
আপাত ঘটনাহীন আধুনিক অস্তিত্বের নন্দনতত্ত্ব মানেই জিম জারমুশের ছবি
ধীমান বন্দ্যোপাধ্যায়
“কফি অ্যান্ড সিগারেটস” জারমুশীয় ক্ষুদ্র অঙ্গভঙ্গির ঘোষণাপত্র। কফি, নিকোটিন, পুনরাবৃত্তি, অস্বস্তিকর বিরতি—তুচ্ছ আচার হয়ে ওঠে দার্শনিক নাট্যমঞ্চ। অর্থহীন কথোপকথনই সবকিছু হয়ে ওঠে। কেট ব্ল্যাঞ্চেট-এর দ্বৈত সত্তা পরিচয়ের অভিনয়কে কৌতুকপূর্ণ অস্বস্তিতে রূপ দেয়। ইগি পপ এবং টম ওয়েটস অংশ বার্ধক্যজনিত শীতলতার আত্ম-পরিহাস। এখানে ক্ষুদ্র আলাপের সিনেমা আসলে অহং, মৃত্যু, খ্যাতি, এবং শূন্যতার সিনেমা।“ব্রোকেন ফ্লাওয়ার্স”-এ ডন জনস্টন (বিল মারে) জারমুশীয় পুরুষ-ভাসমানতার বার্ধক্যরূপ। অজ্ঞাত গোলাপি চিঠি তাকে অতীত প্রেমিকাদের পথে পাঠায়। পথচলচ্চিত্র হয়ে ওঠে পুরুষত্বের অতীত-সমীক্ষা। ডনের যাত্রা মুক্তি নয়; অমীমাংসিত আবেগ-পুরাতত্ত্ব। বিল মারের শূন্যতা এখানে কৌতুকময় মুখোশ এবং অস্তিত্বগত গহ্বর।
জিম জারমুশ মানেই এমন এক চলচ্চিত্রভাষার সামনে দাঁড়ানো, যা মূলধারার গতিশীলতা, কাহিনিকেন্দ্রিকতা, নাটকীয়তা, এবং বাজারনির্ভর আবেগ-উৎপাদনের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ, নীরব, ব্যঙ্গাত্মক, এবং গভীরভাবে কাব্যিক প্রতিরোধ। জিম জারমুশের সিনেমা দেখতে বসলে প্রথমেই বোঝা যায়—তিনি গল্প বলেন, কিন্তু গল্পের প্রচলিত জরুরিতা তাঁর কাছে মুখ্য নয়; বরং সময়, বিরতি, অচলতা, যাত্রা, দৈনন্দিনতার অদ্ভুততা, সাংস্কৃতিক ভাসমানতা, এবং অস্তিত্বের ফাঁকা জায়গাগুলিই তাঁর প্রকৃত বিষয়। তাঁর ছবির চরিত্ররা প্রায়ই কোথাও পৌঁছতে চায় না, কিংবা পৌঁছলেও সেখানে কোনও সমাধান অপেক্ষা করে না। তারা হাঁটে, বসে, অপেক্ষা করে, কথা বলে, চুপ থাকে, সিগারেট খায়, ট্রেন ধরে, ট্যাক্সি চালায়, কবিতা লেখে, কিংবা মৃতের মতো বেঁচে থাকে। আর এই আপাত ঘটনাহীন জীবনযাপনই জারমুশের হাতে হয়ে ওঠে আধুনিক অস্তিত্বের এক অদ্ভুত, শুষ্ক, সংযত, এবং গভীর মানবিক নন্দনতত্ত্ব।

জারমুশের চলচ্চিত্রবিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল গতি-বিরোধিতা। মূলধারার সিনেমা যেখানে কাহিনির অগ্রগতিকে কেন্দ্রে রাখে, জারমুশ সেখানে স্থিরতাকে শিল্পে পরিণত করেন। “স্ট্রেঞ্জার দ্যান প্যারাডাইস” এই নন্দনতত্ত্বের মৌলিক দলিল। উইলি, ইভা, এবং এডি—তিনটি চরিত্র, তিনটি অনিশ্চিত গন্তব্য, কিন্তু কোনও প্রচলিত রূপান্তর নেই। নিউ ইয়র্ক, ক্লিভল্যান্ড, ফ্লোরিডা—স্থান বদলায়, কিন্তু অস্তিত্বগত ভাসমানতা বদলায় না। এই চলচ্চিত্রে জারমুশ দেখান, আমেরিকান স্বপ্ন আসলে প্রান্তিক, অভিবাসী, সাংস্কৃতিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষের কাছে কতটা শূন্য। ইভা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—সে হাঙ্গেরীয় বহিরাগত, যার উপস্থিতি আমেরিকান একঘেয়েমিকে উন্মুক্ত করে। জারমুশ এখানে সংযত সংলাপ, স্থির ফ্রেম, খণ্ডিত কাঠামো ব্যবহার করে একঘেয়েমিকে নন্দনতাত্ত্বিক শ্রেণিতে উন্নীত করেন। বিরক্তি এখানে ব্যর্থতা নয়; এটি দেরি-পুঁজিবাদী শূন্যতার অনুভূতি।
“ডাউন বাই ল” জারমুশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথ-কারাগার-সঙ্গী চলচ্চিত্র, কিন্তু এটিও ধারার বিপর্যয়। জ্যাক, জ্যাক, এবং রোবের্তো—তিনজন মানুষ, তিনটি ভিন্ন ছন্দ। টম ওয়েটস-এর বিষণ্ন ভাসমানতা, জন লুরির নৈরাশ্যপূর্ণ শীতলতা, আর রোবের্তো বেনিনির অদ্ভুত প্রাণশক্তি—এই ত্রয়ী এক অস্তিত্ববাদী কৌতুক নির্মাণ করে। রোবের্তো বিশেষভাবে জারমুশীয় চরিত্র: বহিরাগত নিষ্পাপতা দার্শনিক ব্যাঘাত হিসেবে কাজ করে। তার ভাঙা ইংরেজি, শিশুসুলভ কৌতূহল, এবং কাব্যিক অদ্ভুততা বন্দিত্বময় পুরুষত্বকে অস্থির করে তোলে। জারমুশ এখানে কারাগার ভাঙাকে রোমাঞ্চ নয়, মানবিক অদ্ভুততায় পরিণত করেন। লুইজিয়ানার জলাভূমি এখানে পালানোর ভূখণ্ডের চেয়ে বেশি অধিবাস্তব প্রান্তর।

“মিস্ট্রি ট্রেন” জারমুশের সিনেমায় নগর-সিম্ফনির এক অনন্য উদাহরণ। মেমফিস এখানে শুধু এলভিস-পুরাণ নয়; সাংস্কৃতিক অবশেষ। জাপানি পর্যটক জুন এবং মিৎসুকো রক অ্যান্ড রোল তীর্থযাত্রায় আসে, কিন্তু সেই যাত্রাই অনুকরণ, সত্যতা, এবং বৈশ্বিক জনপ্রিয় সংস্কৃতির উপর ধ্যান হয়ে ওঠে। লুইসা, জনি, চার্লি—প্রত্যেকেই খণ্ডিত আমেরিকান রাত্রিজগতের অংশ। হোটেল একটি অন্তর্বর্তী পরিসর, যেখানে বিচ্ছিন্ন জীবনগুলি প্রতিধ্বনিত হয়। জারমুশের আন্তর্জাতীয় ভাসমানতার প্রতি আকর্ষণ এখানে স্পষ্ট—আমেরিকা সবসময় অন্য কোথাও থেকে দেখা। “নাইট অন আর্থ” তাঁর খণ্ডিত মানবতাবাদের বিশ্বনগর সংস্করণ। লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউ ইয়র্ক, প্যারিস, রোম, হেলসিঙ্কি—পাঁচটি ট্যাক্সি, পাঁচটি রাত্রি, পাঁচটি কথোপকথনের জগৎ। এখানে ট্যাক্সি হয়ে ওঠে স্বীকারোক্তির ক্ষুদ্র পরিসর। উইনোনা রাইডারের যন্ত্রকুশলী-চালক প্রচলিত চাকচিক্য প্রত্যাখ্যান করে; রোবের্তো বেনিনির রোমান চালক ধর্মযাজকের সামনে কৌতুকপূর্ণ স্বীকারোক্তিতে ধর্মীয় স্থিতিকে অস্থির করে; হেলসিঙ্কি অংশ গভীর শ্রমজীবী বিষণ্নতা বহন করে। জারমুশ এখানে বিশ্বায়নকে দৃশ্যত চমক নয়, রাত্রিকালীন অন্তরঙ্গতা হিসেবে ধরেন। ভিন্ন শহর, একই নিঃসঙ্গতা।“ডেড ম্যান” সম্ভবত জারমুশের সবচেয়ে দার্শনিক, রাজনৈতিক, এবং আনুষ্ঠানিকভাবে বিপ্লবী চলচ্চিত্র। উইলিয়াম ব্লেক নামটি নিজেই আন্তঃপাঠ—হিসাবরক্ষক থেকে পলাতক, তারপর প্রেতাত্মীয় যাত্রা। জনি ডেপ-এর ব্লেক শিল্প-পুঁজিবাদ থেকে মৃত্যুভূমিতে প্রবেশ করে। নেটিভ আমেরিকান চরিত্র নোবডি এই ছবির অধিবাস্তব কেন্দ্র। তিনি পথপ্রদর্শক, কৌতুক-প্রবঞ্চক, উপনিবেশবিরোধী সাক্ষী। “ডেড ম্যান” পশ্চিমা ধারাকে ভেঙে আমেরিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সহিংসতা উন্মোচন করে। সাদা-কালো চিত্রগ্রহণ, নিল ইয়ং-এর বৈদ্যুতিক গিটার, খণ্ডিত যাত্রা—সব মিলিয়ে এটি উপনিবেশিক মৃত্যুকাব্য। সীমান্ত এখানে সম্প্রসারণ নয়; মৃতভূমি। “ঘোস্ট ডগ: দ্য ওয়ে অব দ্য সামুরাই” জারমুশের আন্তঃসাংস্কৃতিক কোলাজের অসাধারণ উদাহরণ। আফ্রিকান-আমেরিকান ভাড়াটে খুনি, সামুরাই নীতি, মাফিয়ার পতন, হিপ-হপ দর্শন, হাগাকুরে—সব মিলিয়ে অসম্ভব সমন্বয়। ঘোস্ট ডগ চরিত্র আধুনিক বিচ্ছিন্নতার আচারনির্ভর প্রতিক্রিয়া। সে নৈতিকভাবে পচে যাওয়া পৃথিবীতে বিলুপ্ত নীতিতে বাঁচে। লুই এবং বৃদ্ধ মাফিয়ারা করুণ অবশেষ। কবুতরের ঘর, আইসক্রিম বিক্রেতা, হাইতিয়ান ফরাসিভাষী শিশু—জারমুশ ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাকে কাব্যিক ব্যবস্থায় পরিণত করেন। এখানে হত্যাচলচ্চিত্র হয়ে ওঠে নীতি, অনুবাদ, এবং নিঃসঙ্গতার ধ্যান।

“কফি অ্যান্ড সিগারেটস” জারমুশীয় ক্ষুদ্র অঙ্গভঙ্গির ঘোষণাপত্র। কফি, নিকোটিন, পুনরাবৃত্তি, অস্বস্তিকর বিরতি—তুচ্ছ আচার হয়ে ওঠে দার্শনিক নাট্যমঞ্চ। অর্থহীন কথোপকথনই সবকিছু হয়ে ওঠে। কেট ব্ল্যাঞ্চেট-এর দ্বৈত সত্তা পরিচয়ের অভিনয়কে কৌতুকপূর্ণ অস্বস্তিতে রূপ দেয়। ইগি পপ এবং টম ওয়েটস অংশ বার্ধক্যজনিত শীতলতার আত্ম-পরিহাস। এখানে ক্ষুদ্র আলাপের সিনেমা আসলে অহং, মৃত্যু, খ্যাতি, এবং শূন্যতার সিনেমা।“ব্রোকেন ফ্লাওয়ার্স”-এ ডন জনস্টন (বিল মারে) জারমুশীয় পুরুষ-ভাসমানতার বার্ধক্যরূপ। অজ্ঞাত গোলাপি চিঠি তাকে অতীত প্রেমিকাদের পথে পাঠায়। পথচলচ্চিত্র হয়ে ওঠে পুরুষত্বের অতীত-সমীক্ষা। ডনের যাত্রা মুক্তি নয়; অমীমাংসিত আবেগ-পুরাতত্ত্ব। বিল মারের শূন্যতা এখানে কৌতুকময় মুখোশ এবং অস্তিত্বগত গহ্বর। নারীচরিত্ররা প্রত্যেকে বিকল্প সময়রেখা—স্মৃতি, অনুশোচনা, সম্ভাবনা, অজানাযোগ্যতা। আমেরিকার উপশহর এখানে আবেগগত উজাড়ভূমি। “দ্য লিমিটস অব কন্ট্রোল” তাঁর সবচেয়ে বিমূর্ত কাজগুলির একটি। ইসহাক দ্য ব্যাংকোলের লোন ম্যান প্রায় মানবোত্তর চরিত্র—আচার, পুনরাবৃত্তি, সংকেতপূর্ণ বিনিময়। আখ্যানগত সংহতি ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষীণ। দিয়াশলাইয়ের বাক্স, এসপ্রেসো, তাই-চি, জাদুঘর—অ্যাকশন stripped হয়ে ধারণাগত অঙ্গভঙ্গিতে পরিণত। এটি গুপ্তচর-রোমাঞ্চ নয়; রোমাঞ্চ-বিরোধী চলচ্চিত্র। জারমুশ এখানে উপলব্ধিকেই কেন্দ্রে আনেন। পুঁজিবাদী ক্ষমতাকাঠামো বনাম ধ্যানমগ্ন স্বায়ত্তশাসন। “ওনলি লাভার্স লেফট অ্যালাইভ” ভ্যাম্পায়ার ধারাকে মৌলিকভাবে পুনর্গঠন করে। অ্যাডাম এবং ইভ অমরত্বের বিষণ্ন বুদ্ধিজীবী। তারা শিকারি নয়; মানব সংস্কৃতির ক্লান্ত সংরক্ষণকারী। ডেট্রয়েট এবং ট্যাঞ্জিয়ার—ধ্বংসাবশেষ ও স্মৃতি। অ্যাডামের হতাশা দেরি-সভ্যতার ক্লান্তি; ইভ-এর প্রাণশক্তি সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা। মার্লো চরিত্র সাহিত্যিক অমরত্বের ব্যঙ্গ। এখানে রক্তপিপাসা ভোগ নয়; বরং বর্বর সময়ের মধ্যে পরিশীলিত টিকে থাকা। জারমুশ প্রশ্ন করেন—বর্বর যুগে সংবেদনশীল থাকা কীভাবে সম্ভব? “প্যাটারসন” তাঁর সংযত শ্রেষ্ঠকীর্তি। বাসচালক প্যাটারসন কবিতা লেখে, দৈনন্দিন রুটিন পালন করে, পুনরাবৃত্তির ভিতরে সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ্য করে। প্যাটারসন শহর হয়ে ওঠে দৈনন্দিন হাইকু। লরার সৃজনশীলতা বিশৃঙ্খল, প্যাটারসনের সৃজনশীলতা নীরব। এই চলচ্চিত্র সম্ভবত জারমুশের দর্শন সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে: শিল্প কোনও ব্যতিক্রমী উত্তরণ নয়; এটি মনোযোগী উপস্থিতি। দিয়াশলাইয়ের বাক্স, জলপ্রপাত, বাসরুট—সাধারণ বস্তুই গীতিময় উন্মোচন। সংঘাত সংযত, তবু আবেগগত গভীরতা বিপুল। রুটিন এখানে নিস্তেজতা নয়; ধ্যান। “দ্য ডেড ডোন্ট ডাই” আপাতদৃষ্টিতে জম্বি-কৌতুক, কিন্তু আসলে পরিবেশগত বিপর্যয়, ভোক্তাবাদী জম্বিকরণ, এবং ধারাগত ক্লান্তির শুষ্ক ব্যঙ্গ। জম্বিরা পুনরাবৃত্তি করে ভোগের অভ্যাস—“শার্দনে,” “ওয়াই-ফাই।” জারমুশ এখানে সর্বনাশকে অদ্ভুত দৈনন্দিনতায় নামিয়ে আনেন। বিভীষিকা হয়ে ওঠে অভ্যাসগত পুঁজিবাদের সমালোচনা। জিম জারমুশের পুনরাবর্তিত চরিত্রধারা লক্ষণীয়—ভবঘুরে, বহিরাগত, ব্যর্থ পুরুষ, কাব্যিক পর্যবেক্ষক, সাংস্কৃতিক সংকর, রাত্রিজীবী শ্রমিক। তাঁর মানুষরা সাফল্যের আখ্যান প্রত্যাখ্যান করে। তারা প্রান্তে বাস করে—ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, ভাষাগত, অস্তিত্বগত। নারীচরিত্ররা নিছক অনুপ্রেরণা নয়; প্রায়ই বিকল্প চেতনার ব্যাঘাত। তাঁর নন্দনতত্ত্ব গভীরভাবে সংগীতনির্ভর। পাঙ্ক, জ্যাজ, ব্লুজ, হিপ-হপ, লোকসংগীত—সঙ্গীত এখানে অলংকার নয়; বিশ্বদৃষ্টি। জ্যাজের স্বতঃস্ফূর্ততার মতোই তাঁর চলচ্চিত্র গন্তব্যের চেয়ে ছন্দকে প্রাধান্য দেয়।

দৃশ্যত স্থির ফ্রেম, দীর্ঘ শট, শুষ্ক বিন্যাস, সাদা-কালোর সংযম—সব মিলিয়ে জারমুশ চমক-বিরোধী সিনেমা নির্মাণ করেন। তিনি একঘেয়েমি, নীরবতা, অস্বস্তি, পুনরাবৃত্তি—যা মূলধারা বাদ দেয়—তাকেই কেন্দ্রে আনেন। আমার কাছে জিম জারমুশের সবচেয়ে বড় শক্তি হল, তিনি শূন্যতাকে নিছক ফাঁকা হতে দেন না; তিনি তাকে বুনটে পরিণত করেন। তাঁর সিনেমা শেখায়, জীবনের অর্থ চূড়ান্ত মুহূর্তে নয়; বিরতিতে। অপেক্ষা, ভেসে থাকা, শোনা, হারানো, পুনরাবৃত্তি—এগুলি কাহিনির অতিরিক্ত অংশ নয়; অস্তিত্বের কেন্দ্র। সবশেষে, জিম জারমুশের চলচ্চিত্রকে আমি বলব ভাসমানতার চলচ্চিত্র-জেন। তিনি আমাদের দ্রুততাগ্রস্ত পৃথিবীতে ধীরতা, লক্ষ্য-আসক্ত সংস্কৃতিতে লক্ষ্যহীনতা, শব্দ-সংস্কৃতিতে নীরবতা, ভোক্তাবাদী পরিচয়ে অদ্ভুত ব্যক্তিসত্তা ফিরিয়ে দেন। তাঁর সিনেমা কাহিনির চেয়ে আবহ, সমাধানের চেয়ে উপস্থিতি, গন্তব্যের চেয়ে যাত্রা। তিনি দেখান—অর্থহীনতার মধ্যেও এক ধরনের সূক্ষ্ম অর্থ আছে, যদি আমরা যথেষ্ট ধীরে তাকাই। জিম জারমুশ তাই কেবল স্বাধীন চলচ্চিত্রকার নন; তিনি আধুনিকতার ক্লান্ত আত্মার ইতিহাসলেখক। তাঁর ছবিগুলি আমাদের শেখায়—বেঁচে থাকা মানে সবসময় কোথাও পৌঁছানো নয়; কখনও কখনও শুধু রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সিগারেট হাতে পৃথিবীর অদ্ভুততাকে লক্ষ্য করাও এক গভীর শিল্প।

