
সৌন্দর্যের নিঃসঙ্গ যাপন
রাজা মুখোপাধ্যায়
"অলোকরঞ্জন শুধু বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব নন, সামগ্রিক এবং সর্বকালীন মেধাচর্চার প্রেক্ষিতেও এক বিরল প্রতিভা। কিন্তু বিচিত্রগামী নানাবিধ সৃজনে মগ্ন থেকেও আসলে তিনি নিরলস ছিলেন বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের উৎস-সন্ধানে। আর নিভৃতে জীবনব্যাপী এই সুন্দরের আরাধনা করতে করতে তিনি গমন করেছেন নিঃসঙ্গ থেকে নিঃসঙ্গতর এক ভুবনে। মানসিকভাবে দুর্গম এই পথটি বেছে নেওয়ায় তিনি স্ব-দীক্ষিত হয়েছিলেন বাল্যবয়সেই এবং সেই কারণে তাঁকে মূল্যও কম দিতে হয়নি। খ্যাতি, অর্থ, পদমর্যাদা, সম্পর্কের দূরত্ব এমনকি তার ভাঙন, কিছুই তাঁকে বশ করতে পারেনি। নিজের লক্ষ্যের প্রতি আজীবন তিনি ছিলেন অবিচল।"
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। ১৯৩৩ – এ কলকাতায় জন্ম, প্রয়াণ ২০২০ – তে, সাতাশি বছর পূর্ণ করার দেড় মাসের মধ্যে তাঁর দ্বিতীয় স্বদেশ জার্মানির হির্শবার্গ গ্রামের বাসভবনে। কী দেখেননি তিনি এই সময়কালের মধ্যে? উত্তাল তিরিশের দশকে কেটেছিল তাঁর শৈশব। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর শোকযাত্রা দেখেছিলেন। স্মৃতিতে গেঁথে গিয়েছিল সেইদিনের জনতার উন্মত্ত আচরণ। ঘটল নোয়াখালি আর কলকাতার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। দেশ ভাগ হল। কলকাতার পাট চুকিয়ে তাঁর পরিবার চলে গেল সাঁওতাল পরগণার রিখিয়ায়। অতঃপর বাবার ইচ্ছেয় শান্তিনিকেতন যাত্রা। এ প্রসঙ্গে তিনি একবার একটি সাক্ষাৎকারে অরুণ দে’কে বলেছিলেন, ‘ঠিক স্কুলের যে ফ্রেম বা প্রচলিত স্কুলের যে ফ্রেম, তাতে যে আমায় ধরবে না বা আমাকে মানাবে না, সেটা তিনি জানতেন।’ একথাও বলেছিলেন, ‘বাবা যদিও ঠিক যাকে রবীন্দ্রপন্থী বলা হয়, তা ঠিক ছিলেন না, কিন্তু অনেকটাই আমার যে মতিগতি প্রবণতা, সেইটেকে তিনি সঞ্চালিত করতে চেয়েই শান্তিনিকেতনকে নির্বাচন করেছিলেন।’

মানুষের জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে যায়, যাকে একরকম অদৃষ্টনির্ধারিত বলা যায়। আর অদৃষ্টবাদী না হয়েও একথা বলা যায়, এইরকম ঘটনাপুঞ্জ সময়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৈরি করে এক মানব। প্রতিভার আশ্চর্য বিকাশ ঘটে যায় এই প্রক্রিয়ায়। ১৮৭৩ সালে মাত্র বারো বছর বয়সে তাঁর পিতামহ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যে হিমালয় ভ্রমণ এবং দীর্ঘ যাপন, তা যে ভবিষ্যতে তাঁর অন্তর্দৃষ্টি উন্মোচনের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করেছিল, এ বিষয়টি মনে হয়, বলাই বাহুল্য। সমান্তরাল তুলনায়, অলোকরঞ্জনের ক্ষেত্রেও প্রারম্ভিক জীবনের এই যে ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষত তাঁর কলকাতা থেকে রিখিয়া হয়ে শান্তিনিকেতনে যাওয়া, শেষ পর্যন্ত যে এক অসামান্য স্রষ্টার মানসিক এবং ব্যক্তিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা পালন করেছিল, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ কম এবং তাঁর আপন শব্দভাণ্ডার একটি বিশেষ শব্দ ধার করে বলা যায়, ঘটনাবিন্দুগুলিকে যে অদৃশ্য রেখা যুক্ত করে, তাকে ‘নিয়তিময়’ বললেই যথার্থ হয়।
অলোকরঞ্জন শুধু বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব নন, সামগ্রিক এবং সর্বকালীন মেধাচর্চার প্রেক্ষিতেও এক বিরল প্রতিভা। কিন্তু বিচিত্রগামী নানাবিধ সৃজনে মগ্ন থেকেও আসলে তিনি নিরলস ছিলেন বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের উৎস-সন্ধানে। আর নিভৃতে জীবনব্যাপী এই সুন্দরের আরাধনা করতে করতে তিনি গমন করেছেন নিঃসঙ্গ থেকে নিঃসঙ্গতর এক ভুবনে। মানসিকভাবে দুর্গম এই পথটি বেছে নেওয়ায় তিনি স্ব-দীক্ষিত হয়েছিলেন বাল্যবয়সেই এবং সেই কারণে তাঁকে মূল্যও কম দিতে হয়নি। খ্যাতি, অর্থ, পদমর্যাদা, সম্পর্কের দূরত্ব এমনকি তার ভাঙন, কিছুই তাঁকে বশ করতে পারেনি। নিজের লক্ষ্যের প্রতি আজীবন তিনি ছিলেন অবিচল।

আন্তর্জাল এবং সমাজমাধ্যম যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভৌগলিক দূরত্ব আপাতভাবে কমিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে চিঠি লেখার অভ্যাস, পঙ্গু হয়ে গেছে সৃজনী। বিশ্ব জুড়ে পত্রসাহিত্যের এই অপমৃত্যু ঘটার আগে যখন চিঠিই ছিল সংযোগ স্থাপনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম, অলোকরঞ্জনের আপন বৃত্তের সকলকেই কমবেশি তিনি চিঠি লিখতেন নিরলস। টেলিফোন ছিল ব্যয়সাপেক্ষ, তাই টেলিফোনে সে যুগে আজকের মতো দীর্ঘ কথোপকথন ছিল অভাবনীয় আর সেই কারণেই আরও ডাক যোগাযোগের সৌজন্যেই চলত খবর আর আবেগ আদানপ্রদান। ঠুনকো ইমোজিনির্ভর যুগে সেই আস্বাদন অনেকটা মঙ্গলগ্রহে চড়ুইভাতি করার মতো ব্যাপার!

যে যুগের কথা বলছি, তখন ইউরোপ থেকে একটি চিঠি আসতে সময় লাগত তিন সপ্তাহ কি তারও বেশি। কিন্তু উত্তেজনাবিদ্ধ এই সময়টিতে চিঠিটির সুদীর্ঘ যাত্রাপথ যেন দেখতে পাওয়া যেত। কত গিরিপথ, জলরাশি আর মরুপ্রান্তর অতিক্রম করে যেন শেষে Mit Luftpost লেখা জার্মানির ডাকটিকিট লাগানো একটি সাদা খাম অথবা আমাদের ইনল্যান্ড লেটার ধরনের একটি নীল চিঠি উঁকি মারত লেটারবক্স থেকে, যার ওপরে তাঁর ব্যক্তিত্বের মতোই আকর্ষণীয় হস্তাক্ষরে লেখা প্রাপকের নাম এবং ঠিকানা। এই অভিজ্ঞতা যাঁদের হয়েছে, তাঁরা জানেন কেমন ছিল সেই মুহূর্তটির অনুভূতি। এক ধরনের অদ্ভুত উত্তেজনামেশা আনন্দ সেইসময় ভর করত। অতি সন্তর্পণে সেই চিঠিটিকে আবিষ্কার করা যেন সদ্য প্রকাশিত একটি বইয়ের মোড়ক খোলার এক চকিত অথচ চূড়ান্ত অভিঘাতময় ক্ষণ! এরপর যেটি দৃশ্যমান হত, তা হচ্ছে অন্তত দুই বা আড়াই পাতাব্যাপী কিছুটা সংলাপের ঢং–এ লেখা এক আশ্চর্য গদ্য, যাকে কবিতা বললেও অত্যুক্তি হয় না। একই ব্যক্তিকে লেখা প্রতিটি চিঠির বিষয়বস্তুর সঙ্গে বদলে যেত তার ছন্দ। মনস্তত্ত্ব, আবেগ, স্নেহশীল অভিভাবকত্ব – এই সবকিছুর মিশেল ছাপিয়ে উঠত তাঁর নান্দনিক বোধ। ফলত এই চিঠিগুলির প্রত্যেকটিই হয়ে উঠত সংরক্ষণতুল্য। সম্প্রতি যখন একটি খবরে চোখ আটকে যায় যে ডেনমার্কে ডাকবিভাগ আর কাউকে কখনও কোনও চিঠি পোঁছে দেবে না, তখন কেমন যেন নিজেকে জাতিস্মর মনে হয়, মনে হয় চিঠি লেখা তো গতজন্মের কোনও সংস্কার! আসলে তাই কি? আসলে বিগত তিন-চার দশকে পৃথিবীটা একেবারে বদলে গেছে। বার্লিন প্রাচীরের পতন হয়েছে। কমিউনিস্ট দুর্গগুলি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। চারপাশে এখন শুধু একপেশে নির্লজ্জ পেশি প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই তেমন চোখে পড়ে না। স্বভাবতই আমূল পরিবর্তন হয়েছে শিল্পের ধরনধারণের। নন্দনতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ হত্যালীলার প্রসঙ্গে দার্শনিক থিওডোর আডর্নো যেমন বলেছিলেন, ‘আউশহ্বিৎসের পর আর কবিতা লেখা সম্ভব নয়’, প্রায় সেই একই সুরে অলোকরঞ্জন উচ্চারণ করেছিলেন, ‘গালফ্ যুদ্ধের পর আর লিরিক কবিতা লেখা যায় না’। এ যেন এক অতীন্দ্রিয় সমাপতন! যে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘যৌবন বাউল’, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল লিরিক কবিতা, তিনিই তাঁর সৃজনের একের পর এক শৃঙ্গ অতিক্রম করতে করতে, পালটে যাওয়া এক সময়ের সন্ধিক্ষণে এমন মন্তব্য করেছিলেন। একথা ভাবলে কিন্তু ভুল হবে, সৌন্দর্য পিপাসু তাঁর ব্যক্তিত্ব আজীবন লালিত এই মননবৈশিষ্ট্য ত্যাগ করেছিল। প্রকৃতপক্ষে অন্যতর এক সৌন্দর্যের সন্ধানে মেতে উঠেছিলেন তিনি। পৃথিবী-জোড়া শরণার্থী সংকট, যুদ্ধ, প্রাচীরের পতন অথবা তার নবনির্মান কিংবা মানুষের ন্যূনতম গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য যে কঠিন সংগ্রাম – এ সবই বদলে দিয়েছিল তাঁর নিত্যনতুন কবিতা লেখার আঙ্গিক আর তার অভিমুখ। কিন্তু ‘মাঠ ছাড়েননি’ তিনি। ব্যক্তিগত নন্দনতত্ত্ব আঁকড়ে থেকেছেন সারাজীবন। তাই যখন ক্রমে চিঠি লিখে তার উত্তর পেতে দেরি হতে লাগল অনেক, তিনি তুলে নিলেন আরেক হাতিয়ার- ফ্যাক্স। অতঃপর আবার শুরু হল প্রিয়জনের সঙ্গে তাঁর ভাবের আদান-প্রদান। তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে। তাঁর গতির সঙ্গে তাল রাখতে গিয়ে হিমসিম খেতে হত প্রাপককে। অনেক সময় উত্তর (যাকে তিনি বলতে ভালোবাসতেন, ‘সাড়া দেওয়া’) হয়ে পড়ত গতানুগতিক বা দায়সারা। যা সহ্য করতে পারতেন না তিনি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চলে আসত তাঁর আহত প্রতিক্রিয়া। জার্মানিতে তাঁর বাসভবনের পাতালঘরে আরও অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে সযত্নে রাখা ছিল তাঁর অতি প্রিয় ফ্যাক্স যন্ত্রটি। ইমেইল লিখবেন না কোনওদিন পণ করেছিলেন, কিন্তু ফ্যাক্সের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখায় তিনি ছিলেন ক্লান্তিহীন। কত যে কবিতা, কত প্রবন্ধ বা সমসময়ের কোনও বিষয় নিয়ে তাঁর তীব্র প্রতিক্রিয়া, সবই এক লহমায় পৌঁছে যেত এখানে। কিন্তু কখনও, কোনও পরিস্থিতিতে এমন দেখা যায়নি যে তাঁর আজন্ম-লালিত একান্ত নিজস্ব সৌন্দর্যযাপনের গণ্ডিটি তিনি পেরিয়ে গেছেন। এই সূত্রে এসে যায় একটি ঘটনার প্রসঙ্গ। সেটা সম্ভবত দেশে জরুরি অবস্থা জারির পূর্বক্ষণ। রাজভবনে কয়েকজন বিশিষ্টজনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির এক চা-পানের আসরে আমন্ত্রিত হয়েছেন অলোকরঞ্জন। সেখানে কথোপকথনের এক সন্ধিক্ষণে উঠে আসে ‘লেখকের স্বাধীনতা’র প্রসঙ্গ। শানিত, দৃঢ় অথচ নম্রভাবে সেদিন ইন্দিরা গান্ধির বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। শোনা যায়, এরপর কয়েক মিনিট সেই সভাকক্ষে বিরাজ করেছিল এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। এর অনেক পরে যখন এ রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের প্রাক-মুহূর্তে ঘটে যায় নন্দীগ্রাম বা নেতাই, তখনও তিনি ছিলেন সদা বিচলিত। নানান লেখাপত্রে, ঘরোয়া আলোচনায় প্রতিবিম্বিত হচ্ছিল সেই অস্থিরতা। কিন্তু এমন অসতর্ক ক্ষণের সাক্ষী কেউ নেই, যখন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সৌজন্যবোধ হারিয়ে ফেলেছিলেন।

শিক্ষকতা ছিল তাঁর ধমনীতে। বুদ্ধদেব বসু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তুলনামূলক সাহিত্য’ বিভাগ তৈরি করার পর অলোকরঞ্জন সেখানে যোগ দেন এক তরুণ অধ্যাপক হিসাবে। নবনীতা দেবসেন, অমিয় দেব, মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা সুবীর রায়চৌধুরির মতো ভবিষ্যতের নক্ষত্ররা সেদিন ছিলেন তাঁর ছাত্রদের মধ্যে। তাঁর আশি বছরের জন্মদিন পালনের এক অনুষ্ঠানে নবনীতা দেবসেন এসেছেন। মঞ্চে উপবিষ্ট অলোকরঞ্জন। নবনীতা বললেন, ‘উনি আমার মাস্টারমশাই’, তারপর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। এ দৃশ্য ভোলার নয়।
যে দেশে তিনি তাঁর জীবনের পাঁচ দশক কাটিয়েছেন, যে সময়ের মধ্যে তিনি পৌঁছেছিলেন তাঁর সৃজনশীলতার শীর্ষে, অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন, তৈরি হয়েছে কৃতি ছাত্রছাত্রী, যাদের অনেকে এখন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, সেই জার্মানিতেও তিনি গড়ে নিয়েছিলেন একই সমান্তরাল জীবনধারা। ওয়াকিবহাল মাত্রই একথা জানেন। হাইডেলবার্গের সন্নিকটে এক ট্রামলাইনের গা ঘেঁষে (যে পাঁচ নম্বর ট্রামে করে দীর্ঘ সময় জুড়ে তিনি সাউথ এশিয়া ই্নস্টিউট থেকে বাড়ি ফিরতেন) দু’নম্বর ওডেনহ্বাল্ড স্ট্রাসের পিছনে ছিল এক অসাধারণ বাগান। সেখানে অনেক গাছগাছালির সঙ্গে ছিল কিছু পাখির বাসা। সেই বাগানের পা-ডুবে যাওয়া ঘাসের মাথায় রাতভর জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলিকে সকালের রোদ এসে যখন আদর করত, প্রায়শই পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর একটা শাল চাপিয়ে বেরিয়ে যেতেন তিনি পাখিদের খাওয়াতে। আহারপর্বে পাখিদের কলতানের সঙ্গে চশমার আড়ালে তাঁর চোখেমুখে ফুটে উঠত এক অনির্বচনীয় আনন্দের আলো।

অতি সুদর্শন এই মানুষটির ব্যক্তিত্বের আরেকটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ব্যাপার ছিল কোনও বিশেষ প্রস্তুতি ছাড়াই একটি অতি জটিল বিষয়ে অনর্গল কথা বলতে পারা। তাঁর শব্দ চয়ন, বাক্য বিন্যাস এবং অবশ্যই বাচনভঙ্গি এমন একটি সম্মোহক পরিবেশ তৈরি করত যে একমাত্র সেই অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ শ্রোতাই তার সাক্ষ্য দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে তাঁর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন, কবি শঙ্খ ঘোষের তিনি ছিলেন ঠিক বিপরীত। শঙ্খবাবু ছিলেন মূলত শ্রোতা, মৃদুভাষী আর অলোকরঞ্জন এককথায়, তাঁর নিজস্ব কৌতুকী বিশেষণ প্রয়োগে, ‘বাচাল’। অথচ এই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘সপ্তসিন্ধু দশ দিগন্ত’র মতো অসামান্য এক অনুবাদ-গ্রন্থ, যার ভূমিকায় বইটি সম্পর্কিত যাবতীয় কৃতিত্ব তাঁর অনুজ বন্ধুকেই দিয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষ। কথা বলতে ভালোবাসতেন তিনি। প্রায় যে লিখনশিল্পে মুগ্ধ করতেন আমাদের, সেই গদ্যভাষাই (পড়ুন কাব্যভাষা) কথা বলার সময় উঠে আসত, এমনকি ঘরোয়া আড্ডাতেও। ফলত দৈনন্দিন বিষয়ের সঙ্গে সাহিত্য-বিষয়ক কোনও আলোচনার মূলগত পার্থক্য থাকলেও বিন্দুমাত্র গুণগত প্রভেদ খুঁজে পাওয়া যেত না। আশ্চর্য এই ক্ষমতার কারণেই তাঁর যে কোনও ভাষণ সর্বদাই ছিল সৌন্দর্য, সৃজনী আর কৌতুকের মিশেলে এক অনিন্দ্য অভিজ্ঞতা। ‘প্রমা’ পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক সুরজিত ঘোষ অলোকরঞ্জন কলকাতায় থাকলেই অন্তত একটি সাহিত্য-আড্ডার আয়োজন করতেন। সেটা গত শতকের সত্তর-আশি কিংবা নব্বই-এর দশকের কথা। সেইরকম কোনও একটা অনুষ্ঠানে বলা শুরু করে কয়েক মুহূর্ত থেমে থেকে বলেছিলেন, ‘কবিতা পড়া বা লেখা হল চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকা’। আরেকবার পাউল ৎসেলানের কবিতার অনুবাদ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, সেগুলি এমন গোত্রের বিশুদ্ধ কবিতা যে ‘জার্মান ভাষাতেও তার যথাযথ অনুবাদ সম্ভব নয়’। সময়ের তাৎক্ষণিকতায় আচম্বিতে করা এমন অজস্র মন্তব্যের যথার্থতা ঠিকমতো হৃদয়ঙ্গম না হয়ে থাকলেও আজ এতগুলি দশক পর বাক্যগুলি মাথায় খেলা করলে কেন জানিনা শিহরণ হয়।
তাঁর অজস্র ভাষণের মধ্যে থেকে দুটির কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে ইচ্ছে হচ্ছে। প্রথমটি গত শতকের আশির দশকের প্রথমার্ধে ‘প্রেমে পরবাসে’ নামে হাইনরিশ হাইনের এক দ্বিভাষিক (জার্মান-বাংলা) সংকলনের মঞ্চরূপের প্রারম্ভে মাক্স ম্যুলার ভবনে এক সংক্ষিপ্ত স্বাগত ভাষণ। যার অভিঘাত আজও রয়েছে। দ্বিতীয়টি, প্রথমটির প্রায় দুদশক পরে, এই শতকের গোড়ার দিকে বাংলা অকাদেমি প্রেক্ষাগৃহে জার্মান প্রবন্ধকার এবং সমালোচক হ্বাল্টার বেনিয়ামিন-কে নিয়ে প্রায় দুঘণ্টা ব্যাপী এক বক্তৃতা। শুধুমাত্র স্মৃতিশক্তির ওপর ভর করে যে এমন একটি বক্তৃতা দেওয়া যায়, তা সত্যিই অভবনীয় মনে হয় আজও। এমতবস্থায় মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়া ছাড়া দর্শকশ্রোতার আর কিছুই করার থাকে না। কথা বলার সময় নিজস্ব ভঙ্গিমায় তিনি তৈরি করে নিতেন নতুন অনেক শব্দ। যেমন ‘প্রভোকিত’ – যে শব্দের অতর্কিত ব্যবহারে একবার আমাদের আকৈশোর সুহৃদ (তাঁর ছাত্রও বটে) হানস্ হার্ডারের হাসি বন্ধই হচ্ছিল না! এইভাবে তাঁর অনায়াস-সৃষ্ট অজস্র শব্দের সৌন্দর্যে সেজে উঠত তাঁর যে কোনও ভাষ্য।
অলোকরঞ্জনের যাপিত সময়কালের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন তাঁর মননসঙ্গিনী ট্রুডবার্টা। নিজের অজান্তেই একরকম যে একগুঁয়ে সৌন্দর্যবোধে অলোকরঞ্জন দীক্ষিত হয়েছিলেন বাল্য বয়সেই, এক পরিণত স্রষ্টা হিসাবে তিনি তরুণ বয়সে পেয়েছিলেন অসাধারণ এই রমণীর সঙ্গ। বিবাহের পর তাঁরা প্রথম সংসার পেতেছিলেন দক্ষিণ জার্মানির উলম্ শহরে। যৌথ সৌন্দর্যরচনার সেই সূত্রপাত। এরপর পেশাগত কারণে তাঁরা চলে আসেন হাইডেলবার্গ শহরের কাছে একটি ছোট্ট জনপদ হির্শবার্গে। অলোকরঞ্জন তখন হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া ইনস্টিউটে বাংলা পড়াচ্ছেন আর ট্রুডবার্টা স্থানীয় একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তাঁদের তিনতলা বাড়িটির তৃতীয় তলটি ছিল অতিথিশালা। সুবিশাল একটি শয়নকক্ষ (যেখানে একসঙ্গে অন্তত ছ’জন থাকতে পারতেন) এবং সংলগ্ন স্নানের জায়গা, যার জানালা ফাঁক করলেই দূরে চোখে পড়ত ওডেনহ্বাল্ড পাহাড়শ্রেণীর রেখা। কলকাতার লেখক, প্রকাশক, চিত্রকর এমন কেউই নেই, যাঁরা জার্মানি গেছেন অথচ ট্রুডবার্টা-অলোকরঞ্জনের আতিথেয়তা গ্রহণ করে ওই অতিথি-কক্ষে থাকেননি। দোতলায় ছিল এই দম্পতির শয়নকক্ষ এবং কয়েক হাজার বইয়ের এক সংগ্রহশালা, যেটি একতলার বসার ঘর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। একতলায় খাবার টেবিলটির একধারে থাকত স্তূপীকৃত বইপত্র এবং লেখার কাগজ। জানালার ধারে তাঁর প্রিয় চেয়ারটিতে বসে লেখালেখিতে ডুবে থাকতেন অলোকরঞ্জন। আপদমস্তক বাঙালি এই মানুষটির জন্য ট্রুডবার্টাও হয়ে উঠেছিলেন ‘বাঙালিনী’। অসামান্য রান্না করতেন। অবশ্যই বঙ্গরসনার সুতৃপ্তির জন্যই। রাতবিরেতে ফোন করলে জানতে পারতাম তখনও নৈশাহার হয়নি, ট্রুডবার্টা বেগুন ভাজছেন, তারপর তাঁরা খেতে বসবেন। একজন আড্ডাপ্রিয় বাঙালিকে বিবাহ করে আজন্মলালিত এরকম অনেক অভ্যাসই ত্যাগ করেছিলেন ট্রুডবার্টা, অথবা বলা ভালো, নতুন সব অভ্যাস তৈরি করে নিয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়ায় দু’দেশ জুড়ে বৃহৎ যে পরিবারটি গড়ে তুলেছিলেন দুজনে, সেই পরিবারের প্রত্যেকের বিশেষ দিনে তাকে শুভেচ্ছা জানানোর একটি বিরাট তালিকা চোখে পড়েছিল তাঁদের অতি সুসজ্জিত রান্নাঘরের দরজার পিছনে। তাঁর প্রয়াণের পর। জাগতিক যে কোনও বিষয়ে প্রায় অজ্ঞ এবং উদাসীন একজন মানুষকে নিয়ে ঘর করার যে নিদর্শন ট্রুডবার্টা ২০০৫ সালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর আগে পর্যন্ত রেখে গেলেন, তার তুলনা পাওয়া সহজ হবে না। তার চেয়েও বড় কথা ঘর ও বাহির সমান দক্ষতায় সামলে, অলোকরঞ্জনের মতো প্রতিভাধর একজন মানুষ যাতে সর্বদাই তাঁর সৃজনের প্রতি মনোযোগী থাকতে পারেন, সেইদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য ব্যক্তিগতভাবে নানা সময়ে তাঁকে কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীরাই জানেন। জীবনের শেষ পর্বে, অলোকরঞ্জন যখন নিঃসঙ্গ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, ভঙ্গুর, দিশাহারা তখন তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এলিজাবেথ গ্যুন্ঠার, কোনও রকম প্রত্যাশার সমীকরণ ছাড়াই। ভারতপ্রেমী এই রমণী ভালোবেসেছিলেন এই অবুঝ মানুষটিকে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শুশ্রূষা করেছেন তাঁর শিল্পী-সত্তার। সেইসঙ্গে ঋণী করলেন আমাদেরও।
মৃত্যু মানুষের জীবনে বয়ে নিয়ে আসতে পারে অপার শূন্যতা। আবার এই ধরনের চরম আঘাত থেকে জন্ম নেয় কালজয়ী শিল্প। পৃথিবীতে এর নজির অনেক। পুত্রশোকে দগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছেন অসামান্য গান। দুঃসময় আর ক্ষত থেকে অবিরল রক্তক্ষরণের মধ্যেও মাথা তুলে দাঁড়ায় স্রষ্টা। প্রকৃত সৌন্দর্যের সাধক। অলোকরঞ্জনের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রাত্যহিক যেকোনও খুঁটিনাটি বিষয়েও যাঁর ওপর চূড়ান্ত নির্ভরশীল ছিলেন তিনি, সেই জীবনসঙ্গিনী ট্রুডবার্টার অকাল প্রস্থানের পর পনেরো বছর তিনি আক্ষরিক অর্থেই হয়ে পড়েছিলেন অবলম্বনহীন। এক অর্থে জীবন ধারণের সংজ্ঞাই বদলে গিয়েছিল। তবুও তিনি বাড়িভর্তি বই আর আসবাবের মধ্যে তিনি বাঁচার এক স্বতন্ত্র শৈলী নির্মাণ করে নিয়েছিলেন কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও লক্ষ্যচুতি ঘটেনি তাঁর। আপসহীন সৌন্দর্য যাপনের এক বিরল নমুনা রেখে গেছেন তিনি তাঁর জীবদ্দশায়। হির্শবার্গের এক সমাধিক্ষেত্রে তাঁদের যৌথ স্মৃতিফলকে উৎকীর্ণ হয়ে আছে তাঁরই অনুবাদে তাঁর প্রিয় কবি গ্যোটের ‘প্রাচী প্রতীচীর দিভান’ গ্রন্থের কয়েকটি লাইন, ‘Gottes ist der Orient/Gottes ist der Okzident/Nord u. suedliche Gelaende/Rueht im Frieden seiner Haende’, যা তাঁদের অঙ্গীকৃত জীবনস্তোত্র বলে মনে হয়, ‘ইশ্বরের নিজস্ব এই প্রাচী/ ইশ্বরের নিজস্ব প্রতিচি/যা-কিছু রয় উত্তরে ও দক্ষিণাঞ্চলে/শান্তি নিয়ে জুড়িয়ে আছে তাঁরই তো করতলে’।


