
অনুবাদক ও অনুবাদ: কিছু ভাবনা
অরুণাভ ঘোষ
ইংরেজিতে অনুবাদ নিয়ে একটি আপাত লিঙ্গ-বিদ্বেষী রসিকতা চালু আছে – translations are like women; they are either beautiful or faithful – অস্যার্থ, মূলানুগ অনুবাদ সুন্দর হতে পারে না। এখানেই এসে পড়ে অনুবাদকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। অনুবাদটিকে সুন্দর করতে তাঁর প্রচেষ্টা। ‘সুন্দর’ নিয়ে তখন উঠে যাবে প্রশ্ন। কাকে বলা হবে ‘সুন্দর’? মূলের প্রতি বিশ্বস্ত না থেকে যদি অনুবাদ কর্মটি চমৎকার হয় তাহলে সেটি কি সার্থক অনুবাদ বলে গণ্য হবে? মূল টেক্সটের ছায়ায় যদি অন্য একটি লেখা তৈরি হয় তাকে কি যথার্থ অনুবাদ বলা যাবে? সেখানে অনুবাদের নৈতিকতা নিয়ে আরেক প্রস্থ প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া অসঙ্গত নয়। এবং বর্তমান যুগে নৈতিকতার প্রশ্নটি বহু চর্চিত। অনুবাদতত্ত্বের অলোচনায় তাই এমানুয়েল লেভিনাস-এর (Emmanuel Levinas) ‘অপর’ বিষয়ক দার্শনিক চিন্তার প্রয়োগ স্বাভাবিকভাবেই করা হয়ে থাকে। এই ‘অপর’ ব্যক্তির থেকে একেবারেই পৃথক এক অস্তিত্ব, এক ‘অপরত্ত্ব’ যার প্রতি ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্ব অপরিসীম কারণ এই অপরত্ত্বকে গ্রহণ করার মধ্য দিয়েই ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। সুতরাং অনুবাদক যখন একটি টেক্সটের অনুবাদ করছেন তখন তিনি একই সঙ্গে অন্য এক ব্যক্তির, অপর এক সত্তার পরিচয় তুলে ধরছেন; নিজের নয়। এখানেই অনুবাদকের নৈতিকতার প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি কি অন্যের পরিচয় যথাসম্ভব সৎ ভাবে প্রকাশ করবেন নাকি নিজের ব্যক্তিত্বের, নিজের অভিজ্ঞতার ছাঁকনি ব্যবহার করবেন? এই কারণে কেউ কেউ মনে করেন অনুবাদকর্মটিই নৈতিকতার নিরিখে সন্দেহজনক আবার কেউ মনে করেন লেখক বা টেক্সটের সঙ্গে অনুবাদকের সম্পর্ক সমমূল্যের আদানপ্রদানের। যাই হোক না কেন, অনুবাদকে একই সঙ্গে বিশ্বস্ত এবং সুন্দর হতে গেলে অনুবাদককে শুধু দক্ষ নয় হতে হবে সংবেদী।
এই পর্যন্ত পড়ে যদি ভেবে থাকেন আমি অনুবাদ বিষয়ে কোনো গভীর তাত্ত্বিক আলোচনায় প্রবেশ করতে চলেছি তাহলে ভুল ভাবছেন। সেই যোগ্যতা আমার নেই। দীর্ঘদিন অনুবাদ কর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে অনুবাদকের ভূমিকা নিয়ে কিছু ধারণা আমার হয়েছে। সে কথাই বলার চেষ্টা করবো এখানে। তবে অনুবাদকে বাদ দিয়ে তো আর অনুবাদককে নিয়ে কোনো কথা হতে পারে না, তাই প্রথমে অনুবাদ নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার।
অনুবাদ শব্দটির আভিধানিক অর্থ কথিত বিষয়ের পুনঃকথন বা পুনরুক্তি। সেই হিসেবে ভাষান্তরে পুনঃকথনকে বলা যায় ভাষান্তরকরণ আর সে ভাবেই অনুবাদ হয়ে উঠেছে ভাষান্তরকরণের ব্যবহারিক প্রতিশব্দ। বাংলায় আরো একটি শব্দ আছে – তরজমা। আরবি তরজুমা থেকে আসা এই শব্দটিও অনুবাদের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তরজুমা-র প্রকৃত অর্থ স্থানান্তরণ (transfer)। সেই ব্যঞ্জনায় একটি ভাষাকে অন্য ভাষায় স্থানান্তরণকে তরজুমা বলা হয়, বাংলায় যা তরজমা হয়েছে। ইংরাজিতে translation শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। সেটিরও উৎপত্তি ল্যাটিন ট্রান্সলাটিও (translatio) শব্দে যার অর্থ পার করে বা বহন করে নিয়ে আসা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে অনুবাদ, তরজমা বা ট্রানস্লেশন যাই বলি না কেন সেখানে একটা ভাষা থেকে অন্য একটি ভাষায় যাওয়ার ব্যাপার থাকছে। এর থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট – অনুবাদে একটি ভাষা থেকে অন্য একটি ভাষায় যাওয়ার সময়ে উৎস ভাষার (source language) বক্তব্য যেন যতদূর সম্ভব উদ্দিষ্ট বা লক্ষ্য ভাষায় (target language) অক্ষুণ্ণ থাকে। অর্থাৎ ভাষান্তরণের সময় জরুরি কিছু যেন হারিয়ে না যায়।
অনুবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্বতন্ত্র একটি বিদ্যাচর্চা যাকে translation studies নাম দেওয়া হয়েছে। সেখানে interdisciplinary পদ্ধতি ব্যবহার করে ভাষাবিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, দর্শন, semiotics ইত্যাদির সাহয্যে এবং সংমিশ্রণে অনুবাদের তত্ত্ব, পদ্ধতি, বিবরণ চর্চা করা হয়। আমদের বর্তমান লক্ষ্য অনুবাদ-চর্চা নয়। মনে রাখা ভালো যে অনুবাদ না হলে এই চর্চাও হত না। আর অনুবাদ প্রক্রিয়া অতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। উদাহরণ হিসেবে বলা চলে প্রাচীন গ্রিক দর্শন ও সাহিত্য রোম সাম্রাজ্যের উন্নতির কালে ল্যাটিনে অনূদিত হয় আর তারপর বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে। সংস্কৃতের বহু টেক্সট পালিতে পরিবর্তন করা হয়। মোগল আমলে সংস্কৃতে লেখা দর্শন এবং সাহিত্য ফারসীতে অনুবাদ হয়। যেমন শাহজাহানের পুত্র দারা শিকোহ একাধিক উপনিষদের ফারসী অনুবাদ করেন।
আমরা প্রথমে দেখে নেব অনুবাদের বিভিন্ন পদ্ধতি, প্রক্রিয়া এবং আদর্শ। জন ড্রাইডেন ১৭ শতকের ইংল্যান্ডের poet laureate বা রাজকবি থাকার সময়ে ল্যাটিন থেকে কবি ওভিডের রচনা অনুবাদ করেন। ১৬৮০-তে প্রকাশিত তাঁর Preface to Ovid’s Epistles-এ ড্রাইডেন অনুবাদকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেন – Metaphrase, Paraphrase আর Imitation। মেটাফ্রেজ হল শব্দ ধরে, লাইন ধরে অনুবাদ যাকে আমরা আক্ষরিক অনুবাদ বলতে পারি। প্যারাফ্রেজে অনুবাদক মূলের শব্দকে হুবহু অনুসরণ না করে অর্থকে অনুসরণ করেন, ফলে আমরা পাই বিশ্বস্ত কিন্তু অনেকটাই স্বাধীন অনুবাদ। ইমিটেশন শব্দটি ড্রাইডেন ব্যবহার করেছেন অনুকৃতি অর্থে; অর্থাৎ মূল টেক্সটকে অবলম্বন করে একটি স্বতন্ত্র রচনা। উদাহরণ হিসেবে আমরা উল্লেখ করতে পারি বাল্মীকির রামায়ণ। সেই মহাকাব্যকে অনুসরণ করে, অবলম্বন করে কৃত্তিবাস যে রামায়ণ রচনা করেন তা মূল কাহিনির কাঠামো বজায় রেখেও বহুলাংশে তাঁর নিজেরই সৃষ্টি। সুতরাং ড্রাইডেন বর্ণিত ইমিটেশনকে অনুবাদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কারণ নেই।
অনুবাদের প্রধানত দুটি আদর্শ বা তত্ত্ব আমরা দেখতে পাই। প্রথমটিতে মুখ্যত জোর দেওয়া হয় মূলের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য এবং বাক্যাংশ, তার অর্থ যেন অনুবাদে মূলানুগ হয়। দ্বিতীয়টিতে লক্ষ্য হল এমন একটি অনুবাদ তৈরি করা যেটি উৎস ভাষার টেক্সটিকে উদ্দিষ্ট ভাষায় এমন ভাবে ভাষান্তরিত করবে যাতে মনে হয় মূল টেক্সটি উদ্দিষ্ট ভাষাতেই লেখা। অর্থাৎ উৎস ভাষার যে স্বাচ্ছন্দ্য তা যেন উদ্দিষ্ট ভাষাতেও বজায় থাকে, যেন অনুবাদটিকে আড়ষ্ট না মনে হয়।
এই দুটি তত্ত্ব পর্যালোচনা করলে স্বাভাবিকভাবে যে বিষয়টি নজরে আসে তা হল অনুবাদকের ভূমিকা (ভুলে গিয়ে থাকলে আরো একবার প্রথম অনুচ্ছেদটি পড়ে নিন)। অনুবাদের চেহারা কী হবে তা নির্ধারিত হয় অনুবাদকের নির্বাচিত পদ্ধতির সাপেক্ষে। অর্থাৎ অনুবাদক কতটা মূলানুগ থাকবেন আর কতটা স্বাধীনতা নেবেন তার ওপর নির্ভর করে অনুবাদের প্রকৃতি। প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে অনুবাদক আসলে বার্তা বাহক। একটি ভাষায় যে বার্তাটি লেখা হয়েছে অনুবাদক অন্য একটি ভাষার পাঠকের কাছে সেই বার্তা যতদূর সম্ভব বিশ্বস্ততার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন; তিনি কোনও ভাবেই লেখাটির বা বার্তাটির স্রষ্টা ন’ন। লেখক নিজে অনুবাদক হলে নিজের লেখা নিয়ে যতটা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারেন, অনুবাদক সেটা পারেন না। রবীন্দ্রনাথ গীতাঞ্জলিকে যখন Song Offerings নামে অনুবাদ করেন তখন সেই অনুবাদে ত্রুটি থাকলেও আপত্তির জায়গা নেই কারণ পরিবর্তন, পরিমার্জনা, পরিবর্ধন যা-ই তিনি করে থাকুন না কেন সেটি তাঁর নিজের স্বাধীন রচনা। এই স্বাধীনতা অনুবাদক পেতে পারেন না। সুতরাং এই বিতর্ক চলতেই থাকে যে অনুবাদকের কাজটা আসলে কী – পাঠককে টেক্স্টের কাছে নিয়ে যাওয়া নাকি টেক্স্টটা পাঠকের কাছে নিয়ে আসা।
ভুলে গেলে চলবে না অনুবাদ শুধু সাহিত্যেরই হয় না, অন্য অনেক কিছুরই হয়। কিন্তু সেগুলির সমস্যা ভিন্ন। টেকনিক্যাল অনুবাদ দুনিয়ায় প্রচুর হয় কিন্তু সেখানে সাংস্কৃতিক বার্তা বহনের বিশেষ প্রয়োজন হয় না। একদমই যে হয় না তা কিন্তু নয়। প্রথম যখন পেপসির বিজ্ঞাপন চীনে প্রকাশিত হয় তখন ইংরেজি ক্যাচলাইন ‘Pepsi gives you zest for life’ থেকে চিনা ভাষায় করা আক্ষরিক অনুবাদের মানে দাঁড়ায় ‘পেপসি তোমার পূর্বপুরুষকে কবর থেকে ফিরিয়ে আনে’!! কিন্তু সাহিত্য, যেখানে সাংস্কৃতিক বার্তার স্থানান্তরণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে দুটি সংস্কৃতির বিভিন্ন সূক্ষ্মতা, খুঁটিনাটি অনুবাদকের জানা থাকাটা জরুরি। সুতরাং অনুবাদক যদি লেখকের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ রেখে চলতে পারেন তাহলে অনুবাদের কাজটি ভালো হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। দুটি উদাহরণ পেশ করি এখানে। প্রথমটি লিও তলস্তয়, দ্বিতীয়টি গীতাঞ্জলি শ্রী। তলস্তয়ের প্রথম ইংরেজি অনুবাদক ছিলেন এক ব্রিটিশ দম্পতি – আইমার এবং লুইস মৌড (Aylmer and Louise Maude)। প্রায় ত্রিশ বছরের ছোট রাশিয়ায় বসবাসকারী এই দম্পতির সঙ্গে এবং এই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তলস্তয়ের বন্ধুত্ব এবং হৃদ্যতা ছিল। ফলে শুধু তলস্তয়ের সাহিত্য নয়, তাঁর জীবনযাত্রা, তাঁর ভাবনাচিন্তার সঙ্গেও মৌড দম্পতি গভীরভাবে পরিচিত ছিলেন। ১৮৯৭ সালে মৌড দম্পতি রাশিয়া থেকে ব্রিটেনে চলে এলেও তলস্তয়ের সঙ্গে আইমারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। তিনি একাধিকবার রাশিয়া গেছেন তলস্তয়ের সঙ্গে দেখা করতে। বস্তুত তলস্তয়ের অনুমতিক্রমে আইমার তাঁর জীবনীও রচনা করেছিলেন। লেখকের সঙ্গে অনুবাদকের এমন নৈকট্য বিরল বলেই মানতে হবে। মৌড দম্পতিকৃত তলস্তয়ের রচনার অনুবাদকে অনেকাংশে নিখুঁত এবং মূলের স্বাদকে অক্ষুণ্ণ রাখার কৃতিত্ব দিয়েছেন আলোচকেরা। তলস্তয়ের বহু ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে, করেছেন একাধিক বিখ্যাত অনুবাদক। তাঁরাও নিজেদের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। পেঙ্গুইন প্রকাশনা থেকে রোজমেরি এডমন্ডসের (Rosemary Edmonds) অনুবাদ একসময়ে তলস্তয়ের মর্মের সন্ধান দিলেও পরে পেঙ্গুইন অ্যান্থনি ব্রিগসের (Anthony Briggs) অনুবাদকে বেছে নেয় কারণ সেই অনুবাদ ইংরেজ পাঠকের রুচি এবং সমসাময়িক ভাষার সঙ্গে ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ। তলস্তয়ের অনুবাদের তুলনামূলক আলোচনা আমার উদ্দেশ্য নয়। যা বলতে চাইছি তা সরল। তলস্তয় সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার থেকে যিনি যতটাই অনুবাদ করে থাকুন না কেন তাঁকে সে কাজে নিমজ্জিত থাকতে হয়েছে। বুঝতে হয়েছে ভাষা, সংস্কৃতির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুষঙ্গ। মৌড দম্পতি ভাগ্যবান যে তাঁরা সে কাজটিতে তলস্তয়ের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন।
এখানে আমার একটা নিজস্ব ভাবনা জানিয়ে রাখা জরুরি। একটি ইউরোপীয় ভাষা থেকে আরেকটি ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদকালে একজন অনুবাদক একটি বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। সেটি হল ভাষা আলাদা হলেও, তার চলন আলাদা হলেও সংস্কৃতিগতভাবে কিছু মিল থেকে যায় প্রায় প্রতিটি দেশের মধ্যে, ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে। এই মহাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, ধর্মীয় ভাবধারা ইত্যাদি অনেক কিছুর মধ্যেই একটা যৌথ সংস্কৃতির প্রবাহ অস্বীকার করা যায় না। একজন অনুবাদকের এটা একটা মস্ত সুবিধা। অনূদিত ভাষার পাঠককে অনেক কিছুই বুঝিয়ে বলবার দরকার পড়ে না। এই সুবিধাটি অ-ইউরোপীয় ভাষার সাহিত্যের থেকে একটি ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদকের থাকে না। সাংস্কৃতিক ফারাকটিকে উদ্দিষ্ট ভাষায় যথাযথভাবে উপস্থাপনা করার চ্যালেঞ্জ পদে পদে অনুভূত হয়। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। উঠোনে ছড়ানো মুড়ি খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে দুটো চড়াই পাখি। আমাদের কাছে খুবই সহজ এবং পরিচিত দৃশ্য কিন্তু একজন অনুবাদকের কাছে ততটাই কঠিন এই দৃশ্য ইংরেজি বা অন্য যে কোনো ইউরোপীয় ভাষায় সাবলীলভাবে অনুবাদ করা। বিশেষ জোর দিতে চাইছি ‘সাবলীল’ শব্দটির ওপর। উৎস ভাষার টেক্সট উদ্দিষ্ট ভাষায় সাবলীলভাবে ভাষান্তরিত না হলে অনুবাদ সার্থক হয় না। পাঠকপ্রিয়ও নয়।
এখানেই আসি দ্বিতীয় উদাহরণে। ২০২২-এ আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত হিন্দি উপন্যাস ‘রেত সমাধি’। গীতাঞ্জলি শ্রী-র লেখা এই বৃহৎ উপন্যাসটি ইংরেজিতে ‘Tomb of Sand’ নামে অনুবাদ করেছেন ডেইজি রকওয়েল (Daisy Rockwell)। আমেরিকার বাসিন্দা ডেইজি হিন্দি ছাড়াও একাধিক ভারতীয় ভাষায় পারঙ্গম এবং অন্যান্য অনুবাদও করেছেন। অনুবাদক জানাচ্ছেন গীতাঞ্জলি নিজে ভালো ইংরেজি জানলেও হিন্দিতে উপন্যাসটি লিখেছেন যেখানে ইতিহাস, আধুনিক নাগরিক জীবন, বিভিন্ন ভাবধারা, দেশভাগ, লোককথা এবং বিবিধ বিষয় বিধৃত হয়েছে। গীতাঞ্জলি বহুসময়েই শব্দের ধ্বনি নিয়ে খেলা করেছেন তাঁর উপন্যাসে। সেখানে অনুবাদকের করণীয় কী? ডেইজি লিখছেন – ‘What is a translator to do with a text that is focused on its own linguicity (not a real word, I know)? I have striven throughout my translation to recreate the text as an English dhwani of the Hindi, seeking out wordplays, echoes, etymologies, and coinages that feel Hindi-esque. I have included many fragments of poetry, prayer, prose, songs in the original language, alongside their English renderings, and even the occasional fragment of the original that was too good to leave behind. Readers who are not familiar with the South Asian linguistic landscape will find the text packed with words and phrases from Hindi, Urdu, Punjabi and Sanskrit. What they may not realise is that the original text was similarly packed with English.’
যেহেতু ব্যক্তিগতভাবে আমি হিন্দি ভাষাটির সঙ্গে পরিচিত তাই বুঝি কী দুরূহ কাজ করেছেন অনুবাদক – মূলের স্বাদ-গন্ধ অবিকৃত রেখেছেন। কোনো সাধুবাদই এর জন্য যথেষ্ট নয়।
এতক্ষণে কেউ কেউ হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন যে ইউরোপীয় ভাষা থেকে অ-ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদের সমস্যার উল্লেখ করিনি। সঙ্গত কারণেই করিনি। যেহেতু ইংরেজি ছাড়া আর কোনো ইউরোপীয় ভাষায় আমার দখল নেই তাই অ-ইউরোপীয় (পড়ুন বাংলা) ভাষায় অনুবাদ নিয়ে আমি দ্বিধাগ্রস্ত। ইংরেজির বাংলা অনুবাদ পড়ার প্রয়োজন হয় না। অন্য ইউরোপীয় ভাষার সাহিত্য যথাসম্ভব ইংরেজিতেই পড়ি। কিন্তু সমস্যাটি বোধহয় একই থাকে অর্থাৎ উৎসের ইউরোপীয় ভাষার সাংস্কৃতিক উপাদানগুলি উদ্দিষ্ট ভাষায় ভাষান্তরণ করার চ্যালেঞ্জ। তবু ঔপনিবেশিক ইতিহাস হয়তো ইউরোপীয় সংস্কৃতি বুঝতে কিছুটা সাহায্য করে। আমাদের দেশের বিবিধতা সত্ত্বেও সংস্কৃতিগত পরিচয়ের কারণে একটি ভারতীয় ভাষা থেকে অন্য একটি ভারতীয় ভাষায় অনুবাদ তুলনায় সহজ হতে পারে বলে মনে হয়। কিন্তু সেই উদ্যম আজও চোখে পড়ার মতো নয়।
শেষ করার আগে আরও একবার অনুবাদকের ভূমিকা স্মরণ করা যাক। অনুবাদক যেহেতু মূলত বার্তাবাহক সুতরাং উৎস ভাষা এবং লক্ষ্য ভাষা দুটিকে আভিধানিক মাপকাঠিতে জানাই যথেষ্ট নয়, দুটি ভাষার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বিষয়ে অবহিত থাকা প্রয়োজন কারণ দুটি সংস্কৃতির সংযোগ স্থাপিত হয় অনুবাদের মাধ্যমে। এর জন্য অনুবাদককে উৎস ভাষাগোষ্ঠীর ইতিহাস, জীবনযাপন, সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। একই সঙ্গে তাঁকে জানতে হয় অঞ্চলভেদে এবং সময়ভেদে শব্দের প্রায়োগিক বা ব্যবহারিক অর্থও। সময় ও ভাষা দুই-ই প্রবহমান এবং সেটুকু মেনে নিয়েই অনুবাদককে মূলপাঠের বৈশিষ্ট্য এবং রচনাশৈলীকে মাথায় রেখে অনুবাদ করতে হয়। অনুবাদকের কাজটি সহজ নয় বিশেষ করে সাহিত্যকর্মের অনুবাদের সময় কারণ সেখানে শব্দের শুধুমাত্র আভিধানিক অর্থটুকুই যথেষ্ট নয় তার সঙ্গে থাকে দ্যোতনা বা গূঢ়ার্থ। সফল অনুবাদক তিনিই যিনি উৎস ভাষার আভিধানিক, আভিপ্রায়িক এবং দ্যোতনা তিনটি অর্থের মেলবন্ধন করতে পারেন উদ্দিষ্ট বা লক্ষ্য ভাষায় – একেবারে যাকে বলে ত্র্যহস্পর্শ যোগ। সফল অনুবাদ তা-ই যা উৎস ভাষার টেক্সটের অর্থ, গূঢ়ার্থ এবং শৈলীকে লক্ষ্য ভাষায় সাবলীলভাবে বহন করে নিয়ে আসে, ভাষান্তরণে বিশেষ কিছু হারিয়ে না ফেলে।
সুতরাং শেষ পর্যন্ত অনুবাদকের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ নয়। স্রষ্টার অবাধ আকাশ তার নেই।

