সাম্প্রদায়িকতার কাহিনিতে রবীন্দ্রনাথ – দুর্ভাগা ‘গুরুবর’!  <br />  জয়ন্ত ভট্টাচার্য

সাম্প্রদায়িকতার কাহিনিতে রবীন্দ্রনাথ – দুর্ভাগা ‘গুরুবর’!
জয়ন্ত ভট্টাচার্য

“আমি যখন আমার জমিদারি সেরেস্তায় প্রথম প্রবেশ করলেম তখন একদিন দেখি, আমার নায়েব তাঁর বৈঠকখানায় এক জায়গায় জাজিম খানিকটা তুলে রেখে দিয়েছেন। যখন জিজ্ঞেস করলেম, ‘এ কেন’ তখন জবাব পেলেম, যে-সব সম্মানী মুসলমান প্রজা বৈঠকখানায় প্রবেশের অধিকার পায় তাদের জন্য ঐ ব্যবস্থা। এক তক্তপোষে বসাতেও হবে অথচ বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা পৃথক। এ প্রথা তো অনেক দিন ধরে চলে এসেছে; অনেকদিন মুসলমান এ মেনে এসেছে, হিন্দুও মেনে এসেছে। জাজিম-তোলা আসনে মুসলমান বসেছে, জাজিম-পাতা আসনে অন্যে বসেছে।” “কোট বা চাপকান” প্রবন্ধে বললেন – “এক্ষণে যদি ভারতবর্ষীয় জাতি বলিয়া একটা জাতি দাঁড়াইয়া যায়, তবে তাহা কোনমতেই মুসলমানকে বাদ দিয়া হইবে না। যদি বিধাতার কৃপায় কোনোদিন সহস্র অনৈক্যের দ্বারা খণ্ডিত হিন্দুরা এক হইতে পারে, তবে হিন্দুর সহিত মুসলমানের এক হওয়াও বিচিত্র হইবে না। হিন্দু মুসলমানের ধর্মে না - ও মিলিতে পারে, কিন্তু জনবন্ধনে মিলিবে—আমাদের শিক্ষা আমাদের চেষ্টা আমাদের মহৎ স্বার্থ সেই দিকে অনবরত কাজ করিতেছে। অতএব যে - বেশ আমাদের জাতীয় বেশ হইবে তাহা হিন্দু মুসলমানের বেশ।” লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি চিঠিতে। কিন্তু আজ, এই পোস্ট-ট্রুথ বা রাজনৈতিক ভাষ্যে সত্য-বিকৃতির যুগে, তাঁর গায়েও সাম্প্রদায়িকতার ভূষণ চাপিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়তে সত্য-উৎপাদনে রত এক ফ্যাসিস্ট শক্তি। কথা হল এই যে, বিকৃত সত্যকে বারবার বলতে বলতে তা সামাজিক ভাবে এক সত্যে পরিণত হয়। এর বিরুদ্ধে একটাই রাস্তা। প্রকৃত সত্যকে বলে যাওয়া বারবার। যতবার তারা সত্যকে বিকৃত করবে, আমরা ততই সত্যের ইতিহাসাশ্রয়ী রূপ তুলে ধরব। আর সেই রূপ তুলে ধরলেন জয়ন্ত ভট্টাচার্য।

আমার এ লেখাটি নিয়ে চিন্তার সলতে জ্বালিয়েছে ঐতিহাসিক দীপেশ চক্রবর্তীর আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধ (১৮.০১.২১) ‘যেন লজ্জা স্বীকার করি’। দীপেশ চক্রবর্তী তাঁর লেখায় মূলত তিনটি বিষয়ের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন – (১) ‘ফেক’ নিউজ’, (২) কর্তিত বা খণ্ডিত উদ্ধৃতি – বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের মতো স্রষ্টার যাঁর সৃষ্টি সম্ভার বিপুল, এবং (৩) ইতিহাসের কোন বিশেষ সময়ক্রমে কোন উক্তি বা বক্তব্য জন্ম নিচ্ছে, তৈরি হচ্ছে। তৃতীয় ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯২১-এর মোপলা বিদ্রোহ, ১৯২১-এর কিছু হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা এবং ১৯২৫-২৬-এর ‘কাজিয়া তুঙ্গে’ ওঠার প্রসঙ্গ এনেছেন। সাথে এটাও জানিয়েছেন “একটি সাময়িকভাবে শান্ত বছরে চিঠিটি লিখছেন রবীন্দ্রনাথ।”

এ প্রসঙ্গের সূত্র ধরে আমরা ইতিহাসের পথে আরও খানিকটা হাঁটতে পারি। প্রাক-উপনিবেশিক ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের অল্পবিস্তর সুলুক সন্ধান করতে পারি। ইতিহাস ও কল্পকাহিনীর (মিথ) মধ্যেকার সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করতে পারি। পুরাণ বা গল্পগাথা থেকে যেমন ইতিহাসের উপাদান খুঁজে নেবার চেষ্টা করা যায় তেমনি বিপরীত পথে ধূর্ত পায়ে হেঁটে ইতিহাসের মধ্যে পুরাণ, কল্পকাহিনী, গল্পগাথার উপাদান সফলভাবে নতুন করে প্রবিষ্ট করানো যায়। এরফলে অতি সহজে বিশ্বাস করার বা শক্তিশালী গুজবে প্রভাবিত হবার মতো বিপুলসংখ্যক মানুষের মাঝে কোনটি ইতিহাস আর কোনটিই বা ‘ফেক নিউজ’ তথা মশলাদার কল্প-কাহিনী এ বিভাজনরেখা অস্পষ্ট করে ফেলা যায় শুধু দুটি কাজ নিষ্ঠাভরে করে গেলে – প্রথম, ফেক নিউজ নিরন্তর, ছেদহীনভাবে তৈরি করে যেতে হবে; দ্বিতীয়, ‘নির্মিত’ খবরগুলোকে অবিরত এই মানুষগুলোর কাছে পৌঁছে দিতে হবে নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহে। যদিও একাজের জন্য একটি একেবারে তৃণমূল স্তর অব্দি প্রসারিত ও সজীব রেজিমেন্টেড সংগঠন থাকতে হবে।

ফেক নিউজ – সামান্য কথা

নেচার জার্নালে প্রকাশিত নোয়েবল ম্যাগাজিন-এর একটি সংবাদ “Synthetic media: The real trouble with deepfakes” (১৬.০৩.২০২০) বেশ কিছু ছবি এবং ভিডিও পোস্ট করে জানায় – “Nope. All of these images are “deepfakes” — the nickname for computer-generated, photorealistic media created via cutting-edge artificial intelligence technology. They are just one example of what this fast-evolving method can do. (You could create synthetic images yourself at ThisPersonDoesNotExist.com.) Hobbyists, for example, have used the same AI techniques to populate YouTube with a host of startlingly lifelike video spoofs — the kind that show real people such as Barack Obama or Vladimir Putin doing or saying goofy things they never did or said”। বায়োলজির দিক থেকে এটা বলার কথা যে যতবেশি মানুষ উপরিস্তরের নিউরনের কাজের মধ্যে আটকে থাকবে ততবেশি গুজব এবং মিথ্যের বাতাবরণ ফনফনিয়ে বেড়ে উঠবে। নিঊরনের পাশে শুয়ে থাকা গ্লায়াল কোশের কাজ যত কম হবে তত মানুষের গভীরে গিয়ে ভাবার ইচ্ছে এবং ক্ষমতা কমবে। স্মৃতির গভীর থেকে উঠে আসা চিন্তার বিস্তার কমে যাবে। এতে লাভ? রাষ্ট্র এক মানুষ-পিণ্ড তৈরি করতে পারবে যারা প্রশ্ন করতে ভুলে যায়। শুধু দৌড়ে চলে নির্মিত মিথ্যা, অর্ধসত্য বা গুজবের পেছনে। এবং নিপুনতার সাথে যদি এই কাজটিই সেকেন্ড মিনিট ঘন্টা দিন বছর ধরে ছেদহীনভাবে করে যাওয়া যায় তাহলে জনমানসে গুজব গেলানোর সাথে ভোটের ঈপ্সিত ফলাফলের একটি সমানুপাতিক সম্পর্ক তৈরি করা যায় – কি আমেরিকায়, কি অন্যত্র।

ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত (অক্টোবর ১, ২০১৭) একটি খবরের শিরোনাম ছিল – India’s millions of new Internet users are falling for fake news – sometimes with deadly consequences”। এ প্রতিবেদনটিতে মন্তব্য করা হয়েছিল – “যেখানে আমেরিকায় বলা হয় ফেক নিউজ ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয়ে সাহায্য করেছে, ভারতে, যেখানে ৩৫.৫ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, সেখানে মিথ্যা সংবাদ প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে – জাত এবং ধর্মের মাঝে হিংসা বাড়িয়ে তুলছে, এমনকি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়কেও প্রভাবিত করছে।”
নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় রমিলা থাপারের একটি আমন্ত্রিত প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল (মে ১৭, ২০১৯) “They Peddle Myths and Call It History” শিরোনামে। এ প্রবন্ধে থাপার বলেন – “Nationalists are known to construct an acceptable history to identify those who claim constitute the nation; extreme nationalists require their own particular version of the past to legimize their actions in the present. Rewriting Indian history and teaching their version of it is crucial to justifying the ideology of Hindu nationalists … Both Muslim and Hindu nationalisms were rooted in Britain’s colonial understanding of India.”

দ্য আটলান্টিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল একটি সংবাদ (এপ্রিল ১০, ২০১৯) “Misinformation Is Endangering India’s Election” শিরোনামে। এ খবরে হোয়াটস্যাপ গ্রুপে অসংখ্যবার প্রচারিত একটি খবর ছিল – কংগ্রেসের সাথে কাশ্মীরি জঙ্গীদের যোগাযোগ এবং অর্থসাহায্য করা নিয়ে। সংবাদটিতে বলা হচ্ছে – “The claim, however, was fake. No member of Congress, either a national or a state level, had made any such statement.”

এরকম একটি ক্রমাগত বিরামহীনভাবে গড়ে নেওয়া সামাজিক গণমানসিকতার প্রেক্ষিতে আলোচনা করা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা, সাম্প্রদায়িকতা, ইতিহাসের পারম্পর্য এবং এসবের মধ্যেকার অন্তর্গত টানাপোড়েন ও সম্পর্ক।
রবীন্দ্রনাথের চিঠি এবং অন্যান্য

১৯৪৬ সালে প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলীর চতুর্বিংশ খন্ডে ৩৭৪ থেকে ৩৭৭ পাতা জুড়ে রয়েছে কালিদাস নাগকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিটি যা দীপেশ চক্রবর্তীর আলোচনার ভরকেন্দ্র। পরে এই চিঠিটি “কালান্তর’ সংকলনে সংকলিত হয়। “৭ই আষাঢ়, ১৩২৯” বঙ্গাব্দে লেখা চিঠিটি শুরু হচ্ছে এভাবে – “ঘোর বাদল নেমেছে। তাই আমার মনটা মানব-ইতিহাসের শতাব্দীচিহ্নিত বেড়ার ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেছে।” এরপরে লিখছেন – “ঠিক যখন আমার জানলার ধারে বসে গুঞ্জনধ্বনিতে গান ধরেছি –
আজ নবীন মেঘের সুর লেগেছে
আমার ম্নে
আমার ভাবনা যত উতল হল
অকারণে—

ঠিক এমনসময় সমুদ্রপার হতে তোমার প্রশ্ন এল, ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান কী। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, মানবসংসারে আমার কাজ আছে – শুধু মেঘমল্লারে মেঘের ডাকের জবাব দিয়ে চলবে না, মানব-ইতিহাসের যে-সমস্ত মেঘমন্দ্র প্রশ্নাবলী আছে তারও উত্তর ভাবতে হবে। তাই অম্বুবাচীর আসর পরিত্যাগ করে বেরিয়ে আসতে হল।” এরপরে রবীন্দ্রনাথের চিন্তনপথের একটি সরণ ঘটলো। লিখলেন – “পৃথিবীতে দুটি ধর্মসম্প্রদায় আছে অন্য সমস্ত ধর্মমতের সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধতা অত্যুগ্র – সে হচ্ছে খৃষ্টান আর মুসলমান-ধর্ম।” চিঠিতে এরপরের অংশ – “অপরপক্ষে হিন্দুজাতিও এক হিসাবে মুসলমানেরই মতো। অর্থাৎ, তারা ধর্মের প্রাকারে সম্পূর্ণ পরিবেষ্টিত। বাহ্য প্রভেদটা হচ্ছে এই যে, অন্য ধর্মের বিরুদ্ধতা তাদের পক্ষে সকর্মক নয় – অহিন্দু সমস্ত ধর্মের সঙ্গে তাদের non-violent non-co-operation। হিন্দুর ধর্ম মুখ্যভাবে জন্মগত ও আচারমূলক হওয়াতে তার বেড়া আরও কঠিন। মুসলমান্ধর্ম স্বীকার করে মুসলমানের সঙ্গে সমানভাবে মেলা যায়, হিন্দুর সে পথও অতিশয় সংকীর্ণ।” চিঠিতে এগোলেন রবীন্দ্রনাথ – “আধুনিক হিন্দুধর্মকে ভারতবাসী প্রকাণ্ড একটা বেড়ার মতো করেই গড়ে তুলেছিল – এর প্রকৃতিই হচ্ছে নিষেধ এবং প্রত্যাখ্যান। সকলপ্রকার মিলনের পক্ষে এমন সুনিপুণ কৌশলে রচিত বাধা জগতে আর কোথাও সৃষ্টি হয় নি। এই বাধা কেবল হিন্দু-মুসলমানে তা নয়। তোমার আমার মতো মানুষ যারা আচারে স্বাধীনতা রক্ষা করতে চাই। আমরাও পৃথক, বাধাগ্রস্ত।” এ অংশটি আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও সমান সত্যি! যারা আচারে স্বাধীনতা রক্ষা করতে চায় তারা পৃথক, বাধাগ্রস্ত। তাদেরকে পৃথক করে বাধা দেবার এক প্রবল রাষ্ট্রিক উদ্যোগ দুর্মর বেগে সমাজকে প্লাবিত করছে, আবিষ্ট করছে।

পরে অন্যত্র (“হিন্দুমুসলমান”) বলছেন – “আমি যখন আমার জমিদারি সেরেস্তায় প্রথম প্রবেশ করলেম তখন একদিন দেখি, আমার নায়েব তাঁর বৈঠকখানায় এক জায়গায় জাজিম খানিকটা তুলে রেখে দিয়েছেন। যখন জিজ্ঞেস করলেম, ‘এ কেন’ তখন জবাব পেলেম, যে-সব সম্মানী মুসলমান প্রজা বৈঠকখানায় প্রবেশের অধিকার পায় তাদের জন্য ঐ ব্যবস্থা। এক তক্তপোষে বসাতেও হবে অথচ বুঝিয়ে দিতে হবে আমরা পৃথক। এ প্রথা তো অনেক দিন ধরে চলে এসেছে; অনেকদিন মুসলমান এ মেনে এসেছে, হিন্দুও মেনে এসেছে। জাজিম-তোলা আসনে মুসলমান বসেছে, জাজিম-পাতা আসনে অন্যে বসেছে।” “কোট বা চাপকান” প্রবন্ধে বললেন – “এক্ষণে যদি ভারতবর্ষীয় জাতি বলিয়া একটা জাতি দাঁড়াইয়া যায়, তবে তাহা কোনমতেই মুসলমানকে বাদ দিয়া হইবে না। যদি বিধাতার কৃপায় কোনোদিন সহস্র অনৈক্যের দ্বারা খণ্ডিত হিন্দুরা এক হইতে পারে, তবে হিন্দুর সহিত মুসলমানের এক হওয়াও বিচিত্র হইবে না। হিন্দু মুসলমানের ধর্মে না – ও মিলিতে পারে, কিন্তু জনবন্ধনে মিলিবে—আমাদের শিক্ষা আমাদের চেষ্টা আমাদের মহৎ স্বার্থ সেই দিকে অনবরত কাজ করিতেছে। অতএব যে – বেশ আমাদের জাতীয় বেশ হইবে তাহা হিন্দু মুসলমানের বেশ।”

আরেকটি গভীরতর সত্য উচ্চারণ করেছিলেন ক্রান্তদর্শী এই মানুষটি। “হিন্দু-বিশ্ববিদ্যালয়” প্রবন্ধে বাংলা ভাষা প্রসঙ্গে লিখলেন – “বাঙালি বাংলা ভাষার বিশেষত্ব অবলম্বন করিয়াই সাহিত্যের যদি উন্নতি করে তবেই হিন্দিভাষীদের সঙ্গে তাহার বড়ো রকমের মিল হইবে। সে যদি হিন্দুস্থানীদের সঙ্গে সস্তায় ভাব করিয়া লইবার জন্য হিন্দির ছাঁদে বাংলা লিখিতে থাকে তবে বাংলা সাহিত্য অধঃপাতে যাইবে এবং কোনো হিন্দুস্থানী তাহার দিকে দৃক্‌পাতও করিবে না। আমার বেশ মনে আছে অনেকদিন পূর্বে একজন বিশেষ বুদ্ধিমান শিক্ষিত ব্যক্তি আমাকে বলিয়াছিলেন, ‘বাংলা সাহিত্য যতই উন্নতিলাভ করিতেছে ততই তাহা আমাদের জাতীয় মিলনের পক্ষে অন্তরায় হইয়া উঠিতেছে। কারণ এ সাহিত্য যদি শ্রেষ্ঠতা লাভ করে তবে ইহা মরিতে চাহিবে না — এবং ইহাকে অবলম্বন করিয়া শেষ পর্যন্ত বাংলা ভাষা মাটি কামড়াইয়া পড়িয়া থাকিবে। এমন অবস্থায় ভারতবর্ষে ভাষার ঐক্যসাধনের পক্ষে সর্বাপেক্ষা বাধা দিবে বাংলা ভাষা। অতএব বাংলা সাহিত্যের উন্নতি ভারতবর্ষের পক্ষে মঙ্গলকর নহে।’”
“কালান্তর” সংকলনে লিখলেন – “আমার অধিকাংশ প্রজাই মুসলমান। কোর্বানি নিয়ে দেশে যখন একটা উত্তেজনা প্রবল তখন হিন্দু প্রজারা আমাদের এলাকায় সেটা সম্পূর্ণ রহিত করবার জন্য আমার কাছে নালিশ করেছিল। সে নালিশ আমি সংগত বলে মনে করি নি, কিন্তু মুসলমান প্রজাদের ডেকে যখন বলে দিলুম কাজটা যেন এমনভাবে সম্পন্ন করা হয় যাতে হিন্দুদের মনে অকারণে আঘাত না লাগে তারা তখনই তা মেনে নিল। আমাদের সেখানে এপর্যন্ত কোনো উপদ্রব ঘটে নি। আমার বিশ্বাস তার প্রধান কারণ, আমার সঙ্গে আমার মুসলমান প্রজার সম্বন্ধ সহজ ও বাধাহীন।”

অন্যত্র আরও তীব্র ভাষায় বলেছেন – “মানুষকে ঘৃণা করা যে দেশে ধর্মের নিয়ম, প্রতিবেশীর হাতে জল খাইলে যাহাদের পরকাল নষ্ট হয়, পরকে অপমান করিয়া যাহাদিগকে জাতিরক্ষা করিতে হইবে, পরের হাতে চিরদিন অপমানিত না হইয়া তাহাদের গতি নাই। তাহারা যাহাদিগকে ম্লেচ্ছ বলিয়া অবজ্ঞা করিতেছে সেই ম্লেচ্ছের অবজ্ঞা তাহাদিগকে সহ্য করিতে হইবেই।

মানুষকে মানুষ বলিয়া গণ্য করা যাহাদের অভ্যাস নহে, পরস্পরের অধিকার যাহারা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে সীমাবদ্ধ করিয়া রাখিবার কাজেই ব্যাপৃত– যাহারা সামান্য স্খলনেই আপনার লোককে ত্যাগ করিতেই জানে, পরকে গ্রহণ করিতে জানে না– সাধারণ মানুষের প্রতি সামান্য শিষ্টতার নমস্কারেও যাহাদের বাধা আছে– মানুষের সংসর্গ নানা আকারে বাঁচাইয়া চলিতে যাহাদিগকে সর্বদাই সতর্ক হইয়া থাকিতে হয়– মনুষ্যত্ব হিসাবে তাহাদিগকে দুর্বল হইতেই হইবে। যাহারা নিজেকেই নিজে খণ্ডিত করিয়া রাখিয়াছে, ঐক্যনীতি অপেক্ষা ভেদবুদ্ধি যাহাদের বেশি, দৈন্য অপমান ও অধীনতার হাত হইতে তাহারা কোনোদিন নিষ্কৃতি পাইবে না।”

প্রাক-উপনিবেশিক এবং উপনিবেশিক যুগে সাম্প্রদায়িকতার সংক্ষিপ্ত চেহারা

এ বিষয় নিয়ে যোগ্য ব্যক্তি এবং ঐতিহাসিকেরা বিবিধ ও সুপ্রচুর বিশ্লেষণ করেছেন। আমি সামান্য কিছু যোগ করার অধিকারী হয়তো। সি এ বেইলি তাঁর “The Pre-history of ‘Communalism’? Religious Conflict in India, 1700-1860” (Modern Asian Studies, 19.2, 1995, pp. 177-203) প্রবন্ধে দেখাচ্ছেন প্রাক-উপনিবেশিক সময়ে ও সমাজে ধর্মীয় সংঘাত থাকলেও খুব কম ক্ষেত্রেই তা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের চেহারা নিয়েছে। অর্থাৎ, ধর্মীয় দূরত্ব মানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এরকম কোন সরল সমীকরণ করার যাথার্থ্য নেই। তাঁর অভিমত হচ্ছে – “If religious revitalization did not necessarily give rise to religious or communal conflict, it is also the case that the widespread Hindu-Muslim symbiosis of the pre-colonial and early colonial periods did not totally exclude the possibility of riot and disturbance along communal lines.” যুদ্ধজীবী (warbands) রাজপুত শ্রেষ্ঠদের হারেমে মুসলমান রমণীদের রাখা হত। এবং এই প্রথা উলমাদের অসীম বিরক্তির কারণ ছিল। বেইলি মন্তব্য করছেন – “Indeed, the emergence of sharper boundaries between Hindu and Muslim religious practice in the period after 1820 must to some extent be attributed to the decline of this mobile and eclectic warrior culture.” তিনি দেখিয়েছেন হিন্দুরা যেমন অনেক মসজিদ রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছে বহুক্ষেত্রে, তেমনি মুসলমানেরাও সুলতানেরা বহু মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। এমনকি শিখেরা গুরুদ্বারের মধ্যে মসজিদও বানিয়েছে।
বেইলি প্রশ্ন করছেন জমি নিয়ে যুদ্ধ কিভাবে ‘সাম্প্রদায়িক’ হয়ে উঠলো? অনেক কারণের মধ্যে সম্ভাব্য একটি কারণ, বেইলির মতে, “Communal violence was not incompatible with eclectic religious practice as the orthodox nationalist view of communalism has so often contended.” অস্যার্থ, গোঁড়া জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গী সাম্প্রদায়িকতার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাঁর সিদ্ধান্তের অংশে বেইলি, আমার ধারণায়, দুটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রেখেছেন – (১) “What seems difficult to show is that there was any unilinear or cumulative growth of communal identity before i86o. Indeed, one may very well doubt whether there was ever an identifiable ‘Muslim’, ‘Hindu’ or ‘Sikh’ identity which could be abstracted from the particular circumstances of individual events or specific societies”, এবং (২) “Conflicts between Hindu and Sikh peasantry and Muslim gentry, or between Muslim peasantry and Hindu gentry did not inevitably lead to polarization on communal lines. Preconditions are not the same as causes.”

হিন্দুমুসলমান সম্পর্কের প্রসঙ্গে ইংরেজ শাসনের একেবারে গোড়ার দিকে যারা বিভিন্নভাবে লিখেছেন তাদের একজন উইলিয়াম ওয়ার্ড। তাঁর লেখা পুস্তক (শ্রীরামপুর থেকে ১৮১৮ সালে ২য় সংস্করণ ২ খণ্ডে প্রকাশিত হয়) হল A View of the History, Literautre, and Mythology, of The Hindoos: Including a minute Description of their Manners and Customs, and Translations from their Principal Works। ওয়ার্ড বলছেন কলকাতার কুখ্যাত এবং লম্পট চরিত্রসম্পন্ন বাড়ির সংখ্যা অবিশ্বাস্য। এর একটি বিবরণ দিচ্ছেন তিনি – “Some years ago, one of the Hindoo rajas, of the kshútriyŭ (ক্ষত্রিয়) cast, retained an English concubine ; and afterwards had a family by a Musulman woman, whose sons were invested with the poita (পৈতা); and were all married to Hindoos. This woman had a separate house, where the raja visited her; she worshipped idols, had a bramhăn for her spiritual guide, and another for her priest; and all the Hindoos around partook of the food which had been cooked in the houses of this woman and her children, so that thousands of persons, according to the strict laws of the shastri, forfeited their casts.”

ওয়ার্ড জানাচ্ছেন যে কলকাতা, ঢাকা, পাটনা, মুর্শিদাবাদের মতো বড়ো শহরগুলোতে অনেক ধনী হিন্দু মুসলিম উপপত্নীর সাথে সহবাস করে এবং “amongst the lower orders, this intermixture of the casts for iniquitous purposes is still more general.” (১ম খন্ড, পৃঃ ২১০) অর্থাৎ, নীচুতলার মানুষের মধ্যে ধর্মীয় এবং সম্প্রদায়গত আদানপ্রদান ও মেলামেশা স্বাভাবিক বিষয় ছিল। ফলে সাম্প্রদায়িকতা এবং এর ফলে উদ্ভুত দাঙ্গা বিবেচ্য বিষয় ছিল বলে মনে হয়না। প্রসঙ্গত স্মরণে রাখবো, ওয়ার্ড পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে কিংবা নৌকোতে করে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে, গ্রামের অভ্যন্তরে মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে মিশেছেন। ফলে ঊনিশ শতকের শুরুতে তাঁর এই অভিজ্ঞতা ফেলে দেবার মতো নয়, বরঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ।

পার্থ চট্টোপাধ্যায় তাঁর “ইতিহাসের উত্তরাধিকার” (নিম্নবর্গের ইতিহাস, সম্পাঃ গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আনন্দ, ১৯৯৮, পৃঃ ১২১-১৬০) প্রবন্ধে বলছেন – “সেকুলার ইতিহাস চর্চার সংকট এইকাহ্নেই – আজকের রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে জাতীয়তার ইতিহাসের সামঞ্জস্য আনা। সংকট এইজন্য যে জাতীয়তার যে ইতিহাস গত শতাব্দী থেকে লেখা হয়ে এসেছে, তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে রয়েছে এমন সব কাহিনী, ধারণা, ব্যাখ্যা যা আজকের উগ্রহিন্দু প্রচারের প্রধান উপাদান।” ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারের রাজাবলী (১৮০৮) দিয়ে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের আলোচনা শুরু। রাজাবলী কার্যত পৌরাণিক উপাদান সমৃদ্ধ হিন্দু বিবরণ বললেও অত্যুক্তি করা হয়না। এই বইটি নিয়ে উইলিয়াম ওয়ার্ড তাঁর পূর্বোক্ত গ্রন্থে বলছেন – “The work compiled by Mrityoonjŭyů , a bramhŭn , and published in the year 1808, and from which the above history, beginning from the kúlee yoogi, has been principally drawn, describes the effects of the Músůlman power, when it became predominant, on the different Hindoo kingdoms in Hindoost’hanŭ; most of which were subdued by it.” (পৃঃ ২৬) ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত এবং আলোকপ্রাপ্ত ওয়ার্ডেরও নজরে এসেছে রাজাবলী-র ইতিহাসের ঢং-এ পৌরাণিক চরিত্র এবং প্রধানত হিন্দু-মুসলমান সংঘাতের কাহিনী বলা। পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলছেন – “বঙ্কিমের যুগে এসে পৌরাণিক আর ঐতিহাসিক কালের মধ্যে যে তফাৎ করা হবে, পৌরাণিক বিবরণের থেকে ইতিহাসের মালমসলা বের করার পদ্ধতি নিয়ে যে আলোচনা হবে, মৃত্যুঞ্জয়ের চিন্তায় তা আভাসটুকুও নেই।” মৃত্যুঞ্জয়ের মতো যারা ইতিহাস রচনা করেছেন তারা একটি কাজই মনোযোগ দিয়ে করেছেন – হিন্দু গরিমায় উজ্জ্বল একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি গড়ে নেওয়া। আবার বিপরীতদিকে, মুসলমান রচয়িতা যারা তাদের কাছে মক্কা এবং মহম্মদের গরিমা কীর্তন প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এরকম যে ইতিহাস লেখার একটি জাতীয়তাবাদী তথা হিন্দু ইতিহাস লেখার উদ্যোগ শুরু হল সেখানে, পার্থ প্রশ্ন করছেন, “তাহলে হিন্দু নয় অথচ ভারতের অধিবাসী, এমন জনগোষ্ঠীর স্থান কোথায়?” তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা জনপ্রিয় ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৮৫৮ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে ১৮টি সংস্করণ হয়েছিল) আলোচনা করতে গিয়ে বলছেন – “রাষ্ট্র সার্বভৌমত্বের আধুনিক চিহ্ন রামচন্দ্রের হাতে পত্পত্ করে উড়ছে, এ-ছবি একশো বছর আগের ইংরেজি-শিক্ষিত বাঙালি ব্রাহ্মণের কল্পনায় সহজেই এসে গিয়েছিল।” জাতীয়তাবাদীর কাছে প্রাচীন ভারত হয়ে উঠল তার ক্লাসিকাল আদর্শ। বেইলি তাঁর লেখায় যে ইঙ্গিত করেছিলেন জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোন অসঙ্গতি নেই, বরঞ্চ সাযুজ্যপূর্ণ সেকথাই অন্যভাবে পার্থর বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পাচ্ছি। ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই জাতীয়তাবাদী চেতনায় ইতিহাস রচনার সাথেই সংপৃক্ত হয়ে আছে সাম্প্রদায়িক বোধের বিকাশ।
পার্থ তাঁর পর্যবেক্ষণে জানাচ্ছেন – “বস্তুত জাতীয়তার অর্থ হিন্দু জাতীয়তা, এই ধারণাটিকে কোনও পড়াক-আঢূণীক ঢোড়ড়মিয় মতাদর্শের বলে ভাবলে মারাত্মক ভুল করা হবে। ধারণাটি সম্পূর্ণ আধুনিক। আধুনিক অর্থেই তা যুক্তিবাদী; অযৌক্তিক আচার-ব্যবহার কুসংস্কার বিরোধী। আধুনিক অর্থেই তা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক; রাষ্ট্রের অখণ্ডতা এবং সার্বভোউমত্বের ব্যাপারে কট্টরপন্থী এবং সমাজনীতি নির্ণয় ও সংস্কারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে বিশ্বাসী।” (পৃঃ ১৫৩)

এখানেই রবীন্দ্রনাথের ইতিহাসবোধ, নেশন তথা রাষ্ট্রিক চেতনা এবং সমাজে মুক্ত মানুষের ভূমিকার প্রসঙ্গে এই ইতিহাসের নির্মাণের সাথে অনপেনয় দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথকে ফেলাও যায়না, গেলাও যায়না, আবার রাখাও যায়না। ফলে রবীন্দ্রনাথকে নিজেদের মতো করে আত্মীকরণের জন্য টুকরো টুকরো অংশে ভেঙ্গে যেমন যেমন দরকার ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ে।
কিন্তু জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনার মাঝে কখনোসখনো কিছু ফাঁক-ফোকরও চোখে পড়ে। ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্ত শিক্ষিতেরা মাঝেমধ্যে আতান্তরেও পড়েছেন। এরকম একজন ভূদেব মুখোপাধ্যায়। ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর স্বপ্নলন্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস। নামেই অনুমান করা যায় যেহেতু স্বপ্নলব্ধ এজন্য বহু কথাই হয়তোবা স্বপ্নের ঘোরে বলা, সঠিক অর্থে ঐতিহাসিক যুক্তির বাঁধনে রচিত নয়। তাঁর লেখায় ভূদেব জানাচ্ছেন যে সাহেবুদ্দিন মহম্মদ ঘোরি ভারতবর্ষ আক্রমণ করতে এসে পৃথ্বীরাজ রাওয়ের হাতে বন্দী হয়েছিলেন। সে প্রসঙ্গে বলছেন – “কিন্তু ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া যদিও বরাবর অনিষ্ট ঘটিয়াছে, তথাপি হিন্দুদিগের জাতীয় প্রকৃতির অন্যথাচরণ হইতে পারে না। … আপনি নিজ দলবল সহিত নির্বিঘ্নে স্বদেশে গমন করুন।” (পৃঃ ৩) এটুকু অংশের স্বতঃপ্রকাশিত যে হিন্দুদের মানবিক এবং নৈতিক অবস্থান মুসলমানদের ওপরে। এরপরে মনে হয় ভূদেব একটু আতান্তরে পড়েছেন। লিখছেন (দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিলাম) – “একজন ব্রাহ্মণ একজন মুসলমানকে বলিতেছেন “যে রাম সেই রহীম, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়”। মুসলমান বলিতেছেন “ঠাকুর যথার্থ কহিয়াছেন, সমস্ত জগৎ সেই এক অদ্বিতীয় ঈশ্বরেরই বিভূতি মাত্র, মানুষ ভেদে যেমন আচারভেদ-পরিচ্ছদভেদ-ভাষাভেদ – তেমনি উপাসনার প্রণালীভেদও হইয়া থাকে। সকলেই এক পিতার পুত্র। … কোন্ মুসলমান হিন্দু দেবতার এবং ব্রাহমণ ঠাকুরের যথোচিত সম্মাননা না করে? আমার জানত অনেক মুসলমান ব্রাহ্মণদিগকে খরচপত্র দিয়া দুর্গোৎসব করান। … নগরময় এইরূপ কথোপকথন, কোথাও হাস্য পরিহাস, কোথাও গান বাজনা, কোথাও প্রীতিভোজের সমারোহ।” (পৃঃ ১০-১১)

একই ব্যক্তির একই লেখায় মুসলমানদের নিয়ে দুধরনের বয়ান দেখতে পাচ্ছি। কোনটাকে গ্রহণ করবে পাঠক? কিংবা দুটোকেই গ্রহণ করবে? একটি যুক্তি তো রয়েছে যে এটা স্বপ্নলব্ধ ইতিহাস। ফলে স্বাভাবিক ব্যাখ্যার অতীত অনেককিছুই ঘটতে পারে। আরেকটি সম্ভাবনা হল অন্তর্গত সাম্প্রদায়িক বোধকে নিয়ে যে জাতীয়তাবাদী ভাষ্য এবং ইতিহাস নির্মিত হচ্ছিল সেটা সবসময়ে একমাত্রিক ছিলনা। কিছু ভিন্ন স্বরের অস্তিত্ব ছিল হয়তো। যদিও আমাদের বর্তমান আলোচনার চৌহদ্দির বাইরে সে প্রসঙ্গ।
ইতিহাস রচনার তাত্ত্বিক এবং বৌদ্ধিক পরিসরের বাইরে ছিল ব্যবহারিক দিক – উপনিবেশ সুপ্রতিষ্ঠিত হবার পরে। কলকাতা থেকে ঊনিশ শতকের শুরুর দিক থেকে ফার্সিতে সংবাদপত্র প্রকাশিত হত। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং নরমপন্থী সংবাদপত্র ছিল জাম-ই-জাহান-নুমা। ১৮৪৫ পর্যন্ত এই সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। (এ এফ সালাহউদ্দিন আহমেদ, সোশ্যাল আইডিয়াজ অ্যান্ড সোশ্যাল চেঞ্জ ইন বেঙ্গল – ১৮১৮-১৮৩৫, প্যাপিরাস, ২০০৩, পৃঃ ১২৭) কোর্টের ভাষা ছিল ফার্সি। পরিণতিতে, ইংরেজিতে শিক্ষিত হিন্দুদের ফার্সি আয়ত্ব করা আবশ্যিক ছিল। হিন্দুদের ক্ষেত্রে এটা অসন্তোষ এবং বিরোধিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। মে, ১৮২৮-এ ইংরেজ সরকার পয়সা বাঁচানোর জন্য ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোর subscription বন্ধ করে দেয়। (প্রাগুক্ত, পৃঃ ১৩২) ফেব্রুয়ারি, ১৮৩৫-এ হিন্দু কলেজের পরিচালকবৃন্দ সহ কলকাতার ৬,৯৪৫ জন অধিবাসী (এর মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষিত ছাত্র এবং তাদের অভিভাবকেরাও ছিল) উইলিয়াম বেন্টিঙ্ককে স্মারকলিপি দেয় যেখানে বলা হয় কোর্টে ইংরেজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে নিষেধাজ্ঞা আছে তুলে নেওয়া হোক। স্মারকলিপি প্রদানকারীরা উল্লেখ করে যে ফার্সি “as foreign to the natives of Bengal as to their rulers”। এসবের ফলশ্রুতিতে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি জুডিশিয়াল ডেসপ্যাচে (২৬ জুন, ১৮৩৫) ফার্সিকে ভাষার ব্যবহারিক মাধ্যম হিসেবে বিলোপ করা হয়। (প্রাগুক্ত, পৃঃ ২০৪)
এর বিপরীত একটি ঘটনাও ঘটেছিল। সে বছরেই (১৮৩৫) ফার্সিতে ৮,৩১২ জন মুসলিম অধিবাসীর স্বাক্ষরিত একটি স্মারকলিপি সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয় – “Petition on behalf of the Muslims of Calcutta against the Proposed Abolition of Madrasa”। (প্রাগুক্ত, পৃঃ ২৬৪-২৬৭) কিন্তু সংখ্যাধিক্য থাকা সত্বেও ফলপ্রসূ হলনা। একদিকে ভাষা হিসেবে ফার্সি নির্বাসিত হল, অন্যদিকে শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ইংরেজের তৈরি মাদ্রাসা ইংরেজদেরই সিদ্ধান্তে বন্ধ হয়ে গেল। মুসলিম সমাজের গণমানসিকতায় এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়লো। শুধু মাদ্রাসাই নয় ১৮৩৫-এ ভারতের প্রথম মেডিক্যাল স্কুল নেটিভ মেডিক্যাল ইন্সটিটিউশনও বন্ধ হয়ে গেল। সংস্কৃত কলেজ বা হিন্দু কলেজ বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষিত হিন্দুদের ওপরে যেরকম প্রভাব পড়ত, এ প্রভাবও সেরকম। আমাদের ধারণা মুসলিম মানসিকতায় “অপর” নির্মিত হতে শুরু করল – একদিকে হিন্দু, অন্যদিকে ইংরেজ।

এখানে NMI বা নেটিভ মেডিক্যাল ইন্সটিটিউশন কিছুটা আলাদা আলোচনার দাবী রাখে। ১৮২২-এ তৈরি হওয়া এই আধুনিক মেডিক্যাল শিক্ষার জন্য তৈরি ভারতের প্রথম মেডিক্যাল স্কুল। ডাক্তারদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে তৈরি করার জন্য এখানে ৩ বছর পড়ানো হত। এবং সেসময়ে উর্দু হয়েছিল পশ্চিমী পদ্ধতিতে ডাক্তারি শিক্ষার ভাষাগত মাধ্যম। (সীমা আলাভি, ইসলাম অ্যান্ড হীলিং – লস অ্যান্ড রিকভারি অফ অ্যান ইন্ডো-মুসলিম মেডিক্যাল ট্র্যাডিশন, ১৬০০-১৯০০, পৃঃ ৭০)। এমনকি এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান জন টাইটলার রবার্ট হুপারের The Anatomist’s Vade-Mecun আরবীতে অনুবাদও করেছিলেন ১৮৩০ সালে।

১৮৩৫-এ এ প্রতিষ্ঠানটি ভেঙ্গে দিয়ে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ তৈরি হল। সেদিন এখানকার সমস্ত ছাত্রকে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করে দেওয়া হল। “নেটিভ” শিক্ষক শেখ ওয়ারিস আলি এবং হীরা লালের তত্ত্বাবধানে নিজেদের খরচে নৌকা ভাড়া করে এরা ফিরে গেল দিল্লি, এলাহাবাদ, লক্ষনৌ-এর মতো জায়গাগুলোতে – নিজেদের ভিটেতে। আলাভি বলছেন – “As the students of the NMI and its staffers dispersed into the qasbas and towns of the North Indian countryside, so did their new ideas and texts. These now became diffused in local society”। (প্রাগুক্ত, পৃঃ ৯৮) এরা এবং এদের বংশধরেরা সিপাহী বিদ্রোহের সময় লক্ষ্যণীয় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে। সেসময় বাংলার হিন্দু বাবুরা প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে সিপাহীদের দমনে প্রত্যক্ষ মদত জুগিয়েছে।

আবার রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ ও হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধের সংকলন কালান্তর প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৭-এ বিশ্বভারতী থেকে। এই সময়কাল জুড়ে একাধিক ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়ে গিয়েছে। এ সংকলনের “স্বামী শ্রদ্ধানন্দ” শীর্ষক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলছেন – “আজকে দেখতে হবে, আমাদের হিন্দুসমাজের কোথায় কোন্ ছিদ্র, কোন্ পাপ আছে; অতি নির্মমভাবে তাকে আক্রমণ করা চাই। … আমাদের পক্ষে এ বড়ো সহজ কথা নয়। কেননা, অন্তরের মধ্যে বহু কালের অভ্যস্ত ভেদবুদ্ধি, বাইরেও বহু দিনের গড়া অতি কঠিন ভেদের প্রাচীর। …. আমাদের মধ্যে কত ছোটো ছোটো সম্প্রদায়, কত গণ্ডী, কত প্রাদেশিকতা – উত্তীর্ণ হয়ে কে আসবে?” (পৃঃ ৩২৪-২৫)
এ সত্যকে কি আমরা স্বীকার করতে পারব? কিংবা প্রত্যেকের নিজের আত্মচিহ্ন মুছে ফেলে একটি সমস্তত্ব রাষ্ট্রিক সংস্কৃতির মাঝে বিলীন হয়ে যাব? রবীন্দ্রনাথ আমাদের বড়ো শক্ত প্রশ্নের ন্সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (20)
  • comment-avatar
    শ্যামল ঘোষ 3 months

    খুব ভালো লাগল। তবে তাঁর স্বপ্ন কি আর সফল হবে ? বিভেদ তো বেড়েই চলেছে।

  • comment-avatar

    লেখাটি সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য | তবে কয়েকটা কথা বলার আছে। হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা মুসলমান এবং ব্রিটিশ কলোনিয়াল যুগের আগেও ছিল | আজকে মানুষের মধ্যে সমস্ত কিছু নিয়ে প্রশ্ন করার মানসিকতা জাগানোর প্রয়োজন আছে (হয়ত ফালতু জ্ঞান বলে কথাটা মনে হতে পারে কারো কারো, তবুও আমি বলব, 🙂 ) |
    জয়ন্তবাবুর লেখার উত্তরে আমার বক্তব্য বিশদে নীচের লিঙকে পড়তে পারবেন,

    http://bit.ly/jayanta_response

    • comment-avatar
      Jayanta Bhattacharya 3 months

      ভারী গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন অরিন বসু। ইংরেজিতে বললে এটা একটি unequal overdetermination-এর অঞ্চল, অসম খেলা। রাষ্ট্র “নির্মাণ” করে গণমানসিকতা, আবার “নির্মিত” কিংবা অ-নির্মিত জনসমাজ তৈরি করে নীতি নির্ধারক নেতাদের। কিন্তু ক্ষমতার ভরকেন্দ্র রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে তার জোর অনেক বেশি। ভারতীয় গণতন্ত্র তো একদিক থেকে কেবল নাম্বার গেম। এরজন্য অনুদান, উপঢৌকন, মৌহূর্তিক তোষণ ইত্যাদি সবকিছুই ক্ষমতার কৈশিক নালী বেয়ে একেবারে শেষ মানুষটি অব্দি পৌঁছে যেতে পারে।

      এর মোকাবিলা করা inchoate জনসমাজের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু নিরন্তর সামাজিক সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।

  • comment-avatar
    Soumya Chakraborty 3 months

    Khubi sunder lekha sir

  • comment-avatar
    Parthajit Chanda 3 months

    খুব গুরুত্বপূর্ণএকটি লেখা। খণ্ডসত্যের ঘাতক ক্ষমতা আমাদের সামনে আসছে।

  • comment-avatar
    Shyamashri Ray Karmakar 3 months

    খুব প্রয়োজনীয় একটি লেখা

  • comment-avatar
    শ্যামল ঘোষ 3 months

    খুব ভালো লাগল। তবে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তো চোখে পড়ছে না। আমরা বিভেদের রাজনীতির মধ্যেই বেশি করে জড়িয়ে পড়ছি।

  • comment-avatar
    Keya Chatterjee 3 months

    Very interesting!!

  • comment-avatar
    সুকুমার ভট্টাচার্য্য 3 months

    ভাল লাগল লেখা।
    বরেণ্য মানুষদের লেখার খন্ডিত প্রকাশ শুধু জল্লাদের নীচতার সমর্থন জোগাড় করে না, বরেণ্য মানুষটিকে মূর্খদের মধ্যে ছোট করার প্রয়াস রাখে।
    নিজের অসার বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য মহামানবদের হীন করার এই প্রচেষ্টা ক্রমবর্দ্ধমান। জানি না এর শেষ কবে? তবে সামাজিক ক্ষতি তো বাড়ছেই। 
    সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর ক্রমাগত আক্রমণ তো চলছেই।
    ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্যের বা একই যুক্তিসম্মত লেখা আরও বেশী লোক পড়ুন।
    আমাদের চোখ খুলুক।

  • comment-avatar
    GOUTAM KUMAR DUTTA 3 months

    Khub valo

  • comment-avatar
    মণীশ দাস 3 months

    গুরুত্বপূর্ণ এবং খুব প্রাসঙ্গিক লেখা।

  • comment-avatar
    Dipankar Sarkar 3 months

    তথ্যসমৃদ্ধ সময়োপযোগী লেখা। গণঅন্ধতা হাত থেকে রক্ষা করবার জন্য এ ধরনের লেখা বারবার প্রকাশ করা উচিত।
    সাধারণ মানুষের ও এগিয়ে এসে এ ধরনের সত্য ধারণা জনে জনে বলা দরকার। বেশি তথ্য সাধারণত মানুষ ও সাধারণ মানুষের ধৈয্য গ্রাহ্য হয় না তাই সম্ভব হলে একটা দুটো বা বড়জোর তিনটে তথ্য কে ফোকাস করে ভেঙে ভেঙে বেশি সংখ্যক লেখা জনসাধারণের কাছে বেশি acceptable হবে মনে হয়।

  • comment-avatar
    Bhaskar Das 3 months

    সাধারণ মানুষের একটা সাধারণ dialogue নির্মাণ, রাষ্ট্রশক্তির কাজের মধ্যে পড়ে, যদি তার উদ্দেশ্য হয় মানুষকে নষ্ট করে প্রশ্নহীন অনুগত বাহিনীর নির্মান করা। তার বিস্তারিত যে বিবরণ লেখক তুলে ধরেছেন, আমাদের কাজ তাকে যত বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

    • comment-avatar
      Jayanta Bhattacharya 3 months

      ধন্যবাদ, ভাস্কর!

  • comment-avatar
    স্বপন নাথ 3 months

    আচরণ সর্বস্ব ধর্ম ভেদের প্রায্ চোদ্দ শো বছরের অনৈক্যকে বোধহয্ আর এক্যমঞ্চে আনা গেল না। সরকার মুখে বলছে জাতধর্ম তুলে কথা বলবে না অথচ সেই সরকার পক্ষই স্কুল কলেজ কিংবা দপ্তরীখানায্ লিস্ট চাযছে সংখ্যালঘু এসটি এসটি কত? সেই সঙ্গে শুধু হিন্দুসাম্প্রদাযিকতা নয্ মুসলিমসাম্প্রদিযিকতারও আলোচনা দরকার এবং মীরমোশারফ হোসেন , আব্দুল ওদুদ,রেজাউলকরিম সাহেবদের বহুপঠন আবশ্যক।

    • comment-avatar
      Jayanta Bhattacharya 3 months

      সাম্প্রদায়িকতা একপাক্ষিক নয়। তবে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা বেশি শশক্তিশালী। এজন্য চিন্তার।

  • comment-avatar
    Jayanta Bhattacharya 3 months

    রবীন্দ্রনাথ ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লেখা আমার এই লেখাটি পড়ে ঐতিহাসিক দীপেশ চক্রবর্তী আমাকে ব্যক্তিগতভাবে এই মেলটি করেছেন।

    প্রীতিভাজনেষু,
    আপনার লেখাটি পড়ে ভাল লাগল। রবীন্দ্রনাথ যে কোন সহজ সমাধান দেন না, বরং
    আমাদের নানান কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অনেক অস্বস্তিতে ফেলেন – এই কথাটা
    আপনার সুচিন্তিত ও পরিশ্রমী প্রবন্ধে বেশ স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে।
    প্রীতি-নমস্কার গ্রহণ করবেন।
    দীপেশ চক্রবর্তী

  • comment-avatar
    সুদেব সাহা 3 months

    সময়োপযোগী
    অনবদ্য বিশ্লেষণ । শুধু রবীন্দ্রনাথ নয় ‘অপর ‘নির্মাণের জন্য ওরা সমগ্র ইতিহাসচেতনা পুনর্গঠন করছে । স্বীকৃতি আদায়ের জন্য ভ্রান্ত -চেতনা প্রসব করছে । এছাড়া সংখ্যার গণতন্ত্র সুনিশ্চিত করার জন্য কল্পকাহিনী প্রচারের দায়িত্ব কাঞ্চনমূল্যে কাঁধে তুলে নেয় বড় বড় প্রচারমাধ্যম । জনগণেশের জন্য বরাদ্দ উপঢৌকন সংখ্যাগুরুর সংখ্যা বৃদ্ধি করে ।

  • comment-avatar
    দ্বিজেন্দ্র ভৌমিক 1 month

    খুব ভালো লেখা। রবীন্দ্রনাথ পড়া থাকলেও বাকি তথ্য জানা ছিল না। প্রসঙ্গত বলি, রামমোহন ভারতবাসীর ভারতীয় হয়ে উঠতে গেলে যে হিন্দু ও মুসলমান উভয়ের অবদান জরুরি সেকথা বার বার বলেছেন। ধন্যবাদ আপনাকে লেখাটি পড়ানোর জন্য।