পুনঃপাঠ : অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে <br />  অনুপ সেনগুপ্ত

পুনঃপাঠ : অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে
অনুপ সেনগুপ্ত

নীরবতায় ভাসমান যে মেঘমুক্ত ভাষা, যে বাঙ্ময় নৈঃশব্দ্য, সেই রৌদ্রনীলিমায় কিংবা জ্যোৎস্নায় কবির বিশ্ববীক্ষা, পরাদৃষ্টি সংহত হয়। যে পেয়ারাতলা একটি জীবনকালের পরিসর, তাও একদিন পেরিয়ে যেতে হয়। গৌতম বসুও পেরিয়ে গেলেন। আজ অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে পাঠ করতে গিয়েও দেখি, পৃষ্ঠা থেকে পদধূলি ঝরে পড়ছে। গৌতম বসুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। লিখলেন অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে - গ্রন্থটি নিয়ে অনুপ সেনগুপ্ত

গৌতম বসু সেই গোত্রের কবি, যিনি নৈঃশব্দ্যের প্রতি প্রেমাসক্ত হয়েই কথা বলতে শুরু করেন, আর তাঁর এই কথা এগিয়ে যায়, যতক্ষণ না তিনি আরেক নৈঃশব্দ্যকে স্পর্শ করতে পারেন। কখনও যেন নৈঃশব্দ্যের নদীতেই কবি ভাসিয়ে দেন কথার নৌকো। এমনই মনে হল তাঁর অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে কাব্যগ্রন্থটি ত্রিশ বছর পর পুনর্পাঠে।

একসময় ব্যাঙ্কের ফিল্ড অফিসার হিসেবে, কৃষি-ঋণের ব্যাপারে চাষীদের সঙ্গে কথা বলতে গৌতম বসু যেতেন বিভিন্ন গ্রামে। কখনও মাইলের পর মাইল হেঁটে পার হতেন প্রান্তর। সেইসব জনপদের কোনও আপাত তুচ্ছ দৃশ্যের অভিঘাত রূপান্তরিত হত গভীর অনুভবে, আর সেই অনুভবের রূপান্তর ঘটত পরাসংবেদনে।

সেই ক্রোধ যাকে প্রদান করা হয়েছিলো,
কামারশালার পিছনে নিশাচ্ছন্ন
যার কৃষ্ণকেতন স্ফূলিঙ্গে, হাওয়ায়, ধোঁয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে,
অগ্নির, তবু অগ্নির নয়। – (যশোহরি)

কাকে প্রদান করা হয়েছিল ক্রোধ? গৌতম বসুর কবিতায় all form is a gesture, an enigma, a cipher. গোধূলি ও সন্ধের মিলনকালে দ্রষ্টা ও দ্রষ্টব্য ষেন মিশে যাচ্ছে একে অপরের সঙ্গে। ফলত, যাকে – এই একবচন সর্বনাম বাস্তবতার বিভিন্ন স্তরে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠছে বহুবাচনিকতায়।

পরের কবিতা শাহী শেরপুর। এই কবিতার প্রথম শব্দ অনন্তহাট দেশকালসন্ততির ব্যঞ্জনায় সম্পৃক্ত। আর এই অনন্তহাট ধূলামোহিত। এই ধূলায় ব্যক্তিত্বারোপ করেন কবি। এবং আনন্দময় প্রতিবেশেও পাষাণযোনিসম্ভূত জীব-কে কারও কোপতলে চিঁড়ে গুড় মাথায় ফেরি করতে হয়। পাষাণযোনিসম্ভূত শব্দটির মধ্যে ইয়ুঙীয় মাতৃপ্রত্নপ্রতিমার মূর্ছনা প্রতীয়মান। কিন্তু কার কোপতলে? তিনি জগৎপুরুষ? রুদ্র মহাকাল? উত্তরের শুধু আভাস রেখে যান কবি।

এরপর পাদুকা কবিতা শুরু হয়: গ্রীষ্মের সেই অপার সেতুর উপর/তাকে পুনরায় দেখা গেলো, ছায়াহীন, নক্ষত্রসমান। এই অপার সেতু শব্দবন্ধটির বিরোধাভাসে জগৎ-পরিসরের ব্যাপ্তি উদ্ভাসিত। আর সেখানে ছায়াহীন, নক্ষত্রসমান যাকে দেখা যায়, তিনি হয়তো প্রভাকর সূর্যদেব। কয়েক পা অগ্রসর হয়েই এক অনুপম ভাবপ্রতিমা: কাঁথা পবিত্র জেনে কাঁথার উপরের ও নীচের শূন্যতাকে প্রণামের সময়/আগুনের বসনকামনা। কাঁথার পোশাকে আগুনও চায় তার তীব্রতা-প্রশমন। কিন্তু এই বৃথা প্রচেষ্টার শেষে যখন বাতাসের কারিগর চিরতরে চ’লে গেছে, তখন মৃতের স্মরণচিহ্ন তাঁর পাদুকা।

আমিনপুর রোড-এ আমরা ধরিত্রীর শেষ ক্রোশ-এ এসে দাঁড়াই। সেখানে একটি ছাগল যেন নিজের বাইরে এসে অতিদূর থেকে আপন প্রসবকাতরতা লক্ষ করে। তারপর শাবকের উদয়, আর তারপর সে অস্তের রসাতল পথে এগিয়ে যায়। এখানে রাত্রি যেন মা, আর সূর্য তার শাবক। সময়ের গহ্বরে জীবননাট্যচক্র এভাবেই সংঘটিত হয়ে চলে।

রণগ্রাম কবিতায় আবার যে আলো ভেসে চলেছে, মানুষের মতোই তার দেহযুক্ত প্রাণ যাতনা, কৌতুক দুই-ই স্পর্শ করে। আর জেলাসদর বহরমপুর কবিতায় খেয়াঘাটে অবহ পদচিহ্ন দেখে কবি পৌঁছোন পদরেখার গূঢ় জন্মান্তর-এ। গৌতম বসুর কবিতায় এভাবেই কোনও দৃশ্য শুধু নিজেকেই পেশ করে না, নিজেকে পেরিয়ে অন্য কিছুকে নির্দেশ করে, অন্যকিছুতে পরিবর্তিত হয়। ফলত তা হয়ে ওঠে অতিলৌকিক উন্মোচন। এভাবেই দোহালিয়া কবিতায় যার পথিকবেশ নবীন নয়, বৃষ্টিমুখর নয়/সে জন্মতিলক কুড়িয়ে পায়। মতিলালগঙ্গা কবিতায় বটবৃক্ষের ছেঁড়ামলিন ছায়ায়, প্রাণ নয়/প্রাণের ক্ষরণ ধ’রে আছে কেউ। বিভিন্ন দ্বিরূপ বা বাইনারির সমন্বায়ন, চিহ্নের বিপর্যাস, নান্দনিক আবেগ, মূর্ত-বিমূর্তের ডায়লেকটিক্স, সেইসঙ্গে চলমান ভাবচ্ছবির মন্তাজ ও অন্তঃসুষমা নিয়ে গৌতম বসুর বাঙ্ময় যাদুঘর সংস্থিত।

হাটপাড়া কবিতায় কবি এই সম্প্রত্যয় মেলে ধরলেন: যদিও জলস্রোত হই, জাগি না, যাই না কোথাও, দেখি/জগৎ জানে না যে জগৎ ভাসে, কোথায় ভাসে। এই জগতের মধ্যে যেমন আমরা ভাসমান, তেমনই আমাদের মধ্যেও জগৎ ভাসমান। উপস্থিতি তো আসলে জগতের, সত্তার সংকেতলিপি।

নীরবতায় ভাসমান, সে ফিরে চায় না কখনো
মেঘমুক্ত তার ভাষা, যেই পাঠ করতে যাই
পৃষ্ঠা থেকে পদধূলি ঝ’রে পড়ে, অতলে
পেয়ারাতলা পেরিয়ে তার চ’লে যাওয়া, যেখানে এতকাল বিঁধেছিলো। – (রামকৃষ্ণপুর)

নীরবতায় ভাসমান যে মেঘমুক্ত ভাষা, যে বাঙ্ময় নৈঃশব্দ্য, সেই রৌদ্রনীলিমায় কিংবা জ্যোৎস্নায় কবির বিশ্ববীক্ষা, পরাদৃষ্টি সংহত হয়। যে পেয়ারাতলা একটি জীবনকালের পরিসর, তাও একদিন পেরিয়ে যেতে হয়। গৌতম বসুও পেরিয়ে গেলেন। আজ অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে পাঠ করতে গিয়েও দেখি, পৃষ্ঠা থেকে পদধূলি ঝরে পড়ছে।

এই কাব্যগ্রন্থের শ্রী কবিতায় আলতা পা সংসারের সীমানা চিহ্নিত করে। এভাবেই সংসার নারীর পা। কবি যেমন সৌন্দর্যকে রসাতল থেকে উদ্ধার করেন, সৌন্দর্যও তেমনই কবির হাত ধরে তাঁকে আশ্রয় দেয়, এই কোলাহলের জগতে তাঁকে নীরবে রক্ষা করে চলে।

এবার আমরা গোড়েরহাট-এ প্রবেশ করি যেখানে বেদনায়, বৃষ্টিতে কাউকে হারাবার, ফিরে পাবার কথা লেখা থাকে। শ্মশানভূমির জ্বলন্ত চিতার আবহে কবির হাহাকারটুকু ভেসে ওঠে: আমি আগুনের চেয়েও নিরুপায়, জ্বলি। কিন্তু এই জ্বলনেই মৃত্যু ও জীবনের মধ্যে ভাবসেতু রচিত হয়। আত্মমুখের অবস্থান বদলে যায়। অপরায়নে আত্মর উন্মোচন ঘটে।

‘মহাদেবের দুয়ার’ কবিতায় আবার মেটাপোয়েট্রির আভাস দেখা যায়। কবিতা হয়ে ওঠে দেব অস্থি নির্মিত অসি। এরপর কবি উত্তরপাড়া আবাদ-এ পৌঁছোন, যুদ্ধযাত্রীদের পথ যেখানে ঘাসে, নয়নতারায় ভ’রে উঠেছে। এখানেই শেষতম তরবারি-র সন্ধান পান কবি। ইতিহাস যে দুই কালকে পৃথক করেছে, কবিতা তাদের মিলিয়ে দেয়, সমন্বিত করে। ইতিহাসে প্রবেশ করেও তাকে পেরিয়ে যায় কবিতা।

সামান্যর মধ্যে অসামান্যর উদ্ভাস দেখি বারাসত লোকাল কবিতায়। সেখানে পাখির স্খলিত পালক আপন দুঃখে ভর ক’রে ওড়ে। এবং কবি শেষপর্যন্ত এই স্বপ্ন রেখে যান: একটি গহন স্বরের মৃত্যুর ও জন্মের দেখা যেন মেলে, মনে-মনে। এভাবেই কবি অস্তিত্বের, জীবনের সম্মতি আদায় করে নেন। কিন্তু নিখিল দুঃখবোধ থেকে তিনি পরিত্রাণ পান না। সেই দুঃখের প্রকাশ ঘটে আর্তিতে –

যেখানে ধান আপন গীতসাথে জন্ম-জন্মান্তরে ঝ’রে পড়ে
আকাশচারীর দগ্ধমিনতি যেখানে
ঘুরে-ঘুরে সন্ধান করে কোন বিজনে, কোথায়
তার নাকের নোলক, গলার মালা গচ্ছিত আছে। – (মুনাইকান্দ্রা)

জ়াক দেরিদা মনে করতেন কবিতা হচ্ছে the dream of learning by heart. ইতালির একটি জার্নালে Che cos’è la poesia? বা What is poetry? নিবন্ধে লিখেছিলেন, I call a poem that very thing that teaches the heart, invents the heart … সেইসঙ্গে পোয়েটিক্সের পাঠাগারে আগুন জ্বালিয়ে তিনি এই প্রত্যয়ে পৌঁছোন: No poem without accident, No poem that does not open itself like a wound, but no poem that is not also just wounding. You will call a poem a silent incantation, the aphonic wound that, of you, from you, I want to learn by heart. এই aphonic wound-ই গৌতম বসুর কবিতায় ইশারায় কথা বলে – ইশারায় নিজের অস্তিত্ব অবহিত করে –

কত তুলসীতলার প্রদীপ ধুলো হয়ে গেছে
সেই ধুলো সে মাঠে-মাঠে ছড়ায়, কাঁদে। – (শ্রীপুর)

যে কোনও বড় কবিই নিজের মাতৃভাষার মধ্যে নতুন ভাষা উদ্ভাবন করেন। গৌতম বসুও বাংলা ভাষার গুণগত পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তাঁর কবিতায়। এ ব্যাপারে তিনি নিজেই একবার লিখেছিলেন, একজন শক্তিমান কবি কোনো ভাষায় যখন আত্মপ্রকাশ করে, তখন প্রাথমিক অনিশ্চয়তার পর ভাষা তাঁকে অনুসরণ করে, তাঁর চিন্তার প্রাবল্য ও গভীরতা এমন এক বাতাবরণ সৃষ্টি করে যে, তাঁর ভাবনাকে ধারণ করার জন্য ভাষার সুপ্রতিষ্ঠিত কাঠামোর রূপান্তর ঘটে।

গৌতম বসুও তাঁর কবিতায় উদ্ভাবন করেছেন নিজের ভাষাভঙ্গি। তাঁর ঘনসংবদ্ধ শব্দন্যাস এবং রূপকল্প-সংস্থান একপ্রকার ধ্রুপদী আবহ তৈরি করে কবিতায়। এই কবিতার ধাত্র বা ম্যাট্রিক্স এমনই যে গুরুভার শব্দের ঘাত বিপর্যয় সৃষ্টি করে না, বরং কাব্যিক লাবণ্যের উন্মেষ ঘটায়। কবির সংরক্ত অভিব্যক্তিও আশ্চর্য সংযমে বাঁধা। অনেকক্ষেত্রে ছোট ছোট বাক্যাংশ কিংবা শব্দবন্ধ ভাবের ঢেউ তোলে গৌতম বসুর কবিতায়। এক ঢেউ আরেক ঢেউকে কখনও বিপর্যস্ত করে, কখনও-বা হাত ধরে এগিয়ে যায়, আর এভাবেই ভাবপ্রবাহে সম্ভাব্য অনুষঙ্গগুলি কুসুমিত হয়। কোনও সময় আবার ভাবের উল্লম্ব ও অনুভূমিক প্রবাহের দ্বৈতলীলা প্রতীয়মান –

তার কাছে বৃষ্টির মতো ফিরে আসি
আমার দুইকূল তার চোখের কোলের কালি, জলভারে
বেঁকে নীল হয়, জ্যোৎস্নায় আবার স্ফীত, উতলা হয়ে ওঠে। – (বিশ্রামতলা)

গৌতম বসুকে পড়া মানে ডুব দেওয়া। সংগীত ও ব্যঞ্জনা – ভাষার এই দুই চরমমাত্রার মধ্যে তাঁর কবিতা দোলায়িত হয়, কিন্তু এই সংগীত কোনও মেলোডি নয়, বরং বেস (bass) – কিংবা বলা ভালো পরিবর্তনশীল বা অল্টারনেটিং বেস – যেখানে কবি গোত্রনাম হারিয়ে … একটি ভূলুন্ঠিত নিয়োগপত্র রক্ষা ক’রে জেগে থাকেন। – (মিত্রগঙ্গা)

বছর তিরিশেক আগে গাণ্ডীব পত্রিকায় (অষ্টম সংখ্যা, ১৯৯১) নিশীথ চিন্তা শিরোনামে গৌতম বসুর একটি নিবন্ধ ছিল। সেখানে তিনি বিপুল আক্ষেপে লিখেছিলেন: কতো কবিতা লেখা হলো বাংলায়, অসংখ্য কবিতায় ধরা রইলো মানুষের গভীরতম উক্তি, সান্ত্বনা, দুঃখের প্রদীপ জ্বলে রইলো কিন্তু কই, একটি গাছেরও পাতা তো নড়লো না, একটিও মড়া শিশু ফিরে এলো না।

বাস্তবিক যদি জগতের দুঃখ-নির্বাণের শক্তি কবিতার থাকত! কিন্তু কবির এই ব্যর্থতাবোধই হয়তো কাব্যিক সিদ্ধি হয়ে ওঠে অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে-র কবিতায় –

এই কররেখাসকল হাওয়ায় সম্মিলিত কয়েকটি খড়
উড়ে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে কয়েকটি খড়ের মৈত্রী
বিপন্ন হয়েছে জেনে, এ-লিখন নিষ্পাপ রেখো
অন্ধকারের দিকে ফেরার অনুমতি চেয়ে
সহসা তাঁর গুণমুগ্ধ, যদি দাঁড়িয়ে থাকি। – (বহরু)

কিংবা –

জলধারার উপর থেকে তুমি দেখো, নীচে একটি প্রাণ
কীভাবে চেয়ে রয়েছে আকাশে, পথশেষে;
গৃহস্থের অগোচরে তবে এখানেই খেদ রোপণ করি
ওই কেশদামে কেবলই মেঘ ও রৌদ্র, দিগন্তরেখা কোথায়! – (উত্তরপাড়া নিজ)

কোনও কবিতাই তো গৌতম বসু একা লেখেন না – সেই কাব্যিক পরিসরে যা কিছু – মানুষ, পাখি, আকাশ, বাতাস, উদ্ভিদ – জগতের সকল সত্তাই সেই লিখনে অংশ নেয়। জ়াক লাকঁ সমীপে ঋণস্বীকারে বলা যায়, তাঁর কবিতায় সাবজেক্ট বা বিষয়ী নেই, সে আগেই খণ্ডে খণ্ডে ভেঙে গেছে। শুধু এইসব খণ্ডের কন্ঠস্বর কবিতার অভ্যন্তরে আন্তর্মানবিক লীলায় নিজের গৃহ খুঁজে নেয়।

যেথা যাও, ঊর্ধ্বে, মেঘস্থপতির দেশে
সেথা বিদ্যুতে গার্হস্থ্যে বিতরণ কোরো সেই আজ্ঞাবহের প্রাণ
আকাশে খই ও মুদ্রা প’ড়ে থাকে, রুক্ষ হাওয়ায় গড়ায়
নক্ষত্রের বালির ভিতর কোনো দানা তার, কোনোটি পাতকীর। – (স্কুল রোড)

প্রকৃতপ্রস্তাবে গৌতম বসুর কবিতা দর্পণ নয়, বরং জানলা। সেখানে দৃশ্যের ঢেউ ফিরে আসে, বারবার ফিরে আসে, অন্য ঢেউ হয়ে।

ভুলিনি, সেও ভোলেনি কালচক্রতল
তবু কেন, চৈত্রের মতো লাভবান, আবার নেমেছি,
তিনটি পাতার আড়াল থেকে কেন আবার
ফুটে উঠতে হ’লো, সে-কথা বনাঞ্চল জানে না
প্রসববেদনা তার আজও আমায় ঘিরে রয়েছে। – (গোচারণ)

অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে-র অধিকাংশ কবিতার শিরোনামই গ্রামের নামে। এইসব গ্রাম মুর্শিদাবাদ ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার। মুর্শিদাবাদ: যশোহরি, শাহী শেরপুর, রণগ্রাম, দোহালিয়া, মুনাইকান্দ্রা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা: হাটপাড়া, রামকৃষ্ণপুর, গোড়েরহাট, উত্তরপাড়া আবাদ, উত্তরপাড়া নিজ (এই দুই উত্তরপাড়া পাশাপাশি দুটি গ্রাম), শ্রীপুর, বহরু, গোচারণ, গঙ্গানারায়ণপুর। উত্তর চব্বিশ পরগণার রাস্তার নাম এসেছে একটি কবিতায় – আমিনপুর রোড। ট্রেনের নাম এসেছে – বারাসত লোকাল। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার রাস্তার নামেও কবিতার নাম হয়েছে – স্কুল রোড। মুর্শিদাবাদের কান্দির একটি বাসস্টপ কবিতার শিরোনাম হয়েছে – বিশ্রামতলা। সারা বইতে একটিই বড় শহরের নাম এসেছে – মুর্শিদাবাদের জেলাসদর বহরমপুর। অবশ্য এখানেও শহরের প্রান্তস্থিত খেয়াঘাটের প্রতিবেশ। দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার জয়নগর অঞ্চলের দুটি পুকুরের নামে দুটি কবিতার নামকরণ করা হয়েছে – মিত্রগঙ্গা আর মতিলালগঙ্গা। এখানকার লোকশ্রুতি, ভগীরথ এই অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় যেখানে তাঁর পা পড়েছে, সেখানে এক-একটি ‘গঙ্গা’ তৈরি হয়েছে। প্রসঙ্গত, এই মতিলালগঙ্গা পুকুরটি প্রয়াত দার্শনিক বিমলকৃষ্ণ মতিলালের পরিবারের। মিত্রগঙ্গা পুকুরটিও তার অধিপতির নাম বহন করছে বলা বাহুল্য। গোটা বইতে তিনটি কবিতায় শুধু কোনও স্থাননাম শীর্ষক হয়নি। এদের মধ্যে ‘মহাদেবের দুয়ার’ কবিতাটি কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি কাব্যগ্রন্থের নামে হয়েছে। কবিতাটি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেই উৎসর্গিত। আর দুটি সাধারণ নাম হচ্ছে শ্রী এবং পাদুকা।

এই কাব্যগ্রন্থের পরম্পরাগত আরও কয়েকটি কবিতা আমার চোখে পড়েছিল, যেগুলি কোনও কারণে গ্রন্থিত হয়নি, যেমন – অঙ্গবন্দনা, নিসর্গ, শিবরামতলা (শারদীয় লাল নক্ষত্র, ১৩৯৩), মহীসার (শারদীয় লাল নক্ষত্র, ১৩৯২)। এই ধারার আরও অগ্রন্থিত কবিতা হয়তো থাকতে পারে। অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে-র কবিতা যখন লেখা হচ্ছে, সেই সময়কালেই ১৯৯০ সালে আলোচনা চক্র পত্রিকার ৩য় সংকলন কবিতা ভাবনা সংখ্যায় গৌতম বসুর একটি কাব্যিক গদ্য প্রকাশিত হয় – মুক্তির পথে। এটি পরবর্তীকালে ঈষৎ পরিবর্তিত হয়ে কবির রসাতল কাব্যগ্রন্থে শিরোনামবর্জিত বিভাব কবিতারূপে গ্রন্থিত হয় –

এই পথে প্রত্যহ হাঁটি, কিন্তু নিভৃতে তাঁকে পাই না; একদিন, অতর্কিতে জিজ্ঞাসা ক’রে বসি, বন্ধন কীসে? আমরা তখন একটি বাঁশবন পার হচ্ছি, এখানেও কয়েক ঘর মানুষের বাস, তাঁদের প্রধান বৃত্তি ঝুড়ি বোনা। তিনি বলেন আমি মায়াবৃত, এই জন্মই আমার বন্ধন, তবু বন্ধনমাত্র নয়, আমি মুক্তির পথেই রয়েছি।

শীর্ণ পথে নেমে আসা বাঁশপাতার স্তূপগুলি ক্রমে আবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, পাতাগুলি মাড়িয়ে যাওয়ার শব্দও ফিরে আসে, বুঝতে পারি যে, আমরা তখনও হেঁটে চলেছি। তাঁকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করি, বন্ধন কীসে? এবার তিনি বলেন, পার্থিব সম্পদের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার সূত্রে মানবসমাজ স্তরবিভক্ত, স্তরগুলি বিবাদমান, এ-অবস্থাই আমার বন্ধন, তবু বন্ধনমাত্র নয়, আমি মুক্তির পথেই রয়েছি।

আমরা ততক্ষণে বাঁশবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেছি, পথ এখানে অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত, ছায়াসকল তীক্ষ্ণ, যে কাঁচা রাস্তায় গিয়ে উঠবো সেটি ধরে উত্তরদিকে হাঁটলে রামকৃষ্ণপুর, দক্ষিণে বুড়োর হাট, আর সামনে দেখতে পাচ্ছি শাহজাদাপুর অঞ্চলের অন্তর্গত একটি গ্রাম, গঙ্গানারায়ণপুর। একটি তেজস্বী মধ্যাহ্নের প্রশ্বাসে গঙ্গানারায়ণপুর কেমন মিশে রয়েছে!

এই তো সেই গঙ্গানারায়ণপুর, আর সেই বাঁশবন। অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথের অন্তিম কবিতায় আমরা পৌঁছোই –

অবশেষে কোনো এক মধ্যাহ্নে
বাঁশবনের ধারে, যদি কেউ ললাট স্পর্শ করে
ধীরে, অতিধীরে, তাকে দিও, আমার বিরহ। – (গঙ্গানারায়ণপুর)

বিরহই প্রেমকে অন্য মাত্রায় উদ্ভাসিত করে, যেভাবে শূন্যতা আমাদের সত্তার উদ্ভাসনে পৌঁছে দেয়, যেভাবে নীরবতায় ডুব দিয়ে অপেক্ষমান শব্দাদি তুলে আনেন কবি। শূন্যতায় নিজেকে নিক্ষেপ করে কবি নিজেকে পুনরায় সৃষ্টি করেন, নিজে সত্তায়িত হয়ে সৃষ্টি করেন অপরকে, সৃষ্টি করেন বাঙ্ময় মহাবিশ্ব। গৌতম বসুর প্রতিটি কবিতা এমনই মহাবিশ্ব – যে জগতায়নে কবিই ঈশ্বর, আবার কবিই ধুলো – ধুলো, dust, but dust in love.

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (2)
  • comment-avatar
    Rini Gangopadhyay 1 week

    অসাধারণ আলোচনা। খুব ভালো লাগলো।

  • comment-avatar
    অরিন্দম মুখোপাধ্যায় 1 week

    অনবদ্য লেখা। এমন মনোজ্ঞ রিভিউ আমি খুব কমই পড়েছি।