নখ্-এ-মুহব্বত <br />  অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

নখ্-এ-মুহব্বত
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

 

রাত অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেলে, যখন শহরের শব্দগুলো একে একে নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করে, তখন আমি সাধারণত আলো নিভিয়ে বসে থাকি। ঠিক ‘বসে থাকি’ বললে পুরোটা বলা হয় না। বরং বলা উচিত, আমি অন্ধকারের ভেতরে একটু একটু করে তলিয়ে যাই। যেন ঘর নয়, একটা বহু পুরনো কূপ। আমি তার স্যাঁতসেঁতে তলায় বসে আছি। ওপরে কোথাও দূরে শহর চলছে—অ্যাম্বুল্যান্স যাচ্ছে, কোনও দেরিতে-ফেরা ছেলে মিথ্যে কথা বলে প্রেমিকাকে ফোন করছে, কোনও নিউজ চ্যানেলে সিভিলাইজেশন রক্ষা করা হচ্ছে—কিন্তু সেই শব্দ এখানে পৌঁছতে পৌঁছতে হাঁপিয়ে পড়ে। অন্ধকারেরও বয়স হয় বোধহয়। আমার ঘরের অন্ধকারটা নতুন নয়। তার গায়ে পুরনো তামাকের গন্ধ, ভেজা দেওয়ালের ছোপ, এবং বহুদিন ধোওয়া হয়নি এমন চিন্তার দাগ লেগে আছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি আলো নিভিয়ে দিই না—অন্ধকারই আমাকে ডেকে নেয়। খুব ভদ্রভাবে। যেন কোনও বৃদ্ধ উর্দুভাষী খানসামা এসে বলছে, ‘আইয়ে জনাব, বাহার বহুত শোর হ্যায়।’ অভ্যাসটা কবে থেকে হয়েছে মনে নেই। বয়স হলে মানুষের স্মৃতির ভেতরেও স্যাঁতসেঁতেভাব ধরে। তারিখগুলো ঝাপসা হয়ে যায়। কোন বছরে কে মারা গেল, কোন বছরে প্রেম শেষ হল, আর কোন বছরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে ফেয়ারওয়েল দিল—সব একসঙ্গে মিশে যায়। শুধু কিছু গন্ধ টিকে থাকে। পুরনো বইয়ের গন্ধ। বৃষ্টির গন্ধ। হুইস্কির গ্লাসে বরফ পড়ার সেই গন্ধহীন শব্দ। টিক। তারপর আর-একটা। টিক। যেন সময় নিজের হাড়ে ছোট ছোট ফাটল ধরাচ্ছে। আমি বরফের শব্দ খুব মন দিয়ে শুনি। বয়স বাড়লে মানুষ ছোট ছোট শব্দের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ বড় বড় শব্দের ওপর বিশ্বাস উঠে যায়। রাষ্ট্রের ভাষণ, বিপ্লবের স্লোগান, প্রেমের শপথ—সবই শেষ পর্যন্ত একটু থিয়েট্রিক্যাল লাগে। বরফ অন্তত নাটক করে না। সে ধীরে ধীরে গলে যায়। আমারও সম্ভবত তা-ই হচ্ছে। একসময় আমি খুব কথা বলতাম। ক্লাসে দাঁড়িয়ে হেগেল বোঝাতাম, এমন ভঙ্গিতে যেন জার্মান আইডিয়ালিজম না বুঝলে মানবসভ্যতা কাল সকালেই ভেঙে পড়বে। এখন মনে হয়, ছাত্রগুলো আসলে আমার লেকচার নয়, আমার নিঃসঙ্গতা শুনত। অদ্ভুত ব্যাপার, না? বয়স হলে মানুষ নিজের অতীত সম্পর্কেও রিলায়েবল ন্যারেটর থাকে না।
এখন মাঝরাতে, আলো নিভিয়ে বসে থাকতে থাকতে, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় আমি আদৌ প্রফেসর ছিলাম কি না। হয়তো আমি কোনও ব্যর্থ জ্যোতিষী ছিলাম। অথবা কোনও মদ্যপ মোল্লা, যে ভুলবশত হাইডেগার পড়ে ফেলেছিল। আমার ঘরের একমাত্র টেবিল ল্যাম্পটা বহুদিন হল নষ্ট। কবে নষ্ট হয়েছিল মনে নেই। সম্ভবত যে বছর আমি শেষবার প্রেমে পড়েছিলাম—অথবা যে বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন সিলেবাস থেকে শোপেনহাওয়ারকে সরিয়ে প্রফেশনাল এথিকস ঢোকানো হয়েছিল। দুটো ঘটনার মধ্যেই এক ধরনের সভ্যতাগত অন্ধকার ছিল, তাই গুলিয়ে যায়। ল্যাম্পটার মাথা এখনও সামান্য কাত হয়ে আছে। যেন ঘুমন্ত নয়, মৃত কোনও পাখি—যার মৃত্যু খুব ড্রামাটিক ছিল না, শুধু একদিন উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে মনে হয়, ও এখনও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অভিযোগ নয়, বরং এক ধরনের বৃদ্ধসুলভ সমঝোতা নিয়ে। দু’জন অবসরপ্রাপ্ত প্রাণী একই ঘরে পড়ে আছি। বদলানোর ইচ্ছে হয়নি। দোকানে গেলে নিশ্চয়ই নতুন, উজ্জ্বল, এফিসিয়েন্ট ল্যাম্প পাওয়া যেত। টাচ সেনসর থাকবে, ব্রাইটনেস কন্ট্রোল থাকবে, হয়তো ব্লুটুথও। এখনকার জিনিসগুলো আলো কম, আত্মপ্রচার বেশি দেয়। আমি আর সেই বয়সে নেই যে একটা ল্যাম্পের সঙ্গেও কম্প্যাটিবিলিটি বিল্ড করতে হবে। জিনিসপত্রের প্রতিও একটা মমতা জন্মায় বয়স বাড়লে—বিশেষ করে যেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষের চেয়েও বেশি। মানুষ নষ্ট হলে সমাজ তাকে সরিয়ে দেয়। রিটায়ার্ড, ইররেলিভ্যান্ট, আউটডেটেড—এই শব্দগুলো খুব ভদ্রভাবে উচ্চারণ করা হয়, যেন কাউকে হত্যা করার আগে তার গলায় সুগন্ধি মাখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একটা বিকল ল্যাম্প বহু বছর টেবিলের কোণে পড়ে থাকতে পারে, কাউকে বিরক্ত না করেই। হয়তো সেই কারণেই আমি ওটাকে ফেলে দিইনি। ও ঘরের মধ্যে একটা ব্যর্থ আলোর স্মৃতি হয়ে পড়ে আছে। আর ব্যর্থ জিনিসের প্রতি আমার দুর্বলতা বহুদিনের। আমি নিজেও তো শেষ পর্যন্ত দর্শনের ব্যর্থ অধ্যাপক হয়েছিলাম।
জানলার কাচ পুরোপুরি বন্ধ হয় না আর। কাঠ ফুলে উঠেছে বহুদিন। ফলে রাস্তার সোডিয়াম ভেপার লাইটের হলুদ, অসুস্থ আলো একটু একটু করে ঘরে ঢুকে পড়ে। ‘আলো’ বলাটা অবশ্য ভদ্রতা করা। ওটাকে আমার বরং পুরনো জ্বরের মতো লাগে। যেন শহরের শরীর খারাপ, আর তার কপালে ভেজা কাপড়ের বদলে এই হলুদ আলো চেপে ধরা হয়েছে। রাত যত গভীর হয়, সেই আলো তত বদলে যায়। কখনও মনে হয়, কোনও সরকারি হাসপাতালের করিডর ভুল করে আমার ঘরে এসে পড়েছে। কখনও মনে হয়, পুরনো উর্দু সিনেমার শেষ দৃশ্য—নায়ক মারা গেছে, কিন্তু পেছনে রফি এখনও গাইছে। ঘরের দেওয়ালে সেই রং লেগে থাকে। দেওয়ালগুলোও বোধহয় ক্লান্ত। স্যাঁতসেঁতে ছোপের মধ্যে এমন সব আকৃতি তৈরি হয়েছে মাঝেমাঝে মনে হয়, সিভিলাইজেশন শেষ হয়ে গেলে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এগুলোকে নিশ্চয়ই ধর্মীয় চিহ্ন ভেবে ভুল করবেন। অথচ ওগুলো মূলত জল পড়ার দাগ এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা। বেশিরভাগ মেটাফিজিক্সই সম্ভবত এভাবেই শুরু হয়েছিল। সেই আধোঅন্ধকারে বুকশেলফগুলোকে ডুবে যাওয়া জাহাজের সারির মতো লাগে। বইগুলোর মলাট আলাদা করে চেনা যায় না, শুধু তাদের পিঠের রেখা বোঝা যায়। যেন বহু মৃত নাবিক পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। কেউ আর কথা বলে না, কিন্তু প্রত্যেকেই একসময় সমুদ্র দেখেছিল। আমি কখনও কখনও বইগুলোর দিকে তাকিয়ে নাম মনে করার চেষ্টা করি। কোনটা নীৎশে, কোনটা ইবনে আরবি, কোনটা সিওরান—সব গুলিয়ে যায়। যৌবনে আমি নীৎশে পড়তাম উত্তেজনায়, সিওরান পড়তাম গোপনে। কারণ নীৎশে আপনাকে শক্তিশালী হতে শেখায়, সিওরান শেখায়—রাত্তিরে ঘুম না এলে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। বয়স বাড়লে লাইব্রেরিও সেমেট্রি হয়ে ওঠে। শুধু পার্থক্য এই যে, কবরের ভেতরে মানুষ শুয়ে থাকে, আর বইয়ের ভেতরে তাদের ইনসমনিয়া। সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানেন? এত বইয়ের অধিকাংশই আমি পুরো পড়িনি। ছাত্রদের সামনে অবশ্য এমন ভঙ্গি করতাম যেন কান্ট ব্যক্তিগতভাবে আমাকে চিঠি লিখে তাঁর ফিলোসফি বুঝিয়ে গেছেন। অধ্যাপকদের একটা গোপন প্রতিভা থাকে—না-পড়া বই সম্পর্কেও গভীর মুখ করে কথা বলতে পারা। সিভিলাইজেশন সম্ভবত এই দক্ষতার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে একটা বই টেনে বের করি। খুব ধীরে। যেন বই নয়, বহুদিন ঘুমিয়ে থাকা কোনও আহত প্রাণীকে ভুল করে জাগিয়ে ফেলছি। ধুলো ঝরে পড়ে। সেই ধুলোর ভেতরে এক ধরনের ডেড লাইব্রেরির গন্ধ থাকে—শুকনো কাগজ, স্যাঁতসেঁতে কাঠ, পুরনো টোব্যাকো, এবং দীর্ঘদিন মানুষের স্পর্শ না-পাওয়ার গন্ধ। আমি বইটা নাকের কাছে এনে একটু শুঁকি। বয়স হলে মানুষ অদ্ভুত অদ্ভুত কাজ করতে শুরু করে। কেউ ভোরবেলা পার্কে গিয়ে হা-হা করে লাফিং এক্সারসাইজ করে, আমি পুরনো বইয়ের গন্ধ শুঁকি। সিভিলাইজেশন আশ্চর্য রকম ভদ্র; দুটো অভ্যাসকেই ইকোয়ালি রেসপেক্টেবল বলে মেনে নেয়। পাতার ভেতরে শুকনো গন্ধ। কোথাও পুরনো আন্ডারলাইন। কালির রং ফিকে হয়ে এসেছে। কোনও মার্জিনে লেখা—‘ইম্পরট্যান্ট’, ‘অ্যাবসার্ড’, ‘বিউটিফুল লাই’। কোথাও শুধু একটা কোয়েশ্চেন মার্ক। কোথাও লেখা—‘নো, দিস ইজ নট রাইট।’ সবচেয়ে অস্বস্তিকর হল, অনেক সময় নিজের হাতের লেখাও চিনতে পারি না। মনে হয়, অন্য কেউ লিখেছিল। হয়তো কোনও তরুণ প্রফেসর, যার তখনও বিশ্বাস ছিল থিংকিং পৃথিবী বদলাতে পারে। তাকে আমি ভেগলি রিমেম্বার করি। খুব সেল্ফ-কনফিডেন্ট ছেলে ছিল। প্রচুর স্মোক করত। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সময় আননেসেসারিলি নীৎশে কোট করত। যেন প্রেম নয়, ভাইভা দিচ্ছে। এখন আর মনে পড়ে না, কোন বাক্যকে অ্যাবসার্ড বলেছিলাম, আর কোনটাকে বিউটিফুল লাই। বয়স বাড়লে দুটোর পার্থক্যও কমে আসে। রিলিজিয়ন, লাভ, রেভলিউশন, ইউনিভার্সিটির চাকরি—সবকিছুই একটু একটু করে একই ক্যাটাগরিতে ঢুকে যায়। শুধু ধুলো জমার ধরন আলাদা হয়। কখনও মার্জিনে নিজেরই লেখা পাই—‘রি-রিড আর্জেন্টলি।’ তারিখ দেখলে বুঝি, পনেরো বছর আগে লিখেছিলাম। বইটা আর রি-রিড করা হয়নি। আর্জেন্সিটাও কেটে গেছে। মানুষের জীবনে অধিকাংশ আর্জেন্ট ব্যাপারই শেষ পর্যন্ত খুব শান্তভাবে ইররেলিভ্যান্ট হয়ে যায়। মদ খেলে মেমরি আগে ঝাপসা হয় না। আগে ঝাপসা হয় সার্টেনটি। হঠাৎ বুঝতে পারবেন, যাকে এতদিন ট্রুথ ভাবছিলেন, সেটা হয়তো শুধু ভালো সিনট্যাক্স ছিল। আর যাকে ভুল ভেবেছিলেন, সে হয়তো কেবল টাইমের থেকে একটু আগে জন্মেছিল। তখন বইয়ের পাতাগুলোকে আর টেক্সট বলে মনে হয় না। মনে হয়, বহু বছরের ইনসমনিয়ায় ভোগা কিছু মানুষের রাত্তিরবেলার কনফেশন।
আমি গ্লাসে আরেকটু মদ ঢালি। পাতার ওপর অল্প ছায়া পড়ে। তারপর খুব আস্তে বলি—‘কান্ট… ইউ পুওর ওল্ড বাস্টার্ড… তোমরা কেউই শেষ পর্যন্ত কিছুই জানতে না।’ তখন বুকশেলফগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, এরা বই নয়। বরং আমার ব্যর্থ জীবনগুলোর আলাদা আলাদা এডিশন। কোথাও প্রথম খণ্ড, কোথাও রিভাইজড ভার্সন, কোথাও অসমাপ্ত ম্যানুস্ক্রিপ্ট। কিছু বইয়ের মলাট খুলে যাচ্ছে, কিছু এখনও অকারণে ডিগনিফায়েড হয়ে দাঁড়িয়ে আছে—ঠিক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকদের মতো, যাঁরা পেনশন ছাড়া আর কিছুতেই বিশ্বাস করেন না, তবু হাঁটার সময় এমন মুখ করে থাকেন যেন হেগেল ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের সঙ্গে করমর্দন করেছিলেন। আমি মাঝে মাঝে হাত বাড়িয়ে বই ছুঁয়ে দেখি। ধুলো জমেছে। আঙুলে ধুলো লেগে থাকে। সেই ধুলোয় পুরনো কাগজের সঙ্গে খানিক সময়ও মিশে থাকে বোধহয়। শুধু বছর নয়—ব্যর্থতা, ভুল সিদ্ধান্ত, কয়েকটা না-পাঠানো চিঠি, কিছু অসমাপ্ত থিসিস, এবং প্রচুর ইনসমনিয়া। মাঝে মাঝে মনে হয়, ধুলো আসলে সময়ের মৃত স্কিন। সবকিছুর ওপর ধীরে ধীরে জমে। মানুষ সেটা ঝাড়ে, আবার জমে। সভ্যতা সম্ভবত এই ঝাড়ামোছার নামই। কোনও কোনও বই খুললে ভেতর থেকে পুরনো ট্রেনের টিকিট বেরোয়, কোথাও শুকনো পাতার কঙ্কাল, কোথাও একটা নাম—এখন আর মুখটা মনে নেই। একবার একটা বইয়ের ভেতর থেকে একটা সিনেমার টিকিট পেয়েছিলাম। সালটা দেখে বুঝলাম, সেদিন আমি এক মেয়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম। মেয়েটার নাম মনে পড়ল না, কিন্তু সিনেমাটা মনে পড়ে গেল। বয়স বৃদ্ধির মধ্যে একটা নিষ্ঠুর কমেডি আছে—মানুষকে ভুলে যাবে, অথচ সাবটাইটেল মনে থাকবে। এই অস্পষ্টতা আমার ভালো লাগে। বয়স বাড়লে মানুষ জিনিসকে আর স্পষ্ট দেখতে চায় না। বরং তাদের চারপাশের কুয়াশাটুকু বুঝতে চায়। কারণ স্পষ্টতা খুব ওভাররেটেড জিনিস। তরুণ বয়সে আমরা ভাবি, পৃথিবীর প্রতিটি প্রশ্নের একটা কারেক্ট আনসার আছে। তারপর ধীরে ধীরে বুঝি, অধিকাংশ মানুষ আসলে ভুল প্রশ্ন নিয়েই মারা যায়। যৌবন সবকিছুর ডেফিনিশন চায়। লাভ কী, ট্রুথ কী, ফ্রিডম কী, ঈশ্বর আছেন কি না, রেভলিউশন আদৌ পসিবল কি না। তখন মনে হয়, পৃথিবী একটা ভাইভা বোর্ড, আর ঠিক উত্তর দিতে পারলেই জীবন আপনাকে পাশ করিয়ে দেবে। তরুণ বয়সে আমিও এরকম করতাম। এখন মনে হয়, অত প্রশ্ন করাটাও এক ধরনের হরমোনাল প্রবলেম ছিল। বার্ধক্য একটু বেশি সিনিক্যাল। সে জানে, অধিকাংশ ডেফিনিশনই টেম্পোরারি অ্যারেঞ্জমেন্ট। আজ যেটাকে সিভিলাইজেশন বলা হচ্ছে, একশো বছর পরে সেটাই মিউজিয়ামের ক্যাপশন হয়ে যাবে। তাই বার্ধক্য জিনিসের মিনিং কম, তাদের শ্যাডো বেশি দেখতে চায়। আমি এখন মানুষের কথার থেকেও তাদের থেমে যাওয়াগুলো বেশি লক্ষ করি। কে কোথায় চুপ করে গেল। কোন হাসিটা সামান্য দেরিতে এল। কোন মানুষটা হঠাৎ জানলার দিকে তাকাল। বয়স হলে মানুষ ডিটেকটিভ না, রেডিওলজিস্ট হয়ে যায়। শরীর নয়, নীরবতার ভেতরে ফ্র্যাকচার খোঁজে। মাঝে মাঝে মনে হয়, কুয়াশা আসলে পৃথিবীর সবচেয়ে অনেস্ট জিনিস। সে কিছু পুরো লুকোয় না, আবার পুরো দেখায়ও না। রেসপেক্টেবল ডিস্ট্যান্স বজায় রাখে। এখনকার মানুষেরা সেটা পারে না। সবাই ইমিডিয়েটলি আন্ডারস্টুড হতে চায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ব্রেকফাস্ট পর্যন্ত এক্সপ্লেন করে দেয়। আমাদের সময়ে মানুষ অন্তত একটু মিস্টিরিয়াস থাকার চেষ্টা করত। এখন সবাই ট্রান্সপারেন্ট। এবং ট্রান্সপারেন্সির মধ্যে ভীষণ বোরডম আছে। একবার এক ছাত্র আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘স্যার, ট্রুথ এত রিলেটিভ হলে ফিলোসফি পড়ে লাভ কী?’ আমি বলেছিলাম, ‘দেখো, ফিলোসফি তোমাকে ট্রুথ দেয় না। শুধু তোমার কনফিউশনটাকে একটু সোফিস্টিকেটেড করে।’ সে খুব সিরিয়াস মুখে নোট নিয়েছিল। ওই মুহূর্তে প্রথম বুঝলাম, শিক্ষকতা আসলে অনেকাংশে অর্গানাইজড ব্লাফিং। তবু এই অস্পষ্টতার ভেতরেই আমি এখন একটু শান্তি পাই। কারণ সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলে পৃথিবীকে সহ্য করা কঠিন হয়ে যায়। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না—কেস স্টাডি হয়ে যায়। প্রেম হয়ে যায় সাইকোলজি। মৃত্যু হয়ে যায় মেডিক্যাল ডেটা। অথচ জীবনের সবচেয়ে জরুরি জিনিসগুলো কখনও পুরো বোঝা যায় না। কেন একটা গান শুনে হঠাৎ চোখে জল আসে। কেন বহু বছর পরে কোনও পুরনো পারফিউমের গন্ধে বুক ধক করে ওঠে। কেন মাঝরাতে হঠাৎ মনে হয়, কেউ একজন আর কোনওদিন ফিরে আসবে না। এই না-বোঝাটুকুই বোধহয় মানুষকে এখনও পুরোপুরি মেশিন হতে দেয়নি।
এখন আমি শুধু জিনিসগুলোর পাশে একটু চুপ করে বসে থাকতে চাই। খুব বেশি কথা বলতে ইচ্ছে করে না আর। বয়স হলে মানুষ বুঝতে শেখে, পৃথিবীর অধিকাংশ জিনিসই এক্সপ্লানেশন নয়, কম্প্যানিয়নশিপ চায়। যেমন হাসপাতালে কেউ কোমায় থাকা আত্মীয়ের পাশে বসে থাকে। জানে, কোনও মির্যাকল হবে না। ডাক্তারদের চোখের নীচের ক্লান্তি দেখেই বোঝা যায়, সায়েন্স ইতিমধ্যে খুব ভদ্রভাবে হাত তুলে নিয়েছে। তবু মানুষটা যায় না। প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে থাকে। ফ্লাস্কের ঠান্ডা চা খায়। মাঝরাতে করিডরে হাঁটে। ভেনটিলেটরের শব্দ শোনে। কারণ ভালোবাসা অনেক সময় হোপ নয়, হ্যাবিট। আমি এখন বইগুলোর পাশে ঠিক সেভাবেই বসে থাকি। ওরা আর আমাকে নতুন কিছু শেখাবে না। আমিও ওদের পুরো বুঝব না। তবু এই কো-এক্সিস্টেন্সটা চালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার পুরো ঘরটাই একটা আইসিইউ। বুকশেলফগুলো লাইফ সাপোর্টে বেঁচে আছে। নীৎশে, ইবনে আরবি, সিওরান, উইটগেনস্টাইন—সবাই নিজের নিজের সাইলেন্ট বেডে শুয়ে আছেন। কেউ কেউ এখনও ফিসফিস করছেন। কেউ বহুদিন আগেই ইন্টারনালি ডেড। আমি রাত্তিরে গ্লাস হাতে ওদের ওয়ার্ড রাউন্ড করতে বেরোই। কোনও বই খুলে দেখি, পুরনো আন্ডারলাইন। কোথাও বিস্ময়সূচক চিহ্ন। কোথাও লেখা—‘বিউটিফুল বাট ফলস।’ তখন মনে হয়, এগুলো ফিলোসফি না, বরং বহু বছরের ফেইল্ড রোম্যান্সের মেডিক্যাল রিপোর্ট। মজার ব্যাপার কী জানেন? তরুণ বয়সে আমি বই পড়তাম আনসার পাওয়ার জন্য। এখন পড়ি কোম্পানি পাওয়ার জন্য। এই পরিবর্তনটা খুব ডিগনিফায়েড শোনালেও আসলে সামান্য প্যাথেটিক। তবে বার্ধক্যের একটা প্রিভিলেজ আছে—প্যাথেটিক হওয়াটাকে আর খুব লুকোতে হয় না। আমি মাঝে মাঝে বইগুলোর সঙ্গে কথাও বলি। বিশেষ করে থার্ড পেগের পর। ‘আচ্ছা নীৎশে,’ আমি বলি, ‘তুমি এত সুপারম্যান-সুপারম্যান করলে, শেষ পর্যন্ত একটা ঘোড়ার গলা জড়িয়ে কাঁদলে কেন?’ তারপর নিজেই হেসে ফেলি। মদ খেলে আমার হিউমার একটু ক্রুয়েল হয়ে যায়। কিন্তু বৃদ্ধ মানুষের ক্রুয়েলটিও এখন আর খুব ডেঞ্জারাস নয়। দাঁত কমে গেলে কামড়ও ফিলোসফিক্যাল হয়ে যায়। আসলে আমি এখন জিনিসগুলোর ভেতরের ফেইলিওরগুলো দেখতে ভালোবাসি। একটা পুরনো বই, একটা নষ্ট ল্যাম্প, একটা অসমাপ্ত চিঠি, একটা মানুষ যে আর কারও ফোনের অপেক্ষা করে না—এরা সবাই যেন একই গোপন রিলিজিয়নের সদস্য। ওদের পাশে বসে থাকতে ভালো লাগে। কারণ ওরা আমাকে জাজ করে না। মানুষের একটা সমস্যা আছে—তারা সবসময় আপনাকে ইমপ্রুভ করতে চায়। বইগুলো সেটা করে না। ওরা শুধু ধীরে ধীরে ধুলো জমায়। এবং কখনও কখনও, গভীর রাত্তিরে, আমার সত্যিই মনে হয়—ধুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে কমপ্যাশনেট জিনিস। সে সবকিছুর ওপর সমানভাবে পড়ে।
একটা মাস্টারপিসের ওপরও। একটা ফেইলিওরের ওপরও।
বইগুলোর ক্ষেত্রেও তাই। ওদের অনেক কথাই আমি আর পুরো বুঝি না। কিছু বাক্য এখন আর খুলতে চায় না। যেন বহুদিন বন্ধ থাকা ঘরের দরজা—চাবি এখনও আছে, কিন্তু তালার ভেতরে মরচে পড়ে গেছে। কিছু প্যারাগ্রাফের সামনে এসে আমি দাঁড়িয়ে থাকি, যেমন বৃদ্ধ মানুষ পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ভেতরে ঢোকার সাহস হয় না, তবু চলে যেতেও ইচ্ছে করে না। তবু ওদের পাশে বসে থাকলে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, পৃথিবীতে কিছু মানুষ ছিল যারা সত্যিই রাত জেগে চিন্তা করত। শুধু ক্যারিয়ার বানানোর জন্য নয়। সত্যিই চিন্তা করত। এমনভাবে চিন্তা করত যেন মানুষের মাথার ভেতর একটা অন্ধকার সমুদ্র আছে, আর তারা হাতে ছোট্ট একটা লণ্ঠন নিয়ে সেখানে নেমে পড়েছে। এখনকার লোকেরা খুব এফিশিয়েন্ট। খুব আর্টিকুলেট। পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিজের আইডিওলজি এক্সপ্লেইন করতে পারে। আমাদের সময়ে মানুষ অন্তত একটু কনফিউজড ছিল। সেই কনফিউশনের মধ্যেই ক্যারেক্টার ছিল। এখন সবাই টেড টক দেওয়ার মতো করে কথা বলে। যেন প্রত্যেক মানুষের ভেতরে একটা ইনভিজিবল প্রেজেন্টেশন স্লাইড চলছে। ওরা—এই মৃত দার্শনিকরা, কবিরা, ইনসমনিয়ায় ভোগা এসে-ইস্টরা— একটু অন্যরকম ছিল। এদের লেখার ভেতরে ঘামের গন্ধ আছে, নার্ভাস ব্রেকডাউনের দাগ আছে, ফেইল্ড ম্যারেজ আছে, আনপেইড বিল আছে। ফিলোসফি তখনও পুরো কর্পোরেট হয়নি। তখন মানুষ চিন্তা করত নিজের আত্মাকে বাঁচানোর জন্য, লিঙ্কডইন প্রোফাইল আপডেট করার জন্য নয়।
আমি মাঝে মাঝে বই খুলে কিছু লাইন পড়ি। তারপর গ্লাসে চুমুক দিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকি। মনে হয়, বহু বছর আগে কোনও এক মৃত মানুষ রাত তিনটেয় এই একই বাক্য লিখেছিল, এবং লেখার সময় সেও সম্ভবত এগজিস্টেনশিয়ালি ডেভাস্টেটেড ছিল। এই কনটিনিউটিটা আশ্চর্য কমফর্টিং। মানুষ আসলে একা মরতে ভয় পায় না। একা চিন্তা করতে ভয় পায়। তাই বইয়ের ভেতরে আমরা মৃতদের কম্প্যানি খুঁজি। যদিও শেষ পর্যন্ত এদের অধিকাংশই হয় পাগল হয়েছে, না হয় অ্যালকোহলিক। কেউ মনাস্ট্রিতে গিয়ে লুকিয়েছে, কেউ সুইসাইড নিয়ে লিখেছে, কেউ ঘোড়াকে জড়িয়ে কেঁদেছে, কেউ নিজের ঘর থেকে বেরোয়নি বছরের পর বছর। সিভিলাইজেশন পরে তাদের ‘গ্রেট থিংকার’ বলেছে, কিন্তু কাছ থেকে দেখলে এরা সবাই একটু ড্যামেজড ছিল। আমার মনে হয়, চিন্তাভাবনা যদি খুব অনেস্ট হয়, তাহলে মানুষকে সামান্য ভেঙে যেতেই হবে। কারণ পৃথিবীকে দীর্ঘদিন নির্ভুলভাবে দেখলে নার্ভাস সিস্টেমের ওপর চাপ পড়ে। আমি দুটোর মাঝামাঝি কোথাও আছি বলে মনে করতে ভালোবাসি। পুরো পাগল নই। আবার পুরো ফাংশনালও নই। একবার এক পুরনো কলিগ আমাকে বলেছিল, ‘খালিদ, ইউ নিড হেল্প।’ আমি বলেছিলাম, ‘ডিয়ার ফ্রেন্ড, ফিলোসফি ইটসেলফ ওয়াজ দ্য হেল্প।’ সে হেসেছিল। আমিও হেসেছিলাম।
দু’জনেই জানতাম, কথাটা পুরো জোক নয়। এখন মাঝরাতে বইয়ের পাশে বসে থাকলে কখনও কখনও মনে হয়, এরা বই নয়। বরং গভীর সমুদ্রে ডুবে যাওয়া কিছু সাবমেরিন, যেগুলো থেকে এখনও ক্ষীণ সিগন্যাল ভেসে আসে। আর আমি—একজন বৃদ্ধ, সামান্য মাতাল রেডিও অপারেটর—সেই সিগন্যালগুলো ধরার চেষ্টা করছি।
আমি সাধারণত একটা পুরনো কাঠের চেয়ারে বসে থাকি। চেয়ারটা বসলে সামান্য কেঁপে ওঠে। যেন সেও বুড়িয়ে গেছে। কাঠের ভেতরে বয়স ঢুকে গেলে একটা বিশেষ ধরনের শব্দ হয়—শুকনো, ক্লান্ত, অথচ অভিমানী। আমার হাঁটুতে যেমন শব্দ হয় সিঁড়ি ভাঙতে গেলে। আমাদের দু’জনের সম্পর্ক বহুদিনের। আমি উঠলে সে হাঁফ ছাড়ে, আমি বসলে কঁকিয়ে ওঠে। দীর্ঘ কো-এক্সিস্টেন্সের এটাই সম্ভবত সবচেয়ে স্থিতিশীল রূপ। মানুষের চেয়ে আসবাবপত্র অনেক বেশি লয়াল। তারা অন্তত আইডিওলজি বদলায় না। কোনওদিন দেখিনি একটা চেয়ার হঠাৎ ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে, বা একটা টেবিল রাতারাতি লিবারেলিজম ছেড়ে ন্যাশনালিজমে চলে গেছে। মানুষ এ ব্যাপারে অনেক বেশি রেস্টলেস স্পিসিস। চেয়ারটার এক পা সামান্য ছোট হয়ে গেছে। ফলে বসলে একটু দুলে ওঠে। আগে বিরক্ত লাগত। এখন ভালো লাগে। মনে হয়, স্থির জিনিসের মধ্যেও সামান্য অনিশ্চয়তা থাকা দরকার। পুরো ব্যালান্সড জিনিসের ওপর আমার বিশ্বাস নেই। পারফেক্টলি স্টেবল মানুষদেরও আমি একটু সন্দেহ করি। ইতিহাসে অধিকাংশ ভয়ংকর কাজ খুব স্টেবল লোকেরাই করেছে। চেয়ারের হাতলে আমার আঙুলের দাগ পড়ে গেছে। বছরের পর বছর একই জায়গায় হাত রাখতে রাখতে কাঠ মসৃণ হয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে হাত বোলাই। মনে হয়, কোনো বৃদ্ধ জন্তুর পিঠে হাত রাখছি। সে আর দৌড়তে পারে না, কিন্তু এখনও পুরো মরেনি। কখনও কখনও আমার সত্যিই মনে হয়, এই চেয়ারটা আমার সম্পর্কে পৃথিবীর অন্য যেকোনও মানুষের চেয়ে বেশি জানে। কত রাত আমি এখানে বসে থেকেছি। কত গ্লাস হুইস্কি। কত অসমাপ্ত বাক্য। কতবার মাঝরাতে উঠে জানলার কাছে গেছি, আবার ফিরে এসে বসেছি। মানুষ তো শেষ পর্যন্ত শুধু আপনার এডিটেড ভার্সনটাই দেখে। আসবাবপত্র র-ফুটেজ জমিয়ে রাখে। একসময় এই চেয়ারে বসেই আমি লেকচার প্রস্তুত করতাম। হেগেল, হাইডেগার, নীৎশে। এমন মুখ করে নোট লিখতাম যেন মানবসভ্যতা পরদিন সকালে আমার ক্লাসের ওপর নির্ভর করছে। এখন সেই একই চেয়ারে বসে বরফ গলার শব্দ শুনি। সিভিলাইজেশনের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত এইরকমই—প্রথমে ম্যানিফেস্টো, তারপর সাইলেন্স। চেয়ারটার গায়ে হালকা অ্যালকোহলের গন্ধও লেগে গেছে বোধহয়। অথবা সেটা আমারই ভ্রম। বয়স হলে মানুষ নিজের গন্ধ আর বাইরের গন্ধ গুলিয়ে ফেলে। ঘর, শরীর, বই, টোব্যাকো, হুইস্কি—সব মিশে গিয়ে একটা ব্যক্তিগত অ্যাটমস্ফিয়ার তৈরি করে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, মানুষ মারা যাওয়ার পর তার আত্মা বলে কিছু থাকে কি না জানি না, কিন্তু তার ঘরের গন্ধ কিছুদিন নিশ্চয়ই থেকে যায়। মজার ব্যাপার কী জানেন? এই চেয়ারের প্রতি আমার যে অ্যাটাচমেন্ট, কোনও মানুষের প্রতিও সম্ভবত এত কনসিস্টেন্ট ছিল না। একবার এক পুরনো কলিগ আমাকে বলেছিল, ‘খালিদ, ইউ আর ইমোশনালি ইনভেস্টেড ইন ফার্নিচার।’ আমি বলেছিলাম, ‘মানুষের চেয়ে ফার্নিচার কম ডিসঅ্যাপয়েন্টিং।’ সে খুব হেসেছিল।
আমিও হেসেছিলাম। তারপর অনেকক্ষণ চেয়ারটা আস্তে আস্তে দুলছিল। যেন সেও জোকটা বুঝেছে।
গায়ে আমার ধূসর রঙের একটা পাঞ্জাবি। ধূসর বলাটা অবশ্য পুরো ঠিক নয়। বহু বছরের ঘাম, ধুলো, টোব্যাকো আর অ্যালকোহলের সঙ্গে মিশে রংটা এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যাকে নির্দিষ্ট নামে ডাকা কঠিন। ঠিক বৃদ্ধ মানুষের মেমরির মতো। গলার কাছে সামান্য দাগ— হয়তো গত সপ্তাহের হুইস্কির, হয়তো আরও পুরনো কোনও রাতের। কিছু দাগ সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়, কিছু আরও ভেতরে ঢুকে যায়। বয়স বাড়লে কাপড়ও অটোবায়োগ্রাফি হয়ে যায়। কোথাও ছেঁড়া সেলাই, কোথাও সিগারেটের ছোট্ট পোড়া দাগ, কোথাও কলম লিক করে নীল হয়ে থাকা পকেট। মানুষ নিজের শরীরের থেকেও বেশি ট্রুথ লুকিয়ে রাখে জামাকাপড়ে। এই পাঞ্জাবিটা আমি বহুদিন ধরে পরছি। এতদিন যে এখন এর ভাঁজগুলোরও নিজস্ব মেমরি তৈরি হয়েছে। কোন রাতে আমি বেশি মাতাল ছিলাম, কোন শীতে জ্বর নিয়ে একা বসেছিলাম, কোন দুপুরে কলেজ থেকে ফিরে বুঝেছিলাম আর কোনওদিন প্রেমে পড়ব না—কাপড় সম্ভবত সব মনে রাখে। বোতাম দুটো লাগানো নেই। লাগাতে ইচ্ছে করে না। এখন আর রেসপেক্টেবল দেখানোর প্রয়োজন বোধ করি না। রেসপেক্টেবল মানুষদের আমি খুব ভয় পাই। হিস্ট্রির অধিকাংশ নৃশংস কাজ তারাই করেছে। যারা টাই পরে জেনোসাইড অ্যাপ্রুভ করে, যারা পলিশড ইংরেজিতে টর্চার জাস্টিফাই করে, যারা ম্যাসাকারের আগে ডিনার খেয়ে ন্যাপকিন ভাঁজ করে রাখে। পৃথিবীর সবচেয়ে ডেঞ্জারাস মানুষরা সাধারণত খুব ওয়েল-ড্রেসড হয়। আমার চেহারা এখন সামান্য ডিসরেপিউটেবল। এবং অদ্ভুতভাবে, এতে আমি স্বস্তি পাই। অন্তত আমাকে দেখে কেউ সিভিলাইজেশনের ফিউচার নিয়ে আশাবাদী হবে না। শীত না থাকলেও কখনও কখনও কাঁধে একটা পুরনো শাল জড়িয়ে রাখি। কেন রাখি জানি না। হয়তো শরীরের জন্য নয়, বয়েসের জন্য। বয়স হলে মানুষ একটু একটু করে নিজেরই ভূত হয়ে ওঠে। শালটা সেই ভূতের কস্টিউম। মাঝে মাঝে আয়নায় নিজেকে দেখে আমার মনে হয়, আমি কোনও রিটায়ার্ড প্রফেসর নই। বরং লখনউয়ের কোনও ফেইল্ড উর্দু পোয়েট, যে ভুল করে ফিলোসফি ডিপার্টমেন্টে চাকরি পেয়ে গিয়েছিল। একবার এক ছাত্র আমাকে বলেছিল, ‘স্যার, ইউ লুক ভেরি টায়ার্ড।’ আমি বলেছিলাম,
‘না। আমি শুধু সিভিলাইজেশনকে অনেকক্ষণ ধরে দেখছি।’ সে হাসেনি। এখনকার ছেলেমেয়েরা আইরনি খুব কম বোঝে। ওরা সবকিছু লিটারেলি নেয়। এমনকি ডিসপেয়ারও।
দাড়িতে পাক ধরেছে অনেকদিন। কামানো হয় না নিয়মিত। গালে হাত দিলে খসখসে লাগে। যেন মুখের ওপর ধীরে ধীরে কোনও পুরনো দেয়াল তৈরি হচ্ছে। বয়স আসলে মানুষের শরীরে খুব চুপচাপ আর্কিটেকচার বদলায়। প্রথমে চোখের নীচে ছায়া নামে, তারপর গলার স্বর একটু নিচে নেমে যায়, তারপর একদিন আয়নায় নিজের বাবার মুখ দেখতে পান। চোখের নীচে কালি। ঠোঁট সামান্য শুকনো। কথা বলতে গেলে জিভে অ্যালকোহলের ধাতব স্বাদ লেগে থাকে। যেন দীর্ঘদিন ধরে আমি ট্রুথ নয়, মরচে খেয়ে যাচ্ছি। কখনও কখনও সকালে ঘুম ভাঙার পর মনে হয়, পুরো শরীরটা ভেতর থেকে ধীরে ধীরে অক্সিডাইজ হচ্ছে। একসময় আমি ভাবতাম, অ্যালকোহল মানুষকে ডেস্ট্রয় করে। এখন মনে হয়, অ্যালকোহল শুধু ভেতরের decay-টাকে ভিজিবল করে দেয়। সিভিলাইজেশন খুব ভদ্রভাবে মানুষকে ভাঙে। হুইস্কি অন্তত সেটা লুকোয় না। আমার কণ্ঠস্বরও বদলে গেছে। আগে ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে জোরে কথা বলতে পারতাম। হেগেল বোঝাতাম এমন ভঙ্গিতে যেন ডায়ালেকটিক্স ঠিকমতো না বুঝলে সূর্য পরদিন উঠবে না। এখন গলা একটু নিচে নেমে এসেছে। যেন প্রতিটি বাক্য উচ্চারণ করার আগে ভেবে নেয়, সত্যিই বলা দরকার কি না। বয়স হলে মানুষের গলার মধ্যেও সেন্সরশিপ তৈরি হয়। মাঝে মাঝে নিজের গলার শব্দ শুনে মনে হয়, পুরনো গ্রামোফোনে রেকর্ড বাজছে। খানিক স্ক্র্যাচ, খানিক ধুলো, খানিক নস্টালজিয়া। যেন কোনও ফরগটেন উর্দু গজল বহুদিন পর কেউ ভুল স্পিডে বাজাচ্ছে। এই নস্টালজিয়া শব্দটা খুব ইন্টারেস্টিং। গ্রিক শব্দ ‘নস্টস’-এর অর্থ রিটার্ন, আর ‘আলগস’-এর অর্থ সাফারিং। নস্টস আর আলগস মিলে তৈরি হল নস্টালজিয়া। মিলান কুন্দেরা তাঁর ইগনোরেন্সে এটা খুব সুন্দরভাবে লিখেছেন। অর্থাৎ, মেমরি শেষ পর্যন্ত মানুষকে কোনও কমপ্লিট হ্যাপিনেস দেয় না। শুধু কোথাও ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেয়। আর সেই রিটার্ন প্রায় সবসময় ইমপসিবল। এই জন্যই বোধহয় স্মৃতির ভেতরে এত পেইন। আপনি যে জায়গায় ফিরতে চান, সেটা আর কোথাও নেই। শহর বদলে গেছে। মানুষ মরে গেছে। পুরনো বাড়িতে এখন অন্য কারও কার্টেন ঝুলছে। এমনকি যে মানুষটা ফিরে যেতে চাইছে, সেও আর আগের মানুষটা নেই। নস্টালজিয়া আসলে এক ধরনের ইন্টারনাল এক্সাইল। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, মানুষের মেমরি একটা অ্যাব্যান্ডনড রেলওয়ে স্টেশনের মতো। মাঝে মাঝে সেখানে পুরনো ট্রেনের শব্দ শোনা যায়, কিন্তু কোনও ট্রেন আর সত্যি সত্যি এসে থামে না। তবু আমরা অপেক্ষা করি। কারণ মানুষ খুব অদ্ভুত প্রাণী। সে জানে কিছু জিনিস আর কোনওদিন ফিরে আসবে না। তবু দরজাটা পুরো বন্ধ করে না। একবার এক ছাত্রী আমাকে বলেছিল, ‘স্যার, ইউ আর টু মেলানকোলিক।’ আমি বলেছিলাম,
‘না। আমি শুধু পাস্ট টেন্সে বাস করি।’ সে কথাটা বুঝতে পারেনি। তখন ওর বয়সও খুব কম ছিল। কম বয়সে মানুষ ফিউচারকে খুব সিরিয়াসলি নেয়।
টেবিলের ওপর একটা অর্ধেক-ভর্তি বোতল। সস্তার স্কচ। দামি মদের প্রতি আমার কখনওই দুর্বলতা ছিল না। ফিলোসফি পড়িয়ে বড়লোক হওয়া যায় না। আর সত্যি বলতে কী, থার্ড পেগের পর সিভিলাইজেশনের সব মদই প্রায় একই রকম ফিলোসফিক্যাল হয়ে ওঠে। তখন সিঙ্গল মল্ট আর সস্তার ব্লেন্ডেড হুইস্কির মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা শুধু সেইসব মানুষেরই থাকে, যাদের আত্মা এখনও পুরোপুরি ভাঙেনি। বোতলটার গায়ে আঙুলের ছাপ লেগে আছে। আলো পড়লে কাচের ওপর মলিন দাগ দেখা যায়। মাঝে মাঝে মনে হয়, মানুষের জীবনও বোধহয় এইরকম—ভেতরের অ্যালকোহল নয়, বাইরের আঙুলের ছাপই শেষ পর্যন্ত বেশি দৃশ্যমান হয়ে থাকে। গ্লাসে মদ ঢালার সময় আমি তাড়াহুড়ো করি না। বোতলটা সামান্য কাত করি। গাঢ় তরল ধীরে ধীরে নেমে আসে। সেই শব্দ শুনতে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, কোনও অন্ধকার প্রাণী কাচের ভেতরে আশ্রয় নিচ্ছে। অথবা বহুদিন সিলড থাকা কোনও কনফেশন অবশেষে মুখ খুলছে। তারপর বরফ। বরফ ফেলার শব্দটা আমি খুব মন দিয়ে শুনি। টিক। তারপর আরেকটা। টিক। বরফ গলতে শুরু করলে গ্লাসের গায়ে জল জমে। আমি আঙুল দিয়ে সেই ঠান্ডা ভেজাভাব ছুঁয়ে দেখি। বয়স হলে মানুষ অদ্ভুত সব জিনিস স্পর্শ করতে ভালোবাসে—পুরনো বইয়ের ধুলো, দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে, গ্লাসের ঘাম। সম্ভবত শরীর তখন পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে শেষবারের মতো ম্যাটেরিয়াল জিনিসগুলোকে মনে রাখার চেষ্টা করে। আমি মাঝে মাঝে গ্লাসটা আলোয় তুলে ধরি। অ্যাম্বার রঙের ভেতরে অদ্ভুত ছায়া নড়ে। তখন মনে হয়, মদ আসলে লিকুইড মেমোরি। মানুষ সেটা খায় ভুলে যাওয়ার জন্য, অথচ ভেতর থেকে আরও পুরনো কিছু জেগে ওঠে। এমন সব মুখ, যাদের নাম আর মনে নেই। এমন সব রাস্তা, যেগুলো হয়তো এখন শপিং মলে বদলে গেছে। এমন সব বিকেল, যেগুলো তখন তুচ্ছ মনে হয়েছিল, অথচ এখন পুরো জীবনের চেয়েও বেশি বাস্তব লাগে। অ্যালকোহলের একটা স্ট্রেঞ্জ অনেস্টি আছে। প্রথম পেগ মানুষকে সোশ্যাল করে। দ্বিতীয় পেগ নস্টালজিক। তৃতীয় পেগের পর মানুষ নিজের ভেতরের হন্টেড হাউসে ঢুকে পড়ে। আমি সম্ভবত অনেক বছর ধরেই সেই বাড়িটার ভেতরে থাকি। একবার এক ছাত্র আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘স্যার, ইউ ড্রিঙ্ক এভরি ডে?’ আমি বলেছিলাম,
‘না। কিছু কিছু রাতে দু’বার করে ডে হয়।’ সে প্রথমে হাসেনি। তারপর হেসেছিল। তারপর একটু ভয় পেয়েছিল। ভালো ছাত্ররা সাধারণত দ্রুত বুঝতে পারে, তাদের প্রফেসররা আসলে সামান্য ড্যামেজড মানুষ। মাঝে মাঝে গ্লাস হাতে বসে থাকতে থাকতে আমার মনে হয়, আমি মদ খাচ্ছি না। বরং কোনও ধীর, অ্যাম্বার-রঙের টাইম আমাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছে। তবু গ্লাসে আবার মদ ঢালি। কারণ মানুষের কিছু সেল্ফ-ডেস্ট্রাকশন খুব এলিগ্যান্ট হয়।
এই যে আলো নিভিয়ে বসে থাকি, এতে ইলেকট্রিসিটির বিল কমে কি না জানি না। হিসেব রাখার মতো আর কোনও আগ্রহও নেই। কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত—পৃথিবীটা তখন একটু কম স্পষ্ট লাগে। আর পৃথিবী যত কম স্পষ্ট লাগে, তাকে তত বেশি সহ্য করা যায়। স্পষ্ট পৃথিবী আমার ভালো লাগে না। স্পষ্ট পৃথিবী খুবই নিষ্ঠুর। সে সবকিছুকে অত্যন্ত শার্প করে দেখায়। মানুষের লোভ, আত্মপ্রদর্শন, উৎকণ্ঠা—এমনকি হাসির ভেতরের ক্লান্তিটুকুও। যেন বাস্তবতা একটা ওভারএক্সপোজড ফটোগ্রাফ, যেখানে কোনও ছায়ারও আত্মরক্ষা নেই। এখনকার পৃথিবী মানুষের মুখকে আর মুখ থাকতে দেয় না; তাকে বিজ্ঞাপন বানিয়ে ফেলে। প্রত্যেক মুখ যেন একটা করে ছোট্ট বিলবোর্ড। সেখানে সুখের অফার, সাফল্যের স্কিম, এবং ‘ইউ ক্যান বি এনিথিং’ জাতীয় মিথ্যে আশ্বাস ঝুলছে। রাত দুটোতেও মোবাইলের স্ক্রিনে দাঁত-বের-করা সুখী মানুষ ভেসে ওঠে। তারা হাসে এমনভাবে, যেন হাসিটা কোনও ইমোশন নয়—একটা পণ্য। তারা আপনাকে বোঝাতে চায়, একটা নতুন বিমা পলিসি কিনলেই জীবনের শূন্যতা ভরে যাবে। যেন লোনলিনেসও এখন ইএমআই-তে মেটানো যায়। আমি কখনও কখনও মৃদু হেসে ফেলি। হাসিটা নিজের কাছেই অচেনা লাগে। শুকনো, ভেতর থেকে ফাটা। গলার ভেতরে কাশি জমে থাকে, যেন শব্দগুলো বেরোনোর আগে পথ হারিয়ে ফেলছে। স্পষ্ট পৃথিবী মানে টিভি-অ্যাঙ্করের দাঁত। সেই অদ্ভুত চকচকে, শিকারি দাঁত। যেন তারা সংবাদ পড়ছে না, বরং বাস্তবতাকে চিবিয়ে খাচ্ছে। তারা কথা বলে না, আক্রমণ করে। প্রত্যেক বাক্যের শেষে যেন একটা যুদ্ধবিমান উড়ে যায়। আমি মাঝে মাঝে টিভিটা বন্ধ করে দিই। তারপর আবার মনে হয়, বন্ধ করাটাও এক ধরনের অংশগ্রহণ। তাই আবার খুলে দেখি। যেন এক বৃদ্ধ দর্শনের অধ্যাপক, যিনি বহুদিন আগে ক্লাসরুম ছেড়ে দিয়েছেন, এখন শুধু সভ্যতার ডিস্টরশন ফিল্ড পর্যবেক্ষণ করছেন। আমার নাম খালিদ জাফরি। বয়স বাড়লে নামও যেন নিজের ওপর থেকে একটু সরে দাঁড়ায়—দূরে দাঁড়িয়ে দেখে, এই মানুষটা এখন কীভাবে বেঁচে আছে। কখনও মনে হয়, আমি আলো নিভিয়ে বসে থাকি না। বরং আলো আমাকে ধীরে ধীরে ছেড়ে গেছে। যেমন কোনও পুরনো থিয়েটারের স্টেজে শেষ শোয়ের পর লাইটগুলো একে একে নিভে যায়, আর মঞ্চে পড়ে থাকে শুধু ধুলো আর কিছু অসমাপ্ত সংলাপ। পৃথিবীকে তখন আর পৃথিবী মনে হয় না। মনে হয় একটা বিশাল ব্রডকাস্ট রুম, যেখানে কেউ ভুল করে সারাদিনের শব্দ চালিয়ে রেখে গেছে। আর আমি সেই শব্দের ভেতরে বসে থাকা একমাত্র অনএডিটেড ভয়েস।
অনেকদিন এমনও যায়, টিভি দেখি না। দীর্ঘদিন দেখি না। টিভি এখন আমার কাছে একটা পুরনো রাষ্ট্রের মতো—যার নাগরিকত্ব আমি বহু আগেই ছেড়ে দিয়েছি, তবু তার আইন মাঝে মাঝে জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে। পাশের ফ্ল্যাটের শব্দ দেয়াল ভেদ করে আসে। মানুষের কণ্ঠস্বর এখন আর আলাদা থাকে না—সবাই মিলেমিশে এক ধরনের সাউন্ড-স্মগ তৈরি করে। এখনকার দেয়ালগুলোও বড় বিশ্বাসঘাতক—মানুষের গোপন দুঃখ আটকাতে পারে না, কিন্তু নিউজ চ্যানেলের চিৎকার দিব্যি পার করে দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই বিল্ডিংটা আসলে একটা বিশাল রেডিও রিসিভার। প্রত্যেক ফ্ল্যাট একটা করে ফ্রিকোয়েন্সি। কেউ রান্না করছে, কেউ ঝগড়া করছে, কেউ চুপচাপ একা বসে আছে—সব মিলিয়ে একটা অনএডিটেড লাইভ ব্রডকাস্ট। আমি মাঝখানে বসে সেই স্ট্যাটিক শুনি। পাশের ফ্ল্যাটে রাত হলে এক ধরনের তাড়াহুড়ো শুরু হয়। কারও হাসি হঠাৎ কেটে যায়, কারও গলা উঁচু হয়, তারপর আবার নেমে আসে। মনে হয়, মানুষ আসলে শান্ত নয়—শান্ত হওয়ার অভিনয় শিখে নিয়েছে। আর টিভির শব্দ না থাকলেও নিউজ চ্যানেলের ইকো ঠিকই থাকে। কখনও দেয়াল কাঁপে, কখনও জানলার কাচ। মনে হয়, নিউজ এখন শুধু স্ক্রিনে নয়—ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ঢুকে গেছে। আমি একদিন পাশের ফ্ল্যাটের শব্দ শুনে হেসেছিলাম। কারণ তারা এত সিরিয়াসলি তর্ক করছিল, মনে হচ্ছিল কোনও দর্শনের থিসিস ডিফেন্ড হচ্ছে। অথচ হয়তো বিষয় ছিল—রুটি আনা হয়েছে কি না। মানুষের সবচেয়ে গভীর কনফ্লিক্টগুলো সাধারণত খুব সাধারণ জিনিসকে কেন্দ্র করে। আমার বয়সী একজন মানুষ এইসব শুনে আর অবাক হয় না। শুধু নোট করে রাখে—কে কখন চুপ করল, কে কখন বেশি জোরে কথা বলল, কে হঠাৎ হালকা থেমে গেল। বয়স হলে মানুষ আর গল্প শোনে না, সিগন্যাল ট্র্যাক করে। আমি এখন নিজের ঘরে বসে ভাবি, এই শব্দগুলো যদি দেয়াল পার হতে পারে, তাহলে নীরবতা কেন পারে না? নীরবতা কি দুর্বল, না কি সে নিজেই ইচ্ছে করে আটকায় নিজেকে? আমি একসময় ভাবতাম দর্শন মানুষকে স্পষ্ট করবে। এখন দেখি, দর্শন শুধু মানুষকে দেয়ালের মতো করে তোলে—ভেতরে ভেতরে ফাঁকা, কিন্তু বাইরে থেকে অক্ষত মনে হয়।
স্পষ্ট পৃথিবী মানে রাজনৈতিক দলের পতাকা। প্রতিটি রঙ এত উজ্জ্বল, এত হিংস্র, যেন মানুষের ব্যক্তিগত বিষণ্নতার ওপরও তারা নিজেদের মালিকানা দাবি করছে। মনে হয় বিষণ্নতাও এখন আর ব্যক্তিগত নয়—এটা যেন রেজিস্টার্ড প্রপার্টি, যার ওপর সময়মতো এসে কেউ না কেউ মালিকানা দেখিয়ে দেয়। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, বিষণ্নতারও যদি অফিস থাকত, তাহলে তার দরজায় হয়তো লেখা থাকত—‘ওনলি অথরাইজড পার্সনস।’ আর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকত বিভিন্ন দল, বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন রাষ্ট্র—প্রত্যেকে হাতে ফর্ম, প্রত্যেকে ক্লেইম করতে ব্যস্ত। খালিদ জাফরি, আমি, এই দৃশ্যটা কল্পনা করে প্রায়ই মৃদু হাসি। হাসিটা খুব জোরে নয়—একটা শুকনো, প্রায় ভেঙে পড়া হাসি, যেন পুরনো গ্রামোফোনের রেকর্ডে হঠাৎ একটা ভুল নোট ঢুকে গেছে। মনে হয়, এখন মানুষের দুঃখও আর একা থাকতে পারে না। দুঃখ যেন একটা পাবলিক পলিসি। কেউ না কেউ এসে তাকে ম্যানেজ করতে চায়, কোট করতে চায়, ব্যবহার করতে চায়। প্রতিটি রঙ এত উজ্জ্বল, এত হিংস্র, যেন তারা আলো নয়—একটা করে ছোট্ট এক্সক্লুসিভ ক্লেইম। লাল বলে, ‘আমি তোমার রাগ।’ সবুজ বলে, ‘আমি তোমার আশা।’ নীল বলে, ‘আমি তোমার নীরবতা।’ অথচ আসল নীরবতা কোনও রঙ চেনে না। সে শুধু ধীরে ধীরে বসে থাকে, দেয়ালের কোণে, টেবিলের নিচে, মানুষের গলার ভেতরে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই শহরটা একটা বিশাল ল্যান্ড রেজিস্ট্রি অফিস। প্রত্যেকে এসে নিজের নাম লিখিয়ে যাচ্ছে অন্য মানুষের অনুভূতির ওপর। ভালোবাসাও এখন যেন একটা সার্ভিস, যার পাশে ছোট্ট লেখা—‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন অ্যাপ্লাই।’ আমি একসময় ক্লাসে বলতাম, আইডিওলজি মানে আইডেন্টিটির এক্সটেনশন। এখন মনে হয়, আইডিওলজি মানে শুধু ভয়কে সুন্দর করে প্যাকেট করা। তবু আশ্চর্য লাগে, মানুষ এত প্যাকেটের ভেতরেও নিজের খালি জায়গাটা ঠিক খুঁজে বের করে ফেলে। তারপর সেটাকেই দুঃখ বলে ডাকে। আমি কখনও কখনও জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখি, রাস্তায় বাতাসের মধ্যেও যেন স্লোগান ঝুলে আছে। শব্দগুলো এত জোরে না হলেও, তাদের ইকো অনেক বেশি আগ্রাসী। যেন শহরটা একটা বিশাল স্পিকার, আর কেউ সেটাকে লো-ভলিউমে বন্ধ করতে ভুলে গেছে। আগে মানুষ একা হলে কবিতা পড়ত। এখন একা হলেই কোনও না কোনও আইডিওলজি এসে তাকে রিক্রুট করতে চায়। আপনি কষ্টে আছেন? সঙ্গে সঙ্গে কেউ এসে বলবে, আপনার কষ্টের কারণ অমুক দল, তমুক ধর্ম, তমুক রাষ্ট্র। যেন মানুষের আত্মা বলে কিছু নেই—সবকিছু শুধু স্লোগানের ইকুয়েশন। এইসব শুনে আমার মাঝে মাঝে হাসি পায়। খুব বড় হাসি নয়—একটা ছোট, প্রায় ভাঙা হাসি। কারণ মনে হয়, মানুষ এখন আর নিজের দুঃখ নিয়েও একা থাকতে পারে না। দুঃখও এখন শেয়ারযোগ্য কনটেন্ট।
খালিদ জাফরি, আমি, একসময় দর্শনের ক্লাসে বলতাম—আইডেন্টিটি মানে কনটিনিউয়াস কনফ্লিক্ট। এখন দেখি, কনফ্লিক্টটাই আইডেন্টিটি হয়ে গেছে। মজার ব্যাপার হল, যারা সবচেয়ে জোরে স্লোগান দেয়, তারা নিজের নীরবতা সবচেয়ে কম সহ্য করতে পারে। তাই তারা সবসময় শব্দ খোঁজে—ডিসকাশন, ডিবেট, ডিক্লারেশন, ডেমোনস্ট্রেশন। নীরবতা যেন তাদের কাছে একটা সন্দেহজনক অপরাধ। কখনও কখনও মনে হয়, এই শহরটা একটা বিশাল রিক্রুটমেন্ট অফিস। প্রতিদিন দরজায় নতুন নতুন মতাদর্শ দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ফর্ম। শুধু সই করে দিতে হবে—আপনার দুঃখ এখন কোন দলের সম্পত্তি হবে। আমি সাধারণত সই করি না। ফলে কেউ কেউ আমাকে ডিসএনগেজড বলে। কেউ কেউ বলে ডিপোলিটিসাইজড। আমি শুধু বলি, ‘না। আমার একটু দেরি হয়ে যায়। জুতোয় পেরেক ছিল।’ সুনীল গাঙ্গুলির কবিতা। তারপর চুপ করে থাকি।
কারণ চুপ থাকা এখন সবচেয়ে সন্দেহজনক পজিশন।
আমি গ্লাসে চুমুক দিই। ধীরে। খুব ধীরে। যেন তাড়াহুড়ো করলে সময়ও রাগ করবে। গলা দিয়ে মদ নামার সময় একটা উষ্ণ জ্বালা হয়। বুকের ভেতরে সামান্য আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভালো লাগে। কারণ অন্তত এই জ্বালাটা সৎ। এটা কারুর কাছে প্রেজেন্টেবল হতে চায় না, কাউকে ইমপ্রেস করতে চায় না। আমি, এখন জানি—এই শহরে অধিকাংশ অনুভূতি খুব ভালোভাবে মেকআপ করা। হাসি, কান্না, রাগ—সবকিছুই যেন ক্যামেরার জন্য প্রস্তুত। শুধু অ্যালকোহলই এখনও ফিল্টার ব্যবহার করতে শেখেনি। গ্লাসটা হাতে নিলে আলো তার ভেতরে একটু কাঁপে। যেন কাচটা শুধু পাত্র নয়—একটা অস্থির লেন্স, যার ভেতর দিয়ে সময় নিজের মুখ দেখতে ভয় পায়। অ্যাম্বার রঙটা দেখে মনে হয়, ভেতরে কোনও ছোট্ট ধরা-পড়া সূর্য আটকে আছে, যে বহুদিন আগে রিটায়ার করতে চেয়েছিল, কিন্তু ভুল করে আমার ঘরে এসে আটকে গেছে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, এই সূর্যটা সম্ভবত কোনও পুরনো সরকারি কর্মচারী। সকালে উঠত, আলো ছড়াত, তারপর একদিন হঠাৎ বুঝতে পারল—আর এনার্জি নেই, কিন্তু নোটিশও আসেনি। তাই এখন সে আমার গ্লাসের ভেতরে বসে সময় কাটাচ্ছে, খুব ধীরে ধীরে নিজেকে গলিয়ে ফেলছে। আমি, এই দৃশ্য দেখে অকারণে সিরিয়াস হয়ে যাই। তারপর নিজেই নিজের এই সিরিয়াসনেসকে একটু অপমান করি—কারণ বয়স হলে মানুষ নিজেকেও বেশি গুরুত্ব দিতে লজ্জা পায়। গ্লাসটা একটু ঘোরালে ভেতরের আলো বদলে যায়। মনে হয়, সেখানে কোনও ছোট শহর আছে—খুব ছোট, যেখানে রাস্তাগুলো তৈরি হয়েছে লিকুইড মেমোরি দিয়ে, আর বাড়িগুলো বানানো হয়েছে ভুলে যাওয়ার চাপে। মাঝে মাঝে ওই শহরের জানলায় কেউ দাঁড়িয়ে আমাকে দেখে ফেলে, যেন আমি তার দুঃস্বপ্নের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র দর্শক। অ্যাম্বার রঙটা শুধু রঙ নয়, এটা একটা লেট-স্টেজ অস্তিত্ব। আলো আর অন্ধকারের মাঝখানে আটকে থাকা কোনও মধ্যবয়সী সত্য, যে আর কোনও পক্ষেই যেতে পারছে না, তাই আমার গ্লাসেই চাকরি খুঁজে নিয়েছে। আমি চুমুক দিইনি এখনও। শুধু তাকিয়ে আছি। কারণ কিছু জিনিস পান করার জন্য নয়, দেখার জন্য তৈরি হয়। যেমন নস্টালজিয়া, যেমন ভুল সিদ্ধান্ত, যেমন পুরনো দর্শনের বইগুলো যেগুলো আমি এখনও ফেলতে পারিনি। মাঝে মাঝে মনে হয়, গ্লাসের ভেতরের এই সূর্যটা আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে। সে ভাবছে—‘এই মানুষটা এখনও কেন জেগে আছে?’ আর আমি ভাবি—‘তুমি কেন এখনও রিটায়ার করোনি?’ দু’জনেই কোনও উত্তর দিই না। কারণ আমরা দু’জনেই একই রকম লোনলি।
শুধু আমি একটু বেশি গ্র্যাভিটি-প্রোন। চুমুক দেওয়ার পর গলায় যে জ্বালা হয়, সেটা যেন কোনও পুরনো স্মৃতির সিগন্যাল পাঠাচ্ছে। শরীর বলে—‘ডিটেক্টেড: অ্যানসিয়েন্ট পেইন।’ আর আমি মৃদু হাসি। কারণ আমার শরীরও এখন একটু বেশি প্রোটোকল-ওরিয়েন্টেড হয়ে গেছে। একসময় আমি ভাবতাম, দর্শন মানুষকে ক্লিয়ার করবে। এখন দেখি, দর্শন শুধু মানুষকে আরও ধীরে চেনায়। গ্লাসে আরেকটু মদ ঢালতে গিয়ে দেখি হাতটা সামান্য কাঁপছে। বয়সের কাঁপুনি নাকি অস্তিত্বের কাঁপুনি, আমি আর আলাদা করতে পারি না। দুটোই এখন একই রকম ডিলেইড সিগন্যাল। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি মদ খাচ্ছি না। বরং মদ আমাকে ধীরে ধীরে রিকনস্ট্রাক্ট করছে। যেন কোনও পুরনো বিল্ডিং, যেটা ভেঙে পড়ছিল, এখন নতুন করে ভেতর থেকে রিনোভেট হচ্ছে—তবে প্ল্যান ছাড়া। একবার এক ছাত্র আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
‘স্যার, ইউ আর নট ফিলিং ওয়েল?’ আমি বলেছিলাম, ‘না। আমি শুধু একটু বেশি ফিলিং ফিল করছি।’ সে বুঝতে পারেনি। আমি ওকে দোষ দিই না। বুঝে ফেলাটা সবসময় সুবিধাজনক জিনিস নয়। আর গ্লাসের এই উষ্ণ জ্বালাটা? এটা অন্তত কোনও মিথ্যে ডায়াগনোসিস দেয় না। এখানে কোনও হাসপাতালের মতো সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেই, কোনও কাউন্সেলরের সান্ত্বনাও নেই। এটা শুধু শরীরকে জানায়—তুমি এখনও ফাংশন করছ, যদিও খুব দক্ষভাবে না। আমি, এই জ্বালাটাকে প্রায় একটা ইন্টেলিজেন্ট অবজারভার ভাবি। যেন ভেতরের কোনও ছোট ল্যাব টেকনিশিয়ান চুপচাপ রিপোর্ট লিখে যাচ্ছে—‘পেশেন্ট: স্টিল নট কমপ্লিটলি লস্ট। বাট ডিরেকশনাল ক্ল্যারিটি ইজ সাসপিশাস।’ আমি চুমুক দিই, আর গলায় যে উষ্ণতা নামে, সেটা যেন কোনও ভুলে যাওয়া শহরের আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো। আলো নেই, ম্যাপ নেই, তবু চলতে হচ্ছে। কখনও মনে হয়, এই জ্বালাটা কোনও থেরাপি নয়, বরং একটা মিনিমালিস্ট ফিলোসফি। খুব কম কথা বলে, কিন্তু একদম ঠিক জায়গায় আঘাত করে। এটা বলে না তুমি হ্যাপি না স্যাড। এটা বলে—তুমি এখনও কনফিগারড। অদ্ভুত লাগে, বয়স বাড়লে মানুষ ফিলিংস বোঝার জন্য বড় বড় শব্দ খোঁজে, আর অ্যালকোহল এসে সব শব্দকে ছোট করে দেয়। এক লাইনে নামিয়ে আনে—‘তুমি আছো।’ আমি মাঝে মাঝে হেসে ফেলি। কারণ এই জ্বালাটা এত সৎ যে, সেটা কোনও ধর্ম, কোনও মতাদর্শ, এমনকি কোনও সাইকিয়াট্রিক রিপোর্টকেও পাত্তা দেয় না। মনে হয়, আমি যেন একটা পুরনো লাইব্রেরির বই, যেটা কেউ ক্যাটালগ থেকে ডিলিট করে দিয়েছে, কিন্তু শেলফ থেকে সরাতে ভুলে গেছে। তাই আমি এখনও আছি—অফিসিয়ালি না, কিন্তু ফিজিক্যালি। আর এই ‘হারিয়ে যাইনি’ কথাটাও কেমন সন্দেহজনক লাগে। যেন কেউ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বলছে—‘আমি এখানে আছি,’ কিন্তু কেউ শুনছে না, তবু সে চেঁচানো বন্ধ করছে না। আমি, এই অবস্থাটাকে কখনও কখনও খুব হালকা মেজাজে দেখি। ভাবি—হারিয়ে না যাওয়াটাও একটা ইনকমপ্লিট প্রজেক্ট। তারপর আরেকটা চুমুক দিই। কারণ কিছু ইনকমপ্লিট প্রজেক্টও চালিয়ে যেতে হয়—বিশেষ করে রাতগুলোতে, যখন পৃথিবী নিজেই নিজের লগআউট ভুলে যায়।
এবং মানুষের সেই অসহ্য তৎপরতা—ওহো, হো, কী ভীষণ ক্লান্তিকর! যেন সবাই কোথাও পৌঁছতে চাইছে, অথচ কেউ জানে না সেই ‘কোথাও’ আসলে কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ে। মেট্রোয় উঠলেই দেখি, প্রত্যেক মুখে এক ধরনের আতঙ্কিত তাড়া। যেন ট্রেনটা শুধু গন্তব্যে যাচ্ছে না—সঙ্গে সঙ্গে সময়ের বিরুদ্ধে একটা ছোটখাটো যুদ্ধও চালাচ্ছে। কেউ লিঙ্কডইন আপডেট করছে, আঙুলের ভেতরে ভবিষ্যৎকে একটু পালিশ করে নিচ্ছে। কেউ মোটিভেশনাল পডকাস্ট শুনছে, যেন কানে ঢুকলেই জীবন হঠাৎ করে এক্সপোর্ট-রেডি হয়ে যাবে। কেউ ফোনে বলছে—
‘না না, আই অ্যাম অন ইট… আই অ্যাম ওয়ার্কিং অন ইট…’ এই ‘ইট’টা কী, কেউ জানে না। কিন্তু সবাই কোনও না কোনও অদৃশ্য ইট-এর ওপর দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করছে—যেন জীবনটা একটা কনস্ট্রাকশন সাইট, আর আমরা সবাই অস্থায়ী শ্রমিক। আমি ভাবি, কীসে ‘ওয়ার্কিং অন ইট’? জীবনটা কি কোনও পেনডিং প্রোজেক্ট? নাকি একটা ভুলে যাওয়া সফটওয়্যারের মতো, যেটা আপডেটের নামে শুধু আরও একটু ধীরে চলতে শিখছে? আমি, এই প্রশ্নটা ভাবলেই নিজের ভেতরে একটা অদ্ভুত হাসি খুঁজে পাই। কারণ বয়স হলে মানুষ প্রশ্ন করে না আর উত্তরও খোঁজে না—শুধু প্রশ্নটার ধুলো ঝাড়ে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আধুনিক সভ্যতা আসলে একটা বিশাল এসকেলেটর। সবাই ভাবছে ওপরে উঠছে, অথচ তারা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। শুধু হাঁপাচ্ছে বেশি। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হল—এসকেলেটরটা নাকি ‘মুভিং আপওয়ার্ড’ বলেই পরিচিত, তাই কেউ থামতেও লজ্জা পায়। আমি এই দৃশ্যটা কল্পনা করি—মানুষ দাঁড়িয়ে আছে একেকটা স্টেপে, হাতে ল্যাপটপ, কানে হেডফোন, চোখে ভবিষ্যতের গ্লো। আর এসকেলেটরটা খুব শান্তভাবে চলেছে, যেন বলছে—‘আপনারা আমাকে দোষ দেবেন না, আমি তো শুধু ডিজাইন অনুযায়ী চলছি।’ কখনও মনে হয়, এই এসকেলেটর আসলে একটা সার্কুলার টাইম-লুপ। আপনি যত ওপরে যাচ্ছেন ভাবছেন, ততই নিজের আগের অবস্থানে ফিরে আসছেন—শুধু জুতোটা একটু বেশি পরিশ্রান্ত। আর আমি? আমি সাধারণত পাশে দাঁড়িয়ে দেখি। কখনও কখনও ভাবি উঠব। তারপর মনে হয়, উঠলে হয়তো একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারব— আমি কোথাও যাচ্ছি না, শুধু প্রোসেসিং হচ্ছে। একজন অফিস ড্রেস পরা লোক আমার পাশ দিয়ে হেঁটে গেল, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—‘আই অ্যাম রিয়ালি ওয়ার্কিং অন ইট…’ আমি তাকিয়ে ভাবলাম, এই ‘ইট’টা কি কোনও দিন ডেলিভারি হবে? নাকি এটা শুধু একটা কালেক্টিভ ফ্যান্টাসি, যেটা সবাই একসঙ্গে মেইনটেইন করে যাচ্ছে, যাতে এসকেলেটরটা বন্ধ না হয়ে যায়? মজার ব্যাপার হল, এসকেলেটরে কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হালকা ভয়ও পায়, কিন্তু নামতে চায় না। কারণ নামা মানে স্বীকার করা—আপনি কোথাও পৌঁছচ্ছেন না, আপনি শুধু একটা মুভিং ইলিউশনের ভেতরে আছেন। আমি তখন খুব ধীরে হাসি। হাসিটা প্রায় শব্দহীন। কারণ এই সভ্যতা এমন একটা জিনিস, যেখানে স্থবিরতাও এখন পারফরম্যান্সের অংশ। আমি, এই দৃশ্য দেখি আর মাঝে মাঝে ভাবি—মেট্রোটা কি সত্যিই মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি মানুষগুলো মেট্রোকে ব্যবহার করছে নিজেদের পালানোর ভানকে বৈধতা দিতে? ট্রেনের ভেতরে বাতাসটা কৃত্রিম ঠান্ডা। মনে হয়, এখানে আবেগগুলোকে এয়ার কন্ডিশন করা হয়েছে—খুব বেশি গরম হলে সিস্টেম অ্যালার্ট দেবে, খুব বেশি নীরব হলে কেউ সন্দেহ করবে। একজন লোক আমার পাশে বসে হঠাৎ স্ক্রল করতে করতে হেসে ফেলল। আমি তাকালাম। সে আমাকে না দেখে তার ফোনকে দেখছে, যেন ফোনের ভেতরে তার নিজেরই একটা উন্নত সংস্করণ বসে আছে। আমি ভাবলাম, এই শহরে মানুষ আর নিজের সঙ্গে থাকে না—সবাই নিজেরই প্রিভিউ ভার্সনের সঙ্গে কমপেয়ার করে বেঁচে আছে। আর আমি? আমি শুধু বসে থাকি। কারণ আমার গন্তব্য এখন আর লোকেশন নয়—একটা ধীর, অস্পষ্ট অবস্থা। মেট্রো এগোয়। ঘোষণা আসে—‘নেক্সট স্টেশন…’ কিন্তু আমি জানি, আসলে কেউই ‘নেক্সট স্টেশন’-এ নামে না। সবাই শুধু একটু দ্রুত নিজের ভেতরের স্টেশনের দিকে পিছিয়ে যায়।
ম্যায় অন্ধেরে মে বেঁঠকর উস হাঁফনে কি আওয়াজ সুনতা হুঁ।
দূর কহিঁ কোই মোটরবাইক গুজরতি হ্যায়।
কিসি কে টিভি পর নিউজ চ্যানেল কি চিল্লাহট।
কিসি ফ্ল্যাট মে থালি গির পরতি হ্যায়।
ফির একবার খামোশি।

এই নীরবতাটুকুর জন্যই বোধহয় আমি আলো নিভিয়ে বসে থাকি। আলো জ্বালালে পৃথিবী খুব আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে—সবকিছু দেখিয়ে দেয়, নাম দিয়ে দেয়, রায় দিয়ে দেয়। আমি সেই রায়ের আওতায় পড়তে চাই না। আমি, মনে করি আলো এক ধরনের খুব আগ্রাসী ভাষ্যকার। সে চুপ করে কিছু দেখে না—সে দেখামাত্রই ব্যাখ্যা করতে শুরু করে। আর নীরবতা তার ঠিক উল্টো—সে কিছুই ব্যাখ্যা করে না, শুধু থাকতে দেয়। কারণ পৃথিবী যখন কম দেখা যায়, তখন তার শব্দগুলো একটু স্পষ্ট শোনা যায়। তখন বোঝা যায়, শব্দ আসলে শব্দ নয়—তারা ছোট ছোট জীবন্ত সন্দেহ, যারা অন্ধকারে বেশি স্বচ্ছন্দে হাঁটে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, চোখ কি আসলে শোনার বিরোধী অঙ্গ? যত বেশি দেখি, তত বেশি শব্দ হারিয়ে যায়। আর যত কম দেখি, তত বেশি শব্দ নিজের আসল আকারে ফিরে আসে—একটু ভাঙা, একটু লাজুক, একটু সত্যি। ঘরের ভেতরে তখন শব্দগুলো আলাদা হয়ে দাঁড়ায়। ফ্রিজের হালকা গুঞ্জন একটা বৃদ্ধ মানুষের নিঃশ্বাসের মতো শোনায়। দূরের গাড়ির হর্ন মনে হয় কোনও ভুলে যাওয়া বাক্যের শেষ অংশ। আর দেয়ালের ভেতর দিয়ে যে সামান্য কম্পন আসে, সেটা যেন কোনও অদৃশ্য দর্শন-শিক্ষকের চুপচাপ বোর্ড মুছে দেওয়ার শব্দ। আমি চুপ করে বসে থাকি। খুব বেশি কিছু ভাবি না। বয়স হলে চিন্তা আর আগুনের মতো জ্বলে না—সে শুধু হালকা ধোঁয়া হয়ে ঘরের ভেতরে ঘুরতে থাকে। মাঝে মাঝে নিজেকে দেখি, যেন আমি কোনও পরীক্ষাগারের নমুনা। লেবেলে লেখা—‘সিভিলাইজড মেলানকোলিক হিউম্যান (আংশিকভাবে স্থিতিশীল)’। পাশে ছোট্ট নোট—‘নিয়মিত অন্ধকারে রাখলে পর্যবেক্ষণ সহজ হয়।’ আমি হাসি। খুব ছোট হাসি। কারণ বিজ্ঞান যখন নিজের বিষয়কে নিয়ে রসিকতা করে, তখনই বোঝা যায় সে আর খুব নিশ্চিত নেই। আর সত্যি বলতে কী, আলো জ্বালালে ঘরটা একটা সংবাদপত্র হয়ে যায়—প্রতিটা জিনিস শিরোনাম চায়। নীরবতা থাকলে ঘরটা আবার গল্পে ফিরে যায়, যেখানে কিছুই নিশ্চিত নয়, কিন্তু সবকিছু শোনা যায়।
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না:
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নীচে।

এই কথাগুলো বলতে বলতে কখনও কখনও আমার গলা জড়িয়ে আসে। বোঝা যায় না মদের জন্য, না বয়সের জন্য। গলা যেন নিজেরই বিরুদ্ধে ছোট্ট একটা বিদ্রোহ শুরু করে দেয়— খুব নরম, খুব ভদ্র। জীবনানন্দ লিখেছিলেন কথাগুলো। নাকি আমিই লিখেছিলাম অন্য কোনও জন্মে—ঠিক মনে থাকে না। বয়স বাড়লে লেখকেরা আর বাইরের মানুষ থাকেন না; তাঁরা ধীরে ধীরে স্মৃতির ভেতরে ঢুকে পড়েন, আর আমি বাইরে থেকে শুধু সেই পাণ্ডুলিপিটা পড়ে যাই। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি আসলে কোনও দর্শনের অধ্যাপক ছিলাম না। আমি ছিলাম একটা ভুল টাইমজোনে জন্মানো ফুটনোট, যাকে মূল টেক্সট কখনও ডাকে না, তবু সে পৃষ্ঠার নিচে বেঁচে থাকে। এই কবিতাটা আমি হিন্দি-উর্দু মিশিয়ে আমার মতো করে ভাষান্তর করার চেষ্টা করেছি।
ম্যায় ইত্তনা জলদি কহীঁ ভি পহুঁচনা নেহি চাহতা;
মেরি জিন্দেগি জাহাঁ চাহে ওহাঁ আহিস্তা আহিস্তা চল কর পহুঁচনে কা ওয়াক্ত হ্যায়,
অউর পহুঁচ কর বহুত দের তক বৈঠে রেহনে অর ইনতেজার করনে কা ফুরসত ভি হ্যায়।
জিন্দেগি কি মুখতলিফ অর হেয়ারত-অ্যাঙ্গেজ কামিয়াবিয়োঁ কি জোশ
দুসরে সব লোগ উঠায়ে ফিরেঁ; মুঝে ইস কি জরুরত নেহি:
ম্যায় এক গভীর তোর পর রুকা হুয়া ইনসান হুঁ
শায়েদ ইস নও সাদি মে
তারোঁ কি ছাঁও মে।

এই অনুবাদটা বলতে বলতে আমার মনে হল, ভাষাগুলো আসলে আলাদা নয়—শুধু ক্লান্তির উচ্চারণ বদলে যায়। শব্দগুলো শুধু পোশাক বদলায়, ক্লান্তি কিন্তু একই থাকে—একই পুরনো, একই রকম ভদ্রভাবে ক্লান্ত। আমি, কখনও কখনও ভাবি—আমি কি সত্যিই হাঁটছি, নাকি পৃথিবী নিজেই আমার চারপাশে খুব ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে? যেন আমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, আর শহরটা আমাকে চারপাশ থেকে ক্রমশ সরিয়ে নিচ্ছে, বিনা শব্দে, বিনা নোটিসে। রাতে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে দেখি শহরটা খুব ধীরে শ্বাস নেয়। প্রতিটি শ্বাসে আলো জ্বলে, নেভে, আবার জ্বলে—একটা বিশাল ইনসমনিয়া আক্রান্ত প্রাণীর মতো। মনে হয়, এটা কোনও সভ্যতা নয়—একটা বিশাল ইনহেলেশন-এক্সহেলেশন মেশিন, যার ভেতরে আমি ভুল করে ঢুকে পড়েছি। কখনও মনে হয়, এই মেশিনটা আসলে একটা পুরনো হাসপাতালের মতো। যেখানে রোগী নেই, শুধু মনিটর আছে। আর মনিটরগুলো দেখাচ্ছে—‘লাইফ স্ট্যাটাস: অনির্ধারিতভাবে চলমান।’ আর মজার কথা হল—এই ‘অচল মানুষ’ হওয়াটাও এখন এক ধরনের পারফরম্যান্স। সবাই দৌড়াচ্ছে, তাই না দৌড়ানোটা নিজেই একটা স্টেটমেন্ট হয়ে গেছে। আমি এই স্টেটমেন্টটা নিয়ে খুব সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করি না। কারণ সিরিয়াস হলে সেটাও আবার একটা ট্রেন্ড হয়ে যাবে। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি আসলে থেমে নেই—আমি শুধু ভুল ডাইমেনশনে ধীরে চলছি। বাকিরা যাকে ‘ফরওয়ার্ড’ বলে, আমি হয়তো সেটাকে ‘সাইডওয়েজ এক্সিস্টেন্স’ হিসেবে ব্যবহার করছি। শহরটা তখন জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, যেন সে নিজেই জানে না সে আমাকে এগোতে দিচ্ছে, না আটকে রাখছে। শুধু তার নিঃশ্বাসের শব্দে বুঝি—সবাই চলছে, কিন্তু কেউ কোথাও পৌঁছচ্ছে না।
না, আমি কোনও ইম্পর্ট্যান্ট মানুষ নই। দর্শনের রিটায়ার্ড প্রফেসর। উত্তর কলকাতার একটা পুরনো কলেজে পড়াতাম। পাশ্চাত্য দর্শন—হেগেল, হাইডেগার, উইটগেনস্টাইন… মাঝে মাঝে নাগার্জুনও, মানে ইন্ডিয়ান লোকাল আপগ্রেডেড ভার্সন। এখন আর কেউ দর্শন পড়ে না। সবাই কমিউনিকেশন স্কিল শেখে। এটা বোধহয় বলেছি আগেও… না কি বলিনি? মেমরি এখন একটা লিকিং পাত্রের মতো, যেখান থেকে পুরনো বাক্যগুলো চুইয়ে চুইয়ে পড়ে যায়, আবার নতুন বাক্যের সঙ্গে মিশে যায়, আর আমি বুঝতে পারি না কোনটা কপি, কোনটা অরিজিনাল। এবং যোগাযোগ যত বেড়েছে, মানুষের ভেতরের নীরবতা তত অনুবাদহীন হয়ে গেছে। আগে নীরবতা ছিল ভাষার আগে, এখন নীরবতা শুধু একটা ‘নট রেসপন্সিং’ স্ট্যাটাস। মানুষের মধ্যে কথাবার্তা তত কমেনি—কথার ভেতর থেকে মানুষ কমে গেছে। এই যে আমি এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি—এটাও একরকম মাতলামি। খুব সিস্টেমেটিক মাতলামি, কিন্তু মাতলামিই। কারণ আমি নিশ্চিত না আমি ‘কথা বলছি’, নাকি শুধু নিজের ভেতরের ইকো চেক করছি। মদের গ্লাসে বরফ দিলে শব্দ হয়, শুনেছেন? টিক… টিক… আমি যখন শুনি, মনে হয় বরফ নয়, সময় ছোট ছোট ক্র্যাক হয়ে যাচ্ছে। টাইম এখন আর লাইন নয়—একটা ভাঙা কাচ, যার ভেতর দিয়ে অতীত একটু একটু করে গলে পড়ে। এটাও কি আগে বলেছি? হতে পারে। বা হয়তো আমি শুধু একই বাক্যকে আলাদা আলাদা রাতে রিহার্সাল করছি। আমি নিয়মিত মদ্যপান খাই। মদ্যপ শব্দটা সমাজ অপমান হিসেবে ব্যবহার করে। যেন তারা নিজেরা সোবার! যেন সারাদিন মোবাইল স্ক্রল করা, নির্বাচন নিয়ে চেঁচানো, আর অনলাইন ডিসকাউন্টে জীবন কাটানো কোনও নেশা নয়! মাঝে মাঝে মনে হয়, সোবার মানুষ মানে শুধু সেই মানুষ যারা নিজের নেশাটাকে সুন্দর নাম দিতে শিখেছে। আমি একবার এক ছাত্রকে বলেছিলাম—‘দ্যাখো, প্রত্যেক সভ্যতার একটা করে লিগ্যাল নেশা থাকে।’ সে বলেছিল, ‘স্যার, আপনার লিগ্যাল নেশাটা কী?’ আমি একটু ভেবে বলেছিলাম—এগজিস্টেন্স। সে হেসেছিল। আমিও হেসেছিলাম। কিন্তু ও বুঝতে পারেনি। বা আমি বুঝতে পারিনি ওকে বোঝানোর দরকার ছিল কি না—এই কথাটাও এখন ঠিক মনে নেই। কখনও কখনও মনে হয়, আমি কথা বলছি না—আমি শুধু বাক্যগুলোর মধ্যে হাঁটছি, আর মাঝপথে অন্য কোনও বাক্যে ঢুকে পড়ছি, যেন এই মস্তিষ্কটা একটা স্টেশন, যেখানে ট্রেনগুলো ঠিক লাইনে আসে না। খালিদ জাফরি, আমি, এই নামটা বললেও মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়—এটা কি আমি, নাকি আমি যে মানুষটাকে বহুদিন আগে পড়াতাম তার রিটায়ার্ড ভার্সন? বরফ আবার টিক করে ওঠে। আমি তাকাই। মনে হয় সময় নিজেই নিজের গ্লাসে ঢালা হচ্ছে, আর আমি শুধু একটু একটু করে সেটা পান করছি—বুঝে, না বুঝে, বা দুটোই না বুঝে।
আমি প্রায়ই রফি শুনি। বিশেষ করে রাত্তিরের দিকে। কখন শুনি ঠিক মনে নেই—কখনও গ্লাস হাতে, কখনও গ্লাসটা আমাকে হাতে ধরে। সময়ও এখন খুব লুজ কনসেপ্ট হয়ে গেছে, যেন সে নিজেই রিটায়ারমেন্ট চেয়ে বসে আছে। ‘লগতা নেহি হ্যায় দিল মেরা উজড়ে দয়ার মে…’ এই লাইনটা শুনলেই আমার মনে হয়, সিভিলাইজেশন আসলে এক দীর্ঘ উজাড় হওয়ার ইতিহাস। ঘর বানানো মানে এখানে সাময়িক দেরিতে ঘটে যাওয়া ধ্বংস। মানুষ প্রথমে ঘর বানায়, তারপর সেটাকে বাজার বানায়, তারপর বাজারটাকে নিউজ চ্যানেলে রূপান্তর করে, তারপর নিউজ চ্যানেলটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ফিরে আসে আবার ঘরে—একটা সার্কুলার ফার্নিচারের মতো, যেটা কখনও ফিক্সড হয় না, শুধু জায়গা বদলায়। আমি, এই সব ভাবতে ভাবতে মাঝেমাঝে ভুলে যাই আমি আসলে রফির কোন গানটা শুনছিলাম। কখনও ‘লগতা নেহি’ শুরু করি, মাঝপথে মনে হয় এটা তো কোনও পুরনো লেকচার নোট—হাইডেগার কোথাও বলেছিল কি না—তারপর আবার দেখি আমি আসলে গ্লাসে বরফ ফেলছিলাম, টিক… টিক… বরফের শব্দটা এখন রফির গলার সাথে মিশে যায়। মনে হয় প্রতিটা টিক একটা করে লাইন গাইছে—খুব ধীরে, খুব ক্লান্ত। যেন সময় নিজেই প্লেব্যাক মোডে আটকে গেছে। রফির কণ্ঠ আমার কাছে শুধু গান না। এটা একটা পুরনো শহরের ম্যাপ, যেখানে রাস্তাগুলো আর রাস্তায় যায় না—নিজেদের ভেতরেই ঘুরে ঘুরে আবার ‘উজড়ে দয়ার’ শব্দে ফিরে আসে। মাঝে মাঝে মনে হয়, রফি আসলে গান গাইছিলেন না—তিনি সিভিলাইজেশনের আন্ডারগ্রাউন্ড রিপোর্ট পড়ছিলেন। খুব শান্তভাবে, খুব ভদ্রভাবে, যেন বলছেন—‘দেখো, সবই ভাঙবে, কিন্তু সুন্দরভাবে ভাঙবে।’ আর আমি? আমি সেই রিপোর্ট শুনে হালকা হেসে ফেলি। হাসিটা খুব পরিষ্কার নয়—বরং একটু এলকোহলে ভেজা, একটু ভুল জায়গায় জন্মানো। কখনও মনে হয়, আমি গান শুনছি না—গানটাই আমাকে শুনছে। মনে হয় দরজাটা খুলে গেছে, কিন্তু আমি নই, অন্য কেউ ভেতরে ঢুকছে। আমার ভেতরের ঘরগুলোতে—যেগুলো একেকটা পুরনো লেকচার রুম, একেকটা খালি গ্লাস, একেকটা অর্ধেক-পোড়া সিগারেটের মতো অসমাপ্ত সন্ধ্যা—সে হাঁটছে। দরজা খুলে দেখছে, মাথা নাড়িয়ে যেন কোথাও নোট নিচ্ছে, তারপর আবার খুব ধীরে গাইছে—লগতা নেহি হ্যায় দিল মেরা উজড়ে দয়ার মে… আমি শুনি আর হঠাৎ মনে হয়—এই লাইনটা আমি নই, আমার পুরনো কলেজ বিল্ডিং বলছে। ছাদ থেকে চুন পড়ছে। ব্ল্যাকবোর্ডে এখনও আধমোছা চক—‘বিয়িং অ্যান্ড টাইম’—আর আমি ক্লাস নিচ্ছি উইটগেনস্টাইনের। ছাত্ররা নেই। শুধু চেয়ারের সারি বসে আছে, খুব মন দিয়ে শূন্যতা নোট নিচ্ছে। একটা চেয়ার হঠাৎ কঁকিয়ে বলে ওঠে, ‘স্যার, এই উজাড়টা কি মিডটার্মে আসবে?’ আমি হেসে ফেলি। হেসে আবার ভুলে যাই আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। কখনও মনে হয় ক্লাসরুমটা আসলে কবরখানা, আর চেয়ারগুলো মৃত থিওরির কবরফলক। কিস কি বনি হ্যায় আলম-এ-না-পায়েদার মে… আমি বলি—আলম-এ-না-পায়েদার? এটা তো আমার নিজের ফ্ল্যাটের ফ্লোরপ্ল্যান। দেয়ালগুলোও এখন স্থায়ী নয়, শুধু কনসেপ্ট। একটু জোরে শ্বাস নিলেই সরে যায়। আমি জানলার বাইরে তাকাই। শহরটা যেন একটা ভুল বানান, যেটা কেউ আর ঠিক করছে না কারণ সবাই ধরে নিয়েছে ভুলটাই এখন অফিসিয়াল ভার্সন। একটা টেবিল ল্যাম্প—পুরনো, অর্ধমৃত, গলা কাত হয়ে আছে যেন দর্শনের মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করেছে—ফিসফিস করে বলে, ‘স্যার, আমি কি রিয়াল না মেটাফর?’ আমি বলি, ‘তুই আগে লাইট দে, তারপর ডেফিনিশন দেব।’ ল্যাম্পটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আলো জ্বলে না। কিন্তু ঘরটা হঠাৎ একটু বেশি অসুস্থ দেখায়। বুলবুল কো বাগবান সে ন সায়্যাদ সে গিলা, কিসমত মে কাইদ থি লিখি ফসল-এ-বাহার মে… এই লাইনটা শোনার সময় পাখিটা কোথাও নেই, কিন্তু তার অভিযোগটা ঘরের সিলিং ফ্যানে ধুলো হয়ে ঘুরতে থাকে। আমি মনে করি, এই বুলবুল আসলে কোনও পাখি নয়—এটা একটা পুরনো স্টুডেন্ট, যে একদিন কমিউনিকেশন স্কিল ক্লাসে ঢুকে আর বের হয়নি। সে এখন দেয়ালে বসে আছে, টাই পরে, চোখের জায়গায় দুটো নোটিফিকেশন আইকন, আর ফিসফিস করে বলছে, ‘স্যার, বাগানটা কি এখন লিঙ্কডইনে আছে?’ আমি কিছু বলি না। শুধু গ্লাসে বরফ ফেলি। টিক… টিক… মনে হয় কাইদ এখন আর জেলখানা নয়, কাইদ এখন একটা সিভিলাইজেশনাল সাবস্ক্রিপশন প্ল্যান—অটো-রিনিউয়াল অন। উম্র-এ-দরাজ মাংগ কে লায়ে থে চার দিন… আমি হঠাৎ ভুলে যাই, চার দিন ছিল নাকি চার পেগ? সময় এখন খুব জেনারাস, নিজেকে বারবার রিফিল করে। দো আরজু মে কাট গয়ে, দো ইনতেজার মে… আহা, কী ভয়ংকর হিসেব! যেন জীবনটা কোনও মাতাল অ্যাকাউন্ট্যান্ট লিখে গেছে। একটা পুরনো ছাত্র এসে দাঁড়ায়। তার মুখটা নোটিফিকেশনের মতো ফ্ল্যাশ করে। সে বলে, ‘স্যার, আমি এখন ওয়ার্কিং অন ইট ফেজে আছি।’ আমি বলি, ‘আমি তো এখনও ইনট্রোডাকশন টু এক্সিস্টেন্স ফেজেই আটকে আছি।’ সে বোঝে না। আমি নিজেও ঠিক বুঝি না আমি সিরিয়াস না জোক করছি। নাকি দুটোই একই জিনিস হয়ে গেছে। কোন লাইনে ছিলাম? হ্যাঁ—কহ দো ইন হাসরাতোঁ সে কহিঁ অর জা বসে, ইতনি জাগা কাহাঁ হ্যায় দিল-এ-দাগদার মে… এই লাইনটা শোনার সময় আমার বুকের ভেতর একটা ফাঁকা লাইব্রেরি খুলে যায়। সব বুকশেলফ খালি। শুধু ধুলো, আর কিছু পুরনো বুকমার্ক—যেগুলো এমন বইয়ের ভেতরে ছিল, যেগুলো আমি কোনওদিন শেষ করতে পারিনি। ধুলোয় হাত দিলে মনে হয়, সময় গুঁড়ো হয়ে গেছে। আমি নিজেই বলি, ‘হাসরাত? ভাই, তোমরা একটু সাইডে বসো, আমি এখন নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছি না।’ একটা হাসরাত উত্তর দেয়, ‘স্যার, আমরা তো ট্যুরিস্ট, কোথাও জায়গা পাই না।’ আরেকটা বলে, ‘ওয়াই-ফাই আছে?’ আমি হেসে ফেলি। হাসিটা একটু কাশিতে ভেঙে যায়। হ্যায় কতনা বদনসিব জফর দাফন কে লিয়ে, দো গজ জমিন ভি না মিলি কূ-এ-ইয়ার মে… এই জায়গায় এসে খালিদ জাফরি, আমি, হঠাৎ বুঝতে পারি, জাফর আর জাফরি আলাদা কেউ নয়। আমরা দু’জনেই একই ভুল টাইমলাইনের বাসিন্দা, শুধু ভিন্ন ভাষায় নির্বাসন লিখেছি। বাহাদুর শাহ জাফর রেঙ্গুনে বসে লিখেছিলেন, আমি এখানে বসে শুনি—কলকাতার এক পুরনো ঘরে, যেখানে দেয়ালগুলো এখন আর ইতিহাস বহন করে না, শুধু ইকো বহন করে। মাঝরাতে মাঝে মাঝে মনে হয়, রেঙ্গুন আর কলকাতার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই—দুটোই সাম্রাজ্যের পরিত্যক্ত ওয়েটিং রুম। আমি গ্লাসটা তুলি। গ্লাস বলে, ‘স্যার, আপনি কি এখনও সাবজেক্ট?’ আমি বলি, ‘না হে, আমি এখন অবজারভেশনাল ডিস্ট্র্যাকশন… না না, ভুল বললাম… আমি একটা ফুটনোট, যাকে মূল টেক্সট বহু আগেই ডিলিট করে দিয়েছে, কিন্তু পেজ নাম্বরটা রয়ে গেছে।’ বরফ আবার টিক করে। গানটা শেষ হয় না। শুধু ফিরে ফিরে আসে। যেন পুরনো কোনও ভূত ভুলে গেছে সে মারা গেছে। আর আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, এই গান আমাকে শুনছে না, আমাকে আর্কাইভ করছে। যেন রফির গলার ভেতরে একটা পুরনো লাইব্রেরিয়ান বসে আছে, সে আমার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস ক্যাটালগ করে রাখছে, ‘মেলানকোলি, সেকশন বি। অসমাপ্ত জীবন, সেকশন ডি। মাতাল দর্শন, রেয়ার কালেকশন।’
আর অদ্ভুত ব্যাপার হল, এই উজাড় হওয়াটাই এখন আমার কাছে শান্তির মতো লাগে। যেন ধ্বংস আর বিশ্রাম একই রুমে একই সোফায় বসে আছে, কেউ কাউকে তাড়াচ্ছে না—বরং দু’জনেই খুব ভদ্রভাবে একে অপরের ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওরা দু’জনে খুব আস্তে আস্তে চা খাচ্ছে। কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। ধোঁয়াটা সোজা ওপরে না উঠে একটু ভেবে ভেবে উঠছে, যেন সেও নিশ্চিত নয় ঠিক কোন দিকে মিলিয়ে যাবে। আমি দূর থেকে বসে ওদের দেখি। ধ্বংসের গায়ে হয়তো পুরনো উলের সোয়েটার, কনুইয়ের কাছে ছেঁড়া। বিশ্রাম চুপ করে সিগারেট ধরিয়ে দিচ্ছে তাকে। এই দৃশ্যটা আমাকে অস্বস্তি দেয় না। বরং অদ্ভুতভাবে কমফর্টিং লাগে। হ্যাঁ, কমফর্টিং, এই শব্দটা আগে বলেছি নাকি? থাক। বয়স হলে মানুষ একই কথা বারবার বলে। কারণ নতুন কথাগুলো মনে রাখতে কষ্ট হয়, আর পুরনো কথাগুলো নিজেরাই ফিরে ফিরে আসে, ঠিক যেমন পুরনো প্রেমিকারা স্বপ্নে আসে—কিন্তু মুখটা স্পষ্ট দেখা যায় না, শুধু তাদের চলে যাওয়ার শব্দটা শোনা যায়। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমার ঘরটা আসলে একটা পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক ওয়েটিং রুম। পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই, শুধু নোটিফিকেশনটা এখনও পৌঁছয়নি। টেবিলের ওপর গ্লাস। বরফ ধীরে ধীরে গলছে। টিক… টিক… যেন সময় নিজের হাঁটু রিপেয়ার করতে করতে হাঁপিয়ে উঠছে। আর আমি বসে আছি। খালিদ জাফরি, অবসরপ্রাপ্ত দর্শনের অধ্যাপক, আংশিক অ্যালকোহলিক, আংশিক ফার্নিচার। কখনও মনে হয়, আমিও ওই সোফাতেই বসে আছি—ধ্বংসের পাশে। আমরা দু’জনে খুব বিনয়ের সঙ্গে নিজেদের ব্যর্থতার তুলনা করছি। ধ্বংস বলছে, ‘আমি কয়েকটা সভ্যতা শেষ করেছি।’ আমি বলছি, ‘আমি কয়েকটা সম্পর্ক।’ তারপর দু’জনেই চুপ। কারণ শেষ পর্যন্ত সংখ্যার চেয়ে শূন্যতাই বেশি ইমপ্রেসিভ। জানেন, সবচেয়ে অদ্ভুত কী? এই উজাড় হওয়ার মধ্যে একটা গৃহস্থালি ভাব আছে। যেন বহুদিন ব্যবহার করা রান্নাঘর। দেয়ালে হলুদের দাগ। পুরনো এক্সহস্ট ফ্যান। একটা ভাঙা ঘড়ি, যা ভুল সময় দেখিয়েও প্রতিদিন নিষ্ঠার সঙ্গে টিকটিক করে যাচ্ছে। আমি কখনও কখনও সেই ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ভাবি, হয়তো ঠিক সময় বলে কিছু নেই, শুধু বিভিন্ন ধরনের দেরি আছে। আমি কি আগে এই কথাটা বলেছি? হতে পারে। আমার স্মৃতি এখন পুরনো লাইব্রেরির ক্যাটালগ সিস্টেমের মতো। যে বই খুঁজছি সেটা পাওয়া যায় না, কিন্তু অদ্ভুত সব অপ্রাসঙ্গিক জিনিস বেরিয়ে আসে। যেমন হঠাৎ মনে পড়ে যায়, একবার এক ছাত্র আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘স্যার, হোপ কি দরকারি?’ আমি তাকে বলেছিলাম, ‘না। কিন্তু মানুষ খুব অভ্যাসের প্রাণী।’ সে ভেবেছিল আমি মজা করছি। আমিও ভেবেছিলাম। এখন আর নিশ্চিত নই। উজাড় হওয়ারও একটা অ্যাস্থেটিক আছে। একটা ক্লান্ত সৌন্দর্য। যেমন পুরনো সিনেমা হল, যেখানে আর সিনেমা চলে না, তবু সিটগুলো অন্ধকারে বসে থাকে, যেন দর্শকরা একটু পরেই ফিরে আসবে। আমার নিজের শরীরটাও এখন সেরকম লাগে। একটা প্রায়-বন্ধ থিয়েটার। হাঁটুর মধ্যে হালকা শব্দ হয় উঠলে। বুকের ভেতরে কখনও কখনও ফাঁকা করিডোরের মতো প্রতিধ্বনি। আর মজার কথা হল, ডাক্তাররা এগুলোকে এজ-রিলেটেড ইস্যু বলেন। কী ভদ্র শব্দ! যেন শরীর না, কোনও সফটওয়্যার আপডেট ধীরে ধীরে ক্র্যাশ করছে। আমি হাসি। তারপর কাশি। তারপর ভুলে যাই আমি হাসছিলাম না কাশছিলাম। বাইরে শহর চলছে। আলো জ্বলছে। মানুষ দৌড়চ্ছে। আর আমি বসে আছি সেই একই সোফার দিকে তাকিয়ে, যেখানে ধ্বংস আর বিশ্রাম এখনও পাশাপাশি বসে আছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওরা আমাকে হাত নেড়ে ডাকছে। খুব ভদ্রভাবে। যেন বলছে, ‘এসো খালিদ সাহেব, এতদিন তো দাঁড়িয়ে আছ… এবার একটু বসো।’
আমি, কখনও কখনও মনে করি আমি আসলে বসে নেই—আমি একটা ধীরে ভাঙতে থাকা সাম্রাজ্যের ভেতরে বসে আছি। যেখানে দেয়ালগুলো এখনও নিজেদের রয়্যাল পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু প্লাস্টারটা ইতিমধ্যে কবিতায় পরিণত হয়ে গেছে। এই যে গানটা, লগতা নেহি হ্যায় দিল মেরা উজড়ে দয়ার মে… এই লাইনটা শোনার সময় মনে হয়, এটা শুধু একজন মানুষের কণ্ঠ নয়—এটা একটা পতিত শহরের নিজের ভেতরকার এডিটোরিয়াল। যেন ধ্বংস নিজেই রিপোর্ট লিখছে—‘আমি এখানে আছি, কিন্তু আমি ঠিক সম্পূর্ণ নই, আমি শুধু ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছি।’ কোন কথাটা আগে বলছিলাম? বাহাদুর শাহ জাফর না ধ্বংসের সোফা? না কি সেই বুলবুল? বুলবুল তো আবার বাগানের কথা বলে… না, বাগান না—কবরের পাশের বাগান, যেখানে ফুলগুলোও বুঝে গেছে তারা এখন ডেকোরেশন নয়, সাক্ষী। বুলবুল কো বাগবান সে ন সায়্যাদ সে গিলা… এই লাইনটা শুনলে আমার মনে হয়, পাখিটা আসলে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে না—সে শুধু বলছে, ‘আমি যেখানে ছিলাম, সেখানকার মানচিত্রটাই বদলে গেছে।’ আর আমি? আমি মাঝে মাঝে ভুলে যাই আমি এই গানটা শুনছি নাকি গানটাই আমাকে শুনছে। বরফ গলছে গ্লাসে, টিক… টিক… যেন সময় তার নিজের কোর্টে সাক্ষ্য দিচ্ছে। আমি, এই জায়গায় এসে একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পাই বাহাদুর শাহ জাফরের সঙ্গে। তিনি রেঙ্গুনে বসে লিখেছিলেন—আমি কলকাতার এক পুরনো ঘরে বসে শুনি। দু’জনের মধ্যে পার্থক্য শুধু লোকেশন সার্ভিসের, যন্ত্রণা একই পুরনো সফটওয়্যার। তিনি লিখেছিলেন দো গজ জমিন। আমি ভাবি, আজকের দিনে সেই দো গজ জমিনও হয়তো ক্লাউডে ব্যাকআপ হয়ে গেছে, কিন্তু অ্যাক্সেস পারমিশন পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে মনে হয়, তিনি রাজ্য হারিয়েছিলেন, আমি হয়তো শুধু ডিরেকশন হারিয়েছি। তফাৎটা খুব টেকনিক্যাল, কিন্তু অনুভূতিটা একই—একটা ধীরে ধীরে কমতে থাকা সিগনাল। আর মজার ব্যাপার হল, এই উজাড় হওয়াটাকে আমি আর ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখি না। দেখি যেন একটা পুরনো ঘর, যেখানে ফার্নিচারগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের ইতিহাস খুলে রাখছে। আমি সেখানে বসে থাকি। কখনও রাজা, কখনও প্রফেসর, কখনও শুধু একজন ভুলে যাওয়া দর্শক। আর গানটা চলতে থাকে, যেন কেউ বলছে, ‘সবকিছু হারালেও, ভাষাটা অন্তত রয়ে যায়…একটু ক্লান্ত, একটু মাতাল, কিন্তু রয়ে যায়।’
ছোটবেলায় আমার বাবা আমাকে নিয়ে কলেজ স্ট্রিটে যেতেন। আমি তখন রোগা ছেলে। চশমা পরতাম। হাঁটার সময় কাঁধটা সামান্য কুঁজো হয়ে থাকত, যেন পৃথিবীর সমস্ত অপ্রয়োজনীয় বিষণ্নতা আগেভাগেই বইতে শুরু করেছি। কলেজ স্ট্রিট তখন আমার কাছে শহর নয়—একটা গোলকধাঁধা। পুরনো বইয়ের গন্ধে ভরা এক ধুলো-অন্ধকার মহাবিশ্ব, যেখানে প্রতিটা দোকান আসলে অন্য কারও অসমাপ্ত চিন্তার গুদামঘর। বাবা হাত ধরে হাঁটতেন। তাঁর আঙুলে সবসময় সিগারেটের হালকা গন্ধ থাকত। আজ এত বছর পরে বুঝি, মানুষের স্মৃতি আসলে মুখ মনে রাখে না, গন্ধ মনে রাখে। আমি মাঝে মাঝে এখনও পুরনো বই খুলে বাবার হাতের গন্ধ খুঁজি। পাই না। শুধু ধুলো পাই। আর ধুলোও এক ধরনের টাইম-ট্রাভেল, যদিও খুব লো-বাজেট। একবার পুরনো বইয়ের দোকানে একটা বই পেয়েছিলাম—দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাজ উইল অ্যান্ড রিপ্রেজেন্টেশন, শোপেনহাওয়ার। বইটা খুলে কিছুই বুঝিনি। শুধু মনে হয়েছিল, এই লোকটা নিশ্চয়ই খুব দুখী। এমন দুখী, যে আয়নার সামনে দাঁড়ালেও নিজের রিফ্লেকশনকে বিশ্বাস করত না। বইটার পাতাগুলো ছিল হলুদ, একটু স্যাঁতসেঁতে। মনে হয়েছিল বইটা নয়, একটা পুরনো অসুখ হাতে ধরে আছি। ‘নেবেন?’ দোকানদার বলেছিল। আমি বইটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, যেন ওটা আমাকে আগে থেকেই চিনত। পরে বুঝলাম, দর্শনের অর্ধেকই লেখা হয়েছে ঘুম না হওয়া মানুষের দ্বারা। বাকিটা লেখা হয়েছে যাদের প্রেম ভেঙেছিল, কিন্তু তারা সেটা নিয়ে সরাসরি কবিতা লিখতে লজ্জা পেয়েছিল। আমারও ঘুম কমে গিয়েছিল একসময়। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের পর। না না, শুধু রাজনীতি না… যদিও রাজনীতিও ছিল… ছিল টেলিভিশনের রঙ হঠাৎ বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠা, ছিল শহরের ভেতরে অদ্ভুত এক কাচের শব্দ, যেন কেউ অদৃশ্যভাবে পুরনো পৃথিবীটা ভেঙে নতুন একটা শপিং মল বসাচ্ছে। তখন রাত জেগে থাকতাম। জানলার বাইরে কুকুর ডাকত। দূরে কোথাও ট্রেন যেত। আর আমি শোপেনহাওয়ার পড়ার চেষ্টা করতাম, যদিও সত্যি বলতে কী, অনেক রাতে তাঁর ফিলোসফি আর আমার হুইস্কির গ্লাসের মধ্যে তফাৎ করা কঠিন হয়ে যেত। দুটোই খুব তিক্ত, দুটোই ধীরে ধীরে মানুষকে পৃথিবী থেকে আনসাবস্ক্রাইব করে। আমি মাঝে মাঝে বইয়ের মার্জিনে নোট লিখতাম। ‘লাইফ ইজ আ ব্যাডলি অর্গানাইজড ওয়েটিং রুম।’ ‘ডিজায়ার ইজ ইনসমনিয়ার আরেক নাম।’ একবার তো ঘুম না হওয়ার রাতে ভুল করে নিজের হাতেই আন্ডারলাইন করে লিখেছিলাম, ‘এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ’, তারপর সকালে উঠে মনে করতে পারিনি কোন অংশটা। বয়স বাড়লে মানুষ নিজেরই ফুটনোট হয়ে যায়। আর কলেজ স্ট্রিট… আহা, কলেজ স্ট্রিট! এখনও গেলে মনে হয় বইগুলো আর বিক্রি হচ্ছে না, বরং আশ্রয় চাইছে। পুরনো দর্শনের বইগুলো স্তূপ করে রাখা থাকে, যেন নির্বাসিত সম্রাটেরা। কান্ট, হেগেল, শোপেনহাওয়ার—সবাই ধুলোয় ঢাকা। মাঝে মাঝে মনে হয়, রাতের বেলা দোকান বন্ধ হলে ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলে। কান্ট খুব নিয়ম মেনে কথা বলেন। নীৎশে হঠাৎ টেবিল চাপড়ে ওঠেন। আর শোপেনহাওয়ার কোণায় বসে বিড়বিড় করেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম।’ আমি তখন ছোট। কিছুই বুঝতাম না। তবু অদ্ভুতভাবে মনে হত, এই বইগুলোর মধ্যে একটা ঠান্ডা, গভীর সমুদ্র লুকিয়ে আছে। আর আমি হয়তো ভুল করে তার ধারে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছি। বাবা বলতেন, ‘বই কিনলে সব বুঝতে হয় না।’ কী আশ্চর্য কথা। এখন মনে হয়, মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্যি। সব বুঝে ফেললে ভালোবাসা থাকে না, শুধু ইনভেন্টরি থাকে। কোন কথাটা আগে বলছিলাম? হ্যাঁ, ঘুম। আমার ঘুম কমে গিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে রাতগুলো বড় হতে লাগল। এত বড়, যেন ভোর আর আসতে চায় না। তখন মাঝে মাঝে মনে হত, পৃথিবীটা আসলে বিশাল একটা ইনসমনিয়া ওয়ার্ড। সবাই ঘুমের অভিনয় করছে। শুধু কিছু মানুষ—দর্শনের অধ্যাপক, ব্যর্থ প্রেমিক, রাতজাগা কবি, ট্যাক্সি ড্রাইভার, আর অ্যালকোহলিকরা—চুপ করে বুঝতে পারছে, আসলে আলো নিভলেও পৃথিবীর মাথার ভেতরের শব্দ বন্ধ হয় না। বরং অন্ধকার হলেই শব্দগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেন দিনের বেলায় তারা পর্দার আড়ালে ছিল, আর রাত নামলেই একে একে স্টেজে উঠে আসে। কেউ পুরনো অপমান ঘষে বাজায়, কেউ অসমাপ্ত কথোপকথন রিহার্সাল করে, কেউ মৃত মানুষের কণ্ঠ নকল করে। আমি বহু রাতে শুয়ে শুয়ে শুনেছি, আমার নিজের মাথার ভেতরে যেন একটা খালি রেলস্টেশন কাজ করছে। ট্রেন আসে। থামে না। শুধু ঘোষণা শোনা যায়, ‘অ্যাটেনশন প্লিজ, আপনার অনুশোচনা প্ল্যাটফর্ম নম্বর তিনে এসে পৌঁছেছে।’ তারপর হালকা স্ট্যাটিক। তারপর নীরবতা। আবার বরফের শব্দ। টিক। আমি কখনও কখনও সন্দেহ করি, ইনসমনিয়া আসলে অসুখ নয়—এটা একটা গোপন ক্লাব। পৃথিবীর ক্লান্ততম মানুষদের আন্ডারগ্রাউন্ড মিটিং। সেখানে সবাই চোখের নীচে কালি পরে আসে। কেউ কারও দিকে বেশি তাকায় না। শুধু ধীরে ধীরে সিগারেট জ্বালায়। আর আশ্চর্যের ব্যাপার, রাত তিনটের পরে সমস্ত দার্শনিকের মুখ একরকম লাগে। কান্ট, কিয়ের্কেগার্ড, আমার পাশের ফ্ল্যাটের বিবাহবিচ্ছিন্ন ব্যাঙ্ককর্মী—সবাইকে তখন মনে হয় একই দীর্ঘ করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। একবার এক ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে বলেছিল, ‘সাহেব, রাতের কলকাতায় সব লোকই একটু ভূত।’ আমি বলেছিলাম, ‘দিনের কলকাতায় তারা শুধু টাই পরে।’ সে এত জোরে হেসেছিল যে সিগারেটটা প্রায় স্টিয়ারিংয়ে পড়ে যাচ্ছিল। তারপর হঠাৎ চুপ। কারণ গভীর রাতে মানুষ হাসলেও, হাসির ভেতরে একটা খালি চেয়ার থেকে যায়। আমি নিজেও অনেক রাতে আয়নার দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়েছি। মুখটা নিজের লাগে না। মনে হয়, বহুদিন ধরে না-ঘুমোনো একজন লোক আমার মুখ পরে বসে আছে। সে আমাকে খুব মন দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। যেন আমি একটা ফেল করা এক্সপেরিমেন্ট। আর মজার কথা কী জানেন? সকালে সবাই আবার খুব নরমাল হয়ে যায়। দাঁত মাজে। অফিস যায়। গুড মর্নিং বলে। যেন রাতের সেই গোপন মানসিক ভূমিকম্প কিছুই হয়নি। সভ্যতা বোধহয় এই কারণেই টিকে আছে—মানুষ অভিনয়ে অসাধারণ। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, ঘুম আসলে ছোটখাটো মৃত্যু নয়; বরং মৃত্যু হল বিশাল একটা ঘুম, যেখানে অবশেষে নোটিফিকেশন বন্ধ হয়। কিন্তু আমার মতো লোকদের দেখে মনে হয়, মৃত্যুও হয়তো বলবে, ‘স্যার, ইউ আর স্টিল ওভারথিংকিং।’ কোন কথাটা আগে বলছিলাম? হ্যাঁ, শব্দ। পৃথিবীর মাথার ভেতরের শব্দ। আমি নিশ্চিত, শহরগুলোরও ইনসমনিয়া হয়। রাত চারটের দিকে বহুতলগুলোকে দেখলে মনে হয়, তারা ঘুমোয়নি—শুধু চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। জানলার ফাঁক দিয়ে নীল আলো বেরোয়। যেন প্রতিটা ফ্ল্যাটের ভেতরে ছোট ছোট অ্যাকোয়ারিয়ামে মানুষ রাখা আছে। তারা স্ক্রল করছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। নিজেদের নিঃসঙ্গতাকে ওয়াই-ফাই দিয়ে আপডেট করছে। আর আমি বসে আছি, গ্লাস হাতে, খালিদ জাফরি, অবসরপ্রাপ্ত দর্শনের অধ্যাপক, আংশিক মানুষ, আংশিক রাতজাগা ফার্নিচার। কখনও মনে হয়, আমার চেয়ারটাও ঘুমোয় না। আমি উঠলে সে ধীরে কঁকিয়ে ওঠে, যেন বলছে, ‘স্যার, আজও না?’ তারপর বরফ আবার টিক করে। আর সেই টিক শব্দটার মধ্যে আমি মাঝে মাঝে পুরো সভ্যতার ইসিজি শুনতে পাই।
আচ্ছা, বাই দ্য ওয়ে, আপনি কি খেয়াল করেছেন, পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে ‘অপেক্ষা’ জিনিসটা একেবারে উঠে গেছে? আগে প্রেমপত্র আসত। এখন নোটিফিকেশন আসে। আগে মানুষ জানলার ধারে বসে থাকত। এখন চার্জারের ধারে। আর এই পরিবর্তনটা এত ধীরে হয়েছে যে কেউ ঠিক শোকও পালন করতে পারেনি। যেন একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল, পৃথিবীর সব জানলা বদলে ইউএসবি পোর্ট হয়ে গেছে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি যুদ্ধ নয়—লো ব্যাটারি অ্যাংজাইটি। এখনকার মানুষ প্রেমে পড়ার আগেও চার্জ পার্সেন্টেজ দেখে নেয়। ‘আই লাভ ইউ’ বলার আগে পাওয়ার ব্যাঙ্ক আছে কি না চেক করে। আমি এক ছাত্রকে একদিন দেখেছিলাম, প্রেমিকা ব্রেক-আপ করছে আর সে মাঝখানে বলছে, ‘একটু দাঁড়াও, ফোনটা টু পার্সেন্টে।’ মেয়েটা কাঁদছিল। ছেলেটা চার্জার খুঁজছিল। সভ্যতা এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। আর আমি, খালিদ জাফরি, অবসরপ্রাপ্ত দর্শনের অধ্যাপক, বসে বসে এই সব দেখি আর মাঝে মাঝে মনে হয়, শোপেনহাওয়ার যদি আজ বেঁচে থাকতেন, উনি হয়তো ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাজ ব্যাটারি অ্যান্ড নোটিফিকেশন’ লিখতেন। কোন কথাটা বলছিলাম? হ্যাঁ, অপেক্ষা। আগে অপেক্ষার একটা শারীরিকতা ছিল। পোস্টম্যানের সাইকেলের ঘণ্টা শুনলে বুক ধক করে উঠত। এখন ফোন ভাইব্রেট করলেই মানুষ এমন ছুটে যায় যেন হৃদপিণ্ড তাকে ইমার্জেন্সি মিটিংয়ে ডাকছে। আগে জানলার পাশে বসে বৃষ্টি দেখা যেত। এখন মানুষ ওয়েদার অ্যাপ দেখে। বৃষ্টিরও এখন ডিজিটাল টুইন তৈরি হয়েছে। আসল বৃষ্টি নামার আগেই তার নোটিফিকেশন এসে যায়। কী ভয়ংকর! প্রকৃতিও এখন নিজের স্পয়লার দিয়ে দেয়। আমি মাঝে মাঝে গভীর রাতে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে থাকি। অভ্যাসবশত। যদিও জানি, কেউ আসবে না। তবু দাঁড়িয়ে থাকি। কারণ শরীর কখনও কখনও স্মৃতির থেকেও বেশি পুরনো। আমার মনে হয়, মানুষের হাড়ের ভেতরেও অপেক্ষা জমে থাকে। বিশেষ করে যারা প্রেমে ব্যর্থ হয়েছে, বা দর্শন পড়িয়েছে, বা শেষ ট্রাম মিস করেছে। একবার এক মহিলা আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনি রিপ্লাই দিতে এত দেরি করেন কেন?’ আমি বলেছিলাম, ‘আমি পুরনো মডেলের মানুষ। আমার ইমোশনাল সফটওয়্যার এখনও পোস্টাল সিস্টেমে চলে।’ উনি হাসেননি। এখনকার মানুষ জোকও সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে চায়। যেন হিউমরেরও ইনস্ট্যান্ট ডেলিভারি দরকার। অথচ অপেক্ষা ছাড়া কোনও গভীর জিনিস তৈরি হয় না। ভালো ওয়াইন, ভালো সাহিত্য, ভালো বিষণ্নতা, সবকিছুরই সময় লাগে। এখনকার দুঃখগুলোও খুব তাড়াহুড়োর। পাঁচ মিনিট কাঁদে, তারপর রিল স্ক্রল করে। আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি, পুরনো সব প্রেমপত্ররা একটা পরিত্যক্ত পোস্ট অফিসে জমে আছে। ধুলো পড়ছে তাদের গায়ে। তারা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে, ‘আমাদের কেউ আর খোলে না।’ একেকটা খাম যেন ছোট ছোট কফিন। ভেতরে ভাঁজ করা হৃদস্পন্দন। আর এদিকে মানুষ সারাদিন ‘সিন’ হয়ে যাওয়ার ভয় নিয়ে বেঁচে আছে। আহা, কী অদ্ভুত! আগে মানুষ ভয় পেত প্রত্যাখ্যানকে, এখন ভয় পায় ব্লু টিককে। সভ্যতা সত্যিই অনেক দূর এগিয়েছে। না কি পিছিয়েছে? আমি ঠিক বুঝতে পারি না। মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীটা এখন একটা বিশাল চার্জিং স্টেশন। সবাই দেওয়ালে ঝুলে আছে, চোখে ক্লান্ত আলো। আর আত্মা? আত্মা বোধহয় অনেক আগেই এয়ারপ্লেন মোডে চলে গেছে।
আমি বিয়ে করিনি। কারণ আমি প্রেমে বিশ্বাস করতাম। এবং প্রেমে বিশ্বাস করলে বিয়ে করা কঠিন হয়ে যায়। বিয়ে ব্যাপারটা আমার সবসময় একটু সরকারি দপ্তরের মতো মনে হয়েছে—অনেক ফর্ম, অনেক সই, অনেক স্ট্যাম্প, আর শেষে দেখা যায় অনুভূতিটা ফাইলের নিচে চাপা পড়ে গেছে। প্রেম বরং ভূতের মতো। তার কোনও স্থায়ী ঠিকানা নেই। সে মাঝরাতে আসে, সিগারেট চুরি করে, বুকের ভেতরে কিছু আসবাবপত্র সরিয়ে রেখে চলে যায়। একজন ছিল অবশ্য। তার নাম এখন আর বলব না। নাম উচ্চারণ করলে ঘরের তাপমাত্রা বদলে যায়। বরফ একটু দ্রুত গলে। জানলার কাচে কুয়াশা জমে। সে একবার আমাকে বলেছিল, ‘তুমি সবকিছুকে খুব দূর থেকে দেখো।’ আমি বলেছিলাম, ‘দূরত্ব ছাড়া কোনও জিনিস স্পষ্ট দেখা যায় না।’ সে কেঁদেছিল। আমি সিগারেট ধরিয়েছিলাম। তারপর আমরা আর দেখা করিনি। অন্তত, অফিসিয়ালি করিনি। কারণ মাঝে মাঝে গভীর রাতে সে এখনও এই ঘরে ফিরে আসে। না না, আপনি যেটা ভাবছেন সেরকম ভূত নয়… যদিও নিশ্চিতও নই। বয়স বাড়লে স্মৃতি আর হন্টিং-এর মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হয়ে যায়। আজও কখনও কখনও মনে হয়, সে ঠিক আমার সামনের চেয়ারটায় বসে আছে। চুল ভেজা। বৃষ্টির গন্ধ। হাতে আমার পুরনো সোয়েটার। সে বলে, ‘তুমি এখনও এই ঘরটাকে এত অন্ধকার করে রাখো কেন?’ আমি বলি, ‘আলো জ্বাললে জিনিসগুলো অতিরিক্ত সত্যি হয়ে যায়।’ সে হেসে ফেলে। সেই হাসিটা এখনও আগের মতোই, অর্ধেক স্নেহ, অর্ধেক ক্লান্তি। আমি গ্লাসে মদ ঢালি। ‘তুমি এখনও সস্তার স্কচ খাও?’ সে বলে। ‘আমার ট্র্যাজেডি প্রিমিয়াম না,’ আমি বলি। তারপর হঠাৎ দেখি, সে উঠে বুকশেলফের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে। আঙুল বোলাচ্ছে ধুলোয়। যেন মৃত পাখির পালক ছুঁচ্ছে। একসময় ও আমার ঘাড়ে মুখ রেখে বই পড়ত। শোপেনহাওয়ার পড়তে পড়তে হঠাৎ বলেছিল, ‘এই লোকটার কখনও ভালোবাসা হয়নি, তাই না?’ আমি বলেছিলাম, ‘হয়েছিল বলেই এমন লিখেছে।’ তারপর আমরা চুমু খেয়েছিলাম। না না, একটু দাঁড়ান… তার আগে কি বৃষ্টি হচ্ছিল? নাকি পরে? আমি ঠিক মনে করতে পারি না। স্মৃতি এখন আমার মাথার ভেতরে মাতাল এডিটরের মতো কাজ করে। দৃশ্যগুলো কেটে কেটে ভুল জায়গায় বসিয়ে দেয়। কখনও দেখি সে আমার বিছানায় শুয়ে আছে, শাদা চাদরের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে চুল। জানলার বাইরে ট্রাম যাচ্ছে। সে বলছে, ‘খালিদ, তুমি কখনও পুরোপুরি এখানে থাকো না।’ আমি উত্তর দিইনি। কারণ তখন আমি সত্যিই কোথাও ছিলাম না। আমি তার কাঁধে হাত রেখেছিলাম, অথচ মনে হচ্ছিল অনেক দূরের কোনও গ্রহ ছুঁয়ে আছি। সে একবার আমার বুকে কান রেখে বলেছিল, ‘তোমার হার্টবিট শুনলে মনে হয় পুরনো ট্রেন যাচ্ছে।’ কী অদ্ভুত কথা! এখন মাঝরাতে নিজের বুকের শব্দ শুনলেও আমার তাই মনে হয়—ধীরে যাওয়া মালগাড়ি, ভেতরে বোঝাই নস্টালজিয়া। মাঝে মাঝে সে এই ঘরে হাঁটে। অথচ দরজা খোলার শব্দ হয় না। সে রান্নাঘরে গিয়ে জল খায়। ফিরে এসে বলে, ‘তুমি এখনও ঘুমোওনি?’ আমি বলি, ‘ইনসমনিয়া এখন আমার সঙ্গে লিভ-ইন করছে।’ সে হাসে। তারপর হঠাৎ খুব চুপ হয়ে যায়। এই চুপ হয়ে যাওয়াটাই ভয়ংকর। কারণ আমি বুঝতে পারি না, সে এখনকার নীরবতায় চুপ, না বহু বছর আগের কোনও ঝগড়ার ভেতরে। একবার আমরা খুব ঝগড়া করেছিলাম। সে বলেছিল, ‘তুমি মানুষকে অনুভব করো না, অ্যানালাইজ করো।’ আমি বলেছিলাম, ‘দুটো আলাদা?’ তারপর দীর্ঘ নীরবতা। তারপর সিগারেট। তারপর জানলার বাইরে কুকুর ডাকছিল। আজও মাঝে মাঝে সেই ডাক শুনতে পাই। যেন সময় আসলে কোথাও এগোয়নি। শুধু একই রাতকে বিভিন্ন পোশাক পরিয়ে আবার ফেরত পাঠাচ্ছে। আমি কখনও কখনও তাকে বলতে শুনি, ‘তুমি আমাকে ভালোবাসতে?’ আমি গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকি। বরফ গলে যাচ্ছে। টিক। টিক। আমি উত্তর দিই, ‘সমস্যা হল, আমি তোমাকে ভালোবাসতাম দর্শনের ছাত্রের মতো। খুব গভীরভাবে, কিন্তু সামান্য ভুল পদ্ধতিতে।’ সে মাথা নাড়ে। তারপর ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায়। না, না… পুরোটা না। তার পারফিউমটা থেকে যায়। আর বালিশের ওপর সামান্য চাপ। যেন একটু আগেই কেউ সেখানে শুয়ে ছিল। আমি তখন একা বসে থাকি। খালিদ জাফরি। অবসরপ্রাপ্ত দর্শনের অধ্যাপক। আংশিক মাতাল। আংশিক স্মৃতি। আংশিক ফার্নিচার। আর মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা সত্যিই আলাদা হয়ে যাইনি। আমরা শুধু একে অপরের ভেতরে ভূত হয়ে গেছি।
ফয়েজের একটা লাইন আছে, ‘ঔর ভি দুখ হ্যায় জমানে মে মহব্বত কে সিওয়া…’ বাংলা হরফে লিখলে কেমন যেন ঘরোয়া লাগে, না? যেন পৃথিবীর সমস্ত বিপ্লব, নির্বাসন, হারিয়ে যাওয়া প্রেম হঠাৎ উত্তর কলকাতার একটা পুরনো ড্রয়িংরুমে এসে বসেছে, সামনে স্টিলের গ্লাসে চা। উর্দু আসলে খুব একা ভাষা। যেন পুরনো আতরের গন্ধ। অথবা বহুদিন খোলা না-হওয়া কাঠের আলমারি, যার ভেতরে এখনও কারও শরীরের উষ্ণতা আটকে আছে। আমি মাঝে মাঝে মনে করি, উর্দু কোনও ভাষা নয়—এটা একটা ধীরগতির ক্ষত। উচ্চারণ করলেই একটু রক্ত বেরোয়। সে—হ্যাঁ, সেই মেয়েটা, নাম বলব না—একসময় আমার বুকের ওপর মাথা রেখে ফয়েজ শুনত। না না, শুনত না… আমার দিয়ে পড়িয়ে নিত। বলত, ‘তোমার গলায় উর্দু শুনলে মনে হয় কেউ মখমলের ভেতরে কাচ লুকিয়ে রেখেছে।’ কী আজব কথা! তখন বুঝিনি। এখন বুঝি। বয়স বাড়লে প্রশংসাগুলোও দেরিতে ডিকোড হয়। আজও মাঝে মাঝে গভীর রাতে মনে হয়, সে এই ঘরেই আছে। জানলার পাশে দাঁড়িয়ে। পর্দা সামান্য নড়ছে। অথচ হাওয়া নেই। সে ধীরে বলে, ‘লাইনটা আবার বলো তো…’ আমি গ্লাস হাতে বসে থাকি। বরফ গলে গেছে অনেকক্ষণ। তবু গ্লাসে কানে লাগালে এখনও টিক টিক শব্দ হয়। যেন সময় পুরো মরেনি, শুধু কোমায় আছে। আমি বলি, ‘ঔর ভি দুখ হ্যায়…’ সে হেসে বলে, ‘তুমি এই লাইনটা এমনভাবে বলো, যেন ব্যক্তিগতভাবে সব দুঃখের সঙ্গে তোমার আলাপ আছে।’ আমি বলি, ‘আছে তো। কিছু দুঃখ তো এখনও আমাকে ‘তুই’ বলে ডাকে।’ তারপর হঠাৎ দেখি, আমরা আবার সেই পুরনো ঘরে। কলেজ স্ট্রিটের কাছের ভাড়া বাড়ি। সিলিং ফ্যান ঘুরছে কষ্টে। বিছানায় বই ছড়ানো। ফয়েজ, রিলকে, জীবনানন্দ, আর মাঝখানে আমরা—দু’জন আধভাঙা মানুষ, যারা ভাবত সাহিত্য মানুষকে বাঁচাতে পারে। সে আমার শার্ট পরে জানলার ধারে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। আমি বলছি, ‘ধোঁয়াটা বাইরে ছাড়ো।’ সে বলছে, ‘ধোঁয়ারও তো একাকিত্ব আছে।’ তারপর আমরা হেসে ফেলছি। না কি কাঁদছিলাম? আমি ঠিক মনে করতে পারি না। স্মৃতি এখন খুব অবিশ্বাস্য ন্যারেটর। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে ভুল জায়গায় মিউজিক চালিয়ে দেয়। ফয়েজের লাইন চলতে থাকে মাথার ভেতরে। ‘ঔর ভি দুখ হ্যায়…’ আর আমি দেখি, ঘরের কোণায় বসে থাকা ছায়াগুলো ধীরে ধীরে মানুষ হয়ে উঠছে। একটার মুখ শোপেনহাওয়ারের, একটার বাহাদুর শাহ জাফরের, আর একটা… আমার নিজের। সে এসে আমার পাশে বসে। বলে, ‘খালিদ, তুমি এখনও প্রেমকে এত সিরিয়াসলি নাও?’ আমি বলি, ‘না। এখন প্রেমকে আমি পুরনো অসুখের মতো দেখি। আবহাওয়া বদলালেই ব্যথা করে।’ সে মাথা নাড়ে। তারপর হঠাৎ আমার গালে হাত রাখে। হাতটা ঠান্ডা। না কি আমার গালই গরম? আমি বুঝতে পারি না। সে খুব কাছে এসে ফিসফিস করে, ‘তুমি জানো, তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?’ আমি বলি, ‘লিভার?’ সে হেসে ওঠে। সেই হাসি এখনও একইরকম—সামান্য ক্লান্ত, সামান্য নিষ্ঠুর, সামান্য প্রেমে ভেজা। বলে, ‘না। তুমি সবকিছুকে মেটাফর বানিয়ে ফেলো। মানুষকেও।’ আমি প্রতিবাদ করতে যাই, কিন্তু হঠাৎ দেখি সে নেই। শুধু তার আতরের গন্ধ। আর অ্যাশট্রেতে আধখাওয়া সিগারেট। কী অদ্ভুত! কিছু সম্পর্ক চলে যাওয়ার পরেও ঘরে ছোট ছোট ফিজিক্যাল এভিডেন্স রেখে যায়। যেন প্রেম আসলে এক ধরনের ক্রাইম সিন। আমি গ্লাস তুলে শেষ চুমুক দিই। উর্দু শব্দগুলো ঘরের ভেতরে ভাসে। মহব্বত… দুখ… জমানা… শব্দগুলোকে তখন আর শব্দ মনে হয় না। মনে হয় পুরনো পাখি। ক্লান্ত। ধুলো মাখা। তারা উড়ে এসে বুকের মধ্যে বসে পড়ে। আর আমি, খালিদ জাফরি, অবসরপ্রাপ্ত দর্শনের অধ্যাপক, মাঝরাতে বসে বুঝতে পারি, কিছু ভাষা মানুষ শেখে না, মানুষ ধীরে ধীরে কিছু ভাষা হয়ে ওঠে।
যাক গে, প্রসঙ্গ পরিবর্তন করি। আমার একান্ত ব্যক্তিগত জিনিস আপনাদের সঙ্গে এভাবে শেয়ার করব কেন। এও এক ধরনের মাতলামি। মানুষ সাধারণত মদ খেয়ে যা লুকোয়, আমি বোধহয় উল্টোটা করি—ধীরে ধীরে খুলে বসি। যেন বুকের ভেতরে একটা পুরনো আলমারি আছে, আর প্রতিটা পেগের পর তার একটা করে ড্রয়ার খুলে যায়। না না, ওসব থাক। ব্যক্তিগত স্মৃতি খুব বিপজ্জনক জিনিস। ওগুলোকে বেশি বাতাসে রাখলে ছত্রাক ধরে। তারপর মাঝরাতে তারা নিজে নিজে হাঁটতে শুরু করে। আমি একবার দেখেছিলাম—না, সত্যি দেখেছিলাম কি না নিশ্চিত নই—আমার একটা পুরনো স্মৃতি রান্নাঘরে জল খাচ্ছে। পেছন ফিরে তাকাতেই অদৃশ্য। শুধু গ্লাসটা ভেজা। কী বলছিলাম? হ্যাঁ, প্রসঙ্গ পরিবর্তন। মানুষ বয়স বাড়লে কথোপকথনের মাঝখানে বারবার প্রসঙ্গ বদলায়। কারণ মস্তিষ্ক তখন আর সরলরেখায় হাঁটে না। বরং পুরনো শহরের গলির মতো হয়ে যায়। আপনি প্রেম নিয়ে কথা বলতে বলতে হঠাৎ আলুর দাম ভাবতে শুরু করেন, তারপর মৃত্যু, তারপর একটা পুরনো গান, তারপর মনে পড়ে যায় ক্লাস সেভেনে আপনার জ্যামিতির শিক্ষক কেন সবসময় দুঃখী দেখাতেন। আমি নিশ্চিত, স্মৃতিরও আর্থ্রাইটিস হয়। সে ঠিকমতো বাঁক নিতে পারে না। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমার মাথার ভেতরে একজন মাতাল এডিটর বসে আছে। সে ভুল দৃশ্য ভুল জায়গায় ঢুকিয়ে দেয়। আমি যখন দর্শন নিয়ে কথা বলতে চাই, তখন হঠাৎ কারও চুলের গন্ধ মনে পড়ে যায়। যখন প্রেমের কথা বলি, তখন ট্যাক্স রিটার্নের কথা মনে পড়ে। সভ্যতা বোধহয় এইভাবেই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে—বাইরে নয়, ভেতরে। সিনট্যাক্সের মধ্যে। আমি একবার ক্লাসে হেগেল পড়াতে পড়াতে হঠাৎ পাঁচ মিনিট ধরে কচুরির কথা বলেছিলাম। ছাত্ররা চুপ করে শুনছিল। পরে এক ছাত্র এসে বলল, ‘স্যার, ডায়ালেক্টিক্সের সঙ্গে কচুরির সম্পর্কটা…’ আমি বলেছিলাম, ‘সবকিছুর সঙ্গেই সবকিছুর সম্পর্ক আছে, যদি যথেষ্ট ক্লান্ত হও।’ সে লিখে নিয়েছিল। এইটাই ভয়ংকর। তরুণ বয়সে মানুষ অধ্যাপকদের খুব সিরিয়াসলি নেয়। অথচ অধিকাংশ অধ্যাপকই ভেতরে ভেতরে ভাঙা ছাতা। একটু হাওয়া এলেই উল্টে যাবে। যাক গে… আবার ব্যক্তিগত দিকে চলে যাচ্ছি। খেয়াল করেছেন? মাতাল মানুষ আর দার্শনিক—দু’জনেই একই ভুল করে। তারা ভাবে অন্যেরা তাদের মনোলগ শুনতে আগ্রহী। অথচ পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ আসলে শুধু নিজেদের ভেতরের আওয়াজ থেকে বাঁচতে চায়। তাই তারা টিভি চালায়। পডকাস্ট শোনে। মোটিভেশনাল ভিডিও দেখে। আমি মাঝে মাঝে ইউটিউবে সেই মোটিভেশনাল স্পিকারদের দেখি। তারা চেঁচিয়ে বলছে, ‘ইউ ক্যান ডু ইট!’ তাদের দাঁত এত শাদা যে মনে হয় টুথপেস্ট কোম্পানি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। আমি গ্লাস হাতে বসে ভাবি, ‘কী করবে?’ কেউ বলে না। শুধু করতে হবে। এই ‘করতে হবে’ ব্যাপারটাই আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে ক্লান্তিকর ধর্ম। আমি বরং কিছু না-করার মধ্যে গভীর আধ্যাত্মিকতা খুঁজে পাই। এই যে মাঝরাতে আলো নিভিয়ে বসে আছি, এটাও এক ধরনের সাইলেন্ট রেজিস্ট্যান্স। না কি ইলেকট্রিসিটির বিল বাঁচানো? আমি নিজেও নিশ্চিত নই। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার পুরো জীবনটাই ভুল কারণে ঘটে যাওয়া কিছু সঠিক সিদ্ধান্তের সমষ্টি। আমি বিয়ে করিনি—দর্শন পড়িয়েছি—মদ খেয়েছি—ঘুম কমিয়েছি—এবং শেষ পর্যন্ত এসে দেখলাম, আমার সবচেয়ে স্থায়ী সম্পর্ক একটা পুরনো কাঠের চেয়ার আর কয়েকটা আধভর্তি গ্লাসের সঙ্গে। তবু অদ্ভুতভাবে, এতে খুব ট্র্যাজিক কিছু নেই। বরং খানিক কমিক। স্যামুয়েল বেকেট যদি উত্তর কলকাতায় জন্মাতেন, উনিও বোধহয় এইরকম একটা ঘরে বসে বলতেন, ‘নাথিং টু বি ডান’—গ্লাসে তারপর বরফ ফেলতেন। টিক। আর সেই টিক শব্দটার মধ্যে আমি এখনও মাঝে মাঝে শুনতে পাই, পৃথিবী ক্লান্ত হয়ে নিজের ঘড়ি খুলে টেবিলের ওপর রেখে দিয়েছে।
আমার ছাত্ররা এখন বিদেশে। কেউ কর্পোরেট ট্রেইনার, কেউ মোটিভেশনাল স্পিকার। এক ছেলে তো টেড টক দেয়। আমি ওর ভিডিও দেখেছিলাম। সে বলছে—‘নেভার স্টপ হাস্লিং।’ আমি স্ক্রিন বন্ধ করে দিয়েছিলাম। হাস্ল মানে কী জানেন? সভ্যতার সবচেয়ে মার্জিত দাসত্ব। আগে মানুষের গলায় শেকল থাকত, এখন থাকে ব্লুটুথ ইয়ারফোন। আগে চাবুক ছিল, এখন আছে প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপ। মানুষ এখন নিজের ক্লান্তিকেও ক্যালেন্ডারে শিডিউল করে। ওই ছেলেটা—খুব শান্ত ছিল কলেজে। ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসত। হাইডেগার বুঝত না, কিন্তু মন দিয়ে শুনত। একদিন এসে বলেছিল, ‘স্যার, জীবনের মিনিং কী?’ আমি বলেছিলাম, ‘যেদিন বুঝবি, সেদিন টেনশন শুরু হবে।’ সে হেসেছিল। এখন সেই ছেলেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে চকচকে আলোয় বলছে, ‘ইউ হ্যাভ টু বিল্ড ইয়োর ব্র্যান্ড।’ ব্র্যান্ড! কী অদ্ভুত শব্দ। আগে মানুষ চরিত্র গড়ত, এখন ব্র্যান্ড গড়ে। আগে আত্মা ছিল, এখন পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং। আমি ভিডিওটা দেখতে দেখতে হঠাৎ মনে করলাম, ছেলেটা একবার পরীক্ষায় ফেল করেছিল। কাঁদছিল। আমি ওকে চা খাইয়ে বলেছিলাম, ‘ফেলিওর ইজ আ ভেরি আন্ডাররেটেড টিচার।’ এখন সে কোটি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সাফল্যের পাওয়ারপয়েন্ট চালায়। পাওয়ারপয়েন্ট… কী ভয়ের জিনিস! সভ্যতা বোধহয় ধীরে ধীরে বুলেট পয়েন্টে পরিণত হচ্ছে। মানুষ আর গল্পে ভাবে না। স্লাইডে ভাবে। ‘ফাইভ স্টেপস টু হ্যাপিনেস।’ ‘সেভেন হ্যাবিটস অফ হাইলি ইফেক্টিভ পিপল।’ যেন মানব-আত্মা একটা ভাঙা মিক্সার গ্রাইন্ডার, ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখলেই ঠিক হয়ে যাবে। আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি, দস্তয়েভস্কি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, উনিও হয়তো লিঙ্কডইনে পোস্ট দিতেন—‘হাউ সাইবেরিয়ান প্রিজন টট মি লিডারশিপ।’ আর নীচে হাজার হাজার লাইক। আহা, সভ্যতা সত্যিই অনেক দূর এসেছে। না কি গোল হয়ে ঘুরে আবার একই জায়গায় এসেছে? আমি ঠিক বুঝি না। আমার ওই ছাত্রের টেড টক-এ ব্যাকগ্রাউন্ডে নীল আলো ছিল। খুব চকচকে। সে হাত নেড়ে নেড়ে বলছিল, ‘ড্রিম বিগ।’ আমি তখন গ্লাসে বরফ ফেলছিলাম। টিক। মনে হল, এই শব্দটাই বেশি সত্যি। কারণ বরফ অন্তত গলে যাওয়ার কথা লুকোয় না। কিন্তু এই মোটিভেশনাল লোকগুলো… তারা এমনভাবে কথা বলে যেন মানুষ কখনও ভাঙে না। অথচ আমি ক্লাসে বছরের পর বছর দেখেছি—মানুষ ভাঙেই। খুব নীরবে ভাঙে। পরীক্ষার হলে ভাঙে। প্রেমে ভাঙে। বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনে ভাঙে। ভিড় মেট্রোয় দাঁড়িয়ে হঠাৎ ভাঙে। আর সবচেয়ে বেশি ভাঙে রাত দুটোয়, যখন মোবাইলের স্ক্রিন নিভে যায়। কিন্তু এইসব টক-এ কেউ ভাঙার কথা বলে না। সবাই শুধু ‘গ্রোথ’ বলে। ‘স্কেল’ বলে। ‘নেটওয়ার্ক’ বলে। যেন মানুষ কোনও স্টার্ট-আপ। আমি একবার ভুল করে একটা মোটিভেশনাল ভিডিও পুরো দেখেছিলাম। শেষে লোকটা বলল, ‘ইফ ইউ আর টাইয়ার্ড, কিপ গোয়িং।’ আমি তখন সত্যিই ক্লান্ত ছিলাম। এত ক্লান্ত যে মনে হচ্ছিল আমার আত্মাটাকেও কেউ ওভারটাইম করাচ্ছে। আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘না ভাই, আমি একটু বসব।’ তারপর টিভি বন্ধ। ঘর অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারের ভেতরে হঠাৎ দেখি, আমার পুরনো ছাত্ররা সার বেঁধে হাঁটছে। সবার গলায় আইডি কার্ড। চোখের নীচে কালি। তারা হাঁটতে হাঁটতে বলছে, ‘নেভার স্টপ হাস্লিং… নেভার স্টপ…’ যেন মন্ত্র। যেন আধুনিক যুগের জপ। আর দূরে কোথাও, খুব দূরে, একটা ক্লান্ত দেবতা ডেস্ক ল্যাম্পের নিচে বসে রেজিগনেশন লেটার লিখছে। আমি গ্লাস হাতে বসে ভাবি, হয়তো দাসত্ব কখনও শেষ হয়নি। শুধু ইউনিফর্ম বদলেছে। আগে মানুষ পিরামিড বানাত। এখন পিপিটি বানায়। আগে সম্রাটরা বলত, ‘আরও পাথর টানো।’ এখন কর্পোরেট বলে, ‘পুশ ইয়োর লিমিটস।’ ভাষা পালটেছে। হাঁপ ধরা একই আছে। আর আমি, খালিদ জাফরি, অবসরপ্রাপ্ত দর্শনের অধ্যাপক, মাঝরাতে বসে বুঝতে পারি—সভ্যতার সবচেয়ে সফল ট্রিক হল, সে মানুষকে এত ব্যস্ত রেখেছে যে তারা নিজেদের শেকলের শব্দ শোনার সময়ই পায় না।
একসময় মার্কস পড়তাম খুব। তারপর সিওরান। তারপর কামু। শেষে এসে দেখি, বুদ্ধই সবচেয়ে বিপজ্জনক কথা বলে গেছেন—সবকিছু অনিত্য। রাষ্ট্র অনিত্য। বিপ্লব অনিত্য। প্রেম অনিত্য। এমনকি আমাদের ক্ষতও অনিত্য। তাই হয়তো আমি আর খুব রাগ করতে পারি না। শুধু একটা দীর্ঘ ক্লান্তি কাজ করে। যেন বহুদিন ধরে কাঁধে অদৃশ্য একটা সভ্যতা বয়ে নিয়ে হাঁটছি। আগে ভাবতাম ইতিহাস আগুনের মতো—সব পুড়িয়ে নতুন কিছু তৈরি করবে। এখন মনে হয়, ইতিহাস আসলে পুরনো সিলিং ফ্যান। ঘুরছে। শব্দ করছে। কিন্তু বাতাস খুব কম দিচ্ছে। আমি কলেজে মার্কস পড়াতাম খুব উত্তেজনা নিয়ে। ‘হিস্ট্রি অফ অল হিথারটো এগজিস্টিং সোসাইটি…’ এই লাইন বলতে বলতে মনে হত, পৃথিবী সত্যিই বদলানো সম্ভব। ছাত্রদের চোখেও আগুন দেখতাম। তারপর বছর কেটে গেল। সেই ছাত্রদের কেউ ব্যাঙ্কে চাকরি নিল, কেউ রিয়েল এস্টেট, কেউ কর্পোরেট এইচআর। এক ছেলে একদিন আমাকে রাস্তায় দেখে বলল, ‘স্যার, আই হ্যাভ মুভড অন ফ্রম আইডিওলজি।’ কী ভয়ংকর বাক্য! যেন মতাদর্শ কোনও পুরনো গার্লফ্রেন্ড। আমি বলেছিলাম, ‘আইডিওলজি তোকে ছাড়েনি এখনও, শুধু ড্রেস বদলেছে।’ সে বুঝতে পারেনি। মানুষ সাধারণত নিজের খাঁচার ডিজাইন নিয়ে খুব উত্তেজিত থাকে। খাঁচা যে খাঁচাই, সেটা নিয়ে না। তারপর সিওরান এল। আহ্, সিওরান! এমনভাবে হতাশ হতে আমি আর কাউকে দেখিনি। উনি যেন নিদ্রাহীনতার ভেতরে বসে ভাষা দিয়ে ধীরে ধীরে আত্মহত্যা করতেন। আমি রাত জেগে ওঁকে পড়তাম। মনে হত, পৃথিবীর সব ঘড়ি বন্ধ হয়ে গেছে, শুধু সিওরানের বাক্যগুলো হাঁটছে। একবার এত রাত পর্যন্ত পড়েছিলাম যে ভোরে আয়নায় নিজের মুখ দেখে চমকে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল, আমার মুখে সামান্য ট্রানসিলভানিয়া জন্মেছে। তারপর কামু। সিগারেটের ধোঁয়া। অ্যাবসার্ড। সূর্যের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা একাকী মানুষ। দ্য মিথ অফ সিসিফাস পড়ার পর কয়েকদিন লিফটে উঠতে অস্বস্তি হত। মনে হত, পাথরটা এবার আমাকেই ঠেলতে হবে। কিন্তু শেষে এসে… শেষে এসে বুদ্ধ। শান্ত। প্রায় বিপজ্জনক রকম শান্ত। কী ভয়ংকর কথা—সবকিছু অনিত্য। প্রথম যখন বুঝলাম, আমার মনে হয়েছিল, এ তো সমস্ত সভ্যতার বিরুদ্ধে ঘোষিত নরম বোমা। কারণ মানুষ সবসময় স্থায়িত্বের অভিনয় করে। রাষ্ট্র বলে, ‘আমি চিরকাল থাকব।’ প্রেম বলে, ‘আমি কখনও বদলাব না।’ শরীর বলে, ‘আমি এখনও তরুণ।’ তারপর একদিন দাঁত নড়ে যায়। পতাকা বদলে যায়। প্রিয় মানুষ অন্য কারও পাশে ঘুমোয়। আর আয়নায় নিজের বাবার মুখ দেখা যায়। আমি তখন আর রাগ করতে পারি না। সত্যিই পারি না। রাগ এখন আমার কাছে একটু পুরনো ফ্যাশনের আবেগ লাগে। যেমন ভিক্টোরিয়ান যুগের ভারী পর্দা। আমি শুধু ক্লান্ত হই। দীর্ঘ, মহাজাগতিক ক্লান্তি। যেন জন্মের আগেও আমি একটু ক্লান্ত ছিলাম। মাঝে মাঝে মনে হয়, বুদ্ধ আসলে প্রথম মানুষ যিনি বুঝেছিলেন—মানবসভ্যতা একটা বিশাল ওয়েটিং রুম। সবাই টোকেন হাতে বসে আছে। কেউ প্রেমের ডাকের অপেক্ষায়, কেউ বিপ্লবের, কেউ মৃত্যুর। আর দেয়ালে টাঙানো টিভিতে সারাক্ষণ মিউট করা খবর চলছে। আমি একবার মদ খেয়ে বুদ্ধের একটা ছোট মূর্তির সঙ্গে তর্ক করছিলাম। সত্যিই। বুকশেলফের ওপর রাখা ছিল। আমি বললাম, ‘সব অনিত্য হলে এত কষ্ট কেন?’ মূর্তিটা অবশ্য কিছু বলেনি। কিন্তু তার মুখের হাসিটা একটু বদলে গিয়েছিল বলে আমার মনে হয়। অথবা আমি তখন চতুর্থ পেগে ছিলাম। কোনটা সত্যি, বলা কঠিন। বয়স বাড়লে হ্যালুসিনেশন আর ইনসাইট একই জামা পরে আসে। আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি, মার্কস, সিওরান, কামু আর বুদ্ধ একসঙ্গে বসে আছেন। একটা ধোঁয়াভরা ঘর। মার্কস টেবিল চাপড়ে বিপ্লবের কথা বলছেন। কামু জানলার বাইরে তাকিয়ে সিগারেট খাচ্ছেন। সিওরান বলছেন, ‘সবই বৃথা।’ আর বুদ্ধ চুপচাপ বসে আছেন। তারপর খুব ধীরে বলছেন, ‘হ্যাঁ।’ এই ‘হ্যাঁ’ শব্দটাই বোধহয় সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ এর মধ্যে পরাজয়ও আছে, মুক্তিও আছে, আর সামান্য হাসিও। আমি এখন সেই হাসিটার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছি হয়তো। না, জ্ঞানলাভ হয়নি। লিভারের রিপোর্ট এখনও খারাপ। শুধু মাঝে মাঝে গভীর রাতে মনে হয়, পৃথিবীটাকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার দরকার ছিল না। তারপরই আবার বুকের কোথাও হালকা ব্যথা ওঠে। আমি গ্লাসে শেষ বরফটা ফেলি। টিক। শব্দটা শুনে মনে হয়, অনিত্যতা নিজের ছোট্ট ঘণ্টা বাজাল।
এই যে রাজনৈতিক সময়—সবাই যেন শত্রু খুঁজছে। প্রতিটি দলই মানুষের ভেতরে একটা ছোট্ট পুলিশ বসিয়ে দিয়েছে। সবাই নজর রাখছে, কে কী বলল। কিন্তু কেউ আর জিজ্ঞেস করে না—তুমি কষ্টে আছো? আমার মনে হয়, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের বিষণ্নতাকে ব্যবহার করতে শিখেছে। একাকিত্বকে মার্কেটেবল করেছে। আপনি লোনলি? এই নিন ডেটিং অ্যাপ। আপনি অ্যাংকশাস? এই নিন প্রোডাক্টিভিটি কোর্স। আপনি একজিস্টেনশিয়ালি ডেভাস্টেটেড? এই নিন উইকেন্ড গেটওয়ে।
হাইডেগার বলেছিলেন, মানুষ পৃথিবীতে ‘থ্রোন’ হয়। ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমাকে বোধহয় একটু বেশি জোরেই ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। যেন কোনও মাতাল দেবতা এক বর্ষার রাতে বিরক্ত হয়ে আমাকে মহাবিশ্বের ব্যালকনি থেকে ছুড়ে মেরেছিল উত্তর কলকাতার এই স্যাঁতসেঁতে ঘরে, আর তারপর নিচে তাকিয়ে বলেছিল, ‘উপস… টু মাচ এক্সিস্টেন্স।’ আমি তখনও, মানে এখনও… আচ্ছা, আমি কী বলছিলাম? হ্যাঁ, তখনই আমি মদ ঢালি। গ্লাসে। খুব ধীরে। কারণ তাড়াহুড়ো করে ঢাললে মদেরও অপমান হয়। আমার এই ঘরে একটা পুরনো পাখা আছে। ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে শাদা দেখায়। যেন একটা ঘূর্ণমান শ্বেতচক্র। অথবা মৃত কোনও দেবদূতের হ্যালো, যা খুলে এসে সিলিং-এ আটকে গেছে। আমি তাকিয়ে থাকি। অনেকক্ষণ। এতক্ষণ যে কখনও কখনও মনে হয়, পাখাটা আর ঘুরছে না, আমিই ঘুরছি। পুরো ঘরটা ধীরে ধীরে বৃত্তাকারে সরে যাচ্ছে, বইয়ের আলমারি, খালি গ্লাস, রফির গলা, হাইডেগার, সব… সব যেন কোনও অদৃশ্য ওয়াশিং মেশিনে ধোয়া হচ্ছে। তারপর মনে হয়—ঘূর্ণমান শ্বেতচক্রের ওপর আমি হলুদ এবং ডোরাকাটা ঝাঁপ দেব। প্রণয়নখর, নখ্-এ-মুহব্বত গিঁথে তাকে স্তব্ধ করব। কী অদ্ভুত, না? বুড়ো বয়সে এসে মানুষের ভেতরে একটা বাঘ জেগে ওঠে। শিকার করার জন্য নয়—শুধু পৃথিবীর এই অবিরাম ঘূর্ণনটাকে থামাতে ইচ্ছে করে। আমি মাঝে মাঝে নিজের হাতের দিকে তাকাই। আঙুলগুলো কাঁপে, সামান্য। আর তখন সত্যিই মনে হয়, নখের নিচে কোথাও একটা বৃদ্ধ বাঘ ঘুমোচ্ছে। তার দাঁত পড়ে গেছে কিছু, হাঁপানি আছে হয়তো, কিন্তু তবু সে মাঝে মাঝে লেজ নাড়ে। বিশেষ করে রাত তিনটের পর। রাত তিনটে খুব বিপজ্জনক সময়। তখন ফার্নিচারও নিজের আসল চিন্তা ভাবতে শুরু করে। একদিন দেখলাম, চেয়ারটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। স্পষ্ট। আমি বললাম, ‘কী?’ সে বলল, ‘স্যার, আপনি কি নিশ্চিত আপনি এখনও মানুষ আছেন?’ আমি বললাম, ‘তুই আগে চেয়ার থাক, তারপর অন্টোলজি নিয়ে কথা বলিস।’ তারপর হাসলাম। তারপর বুঝলাম, চেয়ারটা আসলে কিছু বলেনি। অথবা বলেছিল। এখন আর নিশ্চিত নই। বয়স বাড়লে হ্যালুসিনেশন আর মেমোরি একই কোট পরে আসে। হাইডেগার বিয়িং-টুওয়ার্ডস-ডেথ বলেছিলেন। কী দারুণ শব্দ। কিন্তু আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা আসলে বিয়িং-টুওয়ার্ডস-সিলিং-ফ্যান। সবাই নিচে বসে আছি, ওপরে একটা ঘূর্ণমান শাদা নিয়তি ঘুরছে, আর আমরা ভাব করছি সব ঠিক আছে। অথচ পাখাটা যদি হঠাৎ খুলে পড়ে? কী সুন্দর হবে, না? না না, সুইসাইডাল কিছু বলছি না… আমি শুধু বলছি, পৃথিবীর সবকিছুই ভয়ানকভাবে ঝুলন্ত। রাষ্ট্র ঝুলছে। প্রেম ঝুলছে। লিভার ঝুলছে। আমার পুরনো পাঞ্জাবির বোতামও ঝুলছে। একমাত্র ঘূর্ণনটাই স্থায়ী। তাই বোধহয় বাঘটা জেগে ওঠে। কারণ বাঘেরা দর্শন বোঝে না, কিন্তু থামিয়ে দিতে চায়। আমি একসময় ভাবতাম বিপ্লব পৃথিবী বদলাবে। এখন মনে হয়, পৃথিবীকে পাঁচ মিনিটের জন্য থামাতে পারলেও যথেষ্ট ছিল। শুধু পাঁচ মিনিট। যাতে সবাই একটু চুপ করে শুনতে পারে নিজের মাথার ভেতরের শব্দ। কিন্তু কেউ শোনে না। সবাই স্ক্রল করছে। সবাই আপডেট হচ্ছে। যেন মানুষ না, সফটওয়্যার। আর আমি এখানে বসে পাখার দিকে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে, ওটা আসলে পাখা না—একটা বিশাল শাদা চোখ। ঘুরছে। ঘুরছে। আমাকে দেখছে। অপেক্ষা করছে আমি কবে সত্যিই ঝাঁপ দেব। অবশ্য ঝাঁপ বলতে… আচ্ছা, আমি কি এটা আগেও বলেছি? হতে পারে। মাতাল মানুষ আর দার্শনিকদের একটা সমস্যা আছে—ওরা একই খাদে বারবার ফিরে আসে, শুধু প্রতিবার নতুন মেটাফর নিয়ে।
আমি জানি, আমি রিয়্যাকশনারি নই। নৈরাশ্যবাদীও নই পুরোপুরি। আমি এখনও সকালে চা খাই, কাক দেখি, কখনও কখনও রাস্তার কুকুরের মাথায় হাত রাখি। মানে এখনও পৃথিবীকে পুরো ঘৃণা করতে শিখিনি। কিন্তু আমি এই সময়ের সঙ্গে আত্মীয়তা অনুভব করি না। আজকাল বইয়ের দোকানে গেলে দেখি, ফিলোসফি সেকশন ছোট হয়ে গেছে। তার জায়গায় সেলফ-হেল্প। নীৎশের জায়গায় ‘অ্যাটমিক হ্যাবিটস’। কী ভয়ংকর! যে মানুষ বলেছিল ‘গড ইজ ডেড’, তাকে সরিয়ে এখন শেখানো হচ্ছে কীভাবে সকাল পাঁচটায় উঠে সফল হতে হয়। হাসি পায়। গালিবের একটা শের মনে পড়ছে—‘দিল হি তো হ্যায় না সঙ্গ-ও-খিশ্ত, দরদ সে ভর না আয়ে কিউঁ…’ হৃদয়ই তো, পাথর-ইট তো নয়। ব্যথায় ভরে উঠবে না কেন? কিন্তু মজার কথা কী জানেন, বয়স বাড়লে মানুষ ঠিক উলটো জিনিসটাই চায়। হৃদয়কে ইট বানাতে চায়। অন্তত একটু সিমেন্ট। একটু প্লাস্টার। কারণ সারাক্ষণ নরম থাকতে থাকতে ভেতরটা জল টেনে নেওয়া দেওয়ালের মতো হয়ে যায়। আমি এখন মাঝরাতে নিজের সঙ্গেই কথা বলি। কখনও আস্তে। কখনও উচ্চস্বরে। একদিন তো বাথরুমের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বকে বলেছিলাম, ‘খালিদ, ইউ আর ডিকেইং উইথ স্টাইল।’ আয়নাটা কুয়াশা জমে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর মনে হল, সে সামান্য মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। অথবা আমি তখন দ্বিতীয়… না তৃতীয় পেগে ছিলাম। ঠিক মনে নেই। সময় এখন আমার ঘরে ঢুকলে জুতো খুলে ফেলে। ‘ম্যান ইজ বর্ন ব্রোকেন… হি লিভস বাই মেন্ডিং… দ্য গ্রেস অফ গড ইজ গ্লু…’ ইউজিন ও’নিল। কী আশ্চর্য কথা! ঈশ্বর আঠা! আমার অবশ্য ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই। কিন্তু আঠায় আছে। এখনও বইয়ের মলাট ছিঁড়ে গেলে ফেভিকল লাগাই খুব যত্ন করে। আঙুলে শাদা আঠা শুকিয়ে গেলে সেটা তুলে ফেলতে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, মৃত চামড়ার ছোট্ট দর্শন ঝরছে। একসময় ভাবতাম মানুষ আদর্শ দিয়ে জোড়া লাগে। পরে দেখলাম, না, মানুষ জোড়া লাগে অভ্যাস দিয়ে। একই কাপ। একই বিছানার দাগ। একই ফোনকল না আসার অপেক্ষা। একই গন্ধ। একই ভুল। আমার এক প্রাক্তন প্রেমিকা—না না, নাম বলব না, মৃতদের গোপনীয়তা থাকা উচিত—সে একবার আমার ছেঁড়া শার্ট সেলাই করছিল। গভীর রাত। জানলার বাইরে বৃষ্টি। আমি বলেছিলাম, ‘তুমি কি আমাকে রিপেয়ার করছ?’ সে হেসেছিল। বলেছিল, ‘তুমি খুব ওভারড্রামাটিক।’ তারপর সূঁচে সুতো ঢোকাতে গিয়ে চোখ ছোট করে ফেলেছিল। সেই মুহূর্তটা আজও আমার মাথায় আটকে আছে। কারণ তখন হঠাৎ মনে হয়েছিল, প্রেম আসলে দু’জন মানুষ মিলে একে অপরের ছেঁড়া কাপড় সেলাই করার ব্যর্থ চেষ্টা। তারপরও কোথাও না কোথাও ছিদ্র থেকে যায়। বাতাস ঢোকে। শীত ঢোকে। ইতিহাস ঢোকে। আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি, স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে, সেখানে নিশ্চয়ই এক বিশাল হার্ডওয়্যার দোকান আছে। ঈশ্বর কাউন্টারের পেছনে বসে আছেন। ক্লান্ত। চশমা পরে। মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে বলছে, ‘একটু আঠা দিন… আমার বিয়ে খুলে যাচ্ছে।’ ‘একটু আঠা দিন… আমার বিশ্বাস ফেটে গেছে।’ ‘একটু আঠা দিন… আমার দেশ ভেঙে যাচ্ছে।’ আর ঈশ্বর খুব ধীরে বোতল এগিয়ে দিচ্ছেন। কী হাস্যকর, না? কসমিক ফেভিকল। আমি এসব ভাবতে ভাবতেই কখনও কখনও গ্লাসে মদ ঢালতে ভুলে যাই। খালি গ্লাস হাতে বসে থাকি। তখন গ্লাসটা দেখতে দেখতে মনে হয়, এও এক ধরনের হৃদয়। স্বচ্ছ। ফাঁপা। সামান্য চাপ পড়লেই ভেঙে যাবে। তবু মানুষ বারবার এতে আগুনরঙা তরল ঢালে। কেন? কারণ ভাঙার শব্দ শুনতে আমাদের ভালো লাগে। গালিব জানতেন সেটা। ইউজিন ও’নিলও। আর আমি… আমি শুধু মাঝরাতে বসে থাকি, পুরনো পাখার নিচে, আঠার শুকনো গন্ধ আর অ্যালকোহলের ধাতব স্বাদ মিশিয়ে ভাবি—হৃদয় যদি সত্যিই সঙ্গ-ও-খিশ্ত না হয়, তাহলে এত বছর ধরে এটা এখনও ভাঙল না কী করে? অথবা হয়তো ভেঙেছে অনেক আগেই। আমি শুধু টুকরোগুলো এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছি যে দূর থেকে এখনও মানুষ বলে ভুল হয়।
বইয়ের মলাট ছিঁড়ে গেলে এখনও আঠা দিয়ে জোড়া লাগাই। হয়তো মানুষও তা-ই করে সারাজীবন। নিজের ছেঁড়া অংশগুলো জোড়া লাগাতে থাকে। কখনও প্রেম দিয়ে। কখনও রাজনীতি দিয়ে। কখনও মদ দিয়ে। কখনও খুব দামি পারফিউম দিয়ে পচনের গন্ধ ঢাকার চেষ্টা করে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, সভ্যতা আসলে একটা বিশাল রিপেয়ার শপ। সবাই কোথাও না কোথাও ফেটে গেছে। কেউ সেটা টাই দিয়ে ঢাকে, কেউ মতাদর্শ দিয়ে, কেউ জিম মেম্বারশিপ দিয়ে। আর আমি? আমি বোধহয় স্কচ দিয়ে। সস্তার স্কচ। কারণ দুঃখেরও একটা ইকনমি আছে। আমার জানলার বাইরে এখন ভোর হচ্ছে। একটা পাখি ডাকছে। না কি অ্যালার্ম? বয়স বাড়লে পাখি আর মেশিনের শব্দের পার্থক্যটাও ঝাপসা হয়ে যায়। রফির গান শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু শেষ হওয়া গানগুলোই বোধহয় সবচেয়ে বেশি বাজতে থাকে। ঘরের ভেতরে এখনও হালকা ইকো ঘুরছে। উম্র-এ-দরাজ মাংগ কে লায়ে থে চার দিন… চার দিন… চার পেগ… চার দশক… সংখ্যাগুলোও এখন মদ খেয়ে ফেলেছে। আমি শেষ পেগটা ঢালছি। ধীরে। খুব ধীরে। কারণ আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না। তাড়াহুড়ো করে পৌঁছে গিয়ে মানুষ কী পায়? অফিস? হাসপাতাল? কবরস্থান? শ্মশান? ইতিহাসের সমস্ত দ্রুতগামী সাম্রাজ্যের শেষ পর্যন্ত খুব ধীর পতন হয়েছে। রোম, মুঘল, সোভিয়েত ইউনিয়ন… আর আমার লিভার। বরফ ফেলি। টিক। তারপর আরেকটা। টিক। মনে হয়, ছোট ছোট হিমবাহ ভেঙে পড়ছে সময়ের ভেতরে। আমি গ্লাসটা আলোয় ধরি। অ্যাম্বার রঙের ভেতরে আজ অদ্ভুত কিছু দেখছি। যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানুষ হাঁটছে। কেউ প্রেমপত্র নিয়ে দৌড়চ্ছে, কেউ পতাকা, কেউ প্রেসক্রিপশন। তারপর তারা ধীরে ধীরে গলে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কী আশ্চর্য, শেষ পর্যন্ত সব তরলই একইরকম লাগে। জল, মদ, স্মৃতি, ইতিহাস। আমি একসময় ছাত্রদের বলতাম, আইডেন্টিটি ইজ আ টেম্পোরারি অ্যারেঞ্জমেন্ট অফ ডাস্ট। তারা লিখে নিত। আমি নিজেও বুঝতাম না কথাটা কতটা সত্যি। এখন বুঝি। ভোরের আলো ঘরে ঢুকছে, কিন্তু খুব অনিচ্ছায়। যেন সূর্য নিজেও আজ একটু ক্লান্ত। আমার বুকশেলফগুলোকে এখন দূর থেকে সমাধিফলকের মতো লাগে। প্রতিটা বই একটা ব্যর্থ পুনরুত্থান। হেগেল, হাইডেগার, নাগার্জুন, ফয়েজ, শোপেনহাওয়ার—সবাই চেষ্টা করেছিলেন ভাঙা পৃথিবীটাকে অন্তত ভাষার মধ্যে একটু সোজা করে দাঁড় করাতে। কেউ পারেননি। তবু লিখেছেন। এটাই বোধহয় মানুষের সবচেয়ে করুণ এবং সবচেয়ে মহিমান্বিত অভ্যাস—ব্যর্থতা জেনেও বাক্য তৈরি করা। আমি মাঝে মাঝে ভাবি, দর্শন আসলে সুইসাইড নোট লিখতে না-পারা মানুষদের দীর্ঘ ড্রাফট। না না, ভয় পাবেন না। আমি মরতে চাইছি না। অন্তত আজ না। আজ আমি শুধু বসে থাকতে চাই। কারণ ভোরের ঠিক আগের সময়টায় পৃথিবীকে সবচেয়ে সৎ লাগে। তখন শহরের মেক-আপ উঠে যায়। পাখিরা এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি সকাল এসেছে। আর মাতালরা এখনও পুরোপুরি ভুলে যায়নি রাত ছিল। এই মাঝের অঞ্চলটা… এই আধা-আলো… এটাই বোধহয় আমার প্রকৃত দেশ। আমি জানলার বাইরে তাকাই। দেখি, আকাশের রঙ বদলাচ্ছে। কিন্তু খুব ধীরে। যেন বিশাল কোনও অদৃশ্য প্রাণী ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরছে। আমার হঠাৎ মনে হয়, মানুষ আসলে কখনও সম্পূর্ণ জোড়া লাগে না। আঠা শুধু ভাঙা অংশগুলোকে সাময়িকভাবে একসঙ্গে ধরে রাখে, যাতে আমরা কিছুদিন হাঁটতে পারি, কথা বলতে পারি, কাউকে ভালোবাসতে পারি, বা অন্তত ভালোবাসার অভিনয় করতে পারি। তারপর আবার ফাটল। আবার রিপেয়ার। আবার ফাটল। এটাই চক্র। বৌদ্ধরা হয়তো একে অন্য কিছু বলতেন। হেগেল অন্য কিছু। আমার প্রাক্তন প্রেমিকা বলত, ‘তুমি অতিরিক্ত ভাবো।’ সম্ভবত সবাই ঠিক। হঠাৎ খেয়াল করি, পাখিটার ডাক বন্ধ হয়ে গেছে। না কি আমি আর শুনতে পাচ্ছি না? রফির গানও নেই। শুধু ফ্রিজের মৃদু গুঞ্জন। আর আমার শ্বাসের শব্দ। আর দূরে কোথাও, খুব দূরে, যেন একটা ট্রেন যাচ্ছে। আমি কখনও নিশ্চিত হতে পারি না ট্রেনটা বাস্তবে আছে, না আমার মাথার ভেতরে। গ্লাসে শেষ চুমুক নিই। উষ্ণ জ্বালা নেমে যায় ধীরে। মনে হয়, শরীরের ভেতরে ছোট্ট একটা সূর্য অস্ত যাচ্ছে। তারপর আমি বসে থাকি। অনেকক্ষণ। আলো বাড়ে। ঘর স্পষ্ট হয়। আর আমি হঠাৎ বুঝতে পারি, সমস্ত জীবন ধরে আমি আসলে কোথাও পৌঁছতে চাইনি। আমি শুধু এই দীর্ঘ, অস্পষ্ট, আধা-মাতাল করিডোরটার মধ্যেই হাঁটছিলাম—যেখানে মৃত সম্রাটরা রফি শোনে, পুরনো প্রেমিকারা আতরের গন্ধ হয়ে ফিরে আসে, দর্শনের অধ্যাপকরা বরফের শব্দে ইতিহাসের ইসিজি শোনে, আর ভোর হওয়ার ঠিক আগে পৃথিবী কয়েক সেকেন্ডের জন্য এত নিঃশব্দ হয়ে যায় যে মনে হয়, এবার হয়তো কেউ অবশেষে সত্যিটা বলবে। কিন্তু কেউ বলে না। শুধু আলো একটু বাড়ে। আর টেবিলের ওপর ফেলে রাখা গ্লাসের ভেতরে, অদ্ভুতভাবে, এখনও সামান্য তরল রয়ে যায়।

মে, ২০২৬

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes