
গ্রেপ্তার, অ্যালগরিদম ও ধূসর গণতন্ত্র— প্যানোপটিকনের নিচে বাংলা পক্ষ
অরিজিৎ লাহিড়ী
গর্গকে নিয়ে তৈরি মিমগুলো আসলে আমাদের সময়ের নিষ্ঠুরতার প্রতীক। আমরা এমনকি একটি গ্রেপ্তারকেও রসিকতায় পরিণত করতে পারি। এটি এক ধরণের শূন্যতা, যেখানে আমরা কোনো কিছুকেই আর গুরুত্ব সহকারে নিতে পারছি না। গণতন্ত্র এখন আর কোনো শাসনব্যবস্থা নয়, এটি এখন একটি রিয়েলিটি শো যেখানে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আমরা একজন নতুন ‘বিগ বস’ নির্বাচন করি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল এই রিয়েলিটি শো-এর একটি নাটকীয় সমাপ্তি ছিল, যেখানে প্রতাশিতভাবেই আই-প্যাকের মতো স্ট্র্যাটেজিস্টরা বলির পাঁঠা হয়েছেন । গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারির এই ময়নাতদন্ত আমাদের এক তিক্ত সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। রাষ্ট্র, বিপ্লব, জাতীয়তাবাদ, প্রতিবাদ কিংবা গ্রেপ্তার—সবকিছুই এখন এক বিশাল পারফরম্যাটিভ মেশিনারির অংশ। নাগরিকরা আর পুরোপুরি মানুষ নয়; তারা একেকটি ডেটা পয়েন্ট। আপনার প্রতিটি লাইক, প্রতিটি রাজনৈতিক ক্ষোভ, এমনকি গভীর রাতের নিঃসঙ্গতাও এখন কোনো না কোনো সার্ভারে উপাত্ত হিসেবে জমা হচ্ছে। যাকে বলে ‘এক্সিস্টেন্স অ্যাজ মেটাডেটা’ ভাইবস্। গর্গ চট্টোপাধ্যায় কোনো মহানায়ক নন, আবার তিনি স্রেফ খলনায়কও নন। তিনি এই আত্মবিনাশী সভ্যতার এক উপসর্গ মাত্র। তাঁর রাজনীতি যেমন বাঙালির ট্রমাকে পুঁজি করে টিকে ছিল, তেমনি রাষ্ট্রের পুলিশিটাও দেশপ্রেমের আড়ালে নজরদারিকে বৈধতা দিচ্ছে। ফলে এই সংঘাতে স্পষ্ট কোনো নৈতিক পক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমরা এক অদ্ভুত ধূসর অঞ্চলে বাস করছি, যেখানে সত্য আর মিথ্যার মাঝের দেয়াল কর্পোরেট অ্যালগরিদম অনেক আগেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আগের শাসক দলের তৈরি বেআইনি ক্লক টাওয়ার নতুন শাসক দলের ভাঙার মত করে। এখন বাস্তবতা অনেকটাই টাইমলাইনের এনগেজমেন্ট রেট দিয়ে মাপা হয়। গণতন্ত্রের এই বিশাল সার্কাসে আলো নিভে গেলে বোঝা যায়—স্টেজে আসলে কেউ নেই। আছে শুধু মেকানিজম, স্ক্রিপ্ট, আর রিপিট টেলিকাস্ট। গর্গ চট্টোপাধ্যায় হয়তো এখন লালবাজারের কোনো অন্ধকার সেলে ডিজিটাল প্যানোপটিকনের নীল আলোর নিচে বসে হার্ভার্ডের সেই দিনগুলোর কথা ভাবছেন, যখন স্নায়ুবিজ্ঞান অন্তত রাজনৈতিক অ্যালগরিদমের চেয়ে সহজ মনে হতো। আর বাইরে আমরা—ডিজিটাল বন্দিরা—অপেক্ষা করে আছি পরবর্তী ট্রেন্ডিং খবরের, পরবর্তী গ্রেপ্তারির, পরবর্তী ভাইরাল ক্রোধের, যা আমাদের একঘেয়ে অস্তিত্বে সাময়িক ডোপামিন শট দেবে। কারণ এখন প্রতিবাদও অনেকটাই কনটেন্ট, ক্ষোভও অনেকটাই স্ক্রলযোগ্য অর্থাৎ সবটাই ডুমস্ক্রল সিভিলাইজেশন কোর।
গর্গ চট্টোপাধ্যায় একজন হার্ভার্ড-ফেরত স্নায়ুবিজ্ঞানী। তাঁর একসময়কার বাজারকথিত বামপন্থী বুদ্ধিজীবী থেকে আচমকা বাংলা জাতীয়তাবাদী নেতায় পরিণত হওয়ার এই রূপান্তর নিজেই এক অদ্ভুত আধুনিকতাবাদী নাটক। তাঁর সংগঠন ‘বাংলা পক্ষ’ যখন প্রথম দিকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে পথে নেমেছিল, তখন মনে হয়েছিল বাঙালি হয়তো তার দীর্ঘদিনের আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খুঁজছে। কিন্তু ক্রমশ সেই রাজনীতি একধরনের সংকীর্ণ উপ-জাতীয়তাবাদের চোরাগলিতে ঢুকে পড়ল। গর্গর রাজনীতি আসলে মধ্যবিত্ত বাঙালির গভীর হীনম্মন্যতা এবং আত্মশ্রেষ্ঠত্ববোধের এক টক্সিক সংমিশ্রণ। একদিকে ১৯৪৭-এর দেশভাগের ঋত্বিক ঘটক মার্কা ট্রমা, ওপার বাংলা থেকে ভিটেমাটি হারিয়ে এপারে এসে দাঁড়ানোর দীর্ঘ যন্ত্রণা; অন্যদিকে হিন্দি বলয়ের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ভঙ্গুর, রক্ষণাত্মক প্রতিরোধ। এই রাজনীতির কেন্দ্রে কোনো বৃহৎ মুক্তির স্বপ্ন নেই, আছে কেবল আক্রান্ত হওয়ার এক স্থায়ী অনুভূতি—এক ধরনের ভিকটিম কমপ্লেক্স। গর্গ বারবার বলতে চেয়েছেন, বাঙালিরা বিপন্ন; তাদের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে ‘বহিরাগতরা’, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে গ্রাস করছে দিল্লিকেন্দ্রিক ক্ষমতার কাঠামো। শুনতে এই বয়ান যতটা বৈপ্লবিক মনে হয়, তার অন্তর্গত সাংস্কৃতিক বিদ্বেষ ততটাই উদ্বেগজনক। কারণ এই বক্তব্য ধীরে ধীরে বাস্তব অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্ন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পরিচয়ের আতঙ্ককে রাজনৈতিক মূলধনে পরিণত করে। এখানেই গর্গর রাজনীতির সবচেয়ে জটিল দিকটি লুকিয়ে আছে। তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক নিরাপত্তাহীনতাকে কেবল ভাষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ রাখেন না; সেটিকে একধরনের অস্তিত্ব সংকটে রূপ দেন। ফলে নাগরিক সমস্যার জায়গা দখল করে নেয় পরিচয়ের রাজনীতি। বেকারত্ব, শিল্পহীনতা, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকটের বদলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে—কে ‘আসল’ বাঙালি, কে নয়। আর ইতিহাস বলছে, এই প্রশ্ন যত প্রবল হয়, গণতন্ত্র তত সংকীর্ণ হয়ে আসে।
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ছিল এই রাজনৈতিক থিয়েটারের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক দশকেরও বেশি সময়ের শাসনের অবসান ঘটিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের উত্থান আসলে এক ধরনের আধিপত্যবাদী বয়ান থেকে অন্য এক আধিপত্যবাদী বয়ানে উত্তরণ। ক্ষমতার ভাষা বদলেছে, পতাকার রং বদলেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের স্থাপত্য প্রায় একই রয়ে গেছে। এই উত্তরণপর্বে গর্গ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন এমন এক অভিনেতা, যিনি নিজেকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো বিদ্রোহী চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের নজরদারি-যন্ত্রের কাছে তিনি স্রেফ আরেকটি ডেটা পয়েন্টে পরিণত হলেন। ইভিএম নিয়ে তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টগুলি—যেখানে নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, যেখানে ‘গোপন পরিকল্পনা’-র ইঙ্গিত ছিল—সেগুলি শেষ পর্যন্ত এই বৃহৎ ভারতীয় রাজনৈতিক সার্কাসেরই একটি উপকাহিনি হয়ে দাঁড়াল। রাষ্ট্র এখানে পরিচালক, পুলিশ বাউন্সার, আর নাগরিকরা টিকিট কেটে বসে থাকা দর্শক—যারা এক্স, ইনস্ট্যাগ্র্যাম আর ফেসবুকের টাইমলাইনে হাততালি দিতে দিতে ধীরে ধীরে ভুলে যায়, মঞ্চ আর দর্শকাসনের মাঝখানের দেয়ালটি অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে। এখন প্রত্যেক দর্শকও একই সঙ্গে প্রদর্শনীর অংশ। প্রত্যেক পোস্ট, প্রত্যেক ক্ষোভ, প্রত্যেক প্রতিবাদ অ্যালগরিদমের খাদ্যে পরিণত হচ্ছে। গণতন্ত্র যেন ক্রমশ এক বিশাল রিয়্যালিটি শো—যেখানে ভোটার নাগরিক নয়, বরং ডেটা-চালিত দর্শকসংখ্যা।
মিশেল ফুকো যখন প্যানোপটিকন অর্থাৎ সর্বব্যাপী নজরদারির ধারণা নিয়ে লিখছিলেন, তখন তিনি হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে একদিন সেই নজরদারি ব্যবস্থাই মানুষের পকেটে পকেটে ঘুরে বেড়াবে। আধুনিক ভারতে পুলিশিং এখন আর শুধু লাঠি, গ্রেপ্তার বা টিয়ার গ্যাসের প্রশ্ন নয়; এটি এখন এক ভয়ংকর ডিজিটাল মেকানিজম। কলকাতা পুলিশের সাইবার সেলের মাধ্যমে গর্গর গ্রেপ্তার সেই বৃহত্তর ডিজিটাল প্যানোপটিকনেরই একটি ছোট্ট ট্রেলার মাত্র। রাষ্ট্র এখন আর শুধু নাগরিককে চুপ করাতে চায় না; সে তাকে ট্র্যাক করতে চায়, ডেটায় পরিণত করতে চায়। নাগরিক মানুষ নয়, বরং একেকটা বিহেভিয়ারাল প্যাটার্ন। প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি রাগ, প্রতিটি লেট নাইট র্যান্ট—সবকিছুই অ্যালগরিদমের কাছে কনটেন্ট। যেন আমরা সবাই নিজের অজান্তেই সার্ভেইলেন্স ক্যাপিটালিজমের আনপেইড ইন্টার্ন হয়ে গিয়েছি—ডিস্টোপিয়ান ভাইবস্।ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং সেলের বিস্তার দেখলে বোঝা যায়, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ এখন একটা অ্যাস্থেটিক শব্দ। সংবিধানের পাতায় তার গ্লো-আপ আছে, কিন্তু বাস্তবে সে প্রায় ঘোস্টেড। আপনাকে কথা বলতে দেওয়া হবে, অবশ্যই—কিন্তু সেই কথার স্ক্রিনশট, মেটাডেটা, লোকেশন হিস্ট্রি, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট—সবকিছুই চুপচাপ আর্কাইভ হয়ে থাকবে। রাষ্ট্র এখন অনেক বেশি সাটল; সে সবসময় চিৎকার করে না, অনেক সময় শুধু সাইলেন্টলি ওয়াচিং মুডে থাকে। আর সেটাই বেশি ভয়ঙ্কর। এখানেই আধুনিক ক্ষমতার আসল খেলাটা। ভয় দেখিয়ে মানুষকে চুপ করানো পুরোনো কৌশল; এখন মানুষ নিজেই নিজেকে সেন্সর করে। পোস্ট লেখার আগে ভাবে—এটা দিলে আবার কোনো সিন হবে না তো? এই সেলফ-সেন্সরশিপই প্যানোপটিকনের আল্টিমেট সাকসেস। কারারক্ষীকে চোখে দেখা যাচ্ছে না, তবু বন্দি জানে—কেউ না কেউ লার্কিং করছে। বিগ ব্রো এখন আর দেয়ালে আঁকা পোস্টার নয়; সে আপনার নোটিফিকেশন বারে থাকে। রাষ্ট্র এখন শারীরিক সহিংসতার চেয়ে তথ্যের ওপর অনেক বেশি ইনভেস্ট করছে। পশ্চিমবঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং সেলের সংখ্যা ২ থেকে বেড়ে ৩৮ হওয়া কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি আসলে এক বড়সড় প্যারাডাইম শিফট। অর্থাৎ রাষ্ট্র বুঝে গেছে—রাস্তায় নামা মানুষের চেয়ে টাইমলাইনে ঘুরে বেড়ানো বয়ান অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ লাঠিচার্জ একটা মোড় সামলায়, কিন্তু ভাইরাল পোস্ট পুরো ন্যারেটিভ বদলে দিতে পারে। মেন ক্যারেক্টার এনার্জি এখন রাস্তায় নয়, রিলস আর পোস্টের কমেন্ট সেকশনে।
গর্গ চট্টোপাধ্যায়কে যখন লালবাজার তলব করেছিল এবং তিনি যাননি, তখন রাষ্ট্র তাঁর এই অবাধ্যতাকে শুধু আইন অমান্য হিসেবে দেখেনি; বরং তাকে ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের মধ্যে একধরনের ‘ভাইরাস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অভিযোগ ছিল, তিনি ইভিএম কারচুপি নিয়ে গুজব ছড়িয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছেন এবং ফলাফল ঘোষণার দিন বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। রাষ্ট্রের ভাষায় এটি ‘প্ররোচনা’; কিন্তু পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট দৃষ্টিতে এটি আসলে একটি ‘কাউন্টার-ন্যারেটিভ’—রাষ্ট্রের একচেটিয়া সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আরেকটি গল্প। এখানেই আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং, আবার সবচেয়ে আনসেটলিং দিকটা ধরা পড়ে। রাষ্ট্র এখন শুধু আইন প্রয়োগ করে না, সে ন্যারেটিভও ম্যানেজ করে। কোন বক্তব্য ‘ফ্যাক্ট’, কোনটা ‘ফেক’, কোনটা ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, কোনটা ‘জনস্বার্থবিরোধী’—এই লেবেলগুলো এখন ক্ষমতার নতুন অস্ত্র। একসময় সেন্সরশিপ মানে ছিল বই বাজেয়াপ্ত করা; এখন সেন্সরশিপ অনেক বেশি স্মুথ। আপনার পোস্ট ডাউনরিচ হবে, অ্যাকাউন্ট ফ্ল্যাগ হবে, কিংবা আপনাকে এমনভাবে নজরে রাখা হবে যে আপনি নিজেই ধীরে ধীরে ‘এটা না বলাই বেটার’ মুডে চলে যাবেন, মানে একটা সফট কন্ট্রোল ভাইবস্। ফুকো হয়তো আজ বেঁচে থাকলে বলতেন—আধুনিক রাষ্ট্র আর নাগরিকের শরীর দখল করতে চায় না, সে তার অ্যাটেনশন স্প্যান দখল করতে চায়। কারণ যে সমাজের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার রাগ, ভয়, প্রতিবাদ—সবকিছুই অ্যালগরিদমিকভাবে ম্যানেজ করা সম্ভব। আর তখন গণতন্ত্র ধীরে ধীরে বিতর্কের জায়গা থেকে সরে গিয়ে কনটেন্ট মডারেশনের সাবস্ক্রিপশন প্ল্যানে পরিণত হয়। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের জয় নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের লড়াইকে আরও জটিল করে তোলার মুহূর্ত। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বয়ানেরও পালাবদল হয়েছে, কিন্তু সংকটের চরিত্র খুব একটা বদলায়নি। বরং এখন পরিচয়ের রাজনীতি আরও বেশি অ্যাগ্রেসিভ, আরও বেশি পারফরমেটিভ। স্লাভয় জিজক প্রায়ই বলেন, আমরা যখন কোনো আদর্শের বিরোধিতা করি, অনেক সময় অজান্তেই সেই আদর্শেরই আয়না-প্রতিবিম্ব হয়ে উঠি। গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাংলা পক্ষ’ এবং বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদ’—এই দুই শক্তির মধ্যে সেই অদ্ভুত মিল স্পষ্ট। একজন ‘বহিরাগত’ তত্ত্বে বিশ্বাসী, অন্যজন ‘অনুপ্রবেশকারী’ তত্ত্বে। শব্দ আলাদা, ভয় একই। একজন ভাষার নিরাপত্তাহীনতা বিক্রি করে, অন্যজন ধর্মীয় নিরাপত্তাহীনতা। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই রাজনীতির জ্বালানি হলো আতঙ্ক বা ফিয়ার ইকোনমি ভাইব। এটি যেন দুটি আয়নার মধ্যে আটকে থাকা এক ভূতের গল্প। তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে নিজেদের বিকৃত প্রতিফলন দেখে, তারপর সেই বিকৃতিকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। ফলে রাজনীতি আর বাস্তব সমস্যার সমাধানের জায়গা থাকে না; সেটি পরিণত হয় এক অন্তহীন পরিচয়-যুদ্ধে, যেখানে প্রতিটি পক্ষ নিজেকে একইসঙ্গে শিকার এবং রক্ষাকর্তা হিসেবে কল্পনা করে।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই দুই ধরনের রাজনীতিই শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় গিয়ে মিশে যায়—মানুষকে নাগরিক থেকে পরিচয়ে নামিয়ে আনা। আপনি তখন আর বেকার নন, আপনি ‘বাঙালি’; আপনি আর শ্রমিক নন, আপনি ‘হিন্দু’; আপনি আর মানুষ নন, আপনি এক ডেমোগ্রাফিক ডেটা। আর রাষ্ট্র তখন সেই পরিচয়গুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে খুব ক্যালকুলেটেডভাবে নিজের ক্ষমতা কনসোলিডেট করে। একটা ‘ডিভাইড অ্যান্ড ফার্ম দ্য এনগেজমেন্ট’ মুড। গর্গ চট্টোপাধ্যায়কে কোনোভাবেই শহীদ হিসেবে ভাবা যায় না। কারণ তাঁর রাজনীতির ভেতরেই একধরনের উগ্র শ্রেষ্ঠত্ববাদের বীজ ছিল। ২০২২ সালে তিনি যখন আহোম রাজা সুকাফাকে ‘চৈনিক আক্রমণকারী’ বলে আক্রমণ করেছিলেন, তখন তিনি আসলে সেই একই আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের ভাষাই ব্যবহার করছিলেন, যার বিরুদ্ধে তিনি নিজেকে পজিশন করাতে চাইতেন। এখানেই তাঁর ব্যক্তিগত রাজনীতির সবচেয়ে বড় কনট্রাডিকশন। তাঁর বক্তব্যে প্রায়ই রাষ্ট্রবিরোধী বা ভারত-বিরোধী সুর ধরা পড়ত, কিন্তু সেই সুর কোনো বৃহত্তর মানবিক সংহতির জায়গা তৈরি করত না; বরং বাঙালির এক সংকীর্ণ বিচ্ছিন্নতাবোধকে আরও উসকে দিত। যেন প্রতিটি রাজনৈতিক প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায়—আমরা বনাম ওরা। আর এই ‘ওরা’ সবসময় বদলাতে থাকে: কখনও দিল্লি, কখনও হিন্দিভাষী মানুষ, কখনও অন্য কোনো জাতিগত গোষ্ঠী। যা আসলে পারপিচুয়াল অপমান-সিনড্রোম! আসলে এই রাজনীতি মধ্যবিত্ত বাঙালির সেই পুরোনো ‘ভদ্রলোক’ অহংকারের ডিজিটাল রিবুট ভার্সন। একসময় যে অহংকার কফি হাউসের টেবিলে, লিটল ম্যাগাজিনে বা কলেজ স্ট্রিটের তর্কে বেঁচে ছিল, এখন তা ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব শর্টস আর ভাইরাল পোস্টে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। পার্থক্য শুধু একটাই—আগে বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মপ্রেম ছিল অ্যানালগ, এখন সেটা ফুল এইচডি স্ট্রিমিং। সবচেয়ে আয়রনিক ব্যাপার হলো, এই ধরনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সেই একই জিনিসে পরিণত হয়, যাকে সে ঘৃণা করার দাবি করে। উগ্র জাতীয়তাবাদ যখন আঞ্চলিক হয়, তখনও তার ভেতরের লজিক একই থাকে—একটি বিশুদ্ধ পরিচয়ের কল্পনা, একটি বিপন্ন সম্প্রদায়ের গল্প, এবং একটি শত্রু তৈরির আবেগ। ফলে প্রতিবাদ আর মুক্তির ভাষা খুব সহজেই এক্সক্লুশনের ভাষায় বদলে যায়। আর তখন রাজনীতি আর ভবিষ্যৎ নির্মাণের জায়গা থাকে না; সেটি পরিণত হয় ইনফাইনাইট কমেন্ট ওয়ারে, যেখানে সবাই সাইমালটেনিয়াসলি ভিকটিম এবং মেন ক্যারেক্টার। অন্যদিকে, নতুন শাসকশ্রেণি যেভাবে দেশপ্রেমকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন তাঁদের নির্বাচনী প্রচারে, সেটাও চরম বিদ্রুপের বিষয়। এখানে দেশপ্রেম মানে আর দেশকে ভালোবাসা নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি পদক্ষেপকে বিনা প্রশ্নে মেনে নেওয়া। প্রশ্ন করলেই আপনি সন্দেহভাজন, সমালোচনা করলেই আপনি নেগেটিভ, আর দ্বিমত পোষণ করলেই আপনি প্রায় দেশদ্রোহিতার সফট লিস্টে ঢুকে পড়েন।
প্রশাসন এবং পুলিশ এখন কেবল আইন রক্ষার যন্ত্র নয়; তাঁরা ক্রমশ এক ধরনের মতাদর্শিক পুলিশির ভূমিকাও পালন করছেন। গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারির পর লালবাজারের প্রেস কনফারেন্সটি লক্ষ্য করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কমিশনার যখন কথা বলছিলেন, সেটি নিছক প্রশাসনিক ঘোষণা ছিল না; বরং ছিল ক্ষমতার এক ক্যালকুলেটেড পারফরম্যান্স। যেন রাষ্ট্র ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে চাইছে—আমরা সব দেখছি। এই জায়গাটাই সবচেয়ে আনসেটলিং। কারণ আধুনিক রাষ্ট্র এখন শুধু নাগরিকের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, সে নাগরিকের পারসেপশনও ম্যানেজ করতে চায়। কে ভালো নাগরিক, কে ঝুঁকিপূর্ণ, কে অ্যান্টি-সিস্টেম—এই ট্যাগগুলো এখন ধীরে ধীরে অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তে রূপ নিচ্ছে। ফলে বিচারব্যবস্থা শুরু হওয়ার আগেই ডিজিটাল স্পেসে চরিত্রহনন সম্পূর্ণ হয়ে যায়। আপনার পোস্ট, সার্চ হিস্ট্রি, লাইক, শেয়ার—সব মিলিয়ে এক ধরনের বিহেভিয়ারাল প্রোফাইল তৈরি হয়—ব্ল্যাক মিরর কোর। এ একধরনের ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ, যেখানে বন্দুকের চেয়ে ডেটা বেশি শক্তিশালী। এখানে অ্যালগরিদমই ধীরে ধীরে নির্ধারণ করতে শুরু করে কে নিরাপদ নাগরিক আর কে সম্ভাব্য হুমকি। আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—এই নজরদারিকে মানুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করে। কারণ সার্ভেইলেন্স এখন আর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কিছু নয়; এটি কনভিনিয়েন্সের মোড়কে আসে। ফ্রি অ্যাপ, স্মার্ট সিটি, ডিজিটাল সিকিউরিটি, ফেস রিকগনিশন—সবকিছু মিলিয়ে মানুষ নিজেই নিজের পকেটে ক্ষুদ্র প্যানোপটিকন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা প্রাইভেসি ইজ ডেড টাইমলাইন। বাঙালির জাতীয়তাবাদ সবসময়ই একধরনের ট্রমার ওপর দাঁড়িয়ে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বাঙালির অবচেতনে এমন এক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, যা আজও পুরোপুরি শুকোয়নি। ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণা, উদ্বাস্তু জীবনের অপমান, আর পরবর্তীকালে দিল্লিকেন্দ্রিক ক্ষমতার প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার অনুভূতি—এই সবকিছুই গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের রাজনীতির প্রধান রসদ। বাঙালি নিজেকে সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত উন্নত বলে ভাবতে ভালোবাসে, অথচ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সে প্রায়ই নিজেকে প্রান্তিক বলে অনুভব করে। এই দ্বৈত মনস্তত্ত্ব থেকেই জন্ম নেয় একধরনের কালচারাল সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্স। অর্থাৎ বাস্তব ক্ষমতা না থাকলেও সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের কল্পনায় নিজেকে টিকিয়ে রাখা। আর গর্গ চট্টোপাধ্যায় ঠিক এই গৌরববোধের ফেরিওয়ালা হিসেবেই হাজির হয়েছিলেন। তিনি বাঙালির চায়ের দোকানের আড্ডায়, ড্রয়িংরুমের রাজনীতিতে, ফেসবুক কমেন্ট সেকশনে একধরনের কৃত্রিমলস্ট গ্লোরি রিবুট আর্ক উত্তেজনা তৈরি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর গভীর নেতিবাচকতা। এটি কোনো ইতিবাচক ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন দেখায় না; বরং কেবল বিরোধিতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। গর্গর রাজনৈতিক কল্পনায় বাঙালি প্রায়শই হিন্দি-বলয়ের বিরুদ্ধে এক অবরুদ্ধ সত্তা। অথচ বিশ্বায়নের এই যুগে পরিচয় যে ক্রমাগত বদলায়, মিশে যায়, নতুন রূপ নেয়—সেই তরল বাস্তবতাকে তিনি ধরতে পারেননি।
২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফলও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। দেখা গেছে, বাঙালির এক বড় অংশের কাছে আবেগনির্ভর পরিচয় রাজনীতির চেয়ে উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং আইন-শৃঙ্খলার বয়ান বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে—এমনকি যদি সেই স্থিতিশীলতার বিনিময়ে আরও কঠোর নজরদারি মেনে নিতে হয়। শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পরপরই যেভাবে পুলিশ ও আমলাতন্ত্রে বড়সড় রদবদল শুরু করেছে—যেমন একাধিক ডব্লিউবিসিএস অফিসারের বদলি, শীর্ষ আইপিএসদের অপসারণ, প্রশাসনিক স্তরে দ্রুত পুনর্বিন্যাস—তা স্পষ্ট করে দেয় যে রাষ্ট্র এখন নিজের মতো করে একটি নতুন ডিসিপ্লিনারি রেজিম তৈরি করছে। অর্থাৎ শুধু সরকার বদলাচ্ছে না; বদলাচ্ছে ক্ষমতা প্রয়োগের ভাষা, নজরদারির ধরন, এবং অনুগত নাগরিক তৈরির কৌশল। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে এই পরিবর্তনের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে নিচ্ছে। কারণ দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মানুষ অনেক সময় স্বাধীনতার চেয়ে অর্ডারকে বেশি প্রাধান্য দেয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যখন সমাজ ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন সে প্রায়ই শক্তিশালী নজরদারিকেই স্থিতিশীলতা বলে ভুল করে। যার পরিণাম ডুমস্ক্রল করতে করতে অথরিটারিয়ানিজম নর্মালাইজ হওয়ার সিন। আজকের দিনে প্রতিবাদ মানেই হলো একটি হ্যাশট্যাগ। গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারির পর ফেসবুক ভিডিও, ইউটিউব বিশ্লেষণ আর এক্স যুদ্ধের যে বন্যা বয়ে গেছে, তা দেখলে গাই ডেবোর্ডের সেই স্পেক্টাকল বা দৃশ্যমানতার তত্ত্বটি মনে পড়ে । আমরা এখন এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে কোনো ঘটনা যতক্ষণ না পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং হচ্ছে, ততক্ষণ তার কোনো অস্তিত্ব নেই। গর্গ নিজেও এই ব্যবস্থার একজন সুদক্ষ কারিগর ছিলেন। তাঁর প্রতিটি ভিডিও, তাঁর উচ্চকিত গলার স্বর, তাঁর হাতের ভঙ্গি—সবই এক ধরণের পারফরম্যান্স। আসলে এটি এক ধরণের ডিজিটাল কোর্টরুম, যেখানে জনতা বিচারক এবং মিমগুলো হলো একেকটি রায়। রাষ্ট্র এই ডিজিটাল বিপ্লবীদের কোনো ভয় পায় না, কারণ সে জানে এই ক্ষোভ স্রেফ ফোনের স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ। গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের হ্যান্ডেলটি যখন রাষ্ট্র বন্ধ করে দেয়, তখন সেই হ্যান্ডেলের সাথে সাথে হাজার হাজার ডিজিটাল অনুসারীর বিপ্লবও মুহূর্তে উধাও হয়ে যায় । মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন আর কোনো নৈতিক অধিকার নয়, এটি স্রেফ একটি লাইসেন্স যা রাষ্ট্র বা মেটা-র মতো কর্পোরেট সংস্থাদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে।
গর্গকে নিয়ে তৈরি মিমগুলো আসলে আমাদের সময়ের নিষ্ঠুরতার প্রতীক। আমরা এমনকি একটি গ্রেপ্তারকেও রসিকতায় পরিণত করতে পারি। এটি এক ধরণের শূন্যতা, যেখানে আমরা কোনো কিছুকেই আর গুরুত্ব সহকারে নিতে পারছি না। গণতন্ত্র এখন আর কোনো শাসনব্যবস্থা নয়, এটি এখন একটি রিয়েলিটি শো যেখানে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আমরা একজন নতুন ‘বিগ বস’ নির্বাচন করি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল এই রিয়েলিটি শো-এর একটি নাটকীয় সমাপ্তি ছিল, যেখানে প্রতাশিতভাবেই আই-প্যাকের মতো স্ট্র্যাটেজিস্টরা বলির পাঁঠা হয়েছেন । গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের গ্রেপ্তারির এই ময়নাতদন্ত আমাদের এক তিক্ত সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। রাষ্ট্র, বিপ্লব, জাতীয়তাবাদ, প্রতিবাদ কিংবা গ্রেপ্তার—সবকিছুই এখন এক বিশাল পারফরম্যাটিভ মেশিনারির অংশ। নাগরিকরা আর পুরোপুরি মানুষ নয়; তারা একেকটি ডেটা পয়েন্ট। আপনার প্রতিটি লাইক, প্রতিটি রাজনৈতিক ক্ষোভ, এমনকি গভীর রাতের নিঃসঙ্গতাও এখন কোনো না কোনো সার্ভারে উপাত্ত হিসেবে জমা হচ্ছে। যাকে বলে ‘এক্সিস্টেন্স অ্যাজ মেটাডেটা’ ভাইবস্। গর্গ চট্টোপাধ্যায় কোনো মহানায়ক নন, আবার তিনি স্রেফ খলনায়কও নন। তিনি এই আত্মবিনাশী সভ্যতার এক উপসর্গ মাত্র। তাঁর রাজনীতি যেমন বাঙালির ট্রমাকে পুঁজি করে টিকে ছিল, তেমনি রাষ্ট্রের পুলিশিটাও দেশপ্রেমের আড়ালে নজরদারিকে বৈধতা দিচ্ছে। ফলে এই সংঘাতে স্পষ্ট কোনো নৈতিক পক্ষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমরা এক অদ্ভুত ধূসর অঞ্চলে বাস করছি, যেখানে সত্য আর মিথ্যার মাঝের দেয়াল কর্পোরেট অ্যালগরিদম অনেক আগেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে আগের শাসক দলের তৈরি বেআইনি ক্লক টাওয়ার নতুন শাসক দলের ভাঙার মত করে। এখন বাস্তবতা অনেকটাই টাইমলাইনের এনগেজমেন্ট রেট দিয়ে মাপা হয়। গণতন্ত্রের এই বিশাল সার্কাসে আলো নিভে গেলে বোঝা যায়—স্টেজে আসলে কেউ নেই। আছে শুধু মেকানিজম, স্ক্রিপ্ট, আর রিপিট টেলিকাস্ট। গর্গ চট্টোপাধ্যায় হয়তো এখন লালবাজারের কোনো অন্ধকার সেলে ডিজিটাল প্যানোপটিকনের নীল আলোর নিচে বসে হার্ভার্ডের সেই দিনগুলোর কথা ভাবছেন, যখন স্নায়ুবিজ্ঞান অন্তত রাজনৈতিক অ্যালগরিদমের চেয়ে সহজ মনে হতো। আর বাইরে আমরা—ডিজিটাল বন্দিরা—অপেক্ষা করে আছি পরবর্তী ট্রেন্ডিং খবরের, পরবর্তী গ্রেপ্তারির, পরবর্তী ভাইরাল ক্রোধের, যা আমাদের একঘেয়ে অস্তিত্বে সাময়িক ডোপামিন শট দেবে। কারণ এখন প্রতিবাদও অনেকটাই কনটেন্ট, ক্ষোভও অনেকটাই স্ক্রলযোগ্য অর্থাৎ সবটাই ডুমস্ক্রল সিভিলাইজেশন কোর। এই ময়নাতদন্ত শেষ হলো ঠিকই, কিন্তু যে সভ্যতার দেহ নিয়ে আমরা কাটাছেঁড়া করছি, তার পচন অনেক গভীরে। সেই পচন ঢাকতে রাষ্ট্র নজরদারি বাড়াচ্ছে, আর নাগরিকরা সেই নজরদারিকেই ধীরে ধীরে নিরাপত্তা বলে মেনে নিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত জয় কোনো আদর্শের হয় না; জয় হয় সেই যন্ত্রের, যা ধীরে ধীরে আমাদের রক্ত-মাংসের অস্তিত্বকে ডিজিটাল ধুলোয় পরিণত করে দেয়।
আমাদের এই উত্তর-শূন্যতাবাদী সময়ের কোনো ইতি নেই। আছে কেবল বিরামহীন নজরদারি আর তার ভেতর খাবি খাওয়া কয়েক কোটি ডেটা পয়েন্ট, যাদের এক সময় নাগরিক বলা হতো। গর্গ চট্টোপাধ্যায়ের এই গ্রেফতারি একটি পরিচ্ছেদ শেষ করল ঠিকই, কিন্তু যে মহাকাব্যিক শৃঙ্খলে আমরা বন্দি হয়ে যাচ্ছি, তার থেকে মুক্তির কোনো হ্যাশট্যাগ আজও আবিষ্কৃত হয়নি। গণতন্ত্র এখন স্রেফ একটি ক্লান্ত শব্দ, যা পুলিশের লাঠির ঘায়ের মতো আমাদের পিঠে এসে পড়ছে, আর আমরা তাকেই ‘স্বাধীনতা’ বলে ভুল করছি। ভোরের আলোয় রাজপথ এখন অনেকটা হাসপাতালের মর্গ-এর মতো দেখাচ্ছে—স্থির, শীতল এবং উত্তর-বাস্তব। আজ আর চায়ে চিনি দেব না, তেতোটাই ভালো। সভ্যতার স্বাদ তো শেষ পর্যন্ত তেতোই হয়।
নো ক্যাপ!

