
সৌম্য ঘোষ-এর কবিতাগুচ্ছ
আমরা দুজন চেয়েছিলুম প্রদীপ শিখার দিকে
শিখার নীচে ছায়াখানা উঠল খানিক কেঁপে
আমি ছিলুম তোমার পাশে কাঁধেতে হাত রেখে
থমকে গেলুম তোমার চোখে অলীক আলো দেখে।
আমরা খালি চেয়েছিলুম প্রদীপ শিখার দিকে।
এক জীবনের দেয়া নেয়া রইল অনেক বাকি
বুকের মাঝে শূন্য আসন বলেছিল, “ফাঁকি”
নাই বা পেলুম চাঁদের আলোয় হঠাৎ দেখার সুখ
অল্প আলোয় জেগেছিল তোমার মলিন মুখ।
আমরা সেদিন চেয়েছিলুম প্রদীপ শিখার দিকে।
অনেক কথা মুছে গেছে, ঘরের পরে ঘর
কিছু তবু রয়ে গেল, আপন নয়তো পর
বাঁচব আবার নতুন করে, জাগবে পুবের আলো
শুকনো পাতা জ্বলবে যত ঘুচবে তত কালো।
আমরা শুধু থাকব চেয়ে প্রদীপ শিখার দিকে।
তোমার চোখে অনেক তারা, আলো ফোটে প্রাণে
আমি তবে অন্য তারা, আকাশের এক কোণে
মেঘের ছুটি দিয়ে আমি তোমারই মুখ চেয়ে
আরও কাছে নামব তখন এক ভোরের গান গেয়ে।
যে ফুলে বরণ করে নিলে, যে ভোরে
বাসি হবে কাল সকালে
তবু বলবে, “ভালোবাসি, ভালোবেসেছি।”
প্রতিটা সকাল কঠিন
আরও কঠিন মরে বেঁচে ওঠা
অবশিষ্ট গন্ধে কী এসে যায় পাঁশুটে মুখগুলোর?
শুধু ভালোবেসে মরে একবার, প্রতিবার। চাঁদ ডুবে যায়।
নতুন সূর্য প্রখরতর
ততটাই, অনিঃশেষ স্বপ্নাতুর চোখ
ঘর্মাক্ত কপালে রাতের বলিরেখা,
যে রাত অস্পৃশ্য করেনি কখনও।
কী কথা তবে অনিশ্চিত ভোরে?
নির্লিপ্ত আলোয় বুজে আসে চোখ আরেকটা রাতের মতো
ঘনিষ্ঠ হয় নির্বিকার ক্ষুধা।
এরপরও ভালোবেসে যাবে নির্বিচারে?
এক বিনয়ী ব্যতিক্রমী কবিতার অপেক্ষায় বসে সারারাত
সবাই জেগে, দেবদারু; অশ্বত্থ। ওদের ভাষা নেই।
ভাষাহীন শুকতারাও, আর ডুবে যাওয়া চাঁদ
যেতে যেতে কী বলেছিল শোনেনি ভোরের আকাশ,
শোনেনি আরেকটা রাতের দুরাশা।
দিনের আলোই সব?
একটা অজগর আজও তোলেনি গ্রাস
লেজের ঝাপটায় ঘনায় মেঘ, পিছিয়ে যায় দিন
বিষয়ী সূর্য ভাবে না রাত
ওঠে না ব্যতিক্রমী চাঁদ পুকুরঘেরা সন্ধ্যায়
শুধু কলরব পাখির বাসায়।
ঝিঁঝিঁর শব্দে আবারও ঘনায় রাত, নুয়ে পড়ে ডাল
পেঁচার ডাকে আকাশ চিরে বিকল্প উল্লাস
ফোটে না ভোর। ঘোরের মধ্যে গড়ে ওঠে কবিতা।
এও ব্যতিক্রমী কিছু নয়।
এ বড়ো অসময়, বড়ো অস্থির এ সময়
পৃথিবী ঘুরছে খুব দ্রুত
কোথায় দাঁড়াব আমি? কোথায় দাঁড়াবে শিশুটা?
একে একে পেরিয়ে যাই বিষণ্ন নগরের সব হাতছানি
আবারও সূর্য ঢলে
মানুষের ক্লান্তিহীন আর্তি ঘুমোতে যায় রাজপথে
শিশুটা বুঁদ হয়ে থাকে মুঠোফোনের অন্তর্জালে,
কখনও টেলিভিশনের কুহক ছায়ায়।
ধ্রুবতারা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছি পশ্চিমে,
যেখানে রাত শেষে অপেক্ষা করে আরও এক রাত
সূর্য খেলা করে বুভুক্ষু উদরে।
আমি কি ছেড়ে দেব আমার আবিষ্ট হাত? আর শিশুটা?
দিগন্তে অস্ফুট আলো
যে ভোর দেখি সেটাই সব নয়।
শিশুটা মুঠোফোন ফেলে আঁকড়ে ধরে রুক্ষ হাতখানা
সেও হাঁটতে চায় একটা খটখটে দুপুর।
যে মানুষ ক্ষুধায় ঘুমোতে যায়, কবিতা ভাসে না চোখে
যে মানুষ ক্ষুধায় মারা যায়, কবিতা এঁকে যায় মুখে
যারা তাকে চির ঘুমে পাঠায়, কবিতা মুছে দেয় বুকে
আর কবিতায় যারা বেঁচে থাকে,
কবিতা থেকে তারা অনেক দূরে।
ছায়াপথের ছায়ায় হারিয়ে যায় ছায়াহীন ক্ষুধাতুর মানুষ,
আকাশের পেট ভরায়।
জ্বলে কি ওঠে নতুন ধ্রুবতারা?
ওই মানুষটাকে জানি, যেমন তার হত্যাকারীদের
ক্ষুধার কোনো ধর্ম নেই। তবু ধর্মই মরে।
ভুখা মানুষ ভিড় করে। হাত ধরে। ক্ষুধারাত হবে পার।
এপার থেকে ওপার
লিডারের শব্দ ভুলতে পারি না, বা তিস্তার
নদী আমাদের শিরায় শিরায়।
রোজ গঙ্গা পারাপার করি
তার ছলাৎ ছলাৎ পাশে বসার আর্তি
সময় কম, তবু প্রতিবার চেয়ে থাকি বুকের ভিতর
কোনো শ্যাওলা জমেনি সেখানে।
যে পাড় ভাঙে, তা ভাঙারই ছিল
তবে ওই কান্না কখনও মেশে না তার গভীরে
আমারও পাড় ভাঙে
আর আমি ঘুমোতে যাই সেইসব সরব নীরবতার প্রান্তে।
সারাদিন রোদের ঝিকমিক,
যা ঢাকতে পারে না বহমান কচুরিপানা
লঞ্চের ভোঁর মতো মিলিয়ে যায় অজস্র বর্জ্যের নির্যাস।
তারপর সন্ধে নামে। তারারা ভাসে না তার বুকে।
ভোর হতেই অনেকে ডুব দেয়, মুছে ফেলে সাময়িক ক্ষত
আমিও ডুব দিই, এপার থেকে ওপার।
নিঃস্বার্থ সুন্দর
“ভালোবাসি”, বললেই কি ভালোবাসা যায়?
সে তো নিঃস্বার্থ সুন্দর, দূর থেকে স্পর্শ করা যায়
আমি খুঁজছি আশেপাশে, কোথাও লেপ্টে আছে কিনা!
ভালোবাসা অত স্পষ্ট নয় দিনের রেখার মতো
হেঁটে চলেছি অস্পষ্ট স্নিগ্ধতার দিকে,
যা ছায়ায় ছায়ায় ঘিরে থাকবে নির্জন শীতলতায়।
যখন কোনো গাছের কাছে যাই, দেখি দাঁড়িয়ে একা
যখন কোনো নদীর কাছে যাই, দেখি বয়ে চলেছে একা
সবাই কেমন একা, জড়িয়ে ধরার কেউ নেই।
পাশে একটু বসি। আরও একজন বসে, সবার আড়ালে।
যখন ঘুমোতে যাই, গাছটা মুড়ে থাকে রাত;
শুধু হারিয়ে যায় নদী
ঘুম ভাঙলে গায়ে জলের গন্ধ, আমার মায়ের।

