অজিত সিং বনাম অজিত সিং <br />  সপ্তদশ পর্ব <br /> তৃষ্ণা বসাক

অজিত সিং বনাম অজিত সিং
সপ্তদশ পর্ব
তৃষ্ণা বসাক

অজিত সিং প্রথমে ছিল বঙ্গলক্ষ্মী চানাচুর, তারপর এল আজাদ হিন্দ চানাচুর, তারপর একের পর এক বিপ্লব চানাচুর, সর্বহারা চানাচুর, উন্নততর সর্বহারা চানাচুর, এখন চলছে বিশ্ববাংলা। এখানেই কি ভাবছেন গল্প ফুরিয়ে গেল? এবার আসছে একে ফিফটি সিক্স চানাচুর। নাম যাই হোক, সোল এজেন্ট আমি।’ ‘বেওয়ারিশ’ গল্পের চানাচুরওলা এবার ঢুকে পড়েছে বাংলার শিল্পক্ষেত্র থেকে শিক্ষাজগতের ক্ষমতার অলিন্দে।খুন, যৌনতা, প্রতিশোধ, নিয়তিবাদের রুদ্ধশ্বাস সুড়ঙ্গে সে টের পাচ্ছে- -বহুদিন লাশের ওপর বসে বারবার হিক্কা তুলেছি আমরা -বহুদিন মর্গের ভেতরে শুয়ে চাঁদের মুখাগ্নি করেছি আমরা -অন্ধ মেয়ের মউচাক থেকে স্বপ্নগুলো উড়ে চলে গেছে (জহর সেনমজুমদার) এই সবের মধ্যে বাংলার কি কোন মুখ আছে আদৌ? থাকলে কি একটাই মুখ? না অনেক মুখ, সময়ের বিচিত্র রঙে চোবানো? বিগত প্রায় অর্ধশতাব্দী জুড়ে বাংলার অজস্র মুখের ভাঙ্গাচোরা টুকরো খুঁজে চললেন তৃষ্ণা বসাক, তাঁর নতুন উপন্যাস ‘অজিত সিং বনাম অজিত সিং’-এ । সব কথনই রাজনৈতিক, সেই আপ্তবাক্য মেনে একে কি বলা যাবে রাজনৈতিক থ্রিলার? সিটবেল্ট বাঁধুন হে পাঠক, ঝাঁকুনি লাগতে পারে। প্রকাশিত হল উপন্যাসের সপ্তদশ পর্ব।

১৭

পুরনো খাতাপত্র ঘেঁটে যা পাচ্ছি, তাতে বলা যায় কুন্দেরার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ৯৮ বা ৯৯ সালে। সেন্ট্রাল লাইব্রেরির তিন তলায়। মোটা কমলা রঙের পর্দার মধ্যে দিয়ে ঢুকে আসছে কমলা রঙের আলো। কেমন উষ্ণ, কোমল স্পর্শ বইগুলোর। আমি অন্ধের মতো হাতড়াচ্ছি, টেনে নিচ্ছি কোনটা কোনটা, পড়তে পড়তে উঠে যাচ্ছি, হয়তো আবার হাত বাড়াচ্ছি বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক কোন বিদেশি জার্নালে। এসব তো গুগলজেঠুর অনেক অনেক আগের কথা, যখন গবেষণা করতে গেলে সার্চ করতে হত জার্নালগুলোই। না, না, ইন্সটিটিউশনে নিশ্চয় নেট আছে, কিন্তু হাতে হাতে মোবাইলে তো আসেনি তখনো। জার্নালগুলোই ঈশ্বরের মতো। আমার তখন একটা অস্থির অস্থির অবস্থা। ইন্ডাস্ট্রি ছেড়েছি, কিছু না পেয়েই ছেড়েছি। এরকম কেউ করে? কিন্তু ছাড়ার আগে তো সব্যসাচী স্যারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, গাপ্পুকে অবশ্য পরে জানিয়েছিলাম, সব্যসাচী স্যার বলেছিলেন ভিজিটিং পড়াও, তারপর পি এইচ ডি টা করে নেবে পাশাপাশি। ভেবেছিলাম এই কথাটাই যথেষ্ট। আর আমার ওইরকম রেজাল্ট! ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং একসঙ্গে পেলাম জয়েন্টে, তখন তো সবই সরকারি, টাকা দিয়ে উচ্চ শিক্ষা কেনার কথা কেউ ভাবতে পারেনি, মেধাটাই সব, মেধা দিয়ে দুনিয়া জিতে নেওয়া যাবে এমন সবাই ভাবত, মফস্বলের রাস্তায় হেঁটে গেলে তাকাত লোকে, আঙুল দেখিয়ে বলত, ওই মেয়েটা ন্যাশনাল স্কলারশিপ পেয়েছে, ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং দুটোই এক সঙ্গে, হয়তো দোলনচাঁপা, তুইও তেমন শুনেছিস, তোদের বেনীনন্দন লেনের গলিতে। বিশ্বায়নের আগে কলকাতা আর মফস্বল অনেকটাই এক রকম। বিশ্বায়নের শুরুতে অবশ্য মফস্বল প্রথম ধাক্কায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছিল, তখনো তো হাতে হাতে ফোন আসেনি, তাই ইনফো রিচরা কলকাতায় আর ইনফো পুওররা সব মফস্বলে। কিন্তু সেই শুরুর ঠিক আগের সময়টায়, বাম জমানায়, কলকাতাও বেশ অমল সারল্যের মফস্বল টাইপ। তখনো এ বাড়ির রান্নার গন্ধ ও বাড়িতে পৌঁছত, একটা পাড়া কালচার ছিল, তাই আন্দাজ করতে পারি দোলন, তোকে নিয়েও বেশ গর্ব গর্ব ব্যাপার ছিল তোদের পাড়ায়, যদিও ছোট থেকেই তোরা কোয়ার্টারে থাকতিস। তোদের শরিকি বাড়ির অশান্তি এড়াতে। আমি তো কোয়ার্টারেই গেছি। কিন্তু তুই পাড়ার মেয়েই থেকে গেছিলি, তুই বলেছিস ওই বাড়িতে একটা ঘর ছিল তোদের একেবারে নিজস্ব, মাসে একবার দুবার যাওয়া হতই।

আমাদের ছোট শহরে আমাকে নিয়ে একটু বেশি মাতামাতিই হত। মিউনিসিপ্যালিটি থেকে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছিল, আর তার আগে জানতে চাওয়া হয়েছিল আমি কী কী বই চাই। দারুণ ব্যাপার না? সমাবর্তনের ছবিটা, কমলা রোব পরা, উজ্জ্বল, স্বপ্নিল, কাচের শোকেসে রাখা থাকত। সবাই দেখত, মার হাতের লুচি তরকারি খেতে খেতে দেখে। সবাই তো বলত লেকচারার হিসেবেই ঢুকছ তুমি, এইরকম রেজাল্ট। ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকার দরকার কী ছিল বলে বকুনিও দিত।
ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি হিসেবে আমি সপ্তায় তিনদিন ক্লাস নিই, ইন্ডাস্ট্রির তুলনায় অখণ্ড অবসর মনে হয়। প্রথম প্রথম এত ভালো লাগে যে মনে হয় এত বছর পরে মুক্তি পেয়েছি। এইবার একটু নিজের মতো পড়াশোনা করব। তাই সেন্ট্রাল লাইব্রেরি যাই সময় পেলেই। সোজা তিনতলায়। কেউ যায় না খুব একটা সেখানে। এক ঘর লোভনীয় খেলনার মধ্যে একজন বাচ্চাকে ছেড়ে দিলে যা হয়, আমার তেমন দশা। এইভাবেই একদিন পড়তে শুরু করি ‘দা বুক অফ লাফটার অ্যান্ড ফরগেটিং’ লেখক মিলান কুন্দেরা। পড়তে শুরু করে আর ছাড়তে পারি না, উঠে যেতে পারি না আরও আকর্ষণীয় কোন মলাটের কাছে। পড়েই চলি।
ওর কাছাকাছি সময় আরও একটি বই পড়া হল। একই রকম আবিষ্টতায়। আর সেই বইটি আমার পরবর্তী জীবন ও যাপনকে অনেকটাই বদলে দিল। ‘ফিউচার শক’। লেখক অ্যালভিন টফলার। টফলারের এই বইটা পড়তে দ্যায় তমালদা। নকশাল আন্দোলনের ডাকে যার মেকানিক্যালের ডিগ্রিটা শেষ করা হয়নি। সমাজ পাল্টাতে গিয়ে সমাজের প্রান্তিক মানুষ হিসেবে বেঁচে রইল শেষ পর্যন্ত। যতদিন না ক্যানসার এসে ইতি টেনে দিল জীবনের। এনার্জি স্টাডিজের সামান্য একটা কনসলিডেটেড দক্ষিণায় অচল সংসার টানতে টানতে রাত জেগে অনুবাদের কাজ, আরও কী কী জানা নেই, কিন্তু তমালদার হাসিতে ঝিলমিল চোখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না সেটা। প্রচুর পড়ত, কাগজ চালাত একটা ‘বাস্তবিক’ নামে, আর অমিতাভ সেন ছদ্মনামে কবিতা লিখত। এই বাস্তবিক পত্রিকাতেই বোধহয় কুন্দেরার একটা গল্পের অনুবাদ চোখে পড়ে। তবে কুন্দেরার কোন বই তমালদার হাত হয়ে আসেনি, যেমন এসেছিল ফিউচার শক। কুন্দেরাকে আমি নিজেই খুঁজে নিয়েছিলাম সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে।
এর অনেক পরে পড়েছি ‘আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিইং’ বইটা। আর কেবলই মনে পড়েছে তমালদাকে। ওইরকম অত ভারহীনতা কি আর দেখেছি, আর কারো মধ্যে? না নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা, না রাষ্ট্র, না রাজনৈতিক বিশ্বাস, না উত্তাল সত্তরের স্বপ্ন যাকে ওজন দিতে পারল না, আজীবন তাকে ভেসে থাকতে হল । উড়তে উড়তে শুধু মাঝে মাঝে সবুজ বৃক্ষকে ছুঁয়ে ফেলা, কবিতায় সেঁকে নেওয়ার চেষ্টা স্বপ্নকে- এই তো তার একদানা সর্ষের মতো ওজনদার অস্তিত্ব। আমি কি দেখতে পাচ্ছি না টমাসকে, নামী শল্য চিকিৎসক টমাস, যে চাকরি খুইয়ে জানলা মুছে বেড়াচ্ছে? কিছু কিছু মানুষ যেমন ভারহীন হয়, তেমন ভারহীন তো ইতিহাসও।

History is as light as individual human life, unbearably light, light as a feather, as dust swirls into the air, as wheather will no longer exist tomorrow.

কুন্দেরার এই পাঠে পৌঁছনর আগে থেকেই বিগত দু-দশক ধরেই আমি, আমার ইতিহাস, এই রাজ্য, এই রাষ্ট্র, এই পৃথিবীর ইতিহাস চোখের সামনে কেমন গুঁড়ো গুঁড়ো ধুলো হয়ে গেল।

‘কোন কাজে হাত দেবার আগে, আমাকে বারবার রিওয়াইন্ড করে দেখে নিতে হয়
বাবার মৃত্যুদৃশ্য,
হ্যাঁ মৃত্যুও কখনো কখনো দৃশ্য আর তার নিয়তিতে অনিবার্য ধূলো,
যেমন ধূলো ১৮ টি শিশুর অবয়বের ওপর, এক সপ্তার মধ্যেই
সমস্তই স্বাভাবিক, এই মৃত্যু, এইসব ধূলোর জটলা,
ধূলো তো শেষ পর্যন্ত ধূলোতেই ফিরে যাবে
এরকম তো কতই হয়, বানতলা থেকে গুজরাট পর্জন্ত,
‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ শুনতে শুনতে আত্মা ঢুকে যায় নতুন খোলসে,
শুধু রেললাইনের ধারে পড়ে থাকা কাটামুণ্ডু
কয়েক ইঞ্চি দূরের ধড়ের সঙ্গে কিছুতে মিলতে পারে না,
পারে না অনেক রাতে বাড়ি ফিরে মাকে বলতে
‘ভাত খাব, বড্ড খিদে পেয়েছে’
…’

‘আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিইং’ উপন্যাসটি শুরুই হচ্ছে নীৎসের ইটারনাল রিটার্ন বা চিরায়ত প্রত্যাবর্তন দিয়ে। একবার যা ঘটেছে, বারবার তা পুনরাবৃত্ত হয়, তা নিয়ে ধন্দে কুন্দেরা।
এই ‘ম্যাড মিথ’ কে তিনি দেখতে চান অন্যভাবে।একদম অন্যভাবে।
Putting it negatively, the myth of eternal return states that a life disappears once and for all, which does not return, is like a shadow, without weight, dead in advance, and wheather it was horrible, beautiful and sublime, its horror, sublimity and beauty mean nothing.
এটা খানিকটা বুঝতে পারি যখন ব্যক্তিজীবনের বা রাষ্ট্রের কোন ভয়াবহ স্মৃতির সঙ্গে মেলাই। সেই অমৃতা প্রীতমের একটি গল্পের চরিত্র, হিরোশিমার বোমা পড়ার মুহূর্তে যার ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফেরার মুহূর্তটি একটা ফ্রিজ শট হয়ে গেছিল। তারপর তো মুহূর্তটি এত ভয়ানক থাকে না, গুরুত্বহীন একটা তথ্য, মিয়ার ফ্যাক্ট।
পূর্বজন্ম, জন্মান্তরবাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা আমাদের কিন্তু ইটারনাল রিটার্ন বা অনন্ত প্রত্যাবর্তন বুঝতে অসুবিধে হয় না। এর মধ্যে যে একটু পালাবার পথ থাকে, নিঃশ্বাস নেবার জায়গাটুকু থাকে তা আমরা বিলক্ষণ বুঝি। পরের জন্মে আর একটু ভালভাবে, আর একটু ক্ষমতাবান হয়ে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা – বাস্তব থেকে পালাতে সাহায্য করে। আমরা তাই আশা করতেই পারি টমাস, সাবিনা, টেরেসা সবাই একটা মুক্ত রাষ্ট্রে জন্মাক। সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনে ছটফটিয়ে মরা চেকোস্লোভাকিয়ায় নয়, যেখানে লুঠ হয়ে যায় ইতিহাস, স্মৃতি সত্ত্বা, ভবিষ্যৎ, শুধু জানলা মোছা কিংবা জীবন্ত কাকের জন্য কবর খোঁড়ার কাজ, সেখান থেকে চির অভিবাসে চলে যেতে হয় শত শত লেখক শিল্পীকে।
মধ্য ইউরোপ জুড়ে কমিউনিস্ট রাজত্বের এই বিভীষিকার মূলে তো ছিল একটি মোহ, স্বর্গে যাবার একমাত্র রাস্তাটি তারাই আবিষ্কার করেছে।
কিন্তু হায়, স্বর্গ বলে কিছু ছিল না, কিচ্ছু না। না বাম, না অতি-বাম, না ডান কেউই স্বর্গের রাস্তা জানে না। যেখানে তারা পৌঁছতে চেয়েছিল সেটা ভুল স্বর্গ। আর এই ভুল স্বর্গে পৌঁছতে গিয়ে তমালদার মেকানিক্যালের ডিগ্রিটা পাওয়া হল না, তাকে প্রজেক্টে কাজ করে যেতে হল ৫০০০ টাকা কন্সলিডেটেড স্যালারিতে। তার এক কমরেড, একটি মেয়ে, দীর্ঘদিন আত্মগোপন পর্বে, ভালো করে স্নান করতে পারেনি, তার সারা গায়ে উকুন বাসা বেঁধেছিল। সেই দুঃস্বপ্নের উকুন বাছতে বাছতে সে হয়তো এখনো ঘুমের মধ্যে শিউরে ওঠে। পুনর্জন্ম, অনন্ত প্রত্যাবর্তন থাকলে আমরা তো চাইতাম তমালদা এ জন্মে ডিগ্রিটা কমপ্লিট করুক, তার বিপ্লবী বান্ধবীর গায়ে উকুন না জন্মাক আর কোনদিন। কিন্তু না, আমরা তো একবারই সুযোগ পাই। একবারই, জাস্ট একবারই।

কিন্তু তুই বা আমি সেই একবারও সুযোগ পেলাম না কেন বলতো? ডিপার্টমেন্টে এক সেমিস্টারে আমি ফার্স্ট, তো আরেক সেমে তুই। ছেলেগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত শুধু, এমনকি ল্যাবেও কেউ সুবিধে করতে পারত না। যদিও আমি বেশিবার ফার্স্ট হয়েছিলাম, কিন্তু ফাইনালের গোল্ড মেডেলটা তুই পেলি, ক্লাসের সবাই আমাকে সান্ত্বনা দেবার ছলে এসে বলেছিল ‘দোলন তো পাবেই, ওর বাবা এখানকার প্রফেসর, তাছাড়া প্রদীপ্তদার সঙ্গে লাইন মারছে, প্রদীপ্ত ধর মালটার হেভি ক্যাচ, দেখবি দোলনও লেকচারারশিপ পেয়ে যাবে’
এই কথাগুলো আমি কোনদিন পাত্তা দিই নি। এই যে মেয়েদের বিরুদ্ধে মেয়েদের লাগিয়ে দেওয়া, কোন মেয়ে ওপরে উঠলেই তার পেছনে তার শরীরের মূলধন খোঁজা। আমি তো বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি, যেখানে মেধা আছে, সেখানে শরীরকে ব্যবহার করা মানে আত্মবিশ্বাসের অভাব, মেধার অপমান। কোন সেন্সিবল মেয়ে করতে পারে এসব? দোলন তো নয়ই, ও তো বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা একটা মেয়ে। পড়ার বইয়ের বাইরে ওর জি কে প্রায় জিরো বললেই চলে। খুব স্বাভাবিক, ও ফার্স্ট হয়েছে। ওর মতো গাঁতিয়ে পড়তে পারিনি আমি। আমার তো কত টান ছিল এদিক ওদিক। সাহিত্য, নাটক, গান।

কিন্তু বিশ্বাস কর দোলন, কোন কোন দুর্বল মুহূর্তে আমার কষ্ট হয়েছে, ন্যাশনাল টাইমসের চাকরিটা তুই পেয়ে গেলি, অনেক ভালো প্যাকেজ, আর আমি ফরোয়ার্ড প্রেসে, কত দূর বাড়ি থেকে, অত কম মাইনে, মনে হয়েছিল বাবা, প্রদীপ্তর কানেকশন তোর কাজে লেগেছে নির্ঘাত। আরও না জানি কী কী। আমি চাকরি ছেড়ে যখন ডিপার্টমেন্টে দেখা করলাম, ক্লাস নিতে শুরু করলাম, তখন শুনলাম, তুইও চাকরি ছেড়ে দিয়েছিস, তোকে কোন টেকনিকাল কাজ দেওয়া হয়নি বলে, স্রেফ সফিস্টিকেটেড কেরানিগিরি করাত। ক্লাস নিচ্ছিলাম, ভেবেছিলাম, লেকচারাশিপের পোস্ট বেরোলে আমার সবচেয়ে বেশি দাবী থাকবে। তুই শুনলাম এম টেক করছিস, অন্য স্ট্রিমে।আমাদের লাইনে তখনো এদেশে এম টেক চালু হয়নি। কে যেন বলল ও আরও বড় দাঁও মারার জন্যে তৈরি হচ্ছে। সেসময় দেখা হলে আবছা হাসি হাসতাম। দূর থেকে মাপতাম দুজন দুজনকে, মনে আছে? কেন করতিস দোলন এমন? কেন এমন করতাম আমি? কেন আমরা সেসময় দুজনে দুজনের পাশে থাকতে পারিনি?যখন আমাদের দুজনেরই দুজনকে বেশি দরকার ছিল। বিশেষ করে আমি নিজের ভূমিকার কথা ভেবে লজ্জিত হই।
অনেক অনেক দূরে আছি আমি এখন, সারা সপ্তা ছুটোছুটি, শনি রবি নদীর ধারে জঙ্গলে চলে যাই। চ্যাটাহুচি নাম এ নদীর। এই দুদিন আমি কাজ থেকে অনেক দূরে থাকি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা ভাবি। তোর সঙ্গে অ্যামিনিটি ক্যান্টিন, তুই গড়িয়াহাট চেনালি, সোনালি রেস্টোরেন্টে ধোসা, গোলপার্কের ফুটপাথে লেন্ডিং লাইব্রেরি, সেই এক দিন ট্রেন বন্ধ ছিল বলে তোদের কোয়ার্টারে থেকে গেলাম। অদ্ভুত সেই রাত। সারারাত গল্প করেছিলাম আমরা, তুই প্রদীপ্তর কথা বলে চলেছিলি, আমি কারো কথা বলতে পারিনি বলে কষ্ট পাচ্ছিলাম, যদিও একটা গোপন রাগিনীর মতো ছিল সে। কেন সেসময় ভেবেছি, আমি মফস্বলের যোগাযোগহীন একটা মেয়ে, স্রেফ মেধা ছাড়া আর কিছু নেই আমার, আর সেখানে তোর চারপাশে কত বর্ম, বাবা ওখানকার অধ্যাপক, আমার তো বাবাই নেই, বাবা চলে গিয়ে জীবনটাই তো এলোমেলো আমার, কিন্তু শুধু নিজের কথা ভাবলাম কেন দোলন? তাহলে তো তোর আজ এই অবস্থা হত না? চোখের সামনে তমালদার মতো একটা ছেলেকে দেখেও কেন নিজের ভেতর থেকে একটু বেরিয়ে আসতে পারলাম না?
যদি আসতে পারতাম, তাহলে ইনশাল্লাহ, আমাদের দুজনের জীবনটাই অন্যরকম হত রে। এই রে, ইনশাল্লাহ বললাম বলে অবাক হলি খুব, না? তুই তো জানিস আমি বরাবর শাহরুখ খানের ফ্যান। শাহরুখ খুব বলে না এই কথাটা? জানি, তুই বলবি, আগে তো বলিস নি কোনদিন, আর এখন কেন বলছিস? তুই একটা মেছো গন্ধ পাবি, তোর মতো মেয়েও, যে কোনদিন কাউকে সন্দেহ করে নি, খারাপ চোখে দেখে নি, সেও না ভেবে পারবে না, বিদিশার হল কি? জীবন, দোলন, জীবন। জীবন আমাদের দিয়ে কত কী করিয়ে নেয় বলতো? নইলে আমি কি ভেবেছিলাম এত দূরে চলে আসব মাকে ছেড়ে? না রে, মাকে ছেড়ে আসিনি, মা চলে যাবার পরেই সিদ্ধান্ত নিলাম চলে আসার। আর কোন বন্ধনই রইল না। তুই তো জানিস মা, যতদিন বেঁচে ছিল, আমাকে কীরকম আটকে রেখেছিল। হস্টেলে থাকতে হবে স্রেফ এই কারণে ডাক্তারিই পড়তে দেয়নি। আমাকে কত লোক বলেছে ডাক্তারিই মেয়েদের পক্ষে বেস্ট। আর কিছু না হলে বাড়িতে একটা চেম্বার খুলে বসা যায়। আর আমি আর তুই পড়লাম সদ্য খোলা একটা ইঞ্জিনিয়ারিং, যাতে ওপেনিং কম, অন্তত এই বাংলায়। যারা প্রথমেই বাইরে চলে গেছিল, অ্যাট লিস্ট রাজ্যের বাইরে, তারা বেঁচে গেছে। বহুকাল তো এখানে কোন ইন্ডাস্ট্রি নেই, কলকারখানার চিমনি গুলো চ +ই+ এমনি এমনি হয়ে গেছে, সেখানে মা আমাকে বাইরে যেতে দিল না। বম্বে, (মুম্বাই এখনো অভ্যেস হয়নি রে) দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর কোথাও না। বাবা চলে যাবার পর আমাকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছিল। দোষ দিতে পারি না, তবু আমার জীবনটার কথা ভাবেনি। মাকে দেখে আমি ভেবেছি কি জানিস? সংসারটা খুব ছোট জায়গা, সব খেয়ে নেয়। আমার আর ওসব ইচ্ছে করেনি।
মা চলে যাবার পর চলে এলাম। ভালো আছি দোলন, ইনশাল্লাহ, খুব ভালো আছি। শুধু একেকদিন রাতে জেগে উঠি ছটফট করে। ইচ্ছে করে চলে যাই, কেউ হয়তো আমাকে মনে রাখেনি, তুইও না, তবু যাই। তুই নিশ্চয় এখন ভাবছিস এতদিন পরে তোকে মেল করছি কেন? বলব দোলন, সব বলব। ইনশাল্লাহ।

(ক্রমশ)

CATEGORIES
TAGS
Share This

COMMENTS

Wordpress (0)