওপর তার রাগ। তাই শ্রী যা বারণ করে তাই সে বেশি ক’রে ক’রে করে। যেমন আঙুল ডুবিয়ে জলের গ্লাসে জল তোলা। এবং জল খেয়ে এঁটো গ্লাস বালতিতে রেখে দেওয়া। শ্রীর ঝাঁট দেওয়ার সময় ধুলো পাড়িয়ে হেঁটে যাওয়া। কখনো সখনো যদি তাকে ঝাঁট দিতে হয় তবে ইচ্ছে করে বারবার শ্রীর গায়ে ঝাঁটা লাগিয়ে দেওয়া। এসব খুচরো অশান্তি এ বাড়িতে চলতেই থাকে। সেই সঙ্গে নতুন উপসর্গ হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়। রুচি মৃত্যুঞ্জয়ের প্রেমে পড়েছে। না, প্রেম বলাটা ভুল হলো। এটা আসলে ছোটবয়সের মোহ। একধরণের ইনফ্যাচুয়েশন। কিন্তু সেটা রুচিকে বোঝান সম্ভব নয়। সে এই বয়েসে শেষের কবিতা পড়ে ফেলেছে। বুদ্ধদেব গুহর বাবলি নিয়ে পাড়ার দিদিদের সঙ্গে আলোচনা সেরে ফেলেছে। তার জন্যই বিশ্বদেব দামি দামি বই দিয়ে ঘর সাজিয়েছে। কোন্ বয়সে কোন্ বই পড়া উচিত না বুঝেই মেয়ের হাতে সবরকমের বই তুলে দিয়েছেন।বড়ো মেয়েকে নিয়ে বিশ্বদেবের অনেক আশা। বড়ো মেয়ে তার অহংকার। আর সেই অহংকারেই আঘাত হানল শ্রী। না, একেবারেই ইচ্ছে করে নয়। রুচির আচরণের প্রতিবাদ করেও নয়। একেবারেই ওর ভালোর জন্য। রুচি রোজ সন্ধেবেলা ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকে আর সামনের বাড়িতে মৃত্যুঞ্জয়কে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। বাড়িতে স্পেশাল কিছু রান্না হলে নিজে ইচ্ছেমতো খেয়ে নিয়ে বড়ো ভাইয়ার নাম করে তুলে রাখার জন্য জেদ করে। মা, কাকিমা খেল কিনা সেদিকে তার নজর নেই। একথা বলতে যাওয়ায়, মাধুরী শ্রীকে বলেছে, নাও নাও তোমাকে আমি তোমার ভাগেরটা দিচ্ছি। খেয়ে নাও। তাহলেই তো হলো।
আমি আমার খাওয়ার জন্য বলিনি বড়দি। ওর এই মানসিকতাটাই তো ভালো নয়।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। তোমায় আর অন্যের মানসিকতা নিয়ে ভাবতে হবে না।
তারপর সে গজগজ করতে থাকে, নিজেরও তো মেয়ে হয়েছে। দেখব কেমন মানুষ হয়!
এদিকে রুচির পড়াশোনা সব গোল্লায় গেছে। অঙ্কতেই সবচেয়ে বেশি কাঁচা রুচি। কিন্তু ওর অঙ্কের মাস্টারটাও তেমন। বসে বসে খালি গল্প করে আর হাসে। শ্রী এসব নিয়ে বিশ্বদেবকে একদিন বলতে গেছিল। বিশ্বদেব চোয়াল শক্ত করে বসে থেকেছে। তারপর বলেছে, আসলে কী জানো তো মেজ বৌ, একটা মেয়ের যদি বাড়িতে অনেক গার্জেন হয়ে যায় তাহলে মুশকিলই হয়। রুচির ব্যাপারে তোমাকে ভাবতে হবে না।
শ্রী অবাক হয়ে গেছে। তার মেয়ের ভালোর জন্যই তো সে বলেছে। কী অন্যায় করল! মেয়েটার সামনে মাধ্যমিক। এদিকে একদম পড়ে না।
একথা অনন্তকে বলতে গেলে অনন্ত বলেছে, তোমার দরকার কী আছে অন্যের মেয়ের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর। দাদার মেয়ে দাদা বুঝে নেবে!
শ্রী অনন্তর এই স্বার্থপরতায় আরো খানিকটা অবাক না হয়ে পারেনি।
রুচি কোনোদিনই পছন্দ করে না শ্রীকে। তার মাথায় ছোট থেকে ঢোকান হয়েছিল তার বুধুকে কাকিমা এসে কেড়ে নিল। বুধু আর সাইকেলে করে বেড়াতে নিয়ে যাবে না। আর গল্প বলবে না। মিষ্টি খাওয়াবে না। ওই ছোট্ট বয়স থেকেই তাই শ্রীকে রুচি হিংসে করতে শিখেছে। আর এখন তার নানা কাজে বাধা দেওয়ায় শ্রী হয়ে উঠেছে তার চোখের বিষ।
শ্রীর চটি ছিঁড়ে গেছে। অনন্ত কে বলা সত্ত্বেও অনন্ত কিনে দেয়নি। এদিকে শ্রীকে বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনতে যেতে হবে। শ্রী তাই রুচির একটা পুরোন, ব্যবহার না করা চটি পরে বেরিয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে আসতে না আসতেই রুচি প্রবল চিৎকার করতে শুরু করেছে।
তুমি আমার চটি পরে কেন গেছিলে বলো! আমার চটি পরে কেন?
শ্রী তাকে যতো বোঝাবার চেষ্টা করছে তার চটি ছিঁড়ে গেছে। তাই সে বাধ্য হয়ে…
কিন্তু রুচি কোনো কথা শুনতে চাইছে না। যা নয় তাই বলে শ্রীকে অপমান করছে।আর বিশ্বদেব আর মাধুরী সব শুনছে। একটা কথাও বলছে না। রুচিকে বারণ করছে না। বড়োদের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে নেই সেকথাও বলছে না।
শ্রী সবটা হজম করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বোঝে এ বাড়িতে যৌথ পরিবারের ভাবনাটা কেবল বাইরের লোককে দেখানোর জন্য। আসলে ভিতরে ভিতরে যে যার নিজের স্বার্থ আর হিংসে চরিতার্থ করছে। সেই জন্যই বিশ্বদেবের এতো ভয়। যদি বৃহৎ পরিবারের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হওয়ার কর্তৃত্ব থেকে সে বঞ্চিত হয়। দুর্বলের ওপর ছড়ি ঘোরাতে কে না ভালোবাসে। তারওপর আবার যদি পয়সার জোড় থাকে! কিন্তু বিশ্বদেব একবারও ভাবে না পরবর্তী প্রজন্মকে সে কী শিক্ষা দিচ্ছে। এই অশিক্ষা তার দিকেই বুমেরাং হয়ে ফিরবে না তো!

(ক্রমশ)

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes