
বন্দনা ঘোষ-র কবিতাগুচ্ছ
অভিযোগ
মনের মধ্যে অভিযোগের পাহাড়,
আর সেই কঠিন পাহাড়ের নিচে,
চাপা পড়ে গুমড়ে কেঁদে ওঠে,
ভালোবাসার সম্পর্কগুলো।
একটার পর একটা অনুযোগ,
ক্ষীণ হয় যোগাযোগ,
কথাও ফুরিয়ে যায় একটা সময়,
সমস্ত মন জুড়ে থাকে শুধু উপেক্ষা।
কথার পিঠে কথা সাজিয়ে,
তৈরি করা তর্কেরাও,
একদিন ‘নীরবতা’ হয়ে,
ফিরে আসে নিজেরই শূন্য মনে।
অভিযোগ নয়, তুমি বরং
সময় পেলে একটু সময় দিয়ে,
মনের মধ্যে জমে থাকা পাথরটাকে-
ঠেলে সরিয়ে দিও।
কি লাভ!
শিখে যোগ-বিয়োগ,গুণ-ভাগ,
যদি জীবনের হিসেবটাই-
না মেলাতে পারো ঠিকঠাক।।
প্রাক্তন
একটা নির্জন পাহাড়ের বাঁকে
দেখা হোক দুজন মানুষের,
যারা এখন …
একে অপরের প্রাক্তন।
কোন এক দিন ভালোবেসেছিল
সে কথা ভাবছে মনে মনে ,
আর ঠিক তখনই শত শত মেঘেদের মন ভেঙে …
বৃষ্টি নেমে আসুক পৃথিবীতে।
পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্ণা
হয়ে উঠুক আরো ভয়ার্ত,
আর তার গর্জনে ভেঙে যাক …
সমস্ত নীরবতা।
বহু দিন আগে যে কথা বলতে চেয়েও…
তাঁদের বলা হয়ে ওঠেনি আর,
সে কথাই আজ…
ঝরে পড়ুক ঝর্ণার কলরব হয়ে।
আগুন
আগুন…
ওম দেয় এই কঠিন শীতে,
আরাম লাগে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে।
আগুন…
ঘর জ্বালিয়ে একমুঠো ছাই হয়ে
ফিরে আসে হাতের তালুতে।
আগুন…
মন পোড়ানো আত্মগ্লানিতে নিঃস
কাঙ্খিত সুখের জীবন।
আগুন…
গনগনে উত্তাপে সেদ্ধ হয় চাল,
গরম ভাতের গন্ধে মাতাল হয়ে ওঠে ক্ষুধার্ত মন।
আগুন,
শেষ বারের মতো জ্বলে ওঠে শ্মশানে
ফুরোয় জীবনের সব লেনদেন।
জীবাশ্ম
সময় গড়িয়েছে যত বেড়েছে বয়স তত,
বয়স সে তো…
কয়েকটি সংখ্যা মাত্র
থেমে থাকবে কেন?
কিন্তু তুমি কি জানো ,
আমার মন আজও থেমে আছে ,
আজও আমার সময় কাটে…
তোমার কথা ভেবে।
আমি আজও তোমার জন্য
গোলাপ লুকিয়ে রাখি,
ডাইরির পাতায়।
আর সেই গোলাপের জীবাশ্ম…
অতীতের হাজারো স্মৃতি নিয়ে,
সামনে এসে ভিড় করে দাঁড়ায়!
মনে করিয়ে দেয়,
সেই সব দিন…
তোমার মনে আছে ?
বিশেষ করে সেই
দিনটির কথা ,
আমি কিন্তু ভুলতে পারিনি আজও।
কি যেন একটা
কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে,
আমার চুড়িতে…
তোমার হাত গেল কেটে।
রক্ত ঝরে পড়ছিলো….
কি করব বুঝতে না পেরে,
আমি অস্থির হয়ে উঠেছি,
এমন সময়…
তুমি এক ফোঁটা রক্ত,
আঙ্গুলের ডগায় নিয়ে,
তুলে দিলে ,
আমার সিঁথিতে।
সেদিন, সাক্ষী ছিল…
পড়ন্ত বেলার অস্তগামী রক্তিম সূর্য
আর কয়েকটা পাখি…
যারা ঘরে ফিরছিলো।
কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে,
আমি ফিরে এলাম,
আস্তে আস্তে রক্তের দাগ,
মুছে গেল , সিঁথি থেকে।
মনের মধ্যে , একটা দাগ রয়েই গেল
মুছতে পারিনি আজও…
তবুও বলবো তুমি আমায়,
মুক্তিই দিয়েছো।
কেন জানো?
তোমার সঙ্গে ঘর বাঁধলে,
সে ঘরে আমি বন্দি হয়ে,
একটা সময় হয়তো হাঁপিয়ে উঠতাম।
কিন্তু আজ আমি ,
অন্যের খাঁচায় বন্দি হয়েও
তোমার কথা ভাবি,
আর এতেই আমার মুক্তি।
যোগাযোগ
ধরো হঠাৎ করে একদিন,
সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেল…
আমাদের কথা হবে না আর।
মনে পড়বে…
অন্ধকার নদীর তীরে,
আকাশ ভর্তি তারা মাথায় নিয়ে,
দু’জনের হাতে হাত রেখে বসে থাকা
একটা, দুটো তারাদের খসে পড়া।
আর সঙ্গে সঙ্গে হাত শক্ত করে চেপে ধরে তুমি প্রার্থণা করতে…
আমাদের ছোট একটা ঘর,
সামনে উঠোন, উঠোন জুড়ে জুঁই!
খোঁপায় ফুল গুঁজে,এ ঘর ও ঘর আমার ঘোরাঘুরি।
সেদিনও মনে পড়ববে,
এই নদীর সাঁকো…
জলে ডুবানো আধভেজা পায়ের পাতা।
সেদিনও কি …
এমনই তরঙ্গে তরঙ্গে হিল্লোলিত হয়ে উঠবে তুমি!
উড়নচণ্ডী
খুব ইচ্ছে ছিল , উড়নচণ্ডী হবো
ঝড়ের মত এসে …
তোমার জীবনকে ,
ওলট -পালট করে দেব।
এলাম…
শান্ত, স্নিগ্ধ নদী হয়ে।
অন্তঃসলীলার একটা চোরা স্রোত…
হৃদয়ের গভীরে বয়ে গেল নীরবে।

