‘দেখি বাংলার মুখ’ <br /> ভাষাদিবস সংখ্যা

‘দেখি বাংলার মুখ’
ভাষাদিবস সংখ্যা

আবহমানের বিশেষ ভাষাদিবস সংখ্যা 'দেখি বাংলার মুখ'। থাকছে অগ্রন্থিত প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত। এছাড়াও লিখলেন বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় গৌতম বসু গৌতম চৌধুরী চৈতালী চট্টোপাধ্যায় বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায় দীপক রায় তৃষ্ণা বসাক ওবায়েদ আকাশ রাণা রায়চৌধুরী পার্থজিৎ চন্দ কুন্তল মুখোপাধ্যায় অবিন রায়চৌধুরী দেবাশিস দাশ শীর্ষা মৃন্ময় চক্রবর্তী উমা মণ্ডল মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া চন্দন ঘোষ শিহাব শাহরিয়ার শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সন্দীপন চক্রবর্তী গৌরব চক্রবর্তী মন্দাক্রান্তা সেন সার্থক রায়চৌধুরী কস্তুরী সেন সব্যসাচী ভৌমিক মণিশংকর বিশ্বাস রাহুল দাশগুপ্ত শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী বেবী সাউ অনিন্দিতা গুপ্ত রায় অর্ঘ্যকমল পাত্র সুরঞ্জন রায় সবর্ণা চট্টোপাধ্যায় সুপ্রভাত মেট্যা সুবীর সরকার পলাশ দে সোনালী চক্রবর্তী বৈশাখী রায়চৌধুরী দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায় তন্ময় ভট্টাচার্য শ্যামশ্রী রায় কর্মকার মাসুদার রহমান আম্রপালী দে অনিন্দ্য রায় অজিতেশ নাগ বিবস্বান দত্ত পৌলমী গুহ সোনালী ঘোষ সৌভিক গুহ সরকার রাজর্ষি দে গৌরাঙ্গ শ্রীবাল প্রসূন মজুমদার ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী সুব্রত মিত্র রুমা তপাদার সুপ্রভাত মুখোপাধ্যায় শুভম চক্রবর্তী এবং হিন্দোল ভট্টাচার্য


অগ্রন্থিত প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত

অন্য প্রাপ্তি

দূরে দেখলাম তোমারই মুখের প্রতিচ্ছবি

দগ্ধপ্রহরে বিলায় সুখের মেদুর মায়া,

চিবুক কি চোখ এক ছিল কি না দেখি নি অতো

মায়াবী ইশারা চকিতে হেনেছে সে প্রচ্ছায়া।

কাছে এসে ভুল ভাঙলো, যদিও অভিজ্ঞতা

বর্ধিত হারে ক’রেই চলেছে পরিক্রমা ―

হৃদয় অথবা হৃদয়েরই মতো জীবনভূমি,

যে-মুখ কেবলই ছলনা তাকেও করেছে ক্ষমা।

দুরাশাভঙ্গ বেদনাদায়ক, তবুও যদি

পৃথিবী জুড়েই তোমার সুখের শান্তি খুঁজি ―

চকিত উপমা, ফলিত কলায় স্বয়ংপ্রভ,

ব্যাথাই প্রাপ্য, তাই আপাতত দুচোখ বুঁজি।

[প্রথম প্রকাশ: ১৩৬২ /১৯৫৫]

শিল্প

এক মুহূর্তে, সুতীব্র যন্ত্রণা

ছিন্নছিলা ধনুঃশরে কাঁপে

প্রায়াবলীন কুয়াশাদিন ছিঁড়ে,

রৌদ্র হানে নিভৃত সন্তাপে।

স্পর্শে জ্বলে ভীরুহৃদয়, যদি

আগুন দেয় ত্বরিত সংরাগও

এক মুহূর্তে, তুমি আমার বুকে

বৃষ্টিমুখ মেঘের মতো জাগো ।।

[প্রথম প্রকাশ: ১৩৬২ /১৯৫৫]


দৃশ্যান্তর

গোপন যেহেতু নয়, সব তাকে চেয়েছে ছাড়াতে;

অত উচ্চারিত, স্থির, অমোঘ আলোর সমারোহ

ওপারে কোথাও লাল, এপারে নিখিল ঝুলনাতে

নীলের রোমাঞ্চ; যেন, সামগানে বিবশ আবহ।

না হলে ভালই লাগে স্বতন্ত্রের সহজ প্রকাশে

বৃষ্টিপড়া যাকে বলে মাঘনীল ব্যথার শাখায়, …

অথবা নির্জন হাওয়া নুয়ে-পড়া, ক্রীতদাস ঘাসে

দৃশ্য চোখের মণি; ভয় শুধু, প্রেমিক কোথায়!

প্রেমিক, এখন জানি, গোপন দৃশ্যের চোরাগলি

নিজেই সযত্নে জ্বালে লণ্ঠনের কুটিল হেঁয়ালি,

যদি দেখা যায়, তবে ― যারা ছিল দৃশ্যে অনাহত

তারাও তির্যক, খল, এমন কি ― আলিঙ্গনরত ।।

[প্রথম প্রকাশ: ১৩৬৪ /১৯৫৭]

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়
দুটি কবিতা

ক্ষণ

আমার ও আমার মায়ের জন্মলগ্ন ছিল কোনো এক
অপরাহ্ন চৌঠা মাঘ পড়ন্ত রোদের প্রান্তদেশে
সুদীর্ঘ স্মৃতির ছায়া যেখানে তির্যক হ’তে হ’তে
ঈষৎ সোনালি রঙ…তখনই জলঘড়ি থেকে টুপ্…
শব্দের তন্মাত্র হয়ে প্রথম খসেছে তারও আগে
আকাশ বিজ্ঞানশূন্য, তুমি আমি কিছুই ছিল না।

কালগণনার সেই সূচনায় যে আদি পুরুষ
তিনিই আমার বাবা। অবিকল তাঁরও জন্মক্ষণ
অপরাহ্ন চৌঠা মাঘ…তারও আগে মহানাস্তি, কোনো
দুপুর ছিল না আদি বিশ্বান্ বীরভূম থেকে এই
প্রকৃতি ও প্রাণীকূল, বৃক্ষরাজি, বায়স, চড়ুই
কোকিলাদি নানা পক্ষী নিচে ধূলি ধূসরিত পথে
কতিপয় অজ, গাভী, সারমেয় তথা চতুষ্পদ
শিশু বিশ্ব- সেও তার আপন রিঙ্গন লীলা কাল
পার হচ্ছে ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিয়ে কোনো এক
চৌঠা মাঘ, তেরশত বাষট্টি বঙ্গাব্দ অভিমুখে।

১৪ই ফেব্রুয়ারী, ২০২১
কলকাতা

সান্ধ্যগীতি

রাধিকাপ্রসাদ গীত বিস্মৃত সে সুর
ঝিঁঝিট-খাম্বাজ নাম, গ্রাম বিষ্ণুপুর।
আষাঢ়ে বরষা শুরু গুরু গুরু ধ্বনি
শ্রাবণে মৃদঙ্গ মেঘে মধুর শাওনি-
কল্যাণে মুখর শুনি মনে বনে কোণে
কে বাজায় মত্তবাঈ সান্ধ্য গ্রামোফোনে!
ভাদর তালের মাস পুষ্করিণী পাড়ে
আড়ে এক তাল কান্ড ঈষেৎ কুঁয়াড়ে
যখন পড়েছে সমে উথাল পাতাল
চক্রদায় ঢেউগুলি দেখি ক্ষণকাল
বৃত্তাকারে আসে যায়…কালক্রমে স্থির
পুকুর। উপরিতলে তখনো স্থবির
বাঁকানো তালের ছায়া, বাঙালার সাঁঝ
খঞ্জনী বাজিয়ে ধরে ঝিঁঝিট খাম্বাজ।

৯ই নভেম্বর, ২০২০
কলকাতা


গৌতম বসু

শিরোনামহীন

ভোরের জিজ্ঞাসা এসে বসল বড় চেয়ারটার পিঠে,

জায়গাটি তত পছন্দ হল না বোধহয়, উড়ে গেল

সামনের বাড়ির টঙে। মনে হল সেখানেও, অতীব

অস্থির চিত্তে কয়েক অচল মুহূর্ত কাটাবার পর

ফিরে এল আবার, আমাদের বারান্দার কালো রেলিঙে;

আমি তাকে স্বাগত জানালাম, ঠিক যেমন করা হত

পূর্বে, এক ঘটি জল, গামছা হাতে গৃহস্থ দাঁড়াতেন।

কিছু বললাম না, কারণ বলবার মতো বাক্য নেই,

সেও কইল না কিছু, কারণ আমার বোধের অধীন

কথায় তার রুচি নেই। নৈঃশব্দ্য বিনিময় করলাম।

এবার জগৎসংসারের প্রবেশ, আগে নিতাইয়ের

‘দুধ-দৈ-পনির-ব্রেড!’, তারপর আমাদের নিচ দিয়ে

অবিরাম ধারায় বয়ে চলল, মুখ হাঁ-করা, সরব,

অর্থচিন্তাক্লিষ্ট, অন্নচিন্তাক্লিষ্ট, অলসচিন্তাপীড়িত

এই পৃথিবী। বারান্দায় প’ড়ে রইল ভোরের জিজ্ঞাসা।

গৌতম চৌধুরী
তরঙ্গপ্রায়

১.
ফাঁকা মাঠ। বালকের দিনভর যত্নে পরিপাটি কুটির উঠিল শূন্যে। সন্ধ্যায় তাহাতে আগুন। সকল শ্রম ও কল্পনা দাউদাউ। ছাইমাখা উল্লাসের শিয়রে তারা, একটি দুটি। মনও যদি এইরূপ। ঘুম ও জাগরণের মিশ্র এলাকায় নদী আসে। সে চঞ্চল, তবু উদাসীন। তাহার বার্তাও ওই বালকের প্রায়।
রাত্রি ঘন হইয়া ময়ালের মতো গিলিতে আসে। তাহা কোনও ভয়ঙ্কর প্রস্তাব নয়। ভোরে সে উগরাইবে, অক্ষত। আলো তখন রাঙা। সকল খেলার শুরু। সকল খেলাঘরের।

২.
ভাষাই বেচারাদের একমাত্র সম্বল। সেই অসহায়তায় হাসিয়া খুন ভাষা-উত্তর অস্ত্রবণিকেরা। মরা গাছের ছবিতে, কেহ ভাবে নিঃসঙ্গতার কথা। কেহ বা টের পাইতে চায়, কতটা মাথার ঘাম পায়ে ফেলিলে কত আঁটি লকড়ি মিলিবে। দিনান্তের অন্নসংস্থান হইবে। চাঁদের কলঙ্ক লইয়াও তথৈবচ। কেহ ভাবে, কী নির্লজ্জ, ভিখারিপনার একশেষ। কেহ হিসাব করিতে নেয়, গর্ত ভরাট করিতে কত গাড়ি মাটি লাগিবে, পড়তায় পোষাইবে কি না। এমন বেহুদা পাষাণ-দাঁড়ি লইয়া কি আলোচনার টেবিলে বসা যায়? জনপদের বুকে-পেটে দুরুদ্দাম বোমা ফেলিয়া দেওয়া ঢের সহজ!
আর সেই যে মানুষ, বিশাল আসমানের নিচে বিন্দুবৎ অস্তিত্ব লইয়া জেরবার। সেই যে মানুষ, গাছের বাকলে বাকলে এশেকের প্রতিশব্দ খুঁজিয়া হাল্লাক। ভাষার ভিতরেই দুইচোখ-বাঁধা সাঁতার। হাসি মশকরার তরঙ্গ মাথার অনেক উপর দিয়া। বোমা-বন্দুক কী সাহায্য করিবে? ভাষা-উত্তর যে আসলেই ভাষাহীন!

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়
দুটি কবিতা

অকূল

–ঘর ছিল কখনো কি?
–উঁচু কেয়াঝোপ,
নয়ানজুলিতে পাতা হয়ে ভেসে থাকি

–মর্মর ছিল?হাস্কি শব্দ উঠেছে ঝাউগাছে?
–নুনের বাতাস চেনা দিয়ে বলে সমুদ্রও কাছে

– আসবাব? ছেলেমেয়ে?
–সূর্য ডুবেছে চাঁদ বহে গেছে লজ্জার মাথা খেয়ে

–কান্না শোনোনি মানুষের? ঘুম ভাঙলেই মরে যায়…
–পাথর হইনি স্রেফ ভয়ে,পাছে শেওলা জমবে গায়

–গান, গেয়েছিলে কার জন্য?
–বেঁচেছি! বেঁচেছি! বহুবার। কিন্তু সে গল্প অন্য

আদর

দ্রুত, কবিতার থেকে আঁচল সরিয়ে নেব
মাতৃভাষার খাতিরে।
সে রোদজল খাক। প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা পাক।
তাতে লাবণ্য বাড়ে।
অজানা গয়না ওঠে গায়ে।
শুধু অবহেলা এলে,
ওকে পায়ে ঠেলে দিতে গেলে,
অনুকম্পার মুখে থুতু দিক বাংলাভাষা

দীপক রায়
দুটি কবিতা

ঝড়

উত্তর দিক থেকে
কখন যে একটা ঝড় ধেয়ে আসবে
আর কোথায় যে সে নিয়ে যাবে আমাদের

সকালে ক’মুহূর্ত ভাবি
আর শুরু করি কাজ
সারাদিন মনে পড়ে না তাকে
বেলা পড়ে এলে আকাশের দিকে তাকাই
কী জানি কখন সে আসবে
কবে সে আসবে ?

কাজে মন দিই ।
যে কাজ লাগে না কারো কাজে – মন দিই …
বেলা পার হয়ে যায় গো,
বেলা পার হয়ে যায়
— কে জানায়।

আমি যে ঝড়ের কথা ভাবি
আমি যে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবার কথা ভাবি
তা কাউকে বলি না ।
অজানা ঝড়ের কথা কাকে বলা যায়…

সবাই জানে ঝড় আসবে
কিন্তু ঝড়ের কথা বলে না কেউ।
সবাই কাজ করে আর আকাশের দিকে তাকায়।
সবাই ওই অজানা ঝড়ের কথা ভাবে।

কাউকে বলে না কিছু
বলতে ভয় পায়

আজ কোনো কাজ নেই

আজ কোনো কাজ নেই। চল ঘুরে আসি।
কোথা যাবে? এতো ভেবোনা’ত । চল, গাড়ি বল , বড়ো গাড়ি । যাতে সাত আট জন যায়।
চল অযোধ্যা পাহাড়ে। পাহাড়ের বাঁকে
কত বুনো ফুল আর কুল পেকে আছে
গাছে গাছে। পাকে আর ঝরে পড়ে যায়।

ওই দ্যাখো পাহাড়ের ঝর্ণার জল।
ঝর ঝর করে নেমে আসে।
পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে কত কথা
কত কলরব কত নীরবতা
আটকে আছে খাঁজে খাঁজে।
যেতে যেতে কত বেলা হয়ে যায়।
এবার থামাও গাড়ি । এইখানে
পান্থশালা আছে। পাইস হোটেল আছে।
এখন ঠান্ডা আছে। শীত শীত করে ।
ভাত ডাল আলুভাজা আর ডিমকারী ।
এই তো অনেক হল।
কাল পূর্ণিমা। বড়ো সড়ো চাঁদ উঠল আজ
পাহাড়ের গায়ে।

পাহাড়ের গায়ে কারা সার সার শুয়ে আছে।
হিম পড়ে পাতা ভিজে যায়।
ঘাসের ওপর হিম পড়ে।
কেউ যেন জানলার পাল্লা ধরে বলে গেল
ভয় নেই ঘুমোও এবার । কাল ড্যামে যাবে।
হরেক রকম বাঁধ আর অরণ্যের রহস্যের মধ্যে দিয়ে ঘুরে ঘুরে নেমে যাবে কাল
পাহাড়ের নিচে।

হিসেব নিকেশ গুলো ফেলে দিও ওই বড়ো
ঝর্ণার নিচে।
রহস্যের কথা বোলো বন্ধুদের সাথে।
যে অচেনা মেয়ে বারবার তোমাদের গাড়ির সামনে চলে এসেছিল
বোলো তার কথা।

স্বগতোক্তি,প্রণয় দিবসে
বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়

ওষ্ঠহীন ঠোঁট থেকে ঝরে পড়ে নিঃশব্দ কুয়াশা
চুল গাঢ় অন্ধকার,মুখ তার অতীতে ফেরানো
অসংখ্য প্রেমিক যার, দেবতা ও মেধাবী দানব
কী যেন সে বলেছিল,মনে নেই অর্কিডের ভাষা

একদা আদর করে খুলেছিল সাধের বৈঠাটি
ঘূর্ণিজল স্রোতস্বিনী ভেসে যায় কলঙ্কের টিপ
একটি অলঙ্ঘ যাত্রা, আমি এক সামান্য নাবিক
নিছক মাংসের লোভে পাড়ি দিই সূদূর নৈহাটি

পাড়ি মানে নিরুদ্দেশ,খাড়ি মানে এসে গেছি,নামো
প্রণয়দিবস জুড়ে হাহাকার,সরস্বতী ঘুড়ি
যে আকাশে একদিন, আজো যেন মনে মনে উড়ি
তুমি যেন রাজহংসী, আমি রূপকানা ও বামন

মেঘের আড়াল থেকে কণ্ঠ বলে,ভালবেসে সখী
লিখে রাখি অনুতাপ, সামান্যের শেষ সলিলকি

নিবন্ধ
তৃষ্ণা বসাক
ভাষাসুনামি আসছে

ভাষাসুনামি আসছে। চারপাশে একবার সন্ত্রস্ত চোখ বুলিয়ে গলা নামিয়ে কথাটা বলেছিলেন মণিপুরী ভদ্রলোক, কুলমণি সিং।। কী জানি কেন একদম বেখাপ্পাভাবে মনে পড়ে গেছিল ‘পদিপিসির বর্মিবাক্সের’ অবিস্মরণীয় সেই লাইন ‘চোপ ইডিয়ট! দেখছিস না চারদিক থেকে অন্ধকারের মতো বিপদ ঘনিয়ে আসছে? রক্তলোলুপ নিশাচরেরা যাদের পিছু নিয়েছে তাদের কি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করা শোভা পায়?’ মুহূর্তের মধ্যে গা ছমছমে একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছিল ওই একটা কথায়।
কেন এত বিপন্ন বোধ করেছিলেন ভদ্রলোক? আসলে এ বিপন্নতা তাঁর ভাষিক অস্তিত্বের বিপন্নতা। কিন্তু মণিপুরী তো বিপন্ন কোন ভাষা নয়, অষ্টম তফশিল ভুক্ত অন্যতম মণিপুরী, তাতে গল্পগাছা করার, লেখার, সাহিত্য রচনা করার লোক যথেষ্ট। এ তো বিকিয়া ভাষা নয়, যে ভাষায় কথা বলেন ক্যামেরুনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফুরুবানার একটিমাত্র নারী। ভাষার ভুবনে কী ভীষণ নিঃসঙ্গ তিনি, তাঁর সামনে কী ভয়ঙ্কর ভবিষ্যত, যখন তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বিকিয়া ভাষাটি, ত্রিভুবনে তার কোন অস্তিত্বই থাকবে না। আমরা জানি, পৃথিবীতে প্রতিদিনই এরকম কত ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, কত ভাষা এগিয়ে যাচ্ছে বিলুপ্তির পথে। ক্ষমতাবানের ভাষার দাপটে ছটফট করছে আরও কত ভাষা।
আর ভাষিক নিঃসঙ্গতা যখন স্বেচ্ছানির্বাচিত হয়? মনে পড়ে গেছিল সেই কিশোরীকে। স্কটল্যান্ডের স্কুলপড়ুয়া সেই কিশোরী, যাকে ক্লাসটিচার রচনা লিখে আনতে বলেছিলেন গরমের ছুটি কেমন কাটল, এই বিষয়ে। টিচারের কথা মোটেই অমান্য করেনি সেই মেয়ে, রচনা লিখে ঠিক সময়েই সে জমা দিয়েছিল। কিন্তু তা দেখে তো টিচারের আক্কেল গুড়ুম! কারণ আগাগোড়া রচনাই সে লিখেছিল এস এম এস সঙ্কেতে। টিচারের বিমূঢ় প্রশ্নের জবাবে সে বলেছিল মাতৃভাষা গেলিক বা ইংরেজির চেয়ে এই সংকেতেই সে বেশি স্বচ্ছন্দ।
এ কথা এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই, এখন তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই যে দেশের অধিবাসী, তার নাম সাইবারস্পেস, সেখানে তারা সিটিজেন নয়, নেটিজেন। তাদের নতুন ভাষার নাম ইমোটোকন বা স্মাইলি। এসবই তাদের মাতৃভাষার জায়গা নিচ্ছে। এই বৈদ্যুতিন বিস্ফোরণের ধাক্কায় ভাষা বিপন্ন কিনা সেটা অবশ্য অন্য আলোচনার বিষয়। মণিপুরী ভাষার মূল সমস্যা কিন্তু তা নয়।
বাহন ছাড়া যেমন দেবদেবীদের চেনা যায় না, তেমনি ভাষাকে চেনার অভিজ্ঞান হল লিপি। এই লিপি যেমন ভাষার লিখ্য, মুদ্রিত মাধ্যমে চলাচলের পথ সুগম করে, আবার অন্য ভাষাভাষীর প্রবেশের পথে সঙ্গিন উঁচিয়ে পেয়াদার মতো দাঁড়ায়, সেই পেয়াদাকে এড়িয়ে ভাষার অন্দরমহল তো দূরের কথা, বারদালানে ঢোকারও জো নেই। কারণ মুখে মুখে শুনে শুনে অচেনা কোন ভাষায় বেশ কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়, তাতে মাছের বাজারে দরদস্তুর করা চলে, প্রেম নিবেদন করা যায় কিংবা আচ্ছা করে কাউকে দুকথা শুনিয়ে দেওয়াও যায়, কিন্তু লিপি না জানলে লেখাও যায় না, পড়াও যায় না। যেমন ওড়িয়া ভাষা শুনলে মোটামুটি বোঝা যায় কী বিষয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু ওড়িয়া লিপি আমাদের কাছে দু র্ভেদ্য। এর ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে মণিপুরীর বেলায়। মণিপুরী ভাষার একবর্ণ না বুঝতে পারলেও, এর লিপি আমরা (অর্থ না বুঝেই অবশ্য) গড়গড় করে পড়ে যেতে পারব। কারণ মণিপুরী লেখা হয় বাংলা লিপিতে। অর্থাৎ ভাষা মণিপুরী কিন্তু লিপি বাংলা। বরাবর কিন্তু তা ছিল না।
মোটামুটিভাবে বলা যায় খ্রিস্টিয় অষ্টাদশ শতক থেকে মণিপুরী ভাষার বাহন হয়ে এল বাংলা। তার মূল কারণ মহারাজ ভাগ্যচন্দ্রের রাজত্বকালে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রসার, যা বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলা লিপিকেও আত্মীকরণ করল, বাংলা লিপির আরও রমরমা হল উনিশ শতকের শেষ দিকে , ব্রিটিশ রাজত্বকালে।ব্রিটিশের হাতে স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে নিজের লিপির অধিকারও হারাল মণিপুর। সাহেবরা স্বচ্ছন্দ বোধ করল ইতিমধ্যেই পরিচিত বাংলা লিপির মাধ্যমে শাসনকাজ চালাতে। তাছাড়া শ্রীরামপুর মিশনে বাংলা হরফের নির্মাণ নিশ্চয় এই উদ্যমে ইন্ধন জুগিয়েছিল। যার ফলশ্রুতি হিসেবে এল বাংলা লিপি, পেছনে পড়ে গেল এ যাবত প্রচলিত লিপি মৈতৈ। আর তার দু শতকেরও পরে মণিপুর সরকারের ঘোষণা- মণিপুরে পুনঃপ্রবর্তিত হবে মৈতৈ বাংলার বদলে। আর সেখানেই কুলমণি সিং-র বিপন্নতার শুরু।
এই মৈতৈ লিপির উৎস খুঁজে পেতে আমাদের একটু পুরাণ আর একটু ইতিহাসের দ্বারস্থ হতে হবে। রাধাকৃষ্ণের রাসনৃত্য দেখে পার্বতীর সাধ হয় তিনিও শিবের সঙ্গে ওইরকম যুগলে নাচবেন। কিন্তু তাণ্ডবে অভ্যস্ত নটরাজের প্রলয়নাচন সহ্য করার ক্ষমতা কোন সমতলের আছে? তাই অনেক খুঁজে পেতে উত্তর-পূর্ব ভারতে হিমালয়ের দক্ষিণে একটি জলাশয় পছন্দ করলেন মহাদেব। তাঁর ত্রিশূলের এক খোঁচায় নালা দিয়ে সব জল বেরিয়ে তৈরি হল বিশাল সমতলভূমি, কেবল একপাশে রইল একটি হ্রদ। হরগৌরীর সেই নাচের মঞ্চ নাকি আজকের ইম্ফল (মণিপুরের রাজধানী) আর সেই হ্রদটি লোকতাক হ্রদ। এই পুরাণকথা আমাদের মনে করিয়ে দ্যায় মণিপুরের ইতিহাস বড় কম প্রাচীন নয়। আর মণিপুর নামটিও তো হালের। এর আদত নাম সনাপুং, মতান্তরে সুবর্ণভূ যার মানে সোনার দেশ। যে দেশের জাতি, ভাষা ও লিপি মৈতৈ নামেই পরিচিত। কেউ বলেন মৈতৈ মানে তাদের থেকে মানে অন্যান্য পার্বত্য উপজাতি থেকে, আবার কারো মতে শব্দটি এসেছে মইনা তইরপ্পা থেকে যার মানে সূর্য থেকে অবতরণ।
কত পুরনো এই লিপি?যেকোন ভারতীয় ভাষার থেকে এই ভাষা ও লিপি প্রায় এক থেকে দেড় হাজারেরও বেশি পুরনো, এমন প্রমাণ আছে। প্রথমে এই লিপিতে অক্ষর সংখ্যা ছিল আঠেরটি, স্বরবর্ণ ছিল না। কেমন লেগেছিল মণিপুরীদের, যখন এত পুরনো, এতকালের অভ্যস্ত একটি লিপিকে হঠিয়ে তাঁদের ভাষার বাহন করা হয়েছিল বাংলাকে? এ যেন বহুকালের চেনা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে একজন দেখলেন সবকিছু আমূল বদলে গেছে। ছোট বাড়ি ভেঙে বহুতল, দোকানের জায়গায় শপিং মল, মোড়ের যে দোকানটা থেকে সিগারেট কিনতেন তার জায়গায় একটা মোবাইল কিয়স্ক। প্রতিপদে হোঁচট খেয়ে, ঠিকানা খুঁজে না পেয়ে ফিরে আসতে হল অগত্যা। মৈতৈ থেকে বাংলা লিপিতে বদলের সময় ঠিক এই ব্যাপারগুলোই ঘটেছিল। তারও বেশি। কারণ লিপি বদলালে ব্যবহারিক সমস্যার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে ভাষিক অস্তিত্বের সংকটের প্রশ্ন। প্রখ্যাত দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার যাকে বলেছেন যেখানে ভাষা, সেখানেই বিশ্ব, অর্থাৎ ভাষার ভিত্তির ওপর অস্তিত্বের সমগ্র ধারণা দাঁড়িয়ে আছে।
এবার অনুভব করা যাচ্ছে কুলমণি সিংর আতঙ্কের চেহারাটা?তিনি সঠিকভাবেই আঁচ করতে পেরেছিলেন আবার লিপিবদলের আঘাত মণিপুরী ভাষাবিশ্বে কীভাবে নেমে আসবে, ক্রমে তা নেবে সুনামির চেহারা।
হঠাৎ লিপি বদলে গেলে কী হয়? মানে স্কুল কলেজ অফিস আদালতে, লেখা ও প্রকাশনায়, টিভির সাবটাইটেলে সামগ্রিক বদল হলে? প্রথমত পুরনো লিপিতে অভ্যস্ত পুরনো প্রজন্ম আক্ষরিক ভাবেই হয়ে যাবেন নির্জন দ্বীপবাসী, তাঁরা বর্তমান লিখিত মাধ্যমের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলবেন। দ্বিতীয়ত নতুন লিপিতে পঠনপাঠনে অভ্যস্ত তরুণ প্রজন্ম পুরনো লিপিতে লেখা সাহিত্য পড়তে পারবে না, তারা শিকড় থেকে উৎখাত হবে অজান্তেই। যেখানে এখন প্রায় প্রতিটি ভারতীয় শিশুকে মাতৃভাষা ছাড়া ইংরেজি তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে হিন্দীও শিখতে হয়, সেখানে তার ওপর তারই মাতৃভাষার পুরনো লিপি চাপানো অসম্ভব এবং অবাস্তব। তৃতীয়ত পুরনো লিপিতে লেখা বইপত্র ইত্যাদির বৈদ্যুতিন ডেটাবেস তৈরির বিপুল চাপ ঘাড়ে চাপবে। অথচ তা না করা গেলে রাশি রাশি ছাপা বই ও পুঁথিকে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন এবং গবেষক ছাড়া অন্য কারো কাছে তার মূল্যই বা কতটুকু?

এইরকম রাশি রাশি ধূলিধূসর বই আর পুঁথির দেখা পেয়েছিলাম ললিত নারায়ণ মিথিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের (দ্বারভাঙ্গা) লাইব্রেরিতে। মৈথিলী ভাষার বই, পুঁথি কিন্তু এখন ওই লিপি প্রায় কেউই পড়তে পারেন না। বর্তমানে মৈথিলী লেখা হয় দেবনাগরী বা হিন্দী লিপিতে। আগে তা লেখা হত মিথিলাক্ষর বা তিরহুতিয়া লিপিতে, যা হঠাৎ দেখলে বাংলা বলে ভুল হতে পারে। এতটাই মিল। এই লিপিকে সরিয়ে এল হিন্দী। কেন? অদ্ভুত সেই কাহিনি।
মৈথিলী রাজারা বরাবরই শিল্পসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক, কিন্তু তাঁদের পক্ষপাত সংস্কৃতের ওপর।রাজদরবারে মৈথিলী চিরকালের উপেক্ষিতা। যখন হাতে লেখা পুঁথির যুগ শেষ হয়ে ছাপাখানা এল, তখন প্রয়োজন হল তিরহুতিয়া বা মিথিলাক্ষরের ধাতব হরফ ঢালাই করার। কিন্তু সেই কাজ করার মতো পরিকাঠামো নাকি তৎকালীন মিথিলার ছিল না। তাই হাতের কাছে পাওয়া দেবনাগরী হরফেই ছাপা হতে লাগল মৈথিলী। তিরহুতিয়া থেকে গেল প্রাচীন পুঁথিপত্রের হলদে হয়ে যাওয়া পাতার আড়ালে, কবে কে এসে ধুলো ঝেড়ে হাতে তুলে নেবে তার অপেক্ষায়। বৈদ্যুতিন ডেটাবেসে সংরক্ষণের অভাবে কত যে অমূল্য সম্পদ হারিয়ে যেতে বসেছে তার ঠিকঠিকানা নেই। তিরহুতিয়া লিপিতে অভ্যস্ত মৈথিলী লেখকরা বাংলা পড়তে পারতেন স্বচ্ছন্দে, মূল থেকে তাঁরা পড়েছেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, পরশুরাম। সেখানে তরুণ প্রজন্ম বাংলার ঘনিষ্ঠ সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, লিপির বদল ছোট করে দিয়েছে তাঁদের ভাষাবিশ্বকে।
ঠিক এই পরিণতির পথেই হাঁটছে মণিপুরী ভাষা এবং ভাষাকেন্দ্রিক সমাজ-সংস্কৃতি। স্মরণকালের মধ্যে দু-দুবার ভাষাবদলের অভিঘাত কি সামলাতে পারবে এই ভাষা? ভাষাবিশ্ব ছোট হয়ে আসার প্রতিবাদ কি শোনা যাবে মণিপুরে, যেখানে অসাধারণ এক প্রতিবাদ দেখেছি আমরা? যখন ধর্ষিতা মনোরমার জন্যে নগ্ন হয়ে পথে নেমেছিলেন মায়েরা, তাঁদের লজ্জানিবারক একটি ব্যানারে লেখা ছিল ‘এসো, ধর্ষণ করো’।
নারীর মতো ভাষাও ধর্ষিতা হয়ে চলেছে নিয়ত, প্রকাশ্যে বা গোপনে। প্রতিবাদ কিন্তু থেমে নেই। আমরা অনেকেই হয়তো জানি না যেখানে এদেশে মৈথিলী ভাষায় কথা বলেন উত্তর-পূর্ব বিহারের ২৬ টি জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষ, সেখানে পড়শি দেশ নেপালের প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ মৈথিলীভাষী। নেপালের দ্বিতীয় প্রধান ভাষা মৈথিলী। পৃথক মিথিলাঞ্চল ও মৈথিলী ভাষার অধিকার রক্ষার জন্যে তিন দশক ধরে সেখানে আন্দোলন চলছে। কয়েক বছর আগে নেপাল- বিহার সীমান্তে সেইরকম একটি প্রতিবাদী ধরনায় বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। প্রাণ হারান চারজন, যাঁদের অন্যতম উদীয়মান অভিনেত্রী ও সমাজকর্মী রঞ্জু ঝা। সেই ভাষাশহিদদের প্রণাম।

ওবায়েদ আকাশ
দুটি কবিতা

বাড়িতে আছেটা কী

আবার তোমার জন্য গাছ
ডাল থেকে পাতা খসিয়ে প্রশান্তি খসিয়ে
অন্যের জন্য গোছগাছ রকম একটা কিছু না দেখালে
নাম উঠবে কেন বাড়ির

পাতাবাহার যে আছে, ডেটল নেই
দাম্পত্য নেই, সন্তানের দুঃখিনী বায়নার মতো
যে অবিশ্বাস্য স্নেহটুকু ঘোড়ার লাগাম ধরে উঠোনে
ঝুলে থাকবার কথা, আজ অন্তত সেটুকুও
ক্যারিবীয় দস্যুবাহিনি ঘিরে নির্মিতব্য চলচ্চিত্রের ভাষায়
দুর্বোধ্য সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে

আছেটা কী, বাড়িতে এপিটাফ ভেঙে
গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে জল উঠে আসছেÑ
১৯৭৭ সালে মায়ের মৃত্যু সংবাদ, ’৯০ সালে
স্বৈরাচারের হাড়ের ভেতর দিয়ে সুঁই ঢুকিয়ে
মালা গেঁথে গবাদিকণ্ঠে ঝুলে যাবার মতো কিছুই তো
বিছিয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছে না শিশুরা

২০১৩, ব্যক্তিগত শল্য চিকিৎসার আগে
মা মা করে যতটা না, সন্তানের ফ্যালফ্যাল চোখের দিকে ততোধিক
তাকিয়ে সেই কবেই না বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল রাস্তায়

এখনো রাস্তার ডাকেই ঘুম সুখ দুর্ভাবনা ইত্যাদি জড়িয়ে
বাড়ির সঙ্গে চিঠিপত্র চালাচালি হচ্ছে

আর বাড়ি একটা শিমগাছের পাতায় প্রতিদিনের
দৈব দুর্যোগ-সম্ভাবনাগুলো ছড়িয়ে দিয়ে
যে কোনো আনুষ্ঠানিকতায় দুচার জন প্রিয় মানুষের
সাক্ষাৎ উপস্থিতির অপেক্ষায় থাকে

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প

বারান্দায় সিঁদ কেটে চুরি হয়ে গেছে আমার প্রিয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্পের বইটি। তাতে আমার কোনো হাত নেই। কেননা, এ বইয়ের একটি গল্পও যখন পড়া ছিল না, তখন একদিন হারানের নাতজামাই ছোটবকুলপুরের যাত্রীদের কাছে নিয়ে এসেছিল কতগুলো উলঙ্গ টিকটিকির ছানা। আমি তাদের ছোটো ছোটো লেজগুলো ঝরে পড়তে দেখি; দেখি তাদের বিপন্ন নাচানাচি। যারা হাসছে, কাঁদছে আবার এই মতো বিচ্ছিন্নতায় ক্ষুধার জন্য মিছিলে যাচ্ছে, বিপ্ল¬ব করছে… আর সুরক্ষিত এলাকা থেকে তাদের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে নিয়মিত ঠ্যাঙারে বাহিনি; আমাদের প্রিয় মানিক-দা তার কোনো প্রাক-গল্পের ভূমিকায় এ সংক্রান্তে কতদূর কী লিখেছেন, ভেবেছেন সে সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না কোনো!

রাণা রায়চৌধুরী
কিবোর্ডের ছায়ায়

তোমার দেওয়াগুলি আমি গুছিয়ে রাখছি
এই এইই খানে, ঐখানে গুছিয়ে রাখছি
তুলে যত্ন করে রাখছি তোমায় মনে রাখব বলে

তোমার দেওয়াগুলি দেয়ালে টাঙানো
তোমার দেওয়া ‌সব যত্ন ও অবহেলার
আয়োজন বাতাসে নড়ে

মনে পড়ে আমার পাওয়াগুলো চাওয়াগুলো
তুমি মেটাচ্ছ ধীরে জোৎস্না-আলো…

শান্ত সেই প্রবল দেওয়াগলি রোদের ঠোঁটে
উৎসবের মতো আসত

আমি লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে লোভীর মতো
লুফেছি চিরকাল

এখন বিকেল পড়ে এলে তোমার
দেওয়াগুলো রক্তমৃদঙ্গ হয়ে নড়ে চারপাশে


দূর থেকে দেখি তোমায়। আলঙ্কারিক।

পাইনবনের সরলতা।

রোদ। ছায়া। নেপালিবালকের চেয়ে থাকা।

কাছে আসি। সূর্যাস্ত। সূর্যরশ্মির প্রতিধ্বনি।

রাত্রি এখানে গতজন্মের পাঠ্যবই।

ফিরে গেছে যারা তাদের ছায়ায় বসি।

পার্থজিৎ চন্দ

ব্রাহ্মীশাকের খেত

ব্রাহ্মীশাকের খেত থেকে কাটা টাটকা জরায়ু, ভোরবেলা
ঝাঁকা চেপে বাজারে এসেছে। অন্ধ-মা আর বিকলাঙ্গ ছেলের সংসার
বাজারের এক কোণে সংসার পাতা, শিশিরে ভেজানো শাক থেকে
একটি ফড়িং উড়ে গেল। সংকেত প্রসূতিরা একদিন পাড়ায় পাড়ায়
গর্ভবতী হয়ে উঠেছিল, সংকেত সরোবর থেকে উঠে উভচর দু-একটি মানুষ
পায়ে হেঁটে সাইকেলে চেপে টোটো চেপে বাজারে আসছে
কী অসীম রাত্রির মতো স্তব্ধ তাদের মুখ, স্নায়ুতে ঘুরছে ব্রাহ্মীশাকের স্মৃতি
বাজারের নিথর সকালে সংকেত বিনিময় হল –
অবাক-বাণিজ্য থেকে সংকেত-মুদি স্কুটির হাতল ধরে বাড়ি ফেরে
জরায়ু বিষয়ক মা ও বিকলাঙ্গ ছেলেটির কথা প্রকাশ্য দুপুরে
বাজারের আনাচে-কানাচে ঘোরে। এই শান্তবাজারে এই অভিজাত সংকেত-সরোবরতীরে
মা আর ছেলে ব্রাহ্মীশাক মেখে ভাত খেতে খেতে ঝগড়া করছে
আনন্দে ঝুড়ির ভেতরে লাফিয়ে উঠছে টাটকা জরায়ু
সাইলেন্সার পাইপে ঢুকিয়ে ক্লিনিক্যাল ছুরি দিয়ে কাটা হয়েছিল তাকে
আর কিছু পরে থিতু হয়ে যাবে এইসব
পাখিরা ব্রাহ্মীখেতের কাছে থাকে।স্মৃতিধর। তাই তারা গল্প করতে করতে ফিরবে বাসায়
ঝাঁ-চকচকে বিউটি-পার্লারের উপরের ফ্লোরে স্পিচ থেরাপির সেন্টার
সারাটা বিকেল জুড়ে ভাষাহারা সন্তান নিয়ে ক্রুদ্ধ মায়েরা
তার দিকে হেঁটে চলে যাবে

কুন্তল মুখোপাধ্যায়
দুটি কবিতা


রূপকথা

রাক্ষস আসবে আজ এ শহরে । মাচা বাঁধা হচ্ছে । পশুগন্ধ চারিদিকে । আমরা তার আহারের জন্য উৎসর্গ করে রেখেছি আমাদের সেরা সবকিছু । চারদিকে উড়ে যাচ্ছে পালক । গতরাতে রূপান্তরের আনন্দে নতুন দেহ পাওয়ার আনন্দে কিছু বাজি পুড়েছিল ।

আমাদের শহরে যে এত কাজের লোক ছিল আগে জানতে পারিনি আমরা । রক্তের গন্ধ আঁশটে । সেই গন্ধের ভিতর তারা নেমেছে রাস্তায় । রাক্ষসের আগমনের আনন্দে এ শহরে ঢাক ঢোল এসেছে । এছাড়া এসেছে অজস্র বাস ট্রাক আর ছোট হাতি ।

রাক্ষস বক্তৃতা দেবে । হাঁ-করে শুনবে তেত্রিশ কোটি দেবতারা । দেবতা । যাঁরা পেয়েছেন দুপুরের ভাতের লম্বা একটা প্যাকেট। দেবতা। যাঁরা পেয়েছেন জন প্রতি একশ করে টাকা।


পিয়েতা

নিজের মৃতদেহ কোলে করে মঞ্চে উঠলেন আপনি । কবিতা নিয়ে অনেক কথা বলছেন । আহা আপনার কোলে আলো করে আছে আপনারই মরদেহ। মৃতদেহের মাথার পিছনে দ্যুতি । আপনি বাঁচার ভান করছেন ,চারিদিকে পোড়া গন্ধ ,নক্ষত্রের মৃত্যুর ।

এই আলোকিত শব্দবাজির মধ্যে আসলে আপনি খুঁজেছেন গুপ্তধন, যা নৈঃশব্দ্য দিয়ে তৈরি … এই প্রখর আলোর মধ্যে আপনি খুঁজেছেন গভীর পাথর , আপনার বন্ধু , ইতিহাস । এই মঞ্চের নীচে আপনি জানেন লুকিয়ে আছে নিষ্ঠুর রাজ্যের সমস্ত তলোয়ার । মুগধ হয়ে সবাই শুনছে আপনার বহুবচন ।

শুধু আপনার মৃতদেহ আর আপনাকে দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি আমি

অবিন রায়চৌধুরী
দুটি কবিতা

সমীকরণ

π -এর মানকে ২২/৭ ধরে নিতে হয়।২২ কে ৭ দিয়ে ভাগ করলে দশমিকের ডানদিকে সংখ্যা বেড়েই যাবে,বাড়তেই থাকবে ক্রমশ…তেমনি একটা মানুষকেও শেষ পর্যন্ত ধরে নিতে হয়।তাকে ভাগ করে দেখলে সময় পেরিয়ে যাবে,সমীকরণ জটিল হবে অযথা কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো পূর্ণমান পাওয়া যাবে না…


নীল দিগন্তের সমুদ্রে

জানালায় এসে বসেছে আশ্চর্য এক তিরতিরে ভ্যালেন্টাইন,আমি ওর ডানায় হাত বুলিয়ে দিই, ও আমায় উপহার দেয় নিস্তব্ধ এক দুপুর,আমি ওই দুপুর সারা বিছানায় পেতে শুয়ে পড়ি,আমি ওকে শোনাই আমার হারিয়ে যাওয়া রূপকথার গল্প,ভ্যালেন্টাইন আমার গল্পটুকু ঠোঁটে নিয়ে উড়ে যায় ছায়াপথের দিকে,আমি দেখি—আমার হারিয়ে যাওয়া রূপকথা লাফিয়ে উঠছে,ঝাঁপ দিচ্ছে নীল দিগন্তের সমুদ্রে…


দেবাশিস দাশ


বাগীশ্বরী উপচার

চিরতরুণ কবিকে

কী কথা লেখার আছে? সুজীবন ছাড়া
তোমার ভেতরে মায়াবিশ্বের ইশারা
অর্থহীন। তাই তুমি প্রকাশের খোঁজে
ডুবে মরো প্রতিদিন, কঠিনে সহজে।

কী কথা লিখতে হবে? মৃত্যু পার করে
মহামানবতা নেই তোমারও ভেতরে?
সেই মানবতা থেকে বিচ্ছুরণ তুলে
তুমি মন লিখে যাও, অসামর্থ্য ভুলে।

কী ব্যথা লেখার ছিল? জন্মেছিলে তুমি
উল্কা-গ্রহ-তারাপীঠে… বাংলা ছায়াভূমি
তোমাকে লালন দিয়ে হৃদিমাতৃকতা
ঢালে আজও। জেনো শুধু এ-জলজ কথা।

সেই আলো, সেই জল, সে-হাওয়া, সে-মাটি
অনুবাদ করে লেখো জন্ম পরিপাটি।

চাম্বুল কাঠের নৌকো

একাকিত্ব ঠেলে-ঠেলে কতদূর ভেসে যাব আর?
চাম্বুল কাঠের নৌকো যেন তীব্র মানুষজীবন!
গহন গম্ভীর ভবনদীর উজানে চলে কত-কত লাশ।
যেভাবে পরানমাঝি দাঁড় বায় অকূল স্বভাবে,
যেভাবে পাথর নিয়ে অভিশপ্ত জেদি সিসিফাস
নির্ধারিত কর্মমার্গে আকাঙ্ক্ষাকে ঠ্যালে লাগাতার,
সেভাবে চলেছি আমি, মেলোডি, তোমার সঙ্গে একা।

অহঙ্কার থেকে দূর স্রোত টানে ভাটিয়ালি মন…
উপসাগরীয় জলহাওয়ার আবেগে শুধু শেখা—
বাগীশ্বরী মগ্নতার শেষহারা ওলোটপালোট।

শীর্ষা
বুদ্ধগাছের ছায়ায় দুটি তীরবিদ্ধ হাঁস


ওইখানে বহুদূরে স্থিতপ্রজ্ঞ হাসি
গোধূলির আলো জ্বেলে অপেক্ষা পেতেছে,
বিস্তৃত কপালে যেন ছাত্রবন্ধু লেখা –
চলো ঘুরে আসি। উর্ণনাভের লালা
ঘিরে ধরার আগে, মেরে ফেলার আগে,
চলো মাথা রাখি স্থিরমুণ্ডপায়ে –
উদাসীন বার্ধক্যভাতা হাতে উত্তরীয়
হাওয়া দিক তপ্ত তিক্ত গায়ে


তোমার অসীম প্রবঞ্চনায়
এঁকেছি রাজপুত্র মুখ – মৃত্যুপথযাত্রী দেখে যে
ত্যাগ দিল যত আত্মসুখ, তুমি কি তার কথা
ভেবেছ কখনও?
কাকের মতো অস্নিগ্ধ অপয়া পালক
আমাদের আত্মা থেকে খসে খসে পড়ে রোজ;
শান্ত হাতে সমাধির সুর দাবিয়ে রাখে
বৈকল্যের গান – এভাবেই সূর্য ডোবে, সূর্য
আবার আসে – তোমাদের প্রবঞ্চনা
ছাই হয়ে পড়ে থাকে
সুজাতার পদচিহ্নপাশে


তুমি কি সকলই ছেড়েছ?
দাবানলের গান, পথপাশে পড়ে থাকা সুগন্ধি আঘ্রাণ?
কীট বলো, পাখি বলো, মরু, ফুল-ফল –
প্রকৃতির মুখোমুখি হয়েছ প্রবল?
বহু বহু আত্মা মাঝে এত হাহাকার –
সার্থক বিচার তোমার? এসো, সকলই ছাড়ি,
রক্তমাংস-ক্লেদ-শূন্য নিতম্বহীন বাড়ি,
পূর্ণ থাক মোক্ষ-ত্যাগ-বিরাগপুষ্প গাছে
ওইখানে পাহাড়কণ্ঠে জ্যোৎস্নাধারী শান্তিদেব আছে –
চলো হাত ধরি, জটাজূট পাদস্পর্শে জয়গান করি;
এসো আকাঙক্ষামৃত্যু, এসো লালনের গান,
স্তব্ধ শান্ত বক্ষদেশে হে মহাশ্মশান!
নিত্যপূজা রূপে চলো সাজাই নিজেকে
শূন্যপাত্রে আত্মতুষ্টি শান্তিছায়া মেখে,
বেদনার গাছ – তীরবেগে যাক মুছে যাক
‘তুমি কি সকলই ছেড়েছ’ – আচমকা বুদ্ধকণ্ঠে শুনে,
শান্তিলোভী গৃহীজন অশ্রুসংখ্যা গোনে,
হাহাকারের বিবমিষা নিশ্চুপ অশ্রুসংখ্যা গোনে ..

মৃন্ময় চক্রবর্তী
একুশের কবিতা

ধীরেন্দ্রনাথ — ভাষা বহে নিরবধি

পাখিটা অন্ধ, এখনো আকাশে উড়ছে
ঠোঁটে ছেঁড়া স্বর, ক্ষীণ হয়ে যাওয়া গান
পাখিটা উড়ছে, অস্ত যাচ্ছে আলো
নীচে ভাঙা জমি, হাওয়াজুড়ে ব্যবধান।
পাখিটা অন্ধ, নীচে কাটা ভাষাদেশ
আমরা এপারে নদীটির প্রতিকূলে,
দেখছি ডানায় বেঁধা শ্বাপদের দাঁত
তবুও উড়ছে একা একা দুলে দুলে।
পাখিটার নাম যদিও বাংলাদেশ
পাখিটার নাম যদিও বাংলাভাষা,
খোবলানো চোখ, ওপড়ানো কথা নিয়ে
ভাঙা পায়ে পায়ে হামাগুড়ি দেওয়া আশা।
পাখিটা উড়ছে, ক্ষীণ তারা পশ্চিমে
আমরা দাঁড়িয়ে, ভাঙা দেশকাল নদী
পাখিটা উড়ছে একা একা একা একা
ধীরেন্দ্রনাথ—ভাষা বহে নিরবধি।


ভোরের একুশ, আলোটিমটিম পাড়

প্রতিমার শাঁখা ছড়ানো ছেটানো, ভাঙা
জ্বলে গেছে গ্রাম, জীবন ঢুলির ঘর
পোড়া মন্দির, দেবতা গিয়েছে ভেসে
ভোরের একুশ আলোটিমটিম পাড়
ধূসর হয়েছে কখন বাংলাদেশে।
এদেশে ফজলও ঘুমোয়নি তারপর
নামাজ পড়ছে বুকের ভেতরে ভয়,
কখন যে নাম কেটে খায় ঘুনপোকা।
সে তো কখনোই পাকিস্তানের নয়
আসেনি একুশও গলি ছুঁয়ে ভালোবেসে।
পারবে কি এই আলোটিমটিম পাড়,
বাঁচাবে প্রতিমা, ফজলকে দেবে টোকা?
আমরা তো বোকা, বসে আছি জানালায়
জানালা ক্রমেই হয়ে যায় কারাগার।

উমা মণ্ডলের কবিতা


আঁতুড় ঘর —–

পড়ে আছে আত্মহত্যা , সাদা পাতা আর ঘুমন্ত কলমটি একইভাবে । এইসময়েই ভাটিয়ালি ডাক দিয়ে যায় সেই বরফের শরীরকে । আর কিছু দূরে পাখনায় মুখ ঢেকে কেঁপে কেঁপে ওঠে পাখির শরীর । তার কথা বুঝি বাকি থেকে গেল ……

এই ঘরে সবুজ দেওয়াল ; জানালায় চোখ দিলে আকাশের নীল ঘর বাঁধে তারার গোলার্ধে । তখন ডানার গান , ভেসে যাওয়া সীমাহীন । রূপকথা উঠে আসে ঠোঁটে তারপর গুটি গুটি পায়ে কলমের কথা হয়ে সাদা কাগজের মাঝে ……… তিনতলা , আদরের তিনতলা সর্পিল সিঁড়ির ধাপ ধরে ধরে আকাশকে খোঁচা দেয়

নক্ষত্রের মেহফিলে গজলের স্রোত …… ডিঙি নৌকা ডোবে ওঠে । কলম প্রেমিক জিভ দিয়ে খরা মুছে দেয়। আজ জলের কবিতা হয়ে যাক । রাত , প্রেমিকের রাত হাতছানি যেন ; ইথারের সঙ্কেতে শব্দের জন্ম দেয় । স্ত্রী পাখিটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে । পুরুষ কবিটি চুপ । ইথারের ভাষায় বুনতে থাকে শস্য , হলুদ জীবন

তবু সর্বহারা কলমের কথা মানুষের চোখে কই………কই সেই শূন্য ফেরিওলা কবিতায় যার ঘর । তাই সাদা পাতা , আত্মহত্যা আর ঘুমন্ত কলম ………… অভিমান বলে কিছু নেই এ জগতে । শাবক পাখিটি কেঁপে কেঁপে ওঠে , বুঝি বাকি থেকে গেল তার কথা । গাছেরা জানে পুরাণ ; প্রকৃতির মধ্যে জেগে ওঠে কলমের চোখ চুপিসারে । আবার ঘুমিয়ে পড়ে । বাকিসব মিথ , উপকথা …

অবশিষ্ট —

মৃত্যুকে দিয়েছি রেখে পথের ওপারে । আড়চোখে তবু দেখে নেওয়া। হয়তো গণ্ডিতে বেঁধেছি । ভালো থাকো ভোরের কোকিল সুরে বা আশ্বিনের ঘাসে , শিউলির ঠোঁটে । খড়ের কাঠামো বেয়ে উঠে আসে সরীসৃপ । চুপ থাকো । মুচকি হাসিতে পাশাখেলা । দ্রৌপদীকে হত্যা করে ধ্রুব হয়ে কালপুরুষের নৃ্ত্য মানায় । বিচারে সাজিয়েছ সৈন্য। পুতুলের মতো ঘুরে বেড়ায় ; বন্যের শিশু যেন । সবই তো মায়া , বন্ধকী দেওয়া মন ……… তবু মেয়ে তো , মানুষ তো । বাটখারার খাঁজে খাঁজে রক্তলিপি বয়ে যায় । ঠিকানার পাশে বসা ভৈরবের কপালে তির্যক ভ্রু-ভঙ্গির আকার শিল্পীর চোখে নেশাদেয়

মৃত্যু আঁকে , চিরন্তন ………কালাঅসুখের তৈলচিত্র ঊর্ধ্বতালুতে ঠোক্কর মারে বারে বারে । তিনবার হলো । তবু আরণ্যক রূপ টান দেয় । বাঁধ ভেঙে দলবদ্ধ জল হেঁটে যায় , দূর থেকে দেখে

মৃত্যুকে দিয়েছি রেখে পথের ওপারে ….

মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া
দুটি কবিতা

নদীমাতৃক

ঘুমিয়ে পড়েছি নাকি?
পাথরের অক্ষর ভেঙে দিলো ব্ল‍্যাঙ্কফায়ার
প্রাচীন মিউজিয়ামও ধরে গেল দাউদাউ
গ্ৰন্থ উপচে বৃষ্টি নামল তখনই
জমাজলে দেখি ভেসে পড়েছে নতুন কবিদের লেখা
সূর্যাস্ত তুলে আনতে আজন্মকাল ধরে
জলের পাড় ঘেঁষে ছুটে গেল যারা
ঘড়ির কাঁটার সাথে ঝরে গেল মুঠোভর বালুকণা হয়ে
আর ঘুম ভেঙে একুশের ভোরে
কম্পাস ধ্রুব দিকে ঘুরে গেল আজ
দেখি মাটি ফুঁড়ে ফেরত এসেছে ওরা
হাতে কথাবলা টিয়েপাখি,কলমীলতা
আর অরণ্য ভাষার ডুবো পাথর
ছেঁড়া ম‍্যাপে দপদপ করছে প্রাচীন সূর্যাস্ত
পাথরে নিঃশ্বাস ফেলছে ভাঙা অক্ষর
ভেজা ক্ষত থেকে ধোঁয়া উড়ছে ওদের
হাসছে তবুও, জানে
করোটি পুড়িয়ে দিলেও নতুন কথারা
ফুটে ওঠে আকাশের নীল গম্বুজে
মিনারে বিপজ্জনক ঝোলে পোড়া অ আ ক খ বই
ছাইয়ের ভেতর তার অজস্র প্রাণ ঘুম ভেঙে দ‍্যাখে
কাঁটাতার ডুবে গেছে..জলপথে ঢেউয়ের মাতন
ভোরবেলা আমাদের একই রঙ পাখিগ্ৰাম
কথাদের আলোয়,নিভে যায় দূর আজও
নিভে যায় আমাদের ভুলের ভুবন…

খুঁজে দ‍্যাখো

ঘাসে ঢেকে আছে পথ,ঘুমন্ত মানুষের প্রানে
পথ তুই শুনেছিস কানে?
শোনা নাম?সোনা সোনা নাম…
হাওয়া জানে,হাওয়া সব জানে
ঝরাপাতা- ঋতু ফিরে এলে
পাখিদের কান্না ও গানে
চেনা সব নাম,ঘুরে ফিরে
জিজ্ঞেস করে, আজও জিজ্ঞেস করে
মনে আছে? ভোলোনিতো সেই সব দিন?
কৃষ্ণচূড়ার ক্ষত বুকে নিয়ে রোজ প্রতিদিন
কথা শুধু কথাদের সাথে হেঁটে গেছে দিগন্ত ছাড়িয়ে
শিমুলের লাল ঠোঁটে রেখে গেছে বাতাসের ঋণ
প্রান্তর থেকে আজও দুহাত বাড়িয়ে
চেনা মুখ,চেনা নাম, চেনা সব নদীদের এপার ওপার
যে ভাষা পেরিয়ে যায় রোজ কাঁটাতার
পাপড়ির বনে খোঁজো,খুঁজে দ‍্যাখো বুকের ভেতরে
ঘাসের ওপরে আজও থোকা থোকা নাম,
ঝরে আছে ,ঝরে যায় একুশের ভোরে…

গল্প

গল্পে যা যা থাকতে নেই
চন্দন ঘোষ

বস্তুত গল্পে যা যা থাকে এই গল্পে তা থাকবে না, সেকথা আগেই বলে নেওয়া ভালো। তবে লেখক লোকটা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছিল, অন্য ধরনের কিছু একটা গল্প লিখবে সে। তা অন্য গল্প কি গাছে ফলে? অবশ্য গাছে না ফললেও অনেক সময় সড়সড় করে গাছ থেকে নেমেও তো আসতে পারে। সেই রকমে একটি আস্ত মেয়ে হঠাৎ কী করে জানি তার গল্পে নেমে এল একদিন। মেয়ে যে সে নয়, খুব ডাকাবুকো। তবে এই ডাকাতে মেয়েটার বুকের কোনও ছিরিছাঁদ নেই। অর্থাৎ বোঝানো হচ্ছে যে, তার চেহারাটি তেমন ছম্মকছল্লো টাইপের নয়। তবে কিনা মুখটি পানপাতার মতোই হবে। অন্তত হওয়া উচিত। না হলে গল্পে আর কোনও অনুপান থাকে না।

নায়িকা গাছ থেকে নামলেও নায়ক আর নামে না। নামে না। লেখক বেচারা অনেকক্ষণ থমকে আছে। আগেকার দিন হলে এতক্ষণে দু-চারটে কলম চেবানো হয়ে যেত। কিন্তু দিনকাল পাল্টেছে। তাই লেখক ল্যাপটপের উপরই একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ দুড়ুম করে একটা শব্দ। দেখে ল্যাপটপের মধ্যেই কোথা থেকে টারজানের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে একটা ছেলে। চালচুলোহীন, উস্কোখুস্কো চুল। পকেট ভিতর থেকে বাইরের দিকে উলটে রয়েছে। অর্থাৎ ফাঁকা। প্রেমিকাকে আইসক্রিমটুকুও খাওয়ানোর পয়সা নেই বেচারার।

লেখক তো মহাসমস্যায়। প্রেমটা হবে কী করে তাহলে? মেয়ের রূপ নেই। ছেলের নেই পেটমোটা মানিব্যাগ। অর্থাৎ কেত মেরে প্রেম করতে গেলে যা যা লাগে তাই তো নেই! প্রেমটা আর হয় কী করে? তবু পানপাতাটি কী করে জানি উড়তে উড়তে উস্কোখুস্কো চুলের মধ্যে সেঁধিয়ে গেল একদিন তা লেখকও সঠিক ঠাহর করতে পারল না।

গল্পটা জমবে জমবে করছিল। লেখকও খুশি। ইশ্বর নাকি এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন একদিন আর আমাদের লেখক এইমাত্র একটি প্রেম সৃষ্টি করবে। কী রেলা! কিন্তু গল্পে অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স বলেও তো কিছু একটা চাই। তাই রাষ্ট্র নামক একটা লোক হঠাৎ একটা কাঁটাওলা মুগুর নিয়ে এসে দাঁড়াল। হাতের গুলি ফুলিয়ে বলে, এ প্রেম আমরা মানি না। কিন্তু কেন ভাই, কেন? ওই পানপাতা ছোটোজাতের আর উস্কোখুস্কো উঁচুজাত। পয়সা না হয় নেই, জাত তো আছে! এদেশে এসব আমরা বরদাস্ত করব না। তাই এ প্রেম আমরা মানি না।

অতএব মুগুরের আঘাতে ছেলেটার বুকপকেট থেকে পানপাতাটি টুক করে মাটিতে পড়ে একেবারে থেঁতলে গেল । লেখক আর কিছুতেই তাকে বাঁচাতে পারল না। অতএব প্রেমের গল্পটি শেষ পর্যন্ত বলতে গেলে একেবারে মাঠেই মারা গেল। গল্পে যা যা থাকার কথা নয় তা তা থাকলে গল্প আর জমে কী করে, চাঁদু?

শিহাব শাহরিয়ার
পড়ে থাকে অহংকার

সেই মনডাঙার কথা মনে পড়ে; যেখানে আমরা তুলনা করেছিলাম লাল আর শাদার; সবুজের সঙ্গে নীলের; বেদনার সঙ্গে দুপুরের; তারপর রং আর দুপুর এসে মিশেছিল আমাদের হাঁটু আর বাহুর ভঙ্গিতে। উতলা মনগুলোর স্বভাবই অমন; অতল গভীরে খুঁজতে চায় মনেরই স্বভাব, উজানে ছেড়ে দেয় পাতার ইশারা, ঢেউ-এ ঢেউ-এ অস্থির হয় পাড়ের মাটি। ‘ভাঙন’ না ‘ভাসান’ মানেই জলের পিঠজুড়ে ডিঙিদের উথাল-পাতাল আওয়াজ। আমরা মনডাঙার আকাশ থেকে নৌকাদের বর্ষারূপ দেখি, দূরগুলো চোখে মিলিয়ে যায়। আমরা একদিন ভৈরবে ভাসাবো মনডাঙার ডিঙি। তুমি মনে রেখো পূবালী বাতাসের স্বভাব।


শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
দুটি কবিতা

ডিসটোপিয়ার অন্বয়

কবেকার কাটা রাংচিতায় বন্ধ চোখ
জ্বালা ও ছটফটানির অসম্ভব ঘুম
পাখি কর্কশ মিনার

আমিই সেই ক্ষুধা-কুকুর — কাটা লাশের মধ্যে থেকে
রেললাইনে পড়ে থাকা রুটি খুঁজে বের করি

মাথা নামানো দৌড়, ফেরা
আমার প্রকাশ্য মানে সবকিছু পুনরাবৃত্ত
মানচিত্রের হাবাস্থান গোবাগ্রামদেশ

ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলি — অন্ধ স্পর্শের মত
পরস্পরের ভয়

মাটির তলায় শহরের নিকাশি সুড়ঙ্গে আমরা
পায়ের পাতায় হল্কা ধেড়ে ইঁদুরের চিৎকার

দেশ বিষয়ে একটি আধুনিক কবিতা

এদেশে দাঁড়িয়ে বুঝি স্থির চিত্রকল্প নিয়ে ছায়াগুলো ভারি হয়ে আসছে
অনেকটা উঁচু থেকে দেখতে পাচ্ছি একধরণের বালিঝড়
সমুদ্রের উপর

আমাদের যুদ্ধ প্রস্তুতিহীন সকাল আবিষ্কার করছে
জনপথের ভাঙা দৃশ্য
জ্বালিয়ে দেওয়া ধানের গোলা

সবকিছু নিশ্চুপ ছিল
এমনকি দীর্ঘদিন উপোসী শরীরের সঙ্গম

এখন সামান্য কয়েকটা নিঃশ্বাস
চিৎকৃত উল্লাস দ্যাখে
বিপক্ষের

আর

উড়ান ভাঙা পাখিদের
একটা স্তম্ভন স্থিরতা


সন্দীপন চক্রবর্তী
তিনটি কবিতা

নচিকেতা

আমার সহজ ঋতু খুলে রাখি তোমার চরণে
চরণে চরণচিহ্ন ভেঙে যায় পদক্ষেপে, নেচে ওঠে ঝড়
আমাদের অর্ধনগ্ন শব্দের ভিতর
ঈশ্বর আত্মহত্যা করতে আসেন
ফিরে যান বিফলতা নিয়ে

অতল জলের ছায়া মুখে নিয়ে ভাবি আমি
তাহলে আমার পালা এলো

দেহ

বিষণ্ণ আঠার মতো লেগে আছো আমার শরীরে
ছালচামড়া ওঠা এক অতিকায় ইয়ার্কির মতো
দড়ির উপরে আমি ব্যালান্স দেখাচ্ছি, দ্যাখো
লাট-খাওয়া লাথ-খাওয়া অবিকল উড়ুক্কু মানুষ
বিটাডাইনের মতো গন্ধময়, ম্যাজেন্টা, তরল –
সম্ভাবনা ছিল, তাও অসম্ভবে লাফ দিতে গিয়ে
শরীর ‘দ’-এর মতো, ভাঙাচোরা, উল্লুকসুলভ
অতিক্রমচেষ্টা আর ভেঙে মুখ থুব্‌ড়ে পড়া খুল্লমখুল্লা বাজারে –
হাজারে হাজারে থুতু, উল্কাপিণ্ড…লাগাও তালিয়াঁ…
কপাল বাহিয়া নামে ফোঁটা ফোঁটা ছায়াপথ, নেমে
সময়ের সংকোচন প্রসারণ দ্যাখে, তার
মনে পড়ে, রবারের বলগুলি পড়ে আছে শৈশবের মাঠে

যম

জগঝম্প মনে পড়ে, ভাসানের তাসাপার্টি, নাচ
মনে পড়ে ধাক্কা খাওয়া, তুবড়ে যাওয়া বাসটির আনাচকানাচ
মনে পড়ে কাঁচবেঁধা চোখের মণির মতো লাল
মনে পড়ে গলা অব্দি পাঁকে ডোবা তুখোড় শিয়াল
মনে পড়ে শিকে গাঁথা চাকরিমুখ, কাবাবের স্বাদ
মনে পড়ে ঘষা খেয়ে খেয়ে ছাল উঠে যাওয়া প্রবল আহ্লাদ
মনে পড়ে হেঁটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদে ঘুরে দেখা এই সংসার
কিছুই যে মনে নেই, সেটুকুই মনে পড়ে আর
মনে পড়ে ছিন্ন ভ্রূণ, গর্ভগৃহ, জেলিমাখা এই অন্ধকার
মনে পড়ে হাড় শুধু সারি সারি হাড়
শিশু আর নারী আর লাশের পাহাড়
মনে পড়ে আকাশের আলজিভ ছুঁয়ে তার ব্যর্থ চিৎকার

গৌরব চক্রবর্তী
দু-টি কবিতা

১।
চলে যাব চলে যাচ্ছি রেখে যাচ্ছি কিছু স্মৃতি, মায়া
থেকে যাবে শুধু কিছু না-লেখা শব্দের চিৎকার
আগুনে আগুন হব, বাতাসে বাতাস, জলে জল
তবু এই ভালোবাসা থেকে যাবে তোমার-আমার

দিনান্তে কখনও ফিরে তুমি ঘেঁটে দেখো ঘরবাড়ি
দু-হাতে গোলাপ ছিল আর ছিল বেনারসি শাড়ি

২।
দু-চোখে দৃশ্য নেই শুধু লেগে থাকে কারও মুখ
দূরত্বই জানে শুধু ভালোবাসা ভীষণ অসুখ
তাই দূর থেকে দেখি, ভেতরে ভেতরে পুড়ে যাই
আমাকে লালন করে শুধুমাত্র বাংলা কবিতাই

প্রতিটি অক্ষরে আর প্রতি শব্দে তোমার বসতি
তুমি কি প্রেমিকা? নাকি, তুমি শুধু দেবী সরস্বতী?

মন্দাক্রান্তা সেন-এর কবিতা

মাতৃভাষার জন্য

ভাইয়ের নাম অপরাজেয়, বোনের নাম অপরাজিতা
ভাষাই আমার মা গো, শোনো, ভাষাই আমার আপন পিতা

এই ভাষাতেই কান্না আমার, এই ভাষাতেই আমার হাসি
এই ভাষাতেই বিদ্রোহ আর এই ভাষাতেই ভালোও বাসি

ভালোবাসায় ও বিদ্রোহে শহিদ হলো আমার ভ্রাতা
তোমার লড়াই আমার লড়াই, হ্যাঁ, বিদ্রোহই পরিত্রাতা

তোমার স্লোগান আমার এ গান, তুমিও সাথী এ গান গেও
বোনের নাম কী?– অপরাজিতা, ভাইয়ের নাম তো অপরাজেয়

ভাষার জন্য যুদ্ধ যে এই, বিশ্বে নেই কো তার তুলনা
আমার ভাষা বয় শোণিতে, সেই কথাটি— না, ভুলো না

জ’ন্মে আমার মা’কে ডাকি, যৌবনে দিই প্রেমের চিঠি
বন্ধুকে দিই শুভেচ্ছা আর সবার জন্য সবার প্রীতি

ভাষাই আমার গান হে সাথী, ভাষার জন্য এই কবিতা
ভাষার নাম তো অপরাজেয়, ভাষার নামটি অপরাজিতা

মাতৃভাষাই মাতৃস্তন্য, দুধের ধারাই বইছে শিরায়
মাতৃভাষাই যুদ্ধ করে, সে-ই তো প্রাণের শান্তি ফিরায়

তোমায় বলি প্রাণের কথা, আনন্দিত বাক্যালাপে
তোমার রক্তে আমার রক্তে, হ্যাঁ, শহিদের হৃদয় কাঁপে

ও একুশে ফেব্রুয়ারি, আজ শুধু নয়, আজীবনেও
বাসব ভালো আমার ভাষা, অপরাজিতা, অপরাজেয়!

সার্থক রায়চৌধুরীর কবিতা

একটি নির্ভীক অকবিতা

এক্স কে আজ খুব ভালো লাগলো।..

ওয়াই কে কয়েকদিন বিশ্রাম
দিচ্ছি, বলতে পারেন।

জেড এর নাটক আর ডব্লিউ এর অতিনাটকীয় ন্যাকামোও আমার খারাপ লাগেনি…

এই আজন্ম শয্যাগত গড়াগড়ি আর মৃত্যুর মধ্যে যেটুকু রগড়,.. সব ওই এক্স, ওয়াই, জেড আর ডব্লিউ দের দৌলতে,…
কারো বাহুল্য, কারো সংযম, কারো লাস্যময় আমি গড়িয়ে পড়েছি…

প্রত্যেকবার মনে হয়েছে ওই এক্স এর কথা…

কে এই এক্স?…

উত্তরের পর উত্তরে শুধু নম্বর লিখে রাখা আছে,.
কোন নাম কেউ লিখে যায়নি কোথাও!…

কস্তুরী সেন-এর কবিতা

বলো

আনন্দবিদ্যুৎ আসে, বলে শোনো
মনে করে দ্যাখো সেই যাত্রাপথ যাত্রাপথ
বলে মনে করো সব
জল মাটি, হেঁটে গেলে-
গাছে গাছে বেজে উঠল তূরীয় মুকুল!

আনন্দবিদ্যুৎ সেই একবার
কালো সে কী প্রগাঢ় পোশাকে ঝুঁকে
দ্যাখালে ঝলকমাত্র কণ্ঠমণি গৌর!
তাকে শুষে নিয়ে হল তো শরীরগাত্রে গান
যা যা বেজেছিল!

আনন্দবিদ্যুৎ এই ছেঁড়াখোঁড়া পাতাগুলি
এবারে পুড়িয়ে ফেলা হোক তবে
সব অন্ধ
সব এই ঘ্রাণে থাকা…
বলো শুধু অসম্ভব

বলো যাও আর পারছ না!

কথা

কথাটি তৃষ্ণার ডালে ফোটে
কথাটি একান্ত দোষে ছাই
কথাটি সামান্য
তাও নিজের ভোরের কাছে গিয়ে
কানে কানে বলে মরে যাই?

সব্যসাচী ভৌমিকের কবিতা

প্ল্যানচেট

এমন অন্ধকার, হোঁচট খায় স্মৃতি

বসন্তবৌরি, নীলকমল, সদলবলে খোলা জানলা দিয়ে
মাকড়সার জাল সরিয়ে উঁকি দেয়

পর্যাপ্ত সময় নিয়ে
সংশয় নিয়ে
একদিন আমরাও টেবিলে গোল করে বসবো

সেদিন, কোনো দমকা হাওয়ার সঙ্গে
সিলিং ফ্যানের স্মৃতি
জড়িয়ে যাবে অলীক কণ্ঠস্বরে

আমরাও আঙুলের স্পর্শ ভুলে
একলা আত্মার মতো
হারিয়ে যাবো

কেউ নেই সাড়া দেওয়ার
কেউ নেই সাড়া দেওয়ার

সামান্য পরলোক তখন গুটিয়ে নেবে নিজেকে

টেবিলের কাঠে গোটা শহর তখন খুঁজছে নিজেকে

অসুখ

সিমেন্টের মেঝে ও রোদ্দুরের মধ্যেও ফারাক থাকে

জলের মতো সহজ জীবন অভিধান হাতড়ায়

আমাকে জাগিয়ে রাখো পূজা পর্যায়ের গানে
এটুকুই নিরাময়

বাকিটা অসুখ, বাকিটা অন্ধকার

ঘাতক ক্লান্ত তাই এখনও উড়ছি ছেঁড়া কাগজের মতো

যে কোনো আলিঙ্গনে এ অসুখ শেষ হতে পারে

মণিশংকর বিশ্বাস
দুটি কবিতা

ভাষা

রোদের জটা থেকে ছিটকে ওঠে কয়েকটি শালিখ
‘একি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’ কিশোরীর মতো ধানক্ষেত একা শিস দেয়
গোলাপ ফুলটি আসলে ততটা বড়, যতদূর তার সুগন্ধ
বহুদূর হ’তে আকাশে জীবন্ত কোনো গ্রহ তাকে প্রেম নিবেদন করে।
এইসব মিলেমিশে থাকে আমার ভিতর—
বাইরে থেকে বোঝাই যায় না এই মিলমিশ—
একটি যেকোনো সংখ্যা যেরকম
দুই বা দুইয়ের অধিক ক্ষুদ্রতর সংখ্যার যোগফল।

চাঁদের নিজস্ব আলো আছে


চাঁদপানা মেয়েটি আজ হাওয়াইয়ান ব্রিজ ও ল্যাভেন্ডারের
মিশ্র সুবাস পরে এসেছে।
এই সুবাস তৈরি হয়েছে বহুদূরের এক সমুদ্রশহরে—
কোরাল প্রাচীর ঘেরা ছোট্ট এক শহর
সেখানে সব পুরুষেরা মৎস্যজীবী, সমুদ্রনির্ভর—
তবে মেয়েরা মূলত সুগন্ধি-কারখানায় কাজ করে
আজ মেয়েটির সঙ্গে সেই সমুদ্রললনাদের
এক ঝাঁক এখানে এসে পড়েছে
তাদের রোদ্দুর আর তলপেটের ব্যথা-সমেত।


আর আমি সারাক্ষণ ভাবছি, এই সুগন্ধে
ঠিক কতটুকু
চাঁদের নিজস্ব আলো

রাহুল দাশগুপ্ত-র কবিতা


জন্ম

ওই গাছটা, অনেক দুঃস্বপ্ন দেখার পর
নিজের মনের জোরে একটা গাছ হয়েছে
আর জেগে উঠেছে সমুদ্রের ঠিক মাঝখানে
সমুদ্রের দিকে তাকাও, দেখো
সমুদ্রের মাঝখানে একটা বড়ো গাছ
সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে তার গায়ে
সাদা ফেনায় ঢেকে যাচ্ছে তার অলৌকিক ছায়া
জন্ম হচ্ছে বলিষ্ঠ এক সুন্দরের…


ভিনদেশী

কে পৌঁছে দিয়েছে সংবাদ?
ও আমার গ্রামের মানুষ
কীভাবে জানলে আমি পুবমুখে চেয়ে বসে আছি?

এভাবে কী সংবাদ যায়?
ও আমার গ্রামের মানুষ
সে কী তবে ভিনদেশী ছিল?

হায়! সে তো ভিনদেশী ছিল…

শ্রীদর্শিনী চক্রবর্তী-র কবিতা

একুশের কবিতা

রাস্তার ঘামে বৃষ্টি ভিজেছি আমি,
নিয়নের মুখে ছাই দিয়ে চুমু খাওয়া
ছড়িয়ে গিয়েছে চেনা পথ মাঠে-ঘাটে।
সস্তা মদের ঠেক দূরে, আলো… হাওয়া…

তুমি ব্যস্ততা-বর্ষাতি নিয়ে গায়ে
আলো ভেঙে ভেঙে হেঁটে গেছো রাজপথে,
আগুন ও জলের বিরোধে ভেসেছে পাড়া –
নিয়নেরা ঠায় রয়ে গেছে কোনোমতে।

নোয়া নোয়া বুকে জড়িয়ে শুয়েছো তুমি,
তাহিতির রা্তে কালো-নীল মাখো-মাখো –
আমি আকাশের পোশাকের সেই বুটি,
ছোটবেলা থেকে তারা বলে যাকে ডাকো।

চেয়ে দেখি খবরের আধো আধো চেনা
শহরের বুকে বারুদের জয়গাঁথা
না-শোনার পরও ছিটকে এসেছে ছবি,
রসুনে-পেঁয়াজে কষিয়ে রেঁধেছি ব্যথা।

প্যারী আর কেনিয়ায় বহুদূরে কারা
মৃত্যু পেয়েছে ভালোবাসা খোয়া গিয়ে,
গান-গল্পের মাঝে রক্তের ধারা
বয়ে গেছে ঘৃণা-কাঁটাতার বুনে দিয়ে।

শক্তির খেলা বারুদে বৃষ্টি নিয়ে
সিরিয়ায় ফের ঘর জ্বালিয়েছে পথে
তুমি ব্যস্ততা-বর্ষাতি নিয়ে গায়ে,
ভাঙা আলো ঠেলে হেঁটে গেছো কোনোমতে।

আমরা তবুও বৃষ্টি ভিজব ঘামেই,
হিংসার মুখে ছাই দেবে এই ভাষা –
আমাদের মাঝে নোয়া নোয়া জেগে থাকে,
আকাশের গায়ে জ্বলে থাকে ভালোবাসা।


ভাষা

যে ভাষায় মা বলে প্রথম ডেকেছি,
সেই ভাষা ধ্রুবতারা সম।
আলো আসে, দিশা দেয়
হাজার আলোকবর্ষ পারে থাকা বন্ধু আমার।
তবু স্বপ্নভঙ্গ হলে, কেন যেন মনে হয়-
যে ভাষায় স্বপ্ন দেখি সে ভাষা কি তবে সত্যি নয়!

বিবিধ ভাষার পথে হেঁটে হেঁটে ফেরা হল বহু,
তোমাকে চুমুর ভাষা এখন আপন মনে হয়।

দুটি কবিতা
বেবী সাউ

জীবনানন্দ

তুমি তো বৃষ্টির জল
অবকাশে লিখে রাখা শোক

যেভাবে প্রতিটি নারী মদ ও মাংসের লোভে
পৃথিবীর কাছে চেয়ে বসে সন্তানের জন্ম, প্রতিপালকের স্পৃহা
যেভাবে জারুল বনে পড়ে থাকা মৃত দেহটির মুখে মাছি জমে

প্রতিটি মুহূর্ত মিথ্যা, বৃথা মনে হয়
পৃথিবীর পথে হাঁটে যারা গোধূলির লোকে
তারা তো অধিক ক্লান্ত, হাড় কংকালের ভিড়ে
নিজেকে কী চিনেছে কখনো!

এসব মৃতের বুকে বৃষ্টি জল জমে,
সোঁদা গন্ধে মনে হয় পৃথিবীটি আসলে জীবিত

কুহক, কুহক, কুহক

বুকে বেড়ে ওঠা ঘাসটির মতো
কখন যে শাক ভেবে খেয়ে নেবে ক্ষুধার রাজত্ব


লোরকা

তোমার হত্যার কাছে আমার জমানো নৌকো তুলে দিই

পৃথিবীর প্রেমিকারা গ্রহান্তরে যায়;
তাদের মণিতে শুধু সাপের ছোবল আর পেঁচা ডেকে ওঠে

চুপচাপ চলে যায় ঘন বন শালের জঙ্গলে
হাতে হাত রেখে তারা পড়ে নেয় জ্যোৎস্নার ঘ্রাণ

মাথার খুলির মতো হাওয়া হেসে ওঠে
একেকটি ভাঙা পথ লেখা হলো ভেবে নদীটির মাঝখানে হেসে ওঠে চাঁদ
আর তখনই পোষমানা কুমিরের দল দাঁতে দাঁত পিষে হেঁটে যায় বিক্ষিপ্ত নগরে…

ভাগশেষ
অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

সামান্য টোকা দিলে বালিমাটি ঝরঝর পড়ে যায়,
বাঁশের কাঠামো থেকে হাঁ-মুখ করোটিখানি ঝুলে থাকে শুধু।
রঙ ও ললিত সব ধুয়েমুছে খসখস খড়ের পুতুল।
ঠোঁট নেই, ক্ষতমুখ খুলে গিয়ে পোকামাকড়েরা সারিবদ্ধ হাঁটে ওড়ে, হুল ও কাঁটায়।
ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি নিজের কানেই খুব অচেনা তখন। অন্যমনস্ক পা যেখানে পড়েছে, তার ঠিক কাছাকাছি নীচু খাদ, ঢেকে থাকা গুল্মে লতায়।
হাত থেকে ছুটে যাওয়া শব্দভেদী তীর
হাসি ও কান্নায় কোন তফাত বোঝেনি—
ফলত: আঘাতটুকু লক্ষ্যভ্রষ্ট ফিরে এসে ভারি! ক্ষমার অতীত কিছু স্মৃতি ও সময় পরস্পরের দিকে ছোটাছুটি শেষ করে ক্লান্ত ভীষন
কোলাহল শেষ হলে সামান্য উড়োখই ধুলোর ভিতর মেশা অনুতাপ দিনান্তে চালেডালে একটু লবণ,
আর হাওয়া—ছুঁয়ে থাকা কথার ভিতর
এর বেশি কিছুই থাকে না পড়ে, কোনও আয়োজন!

অর্ঘ্যকমল পাত্র
দুটি কবিতা

যে বান্ধবী, প্রেমিকা হল না

চুল খুলে রেখেছ অবচেতনে।
সুতরাং, তোমার অস্থিরতা থেকে
সরে দাঁড়াই

এ দুপুরে, আমাকে ছাড়া
কোনো বাউল দেখোনি তুমি

একাকী রাতে, তোমার মতো
কোনো বকুলগাছ-ও দেখিনি আমি

সুর জানি না। বুঝি না। শুধু
শব্দের উপর ভরসা করে
তোমার অস্থিরতা থেকে
সরে দাঁড়াই…

কাপুরুষ

১.
এখন তো মলমাস।
হে প্রিয়, কাছে থাকতে পারিনি সুতরাং

হানিমুন শেষে
তোমরা দুজন সৈকতে এখন।

তুমি তো মেধাবী খুব
ঢেউয়ের শব্দে বুঝতে পারবে

— সিংহের উপোস-চিৎকার!

২.
চিৎকার, মৃদু মনে হয়।
সুবাতাস পরিচ্ছন্ন এমন-ই

এবং শীতকাল। বিরহের বেশে
এমনই এক রঙভর্তি ক্যানভাস পাঠালে

শুধু তাতে নিজস্ব রঙ লাগাবার জন্য
একটু ফাঁক খুঁজে চলা…

সু র ঞ্জ ন রা য়
দু’টি কবিতা

রূপান্তর

একটা বই তৈরি হচ্ছে মাথার ভিতর
ভূমিকা,অধ্যায় ভাগ —- ধাপে ধাপে সাজানো পৃষ্ঠারা
জেগে উঠছে পাণ্ডুলিপি থেকে,শব্দের ব্যঞ্জনা-প্রাণ !

একটা বই গাঁথা হচ্ছে মাথার ভিতর
স্বপ্ন বুনে বুনে আঁকা প্রচ্ছদের রঙ
চুঁয়ে পড়ছে ভাবনাদের মাঠে
ছোটো ছোটো কবিতা-গদ্যের কুঁড়ি চোখ মেলছে
রোদের আশ্লেষে

একটা বই ডানা মেলছে অসীম আকাশে,ভালোবেসে
দু’হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে বিষণ্ণ আবেগ
মাথার ভিতর শুধু জন্ম নিচ্ছে শব্দের সন্তান —-

ভূমিকা,অধ্যায় জুড়ে —- ধাপে ধাপে স্বপ্নের পৃষ্ঠারা…


অবজ্ঞার মায়াবী উত্তাপ

ছুড়ে দাও যত পারো অবজ্ঞা মাখানো অহংকার
শব্দের সাহস নিয়ে এগিয়ে যাবোই কাঁটাপথে
দেখে নিও, নিজের হাড়ের তৈরি পাশা ভুল চালে
তোমাকে হারিয়ে দেবে,সহ্যের প্রত্যয় মেখে মেখে

মুছে যেতে যেতে ঠিক ফিরে দেখবো তুমুল বোশেখে
নতুন নামের পাতা ফুটে উঠছে স্মৃতিদের ডালে
কতদিন শুকনো মুখে প’ড়ে আছে ক্ষোভেরা বিপথে !
তবু সেই সত্যের পরম ছুঁয়ে কাটবে অন্ধকার ।

ছুড়ে দাও যত পারো অবজ্ঞা মাখানো অনুতাপ
সৃষ্টির সাহস মেখে এগিয়ে যাবোই ভালোবেসে
তোমাদের হাহুতাশ, তোমাদের বিকলাঙ্গ মন
আমাকে জাগাবে শুধু,ভিতরের গভীর নির্জন
আরও বেশি ভাষা পাবে সহ্য বুকে নিবিড় আবেশে…
ছুড়ে দাও যত পারো অবজ্ঞার মায়াবী উত্তাপ

দুটি কবিতা
সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়

পথ

বিষাদের ঘনিষ্ঠতায় চোখ মুছি।

যে নিরন্ন আঁধার আমায় বারবার বেড়ে দেয় ভাত

হে প্রিয় কালো, কিসের মোহে আজও

জেগে আছি বলতে পারো?

অনন্ত হেঁটে যায়

শূন্য পাখির ডানা তবুও ফেরার কি অদম্য তাড়না

সন্ধে রঙের গায়ে ঢেলে দেয় রেণু

যেন সেই অপেক্ষার চিঠি।

প্রিয় শব্দেরা হরিণের মতো চেয়ে আছে ভালোবাসায়

মায়ার বন্ধন আসলে সংসার।

ছুটে যায় ঠিকানাহীন অতলের দিকে।

ঘনিষ্ঠ হই। ছায়ার নীচে দুটি সিংহ অন্ধকার নিয়ে খেলে,

আর এক বাউল হেঁটে যায় সন্ধের আলো মেখে…

আর্টফিল্ম

একটা রেখা ধেয়ে আসে

ক্ষীণ আলোর নীচে ভেঙে যায় টুকরো টুকরো হয়ে।

এসব ছবিগুলো আজকাল বড়ো ভাবায়।

চোখের কালোছাপ…

হাহাকার তবু শব্দ নেই,

অভিমান এক নিঃসঙ্গ চাদর।

খুঁটিনাটিগুলো গুছোতে গুছোতে

নিজেরই শরীর হাতে পাই।

এই যে এত দুঃখ, শান্তিহীন দীর্ঘ গভীর

বোঝার মানুষ নেই একটিও

অভ্যাসের দরজায় হাত রাখি।

ক্লান্ত অপেক্ষা

শুধু পিছন ফিরে দেখার সময় নেই কারো।

কতবার ভেবেছি একটা স্বীকারোক্তি লিখে যাব,

মৃত্যুর ভেতরেও আমি যে জন্মবার স্বপ্ন দেখেছি

জানাব তোমায়।

হঠাৎ, হাওয়ার দাপট

উড়ে যায় পৃথিবীর সব কাগজ।

তাড়াহুড়ো করে গুছিয়ে রাখি

নিজেরই শরীরের ভাগ।

একটা রেখা, তাড়া করে

তারপর হঠাৎ,

বিস্ফোরণ।

দেখি, হুবহু আমারই মুখ

জল চোখ, হাসিতে উড়িয়ে দিচ্ছে

সফেদ পায়রা, ঝাঁকে ঝাঁকে !

দুটি কবিতা
সুপ্রভাত মেট্যা

অবিকল ঈশ্বর

কথা হারিয়ে গিয়ে ছায়া , সামনে একটা অন্ধকার দাঁড়ালে মনে হয় ।মনে হয় ভয় নিজেকে অবগাহন চাইছে ,ভাষা চাইছে ,নিশি কম্প ভোরের ।আমি কী শূন্যের ঠিকানা হয়ে উঠছি ক্রমশ ! বৈদূর্য রহস্যের অরণ্যকান্তমণে নীলবাহী যাত্রী হয়ে উঠছি ?দেহের তিনভাগ আমার ঘাম ও অশ্রুর জলে ভেসে যাওয়া জীবন হয়ে উঠছে ! অথচ এমনতো হওয়ার কথা ছিল না স্মরণিকা ।কোথায় সেই কালের কবিতা ? লিপি সাম্রাজ্যের অক্ষরে ,হৃদয় খোদাই করা মানবিক ফলকে ,যে চমকানো আলোর দ্যুতি আমাদের অন্ধকার জগতের পথ সরিয়ে সরিয়ে জীবিকা হাঁটত ,সেই সত্য স্পর্শের হাত অবিকল ঈশ্বর আজ কোথায় ?

ঠাকুর ভালো হোক

ঠাকুর ভালো হোক ,আমার পুতুলের গায়ে যে লেখা কলঙ্ক বিবৃতির…
অমন নেচে নেচে ভুলে যাওয়া, এইতো চাও তুমি রাজন? ভিক্ষাপাত্রের দাম দিয়ে আঙুল উঁচিয়ে ঠেলে দেওয়া ,আহা ,আর কী চাই আমার !

ভাষা চাও ,দিবস ও রজনীর ?
সেতো কবেই কবেকার কবিতার আড়ালে থেকে থেকে গোপন অসুখে মজে গেছে। জল দিই ,অালো দিই হাওয়া, তাতে , চাঁদের অন্ধকারে , সামান্য পাতাও নড়ে না যে,রাজন ?আমি ভালো দুপুর নই বলে কী তাই?দেশের ?এখনও মন্দ-সখা স্নানের জলের তাগিদে অন্ধ হয় আমার । ভালো বই থেকে, ধুলোর প্রলেপ দেওয়া নয়ন সরে যায় দূরে….

সুবীর সরকার-
এর কবিতা


গান

আমার এত বছরের হাহাকার বেশ গুছিয়ে রাখছি নুতন কবরের পাশে।ফিরে আসছি সমষ্টি থেকে এককের দিকে।আমরা ও আমির মধ্যে আর কোন
ব্যবধান থাকতে পারে না।কিছু খেলা তো একাই
খেলতে হয়।অন্ধ ভালোবাসার ক্যানভাসে দূরবীন
ছুঁড়ে দিয়ে একটা নুতন ভূগোলের দিকে শান্ত এক পদযাত্রা শুরু করেছি আমি।আর গান বাজছে
আমার চারপাশে।

ডায়েরি

মানুষ দেখি।মেলার ভেতরে যাই।গ্রন্থ থেকে নুতন গল্পের দিকে।যিনি হাতপাখা ফেরি করছেন তার সাথে কথা বলি।পুরনো গামছায় মুড়িয়ে রাখি সদ্য
কেনা পুতুল।নদীর চরে উদাসীন হয়ে খেলে বেড়ায়
ফাল্গুন হাওয়া।আমি টুপি খুলি আর সেই টুপি পরিয়ে
দিই হর্ষবর্ধনের ঘোড়ার মাথায়।অপমান এখন আর কোন বিষন্নতা তৈরি করে না।উপেক্ষিত মনে হলে বরং গামছাবান্ধা দই খাই।বিশ্বাস করুন,আমার কোন কালো চশমা নেই।ম্যাজিক ফিগার টপকে
কতদূর চলে যেতে থাকি।এভাবে কিছু হয় না জানি।
ইদানিং হুইল চেয়ারে বসে ময়না তদন্তের রিপোর্ট
পড়ে যেতে থাকি।

জল

বা হাতি খালে ডুবে যায় কাগজের নৌকো।
চোখের জল নিয়ে এই যে বেঁচে থাকা
হসন্ত জড়িয়ে ধরলে দেখি কচু পাতায়
জল
মোমবাতি নিভিয়ে দেবার মত আজকাল সম্পর্ক
নেভাই

আয়না

প্রকল্প শহরের পাশে টুক করে একটা হাট রেখে
আসি
নখ খসে পড়া বেড়াল মুখ দেখছে ভাঙা
আয়নায়
জীবনের একটা আদর থাকে।
অনেক রোদের ভেতর শুয়ে থাকে
টিকটিকি।
আর কাঠের বেহালা।
আর আঙ্গুলে বৃষ্টি মাখতে থাকো
তুমি।


পলাশ দে-এর কবিতা

রসিক

রসিক বুঝবেন নিশ্চয়ই,
আমি ওরকম ভাবে বলতে চাইনি

ওটা ডানা নয়, হাত
টিলা না, পিঠের কুঁজ
চোখ রাঙানি নয়, বসন্ত
তর্জনীও না বিশ্বাস করুন…
মিছিলে হারিয়ে যাওয়া পেনসিল

আপনি মাইবাপ ,শিস বাড়তে বাড়তে
তৃতীয় বিশ্বের অসহ্য ধ্বনি
হ্যাঁ, ঠিকই টের পেয়েছেন

আন্দোলন

দূরে যখন আকাশ লেগে থাকে
আমি একটা কোকিল তুলে নিই
গাছ ফেরাতে ফেরাতে হরেক পাতা যখন
জড়ো হয় ফিরে যায় বিয়োগ ঋতুর কাছে
চোখে জোনাক আর কলিজায় সোনা ব্যাঙ লাফায়

হাওয়ায় একটা মেঝে বানিয়ে রাখি
তুমি ফাল্গুন বলে ডাকো

তুমি ফাল্গুন বলে ডাকো ?

স্নান করলে সুরসুরি পিঁপড়ে ঢলে পড়ে গায়ে

নিজের শরীর ,
অথচ মনে হচ্ছে কৃষক আন্দোলন চলছে

সোনালী চক্রবর্তীর কবিতা

উৎসর্গ ~ গোবিন্দদাস

পূর্বরাগ

মাধব, চন্দ্রহাস জাগলে উন্মাদিনী নিশ্চিন্তে ভাসে, এ চরাচর লবণ জলের অধিক তার কোনদিন ছিলো?

অভিসার

আয়ান, এই বেহাগগন্ধী অন্ধকার অজস্র জোনাকির রমণ সম্ভাব্য আলোয় ধাবমান। হাওয়ায় বুনে চলেছেন বৃন্দাবনী সারঙ এক অনন্ত লম্পট…

মাথুর

শ্রীমতি, নাড়িতে যে নৌকা ছিঁড়ে ভঙ্গুর পদ্ম কিছু রসস্থ থেকে গেলো, ঘাতক রাজহাঁস সে ঘুণ বিস্মৃত হলো না।

বৈশাখী রায় চৌধুরীর কবিতা

লিখিত জলপ্রপাতে

সারাজীবন ধরে অপেক্ষা ইত‍্যাদি অদ্ভুত শব্দ লিখে আসার পর আমার মনে হয় লিখিত প্রতিটি শব্দই যেন হত‍্যার জলছবি।যে ছবির ভেতর আশ্চর্যজনক ভাবে আঁকা হয়ে গেছে একটা খোলা জানালা।সব জানলার তো উপসংহার থাকে না,থাকে না বলেই জানালা দিয়ে হুহু করে ঢুকে পড়ে রাজহাঁসের দল।তখন হত‍্যার বুক ভরে যায় সাদা পালকের অহংকারে।

কিন্তু নিয়তি তো কাল,নিয়তি অবিনশ্বর। নিয়তির ভূমিকায় রাজবেশে অবতীর্ণ হয় একনিষ্ঠ ব‍্যাধের চোখ।যে চোখের শীতাঞ্জনকে আরাধ‍্যা সরস্বতী ভেবে ঝাঁপ দেয় হাঁসের দল আর সুপ্রভাত শব্দে আত্মহত্যার রাতে খুলে যায় অপেক্ষার জানালা।

না ফেরার গল্প

সব গল্পেরা উড়ে গেছে

এখন ছাদ সম্ভবত একা
হৃদয়ের তার ছুঁয়ে চুঁইয়ে পরে জল

ছাদ জুড়ে জলের আলপনা

মুঠো মুঠো কান্নাফুল
অপরাধের হাঁড়িকাঠে নিজেকে বসাই

কখনো দাঁড়াই শুন‍্যতার বেদী মাঝে ত্রিভঙ্গ হয়ে

পূজা শেষ হলে উঠে আসে ঘৃণা
দলা পাকাই

নিজেকে ছুঁড়ে দিই প্রসাদের ভিক্ষায়

সারিবদ্ধ ভাবে উঠে আসে ভিক্ষুকের দল
এঁটো কাঁটার মাঝে নিজেকে পরে থাকতে দেখলে

করোটি জুড়ে জাগে মায়া,উঠে ঝড়

চিৎকার করে বাগযন্ত্র

এসো এসো ফিরে এসো,ফিরে আসাটা খুব দরকার।

দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়
দুটি কবিতা


দেখা হলে

যে-শব্দকে অনিবার্য ভাবনি কখনও
সেই এসে দাঁড়িয়েছে কবির সম্মুখে
নগ্ন, সুনির্মল, আকাশের দিকে মুখখানি তোলা
শুষে নিচ্ছে প্রগতির প্রতিটি ঘামের বিন্দু, আর
একটু-একটু কেঁপে উঠছে ধরিত্রীর বুকের জ্যামিতি
কবিতার বিপ্রতীপে কোনও ছায়াপথে যদি এভাবেই দেখা হয়ে যায়
তুমুল ঝড়ের তোড়ে উড়ে যাবে যাবতীয় শ্লাঘা ও দ্রাঘিমা
একটি নৌকা ভাসবে শুধু বিস্মরণে, ভোরে!


চিরকালীন

আমার ভিতরে জাগে লেলিহান আগুনের শিখা
বেবাক পোড়ায় তবু আরও দাহ্য খুঁজে মরে স্থলিত আঁধারে
ঘুম ভাঙলে পাশ ফিরি। রতিক্লান্ত সকালের কাছে
ধস্ত, নগ্ন, অতিকায় বিগত জীবন পড়ে থাকে

নিরন্ন মেধায় কোনও স্বপ্ন নেই, স্বপ্নদোষও নেই
প্রেক্ষিতবিহীন স্বচ্ছ সরোবরে ডুব দিয়ে তুলে আনি কবন্ধ শরীর
ঘাসে পড়ে থাকে মেয়ে। শিশিরের বিন্দু কিছু ফুটে ওঠে
অনাবৃত দুটি স্তনভারে
ভোরের কিশোরী। তার সুলভ্য দেহটি যেন আলোর বিদ্রুপ

রাতের গহ্বরে ফের জ্বলে উঠবে চিতা!

তন্ময় ভট্টাচার্য-র কবিতা

অভিযান

(১)
স্তনের উপত্যকাটিতে দাঁড়ালাম।

চোখ তুললে মেঘ-মেঘ, গুম্ফাশব্দ, শাদা গাছ
মুণ্ডিতমস্তক কোনো শ্রমণের জ্যোতি-উচ্চারণ

ওপরে পৌঁছোতে গেলে এত শুদ্ধ পাপ হতে হয়!

(২)
অল্প কিছু পথ, তবু ফুরিয়ে না-ফেলার জীবন
এখানে শিখেছি আমি। প্রথম ধাপের শেষে
খানিক বিস্মরণ – আদৌ কোথায় পরিণাম

কূপের প্রতিটি রোম টিলার মতোই ঋজু, ভার…

তোমার বিরুদ্ধে আরো প্রীত হোক জিহ্বাকুঠার

(৩)
আদিমকালের ছায়া দেখা যাচ্ছে, সামান্য দূরেই

বৃত্তাকারে ঘেরা গ্রাম, ছোট-ছোট বসতি অনেক
মধ্যে যে-প্রাসাদ, তার বিচ্ছুরণ এত অন্ধকার

তবুও ঈশ্বর তিনি, আরোহীকে তাঁহারও সালাম

(৪)
এখানে সূর্যের মানা। কোনোক্রমে এসে পৌঁছোলাম।
এখানে পূজার বিধি জিভ দিয়ে আরতি কেবল

অমৃত দিলেন তিনি। আহ্লাদে মাথায় ছোঁয়ালাম।
দেখতে-দেখতে আরো প্রিয়জন – উর্বর, নিটোল

শিখায় পুড়বে বলে দৌড়ে এসেছে সারা গ্রাম
কামড়ে ধরার আগে মেপে নিচ্ছি পাহাড়িয়া কোল

(৫)
দ্বার বন্ধ হল। চূড়া এতখানি রহস্য করেন
ভাবতে অবাক লাগে। শ্বাসে ঝঞ্ঝা, শিখরে কাঁপন

তাঁকে শান্ত করে নামি। নাভিকুণ্ডে স্নান।
কাছেপিঠে সমুদ্রগর্জন

চৈতন্য হারিয়ে ঝাঁপ দিলে কি, নাবিক?

শরীর সম্পূর্ণ জানে
আমাদের ভারতভ্রমণ…

ভাষা দিবসের কবিতা
শ্যামশ্রী রায় কর্মকার

ভাষা দিবসের কবিতা লিখব বলে
চাঁদ লিখতে চাইলাম,
সে অভাবী নখের মতো ভেঙে পড়ল।
ধুত্তোর বলে দুটো পাখি লিখতেই,
ওমা! দেখি খলখল করে হেসে উড়ে যাচ্ছে শব্দপোড়া ছাই
সমুদ্র বেশ গভীর শব্দ, ভাষার সঙ্গে যায়
তাকে লিখতে যেতেই
আমার খাতা ছিঁড়েখুঁড়ে সে গিয়ে বসে থাকল পাতালে।
কিছুতেই আর কিছু লিখব না বলে গোঁসা করে বসে আছি-
এমন সময় বন বলল, ওই যে!
শুকনো পাতার তলায় তাকে লুকিয়ে রেখেছি।

পাতা সরাতেই বেরিয়ে পড়ল
একটা বেআব্রু মেয়ের লাশ।
তার বুক খুবলে খেয়েছে কেউ-
জন্মদ্বারে আটকে দিয়েছে পাথরের চাঁই-
আমি চিৎকার করে উঠলাম,
ওরে! তোরা এ কী করেছিস!
এর পরে তো আর কোনো নতুন জন্মাবে না!
কোথা থেকে কে একটা,
বেয়াক্কেলে কোকিল টোকিল হবে-
চোখ মটকে বলে উঠল, জন্মেই বা কী হবে শুনি!
ভাষা না থাকলে তো আর
মনের কথা বোঝাতে পারবে না!

মাসুদার রহমান
বেড়াল

১.
এক প্লেট ভাজা মাছ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে- তারপরও কোন গাড়ি শব্দ করলো না,
হর্ন বাজাল না বাইরে

সন্ধ্যার আঁচল ছিঁড়ে চাঁদ লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে গেছে বনের মাথায়। ফরেস্টারের বউ ঠোঁটের লিপিস্টিক মুছে, খোঁপা থেকে ফুল খুলে এলোমেলো ঘুমিয়ে পড়েছে

ঠাণ্ডা হয়ে আসা ভাজা মাছ খেতে কেমন বেড়াল তা জানে

২.
বাটি ভর্তি দুধ কেউ খেয়ে গেছে। বউ চেঁচিয়ে উঠলো- দরজা জানালা তো বন্ধ-ই ছিল

আমি শার্লক হোমস চারপাশ দেখেশুনে বুঝতে চেষ্টা করছি

আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে শো-কেসে মাটির বেড়াল

আম্রপালী দে-র কবিতা


মানুষ মরে যাবে একদিন

ধীরে ধীরে জানালা বন্ধ করে দাও
ঘরের ছিদ্র ধরে একটু আধটু আলো আসুক
পাখিদের উপর আমি ঘুমের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বো

এখন অতিরিক্ত আলো এলে ত্বক পুড়ে যায়
নদী শুকিয়ে একটি মানুষ গড়ে ওঠে
পাহাড় শুকিয়ে প্রকাশিত হয় সমাজ

কবিতারা মিছিলের পথে মাথা নিচু করে থাকে
চা স্টলে দাঁড়িয়ে লাল চা খায়
কখনও দুধ-চিনি উড়ে এসে মুখে—

কৃমি কীটের মতো মরে যাবে একদিন মানুষ
জানি সে কথা, লিখি না
হাতে মৃত্যুর ফাইল
মাটির রঙ এখনো চেনাজানা
শুধু দেবতার কুটিরে শকুনের ছায়া দেখে থমকে যাই

আমি এক বাঁকা নারী

আনকোরা হাত ঢুকিয়েছি মগজে

প্রাণহীন স্তবকের মতো
মস্তিষ্কের গাজন প্রলুব্ধ করে যাদের
দুঃখিত হয়ে ভাবি
সেই দলে ভিড়ে
চেটে খাবো কুকুরের লালা

এতসব লাইন লিখলে
রক্তচাপ বেড়ে যায়
অসুখ হলে মনে হয়
অবসর দিনগুলি
আমি তো মহানন্দে কাটিয়ে দিতে পারতাম !

ঘন ঘন দিন বদল-
মগজের লেজ ধরে টানি ,
ধূমকেতু পতনের বদলে গড়ে ওঠে শ্মশান

আমি সৌহার্দ্যবিহীন
আমি এক বাঁকা নারী ।

পৌলমী গুহ-র কবিতা

বসন্তপ্রেম ইত্যাদি…

এই শহরে আরো কিছু পুরোনো হাওয়া
একা ব্যালকনি, রঙচটা পর্দা।
তেমাথার মোড় থেকে ঘুরে ঘুরে আসে,
কতো বিক্ষোভ, আর কোঁচকানো গাল।
এই শহরে আরো কিছু ধূ ধূ বুক,
ফাঁকা ঘর, টোল খাওয়া মাথা।
এ শহরে বসন্ত বড়ো একা হয়ে গেছে।

প্রলাপের সন্ধি

হেঁটেছে যারা, অথবা যারা হাঁটতে চেয়েছিল,
পৌঁছ-খবর দেয়নি।
গ্লাস থেকে ঠোঁটে মাতাল হয়েছে কথা
ভেঙে পড়ে গেছে যাবতীয় কথা-দেওয়া,
আর তাদের গল্পে একপাল খোঁড়া দাঁড়ি।

প্রেম এবং আরো কিছু

আর তিন পা হাঁটলেই খোলা মাঠ।
জলের গন্ধে পালক গন্ধ মেশে,
শৈশব যেন হাত পেতে আছে
কবেকার ভুল শোধরাতে ফিরে আসি।
ফের একই ভুলে পাশাপাশি বসা,
তুমি-আমি আর বসন্তপাখি জানে
কেন ভুল করে বারবার ফিরে আসা…

অনিন্দ্য রায়-এর কবিতা


পিছুডাক

পিছুডাক, ঘুরে তাকানোর মতো একটি গোসাপ সূর্যাস্তে পুড়ছে
আগুনের অরণ্য যা-হোক— আমাদের জন্য ভাত চড়িয়ে রেখেছে কেউ
একটু অপেক্ষা-করা ভালো, তোমার শর্তের কথা ভুলে-যাওয়া ভালো

পশুদের আধপোড়া দেহের ওপর ছড়ানো রয়েছে ক্ষুধা
বিবমিষা, তোমার স্ত্রী-নামে তার আকর্ষণ নেই

বিবাহের উত্তেজনা নেই
আমরা দুজন তবু, বাস্তুচ্যুত, প্রীতিভোজে এখানে এসেছি

ফিতেবাঁধা সূর্যঘড়ি

ফিতেবাঁধা সূর্যঘড়িটিকে দেখলাম— অন্যের হাতে রাস্তা পার হচ্ছে
আরেকটু বিকেল রয়েছে, আরেকটু ফাঁসের আবদার
আত্মহত্যা অব্দি যেতে পারে

হাত দিয়ে আলোটুকু আড়াল করেছি
প্রেম আর ব্যর্থতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর কাজেই লাগল না

তবু দেখছি, অন্যের হাত মহাজাগতিক পতাকাটিকে গুটিয়ে নিচ্ছে
যেন কোনও রৌদ্র নেই, সূর্য-প্রশাসন নেই
একমাত্র ঘড়িটির ফেমিনিন আকাশে জ্বলছে

বৃত্তান্ত : সুরদাস দুর্গা দত্ত

অজিতেশ নাগ-এর কবিতা


পরিখা

হঠাৎ দেখা হতেই পারে,

বাস বদলাতে শ্যামবাজার বা মুখ বদলাতে সোনাগাছিতে,

আমার হালকা হালকা মনে থাকা বাল্যবন্ধুর সাথে,

হয়ত ততদিনে গাঁ-ঘরের মেটে চালের ইস্কুলবাড়িটাও নেই,

হয়ত মাথার সামনেটা বেশ পাতলা,

হয়ত ডাংগুলি খেলা আঙুল কি-বোর্ড চালিয়ে নুব্জ,

তবুও চিনে ফেলতেই একদৌড়ে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম;

আরেঃ! পিন্টু না!!

নিমেষে বুঝে গেলাম,

ইস্কুলবাড়িটাও ধূলিসাৎ,

আমিও পলাশদিঘিতে নেই,

মাস্টারমশাইরা কবেই মরে ভুত,

বুড়োনিমের ডালে ক্লাসফাঁকির দুপুর সমাপ্ত; আর

এ হয়ত পিন্টু; তবে,

এই মুহূর্তে, সশব্দে –

বড় রাস্তা চিরে চলে গেল আঠাশ বছরের এক গভীর পরিখা।

পার হব কী উপায়ে?


রাতের শেষে

কাল সারা রাত দৌড়ে দৌড়ে ভীষণ ক্লান্ত,

আরেকটু শুতে দাও, এখনও কি রাত ভেসে যাচ্ছে না?

কাল রাতের চকচকে চাঁদের কণামাত্র শুকিয়ে যেতে দাও,

পুবের বারান্দায়, খানিক অন্যমনস্ক চড়াইয়ের ডানায়,

একটু বোঝার চেষ্টা কর, আমি ভীষণ ক্লান্ত।

আমি খুব কষ্ট করেই শিখেছি, শিখেছি কাকতাড়ুয়ার মত অধ্যাবসায়ে;

কী ভাবে রাতের প্রতীক্ষা করতে হয় দিনের আড়ালে আবডালে।

কিছু স্বপ্ন, কিছু মড়া মাকড়সা, কিছু চৈতন্যহীন ঝিমুনি,

রাতের মেঘে কত রং – সেও তো একটা দেখার অভ্যেস।

তুমি তো সকাল হলেই বেড়িয়ে পড়বে, মিশে যাবে পলকা হাওয়ায়,

আর আমিও সকাল হলেই সভ্য মানুষের পোশাক পড়ব,

সকাল হলেই চা বানিয়ে রেখে যাবে টি-পয়ের ওপরে,

পাশে নিপাট দৈনিক, দুপিস আগুনে ভেজা টোষ্ট।

জান আমি ক্লান্ত ঠিকই, তবে তুমি চলে গেলে আর ঘুম আসে না,

আসে না কবিতা; যেমন রোদের ভয়ে আসে না জ্যোৎস্না।

আর রাত শেষ হলেই তো সেই সাদাকালো চৌখুপ্পি রোদ –

ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলে যাবে – এমন রাতের শেষের দিকেই তো খবর ছিল-

‘বাবা আর নেই’।

দুটি কবিতা সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়


বিবস্বান দত্ত-র কবিতা

অভিজ্ঞান

এ কি আর সাজে রাই?
এ পোশাক মায়াচিহ্নময়
দিনান্তের খুনসুটি এইসব লেগে লেগে আছে

লেগে আছে তৃণভূমি
সুবিস্তার আকাশের মত
বললেই কাব্যকথা, আসলে তো বিশেষণ ‘ফাঁকা’

মথুরানগরপতি, রথ চলে ঈশানের মেঘে
ওড়ে শিষ ওড়ে খই
উড়ে চলে জন্মান্তরদাগও

কবে কাকে ছেড়ে আসি
সে কবিতা ভুলিবই যদি

তবে কেন এ পাথর?
খালি পা?

রক্তের হাঁটা!

অতীত

কবি থাকেন কয়াল নদীর তীরে
ইতস্তত ছড়িয়ে থাকে ছায়া
রোদের ছেঁড়া জামার মতো সুরে

কবি গেলেন শহর রঙের বাড়ি
দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে আলো
একলা পড়ে রোদের ছেঁড়া ছায়া

শব্দগুলো কুড়িয়ে নিতেন তিনি
ছোট্ট ঝাঁপি বাঁশের কাঠি দিয়ে
আগলে ছিল শব্দ নুড়ির মতো

তারপরে এক গহিন অসময়ে
শব্দনুড়ি হারায় এক এক করে
কবি খোঁজেন রোদের ছেঁড়া বাড়ি

কবি ছিলেন কয়াল নদীর তীরে
ইতস্তত ছড়িয়ে ছিল ছায়া
রোদের ভাঙা বুকের মতো বাড়ি

সোনালী ঘোষ
দুটি কবিতা


বসন্তের পোস্টকার্ড

এভাবে ফিরে আসা বড়ো দায়

আহা ,দখিনের বাতাস
তোমাকে চুম্বন করে করে, গোটা বসন্তের
পলাশে আরো রঙিন উদ‍্যামতা দিয়েছি।

জানি তো সব একদিন বিচ্ছেদমুখী
তোমার আকার ইঙ্গিত,
ছেড়ে চলে যায় এক স্টপেজ থেকে অন‍্যত্র
পোষ্ট কার্ডের হলদে রঙ আরো আরো হলদে হলে
মায়া বুঝি কেটে যায়,

এভাবে ফিরে আসা বড় দায়…

আংশিক সমুদ্র

ইদানিং কালে একটি মজবুত আশ্রয় চাইছে চোখ;
সন্ধে নামলে
খোলা সমুদ্রের গন্ধে কফির মগ
মনখারাপের ধোঁয়া ওড়ায়।

আমি রঙ তুলি দিয়ে
এঁকে ফেলি বিলুপ্ত সম্পর্কের পূর্বজন্ম,
আর খুঁজতে থাকি
প্রজাপতির ডানার একরোখা জৌলুস…

পলাশ দে-র কবিতা

দুটি কবিতা
সৌভিক গুহসরকার

অফুরান

যেসব শৃঙ্গারকথা এ জন্মে বলা হল না আমাদের, সেইসব কথার গোধূলি রেখে যাই এই জাদুকরী বাংলার শ্যামঘাসে, রাধাচূড়াতলে; রেখে যাই দুপুরের আড়ালে, বকফুলের মতো মেয়েটি যে পথে তার মোমবাতির মতো রোগা প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে গেছে— সেই পথের ধুলোয়; রেখে যাই জ্যোৎস্নাকরুণ কাশফুলের ডাকঘরে।

ফিরে আসতে হবে; মৃত্যুর প্রসিদ্ধ নীরবতা ভেঙে প্রাণের রৌদ্রলিপিতীরে— ঠিক যেখানে শেষ হয়েছিল ঠোঁট, সেখান থেকেই আবার ধরব আখর।

কথারা না শেষ হলে জানি, ফুরবে না জন্মের ডাক— ডানামুড়ে এই ফিরে আসা। জন্ম না শেষ হলে জানি, বারবার ছুঁয়ে যাব এসে— চোখভরা বাংলার ভাষা . . .


ইন্দ্রনীল পত্রিকা

আকাশের ইন্দ্রনীল পত্রিকা; মেঘেদের কবিতায় ভাসে

আলোর সম্পাদনা— অলংকরণ করেছেন: পাখি

আমি তো অরণ‍্য শুধু; ওড়ার ক্ষমতা নেই

তাই আমার যাবতীয় বৃক্ষলতাগুল্ম শিশিরে ভিজিয়ে

আকাশভরা মেঘ পড়তে থাকি!

দুটি কবিতা
রাজর্ষি দে

খারাপ মানুষ

উদগ্র বর্ষা গড়িয়ে চলেছে খারাপ মানুষের দিকে
মিহি বাস্প জমা পড়েছে চশমার কাচে
তার ডান পাশে একটি ভাল মানুষ সাবান মাখছে
তার বাম ধারে একটি নিষ্পাপ মানুষী ঘর ধুচ্ছে

খারাপ আঙুল ভুলে গেছে সাবান-শ্যাম্পু-ফিনাইল
সেগুলি শুধু রতি সিনান সম্পন্ন করছে আদি পাপের জলে

প্রতিবেশী

যেখানে শ্বাসের পাশে শ্বাস থাকতে পারে না
সেখানে শব্দের পরে শব্দ বসাতে ভয় লাগে

এই নিজস্ব স্বেচ্ছাচারিতা, এই আসমানী যথেচ্ছাচার
এটুকু বাগানের পরিধি জুড়েও খরা নামে
এই পিচ কালো ধোঁয়া ফুল সহ্য করতে পারে না
পাতাও খেয়ে ফেলে

ভোরের আলোয় আঙুলগুলো
ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখি
কার কাছে কতটা টিকি বাঁধা রেখেছি
কতটা টান এলে ক-ডিগ্রি মোড় ঘুরে যাবে
ঘষামাজা দাঁতে পচা মাংসের স্বাদ ভেসে আসে

অগত্যা ম্যাজিকের কাল ক্ষয়ে যায়
ইটচাপা যাদুদণ্ডটি শীতঘুমে কালি পেটে থাকে
যেখানে শ্বাসের পাশে শ্বাস থাকতে পারে না
সেখানে আঙুলের পাশে কলম রাখতে ভয় করে

গৌরাঙ্গ শ্রীবাল-এর দুটি কবিতা

রাষ্ট্রযন্ত্র

বুড়ো এক রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ে খেলা করছে রাস্তায়

গণতন্ত্রের সিমেন্ট বালি ইট দিয়ে তৈরি যার মাথা

ভিতরে নতুন ভারতের মেঝে, ফার্নিচার এবং দেয়ালে

প্লাস্টার অফ প্যারিস, উঁচুনীচু পাহাড়ের ছবি।

বুড়োটা অনেক কথা বলে, যেন গল্পঠাকুমার

পিরিতের ভাতার, প্রতিটি

কথায় প্রশ্নের চিহ্নগুলি প্রযুক্তির খুঁটিনাটি

যন্ত্রাংশের মতো যুক্তি-বিযুক্তির মাঝখানে উলটো দিকে

ঝুলে আছে হুইল ছিপের কাঁটা।

গেঁথে আছে। গেঁথে আছে আর ব্যথা পাচ্ছি।

ব্যথিত মাছের উত্তেজনার আবেগে ছুটে বেড়াচ্ছি পুকুরে

উথাল-পাথাল করে কেঁপে উঠছে জল,

সুতোটা দাদুর হাতে যন্ত্রের জটিল প্যাঁচে ধরা।

অনেকক্ষণ খেলেছি। ক্লান্তি আসে। ক্লান্ত।

তবুও ভিতরে প্রাণ। বুড়ো খুশি। উল্লসিত। তার পোষা

কুকুর বেড়াল পায়রা ময়ূরের বুকে আত্মনির্ভর শ্বসনক্রিয়া

আনন্দে টেনে নেয় নির্মল হাওয়া, হাত থেকে খুঁটে খায়

ধান গম চাল আর ভূমিপূজার প্রসাদ।

দেশদ্রোহী

পরিচিত সুখ-দুঃখসীমার ভিতর

ঢুকে গেল এক অন্যরকমের ভাব, ভিনদেশি

রণতরী, মনে হল এ বুঝি বিদেশী শত্রু।

সমস্ত দুঃখের সেনাজাল দিয়ে ঘিরে ফেলে

নিবাসের মধ্যে নিয়ে এলাম, অনেক প্রশ্ন

জিজ্ঞাসার পর সে বোঝাল

সমস্ত দুঃখের জল,

সমস্ত সুখের ঘর তার আছে

তবু ভালোবাসার প্রকৃত দেশ

খুঁজতে খুঁজতে সে অন্যের

সীমানায় ঢুকে পড়ে।

আমার সেনার হাত থেকে তাকে

বাঁচানোর সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে দিলাম এই

সীমানা পেরিয়ে অন্য সীমানায়, আর

আমার সুখ-দুঃখেরা রেগে গেল,

মনে করল আমি দেশবিরোধী, নীরবে

সীমান্তে দাঁড়িয়ে দেখি––

সুদূরে হারিয়ে যাছে সুখের নিশান…।

প্রসূন মজুমদার-এর কবিতা

সৃজনীগণিত

নীরবতা – সাঁকোর ছায়া শূন্য থেকে শূন্যে ঝুলে থাকে।

বিন্দুরা অস্পর্শযোগ্য সরে যেতে চায়, তাই নড়ে।

সেই মৃদু আন্দোলনে যোগমায়া জন্ম নেন ঘরে।

ঘর কিন্তু সম্ভাবনা চেতনার কাল্পনিক তাকে

সাজিয়ে সাজিয়ে রাখা সংখ্যার অসংখ্য খেলা চলে।

ফলে,জন্ম নেয় স্বপ্ন, ভ্রম নয় তবু সে বিভ্রম।

ঘরের আসবাব জানে সংখ্যার আঁচড় জলতলে

ঘূর্ণ্যমান ঢেউ ছাড়া নয় কিছু অতি ব্যতিক্রম।

একে একে দুই আর দুইয়ে যুক্ত থাকারই প্রয়াস।
অনন্ত শূন্যের স্রোতে সাঁকো, দিব্য শিশিরের শ্বাস।


উপহার

নির্লিপ্তি ছাড়া কোনও উপহার দেওয়ার নেই আজ।

কুকুরমুখো একটা হায়নার সঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়ছে ছাগলপানা শেয়াল।

পাখিধরনের কিছু বুনোরেণু বাতাস না পেয়ে খসে পড়ল কাদায়।

কাঁদায় যে হারমোনিয়াম কেউ তাকে কাঁধে করে যাত্রাপালায় নিয়ে যাচ্ছে ।

প্রকাণ্ড হাতির মতো নেমে আসছে সন্ধ্যা।

ধানের খড়ের মধ্যে ঝরে থাকা কয়েকটা দানা খুঁটে তোলে ইঁদুররঙের চোখ

অন্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও বাসস্টপ জানিনা কোথায়!

নির্লিপ্তি ব্যতীত বলো, এই সুখে কতটা আদর দেওয়া যায়?

আয়না উন্মত্ত একটি সকাল
ইন্দ্রনীল চক্রবর্তী

(১)

গাছের ডালে তিরের সংযোগ
রোজ একটি পাখি যে ভাবে জানলায় বসে যায়- পাখি চেতনায়
যে জানলা ঘরে নেই- তার একটি সকাল আছে।

আছে একটি আরশি নগর,
আছে উন্মত্ত বিভ্রম সামগ্রী – হাওয়া মোরগের দিক!
অপ্রতিসাম্যের দিন।

নিজে নিজের মধ্যে যে ভাবে নির্বাণ কে বসাই
আয়নায় ছায়াহীন আলগা ভাস্কর্যে।

সে নির্বাণ অনতিদূর পাহাড় পর্বত পেরিয়ে
দেখে মোরগ ঝুটি হীন সকাল।
দেখে বিরল কেমন করে এগিয়ে আসছে
সূর্যের তেরছা দিনে, শ্রমণ কালে, প্যাগোডা আকাশে
সমর্থ জলে,শান্তির তরে প্রতিবিম্ব কল্পে।

(২)

যে ধ্বনি থাকে ভাষার বাইরে
অপরসায়ন বিক্রিয়া পদ্ধতি
আয়নায় ধ্বনি থাকে না, থাকে না পাহাড় চুড়োর প্রতিধবনি।
নিছক একটি না সভ্যতার দিন আমাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে দূরত্বে
অস্বচ্ছ আকাশ, সাইকেল প্রতিচ্ছবি, ঝরে পরা মৃত ফল
আর একক উপায়ে প্রার্থনার দিন।
সমস্ত প্রার্থনা শেষে – জীবন দাঁড়িয়ে থাকে আয়নার পাশে
উল্কি রং লাগে, নামহীন ঘরে ।
অথ সভ্যতা বসিয়ে যাই নির্বাণ চিত্তে
সমর্থ জলে, শান্তির তরে প্রতিবিম্ব কল্পে।

সুব্রত মিত্র
তোষণ তন্ত্র

সাঁকো গুলো ভেঙে সব সেতু হলো;
বলা হলো না,
নিষেধের দরিয়ায় ঘেরাটোপ নিভে যায়;
বলা হলো না,
দ্রুত গতি অবনতি আসলে তা জীবনের ক্ষতি
কালের নিয়মে আবেগকে ভুলে যায় প্রজন্মের দল হয়ে চঞ্চল,
স্বাদ নেই;গন্ধ নেই;লোভ নেই;ক্ষোভ নেই
এমন সকল তরলের সন্ধান দুস্কর,ইহার সূচনা বিরল।

নেতারা স্বরলিপি আঁকে নিজেদের মতো করে
মসৃণ রাস্তায় মরীচিকা হেসে রয়
ইমারত সাজায় তারা নিজেদের মতো করে
একা পড়ে থাকে বৃক্ষের সাক্ষী।
স্থির জল;
স্থির ঘাট
স্থির ছায়া শীতল,
কখনো তারা যায়নি হারিয়ে
পথ সরে যায়নি পথের পথ হতে দূরে।

সাঁকোর ঠিকানায় সেতু দিয়ে মনগড়া
মনমরা প্রজন্ম এখন সতেজ হবে
অহেতুক সাঁকো ভেঙে সেতু গড়া,
অহেতুক স্বপ্নের মরীচিকায় ছুটে চলা
ছুটে চলা আশ্রয়হীন মিথ্যের ঠিকানায়,
নীতির নির্ধারণ হবেনা আমরণ
প্রাপ্তির আঁচলে বাঁধা আছে ধ্বংসের সন্ধিক্ষণ।

ছাইয়ে ঢাকা আছে তুষের আগুন
ক্ষণিকের লালসায় সেতু দিয়ে মনগড়া নির্মাণ
আসলে তা খোলসের আগুন।

রুমা তপাদার-এর দুটি কবিতা

ভাসান ভাসান খেলা

শুধু শেষ হয়ে আসে আজন্ম মাঠের রেখা
ভাসান ভাসান খেলা টলমলে ক্ষীণ হয়ে এলে
দু-একটি শ্রীকূল পারে সামলে নিতে ভার
অভিযোগ থাকে না কোথাও
শেষ জেনে যেসব পথেরা বাঁক নেওয়া ভুলে গেছে
সেখানে সামান্য জল এসে আশ্রয় জমায় এককোণায়
ফোঁকরেরা বড় হয় জলভারে ধীরে ধীরে
কঠিন পথের কোণ ভাঙে
জল ভারী হয় ধুলো মিশে যায়
ব্যক্তিত্ব থাকে না ধুলো-শ্যাওলা-অপেক্ষায়
বাঁকভোলা স্তব্ধ পথ
ভাঙন জলের দিকে থৈ থৈ এগিয়ে যায়…

আন্তরিক শূন্যতায়

শূন্যতা দু’দিক দিয়ে এলে
বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়
সুঠাম আকাশ এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে থাকে
মেঘ তারা সব এসে আশ্রয় সঞ্চয় করে
দেহটি চৌচির হয়ে নিশ্চিন্ত ঝিমিয়ে বসে
গর্ত খোঁজে চূর্ণ ফেলে দিলে সাফ হয়ে যাবে কালরাত্রি
গুহামুখ বন্ধ হয়ে যায় গোলাকার ইশারায়
স্পন্দনের আগে আকাশ তাগাদা দেয়
আগুন জলজ মাটি ছুঁয়ে দিলে হাহাকার শোনা যায়
মানুষ নিশ্চুপ মেনে নেয় সবই আন্তরিক শূন্যতায়…

দুটি কবিতা
সুপ্রভাত মুখোপাধ্যায়

তালগাছ মাথা তুলে

অস্থির ডাঙার মতো জেগে আছে চোখ

বহু দূর দূর গ্রাম আরও কতো লোক

কোথায় গাছের সারি— মোরাম ধুলোয়

ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে ছড়িয়ে হইচই —

তালগাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ঐ গ্রামে

চিহ্নটি চলেছে যেন হেতমপুর নামে

সেই রাস্তা ধু ধু করছে —পাল্টানো সময়

মাঠে বসে দেখতে পাই; হোয়াটসঅ্যাপ হয়—

আশ্চর্য যুগের হাওয়া — কতো যে হজুগে

পৃথিবীর বাড়ি-ঘরে ছেলে আর মেয়ে

জ্বলে যায় এক একটি তারায়— তারায়

অস্থির ডাঙার মতো বিশ্ব জেগে আছে

আমাদের ছুঁয়ে রোদ— সূর্য হয়ে যায়

প্রাচীন মূর্তির মতো মেঘ

বাঁশের বনের থেকে, মনের কোণের থেকে মাটি

সকাল দুপুর আমরা কবেকার নদী পথে হাঁটি –

সেই যে পথের ছাপে — চিহ্নিত জীবন পদাবলী

আকাশ বাতাস শেখা গৃহিমন, মিহি ও মামুলি।

বালিরাশি ইত্যাদির চাপে পড়ে সময়ের তীর

যেদিকে ফুলের বাস সুগন্ধে ভরেছে প্রাচীর!

প্রাচীন মূর্তির মতো মেঘ এসে গল্প করে যায়

আমাদের নিয়ে ওই পৃথিবীর রোদ –জল–মাটি

দুশো তিনশো চারশো বহু বছরের জন্যে আরও

বিদ্যাসাগরের সেই— সেই চটিজোড়া নিয়ে হাঁটি…


শুভম চক্রবর্তীর কবিতা

নিরুজের রক্ত ও তৃষা

নিরুজের রক্ততৃষা কোনোদিনই সামান্য ছিল না। বইয়ের মলাটে ঝুঁকে থাকা ওই ছবিটির মতো। মশারা গুণগুণ করে আমরা যে কত ভদ্রলোক। এঁটুলির ধুনো তুলে হেঁটে যাচ্ছি দিগন্ত পেরিয়ে। মার্জিত ; পালের গোদা, চার্বাকের একান্ত সাঙাত। খাচ্ছেদাচ্ছে ভুঁড়ি বাগাচ্ছে। আর ভাষা হারিয়ে ফেলেছি, চোর আসা সেই গত রাতে, ঘরের পিছনে। আমাদের মুখে কী যে ক্যালানে মতোন শ্যামলিমা। গানের ওপারে গিয়ে, ভাষার ওপারে গিয়ে, দেখে আসছি পেট্রোলিং কতখানি বাকি আর ছালছেড়ে আস্কা পিঠে কবে হবে আমাদের অম্বুময় দেহ ও সমীহ।

জীবনানন্দ দাশ স্মরণে

ক্যাম্পের ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলো হরিণের নরম সসেজ। তারপর, অন্ধকারে, সাতদিন কেটে গেল চাদর আঁচড়ে ধরে থেকে। কিছু বৃষ্টি হয়েছিল নাকি, কিছু ঝড়। হাসপাতালের ওই ছায়াঘন অবসর থেকে টেনেহিঁচড়ে দু’একটি রেখা আনি, দু’একটি ছ্যাতা পড়া রঙ, প্যারাফিন লণ্ঠনের আলোয় আলোয় ঢাকা অন্ধকার নিভু দ্যোতনার, এবার সময় হ’ল, চলে যাওয়া অপেক্ষা এখন। ঘোড়ারা আস্তাবলে চুক চুক ক’রে ঘাস খায়। তারপর কিছু নেই। হালকা মতো সমবেদনায়, বায়ুভুক ক’টি প্রাণী অন্ধকারে হাত পা নাচায়, খুব মৃদু স্বরে বলে অনেকে মরেছে, কিন্তু, আহা রে এমন মৃত্যু কেউ তো মরেনি।

হিন্দোল ভট্টাচার্য
দুটি চতুর্দশপদী

পুরনো বাড়ির কাছে ফিরে যাই, পুরনো জানলায়
এখনও তোমার মুখ, যে আমায় কোলে তুলে নিত।
যে শিশুর মধ্যে আমি তখনও বুঝিনি আমি আছি…
সে শিশুর চোখে মুখে লেগে থাকত তোমার আদর।

পুরনো গলির কাছে ফিরে যাই, খড়খড়ির গায়ে
এখনও কি লেগে আছে কৌতূহল ? বর্গীদের মিথও
শোনা যেত দুপুরেই, শিয়রে ভনভন করত মাছি।
লাল মেঝে কত লাল হতে পারে, শৈশবের ঘর?

হাতে টানা রিক্সা যায়, লোডশেডিং হলেই আড়ালে
জেগে ওঠে তিরাশির আধোছেঁড়া দীর্ঘশ্বাসগুলি
কুলপি-মালাই, কিংবা আলুর দম নিয়ে অন্ধকার।

পুরনো পাড়ার কাছে এখনও কে মোমবাতি জ্বালে?
কীভাবে তোমার ঘর আমি এই কলকাতায় ভুলি?
ভালোবাসা থাকে সেখানেই, তার ছোট একটা ঘর।

হরপ্পা লুকিয়ে আছে তোমার-আমার শহরেই।
হয়তো দুচোখে দেখা যায় না কখনও তাকে আর
তবু সে রয়েছে আজও, নাগরিক দুঃখগুলো নিয়ে।
হরপ্পা লুকিয়ে আছে, হরপ্পায় জীবিত শহরে।

আছে একটি কালো মেঘ, পশ্চিম আকাশে আছেই।
খরা, মহামারী, আর ভাইরাসের মড়ক, প্রচার
খ্যাতি, যশ, দুর্ভিক্ষের অন্ধকার গলিপথ দিয়ে
হরপ্পা লুকিয়ে চলে যাবে ভাবে বিদেশী আসরে।

তোমার আমার গলি, তোমার আমার বারান্দায়
যে বসন্ত আছড়ে পড়ে, তাকে তুমি বিশ্বাস কোর না।
এ বসন্তে কোকিলের গান নেই, পালক উড়েছে।
এ বসন্তে শহরের খাল ধরে দেহ ভেসে গেছে।
শহরে হরপ্পা আসে, প্রতিদিন, উলটো আয়নায়
তাকে দেখা যায়, তার চোখে মুখে দুঃখ বিবসনা।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (4)
  • comment-avatar
    Gouranga Sribal 7 months

    ভাষাদিবসের প্রাকমুহূর্তে ‘আবহমান’ বল্গজিনে প্রকাশিত সমস্ত কবিতাই পড়লাম। ভিন্ন স্বাদের কবিতা সব। নির্দিষ্ট করে কোনো কবির কবিতাকে ভালোমন্দ বলে বিচার করা সমীচীন নয়। প্রত‍্যেকের কবিতা কবির নিজ প্রতিভার গুণে ভাস্বর। তৃষ্ণা বসাকের লেখা প্রবন্ধটি খুবই প্রাসঙ্গিক। লেখাগুলিতে ছোটোখাটো ত্রুটি থাকলেও আবহমান চলতে থাকুক আবহমানের পথে।

  • comment-avatar
    শীর্ষা 7 months

    খুব ভালো সংখ্যা। কবি সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা দুটি ভীষণ ভালো লাগল। সকলকে ভাষাদিবসের শুভেচ্ছা।

  • comment-avatar
    Trishna Basak 7 months

    বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায়ের কবিতা দুটি অপূর্ব।