রবীন্দ্রনাথ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ <br />  বিশ্ব বসু

রবীন্দ্রনাথ এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ
বিশ্ব বসু

রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদকে কেন বিপজ্জনক মনে করতেন? প্রথমত, এটি মানুষের নৈতিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। তিনি লিখেছিলেন, “Patriotism cannot be our final spiritual shelter; my refuge is humanity.” দেশপ্রেম মানুষের শেষ আশ্রয় হতে পারে না, কারণ দেশ যদি নৈতিকতাকে গ্রাস করে, তবে তা আত্মার বিকাশে বাধা দেয়। তাঁর কাছে মানুষ রাষ্ট্রের চেয়ে বড়, বিবেক পতাকার চেয়ে উচ্চতর। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, যখন রাষ্ট্র সর্বোচ্চ আদর্শ হয়ে ওঠে, তখন dissent বা ভিন্নমত বিশ্বাসঘাতকতা বলে বিবেচিত হয়। তখন স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক থাকে, নৈতিক নয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে ভারতীয় জনজীবনে আজও এক বিরাট দ্বন্দ্ব কাজ করে। একদিকে তিনি “জন গণ মন”-এর রচয়িতা, “আমার সোনার বাংলা”-র স্রষ্টা, স্বদেশচেতনার এক মহান কণ্ঠ; অন্যদিকে তিনিই জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ, আগ্রাসী, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রূপের অন্যতম কঠোর সমালোচক। এই দ্বৈততাকেই ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয় যখন রবীন্দ্রনাথকে কোনো একরৈখিক রাজনৈতিক মতবাদের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা হয়। বাস্তবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না রাষ্ট্রবাদী উগ্রতার কবি; তিনি ছিলেন মানবসমাজ, আত্মিক স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক সহাবস্থান এবং বিশ্বমানবতার দার্শনিক। তাঁর কাছে দেশপ্রেম ছিল মানুষের মর্যাদা রক্ষার এক নৈতিক সাধনা, কিন্তু “Nation” বা আধুনিক রাষ্ট্রজাতীয়তাবাদ ছিল প্রায়শই ক্ষমতার যন্ত্র, সংগঠিত স্বার্থপরতা, এবং মানুষের উপর যান্ত্রিক আধিপত্যের প্রকল্প। ব্যবহারকারীর প্রদত্ত লেখাটিতেও স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথের “স্বদেশী সমাজ” প্রবন্ধকে বিকৃত করে তাঁকে “হিন্দু রাষ্ট্র”-এর সমর্থক হিসেবে দেখানোর প্রচেষ্টা তাঁর চিন্তার পরিপন্থী।

রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ-বিষয়ক চিন্তা বুঝতে হলে প্রথমেই মনে রাখতে হয়—তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধী ছিলেন, কিন্তু ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রের নকলকে ভারতের মুক্তির একমাত্র পথ বলে মানেননি। তাঁর আপত্তি ছিল সেই “Nation”-এর বিরুদ্ধে, যা মানুষের উপর সমাজকে নয়, রাষ্ট্রযন্ত্রকে বসায়। তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতামালা “Nationalism” (১৯১৭)-এ তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন: “Nation is the political and commercial union of a people.” অর্থাৎ Nation তাঁর কাছে মূলত রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সংগঠন—যার কেন্দ্রে থাকে শক্তি, প্রতিযোগিতা, সম্পদ ও নিয়ন্ত্রণ; মানুষ নয়। তিনি আরও লিখেছিলেন, “Nationalism is a great menace.” এই উক্তি কেবল একটি রাজনৈতিক মত নয়; এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বধ্বংসের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এক সভ্যতামূলক সতর্কবার্তা। তাঁর দৃষ্টিতে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করে, সমাজকে রাষ্ট্রের অধীন করে, এবং নৈতিকতাকে ক্ষমতার কাছে বিকিয়ে দেয়।

রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল “সমাজ” বনাম “রাষ্ট্র”-এর পার্থক্য। ভারতীয় সভ্যতার শক্তি তিনি দেখেছিলেন সমাজে—সম্পর্কে, সংস্কৃতিতে, বৈচিত্র্যের সহাবস্থানে। ইউরোপ রাষ্ট্র নির্মাণ করেছে রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণে; ভারত গড়ে উঠেছে বহুত্বের সামাজিক সঞ্চয়ে। “স্বদেশী সমাজ” প্রবন্ধে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার চেয়ে সমাজশক্তির পুনর্গঠনের উপর জোর দিয়েছিলেন। বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে লেখা এই প্রবন্ধে তাঁর মূল কথা ছিল—ভারতকে নিজের সমাজজীবন, আত্মশক্তি, গ্রামসংগঠন, শিক্ষা ও নৈতিক চেতনার ভিতরে পুনর্গঠিত হতে হবে। সেখানে কোথাও “হিন্দু রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠার আহ্বান নেই; বরং ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতির সমন্বয়ের কথাই আছে। ব্যবহারকারীর দেওয়া লেখায়ও বলা হয়েছে, আর্য, মুসলমান—সবাই এই ভূখণ্ডে এসে মিশেছে বৃহত্তর সামাজিক সত্তায়।

রবীন্দ্রনাথের “ভারততীর্থ” কবিতাই তাঁর ভারতচিন্তার সবচেয়ে কাব্যিক দলিল—
“আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, শক, হূণদল, পাঠান, মোগল
এক দেহে হল লীন।”
এই পংক্তিতে ভারতের পরিচয় কোনো একক ধর্মীয় বা জাতিগত আধিপত্য নয়; বরং মিলনের সাধনা। ভারত তাঁর কাছে “মহামানবের সাগরতীর”—যেখানে বহুত্ব মিলিত হয়। অতএব, যে রাজনৈতিক মত ভারতকে একধর্মীয় রাষ্ট্রপরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ করতে চায়, তা রবীন্দ্রীয় ভারতচিন্তার বিপরীত।

রবীন্দ্রনাথ উগ্র জাতীয়তাবাদকে কেন বিপজ্জনক মনে করতেন? প্রথমত, এটি মানুষের নৈতিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। তিনি লিখেছিলেন, “Patriotism cannot be our final spiritual shelter; my refuge is humanity.” দেশপ্রেম মানুষের শেষ আশ্রয় হতে পারে না, কারণ দেশ যদি নৈতিকতাকে গ্রাস করে, তবে তা আত্মার বিকাশে বাধা দেয়। তাঁর কাছে মানুষ রাষ্ট্রের চেয়ে বড়, বিবেক পতাকার চেয়ে উচ্চতর। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, যখন রাষ্ট্র সর্বোচ্চ আদর্শ হয়ে ওঠে, তখন dissent বা ভিন্নমত বিশ্বাসঘাতকতা বলে বিবেচিত হয়। তখন স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক থাকে, নৈতিক নয়।

দ্বিতীয়ত, রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন জাতীয়তাবাদ অর্থনৈতিক লোভ ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যুক্ত। ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ তাঁর কাছে কেবল সামরিক জয় নয়; এটি জাতীয়তাবাদের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ। তিনি বুঝেছিলেন, “সভ্যতা”র নামে যে জাতীয়তাবাদ দুর্বল জাতিকে গ্রাস করে, তা শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনে। আজকের বিশ্বেও যখন ধর্মীয় মেরুকরণ, বর্ণবাদ, সীমান্ত-বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক শুদ্ধতার নামে বিভাজন বাড়ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের এই সমালোচনা নতুন অর্থ পায়।

তৃতীয়ত, ভারতের সামাজিক বাস্তবতায় ইউরোপীয় মডেলের জাতীয়তাবাদ তিনি অচল বলে মনে করেছিলেন। কারণ ভারত বহুভাষিক, বহুসম্প্রদায়িক, বর্ণবিভক্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—যেখানে সামাজিক অসমতা এত গভীর, সেখানে কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা কাদের স্বাধীনতা হবে? যদি সমাজে মানুষ মানুষকে অস্বীকার করে, তবে রাষ্ট্রশক্তি কেবল নতুন প্রভুত্ব সৃষ্টি করবে। এই ভাবনা গান্ধীর গ্রামস্বরাজ ধারণার সঙ্গেও কোথাও মিলে যায়, যদিও রবীন্দ্রনাথ অন্ধ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নানা দিকের সমালোচক ছিলেন।

জাপান সফরে রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের বিপদ নিয়ে সরাসরি সতর্ক করেছিলেন। সে সময় জাপান পশ্চিমা শক্তির সমকক্ষ হতে আগ্রাসী রাষ্ট্রবাদে উদ্বুদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ সেখানে বলেছিলেন, পশ্চিমের শক্তির অনুকরণ করতে গিয়ে যদি জাপান আত্মার স্বাধীনতা হারায়, তবে সে নিজেকেই হারাবে। তাঁর এই বক্তব্য জনপ্রিয় হয়নি; কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, সামরিক জাতীয়তাবাদ শেষ পর্যন্ত জাপানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। তাঁর দূরদৃষ্টি এখানেই।

রবীন্দ্রনাথের কাছে “স্বদেশ” ও “জাতীয়তাবাদ” এক নয়। স্বদেশ মানে মাটি, মানুষ, সংস্কৃতি, আত্মিক যোগ; জাতীয়তাবাদ মানে প্রায়শই রাজনৈতিক সংগঠন। তাই তিনি বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে রাখীবন্ধন উৎসবের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের ডাক দেন। তিনি দেশকে ভালোবাসতেন বিভাজনের মাধ্যমে নয়, সম্পর্কের মাধ্যমে। তাঁর দেশপ্রেম ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক; exclusionary নয়।

এই প্রসঙ্গে তাঁর “ঘরে বাইরে” উপন্যাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সন্দীপ চরিত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, উগ্র স্বদেশী আবেগ কীভাবে নৈতিকতাহীন ক্ষমতালিপ্সায় পরিণত হতে পারে। সন্দীপের ভাষায় দেশপ্রেম উত্তেজক, কিন্তু নিখিলেশের অবস্থানে রবীন্দ্রনাথ মানবতাকে বড় করেছেন। নিখিলেশ বলেন, “দেশকে আমি সেবা করতে রাজি, বন্দনা করব যাকে সে দেশের চেয়েও উপরে।” এই “উপরে” হচ্ছে সত্য, নৈতিকতা, মানবমর্যাদা।

রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদ সম্পর্কেও সতর্ক ছিলেন। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন সর্বগ্রাসী হয়, ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই বিপন্ন হয়। ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান তাঁর রাষ্ট্রসমালোচনাকে আরও দৃঢ় করে। ফলে যে কোনো মতাদর্শ—ডান, বাম, ধর্মীয় বা জাতিগত—যদি মানুষের বহুত্বকে অস্বীকার করে একরৈখিক পরিচয় চাপায়, রবীন্দ্রনাথ তার বিরোধী।

ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথকে নতুন করে পড়া জরুরি। তাঁকে কেবল জাতীয় সংগীতের কবি, নোবেলজয়ী সাহিত্যিক, বা “বিশ্বকবি” হিসেবে স্মরণ করলেই যথেষ্ট নয়; তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের গভীরতা বোঝা প্রয়োজন। কারণ তিনি এমন এক ভারত কল্পনা করেছিলেন, যা আত্মিকভাবে মুক্ত, সামাজিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক, এবং বিশ্বমানবতার অংশ। “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”—এ কেবল ব্যক্তিমানসের প্রার্থনা নয়; এটি এক রাজনৈতিক সভ্যতারও স্বপ্ন, যেখানে সংকীর্ণ গৃহপ্রাচীর বিশ্বকে খণ্ডিত করে না।

রবীন্দ্রনাথের উগ্র জাতীয়তাবাদবিরোধী অবস্থান কোনো দেশবিরোধিতা নয়; বরং দেশকে নৈতিকভাবে রক্ষা করার প্রয়াস। তিনি বুঝেছিলেন, যে জাতীয়তাবাদ মানুষকে অন্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত করে, তা শেষ পর্যন্ত নিজের সমাজকেও গ্রাস করে। তাই তাঁর মানবতাবাদ নিছক বিমূর্ত বিশ্বনাগরিকতা নয়; এটি ভারতের বহুত্ববাদী বাস্তবতার সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক রূপরেখা।

আজ যখন ইতিহাস, সাহিত্য, জাতীয় প্রতীক—সবকিছুকেই রাজনৈতিক appropriations-এর মাধ্যমে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা হয়, তখন রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় ফিরে যাওয়া জরুরি। তিনি কোনো “হিন্দু রাষ্ট্র”-এর কবি নন, কোনো সংকীর্ণ মতবাদের মুখপাত্র নন; তিনি ছিলেন মানুষের স্বাধীন আত্মার কবি। তাঁর ভারতবর্ষ ধর্মীয় আধিপত্যের নয়, সভ্যতার সংলাপের; ক্ষমতার নয়, সংস্কৃতির; বিভেদের নয়, মিলনের।

অতএব রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে হলে তাঁকে ব্যবহার নয়, পাঠ করতে হবে। তাঁর উক্তি, তাঁর প্রবন্ধ, তাঁর উপন্যাস, তাঁর কবিতা—সব মিলিয়ে তিনি আমাদের শেখান: রাষ্ট্র যদি মানুষকে গ্রাস করে, তবে দেশপ্রেমও বিপজ্জনক হতে পারে; কিন্তু মানবধর্ম যদি রাষ্ট্রকে নৈতিক সীমা দেয়, তবেই স্বাধীনতা অর্থবহ। রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এই—জাতীয়তাবাদ তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা মানবতাকে অতিক্রম না করে; আর যখন তা মানুষকে ছোট করে, তখন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই প্রকৃত স্বদেশপ্রেম।

পুরাণে ভস্মাসুর নামে এক অসুরের বিখ্যাত কাহিনি আছে। সে যার মাথায় হাত রাখত, সে-ই ভস্ম হয়ে যেত। আজকের দিনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) যেন সেই ভস্মাসুরেরই রূপ ধারণ করেছে। আমাদের জাতীয় মহাপুরুষদের মাথায় তারা একে একে হাত রাখতে শুরু করেছে। স্বামী বিবেকানন্দ থেকে অরবিন্দ, রামকৃষ্ণ পরমহংস, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর, ড. রামমনোহর লোহিয়া, মহাত্মা গান্ধী— সকলে ইতিমধ্যেই তাদের কবলে পড়েছেন। এবার সেই তালিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পালা এসেছে।

মধ্যপ্রদেশের সাগরে এক আরএসএস শিবিরে ভাষণ দিতে গিয়ে বর্তমান সরসংঘচালক মোহন ভাগবত, যেন নিজের ভস্মাসুরসুলভ রূপ প্রকাশ করেই বললেন— “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘স্বদেশী সমাজ’ নামের বইয়ে হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণা দিয়েছিলেন এবং তার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন।”

প্রথমেই বলা দরকার, ‘স্বদেশী সমাজ’ নামে রবীন্দ্রনাথের কোনো বই নেই। এটি মাত্র তিরিশ পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ, যা তিনি বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫)-এর অব্যবহিত পরে বাংলার জলসমস্যা প্রসঙ্গে লিখেছিলেন। সেখানে কোথাও তিনি হিন্দু রাষ্ট্রের সমর্থন করেননি। তিনি লিখেছিলেন, আর্যরা যখন ভারতে এসেছিল, তখন এদেশের সমাজ তাদের আত্মসাৎ করেছিল; পরে মুসলমানরাও এদেশে এসে একইভাবে আত্মীকৃত হয়। এই ভূখণ্ডের এই বিশেষ আত্মসাৎক্ষমতাকেই তিনি সেখানে তুলে ধরেছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রবীন্দ্রনাথ বরাবরই Nation-State বা জাতিরাষ্ট্র ধারণার কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি একে বলেছিলেন “ইউরোপের এক বিশুদ্ধ দান”। ১৯১৭ সালে তাঁর ‘Nationalism in India’ প্রবন্ধে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন:

“জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাংগঠনিক ভিত্তি আসলে উৎপাদন বৃদ্ধি ও মানবশ্রম সাশ্রয়ের মাধ্যমে অধিকতর সমৃদ্ধি অর্জনের এক যান্ত্রিক প্রয়াস। বিজ্ঞাপন ও নানা মাধ্যমে এই জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করা হয়েছে মূলত জাতির সম্পদ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য। ক্ষমতা বৃদ্ধির এই ধারণা জাতির মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা, বিদ্বেষ ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা মানবজীবনকে অস্থির ও অনিরাপদ করে তুলেছে। এটি জীবনের উপর প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ, কারণ জাতীয়তাবাদের এই শক্তি শুধু বহির্জগতেই নয়, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অবস্থাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে সমাজের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, এবং রাষ্ট্র সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের উপর ভয়ঙ্কর আধিপত্য বিস্তার করে।”

এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, Nation বা জাতি ধারণাটি সংগঠিত স্বার্থপরতার এক কাঠামো, যেখানে মানবিকতা ও আত্মিকতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি। দুর্বল ও অসংগঠিত প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা এই জাতীয়তাবাদের স্বাভাবিক পরিণতি। এর থেকেই জন্ম নেয় সাম্রাজ্যবাদ, যা শেষ পর্যন্ত মানবতার বিনাশ ডেকে আনে। রাষ্ট্রক্ষমতার এই বিস্তারের কোনো সীমা নেই; আর এই সীমাহীন শক্তির মধ্যেই মানবধ্বংসের বীজ নিহিত।

যখন জাতির পারস্পরিক সংঘাত বিশ্বযুদ্ধের রূপ নেয়, তখন তার ধ্বংসক্ষমতা সবকিছু নিশ্চিহ্ন করে দেয়। এটি নির্মাণের পথ নয়, ধ্বংসের পথ। শক্তির ভিত্তিতে কীভাবে জাতীয়তাবাদ মানবসমাজে বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা সৃষ্টি করে, রবীন্দ্রনাথের এই মৌলিক চিন্তা বিশ্বসভ্যতার এক অমূল্য সম্পদ। অথচ মোহন ভাগবত তাঁকেই হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরে তাঁকে ভস্মীভূত করার চেষ্টা করছেন।

ভারতের জন্য জাতীয়তাবাদ কোনো বিকল্প হতে পারে না

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “ভারতে জাতীয়তাবাদ প্রায় নেই বললেই চলে; বাস্তবে ইউরোপীয় ধাঁচের জাতীয়তাবাদ ভারতে শিকড় গাড়তে পারে না।” কারণ, যে সমাজ সামাজিক ক্ষেত্রে গোঁড়ামি আঁকড়ে ধরে, সেখানে জাতীয়তাবাদ কীভাবে বিকশিত হবে? সে সময়কার কিছু চিন্তাবিদ সুইজারল্যান্ডকে ভারতের মডেল হিসেবে ভাবতেন, যদিও সেটি বহু ভাষা ও বহু জাতিসত্তার দেশ। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, সুইজারল্যান্ড ও ভারতের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। সেখানে জাতিভেদ নেই; মানুষ নিজেদের একই রক্তের অংশ মনে করে, পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখে, আন্তর্বিবাহ করে।

ভারতে জন্মগত সমতার অভাব, জাতিভেদ, পারস্পরিক বৈষম্য— এসব রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, সামাজিক বয়কটের ভয়ে ভারতীয়রা ভীরু হয়ে পড়েছে। যেখানে খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতা নেই, সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা মানে কেবল অল্প কয়েকজনের সর্বময় আধিপত্য। এর ফলে জন্ম নেবে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র, আর ভিন্নমতাবলম্বীদের জীবন হয়ে উঠবে দুর্বিষহ। এমন নামমাত্র স্বাধীনতার জন্য কি নৈতিক স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেওয়া উচিত?

সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বিরোধিতা করে তিনি আরও বলেন, জাতীয়তাবাদ মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতা ও আত্মিক বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে। তাঁর মতে, রাষ্ট্রক্ষমতার লাগামহীন ব্যবহার জাতীয়তাবাদকে যুদ্ধোন্মাদ ও সমাজবিরোধী করে তোলে। ব্যক্তি-মানুষকে জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার ধারণা তিনি কখনো মেনে নিতে পারেননি। জাতির নামে গণহত্যা ও সংগঠিত সহিংসতা তাঁর কাছে ছিল অসহনীয়।

তাঁর মতে, জাতীয়তাবাদের সবচেয়ে বড় বিপদ হল— রাষ্ট্রের স্বার্থপর নীতির কারণে মানবিক সহিষ্ণুতা ও নৈতিক পরার্থপরতা বিলুপ্ত হয়। এমন অমানবিক ধারণার উপর রাজনৈতিক জীবন দাঁড়ালে তা শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে। তাই তিনি শুধু ভারতের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই Nation ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের রাজনৈতিক স্বাধীনতার দিক নিয়েও তাঁর সংশয় ছিল, কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল— শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভারতকে শক্তিশালী করবে না। ভারতকে সংকীর্ণ জাতীয়তার ধারণা ছেড়ে আন্তর্জাতিক মানবতাবাদের দিকে এগোতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে ভারত দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধে পিছিয়ে থাকতে পারে না। এমনকি দরিদ্র ভারতও মানবঐক্যের আদর্শ বিশ্বকে দেখাতে পারে।

সমাজ বনাম রাষ্ট্র

রবীন্দ্রনাথ সমাজকে রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, মানুষের বিকাশে সমাজই প্রধান। জাতীয়তাবাদের উন্মত্ততার প্রতীক হিসেবে তিনি ফ্যাসিবাদকে দেখেছিলেন। ফ্যাসিবাদের উত্থানের আগে জাতীয়তাবাদ মূলত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণবাদ ও ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাষ্ট্রক্ষমতার বৃদ্ধি জাতীয়তাবাদকে আরও মহিমান্বিত করে তোলে। মুসোলিনি বলেছিলেন, জাতি রাষ্ট্র সৃষ্টি করে না; রাষ্ট্রই জাতি সৃষ্টি করে।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে জাতীয়তাবাদ প্রথমে সাংস্কৃতিক ধারণা হিসেবে আবির্ভূত হলেও পরে তা আঞ্চলিকতা, যান্ত্রিকতা ও আধিপত্যবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ ক্ষয় হতে থাকে, মানবিক ঐক্যের বন্ধন আলগা হয়ে যায়। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও আরএসএস-এর উত্থানকে এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে।

দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকের (১৯৩১) পরে হিন্দু মহাসভার নেতা ড. বি. এস. মুঞ্জে ইতালিতে গিয়ে ফ্যাসিবাদী সংগঠন, সামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর ডায়েরি থেকে জানা যায়, তিনি সেখানকার সামরিক কলেজ ও ফ্যাসিস্ট শারীরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেন এবং পরে ড. হেডগেওয়ারের সঙ্গে আলোচনা করে আরএসএস-এর প্রশিক্ষণ কাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখেন।

রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদের এই চূড়ান্ত রূপ— যেখানে নিষ্ঠুরতা, অসুস্থতা ও বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট— তার বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর মতে, পাশ্চাত্যে বাণিজ্য ও রাজনীতি জাতীয় যন্ত্রের মাধ্যমে “পিষ্ট মানবতার সুশৃঙ্খল প্যাকেট” তৈরি করেছে।

আজও আরএসএস একই জাতীয়তাবাদের ধারণাকে ব্যবহার করে, এবং সর্দার প্যাটেল, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, আম্বেদকর প্রমুখের বক্তব্যকে বিকৃত করে নিজেদের প্রচারে ব্যবহার করে।

রবীন্দ্রনাথ ভারতকে পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ভারত বহু জাতি, বহু নৃগোষ্ঠী, বহু সংস্কৃতির দেশ— তাই এখানে ঐক্যের ভিত্তি হতে হবে সম্প্রীতি, আধিপত্য নয়। ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের “মদ” পান করলে ভারতও আত্মিক ও মানসিক বিপর্যয়ে পড়বে।

জাতীয়তাবাদের সমালোচনায় রবীন্দ্রনাথ তিনটি প্রধান ভিত্তি চিহ্নিত করেছিলেন—

১. জাতিরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতি
২. প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যবাদ
৩. বর্ণবাদ

ফ্যাসিবাদকে তিনি অসহনীয় স্বৈরতন্ত্র বলেছিলেন। তাঁর কাছে ফ্যাসিবাদ বিশেষভাবে ঘৃণ্য, কারণ সেখানে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রিত।

ভারতে আজ আরএসএস দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করে চলেছে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠার পর রামমন্দির, ৩৭০ ধারা, এনআরসি, লাভ জিহাদ, হিজাব, গোরক্ষা, ঘর ওয়াপসি, এক দেশ এক ভাষা— নানা ইস্যুর মাধ্যমে এই রাজনীতি আরও তীব্র হয়েছে।

গির্জায় আক্রমণ, দাঙ্গা, জাতীয় নেতাদের বক্তব্য বিকৃতি— সবই হিন্দুত্ববাদী প্রচারের অংশ। সেই ধারাবাহিকতায় রবীন্দ্রনাথকেও হিন্দু রাষ্ট্রের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা তাঁর প্রতি অপমান।

এর আগেও স্বামী বিবেকানন্দকে “বিশ্বমানব” থেকে সংকীর্ণ “হিন্দু সন্ন্যাসী”তে নামিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে। অথচ ১৮৯৩ সালে শিকাগো ধর্মমহাসভায় তিনি ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে বলেছিলেন, “Sectarianism, bigotry… have long possessed this beautiful earth.” তিনি বলেছিলেন, কোনো সভ্য ভাষা, সংস্কৃতি বা ধর্মে “Exclusion” শব্দটির স্থান নেই। অথচ আরএসএস-এর ভিত্তিই বর্জনবাদে নির্মিত।

বিনোবা ভাবেও গান্ধী হত্যার পর বলেছিলেন—
“এই সংগঠন সম্পূর্ণ ফ্যাসিস্ট ধাঁচের… গান্ধীজির নীতি ছিল সত্য; এদের নীতি যেন অসত্য। এই অসত্যই এদের কৌশল, পদ্ধতি ও দর্শনের অংশ।”

গীতা থেকে রবীন্দ্রনাথ— সবকিছুর সুবিধাজনক ব্যাখ্যা নির্মাণ এই কৌশলেরই অংশ।

রবীন্দ্রনাথ ১৯১৭ সালে জাপানে গিয়ে জাতীয়তাবাদের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন, যখন জাপান নিজেই জাতীয়তাবাদী উন্মাদনায় আচ্ছন্ন। এর ফলে তাঁকে নির্ধারিত বহু বক্তৃতা বাতিল করে জাপান ছাড়তে হয়েছিল। সেই রবীন্দ্রনাথকেই আজ হিন্দু রাষ্ট্রের প্রবক্তা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা ইতিহাসের এক গভীর বিকৃতি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাত্মা গান্ধীকে লেখা একটি চিঠি এখানে তুলে ধরার লোভ সামলানো গেল না-

প্রিয় মহাত্মাজি,

ক্ষমতা তার সকল রূপেই অযৌক্তিক; সে যেন চোখ বাঁধা সেই ঘোড়া, যে গাড়িটিকে টেনে নিয়ে চলে। তার মধ্যে নৈতিক উপাদান থাকে কেবল সেই মানুষটির মধ্যে, যে ঘোড়াটিকে চালায়। নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ (Passive Resistance) নিজে নিজে নৈতিক শক্তি নয়; এটি যেমন সত্যের পক্ষে ব্যবহার হতে পারে, তেমনি সত্যের বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হতে পারে। সকল শক্তির মধ্যেই যে বিপদ নিহিত থাকে, তা আরও প্রবল হয়ে ওঠে যখন তার সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ে; কারণ তখনই তা প্রলোভনে পরিণত হয়।

আমি জানি, আপনার শিক্ষা হল শুভের সাহায্যে অশুভের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। কিন্তু এমন সংগ্রাম বীরের কাজ, মুহূর্তের আবেগে পরিচালিত মানুষের নয়। একদিকে অশুভ স্বাভাবিকভাবেই অন্যদিকে অশুভের জন্ম দেয়; অন্যায় ডেকে আনে হিংসা, অপমান জন্ম দেয় প্রতিহিংসার। দুর্ভাগ্যবশত, এমন এক শক্তিরই সূচনা ইতিমধ্যে হয়েছে, এবং আতঙ্ক অথবা ক্রোধের বশে আমাদের শাসকেরা তাদের নখর প্রকাশ করেছে— যার নিশ্চিত ফল, আমাদের কারও কারও মধ্যে গোপন প্রতিশোধস্পৃহা জাগানো, আর অন্যদের মধ্যে সম্পূর্ণ নৈতিক অধঃপতন ডেকে আনা।

এই সংকটকালে আপনি, মানবসমাজের এক মহান নেতা হিসেবে, আমাদের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছেন সেই আদর্শের প্রতি আপনার বিশ্বাস ঘোষণা করতে— যে আদর্শ আপনি জানেন ভারতের নিজস্ব আদর্শ; এমন এক আদর্শ, যা যেমন গুপ্ত প্রতিহিংসার কাপুরুষতার বিরুদ্ধে, তেমনি ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের নতিস্বীকারের বিরুদ্ধেও।

আপনি বলেছেন, যেমন ভগবান বুদ্ধ তাঁর সময়ে বলেছিলেন, এবং সর্বকালের জন্য বলে গেছেন—

“অক্কোধেন জিনে কোধং, অসাধুং সাধুনা জিনে।”
(অর্থাৎ— ক্রোধকে জয় করো অক্রোধের দ্বারা, অশুভকে জয় করো শুভের দ্বারা।)

এই শুভশক্তিকে তার সত্য ও সামর্থ্য প্রমাণ করতে হবে তার নির্ভীকতার দ্বারা; এমন কোনো চাপকে অস্বীকার করার মাধ্যমে, যা ভয় সৃষ্টি করাকেই সাফল্যের উপায় করে তোলে, এবং ধ্বংসযন্ত্র ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র জনগণকে সন্ত্রস্ত করতে লজ্জাবোধ করে না।

আমাদের জানতে হবে, নৈতিক জয় কখনো কেবল বাহ্যিক সাফল্যে নিহিত নয়; ব্যর্থতাও তার মর্যাদা ও মূল্যকে কেড়ে নিতে পারে না। যারা আত্মিক জীবনে বিশ্বাস করে, তারা জানে— বিপুল জড়শক্তির মদতে প্রতিষ্ঠিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই প্রকৃত বিজয়; দৃশ্যমান পরাজয়ের মুখেও আদর্শে সক্রিয় বিশ্বাসের এ এক মহান জয়।

আমি সর্বদাই অনুভব করেছি, এবং সেই অনুযায়ী বলেছি, স্বাধীনতার মহৎ দান কোনো জাতি কখনো দয়ার দাক্ষিণ্যে পেতে পারে না। তাকে অর্জন করতে হয়, তবেই সে তার প্রকৃত অধিকারী হয়।

[…]

আপনি এই দুর্দিনে আপনার মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছেন তাকে তার কর্তব্য স্মরণ করিয়ে দিতে; তাকে জয়ের সেই সত্যপথে পরিচালিত করতে; এবং আমাদের বর্তমান রাজনীতিকে তার সেই দুর্বলতা থেকে শুদ্ধ করতে, যে দুর্বলতা ধার করা কূটনৈতিক অসততার পালক পরে নিজেকে সফল বলে মনে করে।

এই কারণেই আমি আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করি— আপনার অগ্রযাত্রার পথে এমন কিছু যেন প্রবেশ না করে, যা আমাদের আত্মিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করে; সত্যের উদ্দেশ্যে আত্মবলিদান যেন কখনো কেবল শব্দের অন্ধ উন্মাদনায় পরিণত না হয়; পবিত্র নামের আড়ালে আত্মপ্রবঞ্চনার অবতরণ যেন না ঘটে।

এই কয়েকটি ভূমিকার পর, আপনার মহৎ কর্মযজ্ঞে এক কবির সামান্য অবদান হিসেবে নিম্নলিখিত পংক্তিগুলি নিবেদন করছি—

আমাকে এই বিশ্বাসে উচ্চশির হতে দাও— তুমি আমাদের আশ্রয়; সকল ভয় তোমার প্রতি হীন অবিশ্বাসমাত্র।

মানুষের ভয়? এ জগতে এমন কোন মানুষ আছে, কোন রাজা, রাজাধিরাজ, যে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বী? কে আছে, যে সর্বকালে, সর্বসময়ে, সর্বসত্যে আমাকে নিজের অধিকারে রাখতে পারে?

এই পৃথিবীতে এমন কোন শক্তি আছে, যে আমার স্বাধীনতা হরণ করতে পারে? তোমার বাহু কি কারাগারের প্রাচীর ভেদ করে বন্দির কাছেও পৌঁছয় না, আত্মাকে কি সে অবাধ মুক্তি দেয় না?

মৃত্যুকে যদি আমি কৃপণের মতো তার নিষ্ফলা ধনের প্রতি আঁকড়ে ধরে ভয় করি, তবে কি তা যথার্থ? আমার এই আত্মার কি অনন্ত জীবনের মহোৎসবে তোমার চিরন্তন আহ্বান নেই?

আমাকে জানতে দাও— সকল বেদনা ও মৃত্যু ক্ষণিক ছায়ামাত্র; যে অন্ধকার শক্তি আমার ও তোমার সত্যের মাঝে এসে দাঁড়ায়, তা সূর্যোদয়ের পূর্বের কুয়াশা ছাড়া আর কিছু নয়; তুমি একাই চিরকাল আমার, এবং সেই শক্তির গর্বের চেয়েও মহান, যে আমার মানবিকতাকে ভয় দেখিয়ে উপহাস করতে চায়।

আমাকে প্রেমের সর্বোচ্চ সাহস দাও— এ আমার প্রার্থনা; বলার সাহস, করার সাহস, তোমার ইচ্ছায় দুঃখ সহ্য করার সাহস; সবকিছু ত্যাগ করার, কিংবা সকলের দ্বারা পরিত্যক্ত হওয়ার সাহস।

আমাকে প্রেমের সর্বোচ্চ বিশ্বাস দাও— এ আমার প্রার্থনা; মৃত্যুর মধ্যে জীবনের বিশ্বাস, পরাজয়ের মধ্যে জয়ের বিশ্বাস, সৌন্দর্যের দুর্বলতার মধ্যে নিহিত শক্তির বিশ্বাস, সেই বেদনার মর্যাদার বিশ্বাস— যে আঘাত গ্রহণ করে, কিন্তু আঘাত ফিরিয়ে দিতে ঘৃণা বোধ করে।

অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে,
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৯ এপ্রিল, ১৯১৯

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes