
অনুবাদ সম্পর্কে যে দু-একটি কথা আমি জানি
সন্দীপন চক্রবর্তী
শব্দব্রহ্ম। শব্দই নাকি ব্রহ্ম। তাহলে কোনো নির্দিষ্ট ভাষার কোনো নির্দিষ্ট শব্দের কি অনুবাদ সম্ভব? অথচ আমাদের জীবনের অধিকাংশ জ্ঞানই তো অনুবাদের মাধ্যমে পাই আমরা। আবার প্রশ্ন উঠতে পারে যে, কোনো একটি ভাষার কোনো একটি শব্দও কি সবসময় একরকম? ধরা যাক, একটি শিশু যখন প্রথম উচ্চারণ করতে শেখে, সেই ‘মা’ শব্দের মাধুর্য কি সাধারণভাবে বলা মা উচ্চারণের সমান? অথচ একই তো শব্দ!
আবার কোনো শব্দকেই কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে নিলে তা খুব বেশিদূর অর্থবাহী হয়ে উঠতে পারে না। অন্যান্য শব্দের সঙ্গে সংযোগ একধরনের গ্রন্থনার মধ্যে দিয়ে তাকে অনেক বেশি অর্থময় বা অর্থের বহুকৌণিক দ্যুতিময় করে তুলতে পারে। তাকে তার সেই আবহের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করা যায় না। সেই সমগ্রতার সাপেক্ষেই তাকে বিচার করতে হয়। বিশেষত সাহিত্যে ঠিক সেটাই হয়। সেজন্যই হয়তো সাহিত্যের অনুবাদের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটা বারবার উঠে আসে যে – ‘সত্যি কি কোনও টেক্সটের অনুবাদ হয়, না কি সেই টেক্সট-এর ছায়ায় অন্য একটি লেখা লিখিত হয়’? কারণ এক ভাষায় একটি শব্দের সংস্থাপন অন্য ভাষায় কি অবিকল আনা যায়? দুটি আলাদা ভাষার সংস্থাপনের ধারা তো তাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসগতভাবেই আলাদা!
এই অনুবাদ কথাটার সূত্র ধরে অবধারিতভাবেই উঠে আসে অনেকগুলো প্রশ্ন — কিসের অনুবাদ? কোন ভাষা থেকে কোন ভাষায় অনুবাদ? কোন সময়ে করা অনুবাদ? কিন্তু এত প্রশ্নের প্রয়োজন কেন? একে একে কারণগুলো খোঁজা যাক।
এই অনুবাদ ব্যাপারটা আবার কবিতার ক্ষেত্রে একরকম, উপন্যাস বা গল্পের ক্ষেত্রে আরেকরকম, আবার প্রবন্ধের ক্ষেত্রে আরেকরকম। তাও তো মুক্তগদ্য বা ভ্রমণকাহিনী বা রম্যরচনা এসব নাহয় হিসেব থেকে বাদই দিলাম। এর মধ্যে আমি কথা বলতে পারি শুধুমাত্র কবিতার অনুবাদ নিয়ে। কারণ, আমি মূলত সেটারই চেষ্টা করেছি খানিক।
যে কোনো কবিতাই একধরনের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। আর সাংস্কৃতিক ইতিহাস আবার অনেকটাই স্থান ও কাল-নির্ভর। তাই ভূগোল বা ইতিহাস তার সঙ্গে জড়িত।
ধরা যাক, শেক্সপিয়রের কোনো নির্দিষ্ট একটি কবিতা যদি মধুসূদন বা রবীন্দ্রনাথ বা সুধীন্দ্রনাথ বা অলোকরঞ্জন বা পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল বা শ্রীজাত বাংলায় অনুবাদ করেন, তাহলে সেই একই কবিতার অনুবাদের চেহারাগুলো কি এক হবে? এটা নাহয় আলাদা হবে, বোঝা যায়। কিন্তু আরও গূঢ় একটা প্রশ্ন তার সঙ্গে উঠে আসে — ব্যক্তিগত স্টাইলের ভিন্নতা ছাড়াও, এই প্রত্যেক অনুবাদে বাংলা ভাষার চলন কি সাধারণভাবে এক হবে? অর্থাৎ সাধু বা চলিত রীতির ব্যবহার, শব্দের বাছাই, ক্রিয়াপদের ধারা, কথ্যভঙ্গীর ব্যবহার — এইগুলো? এগুলো আলাদা হবে কেন? কারণ ভাষা সতত সঞ্চরণশীল। তা একজায়গায় থেমে থাকে না। তা ক্রমশই বাঁক বদল করে। ফলে মধুসূদন যে ভাষাভঙ্গী ব্যবহার করতেন কবিতা লেখার সময়ে, সেই ভাষাভঙ্গী এসে অনেক বদলে গেছে শ্রীজাতর সময়ে। তাই বিভিন্ন সময়ে করা অনুবাদে বাংলাভাষার চলনটাই বদলে যেতে বাধ্য। এমনকি ইংরেজি ভাষাও তো আর শেক্সপিয়রের সময়ে থেমে নেই। ফলে এখন দাঁড়িয়ে কিন্তু ইংরেজিতেও শেক্সপিয়রের অনুবাদ করা যায়। আবার যখন শেক্সপিয়র এইসময়ে বাংলায় অনুবাদ করা হচ্ছে, তখন শেক্সপিয়রের সেই সময়কালের কথা মাথায় রেখে, এই সময়ে দাঁড়িয়েও কিন্তু কোনো অনুবাদক খুব সচেতনভাবে পুরোনো বাংলার ভাষাভঙ্গী ব্যবহার করতে পারেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট ভাষা থেকে আরেকটি নির্দিষ্ট ভাষায় অনুবাদ করার সময়েও কিন্তু এক হাজারদুয়ারি সম্ভাবনা থেকে যায়।
আবার ধরা যাক, ইংরেজির কথা ছেড়ে, যদি সংস্কৃতিগতভাবে অন্য কোনো ইয়োরোপীয় ভাষার কথা ভাবি, তাহলে দেখবো — তার থেকে বাংলাভাষার সংস্কৃতিগত দূরত্ব অনেক বেশি। কিন্তু ভারতীয় কোনো ভাষার — ধরা যাক, হিন্দি — সঙ্গে বাংলার সাংস্কৃতিক দূরত্ব তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে হিন্দি থেকে যদি বাংলায় অনুবাদ করি, তখন ওই দূরত্ব অতিক্রম করা বা ওই দূরত্বের মধ্যে একটা সেতুবন্ধন করা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ।
নিজের করা সামান্য অনুবাদ প্রচেষ্টার অভিজ্ঞতার দিক থেকে বরং এবার এই সমস্যাকে স্পর্শ করার খানিক চেষ্টা করা যাক। আমি নিজে কীভাবে অনুবাদের কাজ করি, সেটাই একটু বলি।
সাধারণভাবে, কবিতাই যেহেতু আমার মূল চর্চার বিষয়, তাই আমি অনুবাদের জন্য সাধারণভাবে বেছে নিই ভারতীয় কোনো ভাষার কবিতা। ওই সাংস্কৃতিক সমীপতার কারণে। তার মধ্যেও আমার একটু ঝোঁক থাকে হিন্দি বা উর্দু কবিতার দিকে। তার কারণও খুব সহজ — এই দুটো ভাষা আমি সরাসরি খানিকটা হলেও বুঝতে পারি। এইবার অনুবাদের সময়ে, আমার প্রথম কাজ হলো — একেবারে হুবহু লাইন ধরে ধরে তাকে আক্ষরিকভাবে বাংলায় অনুবাদ করা। এইবার দেখি যে, তার সামগ্রিকভাবে কোনো অর্থ দাঁড়াচ্ছে কিনা। অনেকসময়ই দেখা যায়, মূল লেখায় যেভাবে লাইন সাজানো, ঠিক সেই সেই অর্ডারে বাংলা রাখলে কোনো প্রপার সিনট্যাক্স আসছে না বাংলায়। তখন প্রথম লড়াই হলো যে, কী করে লাইনের ওই বিন্যাস অক্ষুণ্ন রেখেই বাংলায় প্রপার সিনট্যাক্স করা যায়। এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপের লড়াই। সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি আর পরিশ্রমের লড়াই। বারবার মূল লেখা পড়ে, তার প্রতিটি শব্দের ব্যবহার কেন এবং কীভাবে হয়েছে তা বোঝার চেষ্টা করা। এবং ওই আক্ষরিক বাংলা অনুবাদের মধ্যেই কোন শব্দ কোথায় কীভাবে যোজনা করলে ওই মূলের শব্দব্যবহারের চাঁদমারিতে বিদ্ধ করা যায়, তার সন্ধান। এর পাশাপাশি লক্ষ্য থাকে, যেন এটা করতে গিয়ে আক্ষরিক অনুবাদ থেকে সরে না যাই। শব্দের দিক থেকে বিচ্যুত না হলেও, অনেকসময়ে ভাষাগত কারণে যতিচিহ্নগত কিছু পরিবর্তন করতে হয় মূলের থেকে। তারও পরে একটা ধাপ আছে। সেখানে গিয়ে খেয়াল করতে হয় যে, এই যে বাংলা অনুবাদ, এটা কি কোনো আড়ষ্ট অনুবাদ পড়ছি মনে হচ্ছে? নাকি কোনো বাংলা কবিতাই পড়ছি মনে হচ্ছে? এই বাংলা কবিতাই পড়ছি যাতে মনে হয়, এবার শুরু হয় সেই চেষ্টা। অথচ তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হয়, যাতে মূলের আক্ষরিক অনুবাদ থেকে তা বিচ্যুত না হয়। এমনকি মূল ভাষার এমন কোনো শব্দ, যা সাধারণ বাঙালির কাছে পরিচিত বা বাংলাতেও কখনও কখনও ব্যবহার হয়, তাকে হয়তো অবিকল তার মূলের চেহারাতেই রেখে দেওয়ার চেষ্টা করি। তাতে মূলের ফ্লেভারটা স্বাভাবিকভাবেই খানিকটা হলেও ঢুকে আসে অনুবাদে।
এভাবেই বারবার পরিমার্জন ও সংশোধনের মধ্যে দিয়ে একটা অনুবাদের কাজ সম্পন্ন হয়।

