শাসনে যতই ঘেরো, আছে বল দুর্বলেরও…
সরোজ দরবার

Can the rulers who have chained revolutionaries and arranged armed escorts for them move freely in the midst of the people who elected them? Can they survive outside their protected cages?
তীক্ষ্ণ তিরের মতো এ-প্রশ্ন বিঁধে গেলে, সভ্যতার বুকে যে রক্তক্ষরণ, আমরা জানি, তার নেপথ্যে থেকে যান একজন তীব্র ক্ষমতাধর মানুষ। শাসনের সংজ্ঞা সে-ক্ষমতা মেপে উঠতে পারে না বলেই, তাঁকে খোপে বন্দি করে। মানুষের থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে ভাবে, মানবের সঙ্গে সংযোগ বুঝি ছিঁড়ে ফেলা গেল। কিন্তু ওয়রওয়ারা রাও, জেলবন্দি হয়েও যিনি এ-প্রশ্ন তুলতে পারেন, চারিয়ে দিতে পারেন অসংখ্য মানুষের মননে, তিনি সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি বন্দিত্বকেও অস্বীকার করতে পারেন তাঁর কল্পনাশক্তির স্বাধীনতায়, নিঃসঙ্গতাকে পেরিয়ে যেতে পারেন স্বীয় আদর্শের প্রতি আনুগত্যে; এবং, শেষমেশ হয়ে উঠতে পারেন এমন মানুষ, যাঁকে অশ্রু-বিষাদে বা ভয়ে-বিস্ময়ে এমনকি মিছিলে-স্লোগানেও অ্যাকোমোডেট করা যায় না। বিপ্লবের সকল অভিপ্রায় কাব্য আর স্বাধীনতার ফুল হাতে তাঁরই জন্য অপেক্ষা করে আজীবন। তা, এমন মানুষকে নিয়ে আমাদের মহামহিম রাষ্ট্র কী করবে ভেবে পায় না। সে তাই যখন পারে, তখনই তাঁকে বন্দি করে জেলখানায় পুরে দেয়। কারণ শাসকের অভয়ারণ্যে হেন কোনাটুকু নেই, যেখানে বিপদের সমস্ত সম্ভবানহীন করে এঁকে রাখা যেতে পারে।
আপাত হাস্যকর যে, একজন বৃদ্ধ মানুষকে জেলবন্দি করে না-রাখলে রাষ্ট্রের ঘুম হচ্ছে না কিছুতেই। শক্তিতে তো তার টান কিছু পড়েনি। আইনের শাসন নামক যে আয়ুধখানা তার দখলে, তাতে ভয়েরই বা কী থাকতে পারে! যে আইনের শাসনের থাকলে জনগণের স্বস্তি, সেই শাসন থাকলে রাষ্ট্রেরও শান্তি। কারণ কে না জানে, আপাতত গণতন্ত্রের এই পরিবেশে ‘মেজরিটি’র সমর্থনেই আইন পাশ হয়। সেই ‘মেজরিটি’ আবার শাসকের অঙ্গুলীহেলনে চলে। তাহলে, কীসেরই বা ভয়, কেনই-বা এত জোরাজুরি! ওয়রওয়ারা রাও-কে যে আজ বন্দি করা হয়েছে এমন তো নয়। সময়ে সময়ে, সেই ১৯৭৩ সাল থেকে তাঁর বন্দিদশা চলছে। অথচ রাষ্ট্রীয় মৌচাকের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে কত কেচ্ছা-কেলেংকারির মালিকরা, কতশত লুটেরা, বাহুবলী- তাদের দেখে রাষ্ট্র ভয় পায় না। উলটে, বাঘ যতই হিংস্র বলশালী হোক, মানুষ যেমন তাকে বশ্যতা স্বীকার করিয়েছে, তেমনই এইসব শক্তিশালীদেরও রাষ্ট্র তার নিজে নিয়মে পোষ মানিয়েছে। সেই নিয়মের ভিতরই এদের ওঠা-বসা, আস্ফালন, পেশিশক্তির প্রদর্শনী। এর বেচাল হওয়ার জো নেই। কারণ, এই প্রাইভেট সার্কাসে রাষ্ট্রের হাতে আছে সেই কাঙ্ক্ষিত চাবুক ‘আইনের শাসন’।
এহেন অমিত পরাক্রমী ব্যবস্থা, যে কিনা গণতন্ত্রের আলোয়ানটা সর্বদা গায়ে টেনে রাখে, সে-ও ভয় পায় ওয়রওয়ারা রাও-কে। যখন বলা হয়, ‘কবির মুক্তি চাই’ কিংবা ‘রাজনৈতিক বন্দি ওয়রওয়ারা রাওয়ের মুক্তি চাই’, তখন আমাদের সদিচ্ছাও খানিকটা স্ববিরোধিতায় পড়ে। এমন নয় যে, কবি বলেই কেবল তাঁর মুক্তি চাওয়া যায় কিংবা তিনি রাজনৈতিক বন্দি বলেই। এক্ষেত্রে কেউ কেউ যুক্তি দেন, রাজনৈতিক কারণে অনেকেই বন্দি থাকেন। সকলেই কবি হন না। উলটে কেউ বলেন, শুধু কবি বলে তো নন, তাঁর রাজনীতির কারণেই তিনি তাই বন্দি। এই আলোচনার মীমাংসায় আমাদের এমন একটা জায়গায় পৌঁছাতে হয়, যা এর সম্মিলিত এক ধারণা। যেখানে কবি ও রাজনৈতিক কর্মী অভিন্ন সত্তা। ঠিক এখানেই বিপদ টের পায় রাষ্ট্র। একজন প্রায় অশক্ত মানুষের বন্দিত্ব, যা আপাত হাস্যকর মনে হয়, তাই-ই তার মাথাব্যথার যথেষ্ট কারণ হয়ে দাঁড়ায়। একজন ব্যক্তি হিসেবে ওয়রওয়ারা রাওয়ের থেকে তাঁর তো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একজন মাত্র ব্যক্তিকে সে বারবার বন্দি করছেও না। করছে, ওই ধারণাটিকে। যে-ধারণা বন্দি অবস্থাতেও প্রশ্ন তুলতে পারে, খোদ শাসকরাই কি খাঁচায় বন্দি নয়? যে জনতা তাদের নির্বাচিত করেছে, তাদের মধ্য দিয়েই কি প্রহরাহীন তারা হেঁটে যেতে পারে? এই প্রশ্ন আসলে এক চ্যালেঞ্জ, যা ঘুরিয়ে দেয় রাষ্ট্রীয় খেলের অভিমুখ। যা সরাসরি এই রাষ্ট্রীয় মুখপাত্রদের জানায় হাজার ক্ষমতায় বলীয়ান হলেও, তারা আসলে কেউ জননায়ক নয়। রাষ্ট্র ও তার ছিনাথ বহুরূপীদের মিথ্যে ঠিক এইখানেই ধরা পড়ে যায়।
আমাদের মনে পড়বে, এমারজেন্সি মিসা কয়েদি হিসেবে প্রেসিডেন্সি জেল থেকে তাঁর ‘স্বদেশবাসী ভ্রাতা ও ভগিনীগণ’কে উদ্দেশ্য করে যে চিঠি লিখেছিলেন গৌরকিশোর ঘোষ, সেখানে তিনি সাফ জানিয়েছিলেন, ‘যারা স্বৈরচারী, ফ্যাসিবাদী, তাদের মদমত্ততার ভিত্ত মিথ্যার উপরেই প্রতিষ্ঠিত হয়। … মিথ্যাকে অপসারিত করে সত্যের প্রকাশ ঘটাতে পারলেই স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা তাই তাসের প্রাসাদের মতো হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে। কেননা তার কোনও নৈতিক শক্তি নেই।’ নীতি-ধর্মের এই শক্তিহীনতায় রাষ্ট্র ভোগে বলেই গৌরকিশোর কিংবা ওয়রওয়ারাকে বন্দি করে রাখতে হয় তাকে। এমারজেন্সি ঘোষিতভাবে কি চোখে আঙুল বুলিয়ে চলুক, এর ব্যত্যয় হয় না। কেন-না এই যে ধারণা, একে বলা যেতে পারে রাষ্ট্রের পক্ষে ‘বিপজ্জনক’। কারণ, তা মুহূর্তে শাসকের, ক্ষমতায় যে আসীন তার সমস্ত মিথ্যেগুলোকে নিরাবরণ করার ক্ষমতা রাখে। এ-কথা আমরা কে না জানি, একমাত্র কল্পনাশক্তিকেই পৃথক হয়ে যায় একজন মানুষ। একটি মৌমাছি যত দক্ষ হাতেই তার ঘর গড়ে তুলুক না, তাতে নিপুণ কারিগরী দক্ষতা আছে, কল্পনা নেই। একটি জিনিস হয়ে-ওঠার আগে একমাত্র মানুষই তা কল্পনা করতে পারে। আর, আমাদের এ-ও জানা-কথা যে, একজন কবির অস্ত্র আর কিছুই নয়, এই কল্পনা। যে সত্যের কাছে পৌঁছানো আমরা কল্পনা করতে পারি না, আমাদের চোখ আটকে যায় পাথরে-দেওয়ালে, একজন কবি সেই সত্য কল্পনা করতে পারেন। স্বৈরাচার থেকে মুক্তির, সমাজবদলের, শোষণমুক্তির, সাম্যের কল্পনা করতে পারেন বলেই তিনি লেখেন। তাঁর রচনা হয়ে ওঠে তাঁর কল্পনার স্বর, যা তাঁর রাজনৈতিক বয়ানও। তাঁকে যত বন্দি করা হোক, তিনি তাই বলবেনই –
The secret is,
My poetry was born from the pangs of Struggle.
Cover it if you most-
You will see it escapes through
The spaces of your fingers,
Its vibrant, anguished notes
Snapping in anger,
Setting tears on fire
And flowing forth-
A river of blood-red syllables.
আইনের শাসন দিয়ে এর মোকাবিলা করা যায় না বলেই ওয়রওয়ারা রাওকে নিয়ে রাষ্ট্রের বিড়ম্বনা কেবল বাড়ে।

ফলত সে-ও একটু বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। জরুরি অবস্থায় যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, যেমন গৌরকিশোর ঘোষ, তাঁদের লেখার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আর্তি। ছেলেকে চিঠিতে লিখেছিলেন গৌরকিশোর, ‘গণতন্ত্রই মানুষের স্বাধীনতাকে জীইয়ে রাখে। কেননা গণতন্ত্রই একমাত্র ব্যবস্থা যেখানে মতবিরোধকে সসম্মানে স্বীকার করে নেওয়া হয়।’ হায় গণতন্ত্র! কে বলবে আজ তা নেই! আবার কে বলবে আজ তা আছে! এই হল রাষ্ট্রের শকুনি চাল। গণতন্ত্রের আপাত জলহাওয়ার ভিতরই সে তৈরি করে ফ্যালে তার স্বৈরাচারী অভয়ারণ্য। ওয়রওয়ারা তাই জেলে বন্দি থাকেন, অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি তাঁর মৃত্যুসম্ভবনা যথেষ্ট তা-ও এই গণতান্ত্রিক দেশের মানুষের অজানা নয়। কিন্তু সে গণতন্ত্রের দশা এমনই যে, তার ভিতর দাঁড়িয়ে ওয়রওয়ারার মুক্তি ছিনিয়ে আনা সম্ভবপর হয় না। এই অলিখিত জরুরি অবস্থা বিপজ্জনক। সেখানেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বৃদ্ধ অশক্ত ওয়রওয়ারা রাওয়ের ভূমিকা। তাঁর এই বন্দিদশা আমাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমাদের সাধের গণতন্ত্র কতখানি বিপজ্জনক জায়গায় আছে। এ-ও মনে করিয়ে দিচ্ছে, এই বিপদ কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে, যদি মুক্তির কল্পনা করা যায়। শাসনে যাদের ঘিরে রাখা হয়েছে, সেই দুর্বলেরও তো বল আছে। তাকে ঠিকপথে চালিত করলেই হবে। ব্যক্তি ওয়রওয়ারা জেলে থাকলেও তিনি তাই বন্দি থাকেন না। কেন-না তিনি বলেন,
I do not write because
I have the freedom to write.
I write because
I have nothing to lose but my chains.
শৃঙ্খলে যাঁর ভয় নেই, তিনিই সমস্তরকম দাসত্বের বিরুদ্ধে উলটো খেলাটা শুরু করতে পারেন। যা প্রকারন্তরে খুলে দিতে পারে জনতার বিপুল শক্তির উৎসমুখ। পৃথিবীর ইতিহাসে ঘরপোড়া শাসক এই সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরায়। ওয়রওয়ারাকে তাই বারেবারে বন্দি করে রাখে।
কিন্তু এই বন্দিত্বেই যদি রাষ্ট্রের মোক্ষলাভ হত, তবে এই পৃথিবীতে মানবের ইতিহাসের প্রচ্ছদ বদলে যেত বহুদিন। তা হয় না। হয় না বলেই ওয়রওয়ারাকে বন্দি করে রেখে রাষ্ট্র নিজেই যে কত দুর্বল, কেন দুর্বল- তা আজ আর লুকোতে পারছে না। তার বর্তমান পরাক্রমী গঠনতন্ত্রের ভিতর যে কতখানি ভঙ্গুরতা লুকিয়ে, সমসময়ের মানুষের সামনে তা খোলা-পাতা হয়ে উঠছে এই গ্রেপ্তারির দৌলতেই। ব্যক্তি ওয়রওয়ারা তাই নন, রাষ্ট্রের পরাক্রমের বিপ্রতীপে মুক্তি ও বিপ্লবের যে ধারণা হয়ে তিনি বর্তমান, সেটুকুকে বন্দি করে রাখা যাচ্ছে না কিছুতেই। যায়-ও না। একদা নেলসন ম্যান্ডেলার উদ্দেশে ওয়রওয়ারা লিখেছিলেন,
You define
The consciousness of a political prisoner.
You are a symbol
Of freedom
Defying imprisonment
You seem to say
Freedom means Revolution.

এ-লেখা ১৯৮৮ সালের। আজ, এই ২০২০-তে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো করে তাঁর সম্পর্কেই এই পঙক্তি বললে বিন্দুমাত্র তাই অত্যুক্তি হয় না।

~~
সরোজ দরবার

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)