
রবীন্দ্রনাথ ও ফ্যাসিবাদ প্রদীপ দাশগুপ্ত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সরাসরি “ফ্যাসিবাদ” শব্দের তাত্ত্বিক বিশ্লেষক বলা যাবে না—কারণ তাঁর প্রধান সৃষ্টিকাল সেই রাজনৈতিক অভিধাটির পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠার আগেও শুরু, এবং তাঁর মননের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মুক্তি, সভ্যতার নৈতিকতা, জাতীয়তাবাদের সীমা, সাম্রাজ্যবাদের হিংসা, আত্মিক স্বাধীনতা ও বিশ্বমানবতার প্রশ্ন। কিন্তু ইতিহাসের এক গভীর পরিহাস এই যে, ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থানের বহু আগে থেকেই রবীন্দ্রনাথ এমন এক রাষ্ট্র-সমালোচনামূলক, ক্ষমতাবিরোধী, অন্ধ জাতীয়তাবাদ-সন্দেহী, ব্যক্তি-স্বাধীনতামুখী চিন্তার ভিত নির্মাণ করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের সঙ্গে অসাধারণভাবে সাযুজ্যপূর্ণ বলে প্রতিভাত হয়। তাঁর প্রবন্ধ, বক্তৃতা, উপন্যাস, নাটক ও চিঠিপত্রে বারবার ফিরে আসে একটি মৌল প্রশ্ন—রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, না মানুষ রাষ্ট্রের যন্ত্রমাত্র? এই প্রশ্নই ফ্যাসিবাদের কেন্দ্রস্থলে আঘাত করে, কারণ ফ্যাসিবাদ ব্যক্তি-মানুষকে বৃহৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের এক অনুগত, নিয়ন্ত্রিত, প্রয়োজনে বলিপ্রদত্ত অংশে পরিণত করতে চায়। রবীন্দ্রনাথ, ঠিক বিপরীতে, মানুষের আত্মিক মর্যাদাকে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে স্থাপন করেন। তাঁর সমগ্র সাহিত্য-দর্শন যেন এই উচ্চারণের নানা রূপ—মানুষ কোনো মেশিনের নাট-বল্টু নয়।
রবীন্দ্রনাথের “Nationalism” (১৯১৭) বক্তৃতামালা, যা জাপান ও আমেরিকায় প্রদত্ত, তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ দলিল। এখানে তিনি পশ্চিমী জাতীয়তাবাদকে কেবল দেশপ্রেম হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন “organized self-interest” বা সংগঠিত স্বার্থপরতার এক যান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে। তিনি লিখেছিলেন, “Nation… is the political and economic union of a people in which they congregate to maximize their power.” তাঁর দৃষ্টিতে, আধুনিক জাতীয়তাবাদ এমন এক শক্তি, যা মানুষের নৈতিক সত্তাকে সংকুচিত করে রাষ্ট্রীয় প্রতিযোগিতার নিষ্ঠুর যন্ত্রে পরিণত করে। ইউরোপীয় শক্তিগুলির সাম্রাজ্যবাদী লালসা, বাণিজ্যিক আগ্রাসন, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং উপনিবেশ দখলের পেছনে তিনি এই “Nation”-এর যন্ত্রবুদ্ধিকেই দেখেছিলেন। এখানেই তাঁর দূরদৃষ্টি বিস্ময়কর: তিনি বুঝেছিলেন, জাতীয়তাবাদ যখন মানবতার উপর আধিপত্য করে, তখন তা কেবল দেশপ্রেম থাকে না—তা এক আক্রমণাত্মক মতাদর্শে রূপ নেয়। পরবর্তীকালে মুসোলিনি ও হিটলারের ফ্যাসিবাদ সেই যুক্তিকেই চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতায় বাস্তবায়িত করে। রবীন্দ্রনাথ তাই জাতীয়তাবাদের বিরোধী নন, কিন্তু জাতীয়তাবাদের উন্মত্ত, যান্ত্রিক, নীতিহীন রূপের বিরোধী। তাঁর আপত্তি সেই রাজনৈতিক ধর্মে, যেখানে “দেশ” এক বিমূর্ত দেবতা, যার চরণে মানুষ, বিবেক, স্বাধীনতা—সব উৎসর্গযোগ্য। এই অবস্থান বোঝার জন্য “ঘরে বাইরে” (১৯১৬) এক অনন্য উপন্যাস। সন্দীপ চরিত্রটি কেবল স্বদেশি আন্দোলনের এক বিকৃত প্রতিচ্ছবি নয়; সে আবেগ-উদ্দীপক রাজনৈতিক পপুলিজমের এক প্রাথমিক মডেল। সন্দীপ বলে, “আমি দেশকে ভালোবাসি না, আমি দেশকে ব্যবহার করি।” এই উক্তির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দেখান ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতির সেই কৌশল, যেখানে দেশপ্রেম এক নৈতিক সাধনা নয়, জনতাকে প্রভাবিত করার অস্ত্র। সন্দীপ জনগণকে উত্তেজিত করে, নারীর আবেগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে প্রতীকী উন্মাদনা সৃষ্টি করে। ফ্যাসিবাদী নেতারাও ঠিক তাই করে—তারা জনগণের আহত অহং, ভয়, বঞ্চনা ও পরিচয়-সংকটকে ব্যবহার করে ব্যক্তিপূজা ও গণ-উন্মাদনা নির্মাণ করে। বিপরীতে নিখিলেশ বলেন, “দেশকে আমি সেবা করতে রাজি আছি, বন্দনা করতে নয়।” এই লাইনটি রবীন্দ্র-রাজনৈতিক দর্শনের সারাংশ। দেশ যদি সত্যের বিরুদ্ধে যায়, তবে দেশও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। ফ্যাসিবাদ যেখানে রাষ্ট্রকে পূজা চায়, রবীন্দ্রনাথ সেখানে নৈতিক বিচারকে অগ্রাধিকার দেন।
“চার অধ্যায়” উপন্যাসেও রবীন্দ্রনাথ বিপ্লবী রাজনীতির মধ্যে কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার বিপদ দেখেছিলেন। ইন্দ্রনাথ চরিত্রটি এক সংগঠক, যার কাছে ব্যক্তি-মানুষের চেয়ে সংগঠন বড়। প্রেম, নৈতিকতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—সবই বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্যের কাছে তুচ্ছ। এ যেন রাজনৈতিক মতাদর্শ যখন মানুষের অন্তর্জীবনকে গ্রাস করে, তখন তার স্বরূপ কেমন হয় তার শিল্পরূপ। ফ্যাসিবাদও তাই—রাষ্ট্রের নামে ব্যক্তি-সত্তার বিলোপ। রবীন্দ্রনাথ এই বিপদকে কেবল ডানপন্থী বা বামপন্থী কোনো একক রাজনৈতিক রেখায় দেখেননি; তিনি দেখেছেন সব ধরনের মতাদর্শিক সর্বগ্রাসিতার মধ্যে।
রবীন্দ্রনাথের নাটক “রক্তকরবী” সম্ভবত তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা-সমালোচনামূলক সৃষ্টি। যক্ষপুরীর রাজা অদৃশ্য; কিন্তু তার ক্ষমতা সর্বত্র। শ্রমিকেরা নাম হারিয়েছে, তারা সংখ্যা; তাদের কাজ কেবল সোনা উৎপাদন। এখানে রাষ্ট্র, পুঁজিশক্তি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশেছে। শ্রমিকদের মানবিকতা মুছে গেছে, তারা কেবল উৎপাদন-যন্ত্র। এই নামহীনতা ফ্যাসিবাদের একটি মূল কৌশল—ব্যক্তিকে পরিচয়হীন সমষ্টিতে রূপান্তর। নন্দিনী সেখানে জীবনের আহ্বান, প্রেমের স্বাধীনতা, স্বতঃস্ফূর্ততার শক্তি। নন্দিনীর উপস্থিতি যক্ষপুরীর কাঠামোকে অস্থির করে, কারণ স্বাধীন প্রাণশক্তি যান্ত্রিক ক্ষমতার সবচেয়ে বড় শত্রু। “মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ”—রবীন্দ্রনাথের এই বিখ্যাত উচ্চারণ “সভ্যতার সংকট”-এ যতটা স্পষ্ট, “রক্তকরবী”-তেও তার নাট্যরূপ ততটাই প্রবল। ফ্যাসিবাদ মানুষের উপর বিশ্বাস করে না; সে নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করে। রবীন্দ্রনাথ মানুষের মুক্ত সৃজনশীলতায় বিশ্বাস করেন। “মুক্তধারা” নাটকে যন্ত্রসভ্যতা ও ক্ষমতার সম্পর্ক আরও সরাসরি। বিভূতির নির্মিত বাঁধ কেবল প্রযুক্তির প্রতীক নয়; এটি প্রাকৃতিক প্রবাহ, মানুষের জীবন ও স্বাধীনতার উপর কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ। রাজশক্তি জল নিয়ন্ত্রণ করে মানুষকে বশ মানাতে চায়। অভিজিৎ সেই বাঁধ ভেঙে দেয়—এ এক প্রতীকী মুক্তি। প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়; কিন্তু প্রযুক্তি যখন দমননীতির সহায়ক হয়, তখন তা অমানবিক। ফ্যাসিবাদ আধুনিক প্রযুক্তি, প্রচারযন্ত্র, প্রশাসনিক কাঠামো ও সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করে সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। রবীন্দ্রনাথ এই আধুনিকতার অন্ধকার দিক বুঝেছিলেন।
“সভ্যতার সংকট” (১৯৪১) প্রবন্ধে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, তাঁর হতাশা গভীর হলেও মানবতার উপর আস্থা নষ্ট হয়নি। তিনি ইউরোপীয় সভ্যতার আত্মম্ভরিতা, ঔপনিবেশিক লোভ ও হিংসাকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি দেখলেন, যে ইউরোপ মানবতাবাদ, যুক্তি ও উদারতার দাবি করেছিল, সেই ইউরোপই যুদ্ধ, দখলদারিত্ব ও বর্বরতার উৎসে পরিণত হয়েছে। যদিও প্রবন্ধটির কেন্দ্রে কেবল ফ্যাসিবাদ নয়, তবু নাৎসিবাদ-ফ্যাসিবাদের উত্থান তার পটভূমিতে সক্রিয়। তাঁর উদ্বেগ ছিল—সভ্যতা যদি শক্তির পূজায় আত্মসমর্পণ করে, তবে মানুষ তার আত্মা হারাবে। এখানেই তাঁর মানবতাবাদ রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ইতালি-সফর ও মুসোলিনি-সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমদিকে ইতালির রাষ্ট্রসংগঠনের বাহ্যিক শৃঙ্খলা তাঁকে কিছুটা আকৃষ্ট করেছিল—এটি তাঁর মানবিক কৌতূহলের অংশ। কিন্তু খুব দ্রুত তিনি বুঝতে পারেন, এই শৃঙ্খলার ভিতরে আছে মতপ্রকাশের দমন, ব্যক্তিপূজা, স্বাধীনতার সংকোচন। তাঁর মোহভঙ্গ ঘটে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, রবীন্দ্রনাথ শৃঙ্খলার মূল্য বুঝতেন, কিন্তু স্বাধীনতাহীন শৃঙ্খলাকে প্রত্যাখ্যান করতেন। ফ্যাসিবাদ বাহ্যিক দক্ষতা দেখাতে পারে, কিন্তু তার মূল্য যদি মানবমর্যাদার বিনিময়ে হয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
শিক্ষা নিয়ে তাঁর চিন্তাও ফ্যাসিবাদ-বিরোধী। শান্তিনিকেতন কোনো জাতীয়তাবাদী ক্যাডার তৈরির প্রকল্প ছিল না; ছিল মুক্তচিন্তার বিদ্যালয়। প্রকৃতির মধ্যে শিক্ষা, শিল্পচর্চা, আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি-বিনিময়, ভাষা ও সভ্যতার পারস্পরিক পরিচয়—এসবের মাধ্যমে তিনি এমন মানুষ গড়তে চেয়েছিলেন, যে সংকীর্ণ পরিচয়ের বাইরে ভাবতে পারে। ফ্যাসিবাদ শিক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে সমরূপতা, আনুগত্য ও প্রচার তৈরি করতে; রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা দিয়ে তৈরি করতে চান স্বাধীন বিবেক। তাঁর বিশ্বভারতীর মূলমন্ত্র—“যত্র বিশ্ব ভবত্যেকনীড়ম”—বিশ্বকে এক নীড় ভাবা। ফ্যাসিবাদ “অন্য”-কে শত্রু বানায়; রবীন্দ্রনাথ “অন্য”-র মধ্যে আত্মীয়তা খোঁজেন। ধর্ম সম্পর্কেও তাঁর অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্যাসিবাদ প্রায়ই সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় পরিচয়কে একমাত্রিক রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে। রবীন্দ্রনাথ ধর্মকে দেখেন আত্মিক মুক্তির পথ হিসেবে, প্রতিষ্ঠানগত আধিপত্য হিসেবে নয়। তাঁর “ধর্ম” মানুষের মধ্যে বিভাজন নয়, ঐক্য খোঁজে। তাই তিনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধী। “গোরা” উপন্যাসে পরিচয়, জাতি, ধর্ম ও জাতীয়তার প্রশ্নকে তিনি এমনভাবে জটিল করেন যে কোনো একরৈখিক পরিচয় রাজনীতি সেখানে টেকে না। গোরা যখন জানতে পারে তার জন্মপরিচয় ভিন্ন, তখন তার আত্মপরিচয়-সংকট আসলে পরিচয়-রাজনীতির সীমা ভেঙে দেয়। মানুষ কি কেবল জন্মপরিচয়ে নির্ধারিত? রবীন্দ্রনাথের উত্তর—না। ফ্যাসিবাদ বলে—হ্যাঁ।
রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত প্রার্থনা, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,” একে শুধু ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কবিতা হিসেবে পড়লে কম পড়া হয়। এটি সব ধরনের ভয়-রাজনীতির বিরুদ্ধে। ফ্যাসিবাদ ভয়কে ব্যবহার করে—রাষ্ট্রশত্রু, জাতিশত্রু, বর্ণশত্রু, মতশত্রুর ভয়। রবীন্দ্রনাথ ভয়শূন্য চিত্ত চান, কারণ ভীত মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করে না। “জ্ঞান যেথা মুক্ত”—এ লাইন ফ্যাসিবাদী সেন্সরশিপের সম্পূর্ণ বিপরীত। আজকের পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথের এই চিন্তা আরও প্রাসঙ্গিক। যখন নানা দেশে সংখ্যাগুরুবাদ, নেতাপূজা, মতভেদ-অসহিষ্ণুতা, তথ্য-প্রচারযন্ত্রের অপব্যবহার, সাংস্কৃতিক একরূপতা, শত্রু-নির্মাণের রাজনীতি বাড়ছে, তখন রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে করিয়ে দেন—সভ্যতার মূল প্রশ্ন অর্থনীতি বা সামরিক শক্তি নয়; মানুষের মর্যাদা। তিনি দেশপ্রেমকে নস্যাৎ করেননি; তাকে নৈতিকতার অধীন করেছেন। তিনি আধুনিকতাকে বাতিল করেননি; তাকে মানবতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত দেখতে চেয়েছেন। তিনি রাষ্ট্রকে অস্বীকার করেননি; রাষ্ট্রকে মানুষের সেবক হতে বলেছেন, প্রভু নয়।
রবীন্দ্রনাথের ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতা তাই কোনো দলীয় অবস্থান নয়; এটি এক গভীর সভ্যতামূলক অবস্থান। তাঁর সাহিত্য আমাদের শেখায়, ক্ষমতার সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ সেই, যা নিজেকে চূড়ান্ত সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করে। তাঁর মানবতাবাদ শেখায়, কোনো জাতি, ধর্ম, রাষ্ট্র বা মতাদর্শ মানুষের চেয়ে বড় নয়। তাঁর শিল্প দেখায়, স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়—এটি মানুষের অন্তরের শ্বাসপ্রশ্বাস। “একলা চলো রে” কেবল ব্যক্তিগত সাহসের গান নয়; এটি জনতার উন্মত্ততার বিরুদ্ধে বিবেকের একক পদক্ষেপও হতে পারে। সুতরাং, রবীন্দ্রনাথকে পড়া মানে কেবল কবিতা পড়া নয়; আধুনিক ক্ষমতার ভাষা বিশ্লেষণ করা। তাঁর রচনায় আমরা পাই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে পূর্বাভাস, সতর্কতা ও প্রতিষেধক—মানুষের স্বাধীন চেতনা, নৈতিক সাহস, বৈচিত্র্যের মর্যাদা, এবং বিশ্বমানবতার বোধ। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সভ্যতার সঙ্কটের সময়ে সবচেয়ে বড় কাজ হলো মানুষের উপর বিশ্বাস না হারানো। কারণ ফ্যাসিবাদ শেষ পর্যন্ত মানুষের উপর অবিশ্বাসের রাজনীতি; রবীন্দ্রনাথ তার বিপরীতে মানুষের সম্ভাবনার কবি। তাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বলে—রাষ্ট্র যদি মানুষের আত্মাকে গ্রাস করে, তবে তাকে প্রশ্ন করো; জাতীয়তাবাদ যদি মানবতাকে হত্যা করে, তবে তাকে প্রতিরোধ করো; আর যদি চারদিকে ভয়ের প্রাচীর ওঠে, তবে “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য” সেই স্বপ্নটিকে বাঁচিয়ে রাখো। এ শুধু সাহিত্যিক উত্তরাধিকার নয়, গণতান্ত্রিক সভ্যতার নৈতিক শর্ত।

