আলোকের সাধনা (টমাস আলভা এডিসনের জীবন-কাহিনি) (পঞ্চদশ পর্ব) হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

আলোকের সাধনা (টমাস আলভা এডিসনের জীবন-কাহিনি) (পঞ্চদশ পর্ব) হোমেন বরগোহাঞি মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ-বাসুদেব দাস

১৫

বিজলি বাতির আবিষ্কার

ফনোগ্রাফের আবিষ্কারকেই এডিসন তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু সেই একই মানুষ যখন বিজলি বাতি আবিষ্কার করে রাতকে দিন করে নেওয়া সম্ভব করে তুললেন এবং তা করে মানুষের জীবন যাপনের পদ্ধতিতে অকল্পনীয় পরিবর্তন ঘটালেন, তখন এই দুটি আবিষ্কারের ভেতর কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ সে কথা এক কথায় বলে দেওয়া বড়ো কঠিন হয়ে পড়ল।

এডিসনের বিজলি বাতির আবিষ্কারের কাহিনি বলতে শুরু করার আগে তাঁর ফনোগ্রাফের বিষয়ে আরও দুটি কথা বলাটা জরুরি বলে মনে হচ্ছে।

যেকোনো নতুন জিনিসের পেটেন্টের জন্য আবেদন করার সময় সেই জিনিসটি মানুষের কী কী কাজে লাগতে পারে সে কথা উল্লেখ করতে হয়। এডিসন তাঁর আবেদনে ফনোগ্রাফের চারটি ব্যবহারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছিলেন। সেগুলি ছিল ১) এই যন্ত্রকে শ্রুতলিপি দিয়ে স্টেনোগ্রাফারের সাহায্য ছাড়াই চিঠি লেখাতে পারা যাবে এবং শ্রুতলিপির সাহায্যে করতে চাওয়া প্রতিটি কাজ করানো যাবে।২) অন্ধ মানুষকে বই পড়ে শোনানোর জন্য এই যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে। ৩) মানুষকে বাগ্মিতা তথা  বক্তৃতা কৌশল শেখানোর কাজে এটা বিশেষভাবে সাহায্য করবে।৪) এই যন্ত্রের সাহায্যে গান বাণীবদ্ধ করে রেখে তা বারবার শোনা এবং শোনাতে পারা যাবে।

পৃথিবীতে ফনোগ্রাফ নামের কোনো যন্ত্র নেই–ক্ষণিকের জন্য একথা কল্পনা করতে চেষ্টা করলেই এডিসনের এই আবিষ্কার পৃথিবীতে কী ধরনের যুগান্তর এনেছে সে কথা উপলব্ধি করা সহজ হবে।

১৮৭৮ সনের ১৯ ফেব্রুয়ারির দিন এডিসন তার ফনোগ্রাফের জন্য পেটেন্ট লাভ করলেন এবং তার পরের দিনই খবরের কাগজের মাধ্যমে এই অভূতপূর্ব এবং বিস্ময়কর আবিষ্কারের খবর পেয়ে পৃথিবীর মানুষ এডিসনকে ধন্য ধন্য করতে লাগলেন। যন্ত্র থেকে বের হওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর শোনার জন্য একদিন আমেরিকার বিজ্ঞান আকাদেমিতে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হল। তারা নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারল না; কিন্তু সঙ্গে এই কথাও সবাই বুঝতে পারল যে ঘটনাটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। কল্পনার অতীত অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা মানুষটির প্রতি কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধা এবং প্রশংসা উথলে উঠল। এই সমস্ত মানুষের হয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি এডিসনকে নিজের বাসভবনে নিমন্ত্রণ করে ডেকে এনে তাকে অভিনন্দন জানালেন।

জীবনের শেষ বয়সে এডিসন থিয়োডর ড্রেইসারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর নিজের বিষয়ে একটি অত্যন্ত আশ্চর্যের কথা বলেছিলেন। (থিয়োডর ড্রেইসার আমেরিকার একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক। তাকে সেই দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখকদের ভেতরে একজন বলে গণ্য করা হয়)। এডিসন ড্রেইসারকে  বলেছিলেন–’একটি জিনিস আবিষ্কার বা উদ্ভাবন করার পরে আমি সেই জিনিসটার প্রতি তীব্র ঘৃণা অনুভব করতে শুরু করি। জিনিসটা সফলভাবে উদ্ভাবন করে বের করার পরে আমি তার ছায়াটাও সহ্য করতে পারি না। গত দশ বছরে আমি একদিনের জন্যও টেলিফোন ব্যবহার করিনি। আর বিজলি বাতির আলো থেকে নিস্তার  পাবার জন্য আমি যে কোনো কাজ করতে পারি।’

এডিসন ১৮৭৭ সনে ফনোগ্রাফ আবিষ্কার করলেন যদিও তার পরের দশটি বছর তিনি ফনোগ্রাফের কথা ভুলে রইলেন। তিনি মত্ত হয়ে পড়লেন একশত একটি নতুন আবিষ্কারের চিন্তায়। অবশ্য  ১৮৮৭ সনে পুনরায় একবার ফনোগ্রাফের কথা তাঁর মনে পড়ল, এবং নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি যন্ত্রটিকে আগের চেয়ে অনেক উন্নত করে তুললেন।

এডিসন বিজলি বাতি আবিষ্কার করার আগে পর্যন্ত মানুষ রাতের বেলা ঘর আলোকিত করার জন্য তেল এবং মোমবাতি ব্যবহার করতেন। অবশ্য কেরোসিন তেল আবিষ্কার হওয়ার তখনও  খুব বেশিদিন হয়নি। কেরোসিন তেল আবিষ্কার হওয়ার আগে অসমের মানুষ সর্ষের তেলের প্রদীপ, জোর এবং নাহরের গুটি আদি ব্যবহার করতেন। কেরোসিন তেল আবিষ্কারের ফলে মানুষের বড়ো সুবিধা হল, কারণ কেরোসিন তেলের প্রদীপ বা লেম্প বেশি আলো দেয়। কিন্তু তা বলে সুইচ টিপলেই আলোকিত হওয়া বিদ্যুতের বাতির সঙ্গে কেরোসিন তেলের প্রদীপের লেম্পকে তুলনা করা যায় কি? কেরোসিন তেলের প্রদীপ এবং লেম্প থেকে ধোঁয়া নির্গত হয়, দুর্গন্ধ বের হয় এবং সেসব প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হয়। আর বিজলি বাতি? ধোঁয়া নেই, দুর্গন্ধ নেই, প্রতিদিন পরিষ্কার করার কোনো প্রয়োজন নেই। কেবল একটা সুইচ টিপলেই হল।

টমাস আলভা এডিসনের আগেও মানুষ এ কথা জানত যে বিদ্যুৎ শক্তি থেকে আলো এবং উত্তাপ দুটোই পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মানুষ কথাটাকে শুধু তত্ত্ব হিসেবে জানত। বিজলি শক্তি থেকে আলো বের করে কীভাবে তাকে মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা যায় সেই বিষয়ে মানুষের কোনো ধারনাই ছিল না। এই কাজ সম্ভব করে তোলার জন্য পৃথিবীকে অপেক্ষা করতে হল টমাস আলভা এডিসনের মতো একজন অসাধারণ প্রতিভাবান মানুষের আবির্ভাবের জন্য। বলা হয় যে প্রয়োজনই হল আবিষ্কারের মাতা। মানুষ যখনই তীব্রভাবে কোনো জিনিসের প্রয়োজন অনুভব করে তখনই তা আবিষ্কার করার চিন্তাও মানুষের মনের মধ্যে উঁকি দেয়। বিজলি বাতির চিন্তাও এডিসনের মনে ঠিক এভাবেই এসেছিল।

একদিন রাতে তিনি গবেষণাগারে কাজ করে থাকা অবস্থায় হঠাৎ তার টেবিলের লেম্পটা নিভে গেল। পরম মনোযোগে কিছু একটা কাজ করে থাকার সময় হঠাৎ ল্যাম্পটা নিভে গিয়ে কাজটা করতে না পারা হলে মনের অবস্থা কেমন হয় সে কথা প্রত্যেক মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই জানে। তার মধ্যে আবার এডিসনের মতো কাজ পাগল মানুষের কাজ কোনো সাধারণ কাজ ছিল না। তিনি মত্ত হয়েছিলেন আবিষ্কারের নেশায়। কাজটি অর্ধেক করার সময় হঠাৎ ঘর অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় এডিসনের মন ভেঙ্গে পড়ল। প্রতিকারহীন যন্ত্রনা তাকে গ্রাস করে ফেলল।

অন্ধকার ঘরে তিনি বিষন্ন মনে স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন; তখনই হঠাৎ একটা নতুন চিন্তা বিদ্যুতের মতো তাঁর মনের মধ্য দিয়ে ঢেউ খেলে গেল। বিদ্যুৎ শক্তির সাহায্যে প্রদীপ জ্বালানো সম্ভব নয় কি? তিনি চেয়ারটিতে সোজা হয়ে বসলেন। কেন পারা যাবে না? নিশ্চয় পারা যাবে। এডিসন সঙ্গে সঙ্গে সংকল্প গ্রহণ করলেন–বিজলি শক্তির সাহায্যে প্রদীপ জ্বালানোর উপায় উদ্ভাবন করাটাই হবে সেই মুহূর্ত থেকে তার একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান একমাত্র লক্ষ্য।

আমরা সুইচ টিপে দিয়ে বিজলি বাতি জ্বালানোর সময় একবারও এই কথা মনে করি না যে প্রতিদিন দেখতে দেখতে অতি তুচ্ছ এবং সামান্য যেন মনে হওয়া এই জিনিসটি উদ্ভাবন করার জন্য টমাস আলভা এডিসন নামের একজন মানুষকে  সাধারণ মানুষ কল্পনা করতে না পারা অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। কাজটা আরম্ভ করেই এডিসন বুঝতে পারলেন যে তিনি একটি অত্যন্ত কঠিন কাজে হাত দিয়েছেন। কিন্তু কাজ যত কঠিনই হয় ততই এডিসনের জিদ বেড়ে যায়। কৃতকার্য হওয়ার দুর্জয় সংকল্প মনে নিয়ে এডিসন তার গবেষণার কাজ আরম্ভ করে দিলেন। প্রথমে তিনি পড়তে  শুরু করলেন বিজলির শক্তি সম্পর্কে লেখা  যতগুলি বই পাওয়া যায় সেই সমস্ত বই। বই পড়া প্রয়োজনীয় কথাগুলি টুকে রাখার জন্য তিনি দুশোটি  নোট বইয়ের প্রয়োজন অনুভব করলেন। ঠিক সেভাবে তিনি চল্লিশ হাজার পৃষ্ঠা ভরিয়ে ফেলেছিলেন নক্সা এঁকে এবং বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি সম্পর্কে তার মনে আসা কথাগুলি টুকে রেখে। বিজলি বাতি  সম্পর্কে  গবেষণা আরম্ভ করা মুহূর্ত থেকে কাজটা শেষ না করা পর্যন্ত এডিসন গড় হিসেবে প্রতিদিন কুড়ি ঘন্টা করে কাজ করতেন।

বিজলি পরিবাহক যেকোনো তারের মধ্য দিয়ে যখন বিদ্যুতের স্রোত বয়ে যায় তখন তাকে রোধ করতে পারলেই একই সঙ্গে তার থেকে তাপ এবং আলো পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হল এই যে এভাবে উদ্ভব হওয়া  তাপের ফলে তারটা পুড়ে  যায়। তারটা পুড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আলো নাই হয়ে যায়। তাই বিজলি বাতি নির্মাণ করার ক্ষেত্রে দেখা দেওয়া প্রথম এবং প্রধান সমস্যাটি হল এমন একটি তার বা ফিলামেন্ট উদ্ভাবন করা —যে তার  বা ফিলামেন্ট  তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া বিজলি শক্তির উত্তাপে  পুড়ে বা ছিঁড়ে যাবে না।

এডিসন নিজের বুদ্ধিতে তৈরি করা যে ফিলামেন্টের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে আলো বের করার চেষ্টা করেছিলেন সেই ফিলামেন্ট মাত্র এক মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়েই ছিঁড়ে যাচ্ছিল।এডিসন সমগ্র ঘটনাটি সুক্ষভাবে নিরীক্ষণ করে বুঝতে পারলেন যে যেকোনো ধাতব পদার্থ বাতাসের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে তার ওপরে অম্লজান করা ক্রিয়ার ফলে অক্সাইড সৃষ্টি হয়। এই ধরনের ধাতব পদার্থের মধ্য দিয়ে বিজলি শক্তি প্রবাহিত করলে সে বেশি পরিমাণে বিকিরণ করে। তাই এডিসনের দ্বিতীয় সমস্যাটি হল একটি বায়ুশূন্য বাল্ব তৈরি করে তার মধ্যে ফিলামেন্টটাকে রাখার ব্যবস্থা করা। বায়ুশূন্য জায়গায় রাখা কোনো পদার্থই অম্লজানের সংস্পর্শে আসতে পারে না। ফলে  তা তাপ বিকিরণ করতে পারে না। এডিসন নিজের কারখানাতে একটা কাচের বাল্ব তৈরি করলেন। ফিলামেন্টটা কাচের বাল্বে ভরিয়ে দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে বাল্বের বায়ুটুকু পাম্প করে নিষ্কাশিত করা হল এবং  বাল্বটিকে বাতাস ঢুকতে না পারার মতো সিল করে দেওয়া হল।। এরপরে ফিলামেন্টটার মধ্য দিয়ে বিজলি প্রবাহিত করার সঙ্গে সঙ্গে তা তৎক্ষণাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শুভ্র আলো বিকিরণ করতে লাগল।

 

এডিসন প্রথমবার এই ধরনের পরীক্ষা করার সময় ফিলামেন্টটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে গিয়েছিল। তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য আলো দিয়েছিল।। কিন্তু এইবার মুহূর্তগুলি পার হয়ে যেতে লাগল। মুহূর্তগুলি পার হয়ে যেতে লাগল,অথচ ফিলামেন্টটার আয়ু শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। উত্তেজনায় এডিসনের বুক কাঁপতে লাগল। ।তিনি অবশেষে সত্যিই মানুষের ব্যবহারযোগ্য বিজলি বাতি তৈরি করতে পারলেন নাকি?তিনি পকেট থেকে ঘড়িটি বের করে দেখতে লাগলেন। এক মিনিট দুই মিনিট তিন মিনিট।ঘড়ির কাঁটাটা  যতই ঘুরতে লাগল ততই এডিসনের হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে লাগল।

হঠাৎ এডিসনের চোখের সামনে ফিলামেন্টটা ছিঁড়ে দু টুকরো হয়ে গেল। তিনি ঘড়ি দেখলেন— ফিলামেন্টটা পুরো আট মিনিট ধরে জ্বলছিল।

এডিসনের প্রথম পরীক্ষার সময় জ্বলে উঠেই চোখের নিমেষে নিভে গিয়েছিল। কিন্তু এইবার বায়ুশূন্য বাল্বের ভেতরে তা জ্বলে থাকল আট মিনিট সময়।এডিসন বুঝতে পারলেন যে তিনি সঠিক পথে এগিয়ে চলেছেন, কৃতকার্যতার দরজায় উপনীত হতে তাকে আর বেশিদূর যেতে হবে না। বায়ুশূন্য বাল্বের ভেতরে ফিলামেন্টের আয়ু বাড়াতে পারলেই তিনি মানুষের ব্যবহারযোগ্য বিজলি বাতি তৈরি করতে পারবেন। এইবার তিনি আরম্ভ করলেন  দীর্ঘস্থায়ী ফিলামেন্ট তৈরি করার উপযোগী উপাদানের সন্ধান।

প্পে়টিনামের মতো মহামূল্যবান ধাতু থেকে আরম্ভ করে বাঁশের চোঁচ,  মানুষের চু্‌ল, কাগ্‌জ, তুলো ইত্যাদি অসংখ্য জিনিসের দ্বারা তিনি  ফিলামেন্ট তৈরি করতে চেষ্টা করলেন।তার হাজার হাজার পরীক্ষা ব্যর্থ হল। তার সহকর্মীরা  হতাশায় ভেঙ্গে পড়লেন। কিন্তু এডিসন ছিলেন সম্পূর্ণ অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। তাঁর সহকর্মীদের মতো তিনিও যদি হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে নিজের সংকল্প ত্যাগ করতেন তাহলে আমরা আজ তার এই জীবনীটি লেখার বা পড়ার কোনৈো প্রয়োজনই অনুভব করতাম না। এডিসন ঠিকই বলেছিলেন যে প্রতিভা মাত্র এক শতাংশ প্রেরণা, বাকি নিরানব্বই শতাংশ হল ঘর্মাক্ত পরিশ্রম। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েও ঘর্মাক্ত পরিশ্রমে লেগে থাকতে পারতে হলে মানুষের প্রয়োজন অপরিসীম ধৈর্য এবং চরিত্র বল। কেবল বুদ্ধি বা প্রতিভা যে যথেষ্ট নয়, তার সঙ্গে ধৈর্য এবং পরিশ্রম শক্তি যোগ হলে মানুষ প্রতিভার সাহায্যে মহৎ কার্য সম্পাদন করতে পারে— এটাই হল এডিসন মানুষকে দিয়ে যাওয়া সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা।

অসংখ্যবার পরীক্ষা করার পরে এডিসন অবশেষে এই সিদ্ধান্তে উপস্থিত হলেন যে তার সমস্যাটার সমাধান করতে পারে একমাত্র কার্বন। অর্থাৎ  বিজলি প্রবাহিত হওয়ার পরে ফিলামেন্টটা পুড়ে বা ছিঁড়ে যাতে না যায় তার জন্য তাকে ফিলামেন্টটা তৈরি করতে হবে কার্বন দিয়ে। এডিসনের নির্দেশ মতো তার  দুজন সহকর্মী কয়েকটি সাদা সুতোর উপরে  ঝুলের প্রলেপ লাগিয়ে পরে তাকে কালো করল; তারপরে সুতোগুলি ফারনেসের প্রচন্ড উত্তাপের মধ্যে রেখে তাকে কার্বন অর্থাৎ অঙ্গারে পরিণত করা হল।এই সমগ্র প্রক্রিয়াটা সমাপ্ত হওয়ার পরে সেই কার্বন থেকে অতি কষ্ট করে একটা ফিলামেন্ট তৈ্রি করা হল।

অবশেষে এডিসন তাঁর চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হলেন।একজন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাল্ব রাখা ঘরটাতে প্রবেশ করলেন।রাত তখন নয়টা বেজেছে।

এডিসনের হাতে কাচের গোলাকার বাল্বটা,তাঁর সহকারীর হাতে কার্বনের ফিলামেন্ট।দুজনেই নিজের নিজের হাতে থাকা জিনিস দুটি এত যত্ন আর আদর করে ধরে রেখেছেন–যেন সেই দুটির চেয়ে বেশি মূল্যবান জিনিস পৃ্থিবীতে অন্য কিছুই নেই।এডিসন নিজে খুব সতর্কভাবে ফিলামেন্টটা কাচের বাল্বটাতে ঢুকিয়ে দিয়ে সেখান থেকে পাম্প করে বাতাস্টুকু বের করে দেবার জন্য সহকারীকে নির্দেশ দিলেন।এইটুকু কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরে এডিসন ফিলামেন্টটা দিয়ে বিজলির স্রোত বইয়ে দিলেন।

মুহূর্তের মধ্যে ফিলামেন্টটা জ্বলে উঠল এবং তা থেকে শুভ্র নিস্পন্দ আলো বিকিরিত হতে লাগল। তার চেয়েও বেশি উজ্জ্বল আলো বিকিরিত হতে লাগল এডিসন এবং তার সহকারীর মুখ থেকে। সেই আলো ছিল কষ্টার্জিত কৃতকার্যতা দান করা গভীর আনন্দের আলো।

কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছিল ভয় এবং আশঙ্কা। প্রথমবার পরীক্ষায় ফিলামেন্টটা আলো দিয়েছিল মাত্র এক মুহূর্তের জন্য। দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায় তা আলো দিয়েছিল আট মিনিটের মতো। এবার বা ফিলামেন্টের জীবনকাল কত সময় স্থায়ী হয়! এডিসন মুহূর্তের মধ্যে গম্ভীর হয়ে পড়লেন। মাত্র দশ  বা পনেরো  মিনিট আলো দিয়েই ফিলামেন্টটা যদি পুড়ে বা ছিঁড়ে যায়, তাহলে তাঁর পরীক্ষা সফল হয়েছে বলে নিশ্চয় বলা যাবে না। দীর্ঘস্থায়ী ফিলামেন্টের উপযোগী উপাদানের সন্ধানে তাকে  পুনরায় আরম্ভ করতে হবে দীর্ঘ কষ্টকর পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

দশ  মিনিট সময় পার হয়ে গেল। কিন্তু ফিলামেন্টটা জ্বলেই চলেছে। এডিসন তাঁর বুক থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসা অনুভব করলেন। কার্বন ফিলামেন্টটা অন্তত আগের প্লেটিনাম ফিলামেন্টের আট মিনিটের অভিলেখ ভঙ্গ করতে সক্ষম হয়েছে।

আরও দশ মিনিট…তারপরে আরও দশ মিনিট…এভাবে পুরো ষাট মিনিট পার হয়ে গেল। ফিলামেন্টটা জ্বলছে। তখনই একটি ছেলে এডিসনের ঘর থেকে তার জন্য ব্রেকফাস্ট নিয়ে রুমের ভেতর প্রবেশ করল। তখন এডিসন বুঝতে পারলেন যে ইতিমধ্যে রাত শেষ হয়ে একটি নতুন দিনের শুরু হয়েছে। ফিলামেন্টটাও তার অনিশ্চিত জীবনকালের প্রথম একটি ঘন্টা পূরণ করল। এডিসন নিজে ব্রেকফাস্ট খেয়ে  শুরু করার আগে তাঁর সহকারীকে বাড়িতে গিয়ে ব্রেকফাস্ট খেয়ে আসতে নির্দেশ দিলেন। কিন্তু সহকারীটি যেতে চায় না। তাঁর মনে ভয়–কী জানি সে দূরে থাকার সময়ে ফিলামেন্টটা যদি আবার নিভে যায়! কিন্তু ফিলামেন্টটা এক ঘন্টা জ্বলে থাকতে দেখার পরে এডিসনের আশা এবং আত্মবিশ্বাস দুটি আগের চেয়ে বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এডিসন সহকারীকে আশ্বাস দিয়ে বললেন যে তিনি ব্রেকফাস্ট খেয়ে বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পরেও ফিলামেন্টটাকে জ্বলে থাকতে দেখতে পাবেন।

ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে লাগল; সূর্য আকাশের মাঝখানে উঠে পড়ল; কিন্তু ফিলামেন্টটা নিভে যাওয়ার কোনো লক্ষণই নেই। অবশেষে দিনটাও শেষ হয়ে গেল। ফিলামেন্টটা ইতিমধ্যে বারো ঘন্টার চেয়েও বেশি সময় ধরে জ্বলছে। আরও কতক্ষণ ধরে জ্বলবে? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য বাল্বটিকে সামনে নিয়ে বসে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। এডিসন তাঁর সহকারীকে বললেন–’রাত হয়েছে। তুমি বাড়ি যাও। আমি একাই ফিলামেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকব।’কিন্তু এরকম একটি অভূতপূর্ব এবং যুগান্তকারী ঘটনার শেষ পরিণতি নিজের চোখে না দেখে সহকারীটি বাড়িতে যেতে রাজি হল না। দুজন মানুষ ফিলামেন্টটার সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।

ফিলামেন্টটা জ্বলতে আরম্ভ করা আটচল্লিশ  ঘণ্টার পরে অবশেষে তা থেকে আলো বের হওয়া বন্ধ হল। দিনটি ছিল ১৮৭৯ সনের একুশ অক্টোবর। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দিন। কারণ সেদিনই একথা নিশ্চিত হল যে অশেষ চেষ্টার শেষে টমাস আলভা এডিসন অবশেষে বিজলি বাতি উদ্ভাবন করতে সমর্থ হয়েছেন। তেলের প্রদীপ এবং মোমবাতির যুগ শেষ হল। এরপরে পৃথিবীটা কখনও আর আগের মতো হয়ে থাকবে না।

এই অভিনব আবিষ্কারের খবর সরকারিভাবে জানানোর আগে এডিসন পরের কয়েকটি সপ্তাহ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিজলি বাতিকে যথাসম্ভব আরও বেশি নিখুঁত করে তুললেন। তারপরেই তিনি নিউইয়র্ক হেরাল্ড  নামের খবরের কাগজের সাংবাদিক এবং তাঁর বন্ধু মার্শাল ফক্সকে তার মেনলো পার্কের গবেষণাগারে ডেকে পাঠালেন। এডিসন যখন ফক্সের সামনে তার বিজলি বাতি জ্বালিয়ে দেখালেন, বিস্ময় এবং আনন্দে অভিভূত সাংবাদিক কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললেন। এর আগেও এডিসনের অন্যান্য বিস্ময়কর আবিষ্কার গুলি দেখার প্রথম সুযোগ সব সময় মার্শাল ফক্সই পেয়েছিলেন। কিন্তু বিজলি বাতি দেখার পরে তাঁর মনে ধারণা হল যে এটাই হল এডিসনের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। এই আবিষ্কার পৃথিবীকে একেবারে বদলে দিতে সক্ষম হবে। তিনি নিউইয়র্কে ফিরে গিয়ে নিজের খবরের কাগজে লিখলেন–’বিজলী বাতি–পৃথিবীর এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। কাচের বাল্ব থেকে আলো বের হচ্ছে এবং তা রাতকে দিনের মতো আলোকিত করে তুলছে। এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে মেনলো পার্কের আলভা এডিসন।’

বিজলি শক্তি থেকে আলো বের করে তাকে যে সত্যিই প্রদীপের মতো ব্যবহার করা যেতে পারে এরকম একটি সম্ভাবনা মানুষ কখনও কল্পনাতেও জায়গা দেয়নি। তাই নিউইয়র্ক হেরাল্ডে  খবরটা পড়ে বেশিরভাগ মানুষই এটাকে গাঁজাখুরি গল্প বলে উড়িয়ে দিলেন। খুব কম মানুষই খবরটাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করলেন। সাধারণ মানুষের এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখে এডিসন স্বাভাবিকভাবেই মনে কিছুটা আঘাত পেলেন। তিনি এরকম একটি প্রদর্শনীর আয়োজনের কথা ভাবলেন–যেখানে সমস্ত মানুষ নিজের চোখে তাঁর বিজলি বাতির আলো দেখতে পাবে।

এডিসন কয়েকশো বিজলি বাতি তৈরি করে মেনলো পার্কের ঘরগুলির ওপরে এবং গাছের ডালে সেগুলি ঝুলিয়ে দিলেন। চারপাশে খবর পাঠানো হল যে ১৮৮০ সনে নববর্ষ আরম্ভ হওয়ার দিন মেনলো পার্কে এই অভিনব আলোর উৎসব হবে। উৎসবে প্রত্যেকের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকবে। এডিসন এমনকি নিজের খরচে নিউইয়র্ক এবং ফিলাডেলফিয়া থেকে মেনলো পার্কে ট্রেন চলাচল করার ব্যবস্থা করে দিলেন।

নির্দিষ্ট দিনে চার পাশ থেকে দলে দলে মানুষ এসে মেনলো  পার্কে সমবেত হল। প্রত্যেকের মনেই ভীষণ উত্তেজনা এবং কৌতূহল। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এডিসন সুইচ টিপে দিলেন, আর মুহূর্তের মধ্যে শত শত বিজলি বাতি জ্বলে উঠে সমগ্ৰ শহরটিকে আলোর বন্যায় ভাসিয়ে দিল। মুহূর্তের জন্য মানুষগুলি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে রইল। পরের মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের মুখ থেকে সমস্বরে বের হওয়া আনন্দের চিৎকার দশদিক আলোড়িত করে তুলল। প্রত্যেকেই এক মুখে স্বীকার করল–এডিসন একজন অলৌকিক শক্তির অধিকারী জাদুকর। জাদুকর ছাড়া এই ধরনের অসম্ভব কাজ আর কে করে দেখাতে পারে?

সেদিন থেকে সমগ্র দেশে এডিসন ‘মেনলো  পার্কের জাদুকর’নামে পরিচিতি লাভ করলেন।

———-

লেখক পরিচিতি-১৯৩২ সনে লক্ষ্মীমপুর জেলার ঢকুয়াখনায় হোমেন বরগোহাঞির জন্ম হয়। ১৯৫৪ সনে কটন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক। সাময়িকভাবে সরকারি চাকরি করে সাহিত্যচর্চা এবং পরবর্তীকালে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ‘নীলাচল’, ‘জনক্রান্তি’, ‘নাগরিক’,’অসম বাণী’ইত্যাদি কাগজের সম্পাদনা করেন। ‘পিতাপুত্র’ উপন্যাসের জন্য ১৯৭৭ সনে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ‘আত্মানুসন্ধান’,‘বিভিন্ন নরক’,‘সুবালা’, ‘মৎস্য গন্ধা’, ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’ লেখকের অন্যতম গ্রন্থ। লেখকের ছোট গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ এবং আত্মজীবনী মূলক  রচনা অসমিয়া সাহিত্যকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। ১২ মে ২০২১ সনে এই মহান লেখকের মৃত্যু হয়।

অনুবাদক পরিচিতি- ১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলার যমুনামুখে বাসুদেব দাসের জন্ম হয়।১৯৮২ সনে গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্বে এম এ করেন। আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনূদিত গল্পের সংখ্যা পাঁচশত পঞ্চাশটির ও বেশি।সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে নিয়মিত ভাবে অসমিয়া গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ এবং উপন্যাস অনুবাদ করে চলেছেন।গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপরিচিত সংস্থা NEINADএর পক্ষ থেকে অসমিয়া ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের জন্য  Distinguished Life Membership  এর দ্বারা সম্মানিত করা হয়।প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ছেচল্লিশটি।হোমেন বরগোহাঞির অসমিয়া উপন্যাস ‘সাউদর পুতেকে নাও মেলি যায়’(সওদাগরের পুত্র নৌকা বেয়ে যায়) বাংলা অনুবাদের জন্য ২০২৪ সনের সাহিত্য আকাদেমি অনুবাদ পুরস্কারে সম্মানিত হন।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

CATEGORIES
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)
demon slauer rule 34 lena the plug leak amateurtrheesome.com cumming in milfs mouth mujer haciendo el amor a un hombre, belle delphine of leaked emma watson in porn xxxamat.com big booty in public hidden cam gay sex, sit on face porn g a y f o r i t forcedpornanal.com please screw my wife female celebrity sex tapes