ভাস্করের ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ – কয়েকটি দিক/ রাধাবল্লভ চক্রবর্তী

 ভাস্করের ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ – কয়েকটি দিক/ রাধাবল্লভ চক্রবর্তী

"কে বসে থাকে আড়ালে, আমার সমস্ত কিছু অন্ধকার করে দেয় এমন?’ বা ‘বন্ধ হয়ে আসছে দিন/বন্ধ হয়ে আসছে চোখ/ ক্ষমা করুক কেউ’ বা “তুমি জানো, আমি শালা ভিখারির চেয়েও ভিখারি/ বোকার মতন আজও হেসে/তোমার নিরালা ঘরে উঠে যাই, নেমে আসি, লোকে বলে—‘গম্ভীর মানুষ/একলা ঘরের কোণে থাকে’। এই যে উনি একটা প্রচলিত স্ল্যাং ‘শালা’ ব্যবহার করে ফেললেন, এটাতে লাইনটির বা বলা ভালো পুরো কবিতাটির তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে গেল। যেন উনি নিজেকেই বিদ্রূপ করে ফেললেন। প্রদাহ বা দুর্দশাও নৈঃশব্দ্যের স্বর্গরাজ্য খুঁজে পায় এসব লেখায়। যেমন — ‘খোলা শরীরের ওপর, খেলা করছে, খোলা শরীর/ হলুদ বিছানা, ভেসে চলেছে স্বর্গের দিকে’। এখানে খোলা শরীর যতটা না প্রকাশ্য যৌনতার প্রতীক, তারও চেয়ে বেশি একটি শরীরের (এবং মনেরও) অসুখ এবং তার ক্ষয়ের প্রতীক। আর এই যে বলা হল ‘খোলা শরীরের ওপর, খেলা করছে, খোলা শরীর’ তাহলে এখানে আরেকটি ‘খোলা শরীর’ তা কি মৃত্যুর শরীর, মৃত্যুর ছায়া নয়? এই প্রশ্ন তুলে ধরা কি সঙ্গত বা বাঞ্ছনীয় নয়? কেননা, ঠিক তারপরেই  আগে-পরের কবিতায় উল্লিখিত স্বর্গের প্রসঙ্গের মতো এখানেও রয়েছে। আর হলুদ বিছানা কি বৃদ্ধবয়সের মুমূর্ষু অবস্থায় মানুষের রোগী হয়ে ওঠা, অসমর্থ হওয়া এবং অনেকসময় অচৈতন্য অবস্থায় মলমূত্র ত্যাগের দিকটিকে ফুটিয়ে তুলছে না? এই ‘হলুদ’ শব্দটি সর্বোতভাবে সেদিকেই ইঙ্গিত করছে না? বা ধরা যাক ‘সে পেতে রেখেছিলো পুরোনো বিছানা— / নতুন ভাবে ঘুমোতে চেয়েছিলো কিছুক্ষণ—’। এই নতুন ঘুম কী? মৃত্যু নয়? যদি মৃত্যু না হয় তবে কেন এই কবিতার (‘সে’) শেষ লাইনে লিখবেন ‘শক্ত হয়ে উঠেছিলো তার হাত—সে, সত্যি, কেঁদেছিলো’ ? এই কান্না আনন্দের তো নয়, বরং শোকের। আসলে মৃত্যুকে কখনও বিচ্ছিন্নভাবে দেখতে চাননি ভাস্কর; দেখাটা উচিতও নয়; কেননা, জীবনের একটা অংশই তো মৃত্যু বা মৃত্যুচিন্তা; আমরা মৃত্যু বয়ে বেড়াই।"

বাঙালির চিরকালীন বহুবিধ স্বভাবের মধ্যে, শীতকাতুরে ও প্রেমবিলাসী হওয়া অন্যতম। এই অবিচ্ছেদ্য গুণগুলির প্রকাশ কবিতায় নানাভাবে বহুবার হয়েছে; এর মধ্যে অন্যতম ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’। ভাস্করের এই কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার পর বলা চলে আপামর বাঙালি-পাঠকদের কাছে এটি একটি  স্লোগানে পরিণত হয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই সেটি আর ভাস্করের লাইন হয়ে থাকেনি, বরং তার অধিকারের কথা মুখে-বুকে-ফেসবুকে ঘুরে বেড়ায় প্রতিনিয়ত; অন্তত এই শীতের সময় তো বটেই। প্রায় সব বাঙালি-পাঠক-প্রেমিকহৃদয় আগ্রহ, ব্যাকুলতা, উচ্চাশা নিয়ে তাদের প্রেমিকাদের ‘সুপর্ণা’ ভেবে ‘শীতকাল কবে আসবে’ এই প্রশ্ন করেই থাকে। তাতে অবশ্য সমস্যার বা ক্ষতির কিছু নেই, কিন্তু, ভাবনার জায়গাটি অন্য – এই কবিতা বা বলা ভালো কাব্যগ্রন্থটি নেহাতই কি একটি প্রশ্ন? একটি প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়ে? যদি তা-ও হয়, তাহলেও কি এই প্রশ্নটির মাত্রিকতা মাত্র একটি? মূল কারণ কি কেবলই প্রেম? এটি বুঝতে গেলে কাব্যগ্রন্থটির একটি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সেই চেষ্টাই করা যাক বরং –

১৯৬৫ থেকে ১৯৭১-এ লিখিত ও ১৯৭১-এ প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি যতটা না মানুষের সাথে মানুষের প্রেমের, তারও চেয়ে বেশি অস্তিত্বের, তারও চেয়ে বেশি যাপনের ও সেই অস্তিত্ব বা যাপনের  সংকটের, যা কয়েকটি চেনা চিত্র, দৈনন্দিন অভ্যাসের আঁচড়ের মধ্য দিয়ে সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ভাস্কর। ভাস্কর যে চেনা ছন্দ, মেজাজ ও ইঙ্গিত নিয়ে বাংলাকবিতায় আগামী কয়েক দশক সশরীরে বা তারপরেও শুধু কবিতার মধ্য দিয়ে সমহিমায় থাকবেন বাংলা-কবিতা-পাঠকের মেধায় বা মননে, যেন তার সোচ্চার ঘোষণা শোনা গেছিল এই কাব্যগ্রন্থেই। কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি শুনলে বা পড়লে কারওর বক্তব্য বা জবানবন্দি বলেই মনে হয়। যেহেতু ভাস্করের কবিতার মূল সূচক মানুষ, তাই তার প্রতিটি উত্থান-পতন, ধারাবাহিকতা-বিচ্ছিন্নতা এখানে আলোচনা করা অবশ্যকর্তব্য। ‘থাকা’ ও ‘না-থাকা’ ভাস্করের লেখার এক অন্যতম সংকেত – কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার কয়েকটি লাইন দেখা যাক – কবিতার নাম দিগ্‌ভ্রান্তি। ‘…পড়ে আছে — যেন পৃথিবীর শেষ ফুল/ এখনই ফুটে উঠবে, …’ কিংবা ‘শোক এলেই মা-র কথা মনে পড়ে’  — এই লাইনগুলি আশা এবং নিরাশার এক আশ্চর্য মিশেল; যেমনটা ভাস্করের লেখার এক কোর এলিমেন্ট। ফুল এবং তার ফুটে ওঠা নতুন এবং শুভ সূচনা, আশার প্রতীক; কিন্তু যখনই ‘পৃথিবীর শেষ ফুল’ শব্দ তিনটে পরপর বসল, তখনই কিন্তু ‘ফুল’ শব্দটির সাথে স্বাভাবিকভাবে আসা এক কোমলতা, আশার যে ভাবনা, তা মিলিয়ে যাচ্ছে, বদলে হতাশা, এবং রুক্ষতার ইঙ্গিত পাওয়া শুরু হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, ভাস্কর যেন এই পৃথিবীতে আর স্থায়ী এবং লাভজনক  আশা খুঁজে পাচ্ছেন না; যে আশা আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় বা যাচ্ছে, তা আসলে অন্তিমের প্রতীক; যেন প্রদীপের নিভে যাওয়ার আগে শেষবার সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বলভাবে জ্বলে ওঠার মতনই। মানুষিক দৃষ্টিভঙ্গিকে এই ধরণের কবিতা থেকে আলাদা রাখা যায় না। তার একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ হিসেবে ওই লাইনটিকে ব্যবহার করা হল এখানে — আমরা সবাই, শোক এলে, দুঃখ এলে, জীবনের ঝঞ্ঝা এলে, খুব সম্ভবত যাঁকে কাছে সবচেয়ে কাছে চাই, কাছে যেতে চাই, সব সমাধানসূত্র যে-মানুষটির কাছে পেতে পারি বলে ভেবে নিই, তিনি হচ্ছেন আমাদের জন্মদাত্রী মা। আর তাই, এখানে তিনি লিখছেন ‘শোক এলে মা-র কথা মনে পড়ে’। এখানে আমরা ধরে নিতে পারি, ‘মা’ যতটা না জন্মদাত্রী হিসেবে উনি ব্যবহার করছেন, তারও চেয়ে বেশি আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছেন, নিরাশার সাগরে দেখতে পাওয়া এক ছোট্ট আশার  অন্তরীপ হিসেবে, যার দিকে সাঁতরে যেতে চাওয়ার মানুষের এক অবিচ্ছিন্ন ও ঐকান্তিক প্রয়াস অব্যাহত যুগ যুগ ধরে।

পরের কবিতার দিকে নজর দেওয়া যাক — ‘চৌ-রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমরা চারজন’। এই কবিতার যদি থিম হিসেবে ধরতে হয়, তাহলে মনে হয় তাকে ‘planned’ ও ‘unplanned’ এই শব্দ দুটো দিয়ে ভালো বোঝানো যেতে পারে। কিন্তু হঠাৎ করে এরকম কথা বলার কারণ? কবিতার মূল ভাবনাটি একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক।  এখানে একজায়গায় কবি লিখছেন ‘… যেন স্বর্গে যাবো বলে/ সেই ভোরবেলা — অদ্ভুত ছাতা হাতে আমরা বেরিয়েছি, পায়ে/আশ্চর্য চপ্পল’ — এই কয়েকটি লাইন পড়ে মোটামুটিভাবে আমরা বুঝতে পারি যে বক্তা এবং আরও তিনজন স্বর্গের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন বলে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছেন; কেননা, “ ‘এদিকে স্বর্গের পথ’—বলে এক একচক্ষু নারী” বলে গেছে। তো মোটামুটি এই হচ্ছে ‘planned’ পার্ট; যা-কিনা একটি আভাস। এবার ‘unplanned’ যা-কিছু, এর মধ্যেই আছে। লক্ষ্য করার মতো শব্দটি হচ্ছে ‘যেন’। ‘যেন’ শব্দটির দ্বারা যে বাচ্যোৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ ঘটাচ্ছেন উনি, তাতে পাঠকমনে সংশয়ের জন্ম হয়। মনে হয়: ‘যেন স্বর্গে যাবো বলে’ বললেও, যাত্রাপথ বা গন্তব্য কি অন্য? এই কথা কি নেহাতই শ্লেষ? আর এই কবিতাটি শেষ হচ্ছে সেই অবিসংবাদিত লাইন দিয়ে — ‘আমাদের স্বর্গ নেই স্যারিডন আছে’। এই ‘স্বর্গ’ না থাকা এবং ‘স্যারিডন’ থাকার মধ্যে আসলে স্বপ্নভঙ্গের যতটা না বার্তা আছে, তারও চেয়ে বেশি আছে কঠোর বাস্তবতাকে আঁকড়ে এবং মেনে নিয়ে বাঁচার বার্তা। আমরা সবাই জানি যে ‘স্যারিডন’ হল ঘুমের ওষুধ; যাদের ঘুম স্বাভাবিকভাবে আসে না, তাদের ঘুমানোর জন্য ব্যবহৃত হয় এটি। নিয়ম করে এটি তাদের ব্যাবহার করতে হয়। কবিতায় এই ঘুমের ওষুধের প্রসঙ্গ এনে কবিতাটিকে নেহাতই কবিতা হিসেবে একটি অন্য মাত্রা দিয়েছে শুধু তা-ই নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও দুর্ভাবনার কারণে যে অনিদ্রা ও তার থেকে ক্রমে অসুস্থতা ও ইনস্যানিটির দিকে যাওয়া, তাকেই স্পষ্টভাবে শব্দের ছটার আড়ালে বলতে চেয়েছে। এই কবিতার আরও একটি সাংকেতিক অংশ কিন্তু আমরা পেরিয়ে এসেছি আগে আলোচনা না-করে; সেই লাইনগুলি হল: ‘এ-ওর শরীর নিয়ে গন্ধ শুঁকছি সন্ধেবেলা/ এ-ওর বুকের মধ্যে উঁকি মেরে        কোথায় দুঃখ পাপ/ লুকোনো টাকার মতো রয়ে গেছে, কোথায় ঈশ্বর/ টুপি খুলে হাঁটু মুড়ে/ বসে আছেন, চেয়ে দেখছি— ’ — লাইনগুলি নিশ্চিত করে আমাদের, মানে বর্তমানের মানুষের একটা পচনশীল অস্তিত্বের কথা তুলে ধরছে। যেখানে আমাদের সবার মাঝেই পাপ আছে, দুঃখ আছে, কিন্তু আনন্দ নেই, তার প্রকাশ নেই। এবং ঈশ্বরের ‘লুকোনো টাকার মতো’ থেকে যাওয়া, ঈশ্বরকে ক্রমশ ভুলে যাওয়া, তার অস্তিত্বের গুরুত্বহীনতার দিকে ইঙ্গিত করে। কিন্তু, ঈশ্বর গুরুত্বহীন হলেন কীভাবে? আসলে, লুকোনো টাকাকে যেমন কোথায় রেখেছি তা আর মনে না করতে পারার কারণে ব্যবহার করতে পারি না, ফলে তার অস্তিত্বের কোনও গুরুত্ব থাকে না, তেমনই, ঈশ্বর আমাদের দৈনন্দিন চিন্তা থেকে এমনভাবে লুপ্ত হয়েছেন যে, তিনিও ‘লুকোনো টাকার মতো’ হয়ে গিয়েছেন। তাঁর বসে থাকার ভঙ্গিটিও যথেষ্ট আকর্ষক — টুপি খুলে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা। স্বভাবত, কেউ কাউকে সম্মান প্রদর্শন করতে গিয়ে মাথা থেকে টুপি খোলেন, তাহলে কি এরকম ধরে নেওয়া যায় যে ঈশ্বর মানুষদের সম্মান জানাতে টুপি খুলেছেন? তাতে কি আসলে বিদ্রূপ নেই? নাকি ‘লুকোনো’ শব্দটার দ্বারা ধরে নেওয়া যায় যে ঈশ্বর ত্রস্ত, সে-কারণে স্বাভাবিকভাবে টুপি খুলে মানুষদের থেকে দূরে বা হয়তো মানুষদের মাঝেই লুকিয়ে গিয়েছেন তিনি। এটা কি নাগরিক জীবনের নাস্তিকতা নয়? এই নাস্তিকতায় যে বন্দী হয়ে পড়ছে জীবন ও আমরা, তাতে দর্শনীয় কিছুই নেই, আর তাই দার্শনিকের চোখে আমাদের বাঁচা হাস্যকর; ভাস্কর সেই কারণে লিখছেন – ‘হাস্যকর তোমার অতীত – হাস্যকর তোমার ভবিষ্যৎ’। বিচ্ছিন্নতার এই চূড়ান্ত সময়ে আমরা সবাই ব্যস্ত, আমরা সবাই সবার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, আসলে একে অপরের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি – সে-কারণে, কবিতার লাইন বক্তা হয়ে অথবা বক্তা কবিতার লাইনে লিখতে সমর্থ হয়েছেন ‘পুরোনো মুখগুলো তোমার থেকে সরে যাচ্ছে আরও তোমার পিছন দিকে’ বা ‘বছরের প্রথম দিনেও তুমি ঘুরে বেড়িয়েছো একা একা/ বছরের শেষ দিনেও তাই’।  আর এভাবেই আমরা স্মৃতির অনেক নীচে চলে যাই, বিস্মৃত হয়ে যাই – ‘যারা মরে যায় – তারা ঘরের নিচে এক, / অনেক নিচের ঘরে চলে যায়’ এভাবে বলছেন তাই কবি। জীবন যে সমাধি পায়, কবর পায়, তার কথাই এখানে বলা হয়েছে। আর এটাই পরিণতি হবে জেনে নিয়েও যখন নিজেদের দেখি আমরা জীবিত, তখন অবাক হয়ে যে কথা ভাবি, তা বোধহয় এটাই – ‘এখনো আমি বেঁচে আছি ঘুরে বেড়াচ্ছি ভাবতেই অবাক লাগে কেমন/ কিরোর মতে আমার মরে যাওয়া উচিত ছিলো গতবছরেই’। আমরা জানি, ‘কিরো’ হলেন একজন সুপরিচিত হস্তবিদ্যা সংক্রান্ত পুস্তকের লেখক; তিনি হয়তো নিজেও হস্তরেখাবিশারদ ছিলেন। এই লাইন দুটির দ্বারা জীবনের সর্বময় উপস্থিতি এবং তার unpredictability-কেই বোঝাচ্ছেন। অর্থাৎ, যা হয়তো সত্যিই হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি, আর যা হওয়ার নয়, তা-ই হয়েছে বা হচ্ছে বা হতে চলেছে। যেমন – ‘কতো ট্রাম-বাস ছুটে এলো এ-দিক ও-দিক থেকে, কতো মহিলা অদ্ভুতভাবে/ হেসে উঠলো ও রাত এলো/ আমি কোনো কিছুর শব্দই পেলাম না’। ভাস্করের যে রিক্ততার প্রতি অনুরক্তি, না-পাওয়ার প্রতি সরল জিজ্ঞাসা, শূন্যতার দিকে নির্দেশ এবং হাহাকারকে কাছে ডেকে তাকে উচ্চাসনে বসিয়েও তাচ্ছিল্য করে ফেলা, সেসবের বড় একটা অংশ, instrument হিসেবে কাজ করেছে তাঁর অননুকরণীয় কাব্যভাষা। যেমন — ‘এক সপ্তাহ চলে গেলে আবার অন্য এক সপ্তাহ চলে আসে’  বা ‘আমাদের ছোটো-পিসিমা আসে, ছোটো-পিসিমা চলে যায়

কে বসে থাকে আড়ালে, আমার সমস্ত কিছু অন্ধকার করে দেয় এমন?’ বা ‘বন্ধ হয়ে আসছে দিন/বন্ধ হয়ে আসছে চোখ/ ক্ষমা করুক কেউ’ বা “তুমি জানো, আমি শালা ভিখারির চেয়েও ভিখারি/ বোকার মতন আজও হেসে/তোমার নিরালা ঘরে উঠে যাই, নেমে আসি, লোকে বলে—‘গম্ভীর মানুষ/একলা ঘরের কোণে থাকে’। এই যে উনি একটা প্রচলিত স্ল্যাং ‘শালা’ ব্যবহার করে ফেললেন, এটাতে লাইনটির বা বলা ভালো পুরো কবিতাটির তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়ে গেল। যেন উনি নিজেকেই বিদ্রূপ করে ফেললেন। প্রদাহ বা দুর্দশাও নৈঃশব্দ্যের স্বর্গরাজ্য খুঁজে পায় এসব লেখায়। যেমন — ‘খোলা শরীরের ওপর, খেলা করছে, খোলা শরীর/ হলুদ বিছানা, ভেসে চলেছে স্বর্গের দিকে’। এখানে খোলা শরীর যতটা না প্রকাশ্য যৌনতার প্রতীক, তারও চেয়ে বেশি একটি শরীরের (এবং মনেরও) অসুখ এবং তার ক্ষয়ের প্রতীক। আর এই যে বলা হল ‘খোলা শরীরের ওপর, খেলা করছে, খোলা শরীর’ তাহলে এখানে আরেকটি ‘খোলা শরীর’ তা কি মৃত্যুর শরীর, মৃত্যুর ছায়া নয়? এই প্রশ্ন তুলে ধরা কি সঙ্গত বা বাঞ্ছনীয় নয়? কেননা, ঠিক তারপরেই  আগে-পরের কবিতায় উল্লিখিত স্বর্গের প্রসঙ্গের মতো এখানেও রয়েছে। আর হলুদ বিছানা কি বৃদ্ধবয়সের মুমূর্ষু অবস্থায় মানুষের রোগী হয়ে ওঠা, অসমর্থ হওয়া এবং অনেকসময় অচৈতন্য অবস্থায় মলমূত্র ত্যাগের দিকটিকে ফুটিয়ে তুলছে না? এই ‘হলুদ’ শব্দটি সর্বোতভাবে সেদিকেই ইঙ্গিত করছে না? বা ধরা যাক ‘সে পেতে রেখেছিলো পুরোনো বিছানা— / নতুন ভাবে ঘুমোতে চেয়েছিলো কিছুক্ষণ—’। এই নতুন ঘুম কী? মৃত্যু নয়? যদি মৃত্যু না হয় তবে কেন এই কবিতার (‘সে’) শেষ লাইনে লিখবেন ‘শক্ত হয়ে উঠেছিলো তার হাত—সে, সত্যি, কেঁদেছিলো’ ? এই কান্না আনন্দের তো নয়, বরং শোকের। আসলে মৃত্যুকে কখনও বিচ্ছিন্নভাবে দেখতে চাননি ভাস্কর; দেখাটা উচিতও নয়; কেননা, জীবনের একটা অংশই তো মৃত্যু বা মৃত্যুচিন্তা; আমরা মৃত্যু বয়ে বেড়াই। বলা ভালো আমাদের পরিসমাপ্তি হয়েও হয় না, অর্থাৎ সেই ঘুরেফিরে স্বর্গের প্রসঙ্গ এসে যায়; এসবের ঝল‌মল উপস্থিতি বা পুনরাবৃত্তি অগুনতি রয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক পরপর — ‘যারা মরে গেছে, তারা শান্তিতে আছে তো?’ বা ‘কখন দুপুর থেকে গত বছরের মতো একা একা বসে আছি/ একা একা বসে থাকা ভালো নয় খুব—’ বা ‘জাহাজ ছেড়েছে যেন ঘাট থেকে—স্বপ্ন নেই/ যেন বা রাজার ছেলে মরে গেছে কোনোখানে, আর শুধু বৃষ্টি পড়ছে’।

 

এই যে eternal suffering এর ভাবনা, তাকেই পাওয়া যাচ্ছে ‘যারা মরে গেছে তারা শান্তিতে আছে তো?’ লাইনে। ব্যক্তিএকাকীত্বের সাথে যে বস্তুর সংযোগ থাকে, তারও একটা একাকীত্ব উদ্‌যাপিত হয়, হয়তো তা যে দেখছে তারই দেখার গুণে, তার উপস্থিতি তাৎপর্যপূর্ণ অনেক কবিতায়। তেমনই একটি কবিতা (‘চব্বিশ বছর, আমি’) থেকে কয়েকটি লাইন তুলে নেওয়া যাক — ‘আলমারির পেছন থেকে বেরিয়ে এসে, সারাদিন, আমি আজ বসে থাকতে চাই

তোমার কাছে—চব্বিশ বছর, দেখো

সরু জলের মতো

উঠোনের একদিক থেকে অন্যদিকে আমি গড়িয়ে গেছি—গলার স্বর

চুরি হয়ে গেছে আমার, আমার বন্ধুরা

আমাকে ফেলে রেখে পালিয়েছে—তোমাদের বাগানবাড়ি থেকে

কতো দূর, আমি চলে এসেছি আজ—কতো অল্পতেই মানুষ

সুখী হতে পারে আজ মনে হয়—কতো অল্পতেই মানুষ বুড়িয়ে যায় এক রাত্তিরে—’ কিংবা ওই একই কবিতার অন্য কয়েকটি লাইন — ‘ভালোবাসবার আগেই কতো মানুষের ভালোবাসা ফুরিয়ে যায় হঠাৎ—সশব্দে/ ঘুমোতে ঘুমোতে, কতো মানুষ/ চশমা পরেই হঠাৎ চলে যায় কবরে’ কী অসম্ভব তীব্র এই লাইন! এই ভালবাসা কি শুধুই নারীর প্রতি প্রেম নাকি জীবনের প্রতি মোহ নাকি বাস্তবতার প্রতি ক্লান্তি, বিস্ময়, ক্ষোভ সেই প্রশ্নের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করার এইসব অসম্ভব লাইন। হয়তো বাংলা সাহিত্যে বস্তুর সাথে ব্যক্তির নিগড় বাঁধতে, বস্তুকে দেখা ও তাকেও উপলব্ধি করে বিষন্নতার চূড়ান্ত পরিবেশ তৈরি করতে ভাস্কর ব্যতীত অন্য কেউ সেভাবে সক্ষম হননি। এই সুযোগে আরও কয়েকটি লাইন পড়া যাক তবে — ‘বাইরে, উঁচু-নিচু জ্যোৎস্না

আমাদের স্বপ্নের রেলগাড়ি এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে আজ আমাদের উঠোনে—

চলো, খাটের নিচ থেকে

টেনে আনো তোমার ভাঙা সুটকেশ—

সমস্তরাত আমরা ব্রিজের ওপর দিয়ে—চলো—আমাদের পুরোনো জুতো

পড়ে থাকবে আমাদের স্তব্ধ বাথরুমে’  (সম্পূর্ণ কবিতা এটি। নাম – ‘চলো’) । বা ‘চেয়ার-টেবিলের জন্যে’ কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন — ‘এবারের শীতেও আমি টাকা পাইনি তেমন—যা দিয়ে কাঠের

চেয়ার-টেবিল—কিনে ফেলতে পারি একটা—

মানুষ পোস্ট-অফিসে যায়, ডাকটিকিট কেনে

মানুষ পোস্ট-অফিসে যায়, টাকা পাঠায় বিদেশে—জন্মদিনে কোথাও

মোমবাতি জ্বালিয়ে কেক কাটা হয় এখনও

নরম সোফার মধ্যে সতেজ তরুণ-তরুণী ডুবে থাকে—এবং

আমি লিফটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি যথারীতি

আমার বুটজুতো পরতে ভালো লাগে না

অন্ধকার রেস্তোরাঁর মধ্যে একা একা বসে থাকতে ভালো লাগে না

আমার কোনো চেয়ার-টেবিল নেই’  বা একই কবিতার পরের কয়েকটি লাইন — ‘আমি কি বসে বসে চিঠি লিখবো সকলকে

আমি কি লিখবো, ভালো আছি?

ভালো থাকার জন্যে, মানুষ

খাঁকি হাফ-প্যান্ট পরে ট্রেনিং নেয়, দৌড়য় মাঠের মধ্যে

শশা খায়—সমস্ত দিন শুয়ে শুয়ে

রক্তের গম্ভীর চলাফেরার শব্দ শুনি আমি

আমার বাঁ-হাতের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে ডান হাত

ডান হাতের কথা ভাবতে ভাবতে মাথা টিপটিপ করে’ এবং শেষের কয়েকটি লাইন — ‘হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকলো আমার, চেয়ার-টেবিল সমেত—

ঘুমের ভেতর ঘুম নয় এইসব, সারারাত

ফরফর ফরফর হুইসিল বাজে

ভৌতিক চেয়ার-টেবিল, ঘরময়, ঘুরে বেড়ায়—এবং

আমি হাসতে হাসতে ঢোঁক গিলি যথারীতি

আমার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না

আমার ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না

আমার কোনো চেয়ার-টেবিল নেই’। এখানে ভাস্করের শব্দের অসামান্য প্রয়োগ এবং তার কারণে তৈরি হওয়া চিত্রকল্পের তারিফ না করলে সেটা অন্যায় হবে; শব্দ চারটি হল — ‘রক্তের গম্ভীর চলাফেরার শব্দ’। কোনও চুপচাপ, গম্ভীর শিরা-ধমনীর মধ্য দিয়ে যে রক্তপ্রবাহ বা তার শব্দ, তাকে বোঝাতে গিয়ে যে রক্ত শব্দটিকে যেভাবে personify করলেন বা transfer epithet এর প্রয়োগ ঘটালেন, তা দেখে বুঝতে পারা যায় ভাস্করের শব্দের দখল এবং তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে মুন্সিয়ানা। এই মুন্সিয়ানা তাঁর ‘অসুখ’ নামের কবিতাতেও বর্তমান। পুরো কবিতাটি বোঝার সুবিধার্থে এখানে তুলে দেওয়া হল — ‘আমি কি চেয়েছিলাম বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা বেড়ে চলুক আমার

বিছানায়, ভোরবেলার সিগারেট থেকে হঠাৎ পড়ে যায় ছাই

কিছু একটা করা উচিত আমার

এই শুয়ে থাকা, এই বসে থাকা, এই উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানোর

চিম্‌টে বাতাস থেকে

সরে দাঁড়ানো উচিত কি আমার

আমি কি চেয়েছিলাম সজ্জিত হয়ে উঠুক জীবন

শুকনো জানলা দিয়ে, ভোরবেলাকার আলো এসে পড়েছে

ফাঁকা জুতোজোড়ায়

আমি কি চেয়েছিলাম ওইসব, ব্রাদার

আমি কি চেয়েছিলাম, এই’

 

কবিতাটি কী করা উচিত না উচিত এই নিয়ে চলছিল; তাতে আমরা মূলত procrastination-কে পাচ্ছি। ভাষা খুব পরিচিত, খুব সহজ। কিন্তু jerking আসল অন্য জায়গা থেকে, একটা শব্দ থেকে; শব্দটি খুবই পরিচিত, যাকে বলে কমন, কিন্তু কবিতায় এমন একটা স্টাইলে উনি ব্যবহার করলেন, কবিতাটা একটা অন্য স্মার্টনেস পেয়ে গেল; শব্দটি একটি ইংরেজি শব্দ — ‘ব্রাদার’। আরেকবার কবিতাটি পড়ে দেখুন এবং ওই ‘ব্রাদার’ শব্দটির অভাবনীয়তা লক্ষ্য করুন।

আসলে ভাস্কর হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের এমন এক নীরব নদী, যাঁকে খুঁড়লে আমরা জল, ঢেউ, ভয়ঙ্কর চোরাটান, জোয়ার-ভাটা সবই খুঁজে পাবো। আর তাকে সাঁতরে যেতে চাই অসীম ধৈর্য্য, সাহস, একাগ্রতা। ভাস্করের এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি লাইন আসলে মানুষ-সমাজ-সংসার-দৈনন্দিন বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলে, আর তাই তাকে ধরে ধরে আলোচনা করা একটি arduous ব্যাপার। পরে এই কাব্যগ্রন্থের বাকি লেখাগুলি ও লাইনগুলির চমক নিয়ে ফিরতে হবে, তার আগে বলা ভালো, ‘শীত’ ও কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া ইপ্সিত সেই titular কবিতাটি, অর্থাৎ, ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ দিয়ে এই আলোচনা-পর্বের শুভ সমাপ্তি ঘটানো যাক। দেখে নেওয়া যাক দুটো কবিতা —

কাব্যগ্রন্থে ‘শীত’ নামের কবিতাটি ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’-র পরে রয়েছে। এটি বলার এই কারণে প্রয়োজন হল, এই কবিতার একটি লাইন — ‘শীতের আলোয়, আবার আমি ফিরে এসেছি আজ তোমার ঘরে’। এখানে উনি এই যে ‘আবার’ শব্দটা লিখেছেন, এটি লক্ষণীয়। ‘শীতের আলোয়, আবার এসেছি আমি ফিরে এসেছি আজ তোমার ঘরে’ — তার মানে কি কি উনি আগেও এসেছেন? তাই ফিরে আসার কথা  নির্দিষ্ট করে বোঝাতে ‘আবার’ কথাটা লিখলেন? আর এসেছেন কার ঘরে? সে কি সুপর্ণা? তবে কি শীতকাল এখানে মিলনের ঋতু? এই কবিতার শেষ লাইন ‘শীতের ঝর্না ডেকে ডেকে ফিরে যাচ্ছে আমাদের’। লাইনটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সাধারণ লাইন, কিন্তু, একটু যদি নজর দেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে, এটি মোটেও সাধারণ নয়। কেন এই কথা বলা? শীতকাল বলতে সাধারণভাবে যে দৃশ্যটি আমাদের মনে পড়ে, তা হল জলাশয়ের জল ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ও জমে যাওয়া। কিন্তু, এখানে ঝর্না বয়ে চলেছে, ডেকে চলেছে কবিকে। আসলে এই যে ঝর্নার আড়ালে থাকা রূপক, ঝর্না বা শীতকাল, যা-ই বলি না কেন, একটি চলমানতা, জীবনের প্রতীক; যে-কোনও পরিস্থিতিতে, এগিয়ে যাওয়া, মানিয়ে নেওয়ার ডাক, তার সম্পূর্ণ ইঙ্গিত এখানে রয়েছে।

এই ইঙ্গিত পরতে পরতে রেখেছেন ভাস্কর তাঁর সেই অবিস্মরণীয় কবিতা ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ কবিতাটিতে। সেটির দিকে নজর দেওয়া যাক এবার —

কবিতা শুরু হচ্ছে একটি জিজ্ঞাসা দিয়ে। শীতকাল কবে আসবে। এটি তো সাধারণ জিজ্ঞাসাও হতে পারে, কিন্তু এটি এত বিশেষ হয়ে উঠল কেন? এর কারণ, এই প্রশ্ন বা অন্যান্য লাইনগুলি যেভাবে একের পর এক দিক‌নির্দেশ করেছে, তাতে আর শুরুর জিজ্ঞাসাটি মোটেও সাধারণ হয়ে থাকতে পারেনি। এখানে এই যে শীতকাল কবে আসবে কথাটি জিজ্ঞেস করছেন সুপর্ণা নাম্নী এক নারীকে, তার মাধ্যমে বক্তা যে (যিনি স্বয়ং কবিও হতে পারেন) অপেক্ষারত, বা তিনি তাঁর ইপ্সিত কিছু বা কারওর জন্য অপেক্ষা করতে দ্বিধা করেন না বা ক্লান্ত হন না, হাল ছেড়ে দেন না, তার কথা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এরপর লিখছেন ‘আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব —’ এই যে সময়সীমা চাওয়া, এ যেন বিশ্রামের জন্য। সারাজীবনের ক্লান্তি, শ্রম, হতাশাকে ভুলিয়ে দেওয়ার যে পণ তাঁর, তার মুখ্য অস্ত্র যেন এই ঘুম। এই ঘুম স্বাভাবিক ঘুম হয়তো নয়, এ হয়তো চিরঘুম, মৃত্যু। মৃত্যুর দ্বারা এই কষ্টে ভরা জীবন ছেড়ে চলে যাবেন অন্য কোথাও — হয়তো তাঁর খুঁজতে থাকা স্বর্গে। যখন এক জগতের অন্ধকার পেরিয়ে অন্য জগতের আলোর সন্ধান পাচ্ছেন বা পাবেন বলে ভাবছেন উনি। ‘আমি চুপ করে বসে থাকি- অন্ধকারে

নীল ফানুস উড়িয়ে দেয় কারা, সারারাত বাজি পোড়ায়

হৈ-হল্লা- তারপর হঠাৎ

সব মোমবাতি ভোজবাজির মত নিবে যায় একসঙ্গে- উৎসবের দিন’  জীবন নিজেই কি একটি উৎসব নয়? যেখানে কেউ একা থাকে, মনোকষ্টে থাকে, কেউ বা কেউ কেউ আনন্দ করে যায় — যেমনটা কিনা প্রতিটি উৎসবেই হয়। আর এই যে আনন্দ-উৎসব চলতে চলতে হঠাৎ ‘ভোজবাজির মতো নিবে যায়’, তা আক্ষরিক অর্থে হঠাৎ তৈরি হওয়া শূন্যতা, একাকীত্বের বার্তাবাহক। সেই যে শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন — ‘ছিল, নেই/ মাত্র এই’। এই আছি এই নেইয়ের মানেই তো জীবন। ভাস্কর তারই প্রতিষ্ঠা করলেন এই লাইনে বা অংশটিতে। ‘জলের ভেতর- শরীর ডুবিয়ে

মুখ উঁচু করে নিঃশ্বাস নিই সারাক্ষণ- ভালো লাগে না সুপর্ণা, আমি

মানুষের মত না, আলো না, স্বপ্ন না- পায়ের পাতা

আমার চওড়া হয়ে আসছে ক্রমশঃ- ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনলেই

বুক কাঁপে, তড়বড়ে নিঃশ্বাস ফেলি, ঘড়ির কাঁটা

আঙুল দিয়ে এগিয়ে দিই প্রতিদিন- আমার ভালো লাগে না- শীতকাল

কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব’  — এই যে আকুতি, আর্তনাদ তা পাঠক হৃদয়কে নাড়া দেয়, মনখারাপের সৃষ্টি করে। ঘোড়ার খুরের শব্দ আসলে এখানে জাগতিক ব্যস্ততা, নানাবিধ কাজের চাপ, যা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে বক্তাকে, আর বক্তা গুরুতর অপরাধে অপরাধী পলাতক বন্দীর মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন আর এসবের থেকে মুক্তি খুঁজছেন, আর সেই মুক্তির আশায়, মুক্তির খোঁজে সুপর্ণাকে বারেবারে একই প্রশ্ন করছেন। ভাস্করের এই যে ‘প্রেম’ ভাবনাটির ব্যবহার, নারী যে তাঁর কাছে জীবনের আশ্রয়, তা অতি সূক্ষ্মভাবে আমাদের ধরিয়ে যাচ্ছেন। ‘তোমার কথা মনে পড়তেই আমি কেঁদে ফেলেছিলাম —’ এই যে ‘তুমি’টিও জীবনে স্থায়ী নয়, তাকেও চলে যেতে হয় বা চলে যায় একা করে, অসহনীয় জীবনের মাঝদরিয়ায় ফেলে, তা কি আর বাকি থাকে এই লাইনের অন্তর্হিত মানে বুঝে ফেলার পর? ‘আর মাথা নীচু করে বসে থাকতে ভালো লাগে না- আমি

মানুষের পায়ের শব্দ শুনলেই

তড়বড়ে নিঃশ্বাস ফেলি এখন- যে দিক দিয়ে আসি, সে দিকেই দৌড় দি

কেন এই দৌড়ে যাওয়া? আমার ভালো লাগে না

শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব।’ — আর সবই যখন চলে যায়, কিছুই নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তখন যে মেনে নেওয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না, এবং উনি তা যে মেনেও নিচ্ছেন, জীবনের থেকে মুক্তি চেয়েও, জীবনধর্ম পালন করছেন সর্বাগ্রে, তার এক বিষাদপূর্ণ জয়গাথারই এক অতি ছোট কিন্তু বর্ণময় আলেখ্য এই কাব্যগ্রন্থ, কাব্যগ্রন্থের কবিতা ও সেই অমর কবি, ভাস্কর…

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes