
এই জন্ম,এই ভাষা, এই ডাক মায়ের সমান
বেবী সাউ
১.
শান্ত একটা দ্বীপের মতো হয়ে উঠছি ক্রমশ। যেখানে কোনও শব্দ নেই, অক্ষর নেই; নেই প্রেম-বিরহকে অনুবাদের ভাষাটুকুও। নির্জন এই দ্বীপের খাঁজে আদিগুল্মলতা। সকালের রোদ বলে, আরও শান্ত হও! দুপুরের নির্জনতা আরও… আরও মৌন! মৌনতার দিকে হেঁটে যেতে যেতে কত জন্ম তৈরি হয়! কত মৃত্যু ভেঙে যায়! কত দেহ শীত হয়ে যায়…
একা!
২.
পাখির ডাক হয়ে ওঠে বসন্ত! ফুলের গাছ হয়ে যায় রাধা! সকালের শিশির ভেজা পা, রূপকথার গল্প শোনাতে শোনাতে বাউল গায়। নগরকীর্তনে ভিড় করেন আমাদের বুড়ো রাধামাধব! হলুদ পাখি, বউ কথা কও সুরে মন ভোলায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে!
স্রোতের মতন, গানের মতন, সুরের সাধনার মতো ভরে ওঠে এই জন্ম! এই ভাষা!
৩.
কাকে তুমি পরিচয় দেবে? কাকে বলবে আত্মকথন? জীবনের পরতে পরতে নীরবে ইতিহাস জমে ওঠে। ইতিহাসের খাঁজে প্রপিতামহদের গল্প। শ্যাওলা পড়ে। মসের গায়ে জমা হয় পরগাছা। রূপকথার নায়িকা হয়ে যেতে যেতে দেখি, এই জন্ম আসলেই প্রকৃতি, এই জন্ম শব্দ কল্প দ্রুম!
ভাঙতে এসেছি আজ, অধিকার বশে, মাতৃভাষাকে মৃত ঘোষণা করে যারা, এই নির্জন সন্ত্রাসের যুগে!
৪.
অথচ আরও বেশি শুষ্ক হয়ে ওঠে এই ফাগুন। পলাশ শিমুলের গায়ে রক্তাক্ত কাহিনি। জোনাকির স্রোত এসে সেসব কাহিনির গায়ে আলো জ্বেলে যায়। হো হো করে হেসে ওঠে নির্বাচিত সরকার আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ দল… দিন পেরোয়…
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে শান্ত নদীটির গায়ে। মাঝি উদাসীন। গান ধরে। ভাটিয়ালি সুর যেন রাক্ষসের মরণ কাঠি, দিক থেকে দিগন্তে ছড়ায়…
৫.
এই ভাষা কাকে দিয়ে যাব? অভিমানে চোখ তুলে দেখি, ফিঙেটির শ্যামল শরীর। কালো গাইটির চোখে মায়া আর মায়া! ফুটপাতে, রুখা চুলে বসে থাকা সামান্য বালিকা সেই, শালুক শালুক মুখে তুলে আনে টুসু ভাদু গান! ধান ওঠে! ফসলের গন্ধে ভরে আমাদের সামান্য উঠান।
এই গন্ধ, এই রূপ, এই যাপিত বাস্তব — সবকিছু আসলেই মায়ের সমান…

