জবাবদিহির টিলায় যদি উঠি
: পঙ্কজ চক্রবর্তী

আক্ষরিক অর্থেই ছিটকে মেঝেয় পড়েছিল পাপোশের পাশে। ছিঁড়ে গেছে অনেকখানি। আমার এক মেধাবী বন্ধু বিরক্ত হয়ে ছুঁয়ে ফেলে দিয়েছেন বইটি কিছুক্ষণ আগে। আমি দরজা দিয়ে ঢুকে দেখতে পাই তাকে। কুড়িয়ে নিই সন্দেহের বশে। কবিতাসমগ্র। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। প্রমা প্রকাশনী। সেই প্রথম আমার অলোকরঞ্জনের কবিতার সঙ্গে সহবাস। কয়েকমাসের আচ্ছন্নতা। সেই বই শেষ হতেই আমি নিঃস্ব হয়ে যাই। বহুদিন আর কোনো বই পড়তে পারিনি। এমন স্মৃতিময় সহবাস আমাকে দরিদ্র করে দেয় অনেকখানি। ‘যৌবনবাউল’,’রক্তাক্ত ঝরোখা’ আর ‘নিষিদ্ধ কোজাগরী’র ঐশ্বর্য নিয়ে কতদিন একা একা পথ হেঁটেছে উনিশ বছরের এক উদাসীন বালক। কেবলই স্মৃতির ভিতর ঘাই মারে ‘একটি হাঁসের রাজ্যে হব আমি প্রসন্ন উদাসী।’ তার দুদশক পরে সে টের পায়এক অন্তর্ঘাত। পাঠকের অনিবার্য মুদ্রাদোষ। বুঝে ফেলে প্রথম বই কিংবদন্তি হয়ে উঠলে আজীবন সেই মুগ্ধ শবদেহ বহন করতে হয় একজন কবিকে। পাঠকের মুগ্ধতার এক বিপুল সন্ত্রাসের পাশে চুপ করে থাকতে হয় তাঁকে। আর তাই’যৌবনবাউল’পেরিয়ে দেখা হয়না এই বিশ্বগ্রামের বাসিন্দাকে। এই সুদূর ক্ষতর আজও কোনো শুশ্রুষা নেই।
প্রথম কাব্যগ্রন্থের অসামান্য গভীরতা, সহজ এক লোকায়ত সুর অলোকরঞ্জনের কবিপ্রতিভা অনুধাবন করার পক্ষে এক দুঃসহ বাধা।রিখিয়া, শান্তিনিকেতন আর কলকাতার ভৌগোলিক ব্যাপকতাকে ধারণ করে আছে এই বই শিল্পিত স্বভাবে আর লৌকিক চলনে। স্রোতের মধ্যে তিনি ধরতে চান’ধ্রুবতার আদল।’ অথচ আমরা ভাবলাম তিনি যেন এক শান্ত স্বরের আধ্যাত্মিক কবি। প্রাথমিক একটা অনুযোগ ছিল ‘কৃত্তিবাস’এর পক্ষ থেকে ‘অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কবিতায় অস্থিরতা এবং চাঞ্চল্য দুই অনুপস্থিত।’ অথচ কৃত্তিবাসী ভণ্ড বিদ্রোহের পাশে অলোকরঞ্জনের দার্শনিক নির্লিপ্তিটুকুর নিবিড় পাঠ নিলেই বোঝা কঠিন নয় স্রোতের অভিমুখে তাঁর কবিতার চলন ধারণ করেছে সময়ের উত্তাপ ; ব্যক্তিগত চাঞ্চল্যের উল্লম্ফনে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি।

যৌবনবাউল থেকে মুগ্ধ জাড্যতা সরিয়ে যদি তাঁর কবিতার যাত্রাপথ অনুসরণ করি তাহলে দেখব কত না বিচিত্র পথে এবং বিপ্রতীপে তিনি ধারণ করে আছেন সময়ের স্বর। ‘রক্তাক্ত ঝরোখা’ পেরিয়ে ‘জবাবদিহির টিলা’য় ধরা আছে স্বতন্ত্র এক পরিসর। বিভাব কবিতায় তিনি জানিয়ে দেন ‘দুদিকে খাটিয়া পেতে ঘুমিয়ে থাকে কাতারে – /কাতারে নরনারী তাদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার পথটাই আজ/আমার নিসর্গ।’ এখানেই ছোটো নির্ভার বাক্যের সংহত পাথুরে জমিতে উঠল বিদ্রুপের ছড়। ভ্রমণের ছলে আত্মবিজ্ঞপ্তির মিথ্যে জমিতে ফুটে ওঠে নাগরিক বিষাদ।

“আমার চেয়েও বড়ো?তার মানে বড়োর আড়ালে
এখন লুকোনো যাবে, নিজের নাগরিকতা,
এমন-কী স্বীয় মূল্যবোধ
লুকোনো সহজ হবে , আমার বন্ধুর
মৃত্যুকে ট্যুরিজমের সুরম্য জঙ্গম
অবসরে নিশ্চিন্ত লুকিয়ে
– বুক দিয়ে
সংগ্রাম না করে শুধু আপন-অহং আগলিয়ে-
অপরূপ বিমর্ষ আহ্লাদে
অশাস্ত্রীয় কোকাকোলা খেতে থাকি ছুটির বাগদাদে।”

চতুর্দশ লুইয়ের প্রাসাদ বা আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ির মধ্যে আভিজাত্য আর সময়ের ব্যবধান অনেকখানি। শুধু এক জায়গায় চমৎকার মিল – ভৃত্যবর্গের আবাস একইরকম অস্বাস্থ্যকর,পরিসরহীন।’তাহলে কি অর্ধেকও উঠিনি’কবিতার শেষে এই শাণিত প্রশ্নভরা বিস্ময় কি সভ্যতার আব্রু খসিয়ে দিচ্ছে না অনবরত?

এ এমন এক সময় যখন কবির পক্ষে’সঙ্গোপনে অলোকরঞ্জনা’থাকার কথা নয়। জরুরি অবস্থা বা নকশাল আন্দোলনে যখন ভারি হয়ে আছে চারপাশ তখন ‘বোধের পাখি’কবিও মনে করলেন ‘কবিতাকে শাশ্বতে ন্যস্ত রেখেও যুগাবর্তের সামিল হতে হবে।’ আর তখনই অলোকরঞ্জনের কবিতা হয়ে উঠল ‘চিরায়তের সঙ্গে সমকালীনের অন্তর্বয়নের সমাচার।’ তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত উচ্চারণের পক্ষপাতী- পাঠকের এই ভ্রান্তধারণার বিপরীতে দাঁড়ালেন কবি বহুমাত্রিক বহুমানুষের স্বর নিয়ে। তাঁর কবিতা বৃহত্তর অর্থে রাজনীতিকে ধারণ করল যার কেন্দ্রে মানুষ আর তার দেশকাল জড়িত সত্তা।আরেক দিকে অলোকরঞ্জনের কবিতায় ছড়িয়ে আছে পরিবার। তাঁর সম্পূর্ণতা রিখিয়া থেকে শান্তিনিকেতন এবং বহির্ভারতের কর্মজগতেও। এখানে তিনি বিশ্বনাগরিক, এক বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা। _যৌবনবাউলে’র বুধুয়া,মহিম,তারিনীকাকা,ঝমরু বীতনিদ্র পিতামহ,ঠাকুমা সকলেই এই বিশ্বগ্রামের বাসিন্দা। একটি প্রান্তরের বিষণ্ণ আলো-ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরা।

“মন্দিরের পাশে এক মঠ,
দিগ্বলয় হতে আরো আরো দীর্ঘ মনে হয় যাকে,
হাট বসেছিল কাল, আজ তার বিষণ্ণ বিরাট
শূন্য বুকে ঘুরে মরে একা একটি মা-হারা বাছুর,
সমস্ত দুপুর
খুঁজেছে সে মাকে
তারপর শুয়ে আছে বটের ছায়ায় মৌন রৌদ্রভারাতুর।”

অলোকরঞ্জনের কবিতার প্রধান এক সম্পদ চিত্রকল্প। কবিজীবনের প্রথম পর্বে দু-একটি রেখায় কত না সার্থক দৃশ্যচিত্র এঁকেছেন তিনি।’একটি ঘুমের টেরাকোটা’র মতো কবিতা হতে পারে তেমনি এক দুর্লভ সম্পদ।

“ট্রেন থামল সাহেবগঞ্জে, দাঁড়াল ডান পায়ে।
ট্রেন চলল। থার্ড ক্লাসের মৃন্ময় কামরায়
দেহাতি সাতজন
একটি ঘুমে স্তব্ধ অসাড় নকশার মতন ;
এ ওর কাঁধে হাত রেখেছে, এ ওর আদুল গায়ে:
সমবেত একটি ঘুমের কমনীয়তার
গড়েছে এক বৃত্তরেখা, দিগ্বধূর স্তন;
পোড়ামাটির উপর দিয়ে আকাশে রথ যায়।”

যাঁরা অলোকরঞ্জনকে শুধু এক নম্র গীতিকবি ভাবেন তাঁরা হয়তো খোঁজ রাখেন না তাঁর প্রজ্ঞাশাসিত মেরুদণ্ডের – কবিতায় এবং জীবনে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যসভায় ছুঁড়ে দেন সপাট জবাব। এমনকী বয়স তিরিশ পেরোনোর আগেই অগ্রজ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে বিনীত সুরে জানিয়ে দেন ‘disturb করা কবিতার ধর্ম নয়।’পঞ্চাশের কবিদের অনেকের সময়টাই যখন আত্মবিজ্ঞাপনের তখন তিনি স্থিত থাকেন এই বিশ্বাসে :

‘কবিতা কবির চেয়েও বড়ো সংঘটন। কবি যদি নিজেকে কবিতার চেয়েও আকর্ষণীয় ও জরুরি করে তোলার জন্য তৎপর হয়ে ওঠেন, কবিতার কোনো উপকার হয় না তো বটেই, কবি সামাজিক উচ্চাশার চাপে তাঁর ক্রমমুক্তির সম্ভাব্যতাকে খুইয়ে বসেন।’

তাই অলোকরঞ্জন জনপ্রিয়তার বদলে চেয়েছেন প্রিয়জনতা। আজীবন স্থির ছিলেন এই বিশ্বাসে ‘আমি যাই-ই করি, সেই সুরটাকে মানবতন্ত্রে বাজিয়ে নেব।’ সেই সুর ‘যৌবনবাউলে’ আছে কিন্তু তাকে সম্পূর্ণত পেতে হলে আমাদের’জবাবদিহির টিলা’য় উঠতেই হবে। ফেলে আসতে হবে অলোকরঞ্জন সম্পর্কিত যাবতীয় অভিযোগ এবং মুদ্রাদোষ।

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (2)
  • comment-avatar
    উজ্জ্বল ঘোষ 7 months

    এই লেখাটি মুগ্ধ করে দিল। অসাধারণ রচনা!

    • comment-avatar
      Pankaj Chakraborty 7 months

      আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা নিয়ো।