ধারাবাহিক উপন্যাস ঋতায়তে (চতুর্থ পর্ব) রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

ধারাবাহিক উপন্যাস ঋতায়তে (চতুর্থ পর্ব) রিনি গঙ্গোপাধ্যায়

আটের দশকের মফসসল শহরে বেড়ে উঠছিল একটি মেয়ে। ঋতি। এক অসুস্থ শৈশবে, ভিড়ের মধ্যেও নির্জনে তার বড়ো হয়ে ওঠা। একটু যত্ন, সামান্য ভালোবাসা না পাওয়া কাঙাল এই মেয়েটির বড়ো হয়ে ওঠা এই উপন্যাসের বিষয়। দমবদ্ধ এক পারিবারিক আবহে অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা মেয়েটির জীবন, তার লড়াই! নারী হিসেবে, অসুন্দর হিসেবে, গরীব হিসেবে এই সমাজ মানসের সঙ্গে তার একার লড়াই। পাশে রয়েছে মা, নিরুপায়, অসহায়। তবু অদম্য জেদ ঋতিকে এগিয়ে দিয়েছে। যদিও এই উপন্যাস ঋতির ক্ষরণের ইতিহাস। তার নির্মল মন, তার নিখাদ ভালোবাসার ক্ষরণ। সমকাল, তার মনবদল, নববইয়ের বিচিত্র পট পরিবর্তন সবই ছুঁয়ে আছে এই উপন্যাসের শরীর! ঋতি কি শেষপর্যন্ত পৌঁছোতে পারবে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে! আজ চতুর্থ পর্ব।

পূর্বে প্রকাশিত– , ,

চতুর্থ পর্ব

৩১
সেদিন দুপুর বেলায় সবে শ্রী একটু শুয়েছে। অনন্তর মিল বন্ধ। ও ঘুমোচ্ছে। ঋতি বারান্দায় বসে বসে অঙ্ক করছিল। বিকেলে ঋতির গানের পিসিমণি আসবেন। এখন ঋতি আর রুশি বাড়িতেই গান শেখে। বিশ্বদেব ওদের বাড়িতেই গান শেখার ব্যবস্থা করেছেন। আরো দু একজন মেয়ে জুটিয়ে এনে একটা ছোটো ব্যাচ করে দিয়েছেন। সেখানে অনন্তর সঙ্গে কাজ করে এক ভদ্রলোকের মেয়ে রয়েছে। অনন্তদের তো বছরে ছ’মাস মিল বন্ধ থাকে। ওই ভদ্রলোক পাশাপাশি অন্য ব্যবসা করেন। মেয়েকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছেন। গান শেখাচ্ছেন। মেয়েটিও ভালো। ঋতিদের থেকে বড়ো। স্কুল থেকে সোজা চলে আসে গান শিখতে। বড়ো ভালো গায় মেয়েটি। টুয়ার এক বন্ধুও এখানে গান শেখে। পিসিমণি এই মেয়েটিকে খুব পছন্দ করেন। যেমন ক্লাসিক বেসড গলা, তেমন জোয়ারি। কিন্তু মহা ফাঁকিবাজ। ওর বাবা রিটায়ার করে কাছেই একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকেন। এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে তার বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেছে।
বিকেল তখনো হয়নি, ফোনটা বেজে উঠল। বিশ্বদেবই ফোন ধরেছে। ওপাশে টুয়ার গলা। দাদা, ওরা আমাকে খুব মেরেছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না দাদা। টুয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের ভেতরই ফোনটা কেটে যায়। বিশ্বদেব তাড়াতাড়ি গিয়ে অনন্তর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে মেজ বৌকে ডাকে। শ্রী বুঝতে পারেনি। ভেবেছে দাদা বোধহয় চা করার জন্য ডাকছে। এই দুপুরবেলাটা ঋতি, রুশি আর বিশ্বদেব মিলে নানা কাণ্ড ঘটান। কখনো তিনজনে মিলে লুকিয়ে লুকিয়ে ফ্রিজের মিষ্টি খেয়ে ফেলে। কখনো দুটো করে আম একসঙ্গে খেয়ে ফেলে। যেন চুরি করে খাচ্ছে এমন চুপি চুপি কাজ সারে। ঋতি আর রুশি ভারি মজা পায়। শ্রী ভেবেছে তেমন কিছু একটা মজা করছে না কি বিশ্বদেব! কিন্তু তাহলে শ্রীকে ডাকবে কেন! শ্রী তাড়াতাড়ি উঠে এসেছে। বিশ্বদেব ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। শ্রী কে দেখেই বলল, টুয়া ফোন করেছিল। তোমার একবার যাওয়া প্রয়োজন! শ্রীর পিঠ দিয়ে যেন একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। কি হবে! বাপিও তো নেই। এই মাস কয়েক হলো শ্রীর বাপি, মা, ভাই, কাকু সবাই মালদায় চলে গেছে। ওখানে শ্রীর বাপির আদি বাড়ি। যদিও একতলা ছোটো বাড়ি ছিল। শ্রীর ছোটোকাকা অন্য বড়ো দাদাদের কাছ থেকে সামান্য টাকার বিনিময়ে বাড়ির অংশ লিখিয়ে নিয়ে বাড়িটাকে দোতলা করেছে। এলাহি কাণ্ড যাকে বলে! এই ছোটোকাকা পার্টি করে। দলের হোলটাইমার। আর কাকিমা প্রাইমারি স্কুলের টিচার। তাদের এ হেন বাড়ি দেখে অবাক হতে হয় বৈকি! দুই ছেলেমেয়ে সামলে এতো টাকা এলো কোথা থেকে! যাই হোক, শ্রীর বাপি নিজের অংশটা ছেড়ে দেননি। তিনি তো রিটায়ার করার পর থেকেই মালদা যেতে চেয়েছেন। কিন্তু ছোটো মেয়ের বিয়ে, ছেলের চাকরি সব সামলে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ছেলেটার পুলিশে চাকরি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাইটটা হাফ ইঞ্চি ছোটো হলো। শ্রীর বাপির কাছে টাকার অফার আসে। পাঁচ হাজার টাকা দিলেই চাকরিটা হয়ে যাবে। কিন্তু বাপি সেখানটায় বেঁকে বসলেন! তিনি সারাজীবনে কখনো ঘুষ নেননি, ঘুষ দেননি, এখনো দেবেন না। অনন্ত শ্বশুরমশাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাপি কিছুতেই রাজি হয়নি। শেষপর্যন্ত শ্রীর পিসেমশাইকে ধরে অনন্তর মিলেই ক্ল্যারিকাল জবে ভাইকে ঢোকানো হলো। কিন্তু ভাই ভীষণ নার্ভাস। সামান্য কিছুতেই ঘাবড়ে যায়। আর ভীষণ নরম মনের মানুষ। সকলের কথা বিশ্বাস করে। ওকে ঠকানো বড়ো সহজ। একদিন মিলের বড়ো বাবু ওকে ডেকে পাঠিয়েছে। ও দৌড়ে দৌড়ে অনন্তর কাছে এসে হাজির। অনন্তদা, বড়োবাবু ডেকেছেন! অনন্ত দেখছে মুখ-চোখ লাল হয়ে গেছে ওর। প্রচণ্ড ঘামছে। অনন্ত ওকে বোঝানোর চেষ্টা করে তোমাকে ডেকেছে নিশ্চয়ই কোনো দরকারে। তুমি এতো ভয় পাচ্ছ কেন!
অনন্ত দা, আপনিও চলুন না আমার সঙ্গে। আমি একা একা যেতে পারব না।
অনন্ত অনেক বুঝিয়েও শেষপর্যন্ত ওর সঙ্গে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু বড়োবাবুর অফিসের সামনে এসে বলে আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি। তুমি যাও। ভাই তারপরও খানিক গাঁইগুঁই করে শেষপর্যন্ত ভেতরে ঢোকে। খানিক বাদে বেরোয় মুখে হাসি নিয়ে। বলে আমাকে উইভিং সেকশনে ট্রান্সফার করা হলো। সেটাই বলার জন্য ডেকেছিলেন। অনন্ত বলল, দেখলে তুমি বৃথাই এতো ভয় পাচ্ছিলে! কিন্তু মিলের চাকরির ওপর তো ভরসা নেই। তাই শ্রীর কাকু বারবার বলতে লাগলেন, নিজের ভিটেয় চল দাদা। ওখানে ঠিক একটা ব্যবস্থা হবে। ছোটো ভাই রয়েছে। পার্টির এতোদিনের মেম্বার! ঠিক একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে! শ্রীর বাপিও আর বাড়ি ভাড়া দিয়ে টানতে পারছিলেন না। ওই কটা টাকা তো পেনশন পান! শেষপর্যন্ত ওরা মালদা যাওয়াই সাব্যস্ত করল! ভাই যদিও একেবারেই যেতে চায়নি। ছোটো থেকে ব্যারাকপুরে বড়ো হয়ে ওঠা। এখানেই তো সবকিছু। কলকাতা শহরেই তো চাকরির সম্ভাবনা বেশি! মালদায় গিয়ে কী হবে! শ্রীর মাও তিন মেয়েকে ছেড়ে এভাবে অতো দূরে যেতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু কাকুর জোরাজুরিতে যেতে বাধ্য হলেন। তারপরই এই ঘটনা। শ্রী তাড়াতাড়ি অনন্তকে ডাকতে এলো। অনন্ত শুনেই বলল, তোমার বাবাকে খবর দাও। আসুক।
সে তো কাল সকালের আগে আসতে পারবে না। আজ, এক্ষুণি যেতে হবে টুয়ার কাছে।
আমি পারবনা শ্রী। নিত্যদিনের এই ঝঞ্ঝাট আমার পোষায় না। আর তাছাড়া আমি কে! আমার কতটুকু অধিকার!
মেয়েটা ওভাবে মার খাচ্ছে শুনেও তুমি যাবে না!
না, যাব না।
বিশ্বদেব সবই শুনতে পাচ্ছিল ওরা যা বলছে। মেজ বৌকে ডেকে বলল, ওকে যেতে হবে না। আমি যাব তোমার সঙ্গে। শ্রী বিশ্বদেবের দিকে একবার তাকাল। বুঝল টুয়াকে বিশ্বদেব মন থেকেই ভালোবাসে।
টুয়ার বাড়িতে পৌঁছেই বিশ্বদেব বুঝলেন কি ভুল করেছেন! সম্পর্ক বড়ো বালাই। সম্পর্ক না থাকলে শুধু ভালোবাসার টানে এগিয়ে যাওয়া যায় না। টুয়ার বর বিশ্বদেবকে দেখেই বলল, উনি কে? উনি কী করতে এসেছেন আমার বাড়িতে!
একথা শোনার আগেই অবশ্য শ্রীর টুয়াকে দেখা হয়ে গেছে। টুয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ওর চোখ মুখে নানা জায়গায় কালসিটে পড়ে গেছে। শ্রী আর দুবার না ভেবে টুয়াকে বলল থানায় চল। টুয়া দিদিকে দেখেই কাঁদতে শুরু করেছে। বিশ্বদেবও বুঝল এই ছেলেটার সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। টুয়াকে নিয়ে থানায় উপস্থিত হলো। থানার ওসি সব শুনে বললেন, আপনারা কি চান যে আমি ৪৯৮ কেস দিয়ে থানায় তুলে আনি? সেটা আমি করতেই পারি। তার জন্য একটা এফআইআর করতে হবে শুধু। কিন্তু তারপর আপনার বোন আর ও বাড়িতে সংসার করতে পারবে?
শ্রী অবাক হয়ে ওসির দিকে তাকিয়ে আছে। ভাবছে পুলিশই যদি একথা বলে, সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়!
বিশ্বদেব কিন্তু ব্যাপারটা বুঝতে পারল। শ্রীর বাবার পক্ষে সম্ভব নয় টুয়া আর ওর ছেলের দায়িত্ব নেয়। টুয়া নিজেও কিছু করে না। এমতাবস্থায় স্বামীর কাছে থেকে যাওয়া ছাড়া ওর গতি নেই।
ওসি বললেন, আপনারা আজ বাড়ি যান। কাল সকালে থানা থেকে লোক যাবে। যা করার আমরা করব। কিন্তু কেস – টেস হলে আপনারাই বিপদে পড়বেন।
অগত্যা, ওই রাতে টুয়াকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে শ্রী আর বিশ্বদেব বাড়ি ফিরল রাত দেড়টায়। দেখল বারান্দায় মাধুরী আর ঋতি জেগে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের জন্য অপেক্ষা করছে।
৩২
রুচিকে যেদিন অন্য কলেজে ভর্তি করা হলো সেদিন থেকে রুচি আবার স্বাভাবিক ব্যবহার শুরু করল। রোজ ঠিক সময়ে কলেজে বেরিয়ে যায়। সেখান থেকে টাইপ শিখতে যায়। একেবারে ক্লাস করে বাড়ি ফেরে। সপ্তাহে একদিন করে দমদমে পড়তে যায়। সেখান থেকে কলেজ করে ফেরে। ফিরতে বেশ দেরি হয়। বিশ্বদেব প্রথমে ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারেনি। ভেবেছিল মেয়েটা একটা ভুল করে ফেলেছে। এই বয়সে তো ইনফ্যাচুয়েশন হয়! ছেলেটাই বদ। মেয়েটার মাথা খেয়েছিল। নইলে রুচি পড়াশোনায় ভালো। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক দুটোতেই ফার্স্ট ডিভিশন! কম কথা!
কিন্তু বিশ্বদেবের এই শান্তিটুকু, এই গর্বটুকু রুচি রাখতে দিল না। রিভারসাইড রোডে বিশ্বদেব একটা কাজে গেছিল। ফেরার সময় ভেবেছিল রুচিকে ওর কলেজ থেকে নিয়ে ফিরবে। কিন্তু কলেজে কোথাও রুচির খোঁজ পাওয়া গেল না।বিশ্বদেব শেষপর্যন্ত জিজ্ঞেস করে করে ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের হেডের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেন। হেড ছিলেন না। অন্য একজন অধ্যাপকের সঙ্গে কথা হলো। তিনি বললেন, দেখুন এতো ছেলেয়েয়ের মধ্যে কে ক্লাস করল, কে করলনা সেটা মনে রাখা সম্ভব নয়। আমাকে অ্যাটেন্ডেসের খাতা দেখে বলতে হবে।
বিশ্বদেব অপেক্ষা করলেন। অধ্যাপক জানালেন, এই নাম তো খাতায় নেই! আপনার মেয়ে এই কলেজেই ভর্তি হয়েছিল!
বিশ্বদেব কি বলবে বুঝতে পারছে না।
অধ্যাপকই বললেন, আপনি একবার অফিসে খোঁজ নিন তো। আপনার মেয়ের নাম খাতায় কেন ওঠেনি!
বিশ্বদেব অফিসে গিয়ে জানতে পারল, এই ক্যান্ডিডেট ভর্তি হয়েছে। কিন্তু একদিনও ক্লাস করেনি। বছরের মাঝখানে ভর্তি হয়েছে। ফলে অফিস থেকে নাম তোলা হয়নি। ছাত্র নিজে থেকে ক্লাসে বা অফিসে এসে বললে, খাতায় নাম তুলে দেওয়া হয়! কিন্তু সেটা যখন হয়নি, তখন বুঝতে হবে এই ছাত্রী ক্লাসে আসেইনি।
বিশ্বদেবের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে। মেয়েটার জন্য সে এতো কিছু করলো। অথচ, মেয়েটার কাছে বাইরের ছেলেটাই বড়ো হলো! বিশ্বদেব বাড়ি ফিরল। বুঝল কোনো প্রমাণ ছাড়া রুচির সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই।
মাধুরী তাড়াতাড়ি বিশ্বদেবকে চা করে দিতে রান্না ঘরে ঢুকেছে। বিশ্বদেবের সব রাগ গিয়ে পড়ল মাধুরীর ওপর। সারাদিন তো রান্নাঘর নিয়ে পড়ে আছ। কাজ করছ, কাজ। মেয়েদের দিকেও তো একটু নজর দিতে পার! কোথায় যাচ্ছে! কি করছে!
মাধুরী এ হেন অপবাদের সামনে গুটিয়ে যায়। সে তো যত্ন করে সংসার করছে! স্বামীর সেবা, মেয়েদের দেখাশোনা সবই তো সে করে। তার সংসারের হাল সে নিজের হাতে রেখেছে। মেজ বৌকে কিছুতেই কর্তৃত্ব ছেড়ে দেয়নি। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজের হাতে সবটা রেখেছে। তারপরও তাকে এই কথা শুনতে হলো!
বিশ্বদেব মাধুরীর সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে অনন্তকে ডেকে পাঠাল। অপদার্থ ভাইটা তো তার ঘাড়ে বসেই খাচ্ছে। মিল বন্ধ বলে আর কোনো কাজের চেষ্টা নেই। বউ – মেয়ে সবসুদ্ধ দাদার ঘাড়ে। না হয় একটা কাজই করুক এবার। অনন্তকে বলল, রুচি সারাদিনে কী করে, কোথায় যায়, কার সঙ্গে দেখা করে সব খবর আমার চাই। কাল ওর সকালবেলা দমদমে পড়তে যাওয়া আছে। তুই যাবি ওর পিছন পিছন। ও যেন বুঝতে না পারে!
পরদিন সকালে রুচি বেরোনোর পরপরই অনন্ত বেরোলো। লেডিসের পাশের বগিটায় উঠে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকল। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর দেখা গেল রুচি বেলঘড়িয়ায় নেমে পড়ল। অনন্তও ওকে আড়াল করে করে ওর পিছনে চলেছে। দেখল একটি লম্বা মতো ছেলে স্টেশনে ওর জন্য অপেক্ষা করছে! দুজনে মিলে হাত ধরাধরি করে স্টেশনের বাইরে অটোতে উঠল। অনন্ত ওদের ধাওয়া করতে করতে শেষপর্যন্ত পৌঁছলো একটি কলোনি এরিয়ায় ছেলেটির বাড়িতে। দূর থেকে খানিক অপেক্ষা করে বুঝল বাড়িতে আরো লোক আছে।
দাদাকে এসে সবটা রিপোর্ট করাতে বিশ্বদেব বুঝলেন মেয়েটা অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে। এবার সরাসরি শাসন না করে উপায় নেই! রুচি, তার রুচি, তাকে এইভাবে ঠকালো। কি না করেছে সে মেয়েদের জন্য। মেয়েরা তার কাছে লক্ষ্মীর মতো! বিশেষ করে রুচি হওয়ার পর বিশ্বদেব যেভাবে দু হাতে উপার্জন করেছে তাতে রুচিকে চিরকাল তার পয়মন্তি বলেই মনে হয়েছে। মেজ বৌ এতো ওর পিছনে লেগে থাকে। মেজ বৌকেই চারটে কথা শুনিয়েছে সে। তবু রুচির দোষ দেখেনি। আর সেই রুচি কি না এইভাবে… বিশ্বদেবের বুকের ভিতরটা চিনচিন করছে!
বেশ সন্ধে করেই রুচি ফিরল। ডাইনিং এই ওকে আটকালো বিশ্বদেব। কোথায় গেছিলে?
পড়তে।
তারপর?
কলেজে।
এতো দেরি হলো যে? টাইপিং এর ক্লাস করে আসছি।
বিশ্বদেব আর সহ্য করতে পারল না। মেয়েটা চোখে চোখ রেখে মিথ্যে বলছে! এতদূর স্পর্ধা! চেয়ার ছেড়ে উঠে ওর গালে ঠাস করে একটা চড় মারল! বেয়াদপ মেয়ে! মুখে মুখে খুব মিথ্যে বলতে শিখেছ না!
চড় খেয়ে রুচি অবাক হয়ে গেছে! বাবা কি করে জানল!
বিশ্বদেব তখন এতোটাই রেগে গেছে যে কাঁপছে! হাঁপাচ্ছে!
রুচি আর না দাঁড়িয়ে ঘরে ঢুকে গেল। ও ঘরে রুশি আর ঋতিও ছিল। ওরা তাড়াতাড়ি দিদিভাইয়ের কাছে দৌড়ে এসেছে। রুচির মুখে কিন্তু সেই ফিচেল হাসি। তোদের দুজনকে একদিন আলাপ করিয়ে দেব, কেমন! ঋতি মনে মনে বিরক্ত হয়। দিদিভাই পড়াশোনাটাও ঠিক মতো করছে না! ফেল করলে কী হবে! জ্যেঠু কত কষ্ট পাচ্ছে। দিদিভাই এমন করে সবাইকে কষ্ট দিচ্ছে কেন! বম্মাও তো কাঁদছে। ঋতি আসতে আসতে সরে এলো ও ঘর থেকে।
৩৩
এতো কিছু যখন ঘোষাল বাড়িতে চলছে, যা ঘোষাল বাড়ির কর্তাকে প্রায় দিশেহারা করে তুলেছে তেমন সময়ই তিনি একদিন মেজবৌকে ডেকে একটা বিজ্ঞাপন হাতে ধরিয়ে দিলেন। শ্রী জিজ্ঞেস করল এটা কী?
পড়েই দেখো।
শ্রী কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখে বলল, এ তো ফ্ল্যাটবাড়ির বিজ্ঞাপন!
হ্যাঁ, তোমার জন্য একটা বুকিং করব না কি! বিশ্বদেবের ঠোঁটের গোড়ায় যেন ষড়যন্ত্রের হাসি!
শ্রী অবাক হয়ে বলল, আমি তো এই বাড়িতে থাকি! এই উত্তরে অনন্তও হেসে উঠেছে।
বিশ্বদেব বলল, মাধুরীর নিজের বাড়ি আছে। ছোটো বৌমারও নিজের সংসার আছে। তোমার ইচ্ছে করে না যে তোমারও একটা সংসার হোক!
একথার আসলে কোনো উত্তর হয় না। যা জীবনে সম্ভবই নয়, তা নিয়ে বোকার মতো স্বপ্ন দেখতে শ্রীর আর মন চায় না। মনটা কেমন বোবা হয়ে গেছে শ্রীর। মনে মনে নিজের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে। অভ্যেসের বশে সে কাজ করে যায়। মেয়েকে পড়ায়। সামান্য কারণে মেয়েটাকে মার খেতে দেখলে আজকাল শুধু একটা কথাই মনে হয়, মেয়েটা না জড়ভড়ৎ তৈরি হয়! ওর পরিণতি বোধহয় আমারই মতো! এইসব মনে হতে হতে চোখের সামনেটা কেমন অন্ধকার হয়ে যায়। যখন চোখ খোলে দেখে অনন্ত মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। ননদ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, ফিটের ব্যামো। লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছে ওর বাবা -মা। অনন্ত দিদিকে চুপ করতে বলে। কিন্তু তার বলার মধ্যে কোনো প্রতিবাদ নেই! চোদ্দো বছর এ সংসারে থেকে এখনো এসব কথা শুনতে হচ্ছে!
বিশ্বদেব বলে ওঠে, কি এতো ভাবছ! তোমার জন্য একটা ফ্ল্যাট বুক করে দিয়েছি। বুঝলে!
শ্রী খুব অবাক হয়! ছোটো ভাইয়ের ফ্ল্যাট তো লোন নিয়ে করেছিল ভাসুর। সে লোন বিজয়দেবই শোধ দিয়েছে। মেজো ভাইয়ের ফ্ল্যাট দাদা কিনে দেবে?
বিশ্বদেব বোধহয় শ্রীর মুখ দেখে কিছু আন্দাজ করেছিল। বলল, ও তো এই বাড়ি করার সময় পঁচিশ হাজার টাকা দিয়েছিল। দশ বছরে তা সুদে আসলে মোটা টাকাই হয়েছে। বাকিটা বুধু লোন নিয়ে ব্যবস্থা করবে। বিজয়ও কিছু দেবে বলেছে।
শ্রী শুনল। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। এদের কোনো কিছুকেই সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না শ্রী। আনন্দ পেতে তার ভয় লাগে। মা বাপী নেই। দুই বোনকে নিয়ে তার কেমন অসহায় লাগে!
সেদিনই বিকেলে অনন্ত শ্রীকে ফ্ল্যাট দেখাতে নিয়ে গেল। বিশ্বদেবের বাড়ি থেকে ৭/৮মিনিটের হাঁটা পথ। জায়গাটা শ্রীর চেনা। কিন্তু এই বিশেষ গলিটাতে কখনো ঢোকা হয়নি। ফ্ল্যাটটা রাস্তা থেকে সামান্যই ভেতরে। একতলার প্রথম ফ্ল্যাটটাই বুকিং করা হয়েছে। এই ফ্ল্যাটটাই দুটো বিল্ডিংয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো। কারণ এর সংলগ্ন একটা গ্যারেজ ঘর বার করা হয়েছে। ফলে একটাই বেডরুম। সামনে ডাইনিং কাম ড্রইং রুম। তার কোলেই রান্নাঘর, বাথরুম। বাথরুমটা সদর দরজার মুখোমুখি। একটাই ভালো যে দুদিকে দুটো বারান্দা আছে। একটা ছোটো, একটা একটু বড়ো। কিন্তু বড়ো বারান্দার সামনে একটা ধোপাখানা আছে। কথা বলে বোঝা গেল ওরা হিন্দুস্তানী। নাম রামশরণ। রাম বলেই সবাই ডাকে। শ্রী আর অনন্তর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই রাস্তার ওপর দুবার থুতু ফেলল রাম। এরা এখানেই থাকে। তিনভাই, এক বিধবা বোন, তার ছেলে, বাবা – মা। শ্রী দেখছিল বৌটা বাইরে বসে রান্না করছে। আর উনুনের ধোঁয়া চারদিকে ছেয়ে যাচ্ছে। চোখ জ্বালা করছে। শ্রী বুঝল এইসব অসুবিধে মানিয়ে নিয়ে থাকতে হবে। সেই গঙ্গোত্তিপাড়ায় একপ্রস্ত হিন্দুস্তানীদের সঙ্গে থাকতে হয়েছে। এখানে এসে আবার। যদিও এ পাড়ায় আর সবাই বাঙালি। বড়ো বড়ো বাড়ি রয়েছে তাদের। এই প্রথম ব্যারাকপুর অঞ্চলে ফ্ল্যাট হচ্ছে।
সব দেখেশুনে এসে শ্রীর সত্যিই খুব আনন্দ হলো। এতোদিনে সত্যিই তার নিজের একটা সংসার হবে! আর কারো আশ্রয়ে, কারো পায়ের তলায় তাকে দয়া ভিক্ষে করে থাকতে হবে না! মেয়েটাকে নিয়ে অনন্তকে নিয়ে তার নতুন একটা জীবন হবে! নতুন করে শুরু হবে সবকিছু! শ্রী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছিল না। এই যে নিত্যদিনের কাজ নিয়ে অশান্তি, অন্যেরটা কেড়ে খাওয়ার অভিযোগ, মেয়েটার ভয়ে ভয়ে থাকা – এইসব কিছু থেকে মুক্তি! সুন্দর করে সংসার করবে শ্রী। নানারকম রান্না করবে! মেয়েকে পড়াবে আর খুব আদর করবে! তার রান্নাঘরে সবসময় কৌটো ভর্তি বিস্কুট, চানাচুর এসব থাকবে। কখনো কাউকে না খাইয়ে বাড়ি থেকে ফেরাবেনা শ্রী।
সেদিন এসব ভাবতে ভাবতেই স্নান সেরে টিফিন খেতে আসতে একটু দেরিই হয়ে গেল। খিদে পেয়েছে খুব। কিন্তু মনে মনে এতো আনন্দ হচ্ছে যে খিদের কথাটা যেন মালুমই হচ্ছে না। মাধুরী তো রোজের মতো গজগজ করে চলেছে, শ্রীটা যে কী করে না! ১১টা বাজছে! এখনো তার টিফিন খেতে আসার সময় হলো না। বিশ্বদেব কোথায় বেরোচ্ছিল। জুতোটুতো পরা হয়ে গেছে। মাধুরীর কথা শুনে বসে গেল। শ্রী খেতে এলে ওকে শুনিয়ে শুনিয়ে মাধুরীকে বলল, মাধু, বুধু আর ঋতি তো কোনোদিনই অফিসের, স্কুলের ভাত সময় মতো পাবে না। না খেয়েই চলে যেতে হবে! স্নান করে আসতে যার সকাল পার হয়ে যায়!
শ্রী বলতেই পারত ও সকাল থেকে কী কী কাজ করেছে! কিন্তু কিছুই বললো না। মনে মনে ভাবল, আর তো কটা দিন। তারপর এইসব খোঁচা মারা কথা, এইসব অপমান থেকে মুক্তি!
ঋতিকে নিয়ে শ্রী একদিন ওদের নির্মীয়মান ফ্ল্যাট দেখাতে নিয়ে গেল। ঋতিও আনন্দ পেয়েছে। ওদের নতুন বাড়ি হচ্ছে, থুরি ফ্ল্যাট হচ্ছে। কিন্তু এতো খুব ছোটো ফ্ল্যাট। এখানে সবাই একসঙ্গে থাকব কি করে!
সবাই একসঙ্গে কোথায়! আমি তুই আর বাবা থাকব।
এমা! দিদিভাই, মেজদিভাই!
ওরা তো ওদের বাড়িতে থাকবে!
ওদের বাড়ি! ওটা তো আমারও বাড়ি।
হ্যাঁ, তুমিও থাকতে ওখানে। কিন্তু এখন থেকে এটা তোমার বাড়ি। তুমি এখানে থাকবে।
ঋতি চুপ করে গেল। তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে পড়ে আর কি! ও বাড়িতে সে আর থাকবে না! এ বাড়িতে থাকতে হবে! দিদিভাই, মেজদিভাইকে ছেড়ে থাকতে হবে! আর ও বাড়িতে যে সিল্কি আছে! সিল্কি ডোভারম্যান হলে কি হবে সিলুকে ঋতি একটুও ভয় পায় না। সিলু তো ঋতির সঙ্গে খেলা করে। আবার ঋতি যখন পড়ে সিলু বিছানার ধারে মুখটা রেখে বসে থাকে। ঋতিকে মা মারলে সিলু চেঁচায়। আর বম্মা,মেজদিভাই সবাই মিলে ঋতিকে সরিয়ে নেয়। এখানে মা মারলে ঋতি কি করবে! ঋতি এসব কোনো কথাই মাকে বলল না। মার আড়ালে বাবাকে বলল। আমাদের ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে থাকতে হবে কেন!
কেন, তোর নতুন বাড়িতে থাকতে ভালো লাগবে না।
ওখানে যে দিদিভাই, মেজদিভাই নেই, বম্মাও নেই।
ওদের ছেড়ে থাকতে তোর কষ্ট হবে?
ঋতি চুপ। কষ্টের কথা ঋতি বলতে পারে না। মনকেমন করলে সে লেখে। এই তো কিছুদিন আগে মালদায় দাদুর বাড়ি বেরাতে গিয়ে তার বাবার জন্য খুব মনকেমন করছিল। সে বাবাকে একটা লম্বা চিঠি লিখেছিল। পরে বড়োভাইয়া তাকে বলেছে, হ্যাঁ রে, মুর্মু, এই চিঠিটা তুই নিজে লিখেছিস।
হ্যাঁ।
বাবার জন্য কষ্ট হচ্ছিল তোর?
ঋতি বড়োভাইয়ার দিক থেকে অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নেয়। বোঝে তার চিঠি বাবা সকলকে পড়িয়েছে। তার আনন্দ হয়, সবাই পড়েছে! আবার ভাবে এ তো বাবার আর আমার কথা। সবাই পড়বে কেন!
ঋতি বলে, আমরা এখান থেকে চলে যাব কেন বাবা?
তোমার মা এ বাড়িতে থাকতে চায় না তাই।
ঋতি গুম হয়ে যায়। মার ওপর ভীষণ রাগ হয়। মা শুধু ঝগড়া করে। কখনো বম্মার সঙ্গে, কখনো বাবার সঙ্গে। মা খারাপ। খুব খারাপ।
৩৪
ঠিক হলো দুর্গোপুজোর পঞ্চমীর দিন ছোটো করে একটা পুজো হবে। আর পুজোর পর থেকে এ বাড়িতে থাকতে শুরু করবে শ্রীরা। অনন্ত জিজ্ঞেস করেছিল দাদাকে, এ বাড়িতো বৌদির নামে। তাহলে ফ্ল্যাটটা শ্রীর নামে করব? বিশ্বদেব সঙ্গে সঙ্গে বারণ করে দিয়েছে। ওটা তোর নামে থাকাই ভালো। এমনিতেই মেজ বৌয়ের বাপের বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি আছে। তারওপর ফ্ল্যাট ওর নামে হলে তোকে আর ও বাড়িতে টিকতে হবে না। ওর বাপের বাড়ির লোকই দখল নিয়ে নেবে। কোনো দরকার নেই মেজ বৌয়ের নামে করার। অনন্ত সঙ্গে সঙ্গে দাদার কথার যৌক্তিকতা বুঝতে পেরে মেনে নিয়েছে। এদিকে নতুন ফ্ল্যাটে গ্যাসের লাইন নিতে হবে। তার জন্য হাজার পাঁচেক টাকা দরকার। অনন্ত শ্রীকে মনে করিয়ে দিল, তোমার বাবা ঋতির নামে যে টাকাটা ফিক্স করেছে সেটা আপাতত দরকার।
ওটা তো ঋতির পড়াশোনার জন্য বাপী দিয়েছে।
সে পরে দেখা যাবে। আপাতত টাকাটা দরকার।
ঋতি যদি ডাক্তারি পড়ে তখন তো টাকা লাগবে! কোথা থেকে পাব তখন?
হ্যাঁ হ্যাঁ, মেয়ে তোমার ডাক্তার হয়ে উদ্ধার করে দেবে! এখন তাহলে উনুনে রান্না করো। পারবে তো!
শ্রী আর কিছু বলে না। সে উনুনে রান্না করতে পারলেও ফ্ল্যাট বাড়িতে থেকে সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু অনন্ত ওই টাকা কোন্ মুখে চায়! ঋতি যখন হয় তখন হসপিটালের খরচ, বাচ্চার খরচ এমনকি হিজড়েদের টাকাটাও বাপিই দিয়েছিল। তারপর আর ঋতির অন্নপ্রাশনে ভারি কিছু দিতে পারেনি। একটা ছোটো আংটি দিয়েছিল। অনন্ত সে আংটি যত্ন করে রেখে দিয়েছে। ঋতিকে মাঝে মাঝে দেখিয়ে বলে দেখ, তোর দাদু তোকে কি দিয়েছে। মেয়ে হয়েছে বলে, কালো হয়েছে বলে ঋতিকে ওর মামারবাড়িতে কেউ ভালোবাসে না – একথাটাই বারবার বলে বলে মেয়েটার মন বিষিয়ে দিয়েছে। তাও ঋতি অন্যরকম, সরল সাদাসিধে বলে মামারবাড়ি যেতে ভালোবাসে। ওখানে যে আদরটা পায় সেটাকে অনেক মনে করে। আর আজ অনন্তর দরকার পড়েছে বলে বাপির টাকাটার দিকে হাত বাড়ালো। ঋতির ভবিষ্যতের কথা ভাবল না। এসব কথা অনন্ত যেমন করে ঋতিকে বলে, শ্রীও বলতে পারে আসলে সত্যিটা কী! কিন্তু তাতে মেয়েটাকে আরো কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়া হবে। ও না পারবে আর ওর বাবাকে বিশ্বাস করতে, না পারবে মাকে মেনে নিতে। এই দল ভাগাভাগির মধ্যে মেয়েটাকে নাই বা ফেললাম! ও বড়ো হোক। নিজেই সবটা বুঝে নেবে!
ঋতি নতুন ফ্ল্যাটে পুজোর দিন খুবই খুশি। ওর বন্ধুদের নেমন্তন্ন করা হয়েছে। সকলেই আসবে, শুভলক্ষীও আসবে ওর মায়ের সঙ্গে। ঋতির আনন্দ তাই আর ধরছে না। সম্পূর্ণা ওদের সবার জন্য বম্বে থেকে পিস কাপড় এনে দিয়েছে। সেই কাপড় দিয়ে ফ্রিল লাগিয়ে একটা সুন্দর জামা টেলরকে দিয়ে বানানো হয়েছে। ঋতিকে কোনো ডিপ রঙের জামা পড়তে দেওয়া হয় না। কালো রঙে যে কোনো রঙ মানায় না। তাই সাদা,আকাশি, হালকা গোলাপি এসব রঙই পরানো হয় ঋতিকে। ঋতি দেখে মেজদিভাই হলুদ রঙের জামা পড়েছে। ঋতির খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু কাউকে কিছু বলে না। পুজোর সময় একই রকম জামা ম্যাচিং করে ঋতির সঙ্গে রুশিকে কিছুতেই পরানো যায় না। রুশি একরকম জামা পরবে না। বিশেষ করে ঋতির মতো জামা তো কিছুতেই পরবে না। এসব এ বাড়িতে খুব মজার ব্যাপার। ঋতিও হাসে এসব দেখে। কিন্তু ওর মুখে একটা কালো ছোপ পড়ে যায়। ওর হাসির মধ্যে যে হীনমন্যতা আছে শ্রী সেটা টের পায়। শীতকালে যখন ভোরবেলা ঋতিকে স্কুলে পাঠানো হতো তখন একটু ক্রিমের দরকার পড়ত। অনন্ত তো ওসব কিনে দেবে না। শ্রীর কাছে বোরোলীন আছে। বোরোলীন মেখে রোদে বেরোলেই মুখটা পুড়ে যাবে। তাই শ্রী রুচি -রুশির দামি ক্রিমই একটু নিয়ে এসে ঋতিকে মাখিয়ে দিত। ননদ একদিন সেটা দেখে ফেলে শ্রীকে চোর অপবাদ দিতেও ছাড়েনি। রুচি বলেছিল, ওই জন্য আমাদের ক্রিম এতো তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাচ্ছে। চুরি হচ্ছে আসলে!
ওদের জন্য সবসময় এ বাড়িতে স্পেশাল কিছু আসে। কিন্তু কখনো ভুলেও ঋতি বা শ্রীর জন্য কিছু এলে সে নিয়ে তুলকালাম হয়। শ্রীর এক কাকু শ্রীকে নিভিয়া ক্রিম দিয়েছিল একবার। ছোটো একটা কৌটো। সেটা দেখার পর থেকে রুচি নিজের ক্রিম ব্যবহার না করে শ্রীর ক্রিমটাই খাবলা খাবলা করে নিয়ে মাখতে শুরু করেছে। শ্রী দুদিন দেখে ক্রিমটা আলমারিতে তুলে রেখেছে। রুচি সেই নিয়ে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করেছে, দেখেছ বাবা, আমি মেখেছি বলে কাকিমা ক্রিমটা আলমারিতে তুলে রেখেছে। কি হিংসুটে তুমি কাকিমা। কি ছোটো মনের!
দাদা, ওই ক্রিমটা আমাকে একবারই ফুলকাকু দিয়েছে। রোজ রোজ তো কেউ দেবে না। আমি অল্প অল্প করে ব্যবহার করি। ওরকম বেশি বেশি করে নিয়ে মাখলে ওটা তো শেষ হয়ে যাবে!
ও, আর তুমি যখন ঋতিকে আমাদের ক্রিম মাখাও তখন কিছু হয় না, তাই না!
তখন আমার কাছে নিভিয়াটা থাকলে তোদের ক্রিম মাখাতাম না। ও তো তোদেরই বোন। তোর থেকে কত ছোটো। ওর জন্য শীতকালে বাড়িতে একটা ক্রিমও আসে না। তোদের কিছু মনে হয় না!
অস্মি এই ফ্ল্যাট হওয়া উপলক্ষে ঋতিকে দুটো সোনার কানের গড়িয়ে দিল। ছোটো দুটো বেলফুলের কুঁড়ি। পিছনে প্যাঁচ সিস্টেম। সেটা দেখে বিশ্বদেব বলেছিল, এটি একটা রুশির, একটা ঋতির। এ বাড়িতে দুটো বাচ্চা আছে। সেটা তোদের বোঝার দরকার ছিল।
অস্মির মুখটা ছোটো হয়ে গেলেও শ্রী বলেছিল, আপনি তো আপনার মেয়েদের ভরিয়ে দিয়েছেন। এর আগে রুচি -রুশির জন্য পায়ের মল, কানের দুল কি না হয়নি! ঋতির কি কিছু হয়েছে? ঋতির কথা ভেবেছে কেউ!
৩৫
একাদশীর দিন সকাল থেকে মাল নিয়ে যাওয়া চলছে। অনন্ত মিলের কয়েকজন কুলিকে ধরে এনেছে। ওরা বাবুর বাড়ির কাজ করে দেবে। সামান্য টাকায় হয়ে যাবে। শ্রী বাঁধাছাদার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। ওদের ঘরে কেউ একবার এসে দেখছেও না। কেউ সাহায্যও করছে না। এমনকি মাধুরীও নয়। বাকিরা যেন প্রহর গুনছে। কখন শ্রীরা এ বাড়ি থেকে বিদায় নেবে। সমস্ত মাল চলে যাওয়ার পর শ্রী ঋতির হাতটা ধরে এ বাড়ি থেকে বেরোলো। চৌকাঠ ডিঙোনোর সময় শ্রী আওয়াজ করে কেঁদে উঠেছে। যতই হোক, এ বাড়িতেই তো ছিল। ঝগড়া -অশান্তি যাই হোক না কেন চোদ্দটা বছর একসঙ্গে থাকা। ভালো মুহূর্তও কি নেই! সেই যে সবাই মিলে একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়া! শ্রীর আবদারে বিশ্বদেবও হাতে পাতা নিয়ে ফুচকা খেতে দাঁড়িয়ে গেছিল। সেসব ভাবতেই শ্রী কেঁদে উঠেছে। যতই হোক, মাথার ওপর ছিল তো! তার কি দায়! ভাইয়ের সংসার তো ভাইয়েরই বুঝে নেওয়ার কথা! তবু তো এতোগুলো বছর টানল। মেয়েটার খাওয়া দাওয়া নিয়ে ওর বম্মা কখনো দুরকম করেনি। রুশি দশটা আঙুর খেলে ঋতিকেও দিয়েছে। ঋতিটা এতো বম্মাকে ভালোবাসে। ওর তো সব আবদারই বম্মার কাছে। মাধুরীর চোখেও জল। রুশি কাঁদছে। রুচি একপাশে দাঁড়িয়ে। ঋতি সবাইকে দেখছে। কাঁদছে না। মুখটা কালো হয়ে গেছে ওর। শ্রী বিশ্বদেব মাধুরী আর ননদকে প্রণাম করল। ঋতিও মায়ের দেখাদেখি সবাইকে প্রণাম করে রুশিকে জড়িয়ে ধরেছে। কিন্তু চোখে জল নেই। মুখে কথা নেই। চুপ একেবারে। ওরা বেরিয়ে এলো। এতোদিনের সংসার ভেঙে গেল। বিশ্বদেব অবশ্য পাড়ার লোকেদের বলেছে, বাড়িটা তিনতলা করব। তিন মেয়ের জন্য তিনটে ফ্লোর থাকবে। তখন ওদের আবার এ বাড়িতে ফিরিয়ে আনব। একতলায় সবার কুলোচ্ছিল না। তাছাড়া ওদেরও একটা সম্পত্তি হলো। আমি করে দিলাম সবটা। ভাইয়ের টাকার উল্লেখমাত্র করল না। এমনকি মেয়েদের কাছেও না। ওরা জানল বুধুর ফ্ল্যাট বাবা করে দিয়েছে।
এ বাড়িতে এসে সমস্ত আসবাবপত্র সেট করে জিনিসপত্র গোছাতে দিনটা কাবার হয়ে গেল। শ্রীর বাবা বিয়ের সময় একটা তিন সেটের সোফা দিয়েছিল। সেটা গঙ্গোত্তিপাড়ার বাড়িতে বারান্দায় থাকত। সেখানে বসে বিশ্বদেবের মিটিং থেকে রুশির দাপাদাপি সবই চলত। রুশি কত বার ওই সোফাগুলোর ওপর হিসু করেছে তার ইয়ত্তা নেই। ফ্ল্যাট হওয়ার সময় বিশ্বদেব বলল, তোমার সোফাসেটটা তো আমিই ব্যবহার করলাম। তাই তোমার জন্যে একটা ডাইনিং টেবিল তৈরি করে দিলাম। একটা সিঙ্গল বেডের খাট অনন্ত তৈরি করাল। সামনের ঘরটায় ওই ডাইনিং টেবিল আর খাট দিয়েই ভরে গেল। ভিতরের ঘরে শ্রীর বিয়ের খাট আর আলমারি। রান্নাঘরে ও বাড়ির কিছু বাতিল হয়ে যাওয়া বাসন। বাথরুমে নতুন বালতি, মগ। এই হলো শ্রীর সংসার। সাজিয়ে গুছিয়ে নেওয়ার পর খুব খারাপ লাগছে না ফ্ল্যাটটাকে। অনন্ত হাসি মুখে বলল, মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেলে আমাদের বুড়োবুড়ির জন্য যথেষ্ট কি বলো!
শ্রী একবার তাকালো। মেয়েটা সবে সিক্সে পড়ে। এখন থেকেই বিয়ের চিন্তা করছে অনন্ত। আর মেয়ের বিয়ে দিলে জামাই মেয়ে আসবে না! তখন কোথায় বসতে দেবে! কোথায় শুতে দেবে! মুখে অবশ্য শ্রী কিছুই বলল না।
এতোক্ষণ ওরা ঘর গোছানো নিয়ে ব্যস্ত ছিল। ঋতিকে খেয়াল করেনি। এবার খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল ঋতি বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে গ্রিল ধরে। ওকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শ্রীর কষ্টই হলো। ঋতি ওর দিদিদের, বিশেষ করে ওর দিদিভাইকে যতটা ভালোবাসে, ওর দিদিভাইও যদি সেটুকু বুঝত! শ্রী ঋতির কাঁধে হাত রাখলে ঋতি একবার মায়ের দিকে দেখল। তারপর ঘরে চলে এলো। অনন্ত ঋতিকে দেখে নানা কথা বলছে। ঋতি তাকিয়ে আছে। কেমন নিষ্প্রাণ মনে হচ্ছে মেয়েটাকে। এ বাড়িতে আসার পর থেকে ওকে একবারও হাসতে দেখেনি শ্রী। ছোটো তো, সবটা বুঝতে পারছে না। এখানে ও ভালো থাকবে। কেউ আর ওকে অকারণে বকাবকি করবে না, মারবে না। আনন্দ করে থাকবে।
ফ্ল্যাটে আসার পর থেকেই রুচি আবদার করে বসল আমরা প্রত্যেক রোববার করে কাকিমার কাছে খেতে যাব। শ্রী আনন্দই পেল। সবাই আসবে। সে রান্না করে খাওয়াবে। তাছাড়া ঋতি বিকেল হলেই বাবার সঙ্গে সাইকেলে করে ও বাড়ি চলে যেতে শুরু করল। ঋতির আজকাল খুব ব্লিডিং হচ্ছে। চোখের তলায় মেয়েটার কালি পড়ে গেছে। যা হোক তবু নতুন ফ্ল্যাটে শ্রী ভালো ছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ এই সুখ সহ্য হলো না শ্রীর। অনন্তর মিল বন্ধ হয়ে গেল। ধর্মঘট। কবে খুলবে জানা নেই। শ্রীর মনে হলো সে আতান্তরে পড়ল। এখন তো ভাসুরও নেই যে তার ঘাড়ে বসে খাবে! কী হবে তাহলে! মেয়ে নিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে হবে যে! একমাসও গেল না। এ বাড়িতে অশান্তি তুঙ্গে উঠল। অনন্ত বাজার করে না। বললে একটু আলু এনে দেয়। মাছ খাওয়ার বালাই নেই। ডিমও সপ্তাহে একদিন। তাও দুটো ডিম ভেঙে বড়ো করে অমলেট বানিয়ে সেটাকে ছ’টুকরো করে শ্রী। তার মধ্যেই মোটা টুকরোটা অনন্তর পাতে ওঠে। রাতে বেশিরভাগ দিনই বাটিচচ্চড়ি রুটি। ঋতি রুটি খেতে চায় না বলে শ্রী ওর জন্য অল্প করে দুপুরের ভাত তুলে রাখে। অনন্ত সেই নিয়ে রাগারাগি করে। শ্রী বাজার করার কথা, মাছ আনার কথা বলতে গেলে অনন্ত বলে, কেন! তুমি না কি আলুসেদ্ধ ভাত খেয়ে থাকবে, তবু দাদার সংসারে থাকবে না। তা খাও এখন আলুসেদ্ধ ভাত! মাছটাছ আমি আনতে পারব না। নিত্যদিনের এই অশান্তি ঋতি সহ্য করতে থাকে। বাবা হাত পা নেড়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করে কথা বলে। মা গম্ভীর হয়ে থাকে। এসবের থেকে পালাতে ঋতি ছুটে ছুটে ও বাড়ি চলে যায়। কিন্তু ও বাড়িতে গেলে সকলের কাছে একটাই কথা ঋতি শোনে, তোর মা এ বাড়িতে থাকতে চায়নি। তোর মা তোকে নিয়ে চলে গেছে। শুনতে শুনতে ঋতির মায়ের ওপর আর রাগ হয় না। মুখের ভিতরটা তার কেমন তেঁতো তেঁতো লাগে। বিকেল থেকে এ বাড়িতে পড়ে থাকে ঋতি। পড়াশোনা তার সব চুলোয় গেছে। স্কুলের পরীক্ষায় এবারে হঠাৎই ঋতি খারাপ নম্বর পেয়েছে। শুভলক্ষী সেই নিয়ে হাসাহাসি করেছে। ঋতি স্কুল থেকে ফিরে একা একা খায় আর কাঁদে। বাথরুমে স্নান করতে গিয়ে বা পায়খানায় বসে বসে ঋতি হাপুস নয়নে কাঁদে চোখের তলার কালি তার আরো গভীর হয়। গাল বেয়ে যেন নেমে আসে কালি। মনে হয় যেন কাজল লেপ্টে গেছে। এইভাবে চলতে চলতে ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ঋতির জ্বর এলো। অনন্ত ওষুধের দোকানে বলে ওষুধ নিয়ে এলো। কিন্তু জ্বর কমছে না। ১০৪/৫ জ্বর উঠে যাচ্ছে। মেয়েটার গা তেতে পুড়ে যাচ্ছে। মুখটা লাল হয়ে আছে। মাথায় জলপট্টি দিয়ে, জল ঢেলেও জ্বর নামছে না। দেখেশুনে শ্রী শেষপর্যন্ত বাড়ির কাপড় পরেই বেরিয়ে পড়ে। এই নতুন পাড়ায় কাউকেই সে চেনেনা। তবু পাশের বাড়ির এক ভদ্রমহিলা নিজে এগিয়ে এসে আলাপ করেছে। তার নাম লীলাদি। এই লীলাদির দাদাই এই ফ্ল্যাটের প্রোমোটার। ওদের বিশাল অবস্থা। ব্যারাকপুরের বনেদি বড়োলোক এরা। অবশ্য বদনামও আছে। এতো সম্পত্তি সব নাকি সৎ পথে আসেনি। লীলাদি খুব সহজ ভাবে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে। বাটি চালাচালি একেবারে পছন্দ করে না। ওর একটি মেয়ে। রুশির সঙ্গে পড়ে। এ পাড়াতে বেশিরভাগ বাড়িতেই ছেলে সন্তান। সেই নিয়ে পাড়ার মহিলাদের বেশ গর্ব আছে। লীলাদি এতো টাকা পয়সা থাকা সত্ত্বেও সেইখানটাতেই ঠিক পেরে ওঠে না অন্যদের সঙ্গে। শ্রী এখানে আসার পর শ্রীরও এক মেয়ে জেনে লীলাদি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। লীলিদিই শ্রীকে নিয়ে গেল একজন ডাক্তারের কাছে। তিনি বাড়িতে এসে দেখেশুনে বললেন ওর তো ক্যালকাটা ফিভার হয়েছে। ওই জন্য এতো জ্বর উঠে যাচ্ছে। তিনি ওষুধপত্র দিলেন। কিন্তু তারপরেও ঋতির সেরে উঠতে একমাস সময় লেগে গেল। এই একমাসে ঋতি মাথা তুলে বসতে পারেনি। বেশিক্ষণ চোখ খুলে রাখতে পারেনি। পড়াশোনার সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই হয়ে গিয়েছে। তবু শ্রী তাকে কোনোরকমে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে নিয়ে গেল। ঋতি খানিকটা লিখে আর বসতে পারছিল না। চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তার। মাথা কাজ করছে না। অঙ্কগুলো সব অচেনা। ইংরেজি পড়ে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। ইতিহাসের সালগুলো সব গুলিয়ে গেছে। ঋতি এবারে আর এক থেকে দশের মধ্যে থাকতে পারল না।
৩৬
মালদায় গিয়ে প্রথম একবছর পার্টির হয়ে কাজ করে বেড়াতে হলো শ্রীর ভাইকে। ছোটো কাকা বলল, পার্টির হয়ে কাজ করলে তবেই তো পার্টি তোর কথা ভাববে, তোকে দেখবে! এমনি এমনি আমি কোথাও নিয়ে গিয়ে তোকে বসিয়ে দিলে তো আমি বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবো, তাই না! আমার ইমেজটা নষ্ট হবে।
শ্রীর মায়ের একবার বলতে ইচ্ছে হলো, তুমি যে তোমার শালাদের চাকরি করে দিয়েছ, তারা কতবার পার্টির ঝাণ্ডা হাতে ঘুরেছে! বলা হলো না। ওর ভরসাতেই আসা। ওকে তো আর চটিয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু এক বছর বয়স থেকে এদের হাতে করে মানুষ করা। বড়ো বৌদি মায়েরই মতো। বরং মার থেকে কিছু বেশি বৈ কম নয়। মা তো তার স্বামীর খাবার জোগাড় করতেই জীবনপাত করল। শ্রীর মায়ের বিয়ের সময় ওর মায়ের মামারবাড়ি থেকে খুবই আপত্তি এসেছিল। বলা হয়েছিল, এই পরিবার হেঁসেল ছাড়া আর কিছু জানে না! তবু শ্রীর দাদু মা মরা মেয়েটার এখানেই বিয়ে দিলেন!
সংসারে এতোগুলো ছেলেমেয়ে! শ্রীর মা এসে সংসারের হাল না ধরলে কে সামলাতো এতো কিছু। দেওরদের পড়াশোনা, ননদদের বিয়ে দেওয়া সবই তো তিনি করলেন। আর এখন এরা তাকে পার্টি দেখাচ্ছে। এ বাড়ির দোতলাটা তো করে ফেলেছে ছোটোদেওর। কিন্তু একতলার অবস্থা খুবই খারাপ। দেওয়ালে ড্যাম্প ধরে চুন-বালি খসে পড়ছে। বাথরুমটা উঠোন পেরিয়ে। বাথরুমের অবস্থাও ভালো নয়। মেঝে ফেটে গেছে। সেখান থেকে বিছে, পোকামাকড় উঠে আসে। এ বাড়িতে এভাবে বেশিদিন থাকা সম্ভব না। পাশে যে জমিটা খালি পড়ে রয়েছে সেখানটাই শ্রীর বাবার ভাগে পড়েছে। ওইখানে নিজেদের জন্য একটা বাড়ি করার কথা ভেবেছেন শ্রীর মা। দোতলা ছোটো একটা বাড়ি। ওপরের তলায় ছেলে বউ থাকবে। নিচে তারা বুড়োবুড়ি। কিন্তু এসবই সম্ভব হবে ছেলেটার চাকরি হলে। সেই আশাতেই তো তিন মেয়েকে ছেড়ে এখানে আসা। ছোটো মেয়েটা ওখানে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে। মেজমেয়েটার বর তো কিছুই করে না। এতোদিন ওর শ্বশুরের টাকায় চলত। সেই টাকা দিয়েই সল্টলেকে বাড়ি বানালো। নিজেদের মতো থাকতে শুরু করল। কিন্তু শ্বশুর আর টানতে পারছে না। হাত তুলে নিয়েছে। জামাইয়ের তো কোনো দায়িত্ব নেই। অস্মি এসে বাপী-মার কাছে কেঁদে পড়ে। মা আমার ছেলের পড়া বন্ধ হয়ে যাবে! টাকা দাও। শ্রীর বাবা যে কিভাবে টাকা দিচ্ছেন তা তিনিই জানেন! এর মধ্যে ছেলেটা মাঝে মাঝে যেন কেমন কেমন আচরণ করে! বলে, বাপী, আমার আর চাকরি হবে না!
কেন হবে না? তোর ছোটোকাকা আছে তো!
ছোটোকাকা কিছু করবে না বাপী। ওরা আমাদের এখানে আসাটা ভালো ভাবে নেয়নি।
ও তুই ছাড় না, আমার বাপের ভিটে তে আমি এসেছি! এখানে কার কি বলার থাকতে পারে!
তুমি বুঝতে পারছ না বাপী! আমরা এখান থেকে চলে যাই চলো!
দূর পাগল! নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবি!
কলকাতায়। টুয়া ওখানে মার খাচ্ছে। ছোড়দির ওই অবস্থা। অনন্তদার মিল বন্ধ!
হ্যাঁ রে,সবই জানি। আমি কী করব ভেবে পাই না! মেয়েগুলোর একটারও ভালো বিয়ে হলো না।
বাপী, ওরা সবাই তোমার কাছে এলে তুমি কী ফিরিয়ে দিতে পারবে!
আমার কতটুকু ক্ষমতা রে!
কিন্তু বাপী… বলে ভাই চুপ করে যায়। তারপর খানিক ক্ষণ পর বলে ,ওরাও তো আমাদেরই দায়িত্ব। অথচ, আমরা কিছুই করতে পারছি না।
তবু তোর চাকরিটা হলে…
ভাই বাপীর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে উঠে যায়। সন্ধে করে অন্ধকারে দাওয়ায় পায়চারি করে।ভাবে, চাকরি কবে হবে! আদৌ হবে! কলকাতা ছেড়ে এসে কি লাভ হলো! মনটা তার ভেতরে ভেতরে গুমরোতে থাকে। আবার ভাবে সব বোনেরা যদি তার দায়িত্বে এসে পড়ে! দিদিকে নিয়ে চিন্তা নেই। দিদি অনেককিছু পারে। কিন্তু বাকিদুজন! কী করবে তখন সে একা! বাপী চলে গেলে মাকে নিয়ে তো সে অসহায়! আর মাও যদি চলে যায়! এই পৃথিবীতে সে একা! তারওপর এতো দায়িত্ব! কি করে সামলাবে সে! মাথাটা কেমন এলোমেলো লাগে তার! সে যদি এসব ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে পারত! অনেক দূরে! যেখানে কোনো দায়িত্ব নেই, বিচ্ছেদ নেই।সে প্রবল ঘামতে থাকে!
শ্রীর মা এসে দেখেন ছেলে মুখচোখ লাল করে পায়চারি করছে! সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে! কী হয়েছে তোর? এরকম লাগছে কেন তোকে!
মা, আমার খুব টেনশন হচ্ছে। ভয় লাগছে!
কেন রে? কী হয়েছে?
জানি না মা। মা, তুমি আর বাপী চলে গেলে আমার কী হবে!
ওমা, বাবা – মা কারো চিরকাল থাকে না কি!
না মা, আমি তোমাদের ছেড়ে বাঁচব না। চলো না মা, আমরা তিনজন একসঙ্গে মরে যাই!
এ আবার কি কথা! ছিঃ ছিঃ, তুই এসব ভাবছিস এতোক্ষণ ধরে। চল, ঘরে চল।
শ্রীর মা ছেলেকে জোর করে ঘরে নিয়ে আসে। ছেলেটাকে কেমন উদভ্রান্তের মতো দেখায়!
কয়েকমাস পর ছোটোকাকা খবর দেয় একটা স্কুলে ওর চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু পার্মানেন্ট পোস্ট নয়। পরে হবে। একটা ইন্টারভিউ নেওয়া হয়। ভায়ের মনে হচ্ছিল এই ইন্টারভিউটা দেওয়ার চেয়ে মরে যাওয়াটা অনেক সহজ তার কাছে। সে পড়াশোনা সব ভুলে গেছে। বাড়িতে যে দুএকটা টিউশন সে করে তাতেই মনে হয় এই বুঝি সে হোঁচট খেল। পারল না। ভয়ে ভয়ে পড়ায়। যদিও যেমনই ইন্টারভিউ হোক না কেন চাকরিটা তার হলো। কয়েকটা সপ্তাহ পর সে বুঝতে পারল এই স্কুল নিয়েই নানারকম কেস চলছে! স্কুলের কোনো অ্যাফিলিয়েশন তো নেই ই। স্কুলটার অস্তিত্ব নিয়েই নানা কেস চলছে। ছোটোকাকাকে এসে বলায় ছোটো কাকা বলল, ওসব মিটে যাবে। তুই শুধু লেগে থাক। কয়েকমাসের মধ্যেই পার্মানেন্ট হয়ে যাবি। ভাই সে কথা বিশ্বাস করল। কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারল না।
৩৭
সেদিন চড়টা খেয়ে রুচির জেদটা আরো বেড়ে গেছে। এতোদিন সে বাবার ঘেরাটোপে ছিল। তার অনেককেই ভালো লেগেছে। কিন্তু সাময়িক। তারপর সেটা কেটেও গেছে। শুধু বড়ো ভাইয়ার প্রতি তার মনের মধ্যে এখনো একটা অন্যরকম জায়গা আছে। বড়ো ভাইয়াকে দেখলে আজও গা শিরশির করে ওঠে। কিন্তু রুচি বোঝে বড়ো ভাইয়ার অতো সাহস নেই যে বাবার কাছে এসে তাকে চেয়ে নেয়! বয়সের ডিফারেন্স তো আছেই, তাছাড়া পাড়ার মধ্যেকার ব্যাপার। এ পাড়াতে বড়ো ভাইয়ার অন্যরকম সম্মান। সেটা বড়ো ভাইয়া নষ্ট করতে চায় না বলেই মনে হয়। ফলে রুচি খানিকটা বাধ্য হয়েছে বড়ো ভাইয়ার দিক থেকে সরে আসতে। অন্য সম্পর্কগুলোও তেমন ভাবে ডেভলপ হতে পারেনি। সে তো আর এগিয়ে গিয়ে কিছু বলবেনা! উল্টোদিকে যারা ছিল তারা বাবার প্রেসেন্সটাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তার সঙ্গে ইনভল্ভড হতে ভয় পেয়েছে। এই প্রথম কলেজে এসে রাজার সঙ্গে তার একটা সম্পূর্ণ খোলামেলা পরিবেশে মেলামেশা করার সুযোগ হয়েছে। রাজা তো আর বাবাকে দেখেনি। দেখলেও রাজার কিছু যায় আসে না। রাজা নিজের মর্জির মালিক। রাজা এখন থেকেই ভালো রোজগার করে। রাজা এস্ট্রোলজার। তার বেশ বড়োসড়ো সব ক্লায়েন্ট রয়েছে। ভালো টাকা ইনকাম করে সে। বাংলাদেশ থেকে চলে আসার পর এই কলোনিতেই তারা প্রথমে টিনের চালের ঘরে তারপর আস্তে আস্তে পাকা বাড়ি করে থাকতে শুরু করেছে। ওর বাবা সরকারি অফিসে কাজ করে। রাজা রোজগার করে নিজেদের বাড়িটাকে দোতলা করেছে। হ্যাঁ, রাজা উচ্চমাধ্যমিক পাশ। তারপর আর পড়াশোনা করতে চায়নি। ওর মায়ের জোড়াজুড়িতে কলেজে নামটা লিখিয়েছিল। তারপর তো এই কাণ্ড। কিন্তু প্রথাগত পড়াশোনা না থাকলেও রাজার অনেক জ্ঞান। কত অলৌকিক কথা বলে রাজা। রুচি অবাক হয়ে শোনে। আর রাজা তাকে ভালোবাসে। তার বাবাকে ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসার ছেলে রাজা নয়। দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়গি’র রাজ এর মতো রাজাও প্রতিজ্ঞা করেছে তোমার বাবা নিজে এসে তোমার হাত আমাকে দেবে! তুমি মিলিয়ে নিও। রুচি প্রেমের এই দৃঢ়তা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারেনি। বিশেষ করে বাড়ি থেকে বারণ হয়ে যাওয়ার পর থেকে রাজার সঙ্গে মেলামেশা করাটা রুচির কাছে নিষিদ্ধের প্রতি তীব্র আকর্ষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুচি রাজাকে পেয়ে জীবনে অনুশাসন হীনতার যে স্বাদ পেয়েছে তাকে ছেড়ে বাবার জেলে বন্দি হওয়া তার পক্ষে আর সম্ভব নয়।
সেদিন রাজা কলেজে আসেনি। ওর এক বন্ধু হস্টেলে থাকে। তার সঙ্গে অন্য পার্টির ছেলেদের সামান্য ঝামেলা হয়েছিল সেটাই মেটাতে গিয়েছিল। রুচি সেই খবর পেয়ে হস্টেলে গিয়ে উপস্থিত হয়। ওকে আসতে দেখে রাজা ভিড় থেকে সরে আসে। তুমি এখানে?
বয়েজ হোস্টেল একটা মেয়ে ঢুকে পড়েছে দেখে বাকিরাও অবাক হয়। ঝামেলা সরিয়ে রেখে রাজার বন্ধুরা এগিয়ে আসে ওদের দিকে। নানারকম ইয়ার্কি চলতে থাকে। তারপর ওদেরকে একটা ঘরে কিছুটা আলাদা হওয়ার সুযোগ দিতে ওরা বেরিয়ে আসে। রুচি এই প্রথম রাজার সঙ্গে চার দেওয়ালের আড়ালে। রুচির ভিতরটা শিরশির করছে। রুচি তাকিয়ে আছে রাজার দিকে। রাজার ওই চোখের ভাষা পড়তে অসুবিধে হয়নি। রাজা রুচির ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। আর ঠিক সেই সময়ই অপোনেন্ট পার্টির ছেলেরা দরজায় ধাক্কা মারে! ওরা ধরেই নিয়েছিল রুচি আর রাজা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। কিন্তু তেমন কিছুর তো সুযোগই পায়নি ওরা। কিন্তু এসব কথা তখন আর কাউকে বোঝানো সম্ভব হয়নি। খবরটা কলেজে রটে যায়। সেইসঙ্গে প্রিন্সিপালের কানেও দায়িত্ব নিয়ে তুলে দেওয়া হয়। সেই অর্থে কোনো অপরাধ না করেও ওরা দোষী হয়ে যায়। আর তারপর তো যা ঘটার ঘটেছে। কিন্তু এতো কিছুর ফলে রুচির রাজার সঙ্গে সম্পর্ক আরো অটুট হয়েছে। দুজনে তারা একে অপরের জন্য প্রাণ কবুল করেছে। আর ওদের এই আদান প্রদানে ওদের পাশে থেকেছে রাজার মা। ভদ্রমহিলা রুচিকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দেয়। রাজার সব ভালো। কিন্তু ওর বড়োলোক ক্লায়েন্টদের মেয়েদের সঙ্গে ও অনেকটা সময় কাটায়। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে। নানা জায়গায় দেখা করে। তাছাড়া বাড়ির সংলগ্ন ওর নিজস্ব চেম্বার তো আছেই! এই নিয়ে মাঝে মাঝেই রুচির সঙ্গে লেগে যায়! রুচি অন্য কাউকে রাজার পাশে মেনে নিতে পারে না। ফলে দুজনের ঝগড়া হয়। রাজার মা তখন ব্যাপারটা সামাল দেন। তিনি বোঝেন, রুচি বড়োলোকের মেয়ে। এখানে ছেলের বিয়ে দিতে পারলে রাজকন্যার সঙ্গে অর্ধেক রাজত্ব জুটবে। তাই তিনি রুচিকে তোয়াচ করে চলেন। রুচির সামনে রাজাকে বকাবকি করেন। আড়ালে বলেন, মেয়েটাকে হাতছাড়া করিস না। একবার বিয়েটা হয়ে যেতে দে। তারপর তুই তোর মতো আনন্দ ফুর্তি করিস। কেউ আটকাবে না। এতো কথা যদিও রুচি জানে না। তার মাথায় ঘোরে কাজলের জেদ। শাহরুখ খানকে ছাড়া সে আর কাউকে বিয়ে করবে না। রুচিও রাজাকেই বিয়ে করবে! বাবার সমস্ত বাধা নিষেধ অতিক্রম করে রাজাকেই বিয়ে করে দেখিয়ে দেবে। রাজা তাকে ভালোবাসে। রাজা ভালোবাসতে জানে। রাজা বাবার চোখে চোখ রেখে একদিন তাকে চেয়ে নেবে। রাজা লম্বা লম্বা চিঠি লেখে। জয় গোস্বামীর কবিতার পংক্তি ধার করে সেই চিঠিতে রাজা এই কথাগুলোই লেখে। আর ঝগড়া হলে রুচিকে মিষ্টি করে চুমু খায়! তাই যতই বাবা বারণ করুক, যতই মারুক, যা খুশি করুক, রুচি রাজাকে ছাড়া বাঁচবে না। ইতিমধ্যে রাজা এসেছিল একদিন রুচির বাড়িতে। বিশ্বদেব তখন বাড়ি ছিল না। মাধুরীর হাত -পা কাঁপতে শুরু করেছিল রুচির সাহস দেখে। কোনোরকমে ছেলেটাকে বিদায় করেছে। রাজা পরে বলেছে, তোমার মা একজন মেরুদণ্ডহীন মহিলা। রুচি তাতে সমর্থন না জানিয়ে পারেনি। ইতিমধ্যে রুচির নিজের বাড়ির সম্পর্কে সব কথা বলা হয়ে গেছে। তার বাবা মা, বুধু কাকিমা , বিজু আর ছোটো কাকিমার কথা সব। এরা সব রুচির চোখে কে কেমন সব বলা হয়ে গেছে। ছোটো কাকিমা রুচিকে খুবই ভালোবাসে। রুচি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর কিছু দিন বম্বে তে গিয়ে ছিল। ছোটো কাকিমা তার চুল স্টেপ কাটিয়ে এনেছে। ভুরু প্লাক করিয়ে দিয়েছে। ছোটো কাকিমা খুব ভালো। ভালো নয় মেজ কাকিমা। রাজাও এসব কথা শুনে শুনে বুঝে নিয়েছে এ বাড়িতে কার সঙ্গে কি ব্যবহার তাকে করতে হবে। বিজু বড়োলোক এই কথাটা তার কানে গেঁথে গেছে।
৩৮
আজ প্রায় ছ’মাস হয়ে গেল অনন্তর মিল বন্ধ। জমানো টাকা দিয়েও আর চলছে না। শ্রী যেন আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিল এমন কিছু ঘটতে পারে। তাই বিশ্বদেব যখন বলে যে শাড়ির ব্যবসাটা চালানোর জন্য আমি একটা দোকানঘর করে দিচ্ছি। শ্রী এককথায় রাজি হয়ে গেছিল। বিশ্বদেব বলে, অনন্ত বিকেল থেকে সেলাই মেশিনটা নিয়ে যদি দোকানে বসে, সায়া, চাদর, শাড়ির ফল্, পিকো এসব করবে আর শাড়িও বিক্রি করবে! শ্রী খুব উৎসাহী হয়ে বলেছিল, দাদা, সকালবেলাটা আমি দোকানটা দেখতে পারব।
না, মেজ বৌ, তুমি সকালে দোকান দেখলে বাড়ির কাজ করবে কে! ওখানে তো আর তোমার বড়দি নেই যে সব কাজ করে দেবে!
শ্রী এই খোঁচাটা সহ্য করে নিয়েও বলেছিল, দাদা, আমি ভোরবেলা উঠে সবটা সেরে তারপরই দোকানে যাব। আপনার ভাইয়ের কোনো অসুবিধে হবে না।
না না, তোমার সকালে চান করে আসতেই ১১টা বাজে! তুমি আর বোলো না।
অনন্ত পাশ থেকে বলে উঠেছিল, দোকানের দাম কে দেবে দাদা?
সে তো লোনে নেব। আমার নামে লোন। তোকে তো কেউ লোন দেবে না। তুই দোকান চালিয়ে শোধ দিবি। শোধ হয়ে গেলে দোকান তোর।
না রে দাদা, সেটা সম্ভব নয়। দোকান কতটা কি চলবে! সেই দিয়ে লোন শোধ করতে আমি পারব না।
শ্রী শেষবারের মতো বলে উঠেছিল, ঠিক পারবে। পারবে না কেন! শাড়ির ব্যবসা তো আমাদের চালু ব্যবসা!
যেটা বোঝো না, সেটা নিয়ে কথা বলো না। এর ভিতরে রিস্কটা তুমি বুঝতে পারছ!
রিস্ক তো একটু নিতেই হবে। দাদা এই সুযোগটা দিচ্ছে তুমি নাও। শ্রীর গলার মরিয়া ভাবটা সেদিন লুকোনো ছিল না। কিন্তু অনন্তকে রাজি করানো গেল না।
শ্রী ফ্ল্যাটে আসার পর থেকে তাই সেলাই মেশিনে উলের সোয়েটার বোনা শিখতে শুরু করেছিল। সে এমনিতেই কাঁটায় সোয়েটার বুনতে পারে খুবই ভালো। এবারে মেশিনে বোনাটা রপ্ত করল। ঋতির অসুখ, অনন্তর সঙ্গে অশান্তি সব সত্ত্বেও শ্রী উলের কাজটা চালিয়ে যাচ্ছিল। অল্প টাকায় একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মেশিন কিনে বাড়িতেই কাজ শুরু করে দিল। এই ক’মাসে তার বিক্রিও হয়েছে কিছু কিছু। কিন্তু সে আর কতটুকু! খুঁজে পেতে সে বার করল যারা হোলসেল রেটে সোয়েটার কেনে তাদের। সারা বছর তাদের কাজের চাহিদা থাকে। পরিচয় হলো নাড়ুদা বলে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে। সে এই উলের চাদর আর সোয়েটারের হোলসেল ব্যবসা করে। শ্রী দেখল, এদের এখানে উলের চাদরের খুবই চাহিদা। মেশিনে ডিজাইন সেট করে চাদর বোনা হয়। আর টিটাগড়ের কিছু মেয়ে আছে যারা সেই চাদরের ধার ধরে কুরুশের কাজ করে। তারপর ওগুলো হোলসেলে বিক্রি হয়। শ্রী সব দেখেশুনে এসে অনন্তকে ধরে বসল। তুমি একটা মেশিন কেনো। চাদর বোনো। নাড়ুদার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
অনন্ত বুঝতে পারছে এভাবে আর চলছে না। ছ’মাস হতে চলল। মিল খোলার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তার হাতে আর বেশি টাকাও নেই। পোস্ট অফিসে কিছু টাকা আছে। কিন্তু সে দিয়ে দিনের পর দিন তো আর চলবে না। একটা কিছু শুরু না করলেই নয়। অনন্ত শেষপর্যন্ত রাজি হলো। একটা সেকেন্ড হ্যান্ড মেশিন নাড়ুদার কাছেই ছিল। সেটাই অল্প টাকায় কেনা হলো। শুরু হলো বাড়িতে চাদর বোনার কাজ। মোটর কেনা এখনই সম্ভব নয়। ফলে হাতে টেনেই মেশিন চলতে থাকল। অনন্ত সারাদিন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মেশিন টানে। প্রথম প্রথম নানা ভুল হয়। চাদর কেটে নিচে পড়ে যায়। ডিজাইন ভুল হয়ে যায়। তখন আবার একটা একটা করে ঘর মেশিনে তুলে নতুন করে বোনা শুরু করতে হয়। টিটাগড় থেকে মেয়েরা ফ্ল্যাটে আসতে শুরু করেছে। পেল্লায় একটা ওজনদাড়ি কেনা হয়েছে। সেখানে বস্তা করে করে চাদর মেপে ওদের দেওয়া হয়। উলের গন্ধ, হিন্দুস্তানী পাড়ার গন্ধ সব মিলে ফ্ল্যাটের ভিতরে ঋতির দম আটকে আসে। ভিতরের ঘরে চলতে থাকে অনন্তর মেশিন। আর বাইরের ঘরে চলতে থাকে শ্রীর মেশিন। ঋতি মায়ের পাশে বসে ওই বীভৎস আওয়াজের মধ্যেই পড়াশোনা করে। ক্লাস সেভেনে তাকেও অঙ্ক আর ইংরেজির জন্য অরিজিৎ এর কাছে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঋতি কি পড়ছে, আদৌ পড়ছে কি না দেখার সময় নেই কারো। শ্রী মাঝে মাঝে ধমক দেয়। ঋতি শোনে। খুব বিশেষ ফারাক পড়ে বলে মনে হয় না। দুপুরবেলাটা অনন্ত এক ঘণ্টার জন্য একটু বিশ্রাম নেয়। শ্রীও একটু না শুয়ে পারে না। এ ফ্ল্যাটে কাজের লোক রাখা সম্ভব হয়নি। সব কাজ শ্রীকে একাই করতে হয়। ঋতি বাড়ি থাকলে ঋতিকে বলে ঘরটা মুছে দিতে। ঋতি ভালো পারে না। শ্রী তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে বলে, এখানটা ভালো করে মোছ। ওখানটা আরেকবার টেনে দে। ঋতি খানিকক্ষণ শুনতে শুনতে মায়ের মুখের দিকে তাকায়। অদ্ভুত ভাবে তাকায়। শ্রী বুঝতে পারে না কি হয়েছে! ঋতি ভাবে মা আমাকে দিয়ে এভাবে কাজ করাচ্ছে কেন! ও বাড়িতে তো এসব কাজ মায়াদি করত। এ বাড়িতে কেউ নেই। মাকেই করতে হয়। মাকে সাহায্য করার জন্য সে মাঝে মাঝে ঘর মুছে দেয় বটে। কিন্তু মা কোমড়ে হাত দিয়ে এভাবে ইনস্ট্রাকশন দিচ্ছে কেন! জ্যেঠু যেমন করে মায়াদিকে বলত এখানটা ঝাঁট দাও। টেবিলের তলাটা মুছে নাও। মাও সেরকমই বলছে তাকে! সে কি মায়াদির মতো তবে! ঋতির চোখে জল এসে যায়। শ্রীকে সারাদিন এতো পরিশ্রম করতে হয় যে এতো সূক্ষ্ম ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো অবস্থা তার থাকে না। তার মনে হয়, মেয়েটাও বাপের মতোই কুঁড়ে। কাজ করতে বললেই চোখে জল আসে! এই ফ্ল্যাটে মিউনিসিপ্যালিটির ডিরেক্ট জল আসে ছাদের একটা কলে। আর নিচে রিজার্ভার আছে। অনন্তদের খাবার জলটা ছাদ থেকেই আনতে হয়। শ্রীই বয়ে বয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু এক একদিন ও আর পেরে ওঠে না। তখন ঋতিকে বলে। ঋতি ওই বড়ো বালতিতে জল ভরে নিয়ে আসে। ঋতির হাতের তালু লাল হয়ে যায়। দু হাত পাল্টে পাল্টে চারতলা থেকে জল নিয়ে নামে। শ্রী বোঝে মেয়েটাকে দিয়ে এসব করানো ঠিক নয়। কিন্তু বড়ো ক্লান্ত লাগে আজকাল। বাধ্য হয় মেয়েটাকে বলতে।
দুপুরে ঋতি বাড়ি থাকলে সে একা একা বাইরের ঘরে পা ছড়িয়ে বসে থাকে। এ বাড়িতে কোনোদিক দিয়েই রোদ ঢোকে না। দেওয়ালে এর মধ্যেই ড্যাম্প ধরতে শুরু করেছে। মেঝেতে স্যাঁতস্যাঁতে সাদা সাদা ফাঙ্গাস ওঠে। মোজাইকের মেঝেতে কালো কালো ড্যাম্প ধরে গেছে। উত্তর দিকটা খোলা বলে শীতকালে উত্তরে হাওয়া কাঁপিয়ে দেয়। আর বাকি দিকগুলো বদ্ধ বলে গরমে প্রাণ হাঁপসে ওঠে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা ঋতি দুপুর বেলা পা ছড়িয়ে বসে থাকে। কেমন যেন বোবা হয়ে গেছে মনে হয়। কখনো বসে বসে শুভলক্ষীর জন্য কাঁদে। কখনো ভাবে তার আর পড়াশোনা হবে না। কিছুই তার মাথায় ঢোকে না। অনন্ত এক একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে মেয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। অনন্ত বুঝতে পারে মেয়েটার মন খারাপ। রেজাল্টও আর ভালো করতে পারছে না। অনন্ত তখন ওকে নিয়ে দাদার বাড়ি যায়। কিন্তু সেখানেও খানিকক্ষণ পরে দেখে রুচির সঙ্গে কি নিয়ে গোলমাল হয়েছে। মেয়েটা কাঁদছে। মেয়েটা আজকাল কেন এতো কাঁদে কে জানে! দাদার বাড়ি থেকে চলে আসার জন্য! না কি অন্য কোনো কারণ আছে, অনন্ত বুঝতে পারে না। মাঝে মাঝে অনন্তরও মাথা গরম হয়ে যায়। একে তো বাজার করার মতো অবস্থা তার নয়। তবু গরমের দিনে পটল,কুমড়ো একটু সস্তায় পাওয়া যায়। আলু-পটল দিয়েই শ্রী বাটি চচ্চড়ি বানায়। কিন্তু ঋতি কিছুতেই পটল খাবে না। খেতে বসে উক্কি তুলবে! পটলগুলো বেছে বেছে সরিয়ে রাখবে! সেদিন অনন্ত রেগেমেগে বলেছে সবটা খেয়ে উঠবি! একটা কিচ্ছু যেন পড়ে না থাকে! ঋতি কোনোরকমে আলু দিয়ে রুটিটা খেয়ে শেষে বাবার ভয়ে পটলগুলো সব একসঙ্গে মুখে নিয়ে গিলে ফেলল। তারপর দৌড়ে মুখ ধুতে চলে গেল। অনন্ত শ্রীকে বলল, দেখো তো, মুখ থেকে ফেলে দিচ্ছে কি না!
না, গিলে নিয়েছে।
ঋতি মুখ ধুতে ধুতে সবই শুনতে পেল। তার চোখে জল ভরে আসছে। বাবা তাকে এতোটা অবিশ্বাস করে!

৩৯
ওদিকে আবার আর একটা উপসর্গ শুরু হয়েছে। ঋতির দাঁতে ব্যথা। ঠিক রাত্রিবেলা থেকে দাঁতে ব্যথা শুরু হয়। শ্রী ঋতিকে ফিটকিরি দিয়ে কুলকুচি করতে বলে। তাতে ব্যথার জায়গাটা অবশ মতো হয়। কিন্তু ব্যথা কমে না। ঋতি কখনো মাঝরাতে উঠে নিজেই গরম জল করে অল্প অল্প করে মুখে রাখে। কখনো ব্যথার চোটে গরম গ্লাসটাই গালে চেপে ধরে। গাল লাল হয়ে যায় তার। তবু ব্যথা কমে না। অনন্ত মাঝে মাঝে পেইনকিলার এনে দেয়। সেটাই খায় ঋতি। তার সঙ্গে এন্টাসিড খাওয়ার কোনো ব্যাপার নেই! ঋতির মুখে কেমন কালো কালো ছোপ ছোপ দাগ হচ্ছে। ঋতি এই একবছরে বেশ খানিকটা মোটা হয়েছে। এ বাড়িতে পিরিয়ডসের সময় খুব অসুবিধা হয়। কাপড়গুলো বারান্দায় নিচু করে মেলতে হয়। মেঝের ধুলোবালি সবই লাগে কাপড়ে। বৃষ্টি এলে এমন ঝাপটা আসে জলের যে সব কাপড় ভিজে যায়। ঋতি নতুন কাপড় চাইলে তখন শ্রী রাগারাগি করে। এতো কাপড় পাব কোথা থেকে! পুরনো ছেঁড়া চাদর বের করে দেয়। সেগুলো এতো ভারি হয় যে হাঁটতে অসুবিধে হয় ঋতির। স্কুলে বিশেষ করে খুব মুশকিলে পড়ে সে। বারবার হাত দিয়ে দিয়ে কাপড়টা ঠিক করতে থাকে। বন্ধুদের কারো নজরে পড়লে তারা হাসে। ঋতির লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে আসে। তারপর কাপড় শুকোলেও রাখতে হয় সেই কোনো টিনের কৌটোয়। জল লেগে সেগুলোতেও জং ধরে যায়! তার মধ্যে মাকড়সা, টিকটিকি বাসা বাঁধে। ঋতি ওই কাপড়ই ব্যবহার করে।
সম্পূর্ণা এসে এসব দেখেশুনে বলে মেজদি, মেয়েটার তো ইনফেকশন হয়ে যাবে! তুই এসব কি করছিস!
এবারে অনন্তর মতোই শ্রীও উত্তর দেয়, খাবারই জুটছে না, তার আবার প্যাড।
সম্পূর্ণা এর উত্তরে একটা অদ্ভুত কথা বলে। বলে, সেইজন্যই তো এই ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা। তোদের খাবার জোটার মতো পরিস্থিতি নয়। অথচ দাদার ঘাড়ে বসে তোদের একরকম করে চলে যাচ্ছিল! সেটা যাতে আর না হতে পারে তাই তো আলাদা করে দেওয়া।
হ্যাঁ, দাদা আমাকে অনেকবারই বলেছে, বুধু যা টাকা দেয়, তাতে তোমাদের তিনজনের দশদিনও চলে না। সারা মাস তো বহুদূরের ব্যাপার।
সেকথা আমাকেও বলেছে। বলেছে, নিজের সংসার হলে মেজদা দায়িত্ব নিতে শিখবে। নইলে তো ওই এক মিলের চাকরি। তাও আদ্ধেক দিন বন্ধ থাকে। ও দিব্যি ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাঙ তুলে বসে বসে আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়।
ঠিকই তো বলেছে বল। ভাইয়ের সংসারের দায়িত্ব উনি নেবেনই বা কেন! ওঁরও তো সংসার আছে। মেয়েদের পড়াশোনা,বিয়ে সব আছে। শুধু এভাবে আলাদা করে দেওয়াতে আমার মেয়েটা খুব কষ্ট পাচ্ছে রে। একরকম খাওয়াদাওয়ায় অভ্যস্ত ছিল তো! বাটি চচ্চড়ি আর রুটি ওর গলা দিয়ে নামে না।
এক বছরের ওপর হয়ে গেল মিল বন্ধ। আমাদের কিভাবে চলছে আমরাই জানি। দাদাও কি বুঝতে পারছে না। রোজ এই ফ্ল্যাটে আসবে আর আজ ২৫০টাকার ইলিশ, কাল ৩০০টাকার খাসির মাংসের গল্প করবে। ভাই গেলে ভাইকে মাঝে মাঝে খেতে দেয়। ঋতিকেও এক আধদিন খাইয়ে পাঠায়। এই আর কি!
আর মেজদি তুই?
আমাকে কেন খাওয়াবে বল! আমি পরের বাড়ির মেয়ে। ওদের প্রিয় পাত্র কোনোদিনই হয়ে উঠতে পারিনি। আমার জন্য কেন ভাববে বল!
সম্পূর্ণা শ্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওদের এখন বিশাল অবস্থা। বম্বেতে দামি ফ্ল্যাট কিনেছে। ইন্টিরিয়র ডিজাইনার দিয়ে সেই ফ্ল্যাট সাজানো হয়েছে। বিজয়দেব ইচ্ছে করলেই অনন্তকে সাহায্য করতে পারে অন্তত ঋতির মুখের দিকে তাকিয়ে। এ বাড়ির বাকি মেয়েরা একভাবে মানুষ হচ্ছে। আর ঋতি আরেকভাবে! কারণ ঋতির বাবা গরিব! তাহলে যৌথ পরিবার নিয়ে এদের এতো বড়ো বড়ো কথা আসে কোথা থেকে! সম্পূর্ণার অবশ্য এসব মনে আসে না। তার মনে হয়, আমার স্বামী পরিশ্রম করেছে। তাই আমরা আজ এখানে। মেজদা করেনি। তাই মেজদার এই অবস্থা। সম্পূর্ণা বিজয়দেবকে শ্রীদের অবস্থার কথা বলতে গেলে বিজয়দেব বলেছে, শোনো ছোটোবৌ, গরিবের চাহিদা কখনো শেষ হয় না। তাই ওদের দিয়েও শেষ করা যায় না।
বিজয়দেব এখন এখানে এলেই নিজের কৃতিত্বের কথা জাহির করতে থাকে। সে কত কষ্ট করেছে বম্বেতে গিয়ে। সে কিভাবে এতো বড়ো হলো! বড়ো বলতে অবশ্য বড়ো মানুষ নয়। বড়োলোক, ধনী। ধনী মানুষদেরই কথা বলার অধিকার আছে। জাহির করার অধিকার আছে। ভালো মানুষ, বড়ো মনের মানুষের কোনো দাম নেই বিজয়দেবের কাছে। বোধহয় এদের তিন ভাই কারো কাছেই নেই। এ বাড়িতে সমস্ত কিছু বিচার করা হয় টাকার অঙ্কে। এমনকি মেধাও কিনে ফেলা যায় টাকা দিয়ে। এমনটাই এদের ধারণা। তাই ঋতি যে এ বাড়ির সব মেয়েদের মধ্যে পড়াশোনায় ভালো তার কোনো গুরুত্বই নেই কারো কাছে। ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ করবে, আর বিয়ে হয়ে যাবে। ওর বাবার ওকে পড়ানোর ক্ষমতা নেই। বিশ্বদেব মনে মনে এসবই ভাবেন। বিয়ে দিতেও হয়তো হবে না। যেভাবে বড়ো হচ্ছে, ও নিজেই পালিয়ে যাবে। জুটবে ওর বাবার মতো মিলের ক্লার্ক কি রিক্সাওলা। ও মেয়ের ওই পরিণতি!
আর এমনটা ভাববে না ই বা কেন! ঋতির রেজাল্ট দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে। অরিজিৎ বলেছে, বিলো ক্যাটিগরি রেজাল্ট করছিস তো! সামনে মাধ্যমিক। কিন্তু ওই বলাটুকুই সার। ঋতির পড়াশোনা কিছু মাথায় ঢোকে না। কি যে সারাদিন ভাবে! প্রায় রোজই শ্রী সকালে উঠে দেখে ওর মুখ চোখ ফুলে ফুলে গেছে! মানে সারারাত কেঁদেছে ঋতি। কিন্তু কেন! এ বাড়িতে থাকবে না বলে! ওকে কি করে বোঝাবে শ্রী যে যাদের ও এতো ভালোবাসে তারাই ওকে তাড়িয়ে দিয়েছে! উল্টে মেয়েটার কানে তুলেছে, আমি নাকি ও বাড়ি থেকে ওকে নিয়ে চলে এসেছি। ওর বাবাও ঝগড়া করতে করতে তাই বলে! মেয়েটা শোনে। বাবাকে বিশ্বাস করে। মায়ের ওপর রাগ বাড়ে। মা পড়াশোনা করতে বলে। আর ঠিক সেখানটাতেই মায়ের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য পড়াশোনাটা নষ্ট করছে! শ্রী এভাবেই ভাবে নিজের মেয়ের কথা। মেয়ের ওপর আজকাল তার একটা বিরক্তি কাজ করে। ঋতি কিন্তু এসব কিছুই ভাবে না। তার বুকের মধ্যে কেমন একটা ব্যথা থেকে থেকেই দলা পাকিয়ে ওঠে। কান্না ঠেলে আসে। কেন যে সে কাঁদে, সে নিজেও বুঝতে পারে না। পড়াশোনা হচ্ছে না তার। বন্ধুরা তার থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। সে আর এক থেকে দশের মধ্যে থাকতে পারে না। স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না তার। ভাবে এবার থেকে, আজ থেকেই খুব মন দিয়ে পড়ব। কিন্তু বাড়িতে সারাদিন দুটো মেশিন চলছে। দেওয়ালে দেওয়ালে যেন আওয়াজ ভাইব্রেট হচ্ছে। তার মধ্যেই এক একদিন সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়তে থাকে। সেদিন একটু মনটা ভালো লাগে। মাও খুশি হয়। কিন্তু সবদিন এভাবে সে পেরে ওঠে না। তারপর মাঝে মাঝে আবার বাবা মেশিনে সব সেট করে দিয়ে বলে, তুই একটু চালাবি! নয়তো আজকের কোটা কমপ্লিট হবে না। আমি চট করে একটু আসছি। বলে অনন্ত বাইরে বিড়ি খেতে যায়। ঋতি ওই ভারি মেশিনটা চালাতে থাকে। হাত ভেড়ে যায় ওর। তবু বাবা বলেছে বলেই কষ্ট করে চালায়। তারপর আর পড়ার এনার্জি থাকে না।
৪০
অবশেষে প্রায় দেড় বছর বাদে অনন্তর মিল খুলল। উলের ব্যবসাটা অনন্ত কিন্তু তাই বলে বন্ধ করল না। পুরো দায়িত্বটাই এসে পড়ল শ্রীর ঘাড়ে। একটা মোটর কেনা হলো। এবার থেকে আর হাতে টানতে হবে না। মোটরেই মেশিনটা চলবে। কিন্তু যে কোনো সময় উল ফলস হয়ে যেতে পারে! উল শেষ হয়ে যেতে পারে! সামনে একজন কাউকে থাকতেই হয়। শ্রী একবার রান্নাঘর একবার মেশিন এই করে। তার নিজের সোয়েটার বোনাও থাকে। ঘরের কাজ সবই তাকে সামলাতে হয়। অনন্ত সকাল ৫:৩০টায় বেরিয়ে যায় মিলের জন্য। ৮টা নাগাদ একবার দৌড়ে আসে টিফিন করতে। এসে যদি দেখে শ্রী লাইট-ফ্যান চালিয়ে সোয়েটার বুনছে অনন্তর মেজাজ গরম হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে আলো পাখা চালিয়ে আমার বাপের শ্রাদ্ধ হচ্ছে। কারণ সোয়েটার বিক্রির টাকাটা শ্রী এখন আর সংসারে দেয় না। তারও কিছু দায় থাকে, কর্তব্য থাকে। এই ফ্ল্যাটে তার বাপের বাড়ি থেকে কোনো লোক এলে অনন্ত কথা তো বলেই না, তাদের আপ্যায়নও করে না ! এমনকি ভাসুরের মেয়েরা এলেও তাদের সামনে কিছু খাবার তুলে ধরার দায়িত্ব শ্রীর। নিজের একটা বোরোলিন, একটা ব্রেসিয়ার, সায়া কেনার পয়সাও তার কাছে থাকত না। সেগুলো এখন সে নিজের টাকায় করতে পারে! মেয়ের টুকটাক আবদারও সে ই পূরণ করে। তাছাড়া মেয়েটার জন্য মাঝে মাঝে বছরের ফলটুকু,কখনো সখনো একটু আধটু দুধ বা শীতকালে পিঠে বানিয়ে দেওয়া এগুলো শ্রীই করে।মেয়েটা ওর বাবার কাছে কিছু চায় না। কেমন করে যেন জেনে গেছে বাবার কাছে চাইতে নেই। কিন্তু তাই বলে সব দায়িত্ব নিয়ে নিলে অনন্ত আরোই ছাড় পেয়ে যাবে। সে সুযোগ তাকে দেওয়া যাবে না।
আবার এক শীতকাল উপস্থিত। ঋতির মুখে মাখার কোনো ক্রিম নেই। গায়ে সরষের তেল মেখে কাজ চলে যায়। কিন্তু মুখে! শ্রীই অনন্তকে বলল, মেয়ের জন্য একটা ক্রিম এনে দিতে। অনন্ত একটা সস্তা দরের ক্রিম এনেও দিল। কিন্তু ঋতি বড়ো হচ্ছে। নানারকম হরমোনাল চেঞ্জেস হচ্ছে। ওর গলায় রোম হয়েছে সরু সরু। ওর বন্ধুরা ছাগল দাড়ি বলে ওকে খেপায়! ঋতি বাড়িতে এসে একদিন বাবার রেজার দিয়ে গলাটা টেনে দিয়েছে। শ্রী বারণ করলেও শোনেনি। আর এই ক্রিমটা মেখে ওর মুখ ভর্তি ব্রন হতে শুরু করেছে। কিছু না মাখলে ঠোঁট, গাল ফেটে যাচ্ছে। আর ওই ক্রিমটা মাখলেই ব্রন হচ্ছে। তবু ঋতি ক্রিমটা মাখতেই থাকে। গালদুটো ওর বিশ্রী ব্রনতে ভরে গেছে। এর মধ্যে আবার টুয়া এসে হাজির। ছেলেকে ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। অর্জুন ভীষণ মেরেছে। ওর একটা চোখ প্রায় ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। মাথাটা দরজার বাটামে ঠুকে দিয়ে ছিল। ওর ছেলে তাই অর্জুনকে ব্যাট দিয়ে পিটিয়েছে। সেই রাগে অর্জুন টুয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। টুয়া কোনোরকমে দিদির কাছে এসে উঠেছে। কিন্তু অনন্ত তো এসব দায়িত্ব নেবে না। সে ক্রমাগত বলেই চলেছে তোমার বাবাকে খবর দাও। এসে নিয়ে যাক। বিশ্বদেব খবর পেয়ে এসেছিল। টুয়া কতটুকু খায় মেজ বৌ যে বুধুর এতো অসুবিধে হচ্ছে? আমি ওকে আমার কাছে নিয়ে যেতেই পারি। কিন্তু ওর বর তো জানতে পারলে আরো চারটে বাজে কথা বলবে!
শ্রী টুয়াকে বোঝাতেই থাকে, এখনো সময় আছে। মালদায় ছোটোকাকুকে বলে তোর নার্সিং ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ট্রেনিং নে, চাকরি কর। নিজের জোরে বাঁচ।
টুয়া প্রথমে চুপ করে থাকে। তারপর বলে, আমি ওসব পারব না দিদি। অতো নোংরা কাজ আমার দ্বারা হবে না।
নার্সের কাজ নোংরা কেন হবে টুয়া! নার্স আর আয়া তো এক নয়!
না রে দিদি। আমি একরকম জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অর্জুন আমাকে মারে ঠিকই, কিন্তু বছরে চারবার বেড়াতে নিয়ে যায়, দামি দামি শাড়ি, গয়না, কাজের লোক, রান্নার লোক কোনো অভাব রাখেনি।
শ্রীর একবার বলতে ইচ্ছে হলো, ছিঃ টুয়া, তুই এতো লোভী! শাড়ি গয়নার জন্য নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতেও তোর বাধছে না! কিন্তু ওর অবস্থা দেখে এসব আর বলা হলো না।
টুয়া দু একদিনের মধ্যে অর্জুনকে ফোন করে আবার ফিরে গেল। কিন্তু অর্জুনের আবার বাচ্চা চাই। একটা মেয়ে যদি টুয়া তাকে দিতে পারে, তবে অর্জুন আর টুয়ার গায়ে হাত তুলবে না। টুয়া প্রতিশ্রুতি দিল।
শ্রীর ওকে সাবধানে থাকতে বলা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। অস্মি কোনো অসুবিধেয় পড়লে সোজা বাপীর কাছে মালদায় ছোটে। ছেলের পড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অস্মি বাপীর কাছ থেকে টাকা আনতে ছোটে। টুয়া ছুটে আসে দিদির কাছে। ফোন করে কখনো লীলাদির বাড়িতে। এই ফ্ল্যাটে আসার পর থেকে এখানকার বাসিন্দাদের ওপর শ্রীকে নির্ভর করতেই হয়েছে। তার বাড়িতে ফোন নেই। ফলে লীলাদির বাড়ির ফোনের সুবিধে নিতে হয়েছে। তার বাড়িতে ফ্রিজ নেই। ফলে এর ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে তাদের ফ্রিজে মাছটা, মাংসটা রাখার অনুমতি চাইতে হয়েছে। একটি পরিবার আছে এই ফ্ল্যাটে যারা আমিষ খায় না। তাদের ফ্রিজে মাছ রেখেছিল বলে তারা শ্রীকে যা তা অপমান করেছে। কেউ কেউ তো মুখের ওপর বলে দেয় যে ফ্রিজে জায়গা নেই বা ফ্রিজ খারাপ। শ্রীকে শুনে চলে আসতে হয়।
কখনো আবার কদিন টুয়া বা অস্মির খবর না পেয়ে কারো বাড়ি ফোন করতে ছোটে শ্রী। বাইরে থেকে ফোন করার মতো টাকা নেই তার কাছে। সেই পরিবার তার বদলে শ্রীকে দিয়ে কোনো কাজ করিয়ে নেয়। যেমন এই ফ্ল্যাটে অন্তত দুটো ঘরে গ্যাস পাল্টে দেওয়াটা শ্রীরই কাজ। দিন নেই রাত নেই, তারা ডেকে পাঠায়। শ্রীকে করে দিতে হয়। তারপরও তারা কাজের লোকের কাছে, সামনের ধোপাটার কাছে শ্রীর নামে নিন্দে করে। শ্রী ফোন করে বলে ফোনের বিল বেশি আসে এমন কথাও বলে! আর এসব ব্যাপারে অনন্তর কোনো ভূমিকা নেই। শ্রী অপমানিত হওয়ার পরও পরেরবার আবার সে শ্রীকে একই কাজ করতে বলে। কিন্তু এসব অপমান,অপদস্তের পরেও আরো কিছু পাওয়া শ্রীর জীবনে বাকি ছিল। দুঃখের ভাড়ার তার এখনো পূর্ণ হয়নি।

(ক্রমশ)

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes