ব্ল্যাকমোর গ্রিবিন উপনিষদ <br /> পার্থজিৎ চন্দ

ব্ল্যাকমোর গ্রিবিন উপনিষদ
পার্থজিৎ চন্দ

এ রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক সময়ে আমাদের সামনে dualism-এর আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া কোনও পথ খোলা থাকে না, কারণ সৃষ্টির আদি-রহস্যের মূল স্তম্ভ এটি। ডুয়ালিজম আমাদের এক কমফোর্ট-জোন দেয়, সে কমফোর্ট-জোনে আমরা বিচরণ করে কিছুটা স্বস্তি পাই। নববর্ষ পাঠচক্র। লিখলেন পার্থজিৎ চন্দ

এপ্রিলের নির্জন দুপুর, জামরুলগাছের কাণ্ডে শরীর লেপটে থাকা গিরিগিটি ও জানালার ধারে বিছানার উপর ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি বই।

এটিকে একটি ফ্রেম হিসাবে ধরে নিলে সেখানে আমিও রয়েছি এক কোণে, এই দৃশ্যটির দর্শক ও বইগুলির পাঠক।

এবার আমি নিজেকে এই ফ্রেম থেকে ‘সচেতন ভাবে’ সরিয়ে নেবার প্রক্রিয়াটি শুরু করলাম, এক তীব্র রাবার দিয়ে এপ্রিল-দুপুরে আমি নিজেকে মুছে নিচ্ছি। ফ্রেমটি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুছে নেবার পর যা পড়ে রইল তা হল – ‘আমি-শূন্য একটি ফ্রেম, যেখানে জামরুলগাছ গিরগিটি বিছানার উপর ছড়ানো বই এবং নির্জন দুপুরটিও রয়ে গেছে’।

বিষয়টি যতটা যহজ মনে হল আদপে সেটি ততটা সহজ নয়, বরং ভীষণ জটিল।

যে আমি ‘কনসাসনেস’-এর পথ ধরে নিজেকে বিযুক্ত করেছি ফ্রেমটি থেকে সেই আমি যখন ফ্রেমটির বাইরে থেকে ফ্রেমটির দিকে তাকিয়ে রয়েছি তখন নিশ্চিত ভাবেই আমি ‘কনসাস’। অথচ ‘আমি’ নিজেকে বিযুক্ত করেছি এবং সে ক্ষেত্রে আমার (ফ্রেমের ভিতর) অস্তিত্বের ক্ষেত্রে আনকনসাস হবার প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে গেছি। সচেতনতা ও কনসাসনেসের মধ্যে সরলরৈখিক সম্পর্ক স্থাপণ করে এটিকে লঘু করে দেখার কোনও অবকাশ নেই।

মাছের চোখের তারায় তীর বিদ্ধ করতে গিয়ে অর্জুন’কে একে একে অস্তুপুঞ্জের ভারকে ‘ডিসকার্ড’ করতে হয়েছিল। সেটিও ছিল ‘কনসাস’ এক প্রক্রিয়া। কিন্তু মাছের চোখ তীরবিদ্ধ করবার পর নিশ্চয় সেই বস্তুপুঞ্জ ফিরে এসেছিল অর্জুনের কাছে। যে কনসাসনেস যুক্ত হয়েছিল ‘বস্তু’গুলির সঙ্গে, অর্জুনের দ্বারা বস্তুগুলির ‘ডিসকার্ড’ হয়ে যাওয়া ও তাদের ফিরে আসার মধ্যবর্তী সময়ে সেই কনসাসনেসের অবস্থা ঠিক কি ছিল? তবে কি বলা যায় যে কনসাসনেসই সেই রহস্য যা বস্তুর জন্ম দেয়?

এ রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে অনেক সময়ে আমাদের সামনে dualism-এর আশ্রয় গ্রহণ করা ছাড়া কোনও পথ খোলা থাকে না, কারণ সৃষ্টির আদি-রহস্যের মূল স্তম্ভ এটি। ডুয়ালিজম আমাদের এক কমফোর্ট-জোন দেয়, সে কমফোর্ট-জোনে আমরা বিচরণ করে কিছুটা স্বস্তি পাই।

কিন্তু সে স্বস্তিও ক্ষণস্থায়ী। সুস্যান ব্ল্যাকমোরের মতো কেউ আমাদের অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেবেনই বারবার, যে রহস্য সৃষ্টির নাভিবিন্দুর কাছে অবস্থান করছে তা অন্য গ্যালাক্সির কোনও বিষয় নয়। আমাদের প্রাত্যহিকতার কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে সে রহস্য। সুস্যান এক চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন – ধরা যাক আপনি পড়ার টেবিলে বসে বই-এর পাতা উলটে চলেছেন। ‘হঠাৎ’ আপনি শুনতে পেলেন সেই ছোটবেলায় পড়া আর্মানি-গির্জার মতো ঘন্টা বেজে উঠল আপনার দেওয়াল-ঘড়িতে। ধরা যাক রাত্রি ন’টার ঘন্টাধ্বনি ছিল সেটি। যে মুহূর্তে আপনি ন’টার ঘন্টাধ্বনি শুনলেন সেই মুহূর্তে আপনি সচেতন হয়ে গেলেন ও আবিষ্কার করলেন যে আগের ঘন্টাধ্বনিগুলি আপনি শোনেননি।

ধরা যাক বিকেল সাড়ে-পাঁচ’টা থেকে আপনি পড়ার টেবিলে বসে ছিলেন, অর্থাৎ ছ’টা-সাত’টা-আট’টা, এই তিনবার আপনি ঘন্টাধ্বনি শুনতে পাননি।

এই ঘন্টাধ্বনির ‘স্মৃতি’ কি কোনও আনকনসাস স্তরে রক্ষিত ছিল? এবং যে মুহূর্তে আপনি সচেতন (কনসাস) হলেন সে মুহুর্তে সেই আনকনসাসনেস কনসাসনেসে রূপান্তরিত হল?

ডুয়ালিজমের এই রহস্যময় করিডোরে দাঁড়িয়ে যে পথটি দেখা যাবে সেটি হয়তো ‘ঈশ উপনিষদের’, ‘তদেজতি তন্নৈজতি তদদূরে তদ্বন্তিকে/ তদন্তরস্য সর্বস্য তদু সর্বস্যাস্য বাহ্যতঃ’।

এর ব্যাখ্যা হিসাবে বলা হয়েছে, ‘তিনি চলেন, তিনি চলেন না। তিনি দূরে আছেন, তিনি নিকটেও আছেন। তিনি এই সমুদয়ের অন্তরে আছেন, তিনি এই সমুদয়ের বাহিরেও আছেন।’

দ্বৈত-সত্তার যে করিডোর ডুয়ালিজমের জন্ম দেয় এখানে এসে সম্ভবত তার পরিসমাপ্তি। কারণ এই শ্লোকটির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, ‘(আমাদের বুঝিতে হইবে) বাইরে যে চঞ্চল প্রকৃতির লীলা চলিতেছে তাহা ব্রহ্ম; আবার যে অচঞ্চল স্থির সত্তার উপর আশ্রয় করিয়া এই লীলা চলিতেছে তাহাও ব্রহ্ম। চঞ্চলতা ও অচঞ্চলতা, গতি ও স্থিতি, লীলা ও লীলার আশ্রয় – দুই-ই ব্রহ্মে একসঙ্গে মিলিত হইয়া আছে। তাই বলা হইয়াছে – তিনি চলেন ও চলেন না’।

গতি ও স্থিতির এই অপেক্ষিক সম্পর্ক ঠিক কেমন হতে পারে?

আলোর গতিবেগে সময় স্থির হয়ে থাকে, পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ি থেমে যায়। এবার ফোটন-কণার দিকে চেয়ে দেখা যাক, হাজার হাজার আলোকবর্ষ পেরিয়ে দূরের তারার থেকে ফোটনের স্রোত এসে আছড়ে পড়ছে পৃথিবীর বুকে। কিন্তু তাদের কোনও ‘বয়স’ নেই…ফোটনের ‘স্মৃতি’তে সময়ের কোনও চিহ্ন নেই; কারণ তার কাছে পৃথিবীর সব ঘড়ি স্থির।

কিন্তু প্রোটনের কি স্মৃতি’ও আছে? যার সময়ের ধারণা নেই তার কাছে স্মৃতির উপস্থিতি কী রকম হতে পারে? “The photon’s track on a Feynman diagram has no arrow on it not only because the photon is its own antiparticle, but because motion through time has no meaning for the photon – and that is why it is its own antiparticle.’ (In Search of Schrodinger’s Cat/ John Gribbin)

-গা শিরশির করে ওঠে…একটি কণা, সে নিজেই নিজের অ্যন্টিপার্টিকল।

কিন্তু এর থেকেও বেশি স্তম্ভিত হয়ে যাই শ্রডিংগারের বেড়ালটির সামনে এসে। সে কি মৃত? না, জীবিত? আমরা কি কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন মোতাবেক এই সিদ্ধান্তে উপনীত হব যে দুটি ওয়েভ ফাংশন’ই একই রকম ভাবে ‘unreal’ এবং যখন আমরা বাক্সটির ভিতর দৃষ্টি দেব তখন সেই দুটি unreal-এর একটি স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠবে আমাদের কাছে? অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে আমাদের ‘দেখা’ দুটি unreal-এর মধ্যে একটিকে বাস্তব করে তুলল। আরও একটি সম্ভাবনার কথাও বলেন কেউ কেউ, তাদের কাছে দুটি বিড়ালই ‘real’। তারা বিশ্বাস করেন, ‘There is live cat, and there is a dead cat; but they are located in different world. It is not that the radioactive atom inside the box either did or didn’t decay, but that it did both.’

এই ‘অদ্ভুত’ বাস্তবতার সাপেক্ষে বিড়ালটির ‘কনসাসনেস’-এর দিকে একবার তাকানো যাক। বিড়ালটি জীবিত না মৃত তা কি স্থির করে দেবে তার কনসাসনেস? অথবা শ্রয়ডিংগারের পৃথিবীতে তার কনসাসনেস’ই তার বেঁচে থাকা অথবা মৃত অবস্থার সমনাম?

সুস্যান ব্ল্যাকমোরের বইটির কাছে আবার ফিরে আসি। কনসাসনেস ও তাকে ঘিরে আত্মপ্রতারণার কয়েকটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুস্যান। মানুষ বুদ্ধিমান, মানুষের আত্মপ্রশ্ন আছে…সে নিজেকে প্রশ্ন করতে পারে, ‘আমি কি কনসাস?’ অথবা ‘আমি কী বিষয়ে কনসাস?’

আমরা নিজেদের মতো একটি উত্তর তৈরি করে নিই। ঠিক এই সময়ে ‘অভিজ্ঞতার প্রবাহ’ (stream of experiences) এবং একটি ‘অভিজ্ঞতা-অর্জনকারী সত্তা’র (experiencing self)-র আবির্ভাব ঘটে। এবং পরের মুহূর্তেই সেটির বিলুপ্তি ঘটে। পরের বার আমরা আরেকটি সত্তার কাছে এই প্রশ্নটি করি এবং আরেকবার আরেকটি প্রবাহের জন্ম হয়। যদিও প্রতিটি প্রবাহ পৃথক ও বিচ্ছিন্ন আমরা ভুলভাবে তাদের একটিই প্রবাহ বলে মনে করি।

শুধু তাই নয়, সুস্যান আরেকটি চমৎকার কথা বলেছেন। প্রতিবার ‘আমি কি কনসাস’ প্রশ্নটি করার সময়ে আসলে আরেকটি প্রশ্নের’ও জন্ম হয়, ‘আমি কি মুহূর্তকাল আগে কনসাস ছিলাম?’

যতবার এই প্রশ্নটি করি ততবার আমরা মহূর্তকাল আগের স্মরণযোগ্য পরিসর থেকে উত্তর পাই এবং আমরা আবার একটি ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয় এই ভেবে যে প্রতিটি মহূর্তে আমাদের সত্তা আসলে কনসাস এক সত্তা। কারণ যতবার আমরা প্রশ্ন করি ততবার আমরা কনসাস হয়ে পড়ি এবং সেই কনসাসনেসই আমাদের কাছে ‘একমাত্র’ সত্য হয়ে ওঠে।

এবার আমাদের আক্রান্ত করবে ও ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে সেই ঘাতক প্রশ্ন – তা হলে কি প্রশ্ন করাই কনসাসনেসের প্রথম ও একমাত্র শর্ত? আত্মপ্রশ্ন ছাড়া কি কনসাসনেসের সন্ধান পাওয়া সম্ভব?

সুস্যানের বইটি চমৎকার, এই প্রশ্নটি না-করলেও অসংখ্য প্রশ্ন উসকে দিয়ে চলে যায় সেটি।

কিন্তু যে প্রশ্নটির থেকে নিজেও বের হতে পারছি না সেটি হল সেদিন দুপুরবেলা কোন বইটি পড়ছিলাম আমি?

সেটি কি জন গ্রিবিন’এর শ্রয়েডিংগার ক্যাটের অপার রহস্য ও কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে বই? না কি সুস্যান ব্ল্যাকমোরের ‘কনসাসনেস- অ্য ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন? অথবা ‘উপনিষদ?

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (1)
  • comment-avatar
    Debabrata 2 months

    লেখককে এক অন্যতম প্রধান কবি হিসেবে চিনতাম। তাঁর কবিতা ও গদ্য দুটোই খুব পছন্দ করি। কিন্তু কবি যে পদার্থবিদ্যার এমন নিবিড় এক পাঠক তা জানা ছিল না। বহু বছর আগে শোনা স্যার রজার পেনরোজের এক কোয়ান্টাম ও কনশাসনেস বিষয়ক এক মনোমুগ্ধকর বক্তৃতার কথা মনে পড়ে গেল এ লেখা পড়ে। কবি ছাড়া কেই বা পারেন সৃষ্টির ও অস্তিত্বের গভীর ও পবিত্র রহস্যগুলিকে এমন ভাষা দিতে। এমন আরও অনেক পাঠচক্রর অপেক্ষায় রইলাম।