
বন্দনা ঘোষ-এর গুচ্ছ কবিতা
ব্যস্ততা
নীল রং তুমি এখনও
আগের মতোই পছন্দ করো?
তুমি বলেছিলে,
আমার নীল চোখেই ,
তুমি খুঁজে পাও তোমার মস্ত আকাশ।
আর আমার ,
আগুন রঙের শাড়িটাকে,
তুমি বলেছিলে,
বসন্তের প্রথম ফোঁটা পলাশ।
সেই শাড়িটার রঙ আজ ফিঁকে
শীতের জড়তা –
বাসা বেঁধেছে মনের মধ্যে।
আমাকে ভীষণ ভাবে
ভাবিয়ে তোলে,
তোমার এই অকারণের ব্যস্ততা।
ব্যস্ত থাকাটাও একটা অভ্যেস,
যেটা তুমি খুব সহজেই ,
রপ্ত করে নিতে পেরেছো,
এখন আমারই শুধু অবসর যাপন।
তুমি দেখে নিও,
আমিও একদিন –
সমুদ্রের ঢেউয়ের কাছে
ঠিক শিখে নেব,
কিভাবে ব্যস্ত হয়ে যেতে হয় ।
ফিরে এসো
একটা বিষাদময় বিকেল
আর শীতের দীর্ঘ রাত্রি আমার জন্য থাক,
তোমাকে একটা রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল পাঠালাম।
তুমি না হয় বসন্তের সন্ধে হয়েই ফিরে এসো!
এক টুকরো মন
ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া …
মনটাকে এক জায়গায় জড়ো করে বসে আছি
জুড়ে নিতে পারলেই একটা গোটা।
কিন্তু ওই একটা, একটা টুকরো কিছুতেই
খুঁজে পাচ্ছি না…
ওটাই নাকি আমার প্রথম প্রেম।
নারী
আঠারো তে নয়,
তিরিশ এর কোঠায় পৌঁছিয়েই নারী
হয়ে ওঠে সর্বাঙ্গ সুন্দরী।
যখন ত্রিশের জীবন, জীবনের মধ্য গগনে,
তখন আত্মগ্লানি, হীনমন্যতা,
ষোড়শীর লাজুকতা ,
কিছুই থাকেনা।
যে অষ্টাদশী প্রেমিকা মেয়েটি,
তার সঠিক জীবন সঙ্গীকে চিনতেই ,
জীবনের অর্ধেক সময়…
কখন পেরিয়ে যায় বুঝতেই পারেনা,
সেই মেয়েটিই তিরিশ এর কোঠায়,
সমাজের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের,
চোখে চোখ রেখে,
খুব সহজেই…
মিথ্যেকে গভীর সমুদ্রের জলে ছুঁড়ে ফেলে…
ভাসতে পারে , মিথ্যে হাসি হাসতে পারে।
আর যা পারে তা হলো…
কঠিন বাস্তবতার পায়ে পা মিলিয়ে
নিজেকে বেশ সামলে নিতে।
তাই ষোল -সতেরো -আঠারো ,
ঊনিশ কিংবা কুড়িতে নয়,
নারী তুমি তিরিশেই,
এ সংসারে বেশ মানানসই।
নিঃসঙ্গতা
বৃষ্টি থামার পর,এক অনাবিল নিঃসঙ্গতা,
তোমার এই উদাসীনতায়,
আমার ক্লান্তি , মনখারাপ,ভালোলাগা,
স্পৃহা, নিস্পৃহতা
সব এক জায়গায় জড়ো হয়ে,
দলা পাকিয়ে যায়।
নিজের অনুভূতি গুলো যখন নিজের কাছেই অস্পষ্ট,
তখন তা অন্যের কাছে তুলে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে।
তার থেকে অনেক সহজ শ্রাবণের ধারার মতো
তোমার বুকের পরে, চোখের পরে ঝরে পড়া।
ভেজা চুপচুপে পালকের আড়ালে,
পাখির যেটুকু হৃদয় লুকিয়ে আছে,
তা খুঁজে নেওয়া অতটাও সহজ হবে না।
যতটা সহজ উপায়ে,
তুমি সরু, সুচারু, সবুজ পাতার ওপর
টুপটাপ ঝরে পড়তে পারবে।।
দীর্ঘ রাত্রি
শিশিরে চুম্বনরত দীর্ঘ রাত্রি শেষে,
কপালের লাল টিপ যেন ঊষা…
নববধূটির গোধূলি মলিন মুখ,
খুঁজে পেল পরিপূর্ণতার সুখ।
মাঝে মাঝে জ্বর আসুক খুব,
শরীরের উষ্ণতা মাপতে মাপতে…
বাম অলিন্দে কান পেতে ,
তুমি শুনতে চাইবে লাবডুব।
জল ফড়িং
হেমন্তের গোধূলির মতো যে জীবন,
পাতা ঝরার বিষণ্ণতা,
সবুজ জল ফড়িং এর ডানা,
ঘাসের উপর খসে পড়া।
নিচের দিকে তাকালে ,
ঝরে পড়া ধূসর বর্ণের আতিশয্য,
আর একটু উঁচুতে চোখ রাখলে,
কঙ্কাল সার শরীর।
এতো কিছুর পরেও,
কখনো কখনো জীবন্ত সবুজ পাতার হাতছানি,
কখনো বা শুধুই ছালবাকল হীন,
সব রঙ বেরঙীন।।
প্রথম দেখা
ধরো, আমার বয়স যখন ঠিক ষোল,
তখনই তোমার সাথে প্রথম দেখা হলো।
আমি ফুলের সাজি হাতে,
শিউলি কুঁড়োচ্ছি শারদ প্রভাতে,
কিংবা বসন্তের সন্ধ্যেবেলা …
মাধবী লতা তুলে,
গুঁজে নিয়েছি আমার এলো চুলে।
ধরো, ঠিক তখনই তুমি ,
সে পথ দিয়ে এলে।
আমার হাতে…’গীতবিতান’,
আর তোমার কাঁধে গিটার।
হঠাৎ করেই গিটারের সুরে,
বেজে উঠলো -‘আমি চিনি গো চিনি –
তোমারে ওগো বিদেশিনী।’
তুমি থামার আগেই, দমকা হাওয়ায় –
গীতবিতানের একটি পাতা খুলে গেল-
তাতে লেখা ছিল –
“আমার পরান যাহা চায়,
তুমি তাই, তুমি তাই গো।”
বিশ বছর পর
বিশ বছর পর, মুখোমুখি দুজনে…
দশ বছরের প্রেম,
মাঝখানে আরও কতগুলো বছর
কেটেছে একা,
তোমাকে ছাড়া।
এই নিয়ে আজ আমাদের সম্পর্ক,
ত্রিশ বছরে পা বাড়ালো।
ভালোবাসার রঙ আজ ফিঁকে…
স্মৃতিও আছে ,
আবছা আবছা।
আমার জীবন থেকে
তুমি চলে গেলে,
আমার পথও বেঁকে বেঁকে…
চলে গেল অন্য দিকে।
আজ তুমি অন্য এক তুমি,
অন্য কারও প্রেম,
অন্য কারও আশা।।
পুরোনো স্মৃতি ঘাঁটিয়ে,
আজ আর তোমার মনের
হারিয়ে যাওয়া জায়গা,
খুঁজে পেতে চাইনা।
অবচেতন মনে
তবু জাগে প্রত্যাশা…
সূর্য অস্ত যাবার আগে,
নির্জন সমুদ্রের তীরে…
বিশ বছর পর,
মুখোমুখি দুজনে।


দারুন!